শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

শামসুজ্জামান হীরা 'র গল্প : খোরশেদের শেষ ইচ্ছা

খুব যে একটা ঘনিষ্ঠতা ছিল তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে দুজনেই জড়িত ছিলাম। একই ছাত্রসংগঠন করতাম। আমি ছিলাম বরাবরই অগোছালো -- ও ছিল পরিপাটি; যেমন বেশভুষায়, তেমনই কথাবার্তা চলন-বলনে। নিপাট সুবোধ যুবক। ছাত্র হিসাবেও যথেষ্ট মেধাবী ও মনোযোগী। সে তো আজকের কথা নয়, তেতাল্লিশ বছর আগেকার কথা। এখনও অনেক স্মৃতি তাজা ঝকঝকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকাবার পর বহুবছর ওর সঙ্গে আর দেখা নেই। শুনেছিলাম, রাজনীতি ছেড়েছুড়ে চাকরিতে ঢুকে পড়েছে। বেশ সুনামও কুড়িয়েছে প্রশাসন ক্যাডারের ঊর্ধ্বতন একজন আমলা হিসাবে। এ খবরটাও কানে আসে আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে। মনে মনে যে সূক্ষ্ম পুলক বোধ করিনি তা নয়। একই ছাত্রসংগঠনের এককালীন একজন সদস্যের সুনামে কার না ভালো লাগে! তারপর আর কোনও খোঁজখবর নেই। পরিচিতজনদের মুখে শুনেছি, মেয়াদ পূর্ণ হবার আগেই বিরক্ত হয়ে ও চাকরি ছেড়ে দেয়। চাকরি করার মত সামান্যতম পরিবেশও নাকি ছিল না দুহাজার তিন সালের দিকে। কদিন আগে কেন জানি ওর কথা মনে পড়ছিল খুব। এবং কী আশ্চর্য হঠাৎ মুঠোফোনে ভেসে এল: আমি খোরশেদ, চিনতে পেরেছেন? ভার্সিটিতে একসঙ্গে...

প্রথমে একটু থতমত খেলেও সামলে নিয়ে গলায় উচ্ছ্বাস মিশিয়ে সাড়া দেই: আরে চিনব না মানে! কী অদ্ভুত! আপনার কথাই তো ভাবছিলাম। টেলিপ্যাথি! কতবছর পর যোগাযোগ। তা কোত্থেকে? ঢাকায়?

-হুঁ, উত্তরায় থাকি। মনোজ -- চিনেছেন তো, মনোজের কাছ থেকে আপনার ফোন নাম্বারটা জোগাড় করলাম। কেমন আছেন?

-সত্তর বছরের একজন লোক যতটুকু ভালো থাকতে পারে...

-দেখা হওয়া দরকার, অনেক কথা আছে। আপনি তো মগবাজারেই থাকেন, মনোজ বলল... 

-হ্যাঁ, ছিয়াত্তর থেকেই আছি, চল্লিশ বছর কেটে গেল দেখতে দেখতে।

আমার বাসাতেই দাওয়াত দিতে পারতাম ওকে। দিলাম না। বাসায় থাকার মধ্যে আমি, দু’ছেলে আর স্ত্রী। ছেলে দুটো ইউনিভার্সিটিতে। স্ত্রী চাকরি করে এক প্রাইভেট কলেজে -- আমার ঘুম ভাঙার আগেই বেরিয়ে যায়, ফেরে সেই সন্ধ্যা করে -- কখনও-বা রাত। এ-রকম বাসায় অতিথিদের আগমন স্বস্তিদায়ক নয় মোটেই।

-বইমেলায় দেখা করা যায়, কি বলেন? আমার জবাবের অপেক্ষায় না-থেকে খোরশেদ বলে।

চমৎকার প্রস্তাব -- রথ দেখা কলা বেচা দুটোই হবে। মেলা শুরু হয়েছে সেই কবে; যাব যাব করে যাওয়া হয়ে ওঠেনি আজও। বহুদিন পর একসময়কার ছাত্রআন্দোলনের সহযোদ্ধার সঙ্গে দেখা হবে -- ভেবে রোমাঞ্চিত হই। অনেক পুরনো ঘটনা নিয়ে আলাপ হবে। জানা যাবে সেই সময়কার আরও অনেক পুরনো বন্ধুর হদিস; কে কোথায় আছে -- কে কী করছে। খোরশেদই-বা এখন কী করছে। ছাত্রজীবনে ছিল পাড় মার্কসবাদী। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভালো ছাত্র -- ক্লাশে একনম্বর। মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিনও পড়ত চুটিয়ে। বইপোকা হিসাবে ওকে ঠাট্টা করত বন্ধুরা। দেখতে সুশ্রী খোরশেদের পেছনে মেয়েদের চোখ আটকে থাকত। ভাব জমাতে চাইত অনেকেই। কিন্তু ঢ্যাঙা কালোমত মেয়েটি, যাকে সহাধ্যায়ীরা মস্করা করে ডাকত মহিলা পুলিশ -- তারই সঙ্গে দেখা যেত খোরশেদকে -- পাবলিক লাইব্রেরির বারান্দার শীতল মেঝেতে ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা বসে থাকতে। চাঁদের পাশে যেন একখণ্ড মেঘ! ওর এই সঙ্গিনী পছন্দের ব্যাপারটাও ছিল অনেকের কাছে বিস্ময়ের বিষয়।

বইমেলাতেই দেখা। কে বলবে ও-ই খোরশেদ! একমাথা ঝাঁকড়া চুল কোথায় উধাও! সারামুখে মাকড়শার জালের মত বলিরেখা। ফর্সা চামড়া কুঁচকে গেছে -- ঘন দুধের ওপর সর যেমন কোঁচকায়। নুব্জ খোরশেদ। বয়সের ভারে কি? তা তো হবার নয়। বয়সে তো আমার চেয়ে কিছুটা ছোটই হবে। নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেবার আগপর্যন্ত -- এমন কী হাতে হাত নিয়েও ক'মুহূর্ত ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারিনি ওকে।

-চিনতে খুব অসুবিধা হচ্ছে, তাই না হীরাভাই? 

-এতোটা বদলে গেছেন! অসুস্থ ছিলেন নাকি? 

-চলুন বটতলায় গিয়ে বসি।

-এখন কোনওকিছু করছেন?

-বেকার।

-ভাবি, ছেলেপুলে?

-প্রথমটা নেই -- অন্যদের বৈধ অস্তিত্বের প্রশ্ন আসে না। 

-মানে লাইফ-ব্যাচেলর -- চিরকুমার!

-চিরকুমারের ডেফিনেশন কী জানি না। বিয়ে করিনি, ব্যস্...।

-ওই যে মেয়েটার সঙ্গে আপনার বেশ ভাব ছিল -- লম্বামত...।

-ও-কথা থাক। দুনিয়াতে বহু পুরুষ বিয়ে না-করে কাটিয়ে দিচ্ছে বেশ।

-না, মানে সেক্স জিনিসটা তো কম ইম্পর্ট্যান্ট নয়, নাকি?

-কারও কারও কাছে। ধরে নিন ব্রহ্মচারী। চাপা হাসি খোরশেদের ঠোঁটে।

-শুধু শারীরিক প্রয়োজনই নয়। সঙ্গী থাকাটাও তো দরকার।

-গ্রামের এক বিধবা, খালা বলে ডাকি, থাকেন আমার সঙ্গে। বন্ধুবান্ধব দু’চারটে যে নেই তা নয়। চাকরি ছাড়লেও ক্লাবে প্রায়ই যাই আড্ডা মারতে। খেলাধুলাও হয়। একটু-আধটু গলা না ভেজালে ভাল্লাগে না। আড্ডা চলে আপনার?

-নাহ্ , ফুরসত কই? বন্ধুর এক কম্পানিতে দিন কাটে কাজ করে। অবসর সময়ে একটু-আধটু লেখালেখি।

-ভালোই লেখেন। পত্রিকায় দু’একটা গল্প পড়েছি। ক্রিয়েটিভ কাজে একধরনের আনন্দ না-কি সুখ, কী বলব?

-ক্লাবে গিয়ে আড্ডা, গলা ভেজানোতেও সুখ। তাস পেটানোতে নাকি সবচেয়ে বেশি আনন্দ!

-তাসের নেশা, খুব কড়া নেশা। প্রেমও হার মানে এর কাছে!

-দস্তয়েভস্কির জুয়াড়ি পড়েছেন?

-বহুবছর আগে। কাহিনি এখন আর পুরোপুরি মনে নেই।

বইমেলার হৈ-হট্টগোল, মাইকে প্রচারিত সদ্যপ্রকাশিত বিভিন্ন বইয়ের বিবরণ, ভ্যানরিক্সার ওপর তৈরি-করা ভ্রাম্যমাণ ঝালমুড়ি-চানাচুরের দোকান থেকে কিছুক্ষণ পর পর দোকানির হাঁক: হেঁই চেনাচুর, ঝালমুড়ি। কৌটোয় মুড়ি-মশলা পুরে শিশি থেকে ক’ফোটা তেল মিশিয়ে হতের তালুতে ঠকঠক্ ঠুকে ঝালমুড়ি বানাতে ব্যস্ত দোকানি।

-চলবে নাকি ঝালমুড়ি? জিজ্ঞেস করি আমি।

-আপনি খান। আমার খুব অ্যাসিডিটি; আলসার ধরা পড়েছে মাস দুয়েক হল। শরীরের অবস্থা, এককথায় বলতে গেলে, খুবই নাজুক। দশবছর ধরে ডায়াবেটিস; হার্টটাও নড়বড়ে। যেকোনও সময় শুনবেন অক্কা পেয়েছি!

-সবার বেলাতেই কথাটা খাটে। কথায় আছে না, হায়াত-মৌত-রেজেক-দৌলত আল্লার হাতে।

-ধর্মকর্মে মন দিয়েছেন বুঝি? একসময় তো নাস্তিক-নাস্তিক গন্ধ ছিল আপনার গায়ে।

-তাই? ভালোই বলেছেন। জগতটা চতুর্মাত্রিক; সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা। তো আপনি কী যেন কথা আছে বলতে চেয়েছিলেন। কী কথা?

-খুব সামান্য একটা উপকার চাই আপনার কাছে। জাস্ট একটু সময় দেবেন আমাকে। হাত কচলে ফ্যাঁসফেসে স্বরে বলে খোরশেদ।

-সময়টা কী কাজে?

-শরীরের অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছেন। যাকে বলে মৃত্যুর অতল গহ্বরের ওপর সূক্ষ্ম সুতোয় ঝুলে আছি, যেকোনও সময় টুপ্ করে...

-সেকথা তো শুনলামই। শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে খোরশেদের পুনরুক্তিতে হাসি পায়। অসুস্থতা জাহির করবার মধ্যেও একধরনের সূক্ষ্ম সুখ হয়তো আছে। অন্য এক বন্ধু মোহাম্মদ আলি বাইপাস করার পর এ-কথা ও-কথার শেষে টেনে আনত ওর বাইপাস প্রসঙ্গ। আড়াই লাখ টাকা খরচ করে অত্যাধুনিক হাসপাতালে বাইপাস সার্জারি করার অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিত বেজায় আগ্রহ নিয়ে।

-আমি মারা যাওয়ার পর কোনও মৌলবি-মওলানা যেন আমার শরীর না-ছোঁয়; কোনও দাফন-কাফন যেন না-হয় সে ব্যবস্থা করতেই আপনার সাহায্য চাই!

বিস্মিত আমি অপলক তাকিয়ে থাকি খোরশেদের দিকে। অদ্ভুত আব্দার তো! মরলে শেষকৃত্য কীভাবে করা হবে সে-ব্যাপারে দুনিয়াতে সাতশো কোটি লোক থাকতে আমাকে নিয়ে টানাটানি কেন বাবা! নিজের ধান্দায় এমনিতেই অস্থির। জিনিসপত্রের যা দাম, জীবিত প্রাণীদের প্রয়োজনীয় রসদের জোগান দিতেই প্রাণ ওষ্ঠাগত! মৃতসৎকারের এ আবার কেমনতরো উটকো ঝামেলা! এ-রকম একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হব জানলে আজ দেখা করতেই আসতাম না। আজ কেন, কখনোই না।

একটু গম্ভীর গলায় বললাম: তা মৌলবিদের ওপর এত খাপ্পা কেন? কী করেছে ওরা?

-কী করেনি! মুক্তিযুদ্ধ আপনি করেছেন, আমিও। সে-সময় কী রোল ছিল ওদের, বলেন? কী ফতোয়া দিয়েছিল?

-হ্যাঁ, তা না হয় বুঝলাম। বেশির-ভাগ মওলানাই যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু সে তো পঁয়তাল্লিশ বছর আগেকার কথা। সেই সময়কার মৌলবিদের বেশির-ভাগই এখন মরে ভূত। এখন যারা আছে, তাদের অনেকের তখন বিরোধিতা করার বয়স হয়নি। অনেকে তো তখন পয়দাই হয়নি।

-মানুষগুলোর শারীরিক অস্তিত্বে আপনি বেশি জোর দিচ্ছেন। আদর্শের দিকটা এড়িয়ে যাচ্ছেন। আদর্শ কি মরে গেছে? নাকি আরও তাজা হয়েছে গোড়ায় পানি পেয়ে?

-এর জন্য তো নীতিহীন রাজনীতিই দায়ী। ওদের অযথাই দোষ দিচ্ছেন। স্বাধীনতার চার বছর পার না-হতেই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের উত্থান -- রাজাকারদের পুনর্বাসন। তারপরের ইতিহাস, পরাজিত শত্রুদের তোষণের ইতিহাস। এমনকি যারা মুখে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবি করে, তারাও অভিসার চালায় একাত্তরের ঘাতকদের সঙ্গে; লক্ষ্য একটাই, ক্ষমতা দখল করা, ক্ষমতায় টিকে থাকা। পঁচাত্তরের খুনীদের রাজনীতি করার লাইসেন্স দিল যে বদমাশ ডিক্টেটর; তাকে নিয়ে মোর্চা গঠন! দোষটা শুধু ওদের না দিয়ে যারা প্রশ্রয়দাতা তাদেরকেও ভাগ করে দিন। মাফ করবেন, লম্বা লেকচার দিয়ে ফেললাম।

খোরশেদের মুখে কথা নেই। উনিশশো নব্বুই সালের শেষার্ধে ও চাকরিক্ষেত্রে বেশ আরামেই ছিল। আরামের বিপরীতে দুর্ভোগ! রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এমনটিই হয়!

-আমার লাশটা কোনও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দান করতে চাই। কথা ফোটে খোরশেদের মুখে।

-তাতে এমন কী যাবে আসবে?

-চিকিৎসাশাস্ত্রের উপকার হবে। মৃত্যুর পর এই উপকারটুকু করতে পারলেই-বা মন্দ কী?

-এটা একধরনের রোমান্টিসিজম। পৃথিবীর খুব বিখ্যাত কেউ এ-কাজটি করেছেন বলে মনে পড়ে না। পৈত্রিতসূত্রে ইহুদি আইনস্টাইন ধর্মরীতি ভঙ্গ করে নিজ দেহ দাহ করতে বলেছিলেন। তাঁকে পোড়ানো হয়েছিল। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নাস্তিক কার্ল মার্কস সমাহিত লন্ডনে!

-যথেষ্ট বলেছেন। আমি সাধারণ মানুষ। শুধু এটুকু বুঝি, আমার দেহ মাটির গর্তে পচার চেয়ে মেডিক্যালের ছাত্রদের কাজে লাগলে সেটা ঢের ভালো।

-আজকাল যে-হারে সড়ক-দুর্ঘটনা, লঞ্চডুবি, খুনখারাবি হচ্ছে তাতে ডেডবডি পাওয়া মোটেও কঠিন নয় -- মর্গে বেওয়ারিশ লাশের ঢিপ।

-বেওয়ারিশ লাশ আর আমার ডেডবডিকে এক কাতারে ফেললেন? আপনার কাছ থেকে এটা আমি আশা করিনি। একসময়কার প্রগতিশীল ছাত্রনেতা হয়ে আপনার এ কী-ধরনের কথাবার্তা!

-লাশের মধ্যে পার্থক্য খোঁজার কোনও কারণ তো দেখি না। হ্যাঁ, বেওয়ারিশ লাশগুলোর শ্রেণিচরিত্র নিয়ে কথা উঠতে পারে। ওদের বেশির-ভাগই দরিদ্র -- মেহনতি শ্রেণির। সে-ক্ষেত্রে আপনি উঁচু শ্রেণির এই যা...।

-আমি ডি-ক্লাস্ড, মানে শ্রেণিচ্যুত হয়ে শ্রমিক-আন্দোলনের সঙ্গ্যে জড়াতে চেয়েছিলাম ভার্সিটি থেকে বের হয়েই; পার্টি নেতাদের সঙ্গে মতের বনিবনা না-হওয়াতে সে-চিন্তা ছেড়ে চাকরিতে জয়েন করি।

-ডি-ক্লাস্ড না-হয়ে ফার্স্ট ক্লাস অফিসার হলেন! 

-তাতে কী? চাকরি করলেও আমার কর্মপরিসরে মার্কসবাদ, কমিউনিস্ট মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টাতে কসুর করিনি।

-বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ অর্থহীন। সংগঠন লাগে। তার চেয়েও বড় কথা বিপ্লবের মূল শক্তি মেহনতি জনগণের নিত্যদিনের লড়াইয়ের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত না-করে বুদ্ধিজীবী কমিউনিস্ট হওয়া যায় মাত্র। ফলাফল লবডঙ্কা...। মাইন্ড করলেন? এসব কথা থাক। সিরিয়াস আলাপ করে বহুদিনের পুরনো আবেগকে ফিকে করে দিচ্ছি কিন্তু আমরা। তাছাড়া রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। রাজনীতিতে অরুচি ধরে গেছে।

খুক্ খুক্ করে শুকনো কাশি কাশল খোরশেদ। কিছুক্ষণের নীরবতা।

-আচ্ছা জীবনের অর্থ কি বলতে পারেন? আপনি তো লেখালেখি করেন। প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করে খোরশেদ।

-প্রশ্নটা সহজ নয়। কিন্তু জীবনের অর্থ খুঁজে খুঁজে যাঁরা ক্লান্ত, এমনকি জীবনকে যাঁরা অর্থহীন -- মিনিঙলেস মনে করেন তাঁরাও দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকেন। সাদামাটাভাবে বুঝি, বেঁচে থাকাটাই জীবনের অর্থ। আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে সুখই জীবনের অর্থ; অথবা সুখের প্রতীক্ষা।

-সুখের চেয়ে জীবনে যন্ত্রণা কি বেশি নয়?

-ব্যাপারটা আপেক্ষিক। আমার পরিচিত প্রায় নব্বুই বছরের এক বুড়ি আছেন; শরীরের চামড়া তাঁর বুড়ো কতবেল গাছের বাকলের মত; এতটাই কুঁজো যে সামান্য আরেকটু হলে দেহ তাঁর বৃত্তাকার হত; হাড়জিরজিরে সেই বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম: কেমন আছেন বুবু? কী জবাব দিয়েছিলেন জানেন? -আল্লায় ভালোই রাখছে, দাদাভাই!

লম্বা একটা হাই তুলল খোরশেদ। আবারও খুক্ খুক্ কেশে বলল: অনেক প্যাচাল হল। আসল কথায় আসি। যত যা-ই বলেন, আমার দেহটা আমি দান করবই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এফিডেভিট নিয়ে। এফিডেভিট করতে হলে দু’জন সাক্ষী লাগে। সাক্ষী জোটাতে পারছি না। আপনি আর ভাবি আমার এই উপকারটুকু করলে কীযে...

-খুশি হবেন, তাই তো? কিন্তু সাক্ষী জুটছে না কেন? আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব কাউকে রাজি করানো যায় না?

-ওরা আমার সিদ্ধান্ত বিরোধী। বিশেষ করে আত্মীয়স্বজনরা। ওদের এক কথা, এ-রকম কিছু যদি আমি করি তাহলে সমাজের কাছে ওরা হেয় হবে। মুরতাদের আত্মীয় হিসাবে লোকে ওদের বাঁকা চোখে দেখবে।

-ওদের মানসম্মানের খাতিরে আপনার এই সিদ্ধান্তটা পাল্টানোই বরং বেশি যৌক্তিক। মরে তো আপনি খালাস। মরণোত্তর ঝামেলাটা কেন সামলাতে হবে নিরীহ লোকগুলোকে?

-তাতে আমার কী যায় আসে? ওরা যদি আমার ইচ্ছাকে গুরুত্ব না দেয়, আমার কী ঠেকা পড়েছে ওদের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামানোর? তাছাড়া আমার আত্মীয়স্বজনদের অধিকাংশই সেকেলে, কনজারভেটিভ। অন্ধকারের জীব। অসহ্য!

-আলো অন্ধকার, একেলে সেকেলে এগুলো ফালতু কথা। সারাজীবন ধর্মের অসারতা নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বইগুলো লিখলেন যে লেখক, জঙ্গিদের চাপাতির কোপে কিছুদিন বেঁচে থেকে মারা যাবার পর তাঁর আলোকিত আত্মীয়রা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে তাঁর দাফনের দাবি তোলেননি? দুই বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবির শেষ ইচ্ছাও ছিল আপনার মতই, কিন্তু তাঁকেও গোর দেয়া হয়! ওই একই অজুহাত, বেঁচে-থাকা ঘনিষ্ঠজনদের বিব্রত হবার আশঙ্কা। 

-ওদের ভাইবেরাদর, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ছিল। আমি নিঃসঙ্গ। ওই সমস্যা আমার নেই। নিকটজনেরা মুখে যাই বলুক, সাক্ষী হতে চায় না মনে হয় একমাত্র ধর্মীয় সংস্কারের কারণে। কাজটা করলে নিজেরা গুনাগার হবে এই ভয়ে। বলুন তো ধর্ম জিনিসটা কী? মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করা, সমাজপ্রগতি ঠেকানো আর মানুষকে অলীক পারলৌকিক স্বপ্ন দেখানো ছাড়া আর কোনও কাজ আছে এর? শোষকদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হল গে’ ধর্ম। তা যে ধর্মই হোক। খ্রিস্টধর্মের চার্চগুলো বিজ্ঞান, মুক্তবুদ্ধি আর সমাজবিপ্লবের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি? ধর্ম মানুষের জন্য কল্যাণকর, এ-ধরনের যুক্তি হাস্যকর ছাড়া আর কি? রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে যুদ্ধবিগ্রহের চেয়ে বহুগুণ বেশি মানুষ প্রাণ খুইয়েছে সাম্প্রদায়িক রায়টে; এখনও খোয়াচ্ছে। ঘেন্না করি সেইসব ধর্মজীবী মানুষকে যারা শোষণের, হিংস্রতার পক্ষে ওকালতি করে, বিজ্ঞান আর প্রগতির বিরুদ্ধেৃ দাঁড়ায় -- মোল্লা-মৌলবি, পাদরি-পুরোহিত-রাব্বি, এটসেটরা! আমি চাই না মৃত্যুর পর ওরা আমার দেহ স্পর্শ করুক -- দোআ-কালাম পড়ুক। বলতে পারেন, চিরাচরিত রীতির বিরুদ্ধে সাইলেন্ট প্রটেস্ট। বোঝাতে পারলাম? দীর্ঘ বক্তব্যের শেষদিকটায় কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল খোরশেদের।

-এ-ধরনের কাজ আগেও হয়েছে। খুব একটা লাভ হয়েছে বলে মনে হয় না। এসব সাইলেন্ট প্রটেস্ট লোকজনকে নাড়া দেয় না। তাছাড়া আপনি কি সিওর যে যাদের কথা বললেন ও-রকম লোকের সংস্পর্শে আসেননি কখনও? আপনার দেহে ওদের স্পর্শ লাগেনি? মুচকি হেসে জানতে চাই।

-নিজের অজান্তে -- কখনও-বা বাধ্য হয়ে এসেছি। স্বেচ্ছায় আসিনি। চাকরি করলে কিছু কাজ ইচ্ছার বিরুদ্ধেও করতে হয়।

-কী করে নিশ্চিত হলেন, মরদেহ দান করলে ওই জাতীয় লোক আপনাকে স্পর্শ করবে না?

-মেডিক্যালের ছাত্র ও ডাক্তাররা আমার দেহ নাড়াচাড়া করবে, কাটাছেড়া করবে। ওই জাতীয় লোক আসবে কোত্থেকে?

-আপনার তো জানার কথা, মেডিক্যালের অনেক ছাত্রই ধর্মান্ধ। মোল্লা-মৌলবি না-হলেও অনেকেই আবার একাত্তরের ঘাতকদের আদর্শের অনুসারী, তাদের ছাত্রসংগঠনের সদস্য!

-কী বলছেন! বিশ্বাস হচ্ছে না।

-আপনি দেখছি জগত-সংসার থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন, কোনও খোঁজ-খবরই রাখেন না!

আমাদের আলাপ আর বেশিদূর এগোয়নি। খুবই চিন্তাগ্রস্ত ও বিষণ্ন দেখাচ্ছিল খোরশেদকে। অস্পষ্ট আলোতেও প্রকট দেখাচ্ছিল ওর মুখের ভাঁজগুলো।

দেখতে দেখতেই কেটে গেল অনেকগুলো দিন। খোরশেদের আর কোনও খোঁজখবর নেই। ভুলেই গিয়েছিলাম ওর কথা। ক’দিন আগে প্রাতরাশ সেরে পরম আয়েশে পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছিলাম একাগ্রমনে। ভেতরের পাতায় ছোট্ট এক সংবাদে চোখ আটকে গেল। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক যুগ্মসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ খোরশেদুল ইসলাম হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গতকাল দিবাগত রাত ১টা ৩০মিনিটে বারডেম হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহে...রাজেউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। মরহুম অকৃতদার ছিলেন। তিনি বহু শোকবিহ্বল আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব রেখে গেছেন। আজ ১৯ এপ্রিল বাদ জোহর এই বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় উত্তরা গোরস্থানে দাফন করা হবে।

২টি মন্তব্য:

  1. গল্পের যতিচিহ্ন ---(ড্যাশ)-এর স্থলে ¾ হয়ে গেছে। দক্ষ পাঠক বুঝবেন, আশা করি।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. যতিচিহ্নের বিভ্রাটটা ঠিক করে দেওয়ায় হোঁচট খাওয়া থেকে পাঠক বাঁচবেন!
      সম্পাদককে ধন্যবাদ।

      মুছুন