শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

প্যারিস রিভিউকে দেয়া হুলিও কোর্তাসারের সাক্ষাৎকার

সাক্ষাতকারী : জেসন ওয়েস
অনুবাদক : এমদাদ রহমান 

ক্যান্সারাক্রান্ত হুলিও কোর্তাসার মারা যান ঊনসত্তর বছর বয়সে, ১৯৮৪'র ফেব্রুয়ারিতে; মাদ্রিদের এল পাইস পত্রিকা তাঁকে লাতিন আমেরিকার মহত্তম লেখকদের একজন হিসেবে সম্মান জানায়, মৃত্যুর পর দুই দিনেরও বেশি এগার পাতার বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে, সেখানে প্রকাশিত হয় স্মৃতিচারণ, শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এবং বিদায়ী বার্তা। 

যদিও কোর্তাসার ১৯৫১ থেকেই প্যারিসে বসবাস করে আসছেন, সামরিক জান্তা কর্তৃক ১৯৭০-এ চূড়ান্ত নির্বাসনের আগ পর্যন্ত নিয়মিতই তিনি তাঁর নিজের দেশ আর্জেন্টিনায় যাতায়াত করেছেন, এই জান্তা তাঁর গল্পে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে। যদি জান্তার পতনের পর আলফানসির গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে শেষবারের মতো নিজের দেশে যাবার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। আলফনসির সংস্কৃতিমন্ত্রী তাঁকে কোনওরকম রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা জানানোর ব্যবস্থা করেননি, কারণ- কোর্তাসারের অতিমাত্রায় বামঘেঁষা রাজনৈতিক দর্শন আর লাতিন আমেরিকার মানুষের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি ছিলেন এক অগ্রণী যোদ্ধা। কিন্তু আর্জেন্টিনা তাঁর লেখককে সত্যিকার নায়কের মর্যাদায় গ্রহণ করেছিল। ফিরে আসার পর বুয়েনস আইরেসে, এক রাতে, ওসভালাদো সোরিয়ানোসার উপন্যাস 'সেখানে আর কোনও বেদনা ও বিস্মৃতি নেই' অবলম্বনে তৈরি ছবি দেখে হলের বাইরে আসতেই কোর্তাসার আর তাঁর বন্ধুরা দেখলেন এক বিশাল মিছিল আসছে, বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের মিছিল, কিছুক্ষণের মধ্যেই মিছিলের মুখগুলি সামনে তাদের লেখককে দেখতে পাবার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভ কর্মসূচির রঙ মুহূর্তে বদলে ফেলল তারা, সবকিছুর কেন্দ্রে তখন- কোর্তাসার, প্রিয় লেখক; প্রিয় লেখককে কাছে পেয়ে তারা উল্লসিত, কাছেপিঠের বই-দোকানগুলির কয়েকটি তখনও খোলা, ছাত্ররা হুড়মুড় করে ছুটতে লাগল দোকানগুলির দিকে, অটোগ্রাফ নেবার জন্য তারা নিয়ে আসতে লাগল কোর্তাসারের বইগুলি। নানারকমের মনোহারি জিনিসের সঙ্গে কিছু বইও বিক্রি করেন এমন এক দোকানী দুঃখ প্রকাশ করলেন তার কাছে কোর্তাসারের বইয়ের আর একটিও কপি নেই বলে, তবু তিনিও অটোগ্রাফ নিলেন; ফুয়েন্তেসের উপন্যাসে স্বাক্ষর করলেন হুলিও কোর্তাসার।

তাঁর জন্ম ব্রাসেলসে, ১৯১৪-য়। যুদ্ধের পর তাদের পরিবারটি যখন আর্জেন্টিনায় ফিরে এল, তখন থেকেই বানফিল্ড শহরে তিনি বড় হতে শুরু করলেন, বুয়েনস আইরেস থেকে খুব দূরে ছিল না জায়গাটি। বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তিনি একটি ডিগ্রি গ্রহণ করেন, রাজধানীর কাছের অন্য এক শহরে কাজ করেন ১৯৪০ পর্যন্ত, আর যেন শুধু নিজের জন্যই করতে থাকেন লেখালেখি। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প 'অধিগৃহীত বাড়ি' ছিল এমন একটি লেখা যা তাঁর কাছে স্বপ্নে এসেছিল, প্রকাশিত হয়েছিল '৪৬-এ, একটি সাময়িকপত্রে, সম্পাদক- হোর্হে লুইস বোর্হেস। '৫১-য় কোর্তাসারের প্যারিসে চলে আসার আগ পর্যন্ত আর তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু প্রকাশিত না হলেও লেখাটা কিন্তু চলছিল, নিজের জন্য, পরে যে উপন্যাসটি সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তা লিখিত হতে শুরু করেছিল তাঁর মনে। প্যারিসে তিনি ইউনেস্কোসহ আরও কয়েকটি সংস্থায় অনুবাদক এবং দোভাষী হিসেবে কাজ করেন। তিনি এমন এক লেখক যিনি এডগার অ্যালান পো, ড্যানিয়েল ডিফো আর মার্গারিৎ ইওসেনার-কে অনুবাদ করেছেন, ১৯৬৩ সালে তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস 'এক্কাদোক্কা খেলা' প্রকাশিত হয়, প্যারিস ও বুয়েনস আইরেসের রাতের জীবনের জঙ্গমতাকে কেন্দ্র করে এক আর্জেন্টাইন অস্তিত্ববাদী ও অধিবিদ্যকের কিছু অনুসন্ধান- এরকম বিষয় নিয়েই উপন্যাসটি গড়ে ওঠে, আর কোর্তাসারের নামটিও তখন সত্যিকার প্রতিষ্ঠা পায়। 

যদিও তিনি আধুনিক ছোটগল্পের এক দক্ষ কারিগরের পরিচিতি পেয়েছেন, লাতিন উপন্যাসেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। চারটি উপন্যাসেই ফর্মের অভিনবত্বের সঙ্গে সমাজে মানুষ সম্পর্কে মৌলিক জিজ্ঞাসাটির বিস্তার ঘটিয়েছেন। ১৯৬০-এ প্রকাশিত 'বিজয়ীরা' ও '৬৮-তে প্রকাশিত '৬২, মডেল কিট' উপন্যাস লিখতে গিয়ে দোভাষী হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন। ১৯৭৩-এ প্রকাশিত হয় 'ম্যানুয়াল পুস্তিকা', উপন্যাসের আখ্যান গড়ে উঠেছে লাতিন আমেরিকার এক কূটনীতিজ্ঞের অপহরণের ঘটনা নিয়ে। কিন্তু তাঁর গল্পগুলি হচ্ছে এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম, যেখানে কোর্তাসারবর্ণিত ফ্যান্টাস্টিক বা অদ্ভুত কল্পনার প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ টের পাওয়া যায়। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটি নিয়েই, একই নামে ১৯৬০-এ তৈরি হয় প্রখ্যাত নির্মাতা মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি'র ছবি 'ব্লো-আপ'। তাঁর অন্যান্য বইগুলি হচ্ছে- সমস্ত আগুনই আগুন, শেষ পরীক্ষা, জীবজন্তুদের দুনিয়া, কিস্তিমাত, গোপন অস্ত্রগুলি, সেইসব নেক্রাপিওদের কথা এবং খ্যাতিসমূহ, বিস্ফোরণ ও অন্যান্য গল্প। ইংরেজি ভাষান্তরে, পাঁচখণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গল্পগুলি। মৃত্যুর আগে প্রকাশিত হয় প্যারিস থেকে মারসিলিস যাত্রাপথের অভিজ্ঞতার জার্নাল, ফ্রেন্স ও হিস্পানি ভাষায়; নিকারাগুয়ার সানদিনিস্তা সরকারকে তিনি তাঁর সবগুলি বইয়ের রয়্যালিটি পাবার অধিকারী করে দিয়ে যান, মৃত্যুর আগে। গল্প, উপন্যাস ছাড়াও লাতিন আমেরিকার বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও নিকারাগুয়ার আন্দোলন-সংগ্রামকে নিয়ে তাঁর নন-ফিকশন প্রকাশিত হয়েছে, রাজনৈতিক রচনা হিসেবে। 

নির্বাসনকালীন সময়ে তিনি প্যারিসের বিভিন্ন জায়গায় থেকেছেন। বিগত দশকে তাঁর বইয়ের রয়্যালিটি থেকে প্রাপ্ত অর্থে নিজের জন্য একটি এপার্টমেন্ট কিনতে সমর্থ হয়েছেন; সেই এপার্টমেন্ট এমন এক ভবনের ওপরে, যে ভবনটির অবস্থান চিনামাটির বাসনকোসনের দোকান আর পাইকারি বিক্রেতাদের কোলাহলে মুখর প্যারিসের এক জেলা শহর। এপার্টমেন্টটি এমন, তাঁর কোনও একটি গল্পের জন্য এরকম একটি পরিবেশই যেন কাঙ্ক্ষিত ছিল- প্রশস্ত; যদিও ছড়িয়ে থাকা অজস্র বইয়ের কোলাহল, আর দেয়ালগুলিতে তাঁর বন্ধুরা ছবিও এঁকে দিয়েছেন।

কোর্তাসার দীর্ঘদেহী পুরুষ, উচ্চতায় ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি, তাঁর প্রকাশিত ছবিগুলিতে যেরকম দেখা যায় তারচেয়ে অনেক হালকা পাতলা। এই আলাপচারিতার ঠিক আগের মাসটি তাঁর কাছে অত্যন্ত কঠিন হয়েই এসেছিল, তাঁর শেষ পত্নি, ক্যারল, বয়সে তাঁর থেকে ত্রিশ বছরের ছোট, তখন মাত্রই ক্যান্সারের মারা গেছেন। আরও যা, তা হলো তাঁর ব্যাপকমাত্রার ভ্রমণ, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায় যাওয়া-আসা; তাঁকে অবশ্যই ক্লান্ত করে থাকবে। অবশেষে কেবল এক সপ্তার জন্য তিনি তাঁর ঘরে থাকতে পেরেছিলেন, অবশেষে বসতে পেরেছিলেন প্রিয় চেয়ারটিতে, ধূমপান করছিলেন আর যেমনটা আমরা পরস্পর কথা বলছিলাম... 

সাক্ষাৎকারী
আপনার সর্বশেষ প্রকাশিত 'যন্ত্রণাদগ্ধ সময়ের আখ্যান' বইটির কয়েকটি গল্পে আগের চেয়েও বেশি মাত্রায় বাস্তব জগতের ভেতর উদ্ভট ও অবাস্তব কল্পনার এক অস্বাভাবিক মিশ্রণ ঘটেছে। আপনার কি এখন এই সময়ে এসে এটা অনুধাবন হচ্ছে যে, উদ্ভট কল্পনার জগত আর চারপাশের বাস্তবতাটা একাকার হয়ে যাচ্ছে? 

কোর্তাসার
হ্যাঁ, শেষের দিকের গল্পগুলি লেখার সময় আমার এই অনুভবটি হয়েছে যে, আমরা যাকে বলি কল্পনার অদ্ভুত জগত আর যাকে বলি নিরেট বাস্তব--এই দুইয়ের মধ্যকার দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। আমার আগের গল্পগুলোয় কিন্তু কল্পনা ও বাস্তবের ব্যবধান অনেক বেশি ছিল, কারণ- কল্পনা সত্যিকার অর্থে কল্পনাই ছিল, মাঝে মাঝে এই কল্পনা অতিপ্রাকৃতকেও স্পর্শ করে ফেলত। হ্যাঁ, অবশ্যই সেই কল্পনা রূপান্তরিত হয়, বদলে গিয়ে অন্য কিছু হয়ে যায়। কল্পনার জগতের ধারণা যা আমরা ইংল্যান্ডের গথিক উপন্যাসগুলোয় ইতিহাসের উন্মোচন হিসেবে দেখি, উদাহরণস্বরূপ বলছি, সেই বিশেষ বৈশিষ্টসূচক কল্পনার জগতটি আমাদের আজকের ধারণা'র কাছে কোনও আবেদনই তৈরি করতে পারে না। আমরা এখন যখন হোরেস ওলপোলের 'ওট্রানটো'র দুর্গ' উপন্যাসখানি পড়ব তখন আমাদের হাসি'ই পাবে-- সবগুলো ভূত শাদা পোশাক পরিধান করেছে। কঙ্কালগুলো-- যারা চারপাশে ঘোরাঘুরি করছে আর তাদের শেকলগুলো নাড়িয়ে ভীতিকর শব্দ উৎপাদন করছে। আজকের দিনে, আমার কল্পনার ধারণা যাকে আমরা বাস্তব বলি, সেই বাস্তবের ধারণার অনেক কাছাকাছি, তার কারণ সম্ভবত এটাই যে- এই কঠিন বাস্তবতা এখন অদ্ভুত কল্পনার ভেতর দিয়েই নিজেকে বারবার দেখাচ্ছে, মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে। 


সাক্ষাৎকারী
সাম্প্রতিক বছরগুলির বেশিরভাগ সময়ই আপনার কেটেছে লাতিন আমেরিকার মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে কাজ করে। এই সম্পৃক্ততা কি আন্দোলনের ঘটনাবলির সঙ্গে সরাসরি মানে একেবারে রক্তেমাংসে জড়িত হয়ে এর সত্যিকার রূপটাকে দেখার পক্ষে সহায়ক হচ্ছে না? মুক্তির ঘটনাবলি কি আপনাকে আরও বেশি জড়িয়ে পড়তে উস্কে দিচ্ছে না? 

কোর্তাসার
দেখুন, 'সিরিয়াস' আইডিয়াটিকেই আমি পছন্দ করি না, তার কারণ হল আমি কখনওই ভাবি না যে আমি সিরিয়াস, অন্ততপক্ষে ওই অর্থে তো অবশ্যই নয় যে-অর্থে লোকে, অন্যকে খুব সিরিয়াস বলে ধরে নেয় বা বিবেচনা করে। কিন্তু গত কয়েকটি বছর ধরে-- আর্জেন্টিনা, চিলি, উরুগুয়ে এবং এখন, অবশ্যই সব কিছু ছাপিয়ে নিকারাগুয়া, লাতিন আমেরিকার এই দেশগুলির ক্ষমতা কাঠামোয় যারা আছে বা ছিল, আমার সমস্ত প্রচেষ্টা ছিল সেইসব বিষয়গুলিকে আত্মস্থ করে গল্পের কাঠামোয় একটা কল্পজগতের বিস্তার, আর সেটা হবে এমন এক উপায়ে যা বাস্তবতার কাছাকাছি হবে, আমার মতামত সেভাবেই প্রকাশ পাবে। আর সেটা করতে গিয়ে আমি অনুভব করলাম যে আগের চেয়ে আমার স্বাধীনতা যেন অনেকটাই কমে গেছে। সেই আগের অবস্থাটা, সেই যে ত্রিশ বছর আগে আমি নানাধরনের লেখা লিখতাম যা কিছু মাথায় আসত, আর লেখার সেই বিষয়গুলিকে আমি বিবেচনা করতাম নান্দনিকতার মাপকাঠি দিয়ে। আর এত বছর পরও আমি সেই নান্দনিকতার মাপকাঠি দিয়েই লেখার বিষয়কে বিবেচনা করছি, তার কারণ সব কিছুর ঊর্ধ্বে আমি একজন লেখক-- আর এই সময়ে আমি এমন একজন লেখক যে নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করছে আর লাতিন আমেরিকার সমস্যা নিয়ে নিরন্তর জর্জরিত, সমস্ত মনোযোগ আচ্ছন্ন হয়ে আছে এর ওপর; খুব স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত লেখাপত্রেই খুব সচেতনে কিংবা অবচেতনে লাতিন আমেরিকা চলে আসে। তবুও যে কথাটি আমি খুব জোর দিয়ে বলব তা হলো, আমার গল্পগুলিতে সূক্ষ্ম আদর্শগত এবং রাজনৈতিক অনুষঙ্গের ঠাসবুনট থাকলেও তার গুণ, তার মৌলিক স্বভাবে কোনও পরিবর্তন আসেনি। গল্পগুলি এখনও অদ্ভুত কল্পনায় পূর্ণ ও বাঁধনহারা। 

প্রতিশ্রুতিশীল (যা আজকাল তাদেরকে বলা হয়ে থাকে) লেখকের পক্ষে, সবচেয়ে কঠিন কাজটিই হলো তাকে যেভাবেই হোক সব সময়ের লেখক হতে হবে। রাজনৈতিক বিষয়বস্তু নিয়ে সে যদি একটা লেখা লেখে তাহলে সেটা যে সাহিত্য হবে না তা কিন্তু নয়, তবে লেখাটি খুব সাধারণ, মাঝারি মানের লেখা হতে পারে। বেশ কয়েকজন লেখকের বেলায় এই ব্যাপারটাই ঘটছে। তার মানে, সমস্যাটি হচ্ছে ভারসাম্যের, মিলিয়ে দেবার। আমার কথা হলো আমি যা লিখব তাকে কিন্তু সবসময়েই সাহিত্য হতে হবে, না হলে তা আবর্জনা, আমি আমার সক্ষমতার একেবারে চূড়ান্তে গিয়ে… সমস্ত সম্ভাবনাগুলিকেও জাগিয়ে দিয়ে লিখে দেখা যে কী হলো। কিন্তু ঠিক একই সঙ্গে, লেখায় সমকালের বাস্তবতাকেও মিশিয়ে দেবার চেষ্টা থাকতে হবে। আর এটাই লেখকের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ-- মিলিয়ে দেবার বা ভারসাম্য রক্ষার কাজ। আমার 'যন্ত্রণাদগ্ধ সময়ের আখ্যান' বইয়ের এই নামের গল্পটির ইঁদুরগুলি সম্পর্কে, 'আপনি কি কখনও বিস্মিত হয়েছেন' নামে একটি অন্তর্গত উপাখ্যান আছে; আর্জেন্টিনার গেরিলাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পটভূমির ওপর ভিত্তি করেই সেটা লিখিত হয়েছিল-- ঝুঁকিটা নিতে হয়েছিল শুধুমাত্র রাজনৈতিক ঘটনাবলিকে তীক্ষ্ণ শরে বিদ্ধ করার অভিপ্রায়ে। 


সাক্ষাৎকারী
এই গল্পগুলির ব্যাপারে ঠিক কীরকম প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলেন? লেখক ও পাঠদের কাছ থেকে আসা প্রতিক্রিয়া আর পরবর্তীতে রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রতিক্রিয়ায় কি খুব বেশি ভিন্নতা ছিল? 

কোর্তাসার
হ্যাঁ, অবশ্যই ভিন্ন রকমের অভিজ্ঞতাই হয়েছে। লাতিন আমেরিকার বুর্জোয়া পাঠক সমাজ যারা রাজনীতি সম্পর্কে নিঃস্পৃহ কিংবা সেইসব ব্যক্তিবর্গ যারা একাট্টা হয়েছে ডানপন্থীদের সঙ্গে, হ্যাঁ, এই তারাই কিন্তু রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন নয় যা আমাকে হতাশাগ্রস্ত করে, এখানকার সমস্যাগুলি, যেমন-- নিজস্ব স্বার্থ উদ্ধারে চরমপন্থা, বৈষম্য, নিপীড়ন, এবং আনুষঙ্গিক আরও কিছু যা খুব স্বাভাবিকভাবেই বাজে অবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। তো, এই মানুষগুলোই অনুতাপের সঙ্গে বলে যে আমার গল্প প্রায়ই রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, রাজনৈতিক বক্তব্যে পরিণত হয়। কিন্তু আমার অন্যান্য পাঠক, বিশেষ করে সেইসব তরুণ পাঠক-- যারা আমার দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলে, ভাবনাগুলিকে নানাদিকে ছড়িয়ে দেয়, আমার লড়াইটাকে, লড়াইয়ের প্রয়োজনটাকে বোঝার চেষ্টা করে এবং তারা সাহিত্য ভালবাসে-- তারা কিন্তু এই গল্পগুলিকে পছন্দ করেছে। কিউবার পাঠকরা আমার 'সমাবেশ' গল্পটিকে পড়েছে তাদের আত্মা দিয়ে এবং পছন্দ করেছে। 'সলেন্তিনেমে দিব্যজ্ঞান' হচ্ছে এমন একটি গল্প যাকে খুব আগ্রহ নিয়ে নিরাকাগুয়ায় পঠিত হয়েছে, এবং বারে বারে পড়া হয়েছে গভীর আনন্দের সঙ্গে। 


সাক্ষাৎকারী
রাজনীতির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়তে কে শক্তি যোগাল? জড়িয়ে পড়তে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলেন জড়াতে কীভাবে?

কোর্তাসার
কারা শক্তি যোগাল? তারা হলো-- লাতিন আমেরিকার মিলিটারিরা। একমাত্র তারাই ছিল আমাকে রাজনীতির সঙ্গে কঠোরভাবে সক্রিয় থাকার পেছনে একমাত্র দায়ী। যদি মিলিটারি না থাকত, যদি বিরাট একটি পরিবর্তন আসত, তাহলে আমি একটু বিশ্রাম নিতাম আর কবিতা ও গল্পের জন্য কাজ করতাম, অর্থাৎ আমার সমস্ত কিছু হতো সাহিত্যিক কাজ। কিন্তু মিলিটারিরাই হলো আসল কারণ যারা আমাকে দিয়ে সক্রিয় রাজনীতি করাচ্ছে। 


সাক্ষাৎকারী
সাহিত্য আপনার কাছে খেলার মত একটা ব্যাপার- এই কথাটা আপনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। ঠিক কোন দিকটিকে বিবেচনায় নিয়ে সাহিত্যকে আপনি খেলা হিসেবে ধরে নেন? 

কোর্তাসার
আমার কাছে, সাহিত্য হচ্ছে খেলার একটি রীতি বা ধরণ (ফর্ম)। তবে এই খেলা প্রসঙ্গে বলার সময় আমি আরও কিছু কথা যোগ করি সব সময় আর তা হচ্ছে, আপনি দেখুন, এখানে খেলার ফর্ম আছে কিন্তু দুইটি, যেমন, উদাহরণ দিয়ে বলতে হলে, ধরুন ফুটবল, যা মূলতই একটা খেলা, দ্বিতীয়ত, এটা এমন এক খেলা যার আছে ব্যাপক বিস্তৃতি আর গুরুত্ব। আবার, বাচ্চারা যখন খেলা করে, যদিও তারা শুধুমাত্র নিজেদের আনন্দেই খেলতে নেমেছে, তো, তারা কিন্তু খেলাটাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গেই নিচ্ছে। এই নেয়াটাই খেলার তাৎপর্য। এই খেলাটা তাদের কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে আগামী দশ বছর পর্যন্ত গভীর ভালবাসায় তারা এই খেলাটা খেলতে থাকবে। আমি খুব ভাল করেই মনে করতে পারি-- ছেলেবেলায় মা-বাবা, যারা সব সময়ই বলতেন- অনেক হয়েছে, অনেক খেলা খেলেছ, এখন গোসল করতে এসো। এই ব্যাপারটাকে সব সময়ই নির্বোধের আচরণ বলে মনে হয়েছে, কারণ,- খেলায় মত্ত আমার কাছে তখন গোসল করাটা জঘন্য ব্যাপার। যখন বন্ধুদের সঙ্গে খেলায় মশগুল, খেলাটা যখন চরম উত্তেজনার পর্যায়ে পৌঁছেছে, গোসল করাটা তখন কিন্তু খুবই ফালতু বিষয়। সাহিত্য অনেকটাই এমন প্রকৃতির। একটা উত্তেজনাকর খেলা। কিন্তু সাহিত্য এমন এক খেলা যেখানে কেউ একজন হয়ত তার নিজের পুরো জীবনটাকেই বিলিয়ে দেয়। কেউ একজন এই খেলার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে পারে। 


সাক্ষাৎকারী
অলীক কল্পনার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলেন ঠিক কখন? ছেলেবেলা থেকেই? 

কোর্তাসার
হ্যাঁ, কল্পনার শুরুটা কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই হয়েছিল। সহপাঠীদের অনেকেরই অদ্ভুত ও বিচিত্র কল্পনা সম্পর্কে ধারনা ছিল না। তারা তাদের চারপাশের সমস্ত কিছুকেই স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করত যেন সবকিছুই খুব মামুলি ব্যাপার, এতে আর আশ্চর্য হবার কী আছে... এই হলো একটি চারাগাছ, ওই যে একটি আর্মচেয়ার। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে, বস্তুজগতের কোনওকিছুই ভাল করে নির্ধারণ করা ছিল না। মা, যিনি এখনও বেঁচে আছেন, যিনি এক আশ্চর্য কল্পনাশক্তিধর নারী, আমাকে উস্কে দিতেন, উৎসাহ দিতেন। না, না, এটা নয়, এটা ঠিক নয়, তোমাকে আরও মনযোগী হতে হবে-- এইসব কথার পরিবর্তে কেবল আমার কল্পনাশক্তিকে বাড়তে দিতেন তিনি নানাভাবে। আমি যে তার এক কল্পনাপ্রবণ ছেলে, এটা দেখে তিনি আনন্দিত হতেন। যখন আমি কল্পনার আশ্চর্য জগতে ঢুকে পড়ছি শৈশবের অগাধ কৌতূহলে, মা তখন নানা রকমের বই পড়তে দিয়ে আমাকে আরও বেশি করে কল্পনার জগতে ঢুকিয়ে দিলেন। এডগার অ্যালান পো প্রথম পড়ি মাত্র ন'বছর বয়েসে। পো'র বই আমি চুরি করে পড়েছিলাম কারণ মা চাইতেন না যে এখনই আমি এই বই পড়ি। তিনি ভাবতেন আমি এখনও অনেক ছোট আর তিনিই সঠিক ছিলেন। পো'র বই আমাকে ভীত, আতঙ্কিত করে তোলে; প্রায় তিন মাস আমি অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকি, বইয়ের ঘটনাগুলিকে আমি বিশ্বাস করে ফেলি! ফরাসিরা যেমন বলে-- সে এটাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে ফেলেছে। আমার জন্য কল্পনার জগতটা ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এক জগত, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক-- এ ব্যাপারে আমার কোনও সন্দেহ ছিল না। বস্তুকে আমি কল্পনায় রাঙিয়ে দিতাম। যখনই আমার বন্ধুদের এসব বই পড়তে দিতাম, তারা বলত-- না, এসব নয়, এসব বইয়ের চেয়ে আমরা কাউবয়দের গল্পগুলি পড়তেই বেশি পছন্দ করি। তখন কাউবয়রাই বেশি জনপ্রিয় ছিল। আমি এই ব্যাপারটা বুঝতামই না যে কেন এসব এত জনপ্রিয়। আমার কাছে তখন অপার্থিব জগতই প্রিয় আর কল্পনার জগতেই বিচরণ করতে পছন্দ করছি। 


সাক্ষাৎকারী
বহু বছর পর আপনি যখন অ্যালান পো'র পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করলেন, তখন গভীরভাবে পড়তে গিয়ে আগের পাঠের চেয়ে একেবারে নতুন কোনও আবিষ্কার বা উন্মোচন করেছিলেন তাঁকে? 

কোর্তাসার
তাঁর মাঝে অনেক, অনেককিছুই পেয়েছি। ফিরে পড়তে গিয়ে তাঁর বলার ভাষাটিকে বোঝার চেষ্টায় একটু যেন সফল হয়েছি, যে-ভাষাটিকে ইংরেজ এবং আমেরিকানদের দ্বারা ব্যাপক সমালোচনার শিকার হতে হয়েছিল; কারণ, তারা বুঝেছিল যে এই ভাষা অলঙ্কারবহুল আর অতিরঞ্জনমূলক বারোক। কিন্তু আমি যেহেতু ইংরেজ বা আমেরিকান না, তাই পো'র ভাষাটিকে আমি দেখেছি অন্য এক দৃষ্টিতে। তাঁর ভাষার এমন এক রূপ আছে যা অনেক পুরোনো, যা অচল-- এভাবে অত্যুক্তি করা হয়েছে; ঠিক আছে করা হোক, সমস্যা নেই; কিন্তু তার মানে কিন্তু এই নয় যে তার সৃজনীক্ষমতার সঙ্গে কোনকিছুর তুলনা করা যায়! সেই কোন সময়ে লেখা 'ঊষারের ভাঙা ঘর', কিংবা 'লিজিইয়া বেরেনিস', কিংবা 'কালো বিড়াল', এই গল্পগুলির মধ্য থেকে যে-কোনও একটি গল্পই আমাদের বুঝিয়ে দেয়- কল্পনা আর অতিপ্রাকৃতের মিশেলে তিনি সত্যিকারের একজন জিনিয়াস। গতকাল এডগার অ্যালান পো স্ট্রিটে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলে সেখানে দেখতে পেলাম একটি ফলক, স্ট্রিটের পাশেই, তাতে যেন নির্দেশের মতো করে লেখা-- 'এডগার পো, ইংরেজ লেখক।' অথচ তিনি কোনভাবেই ইংরেজ ছিলেন না! আমাদের অবশ্যই উচৎ এটা বদলে ফেলা-- আমরা দৃঢ়তার সঙ্গেই এর প্রতিবাদ করব। 


সাক্ষাৎকারী
আপনার লেখায় একটা বিচিত্র ও অনিন্দ্যসুন্দর ব্যাপার আছে আর তা হলো চরিত্রগুলোর জন্য সত্যিকার অর্থে যাকে বলে মায়াময় আন্তরিকতা, প্রীতিপূর্ণ মমত্ব। 

কোর্তাসার
আমার চরিত্ররা যখন শিশু থাকে কিংবা শৈশব ও কৈশোরের মধ্যবর্তী সময়টা তারা পার করছে-- ঠিক তখন তাদের জন্য আমার মধ্যে ব্যাপকমাত্রায় কোমলতা ও মমত্বের জন্ম হয়। আমি প্রায়ই ভাবি যে এই চরিত্রগুলি আমার গল্পে আর উপন্যাসে খুব তীব্রভাবে জীবন্ত হয়ে থাক-- এক অপার্থিব ভালবাসা নিয়েই তাদের সঙ্গে আমার হৃদয়ের খেলাটা চলতে থাকে, লেখার লাইনে লাইনে, শব্দে শব্দে। আমি যখন একটি গল্প লিখতে থাকি, সে-গল্পের চরিত্রটি তার বয়ঃসন্ধিতে থাকলে, তখন, গল্পটি লিখতে থাকার কালে আমিও তার সঙ্গে বয়ঃসন্ধিকাল পার করি, আবার আমার চরিত্রটি যখন পূর্ণবয়স্ক তখন কিন্তু ভিন্নরকম ব্যাপার ঘটতে থাকে। 


সাক্ষাৎকারী
আপনার গল্পের অনেক চরিত্রই কি আপনায়ে চেনা জানা বা পরিচিতজনদের অনুকরণে সৃষ্ট? 

কোর্তাসার
দেখুন, আমি কিন্তু এমন কথা অবশ্যই বলব না যে আমার গল্পে এরকম অসংখ্য চরিত্র আছে যারা আমার পূর্ব থেকেই চেনা, যাদের আমি জানি, হ্যাঁ আছে, তবে খুবই কম। আমার চরিত্রদের বেলায় এরকম ব্যাপার ঘটেছে, কোনও একটি লেখায় হয়ত এমন একটি চরিত্র আছে যে আসলে দুই বা তিনজন লোকের একটা সংমিশ্রণ। কখনও আমি হয়ত একসঙ্গে দুজন নারীকে মিলিয়ে গল্পে একটি নারী চরিত্রের ভেতরে দিয়ে দিলাম, উদাহরণ হিসেবেই বলছি, সেই দুজন নারীকে আমি কিন্তু চিনি, জানি। আর এতে যা ঘটে, এই সংমিশ্রণের ব্যাপারটা গল্পের বা বইটির চরিত্রকে এমন একটি বিশেষ ব্যক্তিত্ব প্রদান করে যা অনেক বেশি জটিলতায় আক্রান্ত, জীবনের এক প্রগাঢ় অনমনীয়তা যেন! 


সাক্ষাৎকারী
আপনি যখন এটা বুঝতে পারেন যে একটি চরিত্রকে আরও গভীর কিংবা জটিল করতে হবে, বিস্তৃত করতে হবে, তখন কি একটি চরিত্রের সঙ্গে একাধিক চরিত্রকে মিলিয়ে দেন? 

কোর্তাসার
না, না; এভাবে আসলে কাজের কাজ কিছুই হয় না। আসল বিষয় তো এটাই যে- চরিত্ররাই আমাকে চালিত করে, পথ দেখায়। এভাবে আমি দেখি একটি চরিত্র, সে হয়ত এখানেই দাঁড়িয়ে আছে, আর আমি এমন কাউকে চিহ্নিত করে ফেলি, যাকে আমি চিনি, জানি। কিংবা মাঝে মধ্যে আকস্মিকভাবে দুজনকে পাওয়া যায় অন্যদের মিশ্রণে তৈরি। ব্যাস, ওইটুকুই। কিন্তু পরে হয় কী, চরিত্ররা তাদের নিজেদের ধরণে আচরণ করতে থাকে, নিজেদের বৈশিষ্ট্যে প্রকাশিত হতে শুরু করে। তারা বলতে থাকে... আমি কোনভাবেই জানব না চরিত্ররা কী কথা বলতে যাচ্ছে যখন তাদের নিয়েই আমি সংলাপগুলি লিখতে যাচ্ছি। আসলেই, সবকিছুই নির্ভর করছে তাদের ওপর। আমি শুধু টাইপ করছি তারা কী কথা বলছে, তা। মাঝেমাঝে তো এমনও হয় যে লিখতে লিখতেই আমি হা হা করে হেসে উঠছি কিংবা কাগজটাকে দুমড়ে মুচড়ে ছুঁড়ে ফেলে তাদেরকে বলছি, 'এইখানে, ঠিক এইখানে এসে তোমরা বিশ্রী বিষয় নিয়ে কথা বলছ। যাও, দূর হও।' তারপর টাইপরাইটারে অন্য একটি কাগজ ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের কথোপকথন আবার লিখতে শুরু করি। 


সাক্ষাৎকারী
এবার তাহলে বলুন, তারা কি আপনার চেনা জানা চরিত্র নয় যারা লেখার জন্য আপনাকে উস্কে দেয়? 

কোর্তাসার
না, মোটেই তা নয়। প্রায় সময় হয় কী, গল্পের জন্য মাথায় একটা আইডিয়া খেলা করতে থাকে। শুধুই একটি আইডিয়া। কিন্তু তখন পর্যন্ত সেখানে কোনও চরিত্রের ভাবনা কী আভাসও নেই। মাঝে মাঝে আমার মাথায় এক আজব চিন্তা খেলা করে-- শহরের কোনও একটি বাড়িতে কিছু একটা ঘটতে চলেছে, আমি যেন দেখছি... আমি যখন যা লিখি তখন তা প্রত্যক্ষ করি। সবকিছু দেখি। সমস্ত খুঁটিনাটি। সুতরাং, প্রথমে আমি দেখি বাড়িটি, তারপর চরিত্রগুলিকে সেখানে সংস্থাপন করি-- ধীরে ধীরে। এবং ঠিক এই জায়গাটায় চরিত্রদের মধ্যে কোনও একজন এমন হবে অবশ্যই যাকে আমি আগে থেকেই চিনি, কিন্তু এই চেনার ব্যাপারটা সুনিশ্চিত করার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত থাকি না, আর, আসল কথা হলো-- বেশিরভাগ চরিত্রই আমার নিজের সৃষ্টি, নিজের তৈরি করা। তো, এখন, অবশ্যই এদের মাঝে স্বয়ং আমিও আছি। 'এক্কাদোক্কা খেলা' উপন্যাসের ওলভিরা চরিত্রটির মধ্যে অজস্র আত্মজীবনীমূলক ব্যাপার ঢুকে পড়েছে, ঢুকে পড়ে ওলভিরা আর কোর্তাসারের মধ্যে সম্পর্কসূত্র তৈরি করেছে যদিও, তবুও চরিত্রটি কোনভাবেই আমি নই, কিন্তু আমার অনেক কিছুই, যেমন- প্যারিস জীবনের প্রথম দিককার বেহিসেবি বোহেমিয়ান দিনগুলির অনেক কথাই আছে। 

এখন, পাঠক যদি ওলভিরা-কে পড়তে গিয়ে পড়ে বসেন প্যারিসের কোর্তাসার-কে, সেটা ভুল হবে। আমি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটা লোক। 


সাক্ষাৎকারী
আর সেজন্যই কি আপনি চান- লেখা যেন কোনভাবেই আত্মজীবনীমূলক না হয়? 

কোর্তাসার
জীবনস্মৃতি আমি পছন্দ করি না আর জীবনে কখনও স্মৃতিকথা লিখবও না। কিন্তু অন্যদের স্মৃতিকথা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, অবশ্যই তার একটা মর্ম আছে, কিন্তু আমার জীবনের কোনই লিখে যাবার মতো কথা নেই। আমি যদি লিখে ফেলি, তাহলে আমাকে কিন্তু সত্যের সঙ্গে এগোতে হবে, সত্য আর একই সঙ্গে প্রচণ্ড সততা না থাকলে সেটা আত্মজীবনী নয়। আমি কখনওই মনঃকল্পিত আত্মকথা বলতে যাব না। আমাকে করতে হবে অন্যরকম একটা কিছু- ঐতিহাসিকদের মতো কাজ করতে হবে; নিজের জীবনকে অনুসন্ধানকারীদের মতো খুঁড়ে খুঁড়ে সত্যকে বের করে আনতে হবে। কারণ আমি আবিষ্কার করতে পছন্দ করি ততোটাই যতটা কল্পনা করি তারচেয়েও বেশি। তবে হ্যাঁ, ব্যতিক্রম যে একেবারেই ঘটবে না তা কিন্তু নয়। প্রায়ই এরকম ঘটে-- আমার কাছে যখন কোনও উপন্যাস কি গল্পের আইডিয়া থাকে, বাস্তবতা আর নিজের জীবনের কিছু কিছু মুহূর্ত যেন প্রকৃতির নিয়মেই সেই লেখায় ঢুকে পড়ে। আমার 'যন্ত্রণাদগ্ধ সময়ের আখ্যান' গল্পটিতে একটা ব্যাপার আছে, একটা ছেলের, বন্ধুর বড় বোনের সঙ্গে তার প্রেমের যে আশ্চর্য সংযোগ তা কিন্তু প্রকৃত অর্থেই জীবনের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। তো, আমার লেখায় ঠিক এটুকুই আত্মজীবনীমূলক, খুব ছোট পরিসরে; কিন্তু, বাকিটুকু-- তার সবই অপার্থিব, কল্পনা'র জাদুমন্ত্র। 


সাক্ষাৎকারী
যে-কোনোওভাবে, হতে পারে কোনও একটি বিশেষ দৃশ্য দিয়ে- ঠিক কীভাবে আপনি গল্পটি লিখতে শুরু করেন? 

কোর্তাসার 
যে-উৎস-বিন্দুটি থেকে লিখতে শুরু করি সেই ব্যাপারটা আমার ক্ষেত্রে কীরকম তা বলতে গেলে বলব যে, গল্প কিংবা উপন্যাস শুরু হয়ে যেতে পারে যে-কোনও জায়গা থেকেই। লেখার ক্ষেত্রে, ব্যাপারটা যখন শুধুমাত্র একটা লেখা, তো, যখনই আমি লেখাটা লিখতে শুরু করলাম, তখন, গল্পটা দীর্ঘ সময় ধরে আমার ভিতরে যেন পাক খেতে শুরু করে, দীর্ঘ সময় ধরে একটা ঘূর্ণন, গল্পের; আমার ভিতর, মাঝে মাঝে পুরো একটা সপ্তাহ কেটে যায় এই ঘোরে, কিন্তু তাই বলে গল্পটা যে আমার কাছে শেষ পর্যন্ত জানা হয়ে গিয়েছে বা আমি সমস্তটা দেখে ফেলেছি, তা কিন্তু নয়;-- দিনে দিনে তখন গল্পটি সম্পর্কে একটা খুব সাধারণ ধারনা পাওয়া যায়। সম্ভবত গল্পের ওই বাড়িটাতে, বাড়িটির একটা কোণায় কিছু লালরঙের চারাগাছ আছে, আর, আমি শুধু আরেকটি বিষয় জানি, সেই বাড়িটিতে আছেন বয়োবৃদ্ধ একজন লোক যিনি বাড়িটার সর্বত্র ঘুরে বেড়ান-- ব্যস, এইটুকুই আমি জানতে পেরেছি। গল্পের অবিরাম ঘূর্ণনের ফলে এরকম কিছু ঘটে থাকে, গল্পটা এখান থেকেই শুরু হয়ে যায়, তারপর আর যা কিছু করার বাকি থাকে তা হলো-- স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখা। আমার জন্য ঠিক এ-সময়টাই হলো গর্ভধারণের সময়। এই সময়ের ভিতরে আমার স্বপ্নগুলি ভরা থাকে অজস্র সূত্র আর কিছু পরোক্ষ ইঙ্গিতে আর কিছু ইশারায়-- যা গল্পটির মধ্যে ঢুকে যেতে চলেছে। কখনও দেখা যায় পুরো গল্পটাই একটা স্বপ্নের ভিতর নিমজ্জমান। আমার প্রথম দিকের এবং খুবই পাঠকপ্রিয় গল্প 'অধিগৃহীত ঘর' হচ্ছে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্মৃতি, এক দুঃস্বপ্ন নিয়ে লেখা, যে-অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে আমি নিজে গিয়েছি। দুঃস্বপ্নের রেশ কাটতে না কাটতেই আমি দ্রুত, খুব দ্রুত গল্পটি লিখে ফেলি। কিন্তু এরকম ব্যাপার সব সময় ঘটে না। আমার ক্ষেত্রে সাধারণ অর্থে যা হয়-- স্বপ্ন থেকে লেখার উপকরণ যা যা পাই, তা হলো-- কিছু সূত্র, গল্পের ভাঙা কিছু টুকরো। তো, এভাবে যা কিছু পাই, তাতেই আমার অবচেতন একটা বিশেষ কর্মপ্রক্রিয়ায় সক্রিয় হয় আর আমাকে দিয়ে একটি গল্প লিখিয়ে নেয়। গল্পটিকে অবলম্বন করে যখন স্বপ্নটা দেখতে থাকি, ঠিক তখন থেকেই ভিতরে লেখাটাও যেন চলতে থাকে। সুতরাং, আমি যখন বলি-- আমি শুরু করি যেকোনও জায়গা থেকে, এর কারণ হলো,- আমি আসলে জানিই না শুরুটা কীভাবে হলো, এটা কি শুরুর জায়গা, না সমাপ্তির!? যখন আমি লেখাটা লিখতে শুরু করি, যেভাবে শুরু করি, সে জায়গাটাই হয়তো তার প্রবেশ-মুখ। তবে আমি আগেভাগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকি না যে গল্পটা ঠিক এভাবেই শুরু করব। খুব মামুলি জিনিসের মতো লেখাটা শুরু হয়ে যায় এবং নিয়মিত গতিতে সামনে এগোয়। আর, প্রায় সময়ই গল্পের সমাপ্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা থাকে না-- আমি জানিই না প্রকৃতপক্ষে কী ঘটতে চলেছে। ধীরে ধীরে, একমাত্র যখন গল্পটা এগিয়ে যেতে থাকে, তখন বেশকিছু বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কুয়াশার মতোই যেন অপ্রত্যাশিতভাবে আমি গল্পের শেষটুকু দেখে ফেলি। 


সাক্ষাৎকারী
শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা দাঁড়াল এই-- যখন লিখতে থাকেন, লিখতে লিখতেই গল্পটাকে অভাবিত অবস্থা থেকে আবিষ্কার করেন? 

কোর্তাসার
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। আমি বলব-- এই ব্যাপারটা জ্যাজ সঙ্গীতের তাৎক্ষণিক সুর সৃষ্টি করার মতোই অনেকটা। আপনি কিন্তু একজন জ্যাজ শিল্পীকে অবশ্যই একথা জিজ্ঞেস করবেন না-- আচ্ছা বুঝলাম, কিন্তু এখন আপনি কী বাজাতে যাচ্ছেন? কথাটা শোনেই শিল্পী কিন্তু আপনাকে নিয়ে হাসতে শুরু করবেন, কারণ-- তার একটা থিম আছে, তার ঘরানার কর্ডের একটা সিরিজ আছে-- হারমোমিয়াস একটা অবস্থা-- তারপর তিনি তার ট্রাম্পেট কিংবা স্যাক্সোফোন তুলে নেবেন এবং বাজাতে শুরু করবেন। এখানে কিন্তু কোনও আইডিয়ার ব্যাপার নেই, কেননা ভিন্ন ভিন্ন অজস্র ছন্দময় হৃৎস্পন্দনের একটা অবিরাম স্রোতের ভিতর দিয়েই কিন্তু তাকে যেতে হচ্ছে, আর এই যাওয়া থেকে সঙ্গীতের যে জাদুকরী মূর্ছনা কখনও তা হৃদয় তোলপাড় করে দেবে, মাঝে মাঝে খুব একটা ভালোও হবে না। আমার নিজের ক্ষেত্রেও তা একেবারে মিলে যায়। মাঝে মাঝে আমিও গল্প লিখতে বসে অস্বস্তিতে পড়ে যাই, তবে সেটা শুধু গল্পের বেলাতেই;-- উপন্যাসের বেলায় বিষয়টা অন্যরকম, একেবারেই অন্যরকম, কারণ, উপন্যাসের জন্য আমি ব্যাপকভাবে প্রস্তুত হয়েই কাজ শুরু করি, আর উপন্যাস লিখতে লিখতে বিস্তর প্রস্তুতি নেয়া হয়, একটা আর্কিটেকচার যেন,-- গেঁথে গেঁথে কতদূর চলে যাওয়া যায়। কিন্তু আমার গল্পগুলি করে কী, তারা নিজেই যেন আমাকে বিভিন্ন উপায়ে নির্দেশনা দেয়, যে নির্দেশনাগুলি আমার ভিতরে বিক্ষিপ্তভাবে ছিল, কিন্তু ঠিক যেন আমি নই যে কিনা ঘটনাগুলি লিপিবদ্ধ করেছে। ঠিক আছে। যদিও গল্পগুলি আমার নামেই আবির্ভূত হয়েছে। তাহলে সেগুলি আমারই কাজ, অবশ্য, আমি ধারনা করি যে তাদেরকে আমি নিজের বলে স্বীকার করে নিয়েছি। 


সাক্ষাৎকারী
গল্প লেখার জন্য আপনার যে নিজস্ব কিছু রীতি বা ভঙ্গি আছে সেগুলিকে কি মাঝে মাঝে সমস্যাজনক মনে হয়? 

কোর্তাসার
সাধারণত- সমস্যা তৈরি হয় না, কিন্তু আমি যদি এখন এই বিষয়টির বিশ্লেষণ করতে থাকি তাহলে বলব যে- গল্পটা কিন্তু আমার ভিতরে কোনও একটা জায়গায় ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে, আর, তৈরি যেহেতু হয়েই গেছে; সুতরাং তার গড়ন, কাঠামো, এবং মাত্রাও রয়েছে। লেখাটা যদি একটি ছোটগল্পের দিকে যেতে থাকে কিংবা মোটামুটি একটি বড় গল্প, যা-ই হবে, তা যেন আগে থেকেই ঠিক করে রাখা ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আমি যেন লেখা শুরু করতে গিয়ে কিছুটা সমস্যায় পড়ে যাচ্ছি। কাগজের ওপর আমি যেন অনেক কিছুই এঁকে ফেলতে চাইছি কিন্তু আমার লেখার গতি ক্রমশই যেন ধীর হয়ে যাচ্ছে, যেন কোথাও আমি স্থির হয়ে আছি, এবং এমনভাবে লেখাটা লিখছি যেন দরকারের চেয়ে বেশি লিখে ফেলছি, কিংবা লিখছি একেবারে সংক্ষেপে; সংক্ষিপ্ত আকারে। কয়েকজন সমালোচক অবশ্য বারবার এ-ব্যাপারে আমাকে বলছেন। সমালোচকেরা বলছেন আমি নাকি একটু একটু করে আমার গল্পের মধ্যেকার কোমলতা ও সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলছি। তাদের কথাই যদি সত্য হয়, তাহলে আমি আসলেই জানি না লেখার এই বিবর্তন ভালোর জন্য হচ্ছে, না কি এক নিদারুণ অপচয়... তবে, যা-ই হোক, এটাই এখন আমার লেখার সর্বশেষ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতেই আমি এখন লেখালেখি করছি। 


সাক্ষাৎকারী
উপন্যাস সম্পর্কে আপনি সব সময়ই বলে থাকেন- উপন্যাস হচ্ছে একটি বিস্তৃত স্থাপত্যরীতি। এই কথাটি কি এটাই বোঝায় যে আপনার কাজগুলি শেষ হয়েছে একেবারেই ভিন্নভাবে? 

কোর্তাসার
হপস্কচ-এর যে-অংশটি আমি প্রথমে লিখি তা ছিল এই উপন্যাসটির পুরো একটা অধ্যায়, যা এখন বইটির মাঝখানে চলে গেছে। এটা ছিল সেই অধ্যায় চরিত্ররা যেখানে লম্বা একখানা কাঠকে এক এপার্টমেন্ট বাড়ির জানালা থেকে পাশাপাশি অন্য বাড়ির জানালায় এমনভাবে রাখে যেন অন্য জানালা দিয়ে অনায়াসেই চলে যাওয়া যায়; আর দেখুন, আমি সেটা লিখেছি এটা না জেনেই যে কেন আমি এটা লিখছি! আমি চরিত্রগুলিকে দেখেছিলাম, এমনকি সিচুয়েশনটাও দেখেছিলাম; পুরো ব্যাপারটাই ছিল বুয়েনস আইরেসে, সময়টা ছিল প্রচণ্ড গরমের, মনে করতে পারছিলাম, আমি খুব কাছেই জানালার পেছনে টাইপরাইটারে বসে ছিলাম। একজনের অবস্থা দেখছিলাম যে চেষ্টা করছিল তার স্ত্রীকে একটা কাঠের ওপর দিয়ে অন্যপাশের জানালায় পাঠিয়ে দিতে। সেই কাঠে লোহাগুলি এমন বিপজ্জনকভাবে বের হয়ে ছিল যে মহিলাটি নিজে নিজে যেতে পারছিল না। সবকিছুই আমি লিখলাম, যা ছিল বেশ দীর্ঘ, মোট চল্লিশ পাতার মতো দীর্ঘ, লিখে ফেলবার পর নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম-- সবকিছুই ঠিকঠাক আছে, হ্যাঁ, বুঝলাম, কিন্তু করলামটা আসলে কী? কারণ লিখে ফেলা অংশগুলি কিন্তু গল্প ছিল না। তাহলে কী? তখন বুঝতে পারলাম যে আমি একটি উপন্যাস শুরু করেছি, কিন্তু আমি যেন ঠিক এই জায়গাটি থেকেই শুরু করতে চাইনি। আমাকে এতটুকু লিখেই থামতে হলো, প্যারিসে বসে আমাকে পুরো অধ্যায়টা লিখতে হলো যা উপন্যাসটির একেবারে প্রথমে থাকবে আর সেটা ওলভিরা'র সমস্ত খুঁটিনাটি আর পটভূমি। শেষ পর্যন্ত যখন আগের লেখা সেই অধ্যায়টায় চলে এলাম, সেই যে কাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া পাশের এপার্টমেন্টে, তারপর বাকি অধ্যায়গুলি লিখতে শুরু করে দিলাম। 


সাক্ষাৎকারী
লিখতে লিখতে লেখাটিকে কি বারবার পড়েন, কাটাকাটি করেন? 

কোর্তাসার
না, খুব কমই এরকম করে থাকি, এর কারণ বোধহয় এটাই যে যা লিখেছি, যা লিখতে যাচ্ছি, তা তো আমার ভিতরেই জেগে আছে, আমার ভিতরেই প্রবাহিত হচ্ছে! আমি যখন আমার বিশেষ কয়েকজন লেখক বন্ধুর পাণ্ডুলিপি দেখি, সেগুলি আসলে পরিমার্জন আর সংশোধন করা খসড়া লেখাটা, যেখানে আগাগোড়া কাটাকুটি, আদল-বদল, এদিক থেকে ওদিকে সরিয়ে নেওয়া, পুরো লেখাটার ওপর অজস্র তির-চিহ্নিত জায়গা... না না না। আমার লেখার পাণ্ডুলিপিতে একটুও কাটাকাটি নেই-- ঝকঝকে। 


সাক্ষাৎকারী
হোসে লিসামা লিমা'র 'পারাদিসো'য় দেখা যায় কেমি চরিত্রটি বলছে স্পেনসহ আমেরিকার অন্যান্য হিস্পানিক ভাষাভাষী দেশগুলোর বারোকরীতির প্রতি সত্যিকার আগ্রহ আছে। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী? 

কোর্তাসার
আপনার এই প্রশ্নটির উত্তরে আমি কোনও বিশেষজ্ঞ মত দিতে পারছি না। হ্যাঁ, এই বারোক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পুরো লাতিন আমেরিকায়- শিল্প-সাহিত্যের উভয় ক্ষেত্রে। বারোক বিন্দুকে সিন্ধুর মহত্ব দিতে পারে; বলা যায় এই রীতিটি মানুষের সৃজনশীল মনগজগৎকে নানামাত্রিক বর্ণমালায় এগিয়ে যেতে উন্মুখ থাকে, বারোক স্থাপত্যরীতিতে গড়া এখানকার চার্চগুলির বর্ণাঢ্য নারীমূর্তিগুলিকে ঠিক যেমন নানামাত্রিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, কিংবা বারোক সঙ্গীতের অদ্ভুত মূর্ছনা। কিন্তু আমি এই রীতিকে সন্দেহ করি। এই রীতির লেখকরা বড় সহজেই যেন লেখার তালে কিংবা তরঙ্গে থৈ থৈ করতে থাকেন, এরকমটা কিন্তু প্রায়ই ঘটতে থাকে। তারা পাঁচপাতায় যা লেখেন তা হয়ত অন্য একজন একপাতাতেই লিখে ফেলবেন। আমিও কিন্তু এই সমস্যা থেকে মুক্ত হতে মাঝেমাঝেই ব্যর্থ হই, শেষ পর্যন্ত আমিও তো লাতিন আমেরিকান, কিন্তু সব সময়ই এই সমস্যাটা কাটিয়ে ওঠার জন্য আমি যেন মুখিয়ে থাকি, এই রীতিটিকে অস্বীকারের মধ্য দিয়েই সেটা সম্ভব হয়। আমি কিন্তু বাক্যে শব্দের অহেতুক আড়ম্বর পছন্দ করি না যা অকারণেই বিশেষণে আর খুঁটিনাটি বর্ণনায় জর্জরিত, যা হয়ত পাঠকের কানের কাছে ভাঙা পাথরের টুকরোর মতো কর্কশ ঘড়ঘড় শব্দ করে শুধু। তবু মনে হয় যে এই রীতিটা বেশ মজার আর উপভোগ্য, অবশ্যই। খুবই মনোহর এই গড়ন কিন্তু আমার জন্য নয়, আমার কাছে এর কোনও আবেদনই নেই। বারোক প্রশ্নে আমি হোর্হে লুইস বোর্হেসের দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকি। তিনি আজীবন এই রীতির শত্রুই ছিলেন বলা যায়; বোর্হেস তাঁর লেখাকে খুবই শক্ত ভীতের ওপর স্থাপন করতেন যেন পিলার-স্তম্ভ গড়ছেন। তবে হ্যাঁ এটা তো বিদিতই যে আমি তাঁর একেবারেই বিপরীত ধারার লেখক। কিন্তু যে মহান শিক্ষাটি তিনি আমাকে দেন তা হলো পরিমিতিবোধ। সেই তরুণ বয়সে যখন থেকে বোর্হেস-কে পড়তে শুরু করেছিলাম, তিনি যেন সেই সময়েই আমার ভিতরে ঢুকিয়ে দিতে লাগলেন যে-কথা কেউ একজন বলার চেষ্টা করছে তা কিন্তু অন্যজনের পাঠের পক্ষে পরিমিতির মাত্রা সম্পর্কে ধারনা করে বলতে হবে, কিন্তু সেই মাত্রাটিকে অবশ্যই নিখুঁত হতে হবে, আত্মার জন্য শান্তিদায়ক হবে-- এই হলো লেখার রীতি বা সংগঠন। পার্থক্যটা এখানেই কিছুটা নির্ণীত হয়ে যায়, ধরা যাক গাছ আর পাথরের এই উদাহরণটি, একটি গাছ- বারোক হিসেবেই গাছটিকে ভাবা যায় তার বিপুলা পত্র-সম্ভারের বিস্তারে, যা দৃষ্টিনন্দন, সুন্দর; আর একটি বহুমূল্য সুবর্ণ পাথর, স্ফটিকস্বচ্ছ-- যা আমার কাছে আজীবন সুন্দরকে গ্রহণ করবার মতো। 


সাক্ষাৎকারী
লেখার অভ্যাসটা কী রকম আপনার? যেভাবে শুরু করেছিলেন, এখন সেই নিয়মটা কি কিছুটা বদলে গেছে?

কোর্তাসার
কিছু কিছু বিষয় কিন্তু পরিবর্তিত হয়নি, কোনদিনও হবে না, তা হলো সর্বাঙ্গীণ নৈরাজ্য আর বিশৃঙ্খলা। বদলে যাওয়ার প্রশ্নে বলতে হবে- লেখালেখির ক্ষেত্রে আমার একেবারেই বিশেষ কোনও পদ্ধতি নেই। যখনই বুঝতে পারি আমাকে একটি গল্প লিখতে হবে, এরকম ব্যাপার অনুভব করতে থাকলেই আমি অন্য সকল কাজ ছেড়ে দিই-- গল্পটি আমি লিখি। 


সাক্ষাৎকারী
প্রায়ই আপনাকে বলতে শোনা যায় যে লাতিন আমেরিকা ও তার সমস্যাগুলির প্রশ্নে কিউবা বিপ্লব আপনাকে প্রেরণা দিয়েছে, উদ্বুদ্ধ করেছে।

কোর্তাসার
এবং, আবারও তাই বলছি। 


সাক্ষাৎকারী
লেখালেখির জন্য কি আপনার পছন্দের কোনও জায়গা নির্দিষ্ট করা আছে? 

কোর্তাসার
না, সত্যিকার অর্থেই না। লেখালেখির একেবারে শুরুর দিকে বয়সে যখন তরুণ আর শারীরিকভাবেও বেশ শক্তপোক্ত ছিলাম, তখন, এই এখানেই, উদাহরণ হিসেবেই উল্লেখ করছি প্যারিসের দিনগুলির কথা, এখানকার এক ক্যাফে'য় বসেই 'এক্কাদোক্কা খেলা' উপন্যাসটার একটা বড় অংশ লিখে ফেলেছিলাম। ক্যাফের কোলাহলমুখর পরিবেশ নিয়ে মোটেও চিন্তা করিনি, পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেছি। জায়গাটা লেখার জন্য সম্পূর্ণ উপযুক্ত ছিল কিন্তু ক্যাফের পরিবেশের সঙ্গে মোটেও তা উপযুক্ত নয়। এখানে এসে আমি অনেক কাজ করতে শুরু করলাম-- লেখালেখি আর অবিরাম পাঠ। 

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমিও যেন ব্যাপকমাত্রায় জটিল আর দুর্বোধ্য হয়ে পড়লাম। এখন আমি ঠিক তখনই লিখতে পারি চারপাশে যখন নিশ্চিত নীরবতা, এমনকি কাছেপিঠে কোথাও যদি গানও বাজে, লেখাটা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। মনে হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটতে শুরু করেছে! আসলে সঙ্গীত এক জিনিস আর সাহিত্য অন্যকিছু। আমার লেখালেখির জন্য এখন খুব জরুরি হয়ে পড়েছে নিস্তরঙ্গ স্থিরতা, তবে, এই কথাটি আমাকে কিন্তু বলতেই হচ্ছে যে- হোটেলের কক্ষ, মাঝে মাঝে বিমানে উড়ে যাওয়া বা কোনও বন্ধুর বাড়ি কিংবা এই ঘরটি-- আমার জন্য খুব জরুরি যেখানে প্রশান্ত নীরবতার মাঝে আমি লিখতে পারব। 


সাক্ষাৎকারী
প্যারিস সম্পর্কে কী বলবেন? ত্রিশ বছরেরও বেশি আগে কী আপনাকে এই সাহস, এই আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছিল প্যারিসকেই বেছে নিতে, এখানে চলে আসতে? 

কোর্তাসার
সাহস? না, এক্ষেত্রে আমার অবশ্যই তেমন সাহসী হওয়ার দরকার পড়েনি। খুব সহজভাবেই 'প্যারিসে চলে যাচ্ছি'- ব্যাপারটা মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম আর খুব দৃঢ়ভাবেই বুঝতে পারছিলাম যে আর্জেন্টিনার সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধন আমি ছিন্ন করতে চলেছি। তো, কঠিন সেই সময়টায় প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকার মতো অস্বচ্ছলতা আর নানাবিধ সমস্যায় পতিত হওয়া-- সবকিছুকেই আমি মামুলি বিষয় হিসেবেই নিয়েছিলাম। থাকা ও খাওয়ার সমস্যা এবং আনুষঙ্গিক আরও কিছু ঝামেলা নিয়ে মোটেও দুশ্চিন্তা করিনি। আমি যেন জানতামই যে-কোনও এক উপায়ে সব সমস্যার সমাধান হবে। আমি মূলত প্যারিসেই থাকতে চেয়েছিলাম কারণ প্যারিস হলো ফরাসি সংস্কৃতির কেন্দ্র, আর এই সংস্কৃতির প্রতি আমার ছিল প্রবল আগ্রহ। আর্জেন্টিনায় থাকতে ফরাসি সাহিত্যকে আমি গভীর মনোযোগেই পড়েছিলাম। সুতরাং বলা যায় যে আমি আসলে মনে মনে অনেক আগে থেকেই এখানে আসার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম, বইয়ে পড়া প্যারিসের রাস্তা আর অন্যান্য জায়গাগুলি খুঁজে বের করার ইচ্ছাটাও খুব তীব্র ছিল। ফরাসি উপন্যাসে বর্ণিত বালজাক কিংবা বোদলেয়ার স্ট্রিট ধরে হেঁটে যাওয়া... দীর্ঘ রোমান্টিক এক সমুদ্রযাত্রা যেন এই যাওয়া! আর আমি আগেও বেশ রোমান্টিক ছিলাম, এখনও তেমন আছি। আসল কথাটি হলো আমার রোমান্টিক আবেগপ্রবণতার কারণে লেখার সময় খুব সাবধানে এগোতে হয়, না হলে হয় কি, প্রায় সময়ই আমি নিজেকেই হুবহু লেখায় ঢুকিয়ে দিই... ব্যাপারটাকে আমি খারাপ বলছি না, কিন্তু, এতে করে আমার মধ্যে ভাবালুতা প্রবল হয়ে ওঠে, আমার একান্ত ব্যক্তিজীবনে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনও উপায় আমার থাকে না, এবং, সত্যিকার অর্থেই আমি খুব আবেগপ্রবণ আর রোমান্টিক। একই সঙ্গে আমি একজন কোমল স্বভাবের স্নেহপরায়ণ লোক, প্রীতিপূর্ণ হাত চারদিকে ছড়িয়ে দিতে চাই। নিকারাগুয়াকে আমি এখন যা দিতে চাই, তা হলো আবেগপ্রবণ দৃষ্টি ও মমতা, আর এটাও একটা রাজনৈতিক দৃঢ়তা যা এখন সানদিনিস্তা-রা করছে (এরা নিকারাগুয়ার বামপন্থি রাজনৈতিক সংঘ- সানদিনিস্তা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট, এফ এস এল এন, যারা ১৯৭৯ সালে ক্ষমতায় আসে, বর্তমানে নিকারাগুয়ায় তারা গণতান্ত্রিক-সমাজবাদী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত)। তারাও কিন্তু সঠিক অবস্থানে থেকেই কাজ করছে, মুক্তির সংগ্রামে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে চলেছে, কিন্তু তাদের এই আন্দোলনই একমাত্র চালিকা শক্তি নয়, মূল শক্তিটা হলো মানুষের প্রতি অগাধ ভালবাসা ও মমত্ববোধের এক সম্মিলন, কারণ ভালবাসি তো মানুষকেই, ঠিক যেমন ভালবাসি কিউবানদের, আর্জেন্টাইনদের। এইসব একটু একটু করে মিলে এই হুলিও কোর্তাসার লোকটাকে নির্মাণ করেছে, তার চরিত্র তৈরি করে দিয়েছে। আমার লেখায় নিজেকেই আমি ঘুরে ফিরে দেখি, যখন তরুণ ছিলাম তখন থেকেই আমি এরকম। এমন কিছু লেখা সেই বয়সে লিখেছিলাম, যা পড়লে- চোখে জল আসত, খাঁটি রোমান্টিসিজম; রোম নগরীর গোলাপগুলির উদ্দেশ্যে নিবেদিত। মা এই লেখাগুলি পড়তেন আর কেঁদে বুক ভাসাতেন। 


সাক্ষাৎকারী
প্যারিসে আসার পর থেকেই কিন্তু আপনার লেখাপত্র লোকে চিনতে শুরু করেছে, কিন্তু আপনি তো অনেক আগে থেকেই লিখছেন, তাই না? সেগুলির কিছু কিছু আগেই বই হয়েছে। 

কোর্তাসার
লেখায় আমার হাতেখড়ি হয়েছিল ন'বছর বয়সে অর্থাৎ বয়ঃসন্ধি থেকে যৌবনের অভিষেক পর্ব থেকেই শুরু। সেই তখন থেকেই আমি কিন্তু গল্প এবং উপন্যাস লিখতে অনেকটাই তৈরি হয়ে গেছি, যা আমাকে বুঝিয়ে দেয় আমি আমার আসল পথেই আছি। কিন্তু লেখা প্রকাশের বেলায় আমার মন সায় দিত না কখনও। নিজের বেলায় খুবই কঠোর ছিলাম, কখনওই নিজেকে প্রশ্রয় দেইনি, আর এখনও তেমনটাই আছি। খুব ভালোই মনে আছে, আমার সময়ের অনেক লেখক যখনই কিছু কবিতা কিংবা নভেলা লিখে ফেলতেন, প্রকাশের জন্য উন্মুখ হয়ে তারা প্রকাশক ধরতেন। আমি তখন নিজেকে বলতাম-- না, এখনই তুমি প্রকাশিত হতে শুরু করবে না, লেখাটাকে আঁকড়ে ধরে থাক। কিছু লেখা তখন টেবিলের ওপর অলক্ষ্যে পড়ে থাকত আর কিছু আমি নিজেই ছুঁড়ে ফেলতাম জঞ্জালের বাক্সে। আমার প্রথম প্রকাশের সময় বয়স ছিল তিরিশ বছর আর সময়টা ছিল ফ্রান্সে যাত্রা করবার আগের মুহূর্ত, বইটি ছিল আমার প্রথম গল্পের বই, 'কিছু লোক যারা জন্তুদের সঙ্গে লড়ছে', ১৯৫১ সালে বের হয় এই সঙ্কলনটি; তার কয়েকদিনের ভিতরেই আমি যাত্রা শুরু করি, অবশ্য এর কিছুদিন আগে আমি ছোট একটি টেক্সট প্রকাশ করি, 'সম্রাটের কথা' নামে- যার পুরোটাই ছিল সংলাপ। আমার এক পয়সাওলা বন্ধু তার আরেক বন্ধুর জন্য এই বইয়ের ছোট একটি সংস্করণ করে, ব্যক্তিগত পাঠের জন্য। ব্যাপারটা এখানেই সীমাবদ্ধ থাকে। না, আরও একটি আছে-'যৌবনের ভুলগুলি'-সনেট সংগ্রহ, বইটি আমি নিজেই প্রকাশ করেছিলাম, লেখকের নামটি গোপন ছিল। 


সাক্ষাৎকারী
সাম্প্রতিক একটি ট্যাংগো এলবামের--বুয়েনস আইরেসের ফুটপাত থেকে- আপনি গীতিকার। কী ভেবে ট্যাংগো লিখতে মনস্থ করলেন? 

কোর্তাসার
দেখুন আমি কিন্তু একজন খাঁটি আর্জেন্টাইন এবং এক পোর্তেনোও-- এই কথাটির মানে হলো বুয়েনস আইরেসের বাসিন্দা, আর বুয়েনস আইরেস একটি বন্দরনগরী, আর আমাদের সঙ্গীত- ট্যাংগো। আমি তো বেড়েই উঠেছি ট্যাংগোময় পরিবেশে। এই সঙ্গীত আমরা রেডিওতেই শুনতাম। আমার ছোটবেলা থেকেই রেডিও শোনা হতো, রেডিওয় একটার পর একটা ট্যাংগো বাজতে থাকে। আমাদের পরিবারেই তো এমন দু-একজন ছিলেন, মা আর এক পিসি, তারা পিয়ানোতেই ট্যাংগো বাজাতেন, গানগুলি গাইতেন। রেডিওতে আমরা কার্লো গার্দেল শুনতে শুরু করি, আর সেই সঙ্গে অন্যান্য সব মহান শিল্পীদের। কীভাবে কীভাবে যেন এই ট্যাংগো একদিন আমার সমস্ত অনুভবের অংশ হয়ে গেল। এই সঙ্গীত এখনও আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমার ঝলমলে তারুণ্যে, নিয়ে যায় বুয়েনস আইরেসে। অর্থাৎ, ট্যাংগোতে আমি কিন্তু বেশ ভালোই নিমজ্জিত, তবে সব সময়ই আমি এই সঙ্গীতের কঠোর সমালোচনা করেছি কারণ আমি সেইসব আর্জেন্টাইনদের মতো নই যারা এটা বিশ্বাস করে যে ট্যাংগো হচ্ছে বিস্ময়ের চেয়েও বিস্ময়কর এক সঙ্গীত। আমার মতে এই ট্যাংগো সঙ্গীতধারাটাই, জ্যাজ সঙ্গীতের পাশে, খুবই সাধারণ আর অনুর্বর সঙ্গীত। নিঃস্ব কিন্তু সুন্দর। তা যেন সেইসব গাছের মতো যারা খুবই সাধারণ, কেউই তাদেরকে অর্কিড কিংবা রোজবুশের সঙ্গে তুলনা দিবে না, কিন্তু সাধারণ হলেও তাদের নিজেদের আছে অসাধারণ লাবণ্য। এই কয়েক বছর হলো আমার বন্ধুদের ক'জন এখানে ট্যাংগো পরিবেশন করছে, কোইয়েরতো সিদ্রন হচ্ছে আমার এক বড় শিল্পী বন্ধুদের একজন, আর এক বন্ধু খুবই সুন্দর আর নিখুঁত ব্যান্দোনিয়ন বাজায়, হুয়ান হোসে মোসালিনি। তাতে কিন্তু আমাদের প্রচুর ট্যাংগো শোনা হচ্ছে, ট্যাংগো নিয়ে আলাপও হচ্ছে। এরমধ্যে আবার একটা কবিতাও লিখে ফেললাম একদিন, লিখবার পর মনে হলো, সম্ভবত এটাতে সুর বসানো যাবে; যদিও এ ব্যাপারে আমার তেমন ধারনা নেই। তারপর আমার অপ্রকাশিত কবিতাগুলিকে একটু দেখলাম (আমার বেশিরভাগ কবিতাই প্রকাশ হয়নি), সেখান থেকে কিছু ছোট কবিতা পেলাম, সঙ্গীতজ্ঞ বন্ধুরা বলল এগুলি গান হতে পারে, এবং তারা তা-ই করল। আমরা অবশ্য এগুলির ব্যাপারে নেতিবাচক চিন্তাও করেছিলাম। বন্ধু সিদ্রন আমাকে কিছু সাংগীতিক থিম দিয়েছিল, সেগুলিকে আমি শব্দরূপে লিখেছিলাম, তো, এভাবেই আমরা গান তৈরির কাজগুলি করতে পেরেছিলাম। 


সাক্ষাৎকারী
বইয়ে আপনাকে যতটা পাওয়া যায়, তাতে বোঝা যায় যে আপনি একজন ট্রাম্পেটবাদক। আপনি কি কোনও গানের দলে বাজিয়েছেন? 

কোর্তাসার
না, না, অসম্ভব। যা কিছু শুনেছেন সে ছিল এক উপাখ্যান আর কাহিনীটি বর্ণনা করেছিল আমার প্রাণের বন্ধু পল ব্ল্যাকবার্ন, একেবারে তরুণ বয়সে যার অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হয়। আমার ট্রাম্পেট বাজাবার ব্যাপারটা, মানে একেবারেই নিজের ঘরের ভিতর শুধু নিজের জন্য বাজানো, যার কিছুটা পল জানত। আর তাতেই সে প্রায় সময়ই আমাকে বলত, 'তোর এখন অবশ্যই কিছু মিউজিশিয়ানের সঙ্গেই বাজানো উচিত।' আমি বলতাম, আমেরিকানরা ঠিক যেভাবে বলে থাকে, 'না, সেভাবে বাজানোর জন্য নিজের মধ্যে যা থাকা দরকার তা আমার নেই।' আমার সেই প্রতিভাই ছিল না। আমি শুধুই নিজের জন্যই বাজাতাম। শুধু নিজের জন্যই ছিল বাজনা। নিজের ঘরে আমি রোল মর্টন, আর্মস্ট্রং কিংবা সেই কবেকার অ্যালিংটনের রেকর্ড চালিয়ে দিতাম, গানগুলির সুর ছিল এমন যাকে খুব সহজে আত্মস্থ করে নেয়া যেত, বিশেষ করে ব্লুজ আমাকে এগিয়ে যাবার পথ দেখাত। সঙ্গীত উপভোগ করতাম খুব আর ট্রাম্পেটে সুর তুলতাম। আমি তাদের গানের সঙ্গেই বাজিয়েছি... কিন্তু কখনওই তাদের সঙ্গে এক মঞ্চে বাজাইনি! কখনওই একজন জ্যাজ মিউজিশিয়ানের পাশে দাঁড়াবার দুঃসাহস দেখাইনি; আর এখন আমার সেই ট্রাম্পেট কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, হতে পারে বাড়ির কোথাও অযত্নে পড়ে আছে। বন্ধু পল কোনও একটি বইয়ের সঙ্গে এ ব্যাপারে একটি বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, বিজ্ঞাপনটিতে আমি ট্রাম্পেট বাজাচ্ছি- এরকম একটি ফটোও ছাপা হয়েছিল, লোকের এ-থেকেই ধারনা হয়েছিল যে আমি খুব ভাল বাজাতে পারি। ঠিক যেমন কোনও একটি লেখা সম্পর্কে স্থির বিশ্বাস না জন্মালে আমি কখনওই সেটা প্রকাশ করতে চাই না, ট্রাম্পেটের বেলাতেও সেই একই ব্যাপার-- চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাস না জন্মান পর্যন্ত আমি কোনোদিনই বাজাতে চাইনি। আর সেই আত্মবিশ্বাসের দিনটিও কখনও আসেনি। 


সাক্ষাৎকারী
আর কোনও উপন্যাসে হাত দিয়েছেন 'ম্যানুয়াল পুস্তিকা' লেখার পর? 

কোর্তাসার
না, নতুন লেখায় হাত দিতে পারিনি, তার কারণটাও খুব পরিষ্কার-- রাজনৈতিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়া। উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে আমার দরকার হয় অখণ্ড মনোযোগ এবং একটা নির্দিষ্ট সময়, কমপক্ষে এক বছর, স্থির প্রশান্ত মনে কাজটি করার জন্য, আর অবশ্যই বেপরোয়া হয়ে নয়। তবে এখন, এই সময়টাতে আমি কিছুতেই সেই প্রশান্তিতে পৌঁছতে পারছি না। এই এক সপ্তা আগেও আমি জানতাম না তিন দিনের মধ্যে আমাকে নিকারাগুয়া যেতে হবে। সেখান থেকে যখন ফিরে আসব তখনও আমি জানব না যে এরপর আর কোথায় যাব আর কী হবে। কিন্তু উপন্যাসটি এই আসা যাওয়ার মাঝখানেই লেখা শেষ হয়ে গেছে! উপন্যাসটি আমার মধ্যেই আছে, আমার ঘুমে, স্বপ্নে। আমি তো সব সময় এই উপন্যাসটিকেই স্বপ্নে দেখি। উপন্যাসে কী ঘটবে আমি তা জানি না কিন্তু আমার মধ্যে সেই আইডিয়াটি চলে এসেছে। উপন্যাসের গল্পটি, আমি জানি মোটামুটি দীর্ঘ হবে, কল্পনাশ্রিত কিছু ব্যাপার তো থাকবেই কিন্তু খুব বেশি নয়। উপন্যাসটি 'ম্যানুয়াল পুস্তিকা' ঘরানারই হবে, কাল্পনিক ব্যাপারগুলি যার প্রতিটি পাতায় জীবনের নিয়মেই এসে মিলে মিশে যাবে, হ্যাঁ, অবশ্যই এটি একটি রাজনৈতিক বই হবে না। নিখাদ সাহিত্য। আমি এই আশাটি করছি যে জীবন আমাকে পরিত্যক্ত দ্বীপের মতো একটু জায়গা দেবে, এমনকি এই ঘরটিও যদি সেই পরিত্যক্ত দ্বীপটা হয়, আর, একটি বছর, আমার চাওয়া একটি মাত্র বছর। কিন্তু হন্ডুরান, সমসিস্তা আর রেগান এই তিন জাতের বেজন্মা বর্বরেরা তো নিকারাগুয়াকে ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছে, এই অবস্থায় আমি তো আমার লেখার সেই দ্বীপটিকে খুঁজে বের করতে পারি না। আমি লেখাটা শুরুই করতে পারি না, রাজনৈতিক সমস্যাগুলির কারণে আমি নিরবচ্ছিন্নভাবে পীড়িত হতে থাকি, গভীর অন্ধকারে তলাতে থাকি। অচলাবস্থার কাছে লেখালেখি ব্যাপারটাই কেমন গৌণ হয়ে পড়ে, সমস্যার ওপরই তখন পূর্ণ দৃষ্টি রাখতে হয়। 


সাক্ষাৎকারী
আর জীবন ও সাহিত্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাটাও যথেষ্ট কঠিন হয়ে পড়তে পারে। 

কোর্তাসার
হ্যাঁ, খুবই কঠিন; আবার উলটো করেও বলা যায়- না, ভারসাম্যের ব্যাপারটা খুব যে কঠিন তা কিন্তু নয়। বিষয়টা অনেকাংশেই নির্ভর করছে জীবনযাপনে ঠিক কোথায়, কোন জায়গাটায় বেশি জোর দেয়া হচ্ছে তার ওপর। প্রাধান্য পাওয়া জায়গাগুলি যদি হয়, যা এইমাত্রই আমি আপনাকে বললাম,- ব্যক্তির নৈতিক বোধের জায়গাটাকে স্পর্শ করা, তাহলে আমি আপনার সঙ্গে একমত হব। তবে, আমি বেশ কয়েকজনকে চিনি যারা প্রায় সময়ই অভিযোগ করে বলেন- ওঃ, আমি তো আমার উপন্যাসখানি লিখে ফেলতে চাই, কিন্তু আমাকে যে বাড়িটা বিক্রি করতে হবে; তারপর ট্যাক্সের ঝামেলা তো আছেই, এ অবস্থায় কীভাবে লেখাটায় হাত দেব? আবার এরকম কারণও দেখান কেউ কেউ- আসলে সারাদিন অফিসে খুব ব্যস্ত থাকতে হয়, অনেক কাজ, এ অবস্থায় তুমি কীভাবে এই আশা কর যে আমাকে দিয়ে লেখালেখি হবে! দেখুন, আমিও কিন্তু সারাদিন ইউনেস্কোতে কাজ করেছি, কিন্তু ঘরে ফিরেই তো লিখতে বসেছি; এবং একদিন 'এক্কাদোক্কা খেলা' বইটাও লিখে শেষ করেছি। যখনই কেউ লিখতে চায়, একগুঁয়ে জেদ নিয়ে বসে পড়ে, সে অবশ্যই লিখতে পারে। কাউকে যদি দণ্ড হিসেবে লিখতে বলা হয়, অবশ্যই অবশ্যই সে লিখবে। 


সাক্ষাৎকারী
আপনি কি এখনও অনুবাদক ও দোভাষী-ব্যাখ্যাকার হিসেবে কাজ করেন?

কোর্তাসার
না, এসব কাজ একেবারে ছেড়ে দিয়েছি। এখন আমি খুব সাধারণ জীবন যাপন করছি, কারণ- গানের রেকর্ড, বই কিংবা সিগারেট কিনবার জন্য খুব বেশি একটা টাকার দরকার হয় না। আর আমি এখন বইয়ের রয়্যালটি'র টাকা দিয়েই খেয়ে-পরে দিব্যি বেঁচে আছি। প্রকাশকরা বইগুলোকে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করেছেন, যার সুবাদে বেঁচে থাকবার প্রয়োজনীয় টাকাগুলি আমি ঠিকই পেয়ে যাই, শুধু একটু হিসেব করে চলতে হয়। লেখাপত্র থেকে মোটামুটি ভালোই পাচ্ছি তার মানে কিন্তু এটা নয় যে ইচ্ছে হলে বাইরে বেরিয়ে গেলাম আর নিজের জন্য একটা ইয়োট কিনে ফেললাম, যদিও এখন ইয়োট কিনবার সামান্যতম ইচ্ছাও আমার নেই। 


সাক্ষাৎকারী
আপনি কি খ্যাতি ও সফলতাকে উপভোগ করেন?

কোর্তাসার
ওহ, শুনুন... আমি এখন এমন কিছু কথা বলব যা হয়তো আমার বলা ঠিক হবে না, কারণ, কথাগুলি কেউই বিশ্বাস করবে না। সফলতা আমার জন্যে আনন্দের ব্যাপার নয়। যা কিছু লিখেছি তাতেই আমার খেয়ে-পরে চলে যাচ্ছে আর তাতেই আমি খুশি। আর আমাকে জনপ্রিয়তা ও সফলতার সংকটপূর্ণ দিকটার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই থাকতে হচ্ছে। কিন্তু আমি আজকের চেয়ে আগের সেই দিনগুলিতেই সবচেয়ে সুখি ছিলাম, যখন একেবারেই অপরিচিত ছিলাম। অনেক অনেক সুখি। প্রতি দশ গজ জায়গার ভেতর কেউ না কেউ আমাকে চিনে ফেলছে--এই ব্যাপারটাকে এড়িয়ে কোনোভাবেই আমি লাতিন আমেরিকা কিংবা স্পেনে যেতে পারি না। কেউ না কেউ চিনে ফেলছে, অটোগ্রাফ চাইছে, আলিঙ্গন করতে চাইছে... এগুলি খুব মর্মস্পর্শী ব্যাপার যা আমাকে খুব বিচলিত করে ফেলে। কারণ, আমার এমন সব পাঠক আছেন যারা বয়সে একেবারেই তরুণ। আমি খুবই সুখি যে তরুণরা আমার সৃষ্টিকে পছন্দ করেছে কিন্তু ব্যক্তিগত একান্ততার পক্ষে এই ব্যাপারগুলি আমার কাছে ভয়ংকর লাগে। আমি ইউরোপের সমুদ্রসৈকতেও যেতে পারি না, দেখা যাবে যাওয়ার পাঁচ মিনিটের মাথায় ফটোগ্রাফার হাজির! আমার শারীরিক গড়নকে তো আর ছদ্মবেশে গোপন করতে পারব না। আমি যদি সেই আগের মতো ছোট থাকতাম, তাহলে দাড়ি কামিয়ে ফেলতাম, চোখে দিতাম রোদচশমা, কিন্তু এই শারীরিক উচ্চতা, দীর্ঘ বাহু এবং এই আমি-- আমাকে সবাই দূর থেকেই চিনে ফেলে। অন্যদিকে, খুব মজার আর উত্তেজনাকর ঘটনাও আছে! এই তো গত মাসেই আমি বার্সেলোনায় ছিলাম, এক সন্ধ্যায় সেখানকার গথিক গড়নের বাড়িগুলোর দিকে হাঁটছিলাম, সেখানে এক মার্কিন মেয়েকে দেখলাম, খুবই মিষ্টি দেখতে, অসাধারণ সুন্দর গিটার বাজাচ্ছিল, বাজিয়ে গানও গাইছিল। মাটিতে বসে গান গেয়ে মেয়েটি বেঁচে থাকবার রসদ জোগাড় করছিল। সে জোয়ান বাওয়েজের মতো করে গাইছিল, কিছুটা একেবারে স্পষ্ট গলায়। তাকে ঘিরে গান শুনছিল একদল তরুণতরুণী, এরা সকলেই এই বার্সেলোনার। গান শোনা বাদ দিয়ে আমি একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালাম। তখন সেই তরুণতরুণীর দল থেকে বছর বিশেকের একটি ছেলে, খুবই সুন্দর দেখতে--একেবারেই তরুণ-- আমার দিকে এগিয়ে আসল। তার হাতে একটি কেক। আমার কাছে সে বলল-- হুলিও, একটু টুকরো নাও। আমি তার হাত থেকে এক টুকরো কেক তুলে নিলাম এবং খেয়েও ফেললাম। ছেলেটিকে বললাম-- তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ কেক খাওয়াবার জন্যে। উত্তরে সে আমাকে বলল--কিন্তু, শোনো, তুমি যা আমাকে দিয়েছ সে তুলনায় আমি যা দিয়েছি তা কিছুই না। আমি বললাম-- এভাবে বলো না। আর, আমরা দুজন আলিঙ্গন করলাম। সে চলে গেল। হ্যাঁ, এরকম ঘটনা লেখক হিসেবে আমার রচনার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। আপনার দিকে একটি ছেলে বা একটি মেয়ে এগিয়ে এল কথা বলার জন্যে এবং উপহার দিল এক টুকরো কেক--এটা বিস্ময়কর! লেখালেখির মতো এক তীব্র যন্ত্রণার উপযুক্ত দাম বোধহয় এটাই। 

----------------------------------------------------------------------------------------------------------
 এই অনুবাদে বিশেষ সহযোগিতা করেছেন- অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়।




অনুবাদক পরিচিত
এমদাদ রহমান
জন্মস্থান : সিলেট
বর্তমানে ইংল্যান্ড থাকেন। গল্পকার ও অনুবাদক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন