শনিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৭

বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্যের গল্প : আলোর মানুষ

কলকাতা থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত এই গ্রাম। কখনও গ্রামটির অবস্থান বদলে যায়। কখনও গ্রামটি নিজের জায়গায় থাকেও না। থাকলে, হাওড়া থেকে ট্রেনে উঠলে ঘন্টা দুয়েক বাদে তার প্রকৃতি মাঠ-ক্ষেত-জলাজমি নিয়ে চৌকো করে ভেসে ওঠে জানলায়। ট্রেনের বাবুরা খবরের কাগজ পড়তে পড়তে হঠাৎ মুখ তুলে দেখেন, মাঠে মাচান করে চাষ হচ্ছে শশার। সেই শশার মাচানের
সাদা-সবুজ লাইন টানা জালি সামান্য বক্ররেখা হয়ে অনেক দূরের ঘিয়ে রঙের আকাশের ভিতর ভুস করে মিশে গেল। ডেলি-প্যাসেঞ্জার বাবুদের কেউ কেউ অবাক হন।

গতকাল তো এসব দেখিনি!
গ্রামটির শেষপ্রান্তে রয়েছে একটি খাল। চরা পড়তে পড়তে তা আয়তনে অর্ধেক হয়ে গিয়ে এক বড়ো মাপের পুকুরের আকার নিয়েছে এখন। খালটির নাম- মরাডুবি। বহুদিন ধরে পরিত্যক্ত। খালের চারপাশটিও পরিত্যক্ত বহুদিন ধরেই। কাঁটাঝোপ, বাঁশবন, বনঝাল গাছের জঙ্গলে প্রায় ঢাকা পড়ে গিয়েছে এই জায়গা। গ্রামের কেউই এদিকটা আসে না। পরপর কয়েক বছর গ্রামের বেশ কয়েকজন আত্মহত্যা করে এই খালের জলে ডুবে। তার থেকে ওই নাম। দিকে দিকে রটি গেল ক্রমে, জায়গাটা ভালো না। কয়েকটি মৃত্যু থেকে উদ্ভূত এক সত্যতম আতঙ্ক বরফে ঢাকা মরা মাছের চোখ হয়ে পিনের মতো গিঁথে থাকে এলাকার মানুষের বুকে। তারা আর আসে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও অনেক আগে তৈরি এই খালটি পড়ে থাকে। শীত যায়, বসন্ত যায়, গ্রীষ্ম যায় ... একমাত্র অদ্ভুত বর্ষা এলে তার রূপ যায় ভিজে। সেই ভিজে খাল এবং তার চারদিকের কাঁটাঝোপের দাম্পত্যের মাঝে ধূসর শূন্যতা থেকে তখন উঠে এসে দাঁড়ায় ব্রহ্মময়ী।

অল্প বাতাসে একটা বড়ো কলাগাছের পাতা তার বুক দেখাচ্ছিল। পিঠ দেখাচ্ছিল। তা দেখতে দেখতেই ভাদ্রের এক লম্বা বেলার শেষে খালের সামনের এই ঝোপের পাশে দাঁড়িয়ে গোটা শরীর নিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠল সাইমন কর। মরাডুবির একমাত্র বাসিন্দা এই মানুষটি। ইদানীং, বিকেলের এই সময়টায় প্রায় প্রতিদিনই ঝাঁঝিয়ে ওঠা একরকম অভ্যাসে পরিণত হয়েছে তার। সে ঝাঁঝিয়ে উঠল- মাগি! তোর পেটে লাথি মারব এবার! আবার এসেছিস!

কাঁটাঝোপের থেকে একটু দূরে এক বহু পুরনো বাতাবি লেবু গাছ তার ডাল-পাতা নিয়ে ঝুঁকে পড়েছে খালের জলে। আকাশ থেকে কুচো রোদ বাতাবি গাছের ডালপালায় পড়ে নীচের মাটিতে আলোছায়ার জাফরি করে ফেলেছে। খালের এই এরিয়ায় পৃথিবী তার শেষ রঙটুকু পাঠিয়ে দিচ্ছিল তখন। তার মধ্যে দিয়েই এক-পা দু-পা করে পিছিয়ে যাচ্ছিল মাঝারি সাইজের কালোপানা এক মহিলা। এর উদ্দেশেই কথাটা বলেছে সাইমন। পিছিয়ে যাচ্ছিল সে। হঠাৎ থেমে গেল। কোথা থেকে এক হাসি তুলে এনে সটান বসিয়ে দিল ঠোঁটের ডগায়। লাল ছোপ লাগা দাঁত তারপর বেরিয়ে গেল তার। সামনের দিকের দুটো নেই। সে হাসতে আরম্ভ করল। বিকট এবং বিরক্তিকর সেই হাসি। এরকম হাসি আজকাল উঠে গেছে। প্রথমে মনে হল, ভিড় বাসে সিট না পেয়ে হাই তুলছে। তারপর মনে হল, পেটের একটু উপর থেকে ঘরঘর ঘরঘর করে উঠে আসা অসীম বলশালি কোনও কাশির দমক সামলানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে। হাসিটা শেষহওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে মনে হল, কত লক্ষ বছর যেন সে জলই খায়নি...

হাসিটা পুরোপুরি শেষ করতে পারল না সে। সাইমন আচমকাই তার মাথা লক্ষ করে একটা ঢিল ছুড়ে মেরেছে। ঢিলটা ছুড়ল বটে, তবে তা লাগল না। মাথায় লাগার আগেই মহিলাটি বসে পড়েছে। কাপড় পরে আছে একটা। কয়েক জায়গায় তা ফাটা। চুলে অনেকদিন তেল না পড়ায় তা রুক্ষ, লালচে। হাসিটা থেমেছে তার। সেই জায়গায় ডুবডুব করছে রাগ ও কান্নামিশ্রিত এক ঘোল। মারবি না একদম! বকমকে দে। এদিকেই এসেচিল ও। আমি পোষ্কার দেকলাম... এই এক কথা সে বলে চলেছে। আজ
নিয়ে বোধহয় অনেকগুলো দিন হল। গ্রামের লোক এই মহিলাটিকে 'একাই পাগলি' বলে ডাকে।

আসেনি! বললাম তো! আবার ঝাঁঝিয়ে উঠল সাইমন। আসলেও আমি দেখিনি! দেখলে কেটে ফেলতুম!

দে না আমায়! তোর কি কোনও কেতি করেছি বল! আমাকে দি দে। আর একানে আসব নে। একাই বলে।

তুই যা! মাথাখারাপ মেয়েছেলে শালা! এক কথা রোজ রোজ বলবি না!

হারামজাদা! তোর বাপের মাতাকারাপ! আমার জিনিস আমায় দিবি নে কেন?!

বললাম তো আসেনি! আসলে মেরে ফেলতাম!

মারার কতা বলবি নে! মুকে লাতি মারব!

আমার জায়গায় এসে আমাকে লাথি মারবি তুই! মুখপুড়ি খানকি!

আচমকা বুক চাপড়াতে আরম্ভ করে একাই। তার হাতদুটো তখন সিমেন্টের চাঙর।
বুকে তা জোরে জোরে এসে পড়ায় স্পষ্ট শোনা যেতে থাকে একঘেয়ে 'ধুপধুপ' শব্দ। - ওরে আমার বকমরে খ্যা নিল রে! মাতা গুড়িয়ে, কান মুড়িয়ে, নাড়ি-ভুড়ি বের করে খ্যা নিল রে! ল্যাজাটাও বাদ দেয়নি কেস্টান
রাক্কসটা! ওলুদ দিয়ে, প্যাঁজ দিয়ে, লাল-লাল ঝোল করে খ্যা নিল রে!

তুই বসে বসে চিল্লা! আরো জোরে চিল্লা!

এই কথায় একাই পাগলির গলাটা নরম হয়ে আসে। তার কথার ভিতরে খালের বাতাস ঢুকে গিয়ে ফিসফিসের মতো শোনায় তখন- নে চল না রে! ওই ছাইমন! বকমের কাচে নে চল না রে আমায়!

তুই মর মাগি! বলতে বলতে খালের জলে পা ডুবিয়ে ফেলে সাইমন। সন্ধে হয়ে এল। জল এখন ঠান্ডা। কালো জল। তা ঠেলে ও দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গেল। ওখানে ওর ভেলাটা বাঁধা রয়েছে। ওই ভেলায় চড়ে এরপর খালের মাঝামাঝি চলে যাবে সে। জায়গাটায় বাঁশের ওপর বসানো ছোট কুঁড়েঘর। ওখানেই সে থাকে। ভিতরে মাটির মেঝে। খালের পাশের চর থেকে ঢেলা মাটি নিয়ে এসে সেই মাটি খালের জল দিয়ে পায়ে মাড়িয়ে জাব করে মেঝে করেছে। ঘরের ভিতর একটা যিশুর ছবি। দেওয়াল থেকে ঝুলতে ঝুলতে তিনি ওকে দেখেন। পরিত্যক্ত জলের ওপর পরিত্যক্ত মানুষ।

------------------------------------
বকম হল একাইয়ের খরগোশ। কবে থেকে তা একাইয়ের সঙ্গে রয়েছে এবং কবে থেকে একাই বকমের সঙ্গে রয়েছে, তা জানা যায় না। তাদের একসঙ্গে দেখা যায় কেবল। তাদের একসঙ্গে দেখা যায় সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তে। একসঙ্গে দেখা যায় ধানক্ষেতে, রেললাইনে, বড়ো পুকুরের ধারে, কোনও গাছের ওপর, গ্রামেরই কারও বাড়ির দাওয়ায়। কেউ হয়তো দুটো ডালভাজা করে ডাক দিল- একাই খেয়ে যা। একাই আর বকম তখন ওখানে গিয়ে বসল। সেও খাবে। বকমও খাবে। দুটো আলাদা বাটি। নুন ছড়িয়ে দুজনে ডালভাজা খাবে তারা। খেয়েদেয়ে তারা চলে যায়। কোনও কোনও উন্মাদ রাত্রে অচেনা পশু দলবেঁধে জলপানে আসে। তারা সবাই স্থলশৃঙ্গজগতে ফিরে যেতে পারে না। একটি-দুটি বা তিনটি-চারটি- একেকসময় একেকরকম, নিষ্প্রাণ পড়ে থাকে ওই দুজনের পাশেই। তাদের মধ্যেই শুয়ে থাকে একাই এবং বকম। খুব বেশি পরিবর্তন হয় না তাদের অবস্থানের। হয়তো, পরনের ছেঁড়া কাপড়টি আরো একটু ছিঁড়ে গেল, জনহীন জন্মদ্বার খোলা রইল এবং তারা একটু পাশ ফিরে সরে গিয়ে শুল। এটুকুই। মহাশূন্যে ঘুরতে ঘুরতে একদিন হঠাৎ ইচ্ছেমতো ছিটকে গিয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে পড়া গাছেদের নৈশসঙ্গীতের ভিতর ঘুমিয়ে রইল তারা...

এই বকমকেই একাই খুঁজে পাচ্ছে না। আজ নিয়ে তা হয়ে গেল বহুদিন।
-------------------------------------

নিজের ঘরে বসে নাক খুঁটতে থাকে সাইমন। এই জায়গায় গ্রামের কেউ আসে না। তাতে ভালোই হয়েছে। এতদিন থাকার পর তার মনে হয়- এই বনঝাল গাছের জঙ্গল, এই কাঁটাঝোপ, এই বুড়ো বুড়ো গাছ, খালের পাশের এই খোলা লম্বা চরটুকু নিয়ে জায়গাটি ভালো। পাখি উড়ে উড়ে যায়। গাছের ফুল দুলতে দুলতে নেমে আসে পালকের মতো। খালের জল থেকে বাঁশ পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে সাপ উঠে এসে শুয়ে থাকে ঘরের দরজার সামনে। কখনও ঘরেই চলে আসে। ঘরে তো একটাই চাটাই। সেখানে তখন সে আর সাপ একসঙ্গে শুয়ে থাকে। 'হ্যাট হ্যাট' করে বেশি  লাভ হয় না, দেখেছে সাইমন। ওদের চটাতে নেই। ইচ্ছে হলে চলে যাবে।

এই পৃথিবীর সমস্তটাই বড়ো রহস্যময়। অনন্ত খালের জলের ওপর পড়ে থাকা দুপুর বা বিকেলের আলো কিংবা রাতের আঁধার ভেদ করে কান্নার শব্দও এখন তেমনভাবে এসে পৌঁছয় না সাইমনের কানে। খালের ওপর থাকলে ওর কানটা ওরকম হয়ে যায়। সে এক অমোঘ শব্দহীনতা! এই শব্দহীনতাকে কখনও কখনও তার অস্বস্তিকর কলের গানের মতো লাগে। প্রাচীন পাহাড় ধ্বসে
পড়ার যে অস্থির বজ্র ব্যাপার, রাতের ঝিঁঝিঁ ডাকের যে ঘুম এসে যাওয়ার মতো ক্যাকফনি, প্রমত্ত সমুদ্রের দেহের গূঢ় রহস্যের ভেতর টিকে থাকা নদীতে ঢল ঢুকে পড়ার যে উত্তাল অমোঘ কান্ড, এই শব্দহীনতার বীজ বিদীর্ণ করে ফেটে ছিঁড়ে বেরোনো শব্দ যেন তার থেকেও অনেক অনেক বেশি। এর মধ্যেই ওর বেঁচে থাকা। কেউ আসে না এদিকে আর। প্রকৃতি এখানে প্রসন্ন হয়ে ঢেলে দিচ্ছে সবকিছু। সূর্য নিয়ম করে আলো দিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। ওর পেচ্ছাপ-পায়খানা খালের জলে মিশে মাছের খাবার হয়ে যাচ্ছে। সবটাই বড়ো সুন্দর। এর মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে এই পাগলিটা রোজ চেঁচামেচি করে করে এই সুন্দর ব্যাপারের গোড়া ধরে নাড়িয়ে দিচ্ছে একদম! কী যে চায়, কে জানে!

একটা বিড়ি ধরিয়ে সাইমন ছোট বাটিতে জল নিয়ে এগিয়ে যায় যিশুর ছবির দিকে। অল্প করে জল ঢালে বাঁধানো ছবিতে। ও যিশুবাবা, খেয়ে নাও। জেলা-সদরে গিয়ে এখন মুটে মজুরের কাজ করে সে। বাংলা মদটা সদর থেকেই কেনে। স্টিলের ছোট গ্লাস আছে দুটো। সেখানে ঢেলে ঢেলে খায়। জল নেয় না। ওতে বাংলার গুণ নষ্ট। ওভাবে ঢেলে চারটে খাওয়ার পরই ওর ঢুকে পড়া গালদুটো মাংস মাংস হয়ে গিয়ে থুতনির কাছে ঝুলে পড়ে। এরকম অবস্থাতেই দেওয়ালে বাঁধানো ছবিটাতে জল ঢালছিল সে। সেই সময়ই একাইয়ের মুখটা মনে পড়ল...

তখন বর্ষাকাল। ভারি ঝড়, ভারি জল। মেঘগর্জন আর বৃষ্টিপাতের এক দিনে, প্রবল ঝোড়ো হাওয়া আর বিদ্যুৎ ঝলকানির মধ্যে গ্রামের লোক দেখল রেললাইনের ধারে কাদামাখা হয়ে এক নারীদেহ পড়ে আছে। জ্ঞান তার ছিল না তখন। সেই নারীর শরীরের নীচের দিকের অংশে চোখ পড়লে সত্যদর্শনের মতো রোমাঞ্চ হয়।

গ্রামের মোড়লের বউ তার নাম রাখল- একাদশী। ওই দিনেই রেললাইনের ধার থেকে পাওয়া গিয়েছিল তাকে। সে কোথা থেকে এসেছে তা বলতে পারে না। মোড়লের বাড়িতে ছিল কয়েকদিন। আহ! 'মোড়ল' নয়, ওই জায়গায় 'পঞ্চায়েত প্রধান' হবে। পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ি কয়েকদিন না মাস ছিল এই মেয়েমানুষটি। তারপর একদিন দেখা গেল, গ্রামের খোলা মাঠে ছাগলশাবকের মতো সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এলোমেলো কথা বলে চলেছে। গাছ দেখে সে বলছে- কেন তা আকাশে নেই। আকাশ দেখে বলছে- এত রোদ পায়, তবু কেন তাতে ফল ধরে না। 'একাদশী' থেকে সহজ কাটাছেঁড়া 'একা'। সেখান থেকেই 'একাই'। 'একার' হতে পারত। 'একাও' হতে পারত। কেন হয়নি, কেউ জানে না।

সাইমন আবার একটা বিড়ি জ্বালায়। গালে কাঁচাপাকা দাড়ি। মোটা সাদা ভুরুর ছায়ায় জেগে আছে দুটো চোখ। দপ করে জ্বলে। দপ করে নেভে। কেউ দেখতে পায় না। ও বাইরে আসে। কুঁড়েঘরটির বাইরে। আজ কি অমাবস্যা? কী কালো! ওর ঘরের লম্প ছাড়া আর কোথাও আলো নেই। খালের জলে একটা কীসের নড়াচড়ার শব্দ পেল এই সময়। ইদানীং খুব পাচ্ছে। বাবলা গাছের দুটো মোটা গুঁড়ি দিয়ে একটা ঘাটলা মতো করে রেখেছে ও। মাঝেমাঝে মনে হয় ঘাটলাটা তার নিজের জায়গা থেকে ওর এই ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। এখান থেকে লাফ দিলেই ও মাটি পেয়ে যাবে। ও বেশি উৎসাহ দেখায় না। কত কী আছে পৃথিবীতে! ওর জানার বাইরে সে সব।

এই জলেই পারুল একদিন বেলাবেলি ডুবে মরেছিল। ওর বউ। দু'দিন বাদে যখন ভেসে উঠল, তখন চেনা যায় না। ফাঁপা খোলটি পুরো। সুন্দর জায়গাগুলো খালের নীচে থাকা শাল-বোয়ালেরা যত্ন করে খেয়ে গর্ত করে রেখেছে। পারুলের সঙ্গে যখন বিয়ে হয়, তখন ও ছিল ভাগচাষি। আটার সের আট
আনা। কাছের মফসসলে গেলে খবর পায়, সব বদলে যাবে এবার। দেওয়ালে পোস্টার পড়ে। পুরোটা দেখেশুনে ঘরে এসে দাওয়ায় বসে ধামাতে করে মুড়ি-তরকারি খেতে খেতে বসে সে ভেবে গিয়েছে কিছু জায়গা হবে তার। বড়ো করে পুকুর কাটবে। নারকোল বাগান হবে। বাড়িতে ফিরলে দুটো কচি ডাব কেটে আলাদা করে রাখবে বউ। আহা! কত খেটে এসেছে মানুষটা! খাক! বড়ো বুক ছিল পারুলের। যে চাষির জমিতে চাষ করত সাইমন, ফলন ভালো হওয়ায় সে একবার সব চাষিকে ছোট টর্চ উপহার দিল। সেই ছোটো টর্চ জ্বালিয়ে মাঝেমাঝে পারুলের সুতির ব্লাউজের মধ্যে ঢুকিয়ে দিত সাইমন। প্রথম প্রথম লজ্জা পেয়ে যেত পারুল। এ কী করছ! বাচ্চাকাচ্চা হয়নি ওদের। ভরা বুকে
আলো। একটু সয়ে গেলে পর আহ্লাদী! বিড়ি খেতে খেতে দেখত সাইমন- বউ বুকে আলো নিয়ে ঘরে পায়চারি করছে। ওর ভালোলাগত দেখতে ব্যাপারটা। সাক্ষাৎ দেবী!

পারুল মারা গেল। এতদিনের বউ মরে গেল সাইমনের। কয়েকদিন একা একা তারপর ঘুরে বেড়ালো সে। গ্রামের লোকের সঙ্গে আর বেশি কথা বলে না। গ্রামের লোক বলার চেষ্টা করে। তারা কারণটা জানতে চায়। সে বলে না। চাষ করা ছেড়ে দিয়ে সদরে গিয়ে মুটেগিরি করতে আরম্ভ করল। এর মধ্যেই একদিন সোজা পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ি হাজির। আমি খালের ওপর ঘর বানিয়ে থাকতে চাই বাবু। না করবেন না। কথাটা বলে সে দাঁড়িয়ে রইল ঘরের মেঝের ওপর টান হয়ে। পরনে তেল হয়ে যাওয়া বুকখোলা ফতুয়া এবং হাঁটু পর্যন্ত তোলা লুঙ্গি। পায়ের ডিমে শক্ত ঠান্ডা মাংস হয়ে লেগে আছে ইতিহাস। ওখানে মশা কামড়াতে আসলে তার দাঁত ভেঙে যাবে। পঞ্চায়েত প্রধান অল্পকথার মানুষ। সাইমনকে বহুদিন ধরে চেনেন। শুধু জিজ্ঞাসা করলেন- ওখানে তো আর কেউ যায় না রে। পারবি?

- পারব।

রাত হয়েছে। ঘরের বাইরে টাঙানো নারকোল দড়িতে নিজের দুটো ফতুয়া মেলে দিয়েছিল। খালের হাওয়ায় শুকিয়ে যাবে। একটা ফতুয়া তুলে নিয়ে তার শুকনো জায়গাগুলোতে জ্বলন্ত বিড়িটা চেপে ধরল। এক-এক জায়গায় একটু করে চেপে ধরে, তারপর সরিয়ে নেয়। এভাবে চলল কিছুক্ষণ। ফতুয়ায় তখন বিভিন্ন মাপের গর্ত। তার একটায় চোখ রাখতেই সাইমন একদম ধাঁ! পারুল তাকিয়ে আছে
সেখান দিয়ে ওর দিকে। দৃষ্টিটা করুণ। বয়সটা ধরে রেখেছে। খোঁপাটা ভেঙে বাঁ-কাঁধের উপর উলের বল হয়ে গড়িয়ে গিয়েছে। চুলে লালচে ভাব। কতদিন স্নান করে না? তার পরেরটায় দাদুকে দেখতে পেল। ঘরের ভেতর দুটো পা ছড়িয়ে আগুনে খানিকটা পুড়ে যাওয়া আহতের মতো ছটফট করতে করতে চিৎকার করে যাচ্ছে- পোভু আমার বিচিটা ঠিক করে দাও! দাও গো! ও পোভু। হার্নিয়া হয়েছিল। দাদুর শতাব্দী পেরনো শরীরে ক্লাস ফাইভের ছেলের মুন্ডু লাগানো। তার পরেরটায় পেল শেকুলকাঁটার ঝোপে বসে থাকা একাই পাগলিকে। এই পাগলি কতগুলো দিন ধরে সাইমনের মাথা খেয়ে নিচ্ছে... রোজ ভোরভোর কাজে বেরিয়ে পড়ে ও। বিকেলের মধ্যে খাল পেরিয়ে, মাঠ পেরিয়ে, মানুষ পেরিয়ে এখানে ফিরে আসে। তারপর খালের সামনে দাঁড়িয়ে দেখে খালের মাঝখানে ভাসতে থাকা ওর ঘরটাকে। সূর্য ডুবে যাবে একটু পরেই। অনেকটা গুড় দেওয়া পায়েসের মতো এখন আকাশের রং। দেখলেই খিদে পেয়ে যায়... ছোট একটি গ্রহ, যার ডাকনাম- কমলালেবু। তার ভিতরেই এই খাল-বিল-মানুষ-সাইমন। কমলালেবুটি ঘুরতে থাকে। কমে আসতে থাকে তার আলো। এক মায়াবি নিশি এই সময়টা তার শরীরের ভিতর জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কোনটা তার বাড়ি, কোনটা তার ঘর, কোনটা গাছের পালক, কোনটা পাখির পাতা- এই সময় গুলিয়ে যায় পুরোটাই। চোখের ভিতর তখন ক্রমাগত বনবন করতে থাকে একটি চাকা। তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে আরো একটি চোখ। চোখের ভিতর থেকে অজস্র চাকা এবং চাকার ভিতর থেকে অসংখ্য চোখকে তারপর বেরিয়ে আসতে দেখে সে। মনে হয়, পিছনদিকে কেউ যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। সাঁতার না-জানা মানব সলিলসমাধির আগে যেমন একটিবার হাতটি তুলে ধরার চেষ্টা করে কোনও কঠিনতমকে স্পর্শের আশায়, মাটিতে দাঁড়িয়ে সেইভাবেই হাতটা তখন সামনের দিকে বাড়িয়ে দেয় সে। সূর্যাস্তের দিকে বাড়িয়ে দেয়। প্রতিটি সূর্যাস্তের আগে খালের জলের সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে সাইমন। সেই বিকেলে এই বিপুল ঘোরলাগা বিষাদচুক্কির ওপর একটা ঢিল এসে পড়ল সহসা।

চমক ভাঙলে শুনতে পেল কথা।
- এই হারামজাদা! এতক্ষণ ধরে চেঁচাচ্চি! শুনতে পাচ্চিস না!

প্রথমে বুঝতে পারেনি। তারপর দেখল একাই দাঁড়িয়ে আছে ওর থেকে একটু দূরে।

- বকম তো একানে আসল। এদিকে দৌড়ে আসল। পষ্ট দেকলাম। কোথায় লুকিয়ে রেকেচিস ওকে?

সাইমনের কথা বলতে ভালোলাগছে না। ও এখন প্রশান্তির প্রসেসের মধ্যে রয়েছে। ওর ভালো লাগছে না, তবু ধীরে ধীরে বলল- আমি দেখিনি। আমি জানি না।

- মিত্যে কতা বলবি না! আমি পোষ্কার দেখলাম এদিকে আসল! কোতায় লুকিয়েচিস!

- জানি না। বললাম তো।

- মিত্যে কতা বলবি না! এদিকে আসল পোষ্কার দেকলাম। তুই চুরি করেচিস তা'লে।

সাইমন এই খরগোশটাকে একাইয়ের সঙ্গে অনেকবার দেখেছে। একসঙ্গে দুজন। সুন্দর ব্যাপার। ওর মনে হল বলে- শান্ত হ, একাই। এত চেঁচামেচি করিস না... কিন্তু বলল অন্য কথা- খানকি মাগি! আমার জায়গায় এসে আমাকে চোর বলছিস! আমি নিইনি তোর খরগোশ! নিলেও কেটে খেয়ে ফেলতুম। তোকে দিতুম না!

বাকি কথা গল্পের শুরুর দিকে সংলাপের সঙ্গে প্রায় হুবহু এক। একাই চেঁচাতে থাকে- ওরে আমার বকম রে খ্যা নিল রে! মাতা গুড়িয়ে, কান মুড়িয়ে, নাড়ি-ভুঁড়ি বের করে খ্যা নিল রে! ল্যাজাটাও বাদ দেয়নি খেস্টান রাক্কসটা! ওলুদ দিয়ে, প্যাঁজ দিয়ে, লাল-লাল ঝোল করে খ্যা নিল রে! ... তারপর একসময় কন্ঠস্বরকে মিহি করার চেষ্টা করে সে- নে চল না রে! ওই ছাইমন! বকমের কাচে নে চল না রে আমায়...

রাত গেল।

পরদিন ভোরভোর কাজে বেরোনোর সময় একাইকে দেখতে পেল না সাইমন। ও এখন সদরে যাবে।
এই সময়টা একাই থাকে না। তবে বেলাবেলি আবার এই ঝোপের ধারে চলে আসবে। কাজ
থেকে ফিরে আসার সময় ওকে দেখতে পেলেই ঘ্যানঘ্যান শুরু করবে। আজও করল। তবে ও আর কোনও উত্তর দিল না। শরীরটা জুতে নেই। এই ক'দিনের মধ্যে এই প্রথমবার সাইমন কোনও উত্তর দিল না। একাই নিজের মতো কথা বলে চলল।

সন্ধে নামে।

ঘরে এসে চাটাইয়ে শুয়ে থাকে সাইমন। দেওয়াল থেকে যিশু ঝুলতে ঝুলতে ওকে দেখছেন। ঘন্টাখানেক এভাবে কাটার পর আঁধার যখন আরো গভীর হয়, খালের জলে শব্দ শোনা যায়। অন্যান্য দিনের মতোই। আজ এই শব্দটা এগিয়ে আসতে থাকে। কার আত্মা যেন এই অন্ধকার জলের মধ্যে দিয়ে রঙিন জলপোকাদের টেনে আনছে। ঘাটলাটি কি তবে সত্যিই নিজে থেকে এগিয়ে আসছে আজ? কেন আসছে? ভাবতে ভাবতে চাটাইয়ে উঠে বসে সাইমন। বাইরে এসে অবাক হয়ে যায়। তুই! ভেজা গা নিয়ে বাঁশ বেয়ে ততক্ষণে উঠে এসেছে একাই। শরীরটা ন্যাতা হয়ে গিয়ে অন্যরকম লাগছে। একটু চুপ করে থেকে ও বলে, ক'দিন ধরেই চেষ্টা করচি। খানিকটা সাঁতরে আবার ভয় খেয়ে ফিরে যাই! আলো নেই তো! কিচু দেখা যায় না... কথা বলতে বলতে ভেজা গা নিয়েই চাটাইয়ে উঠে পড়ে সে...

সবদিক খোলা ঠোঁটের মধ্যে তারপর খানিকক্ষণ থাকে দুই পরিত্যক্ত মানুষ। দরজা পুরনো, জানলা পুরনো, বাঁশ পুরনো, গন্ধ পুরনো। তার ভিতরেই ডুবে যেতে যেতে অনেক অনেক বছর বাদে যেন ভেসে উঠল কথাটা- আমায় ছাইমনের কাচে নে চল না রে বকম... ভঙ্গিটা আদুরে।

চেনা ভাষ্যের এরূপ বাঁকবদলে প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেল অপর মানুষটি। তারপর ময়লা ন্যাকড়ার মতো কোঁচকানো চামড়ায় ঝুলে থাকা স্তনটিতে খরগোশের দাঁতের দাগ টের পেতে পেতে ফিসফিস করে বলল- তোর বুকে একটু আলো দরকার একাই। আঁধার লাগে বড্ড । একটু আলোর দরকার।

নির্বোধ লতার মতো একটি রাত্রি তাদের নিঃশ্বাস বেয়ে তারপর ক্রমে উপরে উঠছিল...

৩টি মন্তব্য: