বুধবার, ২১ জুন, ২০১৭

আহমেদ খান হীরক'এর গল্প : আত্মজার জন্য গল্পের প্রস্তাবনা

কল্লোল দার কল্যানে বেশ ক বছর আগে "অ্যামাজিং স্টোরিজ" নামে এক টিভি সিরিজের বেশ কিছু পর্ব পটাপট দেখে ফেলেছিলাম। স্পিলবার্গের নেতৃত্বে করা এই টিভি সিরিজের প্রতিটি পর্বই নতুন গল্প ও স্বাদ দিয়ে মন মাতিয়ে রাখে। যদিও এতগুলো পর্বের মধ্যে আমার মাথায় বেশ কিছু দিন ধরে ঘুরছে সেই পর্বটি যাতে দেখানো হয়েছে ইচ্ছাশক্তি ও সৃজনশীলতার এক অদ্ভুত অনন্য গল্প।

চাকা ভেঙে যাওয়ায় ল্যান্ড করতে অপারগ একটা উড়োজাহাজে আটকে পড়া কিছু তরুণ-তরুণী কীভাবে উড়োজাহাজটিকে ল্যান্ড করিয়েছিল সেটিই ছিল গল্পটির উপজীব্য। পর্বটিতে সবাই যখন হাল ছেড়ে দেয় এবং আকাশে ভাসমান উড়োজাহাজের ভেতর সবাই যখন মৃত্যুর অপেক্ষা শুরু করে তখন এক তরুণ তার সৃজনী শক্তি দিয়ে একটা চাকা বানিয়ে ফেলে। না, চাকাটি সত্যিকারের চাকা তো না। চাকাটি একটা সাধারণ কাগজের তৈরি। যে চাকা দিয়ে সত্যিকারের উড়োজাহাজ কেন একটা খেলনা প্লেনও ল্যান্ড করানো সম্ভব নয়। কিন্তু সেই গল্পে কাগজের তৈরি চাকা দিয়েই ল্যান্ড করে উড়োজাহাজটি। মানুষের সৃজন ও ইচ্ছাশক্তির এমন অদ্ভুত গল্প আমি আগে দেখি নি। প্রথমবার দেখার পর থেকেই গল্পের এই টুকরো অংশটি আমার ভেতর একটা পলির জন্ম দিয়েছে। মিঠে সেই পলিতে এবার বোধহয় শস্য হবে।

শস্যের সেই বীজে এখন তুমি আছো আরাধ্য। তুমি, আমার অংশ, আমার আত্মজা, আমার গভীর কল্পনা ও ততোধিক শক্তিশালী বাস্তব। আমার ইচ্ছাশক্তির গল্প এবং আমার সৃজন।

তুমি বোধহয় জন্মের পর থেকেই আমার কাছে বৃষ্টির কথা শুনে আসছো। প্রচণ্ড খরতায় আমার একমাত্র ভরসা বৃষ্টি। বৃষ্টি হওয়া মানেই তাপিত এ পৃথিবী স্নিগ্ধ হয়ে উঠবে। উষ্ণতা রূপান্তরিত হবে স্নেহছায়ায়। আমি আমার জন্য বৃষ্টি চাই, আমি তোমার জন্য বৃষ্টি চাই। আমি আমাদের জন্য বৃষ্টি চাই। কিন্তু এই বৃষ্টিই কি আমাদের মধ্যে একটা স্বচ্ছ্ব দেয়াল হতে পারে?

আমি জানি বড় হয়ে তুমি মার্কেজ পড়বে। জাদুবাস্তবতার কথাও শুনবে। অনেক বেশি আগ্রহ থাকলে লাতিনের গল্প আর উপন্যাসগুলো হজমও করে ফেলবে। সাহিত্য পড়লে তোমার মধ্যে হাজার হাজার দরজা খুলে যাবে, তুমি দেখে নিও। কিন্তু নাও যদি পড়তে চাও তাহলে এসো আমার একটা কল্পনার সাথে একাত্ম হও এবার। আমার একটা গল্পের সাথে তুমি প্রথম হেঁটে চলো, কথা বলো, প্লাবিত হও।
প্লাবিত হও—কারণ গল্পটা তো প্লাবনের। মার্কেজের গল্পের মতোই আমার এই গল্পেও আমরা আটকা পড়ি এক দীর্ঘ বর্ষায়। আমার জন্য যে বৃষ্টি, তোমার জন্য যে বৃষ্টি, আমাদের সবার কাঙ্খিত যে বৃষ্টি সেই বৃষ্টি শুরু হলে আর থামে না। থামাই স্বাভাবিক, কিন্তু থামে না। পড়তে থাকে। আকাশ ভেঙে পড়তে থাকে। ছোট ছোট বাচ্চারা বলে, আকাশ ফুটো হয়ে গেছে! আকাশ চালের চালনির মতো হয়ে গেছে। আর জানালা দিয়ে তারা আকাশ...আকাশের আঁশটে মেঘ ও মেঘের উৎপাত দেখতে থাকে।

আর আমি আমার অফিসে বসে বসে ভাবি আহা কী অসাধারণ এক বৃষ্টি! আরাধ্য এই বৃষ্টির হিম আবহাওয়ায় প্রশান্তিতে ঘুমাবে। আমার ভাবতে ভালো লাগে এই রকম এক বৃষ্টিতে দুজনে খোলা মাঠে অনেকক্ষণ ফুটবল খেলব কোনো এক দিন। তারপর ছুটে যাবো অনেক অনেক দূরে। তুমি এখনো গ্রামে যাও নি...গেলে দেখবে বৃষ্টিতে কী অপরূপ সেজে ওঠে গ্রাম। গ্রামের নদীগুলো বৃষ্টিতে যখন কাঁপতে থাকে তোমার মনে হবে এমন দৃশ্যের জন্যই পৃথিবীতে বারবার জন্ম নেয়া উচিত। অফিসে বসে বসে এসব আমার ভাবতে ভালো লাগে। এসব ভাবতে আমার খুব স্বাভাবিক লাগে।

কিন্তু সব দিন সব কিছু স্বাভাবিকে থাকে না। স্বাভাবিক সাধারণ বৃষ্টি ধীরে ধীরে অস্বাভাবিক অসাধারণ হয়ে ওঠে। প্রথম এক সপ্তাহেও এই বৃষ্টি থামে না। ঢাকা শহর আক্রান্ত হয় জলাবদ্ধতায়। ঘর থেকে কেউ বের হতে পারে না, বের হতে পারে না অফিস থেকেও। টিভি খুললেই বৃষ্টি দেখা যায়। চ্যানেলের তরুণ ও তরুণীরা বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে রিপোর্ট করতে থাকে। সবাই ধারণা করে সপ্তম দিন পার হলে নিশ্চয় বৃষ্টি থেমে যাবে এবং সূর্য দারুণভাবে উদিত হবে আকাশে...কিন্তু হয় না। অষ্টম দিনেও চলে একটানা বৃষ্টি। এভাবে এক মাস এবং দুই মাস এবং তিন মাস... সবাই যে যার জায়গায় আটকে থাকে। প্রথমে পরস্পরকে ফোন দিয়ে নিজেদের মধ্যে বৃষ্টি নিয়ে আলাপ করতে তাদের ভালো লাগে। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই সেটা খুব বোরিং একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এক বছরের মাথায় শহরজুড়ে মহামারির মতো আত্মহত্যা বেড়ে যায়। বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা বলেন যে বৃষ্টির একটানা শব্দ অনেক মানুষকে ক্রমেই হতাশ করে ফেলছে। এই ক্রমাগত শব্দ মানুষের নার্ভকে আক্রমণ করতে শুরু করেছে। যারা বেঁচে আছে তারাও বধির হয়ে যেতে চাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের কথা খুব ভুল না। কারণ আমার অফিসের অনেকেই কানে হেডফোন লাগিয়ে ইউটিউব থেকে ক্রমাগত গান শুনতে শুরু করেছে। তারা কান থেকে কিছু সময়ের জন্য হেডফোন নামিয়ে রাখলেও প্রায় সাথে সাথেই তা কানে উঠিয়ে নিচ্ছে। তারা নিজেদের মধ্যে বৃষ্টি বৃষ্টি বলে চিৎকার করে উঠছে।

এই এক বছরের মধ্যে আমাদের অফিস থেকে অবশ্য মাত্র তিন জনেরই নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়। এবং তারা প্রবল প্লাবনের মধ্যেই বাসায় ফিরে যাওয়ার ভাবনায় বেরিয়ে পড়েন। প্রথম জন দশ কদমও যেতে পারেন না রাস্তার লম্বা এক ঢেউ তাকে ছিটকে কোথায় নিয়ে চলে যায়। আমরা বুঝতে পারি তাকে খুঁজ পাওয়াটা খুব দূরুহ হয় উঠবে। সে হিসেবে দ্বিতীয় জন ছিলেন অনেক সৌভাগ্যবান। 

আন্দাজ করা ফুটপাতের ওপর দিয়ে তিনি দীর্ঘক্ষণ হাঁটতে পেরেছিলেন আর বাসার খুব কাছাকাছি পৌঁছেও গিয়েছিলেন। কিন্তু বাসার খুব কাছাকাছি পৌঁছানোর পর তিনি নিজের বাসা চিনতে পারছিলেন না। একটা সম্পূর্ণ রাত তিনি বিভিন্ন বাসায় ঢুকে পড়েন এবং নিজের পরিজনের খোঁজ করেন। এবং শেষ পর্যন্ত কোথাও তাদের না পেয়ে অফিসেই ফিরে আসেন আর তৃতীয় জনের খবর দেন যে তাকে একটা চৌরাস্তায় যেটি এখন প্লাবনে সমুদ্র হয়ে গেছে...সেই রাস্তা বা সমুদ্রের ভেতর বসে সে একটা ফড়িং ধরার চেষ্টা করছে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে তার চামড়া সফেদার মতো সাদা হয়ে গেছে। তাকে অফিসে ফিরতে বললে কোনো কথা না বলে উল্টো কামড় দিতে ছুটে আসে। দ্বিতীয় জন তার উরু খুলে দেখায়... সেখানে সাপের মতো কামড়ের দাগ। তাতে আমাদের সন্দেহ হয় যে দ্বিতীয় জনকে বোধহয় তৃতীয় জন কামড় দেয় নি, দিয়েছে কোনো সাপ...কিন্তু দ্বিতীয় জন সাপের কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করলে আমরা সে সব ভুলে যাই। 

আর এভাবে দেখতে দেখতে প্রথম বছর কাটিয়ে টানা বৃষ্টির দ্বিতীয় বছরে আমরা পদার্পন করি। এর মধ্যে তোমার খোঁজ-খবর আমি নিই আরাধ্য। তোমার মাকে জিজ্ঞেস করি তুমি কেমন আছো? তোমার মা জানায় তুমি যথেষ্ট ভালো আছো। এখন তো তোমার ঘাড় শক্ত হয়ে গেছে এবং তুমি এদিক-ওদিক সম্পূর্ণভাবে তাকাতে পারছো। তুমি এখন হামাগুড়িও দিতে পারো। মাঝে মাঝে নাকি উঠেও দাঁড়াও...তবে বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারো না...ধপাস করে পড়ে যাও। গত সপ্তাহে তুমি নাকি খাট থেকে পড়ে গিয়েছিলে আর তাতে তোমার কপালের বাঁ পাশে একটু জায়গা কেটে গিয়েছিল। আমার ভেবে স্বস্তি লাগে যে বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই আমি স্যাভলন কিনে রেখেছিলাম বাড়িতে। ফোনে আর বেশি কথা হয় না। তবে তোমার মা জানায় খুব বেশি বৃষ্টি হওয়ায় আমাদের বারান্দার গাছগুলো নাকি মরে গেছে। আর টবগুলো এখন শূন্য পড়ে আছে। তোমার মায়ের ইচ্ছা হচ্ছে টবগুলোতে নতুন গাছ লাগানোর। কিন্তু এত বৃষ্টিতে টেকসই হয় এমন গাছের খোঁজ সে তেমন একটা পাচ্ছে না। আগের সারা রাত সে গুগল করেছে। তবে টানা বৃষ্টির গাছ লিখলে খুব অদ্ভুত অদ্ভুদ সাইটের সন্ধান আসে যেগুলোতে শুধু পরীর গল্প লেখা আছে। কোনো গাছের গল্প নেই। 

আমি ফোনে তোমার অস্ফূট আওয়াজ শুনতে পাই এবং আমি উৎকর্ণ হয়ে পড়ি। আমার শুনতে ভালো লাগে তোমার আধো আধো বোল। তখন আমারও একবার নার্ভাস ব্রেক ডাউনের মতো হয়। আমারও ইচ্ছা করে আমি অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ি এবং যে কোনো উপায়ে বাসায় ফিরে যাই। তোমার মা অবশ্য সাথে সাথে হইহই করে ওঠে। আমাকে নিষেধ করে বাইরে বের হতে। পাশের ফ্ল্যাটের এক মৃতপ্রায় বুড়ো শুধুমাত্র তার ঘরের জানালাটা খুলেছিল। আর তাতেই জানালা দিয়ে প্লাবন এসে ঢুকে পড়ে এবং বুড়োকে নিয়ে চলে যায়। কোনো রাস্তা কোনো স্ট্যান্ড কোনো গলি কোনো সম্পর্কই এখন আর নিরাপদ না!

তৃতীয় বছরেও যখন বৃষ্টি আর থামল না তখন আমরা বৃষ্টি নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিলাম। এমনিতেও কথা বলা বন্ধ করা ছাড়া আমাদের উপায় ছিল না। কারণ আমাদের ঠোঁটময় এক ধরনের ঘায়ের সৃষ্টি হয় আর কথা বললেই সে ঘাগুলো থেকে আঁঠালো কষ বেরোতে থাকে। চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা বলেন এই ঘা বৃষ্টিবাহিত। বৃষ্টি বা বর্ষা না ফুরালে এ ঘা ফুরাবে না। কিন্তু বৃষ্টি বা বর্ষা ফুরাবার কোনো লক্ষণ আমরা দেখি না। ফলে বৃষ্টিকে এবং আমাদের ঘাকে এবং আমাদের কথা না বলাকে আমরা আমাদের জীবনের অংশ বলে ধরে নিই। আমরা চুপচাপ বসে থাকতে পছন্দ করি। এবং কেউ যদি কোনো একটা শব্দ করে তাহলে আমাদের মেজাজ খুব খারাপ হতে থাকে। এর মধ্যে আমাদের অফিস থেকেও কয়েকজন আত্মহত্যা করে বসে। আর প্রথম বছরে দ্বিতীয় যে লোকটা ফিরে এসেছিল সে হঠাৎ করেই পায়ে হাঁটা বন্ধ করে দেয়। এবং বুকে চলা শুরু করে। তার চলার মধ্যে একটা সর্পিল ব্যাপার। থেকে সে মাঝে মাঝে হিসহিসও করে। আর খুব সময়ের জন্য হা করে। তবে হা করলে তার জিভটা আমরা দেখতে পাই। সেটা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে থাকে। আমাদের বলতে ইচ্ছা করে যে লোকটা আস্ত একটা সাপে পরিণত হয়েছে কিন্তু আমরা উদ্যম পাই না।

তৃতীয় বছরে তুমি বেশ কিছু শব্দ উচ্চারণ করতে পারো। তোমার মা বলে যে সবচেয়ে বেশি বলে মা শব্দটি। কিন্তু আমার সন্দেহ হয় যে আসলে তুমি সবচেয়ে বেশি বলো বাবা। তবে তোমার মা তা জানাতে চাচ্ছে না। আমি বারবার জানতে চাই যে তুমি বাবা বলছো কিনা কিন্তু তোমার মা সেটা এড়িয়ে যায়। আমার একবার সন্দেহ হয় যে তুমি বোধহয় তোমার বাবাকে ভুলে গেছ। আর সে নিয়ে তোমার সাথে আমার কথা বলতে ইচ্ছা হয়। অথচ তুমি যখন ফোনে আসো তখন কী বলতে হবে আমি ভুলে যাই। আমার ঠোঁট বেয়ে কষ গড়িয়ে পড়ে অযথাই। অথচ কোনো কথা বের হয় না। তুমি আমার নিঃশব্দতা শুনে যাও আর আমি তোমার। এই নৈশব্দতার ভেতরেই তিন কি চার কি পাঁচ বছর পার হয়ে যায়। আমাদের অফিসের লোকজন কমতে কমতে বারো জনে এসে ঠেকে। বারোজন মানুষ ও একটা সাপমানুষ। সাপমানুষটার জন্য আমাদের মাঝে মাঝে মায়া হয়। কিন্তু মুখ থেকে প্রচণ্ড কষ যখন বের হতে থাকে আমাদের তখন আর কারো জন্য মায়া করার সময় পাওয়া যায় না। 

এসময় আমরা শুনতে পাই বিদেশ থেকে আমাদের জন্য ত্রাণ ইত্যাদি আসবে। আমরা সে আশায় আমাদের শেষ কলাগাছটাও কেটে ফেলি। এবং তার সব কিছু চুলায় চাপিয়ে রান্না করে ফেলি। তোমার মা এর মধ্যে ফোন দিয়ে জানায় যে টবগুলো এতদিন খালি ছিল তাতে এখন চারটা সাপ এসে ঘুমাচ্ছে। সাপগুলো দেখতে অদ্ভুত এবং শান্ত। তেমন কিছু না বলায় তুমি সেগুলো নিয়ে বেশ মজাও পাচ্ছো। একটা সাপের গায়ে একদিন কাগজের ডানা সেঁটে দিলে নাকি সে উড়েও চলে যায়। আর তাতে তুমি খুশি হয়ে প্রতিটা সাপের জন্য ডানা বানাতে শুরু করেছো। তবে তোমার কাগজ ফুরিয়ে আসায় ডানাগুলো হচ্ছে ছোট। এতে হতে পারে যে সাপগুলো হয়তো খুব বেশি দূর উড়ে যেতে পারবে না। 

এবং কোনো এক প্লাবনের ভেতর হারিয়ে যাবে। আমি এর মধ্যেই জানতে চাই যে তুমি আমাকে বাবা বলে ডাকছ কিনা কিন্তু তোমার মা আবারও এড়িয়ে যায়। আমার একটা অভিমান হয়, হয়তো রাগও হয়। ঠোঁটের কষগুলো গড়িয়ে না পড়লে তোমার মাকে তখন আমি হয়তো একটা ধমক দিতাম...বা কষ গড়িয়ে পড়লেও দিতাম কিন্তু তখনই আমরা হেলিকপ্টারের আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমাদের মধ্যে হুটোপুটি হলো বিস্তর। এবং বারো জনের হুটোপুটিতেই একজন পায়ে চাপা পড়ে প্রায় মারা যাওয়ার দশা হলো। আমরা তখন তাকে প্লাবেনর ভেতর ছেড়ে দিলাম। সে ভেলার মতো ভাসতে ভাসতে কোনো এক দিকে চলে গেল। আমরা তাকে খুব বেশি দেখার সময় পেলাম না কারণ মাথার ওপর তখন আমাদের ত্রাণের হেলিকপ্টার উড়ছিল। আমরা ত্রাণের জন্য আকাশে প্রার্থনার মতো দুহাত বাড়ালে ওপর থেকে অনেকগুলো মশারির প্যাকেট পড়তে থাকে। আমরা বুঝতে পারি না এই প্লাবনের ভেতর মশারি দিয়ে আমরা কী করে। তবে আমরা দীর্ঘক্ষণ মশারির প্যাকেট সংগ্রহ করি এবং পরের দিনের জন্য আবার অপেক্ষা করতে থাকি। পরের দিনেও হেলিকপ্টার আসে এবং একইভাবে অনেক অনেক মশারির প্যাকেট ফেলে যায়। আমরা এগার জন কে কত বেশি মশারির প্যাকেট সংগ্রহ করতে পারি তা নিয়ে মহা ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

সপ্তম বছরে আমরা টিকে থাকি চার জন। তবে এর মধ্যে দুজন সাপ হয়ে যাওয়ায় ওই দুজনকে আমরা খেয়ে ফেলার চিন্তা করি মাঝে মাঝেই। কিন্তু শরীরে তেমন কোনো শক্তি না থাকায় আমরা খাওয়ার কল্পনার চেয়ে বেশি কিছু করতে পারি না। এর মধ্যে তোমার মায়ের সঙ্গে আমার তেমন আর কথা হয় না। আমাদের কথা খুব বেশি শ্বাস ফেলা ও আটকে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। তোমার মা শুধু বলে, তোমার বয়স আট হয়ে গেছে। তুমি এখন গান গাইতে পারো। আমার বলতে ইচ্ছা করে যে খুব ছোটবেলায় আমি তোমাকে যে গানগুলো গেয়ে শোনাতাম সেগুলো তুমি গাও কিনা...কিন্তু এসব কথা বলতে পারি না। তোমার মাও আমাদের এদিকের আর খোঁজ নেয় না। আমরা দুজন মেনে নিই এই জলাবদ্ধতা আর প্লাবন আর মৃত্যু আর সাপ আর দূরত্ব আর আকাশ থেকে পড়া মশারিই আমাদের একমাত্র জীবন। এর অধিক অন্য কিছু নেই। কিন্তু এক দিন খুব ভোরে তোমার মা আমাকে ফোন দেয়। আর ফোন ধরলে তোমার মা অনেকক্ষণ কাঁদে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। আমার ভালো লাগে না তবু আমি তোমার মায়ের কান্না শুনতে থাকি। কান্না অনেকক্ষণ পর শেষ হলে তোমার মা জানায় তোমাকে আর বাসায় পাওয়া যাচ্ছে না। গত রাতে তুমি যখন একটা নৌকা বানাচ্ছিলে কাগজ দিয়ে তখনও নাকি তুমি চমৎকার হাসিখুশি ছিলে। কিন্তু ভোরের দিকে এমন কী হলো যে তুমি চলে গেলে বাসা ছেড়ে। তোমার নিঃসঙ্গতার ভয়ে কাঁদছিল সম্ভবত। কিন্তু আমার বলতে ইচ্ছা করল এই প্লাবনে আসলে আমরা সকলেই নিঃসঙ্গ হয়ে গেছি। কিন্তু বলতে পারলাম না। এখন আর তেমন কোনো কথা বলতে ইচ্ছা তো করে না। আমার পাশের সঙ্গীটি মরে গেল এরপর। তার মৃত্যু দেখে আমার ভালো লাগল। মনে হলে এবার শ্বাস নিতে পারবে। বাঁচতে পারবে। 

আমার মনে হলো আর তো এভাবে বসে লাভ নেই। আমি আমাদের অফিসের দরজাটা খুলে ফেললাম। তাতে গলগল করে পানি বা প্লাবন ঢুকতে শুরু করল। অফিস ছাপিয়ে সে প্লাবন একতলা থেকে দোতলা, দোতলা থেকে তিনতলা, তিনতলা থেকে চার পাঁচে উঠতে শুরু করল। আর রাস্তার দিক থেকে আসা একটা মহা ঢেউ আমাকে তলিয়ে নিলো অনেক গভীরে। তারপর আবার আছড়ে মারল ওপরে। আবার তলিয়ে নিলো। আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে এল এবং আমি বুঝতে পারলাম এবার এই বৃষ্টি থেকে আমি পালিয়ে যেতে পারব...কিন্তু ঠিক তখনই একটা হাত আমার হাত ধরে ফেলল। আমি অনেক পানি খেয়ে চোখ খুলে তাকালে দেখলাম তুমি। তুমি একটা কাগজের নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে আছো। তুমি চিৎকার করে বললে, আমি আরাধ্য...চিনতে পারছ না? বৃষ্টিতে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। তুমি বলছো, তোমার জন্য নৌকা বানিয়ে এনেছি তো... আমি বললাম, এই নৌকা তো ডুবে যাবে... কাগজের নৌকা!
তুমি বললে, ডুববে না। দেখো ডুববে না। আমি তো কাঠের নৌকা বানাতে পারি না! তাই তোমার জন্য কাগজের নৌকা! তুমি উঠে এসো...

আমি কোনো মতে উঠে এলাম নৌকায়। নৌকাটা একবার দুলে উঠল। রুলটানা কাগজের পাশ দিয়ে একটু পানিও ঢুকে গেল নৌকায়। তুমি একটা ছোট্ট লাঠির মতো হাল দিয়ে নৌকাটা সামলে নিলে। আমি একটু হাসলাম নার্ভাসভাবে। কল্লোল দার দেখানো সেই টিভি ফিকশনের কথা মনে পড়ল। আমি কি একটা ফিকশনের ভিতর রয়েছি? আমি তোমার দিকে তাকালাম। তোমার মুখে অমল হাসি। নৌকাটা চলছে ঠিকঠাকভাবে। তুমি যেন এক পাকা মাঝি। অথচ আমি বাজি ধরতে পারি তোমাকে কখনো পুনর্ভবা দেখানো হয় নি আমার। নিয়ে যাওয়া হয় নি আমাদের স্বর্গছেড়া গ্রামে। আমি বললাম, তোমার মা বলছিল তুমি নাকি গান গাইতে পারো আজকাল...

তুমি বললে, সবগুলো না... খুব ছোটতে শুধু তুমি যেগুলো শিখিয়েছিলে...
আমি বললাম, গাইবে নাকি দুয়েকটা?

তুমি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলে। কিন্তু গাইলে না। আমরা রাস্তা বা প্লাবন ধরে কোনো এক দিকে এগিয়ে যেতে থাকলাম। আমি বললাম, কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমাকে? 
তুমি বললে, মার কাছে... বাবান্ধু!

আমি অবাক হয়ে দেখলাম তুমি বাবান্ধুর মতো কঠিন শব্দও কী অনায়াসে উচ্চারণ করলে। আমার আরেকবার সেটা শুনতে ইচ্ছা করল। কিন্তু লজ্জা থেকে সে কথা বলতে পারলাম না। তিব্বত পার হতে হতে তুমি গুনগুন করে গেয়ে উঠলে। আমার মনে পড়ল এই সুরটা এই গানটাই আমি তোমাকে প্রথম শুনিয়েছিলাম!

তোমার গানের মধ্যে বৃষ্টির শব্দটাও আর তেমন খারাপ লাগল না! আমার মনে হলো না আমার অনেকটা সময় আমি অফিসে বন্দী ছিলাম…মনে হলো না অনেক বছর পর আমি অবারিত আকাশ দেখলাম। মনে হলো না অনেকটা বছর আমি মেনে নিয়েছিলাম শৃঙ্খল—বৃষ্টির কিংবা সময়ের!
আমাদের কাগজের নৌকা চলতে থাকল প্লাবন ভেদ করে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন