বুধবার, ১৭ মে, ২০১৭

ইকবাল তাজওলী'র গল্প : একটি পারিবারিক গল্প

কুয়ো থেকে বালতি দিয়ে পানি তুলে মণিদি গোসল করছে। খোদার তিরিশটা দিন মণিদি গোসল করে স্কুলে যায়। গত দুদিন থেকে উত্তরে হিমেল হাওয়া জাকিয়ে বসলেও মণিদি গোসল করা বন্ধ করেনি। গোসল করেই তবে স্কুলে যাচ্ছে।

আমার আর ছোড়দির বার্ষিক পরীক্ষা আজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। 

মাকে ধরে গতকাল ফাঁকি দিয়েছি। গোসল না করেই স্কুলে গিয়েছি। আমার হচ্ছে এই মজা। মা কিছু বললে মণিদিকে আর মণিদি কিছু বললে মাকে ধরি। আজ মনে হয় পারা গেল না।

বার বার মণিদি ‘অভি-অভি ’ ডাকতে থাকলে কাপড়-চোপড় খুঁলে ওর সঙ্গে গোসল করতে লেগে গেলাম। মণিদিটা যে কী ! সাবান লাগিয়ে ডলে-টলে গোসল করাল।

তারপর নিজে উঠে গেল।

এখন শীতকাল। হেমন্ত শেষ হয়ে আজ পৌষ মাসের পহেলা তারিখ। 

হিম হয়ে যাওয়া এই সাত-সকালে আঙ্গুর বু এসে বাসি ঘর ঝাড়– দিচ্ছে আর গুণগুণ করে গান গাচ্ছে। আঙ্গুর বু আমাদের কাজের মেয়ে। সারাটা দিন কাজ করে আর গান গায়। ‘এই কপালে টিকলি আর পরব না, এই চোখেতে কাজল আর আকবো না।.......।’ কোন কারণে ছোড়দি স্কুলে না গেলে সারাক্ষণ এই আঙ্গুর বুর সঙ্গে লেগে থাকে। মনে হয় ওর সতীন। আঙ্গুর বু কিছু বলে না। কিন্তু মুখ দেখলে বোঝা যায় বিরক্তিতে ফোলে আছে।

ছোড়দি আর আমি পাশাপাশি স্কুলে পড়লে কী হলো, ছোড়দির সঙ্গে কখনো স্কুলে যাই না। ঠনঠনিয়া থেকে মকবুলকে নিয়ে তাজমা ফ্যাক্টরি-পলিটেকনিক অতিক্রম করে তারপর পুলিশ লাইন স্কুলে যাই। মকবুল আমার বন্ধু। স্কুলে আমার আরও বন্ধু আছে। জলি, আফরোজ, ইমতিয়াজ আর নূর আক্তার।

আজ আর মকবুলের সঙ্গে যাচ্ছি না। বড় মামার দোকানে ঢু মেরে পয়সা নিতে হবে তো, তাই।

বড় মামা একটু আগে বেলা দেখে সময় আন্দাজ করে দোকানের উদ্দেশে বেরিয়ে গেছেন। আশ্চর্য, বড় মামা কখনো ঘড়ি দেখেন না। রোদ দেখে সময় আন্দাজ করে নেন। কখনো সময়ের হের-ফের হয় না। প্রতিদিন ঠিক দুটোর সময় দোকান থেকে হেটে বাসায় ফেরেন। তারপর গোসল করে নামাজ পড়ে খেয়ে-দেয়ে একটু জিড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে যান। বড়মামার দোকান বিহারি কলোনি বাজারে, মুর্শিদাবাদী বাড়ির সামনে।

মাঝে-মধ্যে বাবার অফিসেও ঢু মারি। বাবা অবশ্য অফিস বলেন না, বলেন আপিস। আপিসে গেলে বাবা এক টাকা দেন। সেই লোভেই যাই।

মার ডাকশোনা গেল। ‘অভি-ডরোথি খেতে আয়।’

আজ মণিদি একটু তাড়িতাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে। ওর বান্ধবী লতা বুর বাড়ি হয়ে লতাবুকে নিয়ে আরেক বান্ধবির বাড়ি হয়ে স্কুলে যাবে তো, তাই। মণিদি কখনো একা স্কুলে যায় না। লতাবুর সঙ্গে যায়। তিন-চার বছর আগে ওদের সিটি স্কুলে কতবার গেছি। অনুষ্ঠানাদি হলে ওই নিয়ে গেছে। এখন আর যাই না। ভাল্লাগে না। ভয় করে। এই তো কয়েক মাস আগে মোহাম্মদ আলি হাসপাতালের পেছনের গ্রামে গিয়ে ওর স্যারের বুলেটে ঝাঝড়া করা ফুলে-ফেপে ওঠা লাশ দেখে এলাম। স্যার নাইট কলেজে নকল ধরেছিলেন, তাই লাশ হয়ে গেলেন।

মণিদি বৃদ্ধাঙ্গুল আর তর্জনি এক করে নাকে ঘষা দিয়ে বেরিয়ে গেল । রাগে জ্বলে উঠলাম। মণিদি এভাবেই আদর করে।

মণিদি বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট বিশেক পর ছোড়দির আগে বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম।

পরীক্ষা শেষে যখন স্কুল থেকে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি, মাহবুব স্যার ডেকে নিয়ে বললেন,‘পরশু থেকে তোদের কাবদের ট্রেনিং। বিজয় দিবসে জিলা স্কুলে মার্চ-পাস্ট হবে । এবারই তোদের শেষ। দুদিন পর তো স্কুল ছেড়ে চলে যাবি। ঠিক দশটার সময় আসবি। সময়ের হেরফের হলে চলবে না।’

বুঝলাম, মকবুল আর আফরোজকে উদ্দেশ করে স্যার কথাগুলো বলছেন। ক্লাস ওয়ান থেকে কাব করছি। আমার এইসব সমস্যা নেই। সময়ের মূল্য বাবার কাছ থেকে শিখেছি। বাবাকে বুঝ হওয়ার পর থেকে দেখছি, সেই সাত সকালে উঠে গোসল সেরে প্রতিদিন একই সময়ে তাঁর আপিসে যাচ্ছেন। কখনো মিনিটের হের-ফের হতে দেখিনি। 

নীতিবান, আদর্শ বাবার সন্তান আমরা । নীতিবান হওয়ায় বড়দা হুট করে ইয়ে করে বিয়ে করায় বাসা থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন। মা-মামার কাকুতি-মিনতি কোন কিছুই বাবাকে তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে টলাতে পারেনি। বড়দাকে বাসা থেকে বের করে দিয়ে বাবা বলেছেন,‘তোর মাথায় ঘিলু নেই। ঘিলু থাকলে পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে এই কাজ করার আগে একশবার ভেবে দেখতি । আজ থেকে তোর খানা-আমার খানা আলাদা। আমার আর বলার কিছুই নেই। যা, বিদায় হ।’

বড়দা কোন কথা না বলে মায়ের আহাজারির মধ্যে চুপচাপ বেরিয়ে গেলেন। আর সপ্তাহ খানেকের মাথায় বড় মামার দোকানের কাছে বাসা নিলেন। ছ মাসের মধ্যে বড় মামার দোকানে লাল বাতি জ্বলল। বাবা ভীষণ রেগে গিয়ে বড় মামাকে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘তুই আর তোর বড় ভাগ্নে মিলে আমার দোকানের বারোটা বাজিয়েছিস। আমি আর পারব না। তোর দ্বারা ব্যবসা হবে না।’ 

বড় মামা কিছু একটা বলতে যাবেন, মা বড় মামার কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘আমার ভাই দিন-রাত পরিশ্রম করে তোমার সংসারে সাহায্য করছে আর তুমি এ কী বলছ ! বাকি-সিকির কারনে তোমার দোকানের এই অবস্থা হয়েছে।’

তারপর মা বড় মামাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘যা, তোর বাড়ি যা। আমাকে সাহায্য করার দরকার নেই।’

বাবা বিগড়ে গেলেন। বিগড়ে গিয়ে বললেন,‘তুমি না বুঝে সব কথায় টেফ দিও না, অভির মা। ওর দোকান থেকেই তো তোমার গুণধর বড়ছেলের বাসায় চাল-ডাল-নুন-তেল সব গেছে।’

মা আর কথা বাড়ালেন না। পাশের ঘরে গিয়ে কাঁদতে লাগলেন। মা হচ্ছেন ছিঁচকে কাঁদুনে। কথায় কথায় কাঁদেন। ছোড়দি মায়ের এই স্বভাব পেয়েছে।

বাবা আর কী বলবেন। বললেন, ‘ আচ্ছা অভির মা, আর কেঁদো না। তোমার কাঁদা আর ভাল্লাগে না। দেখি, কী করা যায়।’


স্কুল থেকে বের হয়ে যখন মকবুলকে নিয়ে বিহারি কলোনি মোড়ে এসেছি, বড়দার নাগাল পেলাম। বড়দা জিজ্ঞেস করল, ‘কীরে অভি, পরীক্ষা শেষ ?’

বড়দার মুখের দিকে তাকিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বড়দা শুকিয়ে কেমন হয়ে গেছে। উত্তর দিতে পারলাম না। হাউ-মাউ করে কেঁদে ফেললাম। ততক্ষণে মকবুল কী মনে করে সরে গেছে। বড়দা বলল, ‘ কাঁদছিস কেন ? কান্নার কী আছে ! পরীক্ষা কেমন হয়েছে তাই বল।’

বলতে হলো না। তার আগে বড়দা মুখ আড়াল করে চলে গেল। 

বাসায় এসে মায়ের পীড়াপীড়িতে কেবল ঘুমিয়েছি, ছোড়দির চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে গেল। বাবা তাঁর আপিস থেকে রাঙ্গাদির চিঠি নিয়ে ফিরেছেন। রাঙাদি আগামী ফেব্রুয়ারিতে আসছে। বাসায় ভাই-বোনদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। রাঙাদি এলে জয়কে নিয়ে মণিদি আর ছোড়দির মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যায়।

চিঠিতে কী লেখা ছিল-তা জানিনে। কিন্তু আমাদের আনন্দের বন্যা বেশিদিন স্থায়ী হলো না। রাঙাদির চিঠি আসার দিন পনের বাদে মণিদি একদিন পাশের বাসার আজাদ ভাইকে নিয়ে উধাও হয়ে গেল। 

দু-দুটো ছেলে-মেয়ের কার্যকলাপ বাবা আর সহ্য করতে পারলেন না। ভেঙ্গে পড়লেন।

জানুয়ারি পেরিয়ে ফেব্রুয়ারি চলে গেল। রাঙাদি এলো না। দুলাভাইর চিঠি এলো। চিঠিতে দুলাভাই জানালেন, তাঁরা অনিবার্য কারণে এবার আসছেন না। আগামীতে আসার চেষ্টা করবেন।

বাসার পরিবেশ কেমন গুমট হয়ে গেল।

দিন যায়-মাস যায়, গুমট ভাব আর যায় না।

একদিন বাবাকে গিয়ে বললাম, ‘ বাবা একটা কথা বলি।’

বাবা বললেন, ‘একটা কেন, দুটো বল।’

বললাম, ‘বাবা, বড়দাকে নিয়ে এসো।’

বাবা কিছুক্ষণ নীরব থেকে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘যা নিয়ে আয়।’

বিকেলে সবাই মিলে বড়দার বাসায় গিয়ে বড়দা-ভাবীকে নিয়ে এলাম।

অনেকদিন পর বাসায় আনন্দে ফিরে এলো। মা আনন্দে কেঁদে ফেললেন। ছোড়দিও মায়ের সঙ্গে জুড়ি ধরল।


গুমট ভাব কেটে বাসায় তখন ভাই-ভাবীর মুখে মিষ্টি দেয়ার পর্ব চলছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন