শনিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৭

আহমেদ খান হীরকের গল্প : আমরা মানে আমি আর মিজানের বউ

শেষপর্যন্ত আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম যে আমরা ছাদে যাবো।

এরকম একটা সিদ্ধান্তে আসার আগে এটা নিয়ে আমাদের মধ্যে লম্বা সময় কথা হয়েছিলো। প্লাবন বলেছিলো হুট করে এই ধরনের একটা গুরুতর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। ফলে আমরা কিছুদিন সময় দিয়েছিলাম নিজেদেরকে আর ভেবেছিলাম আমরা যা করতে যাচ্ছি তার সত্যি সত্যি প্রয়োজন আছে কিনা! প্লাবন আমাদের বন্ধু ছিলো, বিশেষত আমাদের নাগরিক হয়ে ওঠার দিনগুলোতে প্লাবন ছিলো আমাদের একমাত্র ভরসা।
কারণ তার পিতার একটা ফ্ল্যাটবাড়ি ছিলো। পিতা কোনো এক শক্তিবলে সেই ফ্ল্যাটটার মালিক হয়ে যেতে পেরেছিলেন। ভাড়া না দিতে পারার জন্য আমাদের কাউকে মেস থেকে বের করে দিলে আমরা সোজা সেই ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠতাম। এবং দীর্ঘ সময় সেখানে দিনপাত করতাম।

তখন আমরা মানে ছিলাম আমি ও মিজান আর সৌরভ।

তবে মিজান মারা যায় একটা গুলিতে। সেটা কত তারিখ কী বার ইত্যাদি এখন আর মনে নেই। তবে মিজানের আহত হওয়ার সংবাদ আমরা একটা ক্রিকেট ম্যাচের মধ্যে পাই। তখন কোনো একটা দলের সাথে বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা চলছিলো, আর বাংলাদেশ ব্যাট করছিলো আর আমরা চা-খানায় খেলা দেখতে দেখতে বাংলাদেশ কত পর্যন্ত করতে পারে এরকম ভবিষ্যতবাণী করছিলাম। তখন কেউ একজন এসে জানালো যে মোড়ের ওপর গোলাগুলি হইছে!
আমরা তেমন একটা আশ্চর্য না হয়ে খেলাতেই মনোযোগী হতে চেয়েছিলাম কারণ তখনই একটা চার মেরেছিলো বাংলাদেশের উইকেট কিপার। ফলে যারা কম রানের কথা ভাবছিলো ওই চারের সাথে সাথে তাদের আনুমানিক স্কোর টলে গিয়েছিলো। ফলে উত্তেজনা ছিলো। এর বিপরীতে মোড়ের মধ্যে গোলাগুলি তেমন জোরালো উত্তেজনাকর খবর ছিলো না। কিন্তু খবরদাতার কাছে আরো খবর ছিলো যে ওই গোলাগুলির মধ্যে অফিসফেরত কেউ একজন আহত হয়েছে... তার বুকে বা বাম কাঁধে একটা গুলি লেগেছে। এরকম খবরেও অব্শ্য আমাদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় না। তবে ‘অফিসফেরত’ বলাতে আমাদের মধ্যে একটু দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। কেননা আমরাও বেশিরভাগই অফিসগামী ছিলাম আর আমরা ঘটনাটার সাথে একধরনের সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি। যেন একটা ঝলকের মধ্যে দেখতে পাই পাঁচ-ছয়-সাত-আট-নয়-দশ নাম্বার বাসে করে আমরা ফিরছি যে যার মতো ক্লান্ত শ্রান্ত পিপাসার্ত একে অন্যের কাঁধে পিঠে ঘাড়মাথাগুঁজে আর তখনই বেশ একটা হইহট্টা আর বাসের ব্রেক আর হয়তো কয়েকটা ঢিল আর আমরা তখন যে যাকে পারি মাড়িয়ে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকি। নামতে গিয়ে ভেঙে পড়ি হেলে পড়ি ঢলে পড়ি। আর তখন ফায়ার শুরু হয়। ঠাস ঠাস। আমরা ধরেই নিই এই গুলি আমাদের জন্য না তবু আমরা ভয় পাই তবে মাটিতে শুয়ে যাওয়ার মতো হাস্যকর কাজ আমরা করি না বরং আমরা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকি চিৎকার করতে থাকি। কিন্তু একটা গুলি আমাদের বাম বুকে বা কাঁধে লাগে, লেগে বিস্ফোরিত হয়, নাকি বেরিয়ে যায়?

আমরা তখন জিজ্ঞেস করি যে গুলিটা কী হইছে? যাকে লাগছে তার শরীরেই আছে নাকি বাইর হইছে?

খবরদাতা এটার উত্তর দিতে পারে না বা দেয় না। সেও ততক্ষণে ক্রিকেট দেখতে ব্যস্ত হয়ে যায়। আর অনুমান করতে থাকে তিনশ টপকাবে বাংলাদেশ আর টপকালে আজ জিতবেই জিতবে!

তবে তিনশ টপকাতে পারে না বাংলাদেশ, শেষপর্যন্ত। তখন সবাই কিছুক্ষণ গালাগালি করে একেতাকে। কীভাবে খেললে আরো পিটানো যেতো পিটিয়ে তক্তা বানানো যেতো এগুলো নিয়ে আলোচনা হতে থাকে আর আমরা খণ্ডকালীন সময়ের জন্য মেসে ফিরে আসি আর এসে খেয়াল করি যে মিজান অফিস থেকে তখনও ফেরে নি। যদিও আজ তাড়াতাড়ি ফিরে তার দেশের বাড়ি যাওয়ার কথা ছিলো বা এরকম কিছু। আমরা ঠিক শিওর হতে পারি না। তখন সৌরভ জানায় যে মিজানের নাকি পাত্রী দেখার কথা এইবার গ্রামে গিয়ে! পাত্রীর জন্য হয়তো কিছু কেনাকাটা করছে। এ কারণেই হয়তো তার দেরি।

কিন্তু আমাদের তখন অন্য ভয় হয় যে এইবার গিয়ে পাত্রী পছন্দ করে ফেললে মিজান হয়তো বিয়ে করেই ফিরবে। তখন কি মিজান বউ নিয়ে এই শহরে আসবে? তাহলে কি সে মেস ছেড়ে দেবে? ছেড়ে দিলে আমরা একরকমের বিপদে পড়ে যাবো। কারণ মিজানের চাকরির বেতনটারই বেশ ঠিকঠিকানা ছিলো, মাসের প্রথম সপ্তাহেই পেয়ে যেতো ফলে তারই দায়িত্ব ছিলো আমাদের সবার রুমভাড়াগুলো দিয়ে দেয়ার। মিজান বিয়ে করে বউ নিয়ে অন্যত্র উঠলে প্রতি মাসে প্রথম সপ্তাহে ভাড়া দেয়া নিয়ে আমরা একটা বিপদের মধ্যে পড়ে যাবো। ফলে আমরা চিন্তা করতে থাকি যে মিজানের যেন এবারেও বউ পাত্রী পছন্দ না হয়!

এইটা আনন্দের ব্যাপার হয় যে বাংলাদেশ দুইশ তিরাশি রানেই জিতে যায় ম্যাচটা। আর আমরা তখন কিছুক্ষণ হো হো করি। একটা এক্সট্রা সিগারেট খাই। এবং আনন্দের চূড়ান্তে একটা গ্লাশ ভেঙে তার জরিমানা দিই রহমত মিয়াকে। আর খেলা শেষে জেতার আনন্দের চাইতেও গ্লাশ ভাঙার জরিমানা বাবদ অধিক মনোকষ্ট ও গ্লানি নিয়ে মেসে ফিরে এলে দেখি তখনও মিজান ফেরে নাই। আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে হারামি মেসে না ফিরে অফিস থেকেই সরাসরি গ্রামে চলে গেছে। তখন আমরা খোঁজ নিই তার মিল চালু করা আছে কিনা! মেস ম্যানেজার জানায় মিল চালু করা নাই। তখন আমরা আরো ক্ষিপ্ত হই যে এটা তার প্ল্যানেই ছিলো যে সে চলে যাবে অফিস থেকে সরাসরি কিন্তু আমাদের বলে নাই। বললে কী এমন পেরেশানি হতো তার সেটা নিয়েও আমরা কিছুক্ষণ আলোচনা করি। হয়তো সে ভেবেছিলো আমরা তাকে মিলটা চালু রাখতে বলবো। আর এটা বলাও তো তেমন কোনো অন্যায় ছিলো না। আমাদের কিছুটা খিদার কষ্ট আছে যে পার মিলে আমরা ভাগে সাধারণত যা পাই কিনি আঙুলের সমান একটা হাড় বা রুগ্ন পেয়াজের সমান আলু আর একথাল ভাত তা যথেষ্ট হয় না রাতের খিদায়। তাই আমরা এরওর মিল পেলে খেয়ে নিই গোপনে প্রকাশ্যে। এবং একথা মিজান নিজেও জানে। মিজানও আমাদের সাথে এরকম কতই না খেয়েছে, অথচ নিজের যখন স্যাক্রিফাইজের সময় এলো তখন সে ফুটে গেলো। আসলে মানুষ এমনই হারামি আর হারামি হয়!

কিন্তু ভোরের দিকে আমরা খবর পাই যে মিজান মারা গেছে। থানা বা মেডিকেল বা অন্য কোথাও থেকে একটা ফোন আসে, ফোনে একটা নারীকণ্ঠ কাঁপতে কাঁপতে জানায় যে মিজান মরে গেছে আর আমরা ঘুমের মধ্যে এরকম অদ্ভুত কথা শুনে বোধহীন হয়ে পড়ি। আমরা কোথায় যাবো বুঝতে পারি না, কোথায় গেলে মিজানকে পাওয়া যাবে তাও বুঝতে পারি না, এবং সবচেয়ে অবুঝ জিজ্ঞাসা হয়ে যা আমাদের সামনে আসে তা হলো কে এই নারী যে কিনা আমাদের ফোন দিয়ে জানালো মিজানের মৃত্যু সংবাদ! আমাদের প্রথমে মনে হয় এ বুঝি তার বোন, সেই বোন যে নাকি মরে গিয়েছিলো পানিতে ডুবে, অষ্টআশির বন্যায়। কিন্তু পরক্ষণেই আমরা হেসে উঠি যে শালা মরার খবর শুনে আমাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে... মরা বোন কেনো মরা মানুষের খবর দেবে, কীভাবে দেবে?

তখন আমরা ভাবি যে হতে পারে এই মেয়ে মিজানের চাচাতো ফুপাতো কোনো বোন যার কথা আমরা জানতেও পারি নি এতদিন। এই শহরে যে মিজানের নিজের কেউ আছে তা জানায় নি দেখে মিজানের ওপর আমাদের অভিমান হতে হতে হয় না কারণ আমাদের মনে পড়ে মিজান আর বেঁচে নেই। মিজানের জন্য নাকি নারীকণ্ঠ রহস্য উদ্ধারের জন্য কী জন্য কে জানে আমরা ওই ভোররাতেই মেডিকেলের দিকে রওনা দিই। কেন কে জানে রাস্তায় নেমেই আমরা খুব সাবধানী হয়ে যাই। একটা রিকশাওয়ালা নিজ থেকে আমাদের দিকে এগিয়ে এলে আমাদের হঠাৎ খুব ভয়। আমরা খুব তীক্ষ্ণ চোখে রিকাশাওয়ালার কোমরের দিকে নজর রাখি। একটা বিশেষ জায়গা উঁচু হয়ে থাকতে দেখে আমাদের ভীতি আরো বাড়ে। আমরা কল্পনা করতে থাকি সেখানে একটা পিস্তল আছে। আসল পিস্তল আমরা কখনো দেখি নি তাই আমাদের কল্পনায় সিনেমার খেলনা পিস্তলগুলো আর পিস্তল থেকে বের হওয়া আগুনগুলো ভাসতে থাকে। আর তখনই একটা পটকা ফোটার আওয়াজ হয়। বাংলাদেশে জয়ের রেশ হয়তো ফুরায় নি। কিন্তু এটা বুঝতে আমাদের অনেক সময় লাগে। ফলে চক্ষুলজ্জা উপেক্ষা করে আমরা রাস্তায় শুয়ে পড়ি। রিকশাওয়ালাটা তখন খ্যা খ্যা করে হাসে আর আমাদের তার রিকশায় উঠিয়ে মেডিকেলে নিয়ে যায়। নিহত মিজানকে দেখতে গিয়ে আমরা নিজেরাই যেন আহত হয়ে যাই।

মেয়েটি জানায় যে বাস থেকে নামতেই খুব হল্লা হয়। বাঁশি বাজে। ককটেল ফাটে। আর অনেক মানুষ সবগুলো দিকে দৌড়াতে থাকে। তারা কোনো দিশা পায় না। আমরা তখন মেয়েটিকে বাধা দিই যে তারা বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে! মেয়েটি জানায় সে আর মিজান একসাথেই অফিস থেকে ফিরছিলো আর তারা এক অফিসেই কাজ করে। আর তারা একসাথে মিজানের গ্রামে যাচ্ছিলো!

এ জায়গায় আমরা আবার মেয়েটিকে বাধা দিই আর জানতে চাই যে তারা বলতে মেয়েটি আসলে কী বোঝাচ্ছে!
মেয়েটি তখন কিছুটা ইতস্তত করে, ঘুমিয়ে থাকার মতো মৃত মিজানের দিকে তাকিয়ে জানায় যে তারা আসলে বিয়ে করে ফেলেছিলো আজ কারণ তারা চিন্তা করেছিলো যে তারা একত্রেই থাকবে! কারণ দুই জায়গায় থাকতে তাদের অনেক টাকা ব্যয় হয়ে যাচ্ছিলো! ফলে তারা বিয়ে করে মিজানের গ্রামে যাচ্ছিলো ব্যাপারটা জানিয়ে দিতে যেন মিজানের আর পাত্রী দেখা না হয়। আমরা তখন মেয়েটির দিকে আরেকবার তাকাই যে এটা তাহলে মিজানের বউ! অবশ্য আমরা মিজানের দিকেও তাকাতে পারতাম আর ভাবতে পারতাম মিজান কেনো এসব আমাদের কাছে গোপন রাখতে গেছে কিন্তু এসব ভাবনার আগেই মেয়েটি জানায় যে প্রথমে তার নাকি আমাদের মেসেই ওঠার কথা ছিলো আর সেজন্যই তারা ওই মোড়ে বাস থেকে নেমেছিলো কিন্তু তার আগেই ওই গুলিটা এসে মিজানকে লাগে আর মেয়েটা দিশেহারা মিজানকে নিয়ে যেতে চায় হাসপাতালে কিন্তু কেউ রাজি থাকে না কিন্তু কেউ রাজি থাকে না...
অবশেষে একটা বুড়া রিকশাওয়ালা রাজি হয়। রিকশাওয়ালাটা কোমরের জায়গাটা বেঢপ ফোলা সে হাসতে হাসতে রাজি হয়। সে মেডিকেলে পৌঁছে দেয় তাদের। কিন্তু মিজানকে আর বাঁচানো যায় না। মরার আগে মিজান নাকি আমাদের কথা বলতে পেরেছিলো। মেয়েটি আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছে সে আশাতেই।

'আশা' শুনে আমরা একটু থমকাই যে এখানে আবার নতুন আর কী আশা যখন একটা মানুষ মরে যায়! মৃত মিজানের কোনো আশা থাকতে পারে না। তাহলে কি মেয়েটির আশা? কিন্তু এই মেয়েটিই বা কী আশা করে আমাদের কাছে? কিন্তু আমরা এসব প্রশ্ন করি না। আমরা চুপচাপ মিজানের দিকে তাকিয়ে থাকি। তারপর ভাবি মিজানকে এখন গ্রামে পাঠিয়ে দিতে হবে এটাই হয়তো শেষ কথা, এটাই হয়তো শেষ আশা... আমাদের কাছে এরকম মনে হয়। ফলে আমরা একটা কফিন একটা কাফন ও কিছু চা-পাতার ব্যবস্থা করে ফেলি। একটা শববাহী গাড়িও ঠিক করে ফেলি। এতে আমাদের বেতনের বড় একটা অংশ বেরিয়ে যায়। আমরা মুখে কিছু না বললেও বেতনের বড় অংশ বেরিয়ে যাওয়ায় মিজানের ওপর খুব অসন্তুষ্ট হই। কিন্তু মৃতর ওপর অসন্তুষ্টি প্রকাশের জায়গা থাকে না বলে আমাদের অসোন্তষ গিয়ে মেয়েটির ওপর পড়ে। মেয়েটিকে আমরা নানাভাবে হেনস্থা করার চেষ্টা করতে থাকি। যদিও আমরা কেউ কারো সাথে পরামর্শ করি না তবু আমাদের মধ্যে সচেতন চেষ্টা থাকে মেয়েটিকে, অর্থাৎ মিজানের বউকে, কথায় কথায় চেপে ধরার। কিন্তু মিজানের বউ নিষ্ঠার সাথে হাসপাতালের খরচাখরচ দিতে থাকে, থানাপুলিশও সামলায় আর একটা ছাড়পত্র নিয়ে মিজানকে ওই শববাহীতে উঠিয়ে দেয়। তখন সন্ধ্যা পার হয়ে যাচ্ছে তবু আমরা বিদায় নিয়ে চলে আসতে চাই মিজানের বউয়ের কাছ থেকে। তখন মিজানের বউ মিজানের আশার কথা আবার উত্থাপন করে যে মিজান মৃত্যুশয্যায় আশা করেছিলো মিজান না থাকলেও তার বন্ধুরা তার খেয়াল রাখবে। এরকম আশার কথা শুনে প্রথমে আমাদের একটু অহং হয় বটে কিন্তু পরক্ষণেই নানা দায় ও দায়িত্বের আশঙ্কা বিবেচনায় আমরা অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়ে যাই। মিজানের বউ জানায় মিজানের সাথেই উঠবে বলে সে তার হোস্টেল ছেড়ে এসেছে তাই এখন তার রাত কাটানোর মতো কোনো জায়গা নেই।

আমরা বলতে পারতাম আমাদের মেসে লেডিস এলাও না কিন্তু আমাদের কোথাও একটা অপরিমিত তরঙ্গ ঝিলিক দিয়ে উঠলে মিজানের বউকে নিয়েই আমরা মেসে ফিরি। এবং মিজানের যে ঘর তাতে তাকে থাকতে বলি আর জানাই যে যদিও মেস মালিক এ ব্যাপারে খুবই কড়া তবে আমরা ব্যাপারটা দেখবো আর মেস মালিক এলে আমরা মিজানের প্রসঙ্গ তুলে মিজানের লাশকে বাণিজ্যে নামিয়ে একটা সমাধানে পৌঁছাই যে মিজানের বউ আপাতত এখানেই থাকবে তবে নিয়মমতো মেস মালিককে ভাড়া মিটিয়ে দিতে হবে প্রথম সপ্তাহেই। মিজানের বউ যেহেতু মিজানের অফিসেই চাকরি করতো ফলে আমরা ধারণা করেই নিই যে সে মাসের প্রথম সপ্তাহেই ভাড়া দিতে পারবে; আমরা তাতে একটু ভারমুক্ত হই। কিন্তু মাসের প্রথম সপ্তাহে আমাদের ভাড়ার কী উপায় হবে এ ব্যাপার নিয়ে আমাদের মৌলিক দুশ্চিন্তাটা থেকে যায়।

এভাবে কয়েকটা মাস যখন যায় তখন দেখি ‘আমরা’ কিছুটা বদলে গেছে। আগের আমরায় যতোটা মিজান ছিলো এবারের আমরায় মিজানের বউ আরো জোরালো ভাবে আছে। মিজানের বউয়ের একটা বিকল্প ধরণ আছে। আমরা কোনো সিদ্ধান্ত দিলে মিজানের বউ একটা বিকল্প সিদ্ধান্ত দেয় আর দেখা যায় সে সিদ্ধান্ত মোতাবেকই সব এগিয়ে যাচ্ছে। এক সময় আমরা খেয়াল করি এরকম সিদ্ধান্তগুলো সবচেয়ে বেশি মেনে নিচ্ছে সৌরভ। আমরা তখন একটু চিন্তিত হই যে সৌরভ কি মিজানের স্থলাভিষিক্ত হতে চায়? এটা আমাদের কাছে ভালো লাগে না। সৌরভ যদি মিজান হয়ে যায় তখন মিজানের বউকে আমরা কী ডাকবো এ নিয়েও দ্বিধা হয় আমাদের। ফলে মিজানের বউয়ের দিকে আবার আমরা নতুন দৃষ্টিতে তাকাতে থাকি। আর ভাবতে থাকি নানান সম্ভাবনার কথা। কিন্তু আমাদের সকল সম্ভাবনার মুখে হলুদ আস্তর মাখিয়ে সৌরভ জানায় সে ওমান যাচ্ছে! কারণ দেশে এত খেটেও কোনো লাভ নেই। খালি ঘাম ঝরে, কোনো আয় উন্নতি নাই। আমরা সৌরভের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। কিন্তু এত টাকা সে কীভাবে জোগাড় করলো এটা জানতেও আমরা আগ্রহী হয়ে উঠি। কারণ দেশের বাইরে কাজ করতে যাওয়ার ইচ্ছা আমাদের মনে গভীরভাবে অনেক আগে থেকেই ছিলো কিন্তু আমাদের কোনো জমানো অর্থ ছিলো না যা কাজে লাগিয়ে আমরা স্বর্ণমৃগ কিনতে পারি। ফলে সৌরভের উপায়টা আমরা জানতে চাই। সৌরভ আমাদের আইডল। সৌরভ আমাদের ঈর্ষা। তখন সৌরভ জানায় সোজা পথে সে যাবে না সে সমদ্র পথে যাবে ঘুরে ঘুরে ফলে টাকা কিছু কম লাগবে... কিন্তু কম হলেও তো কম না কম না... তখন জানতে পারি মিজানের বউ তার সঞ্চয় ভেঙে তার জমানো নগদ পচাত্তর হাজার টাকা সৌরভকে দিয়েছে। আমাদের মাথা ঘুরে যায়। এত টাকার মালিক ছিলো মিজানের বউ? তাও কী যে চুপচাপ... কিছুই যায় নি বোঝা... প্রাথমিক এ ঘোর কাটতেই আমাদের মনে যে প্রশ্নটা বাঘের মতো লাফিয়ে পড়ে সেটা হলো- সৌরভকে মিজানের বউ কেন টাকা দেয়? প্রশ্নটা ঘুরতেই থাকে। তখন এই না করা প্রশ্নের জবাব সৌরভ প্রকাশ করে যে তারা ঠিক করেছে তারা এরপর থেকে একটা ঘরেই থাকবে। তারা সেই ঘর দেখেও রেখেছে! আমাদেরই মেসবাড়ির ছাদে চিলেকোঠায় যে সিঙ্গেল ঘরটা আছে মিজানের বউ আর সৌরভ তাতে একসাথে থাকবে। মেস মালিকের সাথে তাদের কথাও পাকা হয়ে গেছে। সৌরভ ওমানে গিয়ে টাকা পাঠালেই মিজানের বউ ওই ঘরে উঠে দেখভাল শুরু করবে। আর তারপর তারা কোনো না কোনো সময়ে একসাথে থাকবে!

এত বড় বড় সিদ্ধান্ত সৌরভ আর মিজানের বউ আমাদের আড়ালে নিয়ে ফেলেছে দেখে আমরা ক্ষুণ্ণ থাকতে পারতাম কিন্তু সৌরভ ছিলো আমাদের অপার সম্ভাবনা তাই তাকে আমরা নানাভাবে উৎসাহ দিতে থাকলাম আর বারবার জানালাম ওমানে পৌঁছে সে যেন আমাদেরও টেনে নেয়ার ব্যবস্থা করে। কারণ দেশে তো কিছু নেই। আমরা মিজানের কথা স্মরণ করি বারবার যে মিজান দেশে ছিলো বলেই গুলি খেয়ে মরলো ওমানে থাকলে এমন কিছুই হতো না। আমাদের যেন গুলি থেকে বাঁচায় সৌরভ, আমাদের জন্যও যেন তার বরাদ্দ থাকে স্বর্ণমৃগ। সৌরভ আমাদের জানাতে থাকলো আমরাই তার ভাই তাই প্রথম দফায় মিজানের বউকে নেয়ার পরই সে আমাদের টেনে নেবে! আমাদের ভাই ভাইয়ের মধ্য আবার মিজানের বউ চলে আসায় আমরা আবারও বিরক্ত হই কিন্তু সৌরভই আমাদের অপার সম্ভাবনা বলে আমাদের চুপ থাকতে হয়। আর একদিন রাতের ট্রেনে সৌরভ সমুদ্রের দিকে রওনা দেয়। আমরা আশা-আশঙ্কায় দুলতে থাকি। আশা করি সৌরভ ভালোমতো ওমানে পৌঁছাবে আর আশঙ্কা করি সে বুঝি অনেক টাকা কামিয়ে আমাদের আর মনে রাখবে না!

কিন্তু আমাদের আশা-আশঙ্কার চেয়েও বড় বড় ঘটনা সমুদ্রে নাকি ঘটে। সৌরভ যাওয়ার এক মাস পর আমরা তাকে চা-খানার টিভিতে দেখতে পাই। সমুদ্রে ভাসা মানুষগুলোকে কোথায় কোথায় নাকি কবর দিয়ে রাখা হয় আর সে কবরগুলো এখন নাকি বেরিয়ে বেরিয়ে আসছে। কবর থেকে মুর্দারা নাকি আজকাল জেগে উঠছে আর বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে চিৎকার করছে! এরকম খবর আসে, কিন্তু এরকম খবরের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপার ঘটে তা আমরা উপভোগ করতে থাকি যে বাংলাদেশ বল করে উড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিপক্ষকে। এমন ভয়ঙ্কর বল সচরাচর দেখা যায় নাই বিশ্বে। এমন ফাটাফাটি আর এরমধ্যে মাঝে মাঝে নাকি শুনি মুর্দারা নৌকা চায়, নৌকায় করে তারা দেশে ফেরত আসতে চায়... ফলে এর মাঝে আমরাও কখনো কখনো অপেক্ষা করি যে সৌরভ হয়তো ফেরত চলে আসবে। মিজানের বউ বারবার দরজার দিকে তাকায়। অফিস থেকে ফিরেই আমাদের ঘরের দিকে উঁকি দেয় আর জিজ্ঞেস করে আমাদের বন্ধু ফিরেছে কিনা... আমরা তেমন কিছুই বলি না বলে মিজানের বউ রাগও করে না কিন্তু তাকে ইদানিং অস্থির দেখায়। এই অস্থিরতার সূত্র আমরা মেলাতে পারি না। প্লাবন জানায় প্রেম হতে পারে আবার টাকাটাও হতে পারে... ওই যে পচাত্তর হাজার টাকা... যদি আর টাকাটা না পায়...

কিন্তু টাকাটা তো পাওয়ার কথা ছিলো না; ছিলো মানুষটাকে পাওয়া। মানুষটাকে পাওয়ার প্রয়োজন ছিলো নিশ্চয় সচ্ছ্বলতা পাওয়া। আমরা সবাই তখন সচ্ছ্বলতার কথা খুব ভাবি যে কী করে একে পাওয়া যায়? আমরা বিভিন্ন জায়গায় আরেকটু বড় চাকরি খুঁজতে থাকি। কিন্তু তেমন কিছুই পাওয়া যায় না। মিজানের বউ বারবার দরজায় এসে দাঁড়ায়। আগে বন্ধুর খোঁজ নিলেও ইদানিং সে আমাদেরই খোঁজ নেয়। আর ওদিকে মেস মালিক এসে বারবার ধমকায় যে ছাদের ঘর সে খালি করে দিয়েছে এখন ওখানে কাউকে না কাউকে উঠতেই হবে! ধমক শুনে মিজানের বউ আরো অস্থির হয়ে যায়। আর একদিন আমাকে জানায় আমরা দুজন দুই রুমে দুই গুণ ভাড়া না গুণে ছাদের ঘরটায় উঠে যেতে পারি কিনা! প্রস্তাবটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় যেন সচ্ছ্বল এভাবেও তো কিছুটা হওয়া যায়। কিন্তু প্লাবন নানান কিছু ভাবতে বলে। বারবার বলে। যেহেতু তার মাথার ওপর পিতার ফ্ল্যাটবাড়ি আছে ফলে তার এসব ভাবতে ভালো লাগে। তার ভাবনা থেকে তাই আমরা কোনো সমাধান পাই না।

আমরা। এই আমরা এতদিনে বদলে যায়। এই আমরা মিজান সৌরভ আর আমি নই। এই আমরা সৌরভ আর আমি নই। এই আমরা এখন আমি আর মিজানের বউ॥







২টি মন্তব্য: