বুধবার, ১৭ মে, ২০১৭

বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্যের গল্প : ইজিচেয়ার

রাস্তার ধারে বসে লোকটি একমনে সিগারেট টানছিল৷ রাস্তাটি ফাঁকা৷ যতদূর দেখা যায় , ততদূর পর্যন্ত একটি মানুষও চোখে পড়ে না৷ সম্ভবত , বহু দিন এই রাস্তায় কোনও মানুষ আসেনি৷ একটি সাইকেলও নয়৷ দীর্ঘকাল ধরে তৃন্তিহীন লণ্ডভণ্ড চালানোর পর অপার নিঃসঙ্গতা ধুলো বেয়ে নেমে চলে এসেছে যেন এখানে৷ এই রাস্তাটিতে৷ পিচের রাস্তা৷ তকতকে৷ মৃত্যু ফিরে গিয়েছে বোধ হয় এই রাস্তা দিয়ে৷ কেবল , মৃতেরা আর ফেরেনি৷ একটানা ঘন্টা বাজানোর শব্দ কোথা থেকে ছিঁড়ে এসে রাস্তাটিতে পড়ছিল এই একটু আগে পর্যন্ত৷

এখন রয়েছে তার অস্পষ্ট স্খলিত স্বরের প্রতিধ্বনি৷ লোকটি টেনে যাচ্ছিল সিগারেট৷ দেশি ব্র্যান্ড৷ মাথায় অল্প চুল … মানুষ না দেখতে পাওয়া গেলেও এখানে গাছ আছে৷ রাস্তার দু’পাশ দিয়ে টানা বসানো মাঝারি মাপের গাছ৷ মহাকাব্যের পাতার পূর্বদিক থেকে নেমে পশ্চিমে মিশে গিয়েছে তারা৷ গাছগুলোর পেটের কাছে বড়ো কাপড় জড়িয়ে তাতে সংখ্যা লেখা৷ এই সময়টা তারা এমনিতে পাতা ঝরিয়ে উলঙ্গ৷ কিন্ত্ত পেটের কাছের ওই কাপড় তাদের মধ্যে এনে দিয়েছে নববধূর অনুভূতি -কোলাজ৷ এখন বসন্তকাল৷ বেলাবেলির রোদ আকাশ থেকে ঝট করে নেমে তাদের কয়েকটির মাথায় সিঁদুর হয়ে লেগে রইল …

৩৩২ থেকে ৩৩৪ নম্বর গাছের মধ্যে ব্যবধান দশ মিটারের৷ তার মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটিতে বসেই সিগারেট টানছিল লোকটা৷ বসেছিল একটি ইজিচেয়ারে৷ দীর্ঘক্ষণ ধরে বসে আছে সে এখানে৷ তার ব্যাপারে বলতে গেলে এই মুহূর্তে শুধু একটিমাত্র কথাই বলা চলে --- রোজ সকালে উঠে সংস্কৃত ভাষায় লেখা একটি জরুরি পুস্তকের দিকে তাকিয়ে দশবার জোরে জোরে হেসে সে বাথরুমে যায়৷ পনেরো মিনিট সেখানে থাকে৷ ফাগুনঝরা বীভত্স স্তব্ধ নির্জন আকাশের তলায় ইজিচেয়ারে বসে সিগারেট খেতে খেতে লোকটির চোখের সামনে যা কিছু, তা ক্রমশ সত্য ও সমগ্র হয়ে উঠে পাক খেয়ে যাচ্ছিল 

রাস্তার দু’পাশে মাঠ৷ ফসল তুলে নেওয়ার পরে মাঠটির এদিক ওদিক বিচ্ছিরিভাবে ফুটোফাটা৷ কোথাও গর্তগুলি হয়ে গিয়েছে জিজ্ঞাসা চিহ্নের মতো৷ কোথাও হয়ে গিয়েছে লম্বা ড্যাশের মতো৷ হঠাত্ দেখলে মনে হয় , কোনও বাচ্চা ছেলে অঙ্ক করতে করতে বন্ধুদের ডাকে খাতা ফেলে রেখে খেলতে পালিয়েছে৷ মাঠটির শেষে একটি পুকুর ছিল কোনও একদিন৷ তার ঘাটে দাঁড়িয়ে লোকজন ডলে ডলে গায়ের ময়লা তুলে ফেলত৷ সেই পুকুরটি এখন শুকনো৷ তা যে কখনও ছিল এখানে , বর্ষায় উপচে পড়ে ভাসিয়ে দিত মাঠটিকে , তা কিছুতেই টের পাওয়া যাবে না আর৷ শুকিয়ে যাওয়া পুকুরটির থেকে খানিকটা দূরে কয়েকটি গাছ দিগন্তের কাছে স্থির হয়ে ঝুলছে৷ এই রঙহীন অবয়বহীন স্থানে দেখার মতো জিনিস বলতে খালি একটিই --- ইজিচেয়ারটা৷ যেটা থেকে আমরা খানিকটা দূরে সরে এসেছি এখন৷ আবার হাঁটতে হাঁটতে ফিরে যাব৷ গেলাম৷ ইজিচেয়ারটিতে বসে লোকটি এখনও টেনে যাচ্ছে সিগারেট৷ ভয়ঙ্কর থ্যাবড়াভাবে বিভিন্ন রং লেগে আছে চেয়ারটির গায়ে৷ সম্পূর্ণ চেয়ারটিই রঙে ভর্তি৷

ভায়োলেট , ইন্ডিগো , রেড , ব্লু, ইয়েলো , অরেঞ্জ , পিঙ্ক , অলিভ , মেরুন , ব্ল্যাক --- কী নেই ! কোটি কোটি জীবন থেকে অনেকটা করে আলো শুষে নিয়ে তৈরি হয়েছে যেন এইসব রং৷ একজন সাধারণ মানুষ যতগুলো রং কল্পনা করতে পারে , তার থেকে একটি বেশি রং রয়ে গিয়েছে এই চেয়ারে৷ একইসঙ্গে সৃষ্টি করেছে অফুরন্ত সৌন্দর্য এবং বেখাপ্পা ভয়াবহতা৷ সিগারেট শেষ করে লোকটি উঠে দাঁড়াল৷ চেয়ারটি দোল খাচ্ছে এখন৷ একবার৷ দু’বার৷ তিনবার৷ মাঝারি চেহারার প্যান্ট -শার্ট পরা লোকটি এই সময় জোরে একটি লাথি মারল চেয়ারটিতে৷ রাস্তার পাশের মাঠটির আদিম অনিঃশেষ আয়োজনের খাঁজ থেকে একখানা বেঢপ ইঁদুর বেরিয়ে এসেছিল তখন৷ ইজিচেয়ারটি ডিগবাজি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল৷ একটুর জন্য চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছে ইঁদুরটা৷ খাবারের খোঁজে এ মাথা সে মাথা করতে করতে একটা সাদা কাপড়ের ছেঁড়া টুকরো পেয়ে গেল৷ তা দাঁত দিয়ে কাটতে কাটতে তারপর দেখতে পেল --- এতক্ষণ এখানে যে লোকটি বসেছিল , মাথায় লেগে থাকা পাখির গু পরিষ্কার করতে করতে এই রাস্তা ধরে সে এখন পশ্চিমদিকে চলে যাচ্ছে …



৷ ২৷

--- দাদা৷

--- হ্যাঁ৷ বলুন৷

--- খালপাড়টা এখান থেকে কতদূরে পড়বে , বলতে পারবেন ? --- কোন খালপাড় ? অনেকগুলো আছে তো ! কয়েকটা খাল এখনও আছে৷ কয়েকটা খাল বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে৷

--- ওই বুজিয়ে দেওয়াগুলোর মধ্যেই একটা৷ কমপ্লেক্স হয়েছে৷ ফ্ল্যাট … পাশ দিয়ে ব্রিজ চলে গেছে৷

--- ওহ্৷ বুঝেছি৷ বড়ো রাস্তার ধারে তো ?
--- হ্যাঁ৷

--- বিশাল ব্যাপার আজ ওখানে ! জোর দোল খেলা !
--- আপনি কী করে জানলেন ? ওখানে ফ্ল্যাট আছে আপনার ?
--- না না ! দেখছেনই তো দোকান আমার৷ এই লোককে চা খাইয়ে আর টেলিফোন বুথ থেকে ফোন করতে দিয়ে নিজেদেরই সংসার চলে না ! এখন তো সবার হাতে মোবাইল ! বুথ থেকে কেউ ফোনও করে না ! তার ওপর আবার ওখানে ফ্ল্যাট ! কোটি টাকা দাম ! আমি জায়গাটি চিনি , তার কারণ , আমি আগে ওখানে থাকতাম৷ আগে বস্তি ছিল ওখানে৷ সেখানেই থাকতাম৷ তার পর একদিন বস্তি ছাই হয়ে গেল৷ কমপ্লেক্স উঠল৷ আমরা এদিকে চলে এলাম৷

--- ওহ্৷ আচ্ছা৷ আপনার দোকানের চারপাশ তো একদম শুনসান৷ সব দোকানপাট বন্ধ৷ কেউ নেই ?
--- না দাদা৷ দরকারের সময় কাউকে পাবেন না৷

--- হ্যাঁ৷ তাই দেখছি৷ আচ্ছা , ওখানে দোল খেলা কতক্ষণ চলবে একটু বলতে পারবেন ?
--- তা কী করে বলব বলুন ! তবে , বড়োলোকদের ব্যাপার ! চলবে বোধহয় অনেকক্ষণ ! এখন তো সবে দুপুর৷ বিকেল পর্যন্ত তো চলবেই৷

--- যাহ ! তা হলে তো ঝামেলা হয়ে গেল খুব !
--- রং খেলতে ভয় লাগে নাকি ? সে আমারও লাগে৷ ভয় নয় ঠিক৷ ভয় কেন লাগবে ! একটু ঘেন্না লাগে! ওই কালোকুলো হয়ে যাওয়া ! রং মাখলে কাউকে চেনাও যায় না ! আরেকটা ব্যাপার হল , আমার চামড়ায় খুব সমস্যা৷ শালা , রং লাগলেই অ্যালার্জি হয়ে যায়৷ আজেবাজে কেমিক্যাল দেওয়া থাকে তো! অ্যালার্জি হলেই গেল৷ রোদে বেরোনো যাবে না ! দু’হন্তা ধরে দোকান বন্ধ করে রাখো তখন !

--- না৷ আমার চামড়ায় তেমন কোনও সমস্যা নেই৷ আর , ভয় ব্যাপারটাও আমার মধ্যে তেমন নেই৷ আমার সমস্যা রং নিয়ে৷ রঙের গন্ধ নিয়ে৷

--- রঙের গন্ধ নিয়ে ? মানে ?
--- আমার নাকটা ঠিক সুবিধার নয়৷ আমি গন্ধ পাই না কোনও কিছুর৷

--- অ ! সর্দিতে ভরে থাকে সারা বছর ? সে তো অনেকেরই হয় ! আমার এক বন্ধুর তাই ছিল৷ হাগলেও গন্ধ পায় না৷ পাদলেও গন্ধ পায় না৷ অবশ্য , নিজেরটা কেউই পায় না ! কিন্ত্ত , ও অন্যেরটাও পেত না !--- না৷ ঠিক ওই রকম …
--- গত বছর লাইনে গলা দিয়ে সুইসাইড করল৷ খচাত্ করে কেউ কেটে নিয়ে গেছে যেন গলাটা , বুঝলেন তো ! একফোঁটা রক্ত নেই !--- না৷ ঠিক ওই রকম ব্যাপার নয় আমার৷

--- তা হলে ?
--- আমি এমনিই গন্ধ পাই না৷ সর্দির জন্য নয়৷ এমনিই৷ মানে , যে সব জিনিসের রং আছে , আমি তাদের গন্ধ পাই না৷ এ বার , এই পৃথিবীতে প্রকৃত ‘রঙহীন ’ বলে তো কিছু হয় না৷ সব কিছুরই রং আছে৷ যার সামান্যতম আকার আছে , তারই রং আছে৷ সেটা প্রাকৃতিক হতে পারে৷ কৃত্রিম হতে পারে৷ কিন্ত্ত আছে৷ সেইভাবে দেখতে গেলে ‘রঙহীনতা ’ও আসলে একটি রং -ই৷ যার ঠিকঠাক নাম ডিকশনারিতে নেই৷

--- আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না৷ এ আবার কী ! গন্ধ পায় না কোনও মানুষ , এমন হয় নাকি ?
--- একটু সহজ করে দিচ্ছি আপনাকে৷ অন্ধেরা যেমন চোখে দেখতে পায় না , বধিররা যেমন কানে শুনতে পায় না , মূকরা যেমন শব্দ করতে পারে না , ঠিক তেমনই আমি হলাম ঘ্রাণ -প্রতিবন্ধী৷ কোনও কিছুর গন্ধ পাই না৷ যদিও তার জন্য বাসে আলাদা সিট পাইনি কখনও !
--- এমনটা তো শুনিনি !
--- আমিও শুনিনি৷ তবে , আমার তাই হয়েছে৷ গন্ধ নেই৷ গন্ধের স্মৃতিও নেই৷

--- অদ্ভুত ! আচ্ছা , একটা কথা বলুন 
--- পেট্রোল বা ডিজেলের যে ধোঁয়া , মানে এমনিই যে ধোঁয়া ,তা তো কোনও বস্ত্ত নয়৷ তার গন্ধ পান?
--- ধোঁয়ার তো রং আছে৷ কালো৷ অন্ধকার৷ না , পাই না৷

--- কেউ মরে গেলেও গন্ধ পাবেন না তা হলে ! ধরুন , পাঁচ মিটার দূরে একটা বডি পড়ে আছে , পচতে আরম্ভ করেছে …
--- পাব না৷ গন্ধের রং নেই৷ কিন্ত্ত গন্ধের উত্সটির তো আছে৷ তাই পাব না৷ আপনি কিন্ত্ত জায়গাটা বললেন না এখনও !
--- বলছি৷ বলছি৷ আপনার খুব তাড়া নেই তো ?
--- যতক্ষণ না রং খেলা সম্পূর্ণ শেষ হচ্ছে , ততক্ষণ নেই৷

--- রঙহীনতার কোনও গন্ধ পান ? রং নিয়ে অসুবিধা থাকলে রঙহীনতার দিকেই ঝুঁকবেন , বা চেষ্টা করবেন অন্তত সেই দিকেই যাওয়ার , তা তো স্বাভাবিক৷ করেন না ?
--- হ্যাঁ৷ খুঁজে খুঁজে রঙহীন জায়গাগুলোতে , রাস্তাগুলোতে , গলিগুলোতে যাই৷ যেখানে মানুষ কম থাকবে , সেখানে রং কম থাকবে , এমনটা আমি বিশ্বাস করি৷ প্রকৃতি তো ড্রাম থেকে সব জায়গাতেই উন্মাদের মতো রং ঢেলে যাচ্ছে৷ তার মধ্যে মানুষও পড়ে৷ মানুষও একটি রং৷ অতএব , মানুষ না থাকলে একটি রং কমে গেল৷ আমি বাতাস টেনে অল্প একটু স্বস্তি পেলাম৷ এই আর কী !
--- আচ্ছা৷

--- দু’বছর আগে খুঁজে খুঁজে একটি শহরে গিয়েছিলাম৷ সেখানে দাঙ্গা শেষ হয়েছিল তার মাত্র একদিন আগে৷

--- রঙহীনতার খোঁজে ?
--- রঙহীনতার খোঁজে৷ অনস্তিত্বের অস্তিত্বের খোঁজে৷ মানুষহীন স্থানে রং যেমন কম , মানবতাহীন স্থানেও তো তাই -ই …
--- দাঙ্গার শহর বড়ো ভয়ঙ্কর৷

--- হ্যাঁ৷ বীভত্সভাবে কোপানো বডি পুকুরের পাশে পড়ে আছে গাদাগাদি করে৷ অর্ধেকটা জলে অর্ধেকটা উপরে৷ যাদের বডির নীচের অংশ জলে , বোয়াল এসে খেয়ে চলে যাচ্ছে পায়ের পাতা৷ যাদের বডির ঊর্ধ্বাংশ জলে , তাদের চোখ খুবলে নিয়েছে৷ খোবলানো চোখের জায়গায় জল ঢুকে গেছে৷ চোখের গর্তে পুকুরের ঘোলা জল৷ সেই জলে আলো পড়ে ছেঁড়া জামা -প্যান্ট পরা দেহে রামধনু এঁকে দিচ্ছে৷ লোকে পাশ দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে চলে যাচ্ছে নাকে রুমাল চেপে৷ তাদের আতঙ্ক -ঘেন্না মিলে মিশে জলে পড়ছে প্রকাণ্ড ছায়া৷ যাদের দেহে প্রাণ আছে , তাদের হূত্পিণ্ডটি মণিতে গিয়ে ঠেকেছে৷ প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে তা বড়ো হচ্ছে৷ ছোটো হচ্ছে৷

---ভয়ঙ্কর ! আমি দেখিনি৷ তবে , শুনেছি ছোটোবেলায় অনেক৷ ভয়ঙ্কর !
--- এর ভিতরেই একটি মানুষকে দেখেছিলাম৷ সাদা ধুতি পরা খালি গা৷ বাড়ির লোক বা অন্য কেউ রাস্তার পাশের হাইড্রেনের স্ল্যাবের ওপর শুইয়ে দিয়ে গেছে৷ পেটটা ফর্সা৷ কল্পনাতীত ফোলা৷ নাভিটা পেট থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসে খণ্ড ত হয়ে রয়েছে৷ পেটের একটু তলা থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রস বেরিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত৷ একটি বয়স্ক ছাগল মাঝেমাঝে গিয়ে ওই বড়ো পেটটায় লাথি মেরে আসছে৷

--- এ রকম একটা দাঙ্গার সময়েই তো আমার দাদু একটা অল্পবয়সী মেয়েকে তুলে নিয়ে এসেছিল৷ পরে বিয়ে করেছিল অবশ্য৷

--- আর একটা ব্যাপার হল , দাঙ্গার শহরে কেউ মৌলিক কথা বলে না৷ কেউ মৌলিক কথাটুকু খোঁজার চেষ্টাও করে না৷ দিনের পর দিন ধরে আতঙ্কে কুঁকড়ে যেতে যেতে একটা সময় পর থেকে তারা প্রত্যেকে শেখানো ভয় পাচ্ছে৷ প্রত্যেকে শেখানো ভয় দেখাচ্ছে৷ যারা ভয় পাচ্ছে , পেচ্ছাপ করতে গিয়ে ভয় পাচ্ছে , পায়খানা করতে গিয়ে ভয় পাচ্ছে , তারা যেন ভয় পাওয়াটা নিয়ম বলেই ভয় পাচ্ছে৷ আলো দেখে ভাবছে , এই বুঝি নেমে এল কেউ ওটা বেয়ে বেয়োনেট নিয়ে৷ অন্ধকার দেখে ভাবছে , শাবল নিয়ে মুখে কাপড় চাপা দিয়ে ছুটে আসছে কারা … ভয়াবহতার কোপ থেকে যে অন্ধকারতম আতঙ্ক , যাতে ঘাড় -মাথা আলাদা হয়ে যায় চট করে , কথা বলতে গিয়ে ভাষা ভেঙে যায় , খুলে পড়ে , তা তাদের মধ্যে নেই৷ কিন্ত্ত , তার পরেও আমি ওখানে দেখেছিলাম একটা অদ্ভুত ব্যাপার৷ একটু জল হবে ? খাবার ?
--- হবে৷ আপনি যে বেঞ্চে বসে আছেন , তার তলাতেই আছে৷ খেয়ে নিন৷

--- আচ্ছা৷ ওকে৷ (ঢকঢক , ঢকঢকঢকাস )৷ আমি একটা আশ্চর্য ব্যাপার লক্ষ করেছিলাম৷

--- কী ?
--- মৌলিক কথা যেখানে থাকে না , সেই জায়গার রং সব সময়েই ফিকে হয় বলে জানতাম৷ অথচ , ওখানে দেখলাম , কী রং ! কী রং ! একটি কোটি টাকার বিয়েবাড়িতে বা তাজমহল দেখলে যেমন চোখ অচল হয়ে যায় রঙের চোটে , ওখানেও তাই ! জীবনের থেকে মৃত্যুর রং কিছু কম নয়৷

--- তার মানে সেখানেও পেলেন না …
--- না৷ তবে খুঁজে বেড়াই৷ খুঁজে তো বেড়াতেই হয়৷ সব কিছুরই আলাদা আলাদা রং আছে৷ তার ভিতর থেকেই যদি কোনও ভাবে রঙহীনতা ছলকে পড়ে …
--- শেষ কবে গন্ধ পেয়েছেন , মনে পড়ে ? আদৌ পেয়েছেন কখনও ?
--- একটিবার , দু’টিবার পেয়েছি৷ গন্ধ নাকে আসার পরেই ধাওয়া করেছি উত্স খোঁজার জন্য৷ তার পর রাস্তা হারিয়েছি৷ পাইনি৷ সকাল থেকে একটি রাস্তায় বসেছিলাম৷ পরিত্যক্ত রাস্তা৷ কেউ আসে না৷ মানুষই নেই , তাই , রঙের দিনেও কেউ কাউকে রং দিতে আসেনি৷ এমনি দিনে চালিয়ে নিতে পারি৷ দোলের দিন এটাই আমার ভয় …
--- চারদিকে রং৷ বুঝেছি৷

--- হ্যাঁ৷ দম আটকে আসে৷ নাকটাকে মনে হয় সিমেন্ট দিয়ে তৈরি৷ এত ভারি হয়ে যায় ! যে বধির , রবিশঙ্করের সেতার বা বিসমিল্লা খাঁয়ের বাঁশির সুরের মধ্যে তাকে বসিয়ে দিলে তার বধিরতা যেমন মনে -মাথায় আরও বেশি করে চেপে বসে , প্রকটতর হয় , প্রচণ্ড হয় , চারপাশের এই রং খেলার দিনে আমারও তো তেমনিই … কথাটুকু বলে প্যান্ট -শার্ট পরা লোকটি অল্প একটু হাসে৷ অসাড় এবং অসহায় একটি হাসি৷

--- বুঝেছি দাদা৷

--- আপনার দোকানের এই এলাকায় অন্য কোনও দোকান তো খোলা নেই৷ মানুষ নেই৷ কেউ বোধহয় দোলও খেলেনি , তাই রং -ও নেই৷ দেখলাম একটা চায়ের দোকান৷ তার সঙ্গে টেলিফোন বুথও রয়েছে৷ আমি মোবাইল ব্যবহার করি না৷ ভেবেছিলাম এখান থেকেই ফোন করব৷ যদিও এখন আর তার দরকার নেই৷ আপনি বলে দিলেই হবে৷ চা তো করতে পারবেন না মনে হচ্ছে৷ উঠতে পারবেন কি ?
--- না দাদা৷ আর ওঠাবেন না৷ এ ভাবেই ঠিক আছি৷

--- আপনি দোল খেলেছিলেন আজ ?
-- আমি তো কোনও দিনই খেলতাম না ! আর আজ তো দোল শুরুর আগেই ওরা আমায় মেরে দিয়ে গেল !
--- আপনার দেহের ছায়াটার ওপরে রক্ত পড়ে পড়ে শুকিয়ে গেছে৷ মাছি এসে বসছে৷

--- তা বুঝেছি৷ ও ঠিক আছে৷ একদম পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক থেকে গুলি করেছে তো ! কিছু ভাবার সময়ই দেয়নি !
--- হ্যাঁ৷ বুঝতে পারছি৷

--- বিকেল হয়ে এল তো৷ এ বার বরং রাস্তাটা বলে দিই আপনাকে৷

--- বলুন …


৷ ৩ ৷

এগারো তলার ফ্ল্যাটে উঠে এলাম সিঁড়ি দিয়ে৷ যার সঙ্গে দেখা করার জন্য আসা , তার সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিল সাড়ে পাঁচমাস আগে৷ ৫১/২ মাস আগে৷ ভগ্নাংশ জিনিসটা এমনিতেই জটিল৷ এই ‘৫১/২’ সংখ্যাটিও আলাদা কিছু নয়৷ দেখলেই মনে হয় , একটি ভয়াবহ খাঁচা৷ একবার ঢুকে গেলে আর অন্য কোথাও যাওয়ার রাস্তা নেই৷ চাবি দিয়ে কেউ চলে গেল চিরকালের মতো৷ এটি আমার নিজস্ব অসহায়তা৷ এই খাঁচার ভিতর সম্ভ্রান্ত কাবাব হয়ে লুকিয়ে থাকি আমি৷ বেল বাজিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ৷ দরজা খুলে দিল মধুরা নিজেই৷ আমি ঢুকে পড়লাম৷ ও হুইলচেয়ার নিয়ে চলে গেল ড্রয়িংরুমের অন্য প্রান্তে৷ সাড়ে পাঁচমাস আগে আমাদের শেষবার দেখা হয়েছিল ওর তখনকার ফ্ল্যাটে৷ ওর বর থাকে মিশরে৷ বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় পনেরো দিনের জন্য পঙ্গু স্ত্রী -র কাছে আসে৷ ওর বরকে আমি কখনওই দেখিনি৷ ছবিতেও না৷ এই ফ্ল্যাটে কোনও ছবি নেই৷ আমি যতক্ষণ এই ফ্ল্যাটে থাকি , ততক্ষণ ও একটি নাম -না -জানা রঙের স্বচ্ছ পোশাক পরে থাকে৷ আজও পরে ছিল৷ বিকেলের আলো এসে ড্রয়িংরুমের টবে পড়ছে৷ টবের ওপর একটা প্রজাপতি বসেছিল৷ যা কিছু সুন্দর , স্বর্গীয় , তা -ই লুকোনো রঙের গোলা৷ অসহ্য৷ আমি প্রজাপতিটাকে তাড়ালাম৷ বিকেলটা এর পর শেষ হয়ে যাবে৷ নীচে রং খেলে ক্লান্ত লোকজন ঘরে ফিরছে৷ ক্লান্ত পাখি ঘরে ফিরে আসছে৷ তিন -চারবার মৃদু কণ্ঠে ‘হোলি হ্যায় ’ শোনা গেল৷ নিজেই দুটো হুইস্কি বানিয়ে নিয়ে মধুরার কাছে গেলাম৷ ‘এই প্রথমবার দোলের দিন দেখা হল আমাদের৷ ’ আমি বললাম৷ ‘হুইস্কিটা শেষ কর৷ আমাকে এতটা দিলে কেন ?’ বাইরের দিকে তাকিয়ে মধুরা কথা বলছে৷

--- খাবে না ?
--- খাব৷ অল্প৷ শরীরটা ভালো নেই৷

--- কী হয়েছে৷

--- গ্যাস৷ আজ একটু আবিরও দিইনি গায়ে৷ মধুরা বলল৷ একটু থেমে যোগ করল
--- তোমার জন্য৷

--- একটি মৃত রাস্তায় বসে এবং একটি মৃত মানুষের সঙ্গে গল্প করে আসছি আমি৷

--- আচ্ছা৷ তাই ? বেশ৷ 
--- তুমি কেমন আছ ?
--- ভালোই৷ শুরু করবে কি ?
--- শেষ করি আগে এটা৷
--- ঠিক আছে৷

মধুরার হুইলচেয়ারটা ঠেলতে ঠেলতে তার পর বেডরুমে গেলাম ওর৷ ঘরে বিশাল জানলা৷ প্রায় গোটা পৃথিবীটাই এখান থেকে দেখা যায়৷ এই কমপ্লেক্সের একটু দূরেই একটা রেললাইন৷ এত উপর থেকে ওটাকে দেখে মনে হচ্ছে দুটো মানুষের ল্যাতপ্যাতে রক্তাক্ত মেরুদণ্ড পাশাপাশি শোয়ানো৷ মাঝে পাথরকুচি৷ সেগুলোর মধ্যে একটি পাখি বসে রয়েছে৷ আজ এত পাখি কেন ! দূর থেকে তার রং বোঝা যায় না৷ এই রং চেনা আর না -চেনার দ্বন্দ্বের মধ্যেও একটি রঙহীনতার বোধ তার তর্জনীটি নিয়ে উপস্থিত থাকে৷ কথাটা আগে ভেবে দেখা হয়নি৷ সন্ধে হয়ে গেল৷

মধুরা ডাকল আমাকে৷

আমি আসার আগে , প্রতিবারই দেখেছি , ও শরীরটাকে কী একটা মাখিয়ে জল করে তোলে৷ বর্ণহীন গন্ধহীন করে তোলে৷ আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম৷ ‘কী গরম হয়ে গেছে তোমার শরীরটা !’

--- ও আমার বুকের উপর ঝুঁকে বলল৷ আমি নাক দিয়ে ওর শরীরের গন্ধ নিতে থাকি৷ ওর থাইয়ের পেশি এখন আমার নাকে৷ পায়ের কাটা অংশের জায়গাটা মাছের কাঁটার মতো আমার দাড়িতে লেগে থাকে৷ হাতদুটো ওর বুকে৷

সেটাও তার নিজের মতো করে ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করছে মাংসের৷ আমার শরীরের সমস্ত মাংসপেশি হাড় চামড়া স্নায়ু এই মুহূর্তটিতে ক্রমে হয়ে ওঠে একটি ব্যর্থ ছন্নছাড়া ঘিনঘিনে নাক , যার গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতা শেষ হয়ে গিয়েছে চিরকালের মতো৷ যা কিছু বিশদ , যা কিছু বিবরণধর্মী , তা আমাদের বিছানা থেকে জানলা দিয়ে উড়ে যাচ্ছে দোলের বাতাসে৷ ওর শরীরের গন্ধ নিতে থাকি আমি৷ যেমন ভাবে প্রশিক্ষণপ্রান্ত কুকুর কিছু খাবার মুখে দেওয়ার আগে শুঁকে নিয়ে দেখে নেয় তাতে বিষ মেশানো আছে কি না৷ ওকে শুঁকে যেতে থাকি আমি৷ আরও কতটা রঙহীন হয়ে পড়ল ও ?
--- কেমন আছ তুমি ? মধুরা জিজ্ঞাসা করল৷

--- ভালো৷ ভালো৷ ভালো৷ ওর ঠোঁট শুঁকতে শুঁকতে বললাম আমি৷

--- একটা কথা বলছি তোমায়৷ আমি একটা প্রেম করছি৷

--- আবার কোন শুয়োরের বাচ্চা এল ?! আমি তখন ওর পিঠ শুঁকছি৷

--- আছে একজন৷

--- ওহ৷ ঠিক আছে ! এ রকম তো এসেই থাকে কতজন তোমার জীবনে !
--- না৷ ও আলাদা৷ ও আমাকে ভালোবাসে৷

--- ভালোবাসা তো ভালোই৷ দেখো কদ্দিন থাকে৷ আমার নাক এখন ওর পেটে৷ আমার গলাটা এই সময় সায়গলের মতো শোনাচ্ছিল৷

--- তোমার হিংসা হচ্ছে না ?
--- কেন হবে ? এ রকম তো কম দেখলাম না !
--- বয়স হয়ে যাওয়া নয়৷ সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়৷ অর্থ নষ্ট হওয়াও নয়৷ আমি মনে করি , একজন নারীর কাছে সবথেকে ভয়ঙ্কর ও খারাপ ব্যাপার হল যে , তাকে নিয়ে আর কেউ ঈর্ষান্বিত হচ্ছে না৷

--- আচ্ছা বেশ৷ হলাম৷ কী করে ছেলেটি ?
--- চাকরি করে সরকারি৷ ওর সঙ্গে তোমার একটা মিল আছে৷ আমার গায়ের গন্ধ শুঁকতে খুব পছন্দ করে৷ যদিও শুধু শুঁকেই যায় না তোমার মতো৷

--- চমত্কার ছেলে ! কাজের ছেলে !
--- হ্যাঁ৷ আর নীল এলে আমি ওই পারফিউমটা মাখি৷ ও খুব পছন্দ করে৷

আমার নাকটা ওর ঘাড়ের কাছে ছিল তখন৷ হঠাত্ বসে পড়লাম চট করে৷

--- কী বললে ?মধুরা অবাক হয়ে তাকাল আমার দিকে , কী বললাম ? আমি ওই পারফিউমটা মাখি , তাই তো বললাম৷

--- না না ! সেটা ঠিক আছে ! কিন্ত্ত , কার জন্য মাখো ?
--- নীল৷ নীলের জন্য৷ বললাম তো৷ ওর নাম তো নীল৷

গোটা শরীরে একটিও সুতো ছিল না মধুরার৷ জলের মতো শরীর৷ পরিষ্কার দেখতে পেলাম সেই কাঠামোর প্রতিটা অংশে অতি ধীরে নীল রং লেপে দিচ্ছে কেউ৷ নীল মাটির প্রলেপ দিয়ে প্রতিমা গড়ে উঠছে এক৷ বর্ণময়৷ গন্ধময়৷ আমি শার্ট-প্যান্ট পরে নিচ্ছিলাম আবার৷ মধুরা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে শুয়েছিল বিছানায়৷ ওই অবস্থাতেই জিজ্ঞাসা করল , যা প্রত্যেকবারই আমার চলে যাওয়ার সময় করে৷ আজও করল৷ ‘আবার সাড়ে পাঁচমাস বাদে ?’… ওর মুখটা নীল হয়ে যাচ্ছিল দেখতে পাচ্ছিলাম৷ রঙের গন্ধে ভরে যাচ্ছে আমার রঙহীনতার শেষ প্যাশন৷ শোকগাথার ঘোলাটে নদী হয়ে বয়ে যাচ্ছে পৃথিবী দিয়ে৷ বসন্তোত্সবের সন্ধ্যার গান ভেসে আসছে দূর থেকে৷ সমস্ত কোলাহল অতিক্রম করার শক্তি ছিল ওই ক্ষীণ ধ্বনি -স্রোতের৷ শুরু হয়ে গিয়েছে৷ শুরু হয়ে গিয়েছে সব ! নাকটা সিমেন্টের চাঙড় হয়ে যাচ্ছে আবার৷ অত্যন্ত সুনিশ্চিত একটি রাত দোলের শহরে নেমে আসছে ধীরে৷ নগ্ন মধুরা হুইলচেয়ারে বসে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে৷ দরজা খুলে বেরিয়ে আসতে আসতে ওকে বললাম --- আমার আর এখানে কোনও দিন আসা হবে না , মধুরা … 
দরজা খুলে দিল মধুরা নিজেই৷ আমি ঢুকে পড়লাম৷ ও হুইলচেয়ার নিয়ে চলে গেল ড্রয়িংরুমের অন্য প্রান্তে৷ সাড়ে পাঁচমাস আগে আমাদের শেষবার দেখা হয়েছিল ওর তখনকার ফ্ল্যাটে৷ ওর বর থাকে মিশরে৷

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন