শনিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৭

চিঠির গল্প অথবা একটা নিছক চিঠি

সোমেন বসু

শৈবাল,
গ্যাঞ্জেস রোপ কারখানার নাম শুনেছিস? দড়ি কারখানা। সরকারি। এখন নেই। ছিল এক কালে। সরকারি দড়ি শব্দবন্ধটা কেমন শিহরণ জাগায় না? সরকারি জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা হয় আর, বেয়াদব কি দেশদ্রোহীদের লটকে দেওয়া হয়। তখন তাতে একটা মোমের পরত পড়ে। যাতে যার গলায় বসবে তার একটা মসৃণতার অনুভূতি আসে।
প্রিয়া বা প্রিয়র বাহুডোরের মতো। পলিটিকালি কারেক্ট থাকলাম কিন্তু। খেয়াল করিস বাপু। যাকগে, আসল কথা কই। যে লোকটার গল্প শোনাতে বসেছি তোকে, সে ওই দড়িকলে কাজ করত। অবশ্য গল্পটা যে ওই লোকটারই গল্প, হলফ করে তা বলতে পারি না। লোকটারও হতে পারে, তার বৌয়েরও হতে পারে, বা তার মেয়েরও হতে পারে। আবার আদৌ গল্পই নাও হতে পারে। যাই হোক না কেন বলেই ফেলি। খিস্তিই তো করবি, পুরো পড়ে বা আধা পড়ে। সে করিস।

তা গ্যাঞ্জেস রোপে চাকরি করার সুবাদে লোকটা একটা সরকারি কোয়ার্টার পেয়েছিল। হাওড়া শিবপুর চ্যাটার্জীহাটে। উঁচু পাঁচিল ঘেরা কম্পাউন্ডে হলুদ রঙের চারটে এল শেপের চারতলা বিল্ডিং। এক একেকটা বিল্ডিংয়ে ষোলোটা করে ফ্ল্যাট। হলুদ রঙটা যে ঠিক কিসের তা আর দূর থেকে ভালো ঠাহর হয় না। কাছে গিয়ে হাত লাগালে যদি তোর হাতের চেটো পীতরোগের চিহ্ন বহন করে, বুঝবি ওটা চামড়া। আর যদি হাতে গুঁড়ো গুঁড়ো বালির দানা লেগে যায় ঝুরঝুর করে কিছু পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে, বুঝবি তুই চর্মভেদ করতে পেরেছিস। সামনেই রাস্তা। বাস যাওয়ার উপযুক্ত না হলেও দুটো রুটের বাস যায়। এখানে এসে দাঁড়ায় নাতির দোকানের সামনে। কোয়ার্টারের জং ধরা লোহার গেটটার উল্টোদিকে। দাঁড়ালে রাস্তার দিকে মুখ করা বিল্ডিংটার দুই, তিন কি চারতলার ব্যালকনি থেকে মেয়েবউরা 'এইইই বেঁধেএএএ' বলে হাঁক পাড়ে। যার যখন দরকার আর কি। আর তারপর ধীরেসুস্থে ষোলো, বত্রিশ কি আটচল্লিশটা সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসে বিল্ডিংয়ের সামনে অলস লেপ্টে পড়ে থাকা শানবাঁধানো চত্বরে। তাতে কদম, ছাতিমের কিছু শুকনো পাতা, ইতিউতি কাক পায়রার শুকনো ও তাজা গু, কোণে কোণে শ্যাওলার সবুজাভা। ওরা চত্বর পেরোয়, পেরোতে পেরোতে অন্য ফ্ল্যাটের কাউকে দেখা গেলে দু-একটা খেজুর করে, লোহার গেট পেরোয়, রাস্তা পেরোয় এবং বাসে ওঠে। বাস তখন জগৎসংসারের ওপর অভিশাপ দিতে দিতে যাবতীয় অনিচ্ছা নিয়ে গ্যার গ্যার শব্দ করে স্থিতাবস্থা ভাঙে। সেই গ্যারগ্যারানির চটকে সামনের লেডিস সিটের জানালার ধারে বসে যে পৃথুলা মহিলাটি দু'স্টপ আগের টার্মিনাস থেকে উঠে হাঁ করে ঘুমোচ্ছিল তার চোখ দুটো খুলে যায়। এবং আবার বন্ধ হয়। ঠোঁট দুটো বন্ধ হয়। এবং আবার খুলবে আস্তে আস্তে। ঠোঁট বন্ধ হওয়ার আগে অবশ্য জিভটা বেরোয়। শুকনো হয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো একটু হাল্কা করে চেটে আবার ঢুকে যায়।

শৈবাল, নাতির দোকানটা খেয়াল করলি? তোদের বাড়ি যখন প্রথম গেছিলাম, সেই কলেজ জীবনে, তখন জেঠুর তেলেভাজা খাইয়েছিলি। বলেছিলি, ইনি তোরও জেঠু, তোর বাবারও জেঠু। চেহারাটাও মনে আছে। গোলগাল, টাক, অমায়িক হাসি, বয়স পঞ্চাশ থেকে সত্তরের মধ্যে যা কিছু একটা। এই নাতির সাথে তার চেহারায় কোনও মিলই নেই। মিল আছে আসল জায়গাটায়। এও সবার নাতি। আবালবৃদ্ধবণিতার। একদম বালকরা হয়তো চোখলজ্জার খাতিরে নাতিদা বলে বড়জোর। কিন্তু হ্যাঁ রে, তোদের সেই জেঠু আছেন এখনও? আর কেউ? জেঠু-নাতি-মামারা? কাকু থাকতে পারে, এটা কমন বেশি, কিন্তু তাও বোধহয় রাম-শ্যাম কারও লেজুড় হয়ে থাকবে। কিন্তু নাতিদাদুরা একটা সময়কে সাথে নিয়ে হারিয়েই গেল? আমি কতদিন কোনও নাতি দেখি না!

যা বলছিলাম। সেই দু'কামরার ফ্ল্যাট, একটা মোটা বউ আর চারটে ছেলেমেয়ে নিয়ে লোকটার চলে যাচ্ছিল খারাপ না। চার ছেলেমেয়ে বলতে তিন ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটি দ্বিতীয়। বড় ছেলে ছোটটির থেকে পনেরো বছরের বড়। সে চলত সে সময়। আর চলা বলতে কারখানা-বাড়ি, ইতুপুজো-অরন্ধন-কালীপুজোর দিন অলক্ষীবিদায়-- ঘটি বাড়ি, বুঝতেই পারছিস, আর অবরেসবরে পার্বতী-যোগমায়া-শ্যামাশ্রীতে বাংলা সিনেমা। যেমন পৃথিবী চলে। নিজের হেলানো অক্ষের ওপর চব্বিশ ঘণ্টায় একপাক। কিন্তু মানুষ যেহেতু পৃথিবী নয়, তাই তার নিয়মানুবর্তিতাও মানুষের কাছে আশা করা যায় না। লোকটা নিজের একটা ঠ্যাং খুইয়ে ফেলল। কারখানায়, ডান পা, গোড়ালির ওপর থেকে। বগলে ক্রাচ আসল, কিন্তু চাকরিটা গেল না। সেটা গেল আর কিছুদিন পর, যখন কালের নিয়মে গ্যাঞ্জেস রোপ চোখ বুজল। হ্যাঁ রে, 'কালের নিয়ম' বললাম, শুনলি তো? কেন বললাম, সে সব বলব না। তবে বুঝেশুনেই বলেছি। দে দে, খিস্তি দে...!

তবে এটা না বললেও তুই যে ইতিমধ্যেই খিস্তোতে শুরু করেছিস সে দিব্যি টের পাচ্ছি। শুনতে চেয়েছিলি চিঠির গল্প, আর আমি কীসব সাতকাহন ফেঁদে বসেছি! কিন্তু চিঠির গল্প বলা যায় তুই বল? আমাদের ছেলেবেলায় মাঠজাতীয় কোনও খোলা জায়গায় সন্ধের মুখে মাথার ওপর কেমন মশার স্তম্ভ তৈরি হত তোর মনে আছে? এখনও হয় নিশ্চয়ই, আমাদেরই খোলা জায়গাগুলো হারিয়ে গেছে। তোর এই চিঠির গল্প লিখতে বলার পর আমারও মাথার ওপর অমন একটা ভনভনে স্তম্ভ তৈরি হল। শয়ে শয়ে পোস্টকার্ড, ইনল্যান্ড লেটার, খাম। সব আগাপাশতলা লেখা। এবং সবার পেছনে গোটা একেকটা গল্প। তাও তো এ খালি সেই সব চিঠির কথা বললাম যাদের খাকি হাফশার্ট ফুলপ্যান্ট আর কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নেওয়া মানুষগুলো বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যেত। বলতেই মনে পড়ে গেল শৈবাল, আমি কতদিন পিওনও দেখি না রে! যাই হোক, আর সেই চিঠিগুলো যাদের গায়ে পোস্টাপিসের গোল সিলমোহরটা পড়ত না? সেই তোর মালবিকাকে লেখা চিঠিগুলোর মতো অজস্র চিঠিগুলো? জানিস, এই হাতে হাতে দেওয়া চিঠিগুলো আমাদের দেশের এক বিপুল বিপ্লবী সম্ভাবনাকে ধাক্কা দেওয়ার পেছনে একটা বড় ভূমিকা রেখে গেছিল! না রে ভাই! এই বিপুল মহাকাব্য লেখা আমার কম্মো নয়! তুই বরং এই লোকটার গল্পই শোন, যার আপাতত কারখানাটা বন্ধ হয়ে গেছে...।

ঠ্যাং কাটা পড়ে লোকটার চাকরি যায়নি। আর চাকরি গিয়েও কোয়ার্টার গেল না। এই কোয়ার্টারগুলো যায় না জানিসই তো। সাবলেট হয়। কোনও অভাবী গৃহহীন আত্মীয়কে দান করে চিরকাল তার চোখে ভগবানের স্ট্যাটাস উপভোগ করা যায়। কিন্তু যায় না। কারণ সরকার বাহাদুরের দয়ার শরীর! এ নিয়ম কলকাতার পুরনো ভাড়াটেদের ক্ষেত্রেও খাটে। সে বাড়ির মালিকদেরও দয়ার শরীর।

চাকরি যাওয়ার পর লোকটা প্রথম ঠিক করল মেয়েটাকে পার করতে হবে। আঠারো-উনিশ বয়স হয়েছে। আর কত? মেয়েসন্তান বলে কথা। বেকার মায়া বাড়িয়ে লাভ কী! আর এই পার করা তো আর বললেই করা যায় না। ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই ব্যয় করার সামর্থ্য থাকতে থাকতেই ব্যাপারটা চুকিয়ে দেওয়া ভালো। অবশ্য এই বুদ্ধিটা যে কতটা লোকটার আর কতটা তার মোটা বউটার, সে নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। লোকটাকে আমি যদ্দুর জানি, সাদাসিধে খরুচে গোছের। খেতে খাওয়াতে ভালোবাসে। তখনও বাঙালী মধ্যবিত্ত বিলাস বলতে পেট পুরে খাওয়াই বুঝত। এই লোকটাই যেমন আর একটু বুড়ো হলে নাতিনাতনিদের কাছে গল্প বলবে কেমন করে তার উত্তর কলকাত্তাইয়া বাপ রাতবিরেতে তার কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে এক হাঁড়ি গরম রসগোল্লার সামনে বসিয়ে বলত, 'নে খা...'! আর সেও খেতে থাকত আধোঘুম আধোজাগরণে নরম গরম রসগোল্লা। ফলে এ ধরনের বৈষয়িক বুদ্ধি লোকটার ঠিক স্বভাবোচিত নয়। অন্যদিকে, বৌটাও ঠিক শরীরোচিত স্বভাবের নয়। উত্তর কলকাতার কোনও এক যৌথ পরিবারের গৃহিণী হয়ে থাকার কথা ছিল যার, সে যে আজ এই হাওড়ায় এই দু'কামরার সরকারী ফ্ল্যাটে, এর পেছনে নানারকম ঝড়ঝাপটার গল্প আছে। আর সেসব মোকাবিলা করে সে এখন বেশ পোড়খাওয়া। কিন্তু ময়রা বলতেই যেমন একটা ভুঁড়িওয়ালা লোকের ছবি ভেসে ওঠে, পোড়খাওয়া মানুষের ছবিটাও তেমনই ক্ষয়াটে হয়। আর বৌটা মোটাসোটা। তা সে যাক, বুদ্ধি যারই হোক, মেয়েটা যে পার হবে এবার সেটা নিশ্চিত। এই যৎসামান্য মাইনের মধ্যেও বৌটা টুকটুক করে যা কিছু জমিয়েছে, তার একটা সদগতি কাম্য। জানিসই তো, টাকা তরল পদার্থবিশেষ, অর্থনীতির বইতে লেখা আছে।

এবার একটা নতুন ক্যারেকটার আনা যাক গল্পে, কী বল? হুঁ, লক্ষ্মী ঘোষ, ব্রিটিশ কোম্পানিতে কলম পিষে কলকাতার উত্তর শহরতলিতে একটা দোতলা বাড়ি বানিয়ে জাতে উঠেছে। শহরতলি বলছি বটে, কিন্তু যে সময় লক্ষ্মী ঘোষ বাড়িটা বানিয়েছিল তখন তো বটেই, আমাদের গল্পের সময়েও সে একেবারে শেয়াল ডাকা মফস্বল। এবার ঘটনাচক্রে এই লক্ষ্মী ঘোষ আমাদের গল্পটায় ছেলের বাপ, যে ভুলেই গেছে যে বাড়িটা বানানোর আগে অব্ধি সে ভবানীপুরে ভাড়াবাড়িতে থাকত। এখন সে উন্নীত এবং গর্বিত বাড়িওয়ালা। পূর্ববঙ্গীয় সামন্ত বদরক্তের প্রভাব। এমন হতে পারে জানিস, ঐ ভাড়াবাড়ির যাপনের সময়টায় সে ভাবত এটা আসলে সে নয়, অন্য কেউ, সে কেবল অভিনয় করছে। নইলে তার মতো অমুক জেলার অমুক গাঁয়ের অমুক জমিদারের ব্যাটা এই ভাড়াবাড়িতে আর কীই বা করতে পারে! এমনিতে জাতগর্বের ঘোষণাও ছিল যথেষ্ট। লোকে ভুল বুঝতে পারে এই আশঙ্কায় কোনও অপরিচিতের আলাপচারিতায় লক্ষ্মী ঘোষ অবধারিত জানান দিত যে তারা কিন্তু গয়লা ঘোষ নয়, কায়েত ঘোষ। যে সে কায়েতও নয়, ঘোষ-বোস-গুহ-মিত্তিরের কুলীন কায়েত গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এবং লক্ষ্মী ঘোষ নিষ্ঠার সঙ্গে আজীবন ব্রিটিশ প্রভুদের তাঁবেদারি করে কৌলীন্য রক্ষা করেছে। লক্ষ্মী ঘোষ মনে করত ব্রিটিশরা চলে গিয়ে ভারতের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। বাড়ি ছাড়া লোকটার জীবনে যে আর দুটো গর্বের সম্পত্তি ছিল সেগুলো হল একটা রুপোর গ্লাস আর একটা কাশ্মীরী শাল। বিয়েতে পাওয়া একটা সেগুনকাঠের আলমারিতে ন্যাপথালিন দিয়ে রাখা থাকত ও দুটো। লোকজন আসলে পরম যত্নে দেখানো হত। রিটায়ারমেন্টের সময়কার প্রাপ্তি। অপার প্রভুভক্তির শুভ্র নিদর্শন।

এহেন লক্ষ্মী ঘোষ বিয়ের পাকা কথা বলতে এল একাই। ছেলে নাবালক, তার হবু বৌয়ের থেকে মাত্র বছর বারোর বড়, এই সবে তিরিশ পেরিয়ে একত্রিশে পা দিয়েছে। আর বৌ তো মেয়েমানুষ! হ্যাঁ, মেয়ে তার পছন্দ, আর তার কোনও দাবীদাওয়াও নেই, কারণ সে কুলীন। তবে হ্যাঁ, পাড়ায় তার একটা সম্মান রয়েছে, কারণ তার একটা দোতলা বাড়ি রয়েছে। তাই মেয়ে যাওয়ার পর পাড়ার লোকেরা যেন না বলে, লক্ষ্মী ঘোষ ভিখিরির ঘর থেকে মেয়ে নিয়ে এসেছে!

কথাটা শুনলি শৈবাল? সাংসারিক কথাবার্তার একটা আলাদা জঁর আছে জানিস? নিজস্ব ধরন, গঠন, এমনকি ভাষাও। তোর কি এটা আয়ত্ত? আমার তো একদমই নয়। তাই আমি খালি মুগ্ধই হই। কূটনৈতিক ভাষ্যের মতো এ ভাষারও আলাদা করে শিক্ষা নিতে হয়।

এখন কে আর ভিখিরি পরিচয়ে পরিচিত হতে চায় বল! তাই লোকটা সাধ্যের অতিরিক্ত গিয়েও মেয়েটাকে পার করল লক্ষ্মী ঘোষের দোতলা বাড়িতে। মেয়েটা আসল। নিজের উনিশটা বসন্ত, কিছু কিশোরীবেলার স্বপ্ন, হয়তো বা কিছু চিঠি, কিছু মুগ্ধদৃষ্টি, মাবাবাদাদাভাই, এগারো বছরের ছোট ছোটভাইটা যাকে সেই মূলত লালন করত, সেই সব গুরুত্বহীন জিনিসগুলো পেছনে ফেলে। আর এসে প্রথম যেটা তার উপলব্ধি হল সেটা হল এটা বাড়ি নয়, ফোঁড়া। লক্ষ্মী ঘোষের তো বটেই, তার ছেলেরও। জিন যাবে কই! সে ফোঁড়ার নাম গুমোর। আর সে একদম পাকা টুসটুসে ফোঁড়া। একটু চাপ পড়লেই, বা সম্ভাবনা তৈরি হলেই, বা বাস্তব সম্ভাবনাও নয়, স্রেফ তাদের মনে সে সম্ভাবনার উদয় হলেই, যেটা বেশ ঘনঘনই ঘটে, গলগল করে পুঁজ বেরোতে থাকে, দুর্গন্ধময়। একদম পাভলভের কুকুরটার মতো। যাদের বাড়ি নেই, তারা মানুষ নয়। যারা মানুষ নয়, তারা এ বাড়িতে অবাঞ্ছিত। কারণ অভাবে লোভ, লোভে পাপ। বাড়ির অভাবে বাড়ির লোভ, বাড়ির লোভে বাড়ি হাতানোর পাপচিন্তা। নাঃ, শুনে নাও বাছা, সরকারী কোয়ার্টারে ভিখিরির মতো দিনযাপন করা মানুষজন যেন এ বাড়ির দিক না মাড়ায়। মেয়েটা বুঝল, পাকা দেখার সময় ব্যবহৃত ভিখিরি শব্দটা নেহাত রূপক ছিল না।

মেয়েটা সমস্যায় পড়ল। না, বাপ মা আসতে না পারাটা সমস্যা হলেও সেটা সমাধানের কোনও রাস্তাই আপাতত তার হাতে ছিল না। তাই সেটা সমস্যা নয়। সেই ফিজিক্সে আমরা এত ক্ষুদ্র তাই নগণ্য পড়তাম মনে আছে? এটা এত বৃহৎ তাই নগণ্য। মেয়েটার আশু সমস্যা হয়ে দাঁড়াল তার স্বভাবের একটা দোষ। সে কথা বলতে ভালোবাসে। আর এ বাড়িতে কেউ কথা বলে না। বর-শ্বশুর স্ব স্ব প্রয়োজনগুলি বুঝে নেয়, সময়ে অসময়ে মারধোরও করে, কিন্তু কথা বলে না। শাশুড়ি আবার বইমুখো। সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়ে। মাঝেমাঝে উঠে হামানদিস্তায় পান ছেঁচে খায়। আবার বই নিয়ে শুয়ে পড়ে। কথা বলে না। তুই বলতে পারিস, এটা ভালোই। কারণ যে কথা বলে না, সে স্বাভাবিকভাবেই ঝগড়াও করে না। ঠিকই। ভবিষ্যতে মেয়েটা হয়তো রোমন্থন করতেও পারে, যে শাশুড়ি-বৌয়ের যে অমোঘ রসায়ন সেই রাবীন্দ্রিক যুগ কি তারও আগে থেকে আজকের এই সিরিয়াল যুগ অব্ধি বহমান, তাকে সেই রসায়নাগারের ঝাঁঝ পোয়াতে হয়নি। কিন্তু সে তো ভবিষ্যতের কথা, বল। সাধারণ মানুষ মুখ্যত বর্তমান নিয়ে বাঁচে, এবং সেই বর্তমানে মেয়েটার দম আটকে আসে। বাড়ির একতলায় ভাড়াটে ছিল। তিন ভাই, দুই বৌ, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে একটা আস্ত পরিবার। কিন্তু তারা ভাড়াটে। অতএব বাক্যালাপ নিষিদ্ধ। শুধু ভাড়া দিয়ে আয় করা যেতে পারে। মেয়েটা কী করত জানিস? নিচে যখন সেই বৌগুলোকে দেখতে পেত, এদিকে ওপরেও আশেপাশে কেউ নেই, তখন ওদের গায়ে জল ছুঁড়ত। ওরা চমকে ওপরে তাকালে ইশারা-ইঙ্গিতে দু'চারটে কথা! কিন্তু তাতে আর কাঁহাতক মন ভরে! অগত্যা ইংল্যালেটার।

হ্যাঁ রে, মেয়েটা এটাই বলত। তার মা বলত। আরও অনেকেই বলত। স্বল্পশিক্ষিত মানুষজন তো! তুই শুনিসনি কথাটা? অবশ্য ইনল্যান্ড লেটার কার্ডগুলোর তাতে কোনও আপত্তি ছিল বলে মনে হয় না। সে খুব ভালো করেই জানত, এরাই তার ওই যাকে বলে ফ্যান বেস। সাদা পাতায় চিঠি লিখে খামে ভরে পাঠানোটা ছিল হয় অফিসিয়াল নয় লেখাপড়ার জগতের লোকেদের দস্তুর। এই লেখাপড়ার জগতটা কিন্তু ইম্পর্ট্যান্ট। খাতা ডায়েরি থাকত না তো সবার কাছে। কিন্তু চিঠি সবাই লিখত। বাজারে বসা ফুলউলি মাসি, মুদি দোকানের শম্ভুদা, এই মেয়েটা, তার মোটা মা'টা-- সব্বাই। পোস্টকার্ডে লেখা যেত, কিন্তু সে বড় ল্যাংটা, জায়গাও কম, ওদিকে কথাও তো গুচ্ছের। তাই উচ্চবিত্ত খাম আর নিম্নবিত্ত পোস্টকার্ডের মাঝে ইনল্যান্ড লেটারই ছিল মধ্যবিত্তের কাছে বড় ঘরোয়া, বড় আপন, বারোমাস্যা আলুর মতো।

আচ্ছা, তুই কী জানিস শৈবাল দুপুরের এই অলস চরিত্রটা সার্বজনীন কিনা? বাংলার দুপুরগুলো যে আলসে হয় সে আমি জানি। গ্রামগঞ্জে তো বটেই, শহরেও। কলকারখানা বা অফিসকাছারির ভেতরে কি বড় রাস্তার ধারে তাও একরকম। কিন্তু দুপুর যতই তার লম্বা গলা বাড়িয়ে পাড়ার ভেতর ঢুকতে থাকে তত তার গা ম্যাজম্যাজ করে। একটু গড়িয়ে নিতে সাধ হয়। আচ্ছা এই ভাতঘুম, দিবানিদ্রা শব্দগুলো কি অন্য ভাষাতেও আছে? মেয়েটারও তখন একটু গড়ানোর আকুলতা। সেই ভোর থেকে দিনগত পাপক্ষয় চলে তো! কিন্তু এটাই তো তার সময় এবং সুযোগ। মায়ের সাথে একটু কথা বলার।

উপুড় হয়ে শুত মেয়েটা। বুকের তলায় বালিশটা ঢুকিয়ে। সামনে একটা শারদীয় প্রসাদ বা নবকল্লোল বন্ধ করা। ওদের ভূমিকা পাটাতনের। সেই পাটাতনের ওপরে একটা আসমানরঙা ইংল্যালেটার। ডান হাতে কলম। সে চলছে খসখস। আসমান রঙের ওপর অক্ষরের ছবি ফুটছে, একটু বাঁয়ে হেলানো আটপৌরে ধাঁচের অক্ষর, তা থেকে শব্দ তৈরি হচ্ছে, শব্দ থেকে লাইন। লাইন জমতে জমতে পাতা ফুরোচ্ছে। তখন ১৯৭৬-৭৭ সাল শৈবাল। জরুরি অবস্থার ঘোর কাটিয়ে উঠছে গোটা দেশ। কেন্দ্রে প্রথম অকংগ্রেসি সরকার। মেয়েটা লিখছে ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠার সময় তার বড্ড গাহাতপা টনটন করে। রাজ্যে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার আসছে। সিদ্ধার্থ রায়ের আমল শেষ হচ্ছে। যে আমল পরে 'বাহাত্তর-সাতাত্তর' নামে কুখ্যাত হবে এবং বামফ্রন্ট সরকার সেটা চৌত্রিশ বছর ধরে ভাঙিয়ে খাবে। এবং পরেরজনকে ভাঙানোর জন্য এই 'চৌত্রিশ বছর' শব্দবন্ধটাই দিয়ে যাবে। মেয়েটা লিখছে ভিখিরি শব্দটা শুনতে শুনতে তার কান পচে গেছে। কিছুদিন পরেই লোকদেখানো ভূমিসংস্কার শুরু হবে। কারণ বাংলার আনাচকানাচ থেকে তখনও তাজা লাশ আর পোড়া বারুদের গন্ধ বেরোচ্ছে। মেয়েটা লিখছে সেদিন তার বর তার জন্য একজোড়া জুতো কিনে এনেছে অফিস থেকে ফেরার সময়। আগেরদিন বিকেলে চা দিতে পনেরো মিনিট দেরি হয়েছিল বলে তার শ্বশুর তাকে একটা চড় মেরে ঠোঁট থেকে রক্ত বের করে দিয়েছিল। মেয়েটা রাতে বরের কাছে কান্নাকাটি করেছিল। বর তার প্রাত্যাহিক চাহিদা বুঝে নেওয়ার পর বলেছিল বাবাকে সে কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু পরেরদিন জুতো কিনে এনেছে। এই তো আমাদের দেশের দস্তুর শৈবাল। বাহ্যিক আর অন্তঃপুরের রাজনীতির সমান্তরাল সম্পর্ক। চায়ের দোকান বা লোকাল ট্রেনের কামরা থেকে বেডরুমের দূরত্বটা সবসময় মেনটেন করা হয় যথোচিত মর্যাদার সাথে যদি না কোনও বেয়াড়া অনুপ্রবেশ ঘটে।

সেই ইনল্যান্ড লেটারগুলো দু'তিনটে পোস্টাপিসের ছাপ গায়ে নিয়ে এসে পৌঁছত মেয়েটার মায়ের হাতে। সে পড়ত, কাঁদত, নীরবে, তারপর আদর করে অক্ষরগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে চোখের জল মোছাত মেয়ের। একটাই তো মেয়ে, কতই বা বয়স। একটু মাথায় হাতও বুলিয়ে দিত সেই আকাশী কাগজটায় হাত বুলিয়ে। তারপর নিজে একটা ফাঁকা ইংল্যালেটারে শুরু করত খসখস। অক্ষর, লাইন, কথা। সে কথা উপচিয়ে পড়ত তিনটে পাতা ভরাট হয়ে সরু ফোল্ডগুলোর মধ্যে। সব চিঠি যে হাতে পৌঁছত, এমনও নয়। অনেকেই হারিয়ে যেত মাঝরাস্তায়। হয়তো বা কোনও লেটার বক্সের আঁধারে, বা পিওনের হাত থেকে অযাচিত বেরিয়ে রাস্তার ধুলোয়। তোর নিশ্চয়ই মনে থাকবে, সেই সময়ের সব চিঠিতেই তাই "আশা করি তোমরা সবাই ভালো আছ..."-র পরেই অনিবার্যভাবে আসত "তোমার চিঠি পেয়েছি।" সেই ফর্মগুলো মনে আছে? "পত্রের প্রথমেই আমাদের কুশল নিও...।" সেই সম্বোধনগুলো? চরম বিরাগপূর্ণ চিঠিও শুরু হত পূজনীয়, শ্রীচরণেষু বা আরও একটু এগিয়ে শ্রীচরণকমলেষু দিয়ে। আর নিচের দিকে নামলে স্নেহের, স্নেহাস্পদেষু...! তোর, আমার মতো যারা তার একটু পরে পরে চিঠি লেখা শুরু করব, তাদের আর এই নিচের সম্বোধনগুলো আর ব্যবহার করার সৌভাগ্য হবে না। জানি না তোর সুযোগ হয়েছে নাকি, আমার তো হয়নি। শব্দগুলোই হারিয়ে গেল। স্পর্শগুলোর মতোই। মেয়েটার মায়ের মোটা মোটা আঙুলের যে স্পর্শগুলো অক্ষরগুলোকে সান্ত্বনা দিত। মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে, চুলে বিলি কেটে, চোখের জল মুছিয়ে। হরফগুলো ক্রমাগত তার ঝাপসা চোখের সামনে ভাঙতে ভাঙতে তৈরি করত তার আত্মজার নরম কপাল, টলটলে অশ্রুবিন্দু। বুড়ো হয়ে গেলাম রে শৈবাল। যুগান্ত হয়ে গেল চোখের সামনে। স্পর্শ বলতে মোবাইলের টাচস্ক্রীন বুঝতে শিখে গেলাম, হরফ বলতে হরফের ছবি, পোস্টাপিস বলতে গঙ্গাজলের দোকান, ঊষা কারখানা বলতে সাউথ সিটি...।

যাক, তোকে যে গল্পটা বলছিলাম সে প্লটটা এতই ক্লিশে যে ও আর এগোনোর মানে হয় না। শেষটা বরং তুই নিজের মতো ভেবে নিস, সেই ভালো। আমি বরং একটা ক্লু দিই। সেদিন 'শেষ চিঠি' বলে একটা গল্প পড়ছিলাম। কার লেখা এক্ষুণি মনে পড়ছে না। অকৃতদার, অন্তর্মুখী নায়কের নেশা কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথ থেকে পুরনো বই কেনা। আর সেই সব বইয়ের মধ্যে সে মাঝেমাঝেই হাতে লেখা চিঠি পেয়ে যায়। নানা মানুষের লেখা, নানা মানুষকে, অপ্রেরিত। এরকম করেই একদিন এক মহিলার লেখা একটা ব্যক্তিগত চিঠি হাতে চলে আসে তার। আর মাথায় নানান চিন্তার আবর্ত তৈরি হয়। শেষমেশ সে নিজেও একটা চিঠি লেখে আর রেখে আসে সেই ফুটপাথে কোনও একটা পুরনো বইয়ের ফাঁকে, চুপিচুপি, কোনও অজানা মানুষের উদ্দেশে। তোর অভ্যাস আছে বইপাড়ায় পুরনো বই ঘাঁটার? থাকলে পুরনো শারদীয়া নবকল্লোল বা প্রসাদের পাতাগুলো একটু উলটে দেখতে পারিস।

তবে তুই তো কবি মানুষ, জাদুবাস্তবতা ভালোবাসিস। হয়তো মেয়েটাকে ঝুলিয়ে দিলি, একটা আসমানরঙা শাড়ি পরিয়ে, যে শাড়ির গায়ে নকশার মতো অজস্র খুদি খুদি অক্ষর, লাইন, জমিয়ে রাখা কথা! দেখলে বিভ্রম লাগবে যে একটা ইন... ইংল্যালেটারই ঝুলে রয়েছে বুঝি!

তবে মেয়েটাকে যদি ঝোলাসই, সেক্ষেত্রে দড়িটা সরকারী কিনা একবার চেক করে নিতে হবে...

ভালো থাকিস... উত্তর দিস...

ঋজু
৬ই মার্চ, ২০১৭

২টি মন্তব্য: