শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

সাত্যকি হালদার'এর গল্প : একটি গাছের গল্প

সে-সব আশ্চর্য কথা আমাকে শুনিয়েছিল সোভান আলি। বুড়ো সোভান আলি। দূরে আঙুল দেখিয়ে বলেছিল, ওই যে জায়গাটা দেখতেছেন, খানিকটা ঢিবি মতন, ওইখানে ছিল গাছটা। স্বপ্ন-দেখা গাছ। গাছের গোড়ায় ঝোপঝাড়। তার ওই পাশে ছিল জঙ্গল...

কী গাছ ছিল ওটা?

মাদার গাছ। অনেক দিনের পুরোনো মাদার। আমাদের বাপ-ঠাকুর্দারও আগে থেকে ওই গাছ মাঠের মাঝখানে।

তারপর!

তারপর আর কী! লম্বা করে শ্বাস ছেড়েছিল সোভান আলি। তারপর এই এখন যেমন দেখতেছেন।

সেটা ছিল একটা শীত আসি-আসি বিকেল। রোদ্দুরের তেজ কম। বাতাস শান্ত। জায়গা দেখতে এসে আমি আর সোভান আলি বড় মাঠের মাঝখানে। প্রান্তরের ওদিকে অনেক দূরে রাস্তা। চওড়া ডাবল্ লেনের রাস্তা। সারা দিন ধরে গাড়ির যাতায়াত। আমাকে নিয়ে বুড়ো হাঁটতে হাঁটতে অত দূর।

বুড়োর সঙ্গে আলাপের একটা আদি-পর্ব ছিল। ওর ছেলে ইমতিয়াজ। ইমতিয়াজ আমাদের নতুন শহরের ফ্ল্যাটে আসত। জানালায় নেট লাগিয়ে দিয়েছিল। ছোট্ট বারান্দাটার মাথায় একটা শেড। আরও অনেক রকম কাজে আসত ও। ইমতিয়াজদের পাড়া আটঘরা। পাড়া অথবা গ্রাম। প্রায় শহরের গায়ে লেগে থাকা একটা গ্রাম। একদিকে এয়ারপোর্টের পেছনের পাঁচিল, অন্য দিকে সদ্য গড়া নিউটাউন। মাঝখানে কলাবাগান, নারকেল-সুপুরি, শ্যাওলা ভাসা পুকুর। আবার সেই গ্রামেই জেরক্স মেশিন, মটর সাইকেল সারানোর দোকান। ইমতিয়াজ সাইকেল চালিয়ে চলে আসত আমাদের এলাকায়।

আমার বন্ধু শ্যামল জমি নেবে খানিকটা। ওর ফ্ল্যাট নয়, বাড়ির শখ। কিন্তু এসব দিকে আলাদা করে আর জমি নেই। ফলে নিউটাউনের গা ঘেঁষে যদি খোঁজ পাওয়া যায়। সে কথা একদিন বললাম ইমতিয়াজকে। ও শুনে বলল, জমির কথা আমার আব্বারে বলেন। ঝালিগাছির ওদিকে ওনার এখনও একটু জায়গা রয়েছে। মাঝে তো বেচবে-বেচবে করছিল।

তাহলে কি একদিন নিয়ে আসবে তোমার আব্বাকে?

সে যদি বলেন তো আনি। আমরা কাজকর্ম করি, আব্বা এখন ফাঁকা বসে থাকা মানুষ। আপনার কথা বললে চলে আসবেখন।

তাহলে ওনাকে নিয়েই এস একদিন।

ওরা এল একদিন। আমাদের খানিকটা উঁচু তলার ফ্ল্যাটে ঢুকে জানালা দিয়ে নীচের দিকটা খানিকক্ষণ দেখেছিল ইমতিয়াজের আব্বা, সোভান আলি। তারপর বলেছিল, উপর দিককার বাতাসে কেমন একটা গন্ধ। মাঠে সরষের ফুল আসার সময় যেমন হয়।

ইমতিয়াজ বলেছিল, আব্বা আপনি বসেন। এনার কথা ক-টা আগে শুনে নেন।

আমি দেখলাম সাদা চুল সাদা দাড়ির একজন মানুষ। হাঁটু ছাড়ানো পাঞ্জাবিটাও সাদা রঙের। রোগা চেহারা। চোখ দুটো জানালা দিয়ে দূরে। আমার কথা শোনা হলে বলল, জায়গা তো আছে। চান তো বেড়াতে বেড়াতে একদিন দেখিয়ে নে আসি।

আমি বললাম, কিনবে আমার বন্ধু। খড়গপুরে থাকে। ওকে খবর পাঠাই, আসুক। ও-ই আপনার সঙ্গে গিয়ে জায়গা দেখে নেবে। 

সে আপনার বন্ধু যখন আসবে তো আসবে। তার আগে আপনি চলেন আমার সঙ্গে। হেঁটে আসি।

কত সময় লাগবে?

সে আপনি যেভাবে হাঁটবেন। তবে আধা-ঘন্টার বেশি না। আমি তো এক ঘন্টায় ফিরে চলে আসি।

গাড়ি যায় না? বাস?

ও পজ্জন্ত এখনও পথ হয়ে পারেনি। ফাঁকা মাঠ। তবে লোকে যেভাবে জমি খুঁজতে নেমেছে তাতে দু-চার বছরে রাস্তা হয়ে যাবে।

শ্যামলকে জমির খবর জানাব ঠিকই, কিন্তু তার আগে ওকে একটু ইনট্রো দিলে ভাল হয়। দূর থেকে আসবে। একেবারে বেখাপ্পা জায়গা হলে জানিয়ে লাভ নেই। সোভান আলিকে বললাম, আমার কিন্তু রবিবার ছাড়া সময় হওয়া মুশকিল।

সোভান আলি বলল, তা ওই রোববারেই করেন। দুকুরের পর দিক যাব। দেখেশুনে সন্ধে নাগাদ ফিরে চলে আসব। শুক্কুরবার ছাড়া আমার যে-কোনও দিন সুবিধা।

কাছাকাছির রবিবারেই সোভান আলির সঙ্গে যাওয়া ঠিক হয়ে গেল। এবং গিয়ে জায়গাটা পছন্দ হল না। খানিকটা ডোবা মতন। এলোমেলো গাছপালা। কাছাকাছি বসত বলে কিছু নেই। গ্রামের যে সীমানা তাও বেশ তফাতে। অনেক দূরে বড় রাস্তার ওই দিকে আবছাভাবে নিউটাউন। আকাশের গায়ে দূরে দু-একটা টাওয়ার। ইমতিয়াজের বাবাকে অপছন্দের কথাটা তখনই বললাম না।

ফেরার পথে পড়তি বিকেল। সোভান আলির দেখলাম জমি বিক্রি নিয়ে মাথা ব্যথা তেমন নেই। সে বরং সেই বিকেলে শোনাল স্বপ্ন-দেখা মাদার গাছের কথা।

ফ্ল্যাটে ঢুকে সরষে ফুলের গন্ধ পেয়েছিল। ফলে আমি তেমন অবাক হই না। বরং বললাম, গাছের স্বপ্নের কথা জানা গেল কীভাবে?

সোভান আলির গলার স্বর অন্য রকম। ফেরার বিকেলে কথা শুরু করল টেনেটেনে। বলল, সারা শীতকাল ধরে স্বপ্ন দেখত গাছটা। তখন গাছের পাতা ঝরে যেত। গায়ের ছাল ফাটাফাটা। কেউ কাছে যেত না। তারপর ফাল্গুন মাস পড়লে স্বপ্নের কথা জানা যেত। দূরদূর গাঁ-গঞ্জের লোক আসত স্বপ্নের কথা শুনতে।

কী বলত গাছ তখন!

লোকেরা এসে আশপাশে মেলা বসিয়ে দিত। তিন দিনের মেলা। ফাল্গুন মাসে যেই সময় হাড়োয়ায় মেলা তার কাছাকাছি সময় মেলা বসত এদিকেও। কত লোক রাতে পিদিম জ্বেলে আকাশের নীচে থাকত...গাছের স্বপ্নের কথা শোনার জন্য রাত জাগা।

জায়গা দেখতে এসে অন্য গল্পের ভেতর ঢুকে যাচ্ছি। একেবারে ভিন জগতের গল্প। সোভান আলি নিশ্চয়ই এমন সব জগতে থাকতে ভালোবাসে। ফাল্গুন মাসের মেলা আর সরষে ফুলের গন্ধ।

তবে এসব শোনার মেয়াদ বেশি হলে আধ ঘন্টা। তার মধ্যে ঘরে পৌঁছে যাব। ফলে ওনার আগ্রহ ধরে রাখার জন্য কথা বললাম। —লোকেরা নিশ্চয়ই গাছের কাছে আর্জি রাখত নানা রকম। মানতটানত যেমন হয়...।

তা কিন্তু না। সোভান আলি মাথা নাড়ায় দু-দিকে। এতক্ষণ সে আগে হাঁটছিল, আমি ক-পা পিছিয়ে। এবার সে দাঁড়িয়ে যায়। বলে, এ গাছ তো মানতের গাছ নয়, স্বপ্নের গাছ। কেউ কোনও মানত নিয়ে আসত না এখেনে। বরং এসে শুনত পরের বছরটার কথা। পরের বার বান হবে না খরা হবে। ধান পাকার মুখে শিল হবে কিনা। যারা নদীর দেশের লোক তারা এসে জেনে নিত ভাঙনের কথা। কোথায় বা নতুন চর জাগবে...

সেসব কি মিলে যেত!

না মিললে বছর বছর লোক আসছিল কেন! নতুন নতুন লোক। দূরের লোক, দক্ষিণের লোক। সোভান আলি নিশ্চিন্ত মনে আমাকে বোঝায়।

আপনি কখনও এসেছেন মেলায়! 

সোভান আলির নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাই। বয়স বলেই হয়ত এতখানি চলায় একটু কষ্ট। যদিও কথা বলতে বেশ উৎসাহী। বলে, আমি কেন, আরও কত লোক এসেছে। আমার বাপ এসেছে, ঠাকুর্দা এসেছে। হয়ত তাদের আগের লোকেরাও স্বপ্নের কথা জেনে কবরে চলে গেছে।

বিকেলের সূর্য ঢলে গেছে। রোদ বলতে সেভাবে আর কিছু নেই। শেষ বিকেলের আলো। আমরা মাঠ ধরে হাঁটছি।

তখন অন্য একটি প্রশ্ন করার ইচ্ছে হয় আমার। এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলছে সোভান, হয়ত কিছু একটা ঘটত। ওনাকে বলি, গাছ তার স্বপ্নের কথা জানিয়ে দিত কীভাবে!

সোভান আলি খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। হেঁটে যায় মাথা নামিয়ে। তারপর বলে, সে এক বড় রহস্য। গাছের স্বপ্নের মতোই তার কূল দরিয়া নেই।

কী রকম?

সোভান আলি আবার দাঁড়িয়ে যায়। তারপর রহস্য বলার মতোই কথা বলে। —ফি বছর শীতের শেষে মাদারের ফুল আসত যখন, বড় লাল ফুল, তখন কোত্থেকে পির চলে আসত। পির এসে আস্তানা বানাত গাছের তলায়। তার মুখ দিয়েই গাছ রাতে-রাতে স্বপ্নের কথা বলত। 

ব্যাপারটা খানিক বোধগম্য হয় আমার। স্বপ্ন তাহলে গাছের নয়। পিরের। গণনা-টননার মতো। গ্রামের লোক সে-সব বিশ্বাস করে ফিরে যেত। 

সোভান আলিকে সেটুকু ধরিয়ে দিতে সে বলে, রহস্য তো সেইখানেও। প্রতি বার তো এক পির আসত না। একেকবার একেক জনা। কেউ বয়স্ক, কারু মাঝ-বয়স। কারু বুক পর্যন্ত দাড়ি, অনেকের দাড়ি নেই, সাদা চুল। কেউ লম্বা, কেউ খাটো মতন। 

আমি বলি, সত্যিই তার মানে আলাদা লোক!

আলাদা তো বটেই। সোভান আলিরও গলায় বিস্ময়। ...পিরেদের ভাবভঙ্গি আলাদা, চলাচল আলাদা, রাতে যে স্বপ্নের কথা শোনাত সেই গলার স্বরও ভেন্ন। তবে তারা সবাই মাদারের ফুল ফোটা শুরু হলে চলে আসত। দিন-তিথি বলে কিছু নেই, ফুল ফোটায় যোগাযোগ। স্বপ্ন বলা হয়ে গেলে আবার একদিন ফক্কা।

ফক্কা মানে! কোথায় চলে যেত তারা?

সে-সব কেউ কখনও জানতে পারেনি। কোথায় যেত কোথা থেকে আসত সব অজানা। মাঝরাতে গাছের স্বপ্নের কথা জানানো ছাড়া পিরেরা তো আর কথা বলত না। শুধু শেষদিন রাত্রে পিরেরা ডাকত নূরজাহানের নাম ধরে। নূরজাহান...নূরজাহান...সে এক হাহাকার করা ডাক। সেই ডাক শুনে দেদার হকের মেয়েটা গিয়ে দাঁড়াত মাদার গাছের তলায়।

সোভান আলি নিজের মতো করে কথা বলে যায়। সন্ধের ফেরার পথে আমার সামনে থাকলেও সে চলে গেছে আগের কোনও সময়ে। একভাবে বলে যাওয়া গলার স্বরে সেই দূরের সময়। 

...নূরজাহান যখন ছোট, অনেক ছোট, হয়ত সাত-আট বছরকার হবে তখন একবার মা-দাদীর সঙ্গে মেলায় গিয়ে হাত দিয়িছিল ওই গাছে। কোনও কারণ নেই, এমনি হাত দেয়া। আর তারপর থে যে পিরই আসত, মেলার শেষ রাতে সে ডাক দিত তার নাম করে। 

আবার হাঁটা শুরু। আবারও একটু কথা বলি আমি। ...গাছ তাহলে পরের বছরের কথাই শুধু বলেনি। কাউকে কাউকে নাম ধরে ডেকেছেও।

সে একেবারেই দু-একজনাকে। তার মধ্যে ওই নূরজাহান। ওকে যখন ডাকত তখন গলার স্বর বদল হয়ে যেত পিরদের। যেন অনেক কষ্ট, অনেক কথা মেয়েটার সঙ্গে। আসলে তো গাছের স্বপ্নের কথা...।

নূরজাহান এসে দাঁড়ালে কথা বলত পিরেরা?

কিছু না, একটাও কথা না। যেন ওরে শুধু দেখত। গাছটা দেখত পিরের চোখ দে। 

শেষ বিকেলে আমি শুনে যাই। নূরজাহান যেন এই বুড়ো সোভানেরই মেয়ে বা অন্য কেউ। ওনাকে বলি, তাকে ছাড়া আর কাউকে গাছ কখনও ডাকেনি?

সে-সব অনেক কথা। বলতে গেলে আরও কদিন জমিজায়গার খোঁজে আসতে হবে। আর যাদের দু-একবার ডেকেছে তাদের ডেকেছে অন্য কারণে। সে-সব নানা রকম ব্যাপার। 

তবু শোনা যাক একটু।

সোভান আলি দাঁড়িয়ে পড়ল আবার। পেছনে দূরে সেই দিকটায় তাকাল যেখানে গাছটা ছিল বলে বলেছে। তারপর বলল, আপনার তাড়া নেই?

আছে, তবে সেটা সন্ধের পর। সন্ধের আগে ঢুকে যেতে পারলেই হল। 

তবে আমার মেজো চাচা ফরাজ আলির কথাটাও এট্টু শোনেন। সংক্ষেপ করে বলি। এইখানে দাঁড়িয়ে শুনে যান।

দূরে কলকাতার আকাশে সূর্য নেমে পড়ার আলো। মাঠের আশেপাশে পাখি ডাকছে নানা রকম। সোভান আলি বলে, ফরাজ আলি নেই, তবু কথা কয়টা রয়ে গেছে।

কী রকম!

মাঝ-বয়সে সে লোকের নানা রকম ব্যবসা, এদিকওদিক কারবার। বাড়ির থে খানিকটা ছাড়াছাড়া। আর ছিল ক-বছর পরপরই বিয়ে করার শখ। মুর্শিদাবাদের সালারে গেল লোহালক্কর কিনতে, সেখান থেকে একটা মেয়েরে বিয়ে করে আনল। বসিরহাট বাদুড়িয়ায় আর দুটো শ্বশুরঘর। 

আমি চুপ। সোভান আলি বলে যায়। —আর সেই সঙ্গে টাকার অহংকার। অন্য ভাইদের পাত্তা দিত না, আশপাশের কাউরে মানুষই মনে করত না। তখনের দুঅ্যাট্টা নেতার সঙ্গেও যোগাযোগ। একবার বলল স্বপ্ন-গাছের তলা সে বাঁধাই দে দেবে, মোজাইক করে দেবে পিরের আস্তানা। ...কিন্তু কারও তো সেটা পছন্দ না, লোকে ওই সব মাঠ আর গাছ আটকা দেখতে চায় না। অথচ পয়সার গরমের সামনে কে কী বলবে!

তারপর?

তারপর ফাল্গুন মাসে মেলা এল। দূর দূরের লোক এল স্বপ্নের কথা শুনতে। ফরাজ আলিও এসে বসে থাকল এক পাশে। মেলা শেষ হলে সে পুরো গাছের গোড়া মোজাইক করে দেবে, তার লেবার আসবে, সবাইরে ডেকেডেকে সেই কথা শোনাচ্ছে। কিন্তু মাঝরাতে বছরের স্বপ্ন বলা হয়ে গেলে অন্ধকারে পির হঠাৎ ডাক দিল তারই নাম ধরে। ফরাজ... ফরাজ... অন্ধকারে গলা তুলে ডাক। নূরজাহানরে যেভাবে ডাকত সেরকম না। এই গলা কেমন ভারভার। 

তারপর!

ফরাজ আলি উঠে দাঁড়াল নাম শুনে। মাঠে শুয়ে ছিল যারা তারাও উঠে বসল। তখন পিরের গলায় মাদার গাছ বলল, আমার মোজাইক লাগবে না ফরাজ।

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকল লোকটা। আশপাশে রাত-জাগা মানুষ। তারা পরের বছর ধান আর ফসল পাকার কথা জেনে গেছে। সকালের আলো হলে সবাই দেশে ফিরে যাবে। তখন অন্ধকারে গাছ কথা বলল আবার। বলল, তুই আর বিয়ে করিসনি রে ফরাজ।

...ফরাজ কাঁপছে। সেও কথা বলতে চাইল একটু। বলল, কিন্তু আমার যে ছেলেমেয়ে হল না, বউ যে সব কটাই এক রকম। পেটে ধরতে পারে না।

গাছ বলল, বউদের দোষ তেমন নেই। তোরই মেসিন খারাপ। তোর মেসিনে তেল নেই ফরাজ। 

ফরাজ তা শুনে মাথা ঘুরে পড়ে গেল। সকালের আলো ফুটতে মেলার লোক ফিরে গেল যে যার দেশে।

বুড়ো সোভান আলি চলতে শুরু করল আবার। চলতে চলতে টেনেটেনে কথা। তার গলা কেমন করুণ। আমার সামনে হাঁটলেও যেন সে কথা বলছে অনেক দূর থেকে। সে বলে, তারপর থে ওরকম একটা অহংকারী লোক, টাকা ছাড়া যার মুখে কথা নেই, সে কেমন অন্য মানুষ হয়ে গেল। ব্যবসাপত্তর ছেড়ে দিল, টাকা ভাগ করে বউগুলোনরে দিয়ে দিল সব, জমিজমা দান করে দিল এতিমদের নামে। নিজে ক-দিন এসে রাতে আটঘরা মসজিদে থাকছিল, সেখানেই ঘুমোত, নামাজের সময় কাঁদত বুকে হাত দিয়ে। তারপর বলা নেই কওয়া নেই কোথায় চলে গেল একদিন।

আমাদের পৌঁছনোর জায়গা কাছে এসে গেছে। আর খানিকটা এগোলে আমি সোজা যাব, সোভান আলি ডান দিকের পথে ঘুরবে। দূরে বড় রাস্তায় পরপর আলো জ্বলে গেছে। সোভান আলি বলল, গাছ সাধারণত কারও নাম করে কিছু বলত না, শুধু দু-একবার মাত্র এই রকম। কাউকে হয়ত কখনও জমিজিরেত না বেচতে বলেছে, কাউকে বলেছে দূরের দেশে না যেতে, আবার কখনও আয়ুর হিসাব বলে দিয়ে গেছে। তবে শেষ রাতে নূরজাহানরে ডাক দিত তখনও। নূরজাহানের অবশ্য তখন বিয়ের কথা চলছে বাইরের একটা লোকের সঙ্গে। সে লোকটা বারবার আসছিল। টাকা দিতে চাইছিল নূরজাহানের বাপকে। 

নূরজাহানের বাবা টাকা নিল?

না নিয়ে কী করবে! অত টাকা!

আর গাছ যাদের আয়ুর কথা বলেছিল?

সোভান আলি গলা নিচু করে। ...সে-সব দিন-মাস-বছর মেলানো চুল চেরা হিসেব। যেক্কে সেই।

একেবারে ফ্ল্যাটের এলাকার কাছাকাছি এসে গিয়েছিলাম আমরা। আর হয়ত কয়েক মিনিট। সন্ধে হয়ে গেল। সোভান আলিকে বললাম, কিন্তু গাছ কি স্বপ্নে তার নিজের আয়ুর কথা জানতে পেরেছিল!

সোভান আলি দাঁড়িয়ে গেল আবার। চারপাশে আধো অন্ধকার। সোভানের গলা নামানো। বলল, মনে হয় জেনেছিল। শেষ ক-বছর মাঝ রাতে গাছ আশ্চয্যি কিছু কথা বলে গেছে। যখন অন্ধকারে মেলায় পিদিম জ্বলত তখন পিরের গলা সে-সব কথা শুনিয়েছে। তবে কেউ তেমন মানে বুঝতে পারেনি।

কী রকম!

যেমন শেষ দিকে পিরের গলায় গাছ বলত, চারপাশ বদলে যাওয়ার কথা। আমরা মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, কী বোঝব সে-সবের! ধান-পাট নদীর চরের কথা বলা হয়ে গেলে গাছ বলত সময়ও নাকি বদলে-বদলে যায়। সময়ের সঙ্গে বদলায় মানুষ। এক সময়ের মানুষ নাকি ফ্যাকাশে হয়ে যায় আরেক সময় পড়লে।

নিজের আয়ুর কথা গাছ কিছু বলেনি!

বলেছে, তবে অন্যভাবে। 

সোভান আলি নিজেই তখন কথা বলে যায়। সে বলে, শেষবার যে পির এল তার অদ্ভুত চেহারা। মাঝ বয়স, কাঁচা পাকা দাড়ি, কালো আলখাল্লায় গোড়ালি পর্যন্ত ঢাকা। ফাল্গুন মাসে মাদারে ফুল এল যখন সেই সময় এক সন্ধেবেলা এসে পৌঁছেছিল সে। তার টানা দু চোখে সুর্মা মাখানো। সে চোখ দেখে সবাই অবাক। ভাবে, এ পির না পেগম্বর! 

...সেবারও সে ধান পেকে ওঠার কথা বলল। আমের বোল আসার কথা শোনাল। তারপর বলল দক্ষিণের নদীতে বাণ আসার হিসেব। তারপর গাছের দেখা আরও কত যে স্বপ্নের কথা শোনাল আমরা তার হদিশ পেলাম না। গাছ স্বপ্নে দেখেছে কোথায় নাকি নদীর মরণ হচ্ছে একটু একটু করে। কোন দেশে নাকি জঙ্গল কেটে সাফ। কোথায় নাকি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে আস্ত পাহাড়।

...শেষ দিন রাতে পির হেঁটে বেড়াচ্ছিল মাদারের গোড়ায়। সেদিন মেলা শেষ। পর দিন সকালে বেরিয়ে যাবে সবাই। দেশের দিকে রওনা হয়ে যাবে। সেই রাতে কয়েকটা মাত্র পিদিম যখন জ্বলছে, বেশিরভাগ মানুষ মাঠে ঘুমনো, পির তখন ডাকতে শুরু করল হঠাৎ। অনেক কাল আগে গাছের সেই ডাক। মাঠের পর মাঠ পার হয়ে যাচ্ছে তার গলার স্বর। পির ডাকছে, নূরজাহান...নূরজাহান...মেলার লোক উঠে পড়ল সবাই। তাদের চোখ আবছায়া গাছের গোড়ায়। পিরের গলার স্বরে হাহাকার। কেবলই ডেকে চলেছে সে, নূরজাহান...নূরজাহান। পিছনে স্বপ্নের গাছ পাথরের মতো দাঁড়ানো।

বিড়বিড় করে একটু কথা বললাম আমি। কী করল নূরজাহান তখন!

সোভান আলি বলে, সে কোথায় যে সে কিছু করবে! সে তো নেই। সে তো দিল্লির ওদিকে। যে লোকটা ওর বাপকে টাকা দিয়ে বিয়ে করে নিয়ে গেল সে তো নূরজাহানকে বেচে দিয়েছিল ওদিকের কোথাও।

তারপর?

তারপর তো আর কিছু নেই। 

...সকাল হতে মেলার লোক ফিরতে শুরু করল যে যার দেশে। গাছের পাতা ঝরছিল একটা দুটো। পির লোকটা হাওয়ার মতো মিলিয়ে গেল কোথাও। ... আর সে-বছরই হিডকো এল, জমি ঘেরা হল, কুড়ুল পড়ল সব গাছের গোড়ায়। স্বপ্ন-দেখা গাছ দড়ি বাঁধা হয়ে চালান হয়ে গেল কাঠ চেরাই কলে। তারপর থেকে এই এখন যেমন দেখতেছেন...

সোভান আলি গল্প শেষ করে হাসল একটু। নমস্কার জানাল। তারপর পা বাড়াল নিজের বাড়ির দিকে।


আমিও ঘরমুখো হলাম।

1 টি মন্তব্য: