বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

স্বপ্নময় চক্রবর্তী'র গল্প : ইউসুফের মা

শ্যামলী বলল, একটা আবদার করব, বকবে না বল?
জয়ন্ত বলল, কী আবদার আবার তোমার?
অ্যাই, আমি না, একটু তারকেশ্বর যাব।
তারকেশ্বরে কার কাছে?
মন্দিরে।
মন্দিরে কী করতে?
পুজো দিতে...
পুজো দেবে? ভ্যাট, কী বলছ তুমি ? খেপে গেলে নাকি
আগেইতো বলেছিলাম, বোকো না...

চুপ করে রইল শ্যামলী।

কী হল হঠাৎ শ্যামলীর? জয়ন্ত ভাবে। আজকাল শ্যামলীর ঘুম-টুম কম হচ্ছে, মাঝে মধ্যে নাকি হাত-পা জ্বালাও করে বলছিল। জয়ন্ত জানে এসব প্রিমেনোপজ সিনড্রোম। তারকেশ্বরে পুজো দিতে যাওয়াও কি তাই?

জয়ন্ত বলল, ইউ হ্যাভ এভরি ফ্রিডম টু ডু ইয়োর ওন। তুমি যা করবে করো, আমার পারমিশন নিতে হবে নাকি?

উঁহু, পারমিশন নয়, আমাকে একটু নিয়ে যেও। তোমাকে আর কিছু করতে হবে না।

কেন, নিয়ে যেতে হবে কেন? তুমি তো একাই যেতে পার হাওড়া থেকে তারকেশ্বর লোকালে উঠে...

তা তো জানি। যদি না যেতে চাও জোর করব না। তবে একা ভয় করে, যাইনি তো কখনো, শুনেছি পাণ্ডারাও ঝামেলা করে। তাছাড়া একটু আউটিংও তো হয়। একটু শীতও পড়েছে, সময় পেলে একটু আঁটপুর থেকেও ঘুরে আসা যাবে।

ছোটখাটো আউটিংটা অবশ্য মন্দ লাগে না। বাড়িতেও বড় নিঃসঙ্গ লাগে আজকাল। বুবানের সঙ্গে কিছু কথাবার্তা হত, ও এখন হোস্টেলে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে জলপাইগুড়িতে। বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর অনেক কথাই ছিল বুবানকেন্দ্রিক। এখন কথাও কমে গেছে। তবু বাইরে টাইরে গেলে একটু আধটু কথা হয়, যেমন- পাখিটা দেখ কী রকম নীল, ওটা কি মুসুরডালের খেত?- এরকম আর কি।

জয়ন্ত ভাবল জিজ্ঞাসা করবে- কবে যেতে চাও? কিন্তু বলল, কেন যেতে চাও?
বললাম তো পুজো দিতে।
কেন, কেন, পুজোটা কেন?
মানত করেছিলাম।
কেন?
বুবানের জন্য।
বুবান যাতে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পায় ওই জন্য?
কী যে বল, ওর অসুখের সময়।
সে তো দু-বছর আগেকার কথা।
সেই সময়েই করেছিলাম, একটা দুর্বল মুহূর্তে, বলেছিলাম হে তারকনাথ...
তো সে তো চুকেবুকে গেছে। দু-বছর পর হঠাৎ?
হঠাৎই মনে হল।
তারকনাথ কি স্বপ্ন-টপ্ন দেখিয়েছে নাকি?
তা নয়। ক-দিন আগে হঠাৎই মনে হল একটা প্রমিস রাখিনি। এফ এম শুনতে শুনতে। একজন সুনীল গাঙ্গুলীর 'কেউ কথা রাখেনি' আবৃত্তি করছিল, তখন।

জয়ন্ত একটু মুচকি হেসে বলল, তা হলে চেপে যাও।
না গো, খারাপ হবে।
খারাপ হবে মানে- তারকনাথ অভিশাপ দেবে নাকি?

তা নয়। এথিকালি খারাপ হবে। তারকেশ্বরে আমার সেভাবে বিশ্বাস নেই, ভীষণ দুর্বল মুহূর্তে ওঁর কাছে প্রার্থনাও করেছিলাম, ওঁর কাছে যাব বলেছিলাম। হয়তো উনি প্রার্থনা পূরণ করেননি, সেই ক্ষমতাই হয়তো ওঁর নেই, হয়তো উনি নিজেই নেই, সুচিকিৎসায়, বুবান ভালো হয়ে গেছে, কিন্তু যেটা বলেছিলাম, প্রমিস করেছিলাম, সেটা না করলে আমার ভালো লাগবে না।

জয়ন্ত বলে, এত দুর্বল তুমি...। সিগারেট ধরায়।

শ্যামলী তখন বলে, দুর্বলতাই যদি বলবে, বলতে পার। কোন পথে এই দুর্বলতা এসেছে জানো না? তোমাদের দুর্বলতাই আমার দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিয়েছে। যা ভাবো তা বল না, যা বল তা কর না।

ফেরার সময় তারকেশ্বর স্টেশনে ইউসুফের সঙ্গে দেখা। ইউসুফ তো দেখেই উত্তেজিত। জয়ন্ত একবার মনে মনে বলল-এই রে...।

ইউসুফ বলল, কী আশ্চর্য স্যার? এখানে? কী ব্যাপার?

জয়ন্ত শ্যামলীর দিকে তাকিয়ে একটা চোখ টিপল, তারপর বলল, এমনিই, এমনিই এসেছিলাম, একটা আউটিং আর কি। ছেলে বাইরে চলে গেছে, সময় কাটে না... শ্যামলী দাঁত দিয়ে ঠোট কামড়াচ্ছে।

ইউসুফ বলল, তো আউটিং তো তারকেশ্বর কেন? তারকেশ্বর কি বেড়ানোর পক্ষে খুব ভালো জায়গা? নাকি স্যার তারকেশ্বর নিয়ে নতুন পেপার-টেপার কিছু...

না রে না, এখন আর অত...
জয়ন্ত বারবার শ্যামলীর দিকে তাকাচ্ছে।

জয়ন্ত আবার বলল, ভাবছিলাম একটু আঁটপুর যাব। ওখানে অনেক টেরাকোটা মন্দির আছে। পশ্চিমবঙ্গের অনেক মন্দিরের টেরাকোটার কাজ দেখেছি, শুধু আঁটপুরেরই দেখিনি।

তো আঁটপুর যেতে হলে তো হরিপালে নাবতে হত...

হ্যাঁ, ভুল করে তারকেশ্বর চলে এসেছি...

ভাগ্যিস ভুল করে এসেছেন, তাই আমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আঁটপুর পরে যাবেন, আমার বাড়িতে চলুন। অনেকদিন যাবেন যাবেন বলেছিলেন। কী বউদি... শ্যামলীকে বউদিই ডাকে ইউসুফ, কিন্তু জয়ন্তকে স্যার।

শ্যামলী বলল, আমার আপত্তি নেই...।

শ্যামলীর আসলে পুজো দেওয়াটা হয়ে গেছে। আজ বাবার মাস ছিল না, বাবার বারও নয়, তাই ভিড় বিশেষ ছিল না, তাড়াতাড়িই হয়ে গেছে। এর আগে কখনো আসেনি, শিবের মাথায় হাত দিয়ে কখনো প্রার্থনাও করেনি। আজও কিছু প্রার্থনা করার ছিল না, ছিল শুধু কমিটমেন্ট রাখার ব্যাপার। হে তারকনাথ, অসহায় অবস্থায় কিছু বলে ফেলেছিলাম, আজ কথা রাখতে এলাম। ওই স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে কালোপাথরে হাত রেখে শ্যামলীর খুব একটা ভক্তি হয়নি যদিও, কিন্তু চোখ বুজে বলে ফেলে, বুবান যেন ভালো থাকে, সুস্থ থাকে... ওর তো হেপাটাইটিস-বি হয়েছিল, লিভারটা গেছে... হোস্টেলের খাবারে কি ওরা তেল কম দেয় ? যেন কিছু আর না হয়, যেন ভালো থাকে...।

উঠুন উঠুন উঠুন...পাণ্ডা বলেছিল, অন্য ভক্ত এসে গেছে...।

চোখ খুলে শ্যামলী ভাবছিল- এত কথা বলার দরকার কী ছিল। উনি যদি সর্বজ্ঞই হবেন- তাহলে তো ওঁর অজ্ঞাত থাকার কথা নয়। যে বুবানের হেপাটাইটিস-বি হয়েছিল...।

জয়ন্ত মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। বেলপাতা বের করা চুবড়ি হাতে শ্যামলীকে দেখে জয়ন্ত হেসে উঠল। বলল, ভাবতেও পারিনি তোমার এরকম হাল হবে।

তোমাদের এই হাল হয়েছে বলেই আমার এই হাল হয়েছে। কনফিডেন্স নেই। একদম কনফিডেন্স নেই আর। কী করেছ তোমাদের পার্টিটাকে?

ইউসুফ শ্যামলীর দিকে তাকায়। বলে, কী ভালোই না লাগছে। কতদিন পরে দেখা। কত বিরক্ত করেছি আপনাকে বউদি। সাতবার চ...। বুবাব কেমন আছে? ও তো জলপাইগুড়ি...

ভালো আছে। শ্যামলী ওর ঝোলা ব্যাগটার দিকে তাকায়। ঝোলার ভিতরে তারকনাথের চুবড়িটা রয়েছে। লুকিয়ে রয়েছে।

বুবান চিঠি টিঠি দেয়?

ফোন করে। রবিবার রবিবার।

ইউসুফ হরিপাল কলেজে পলিটিক্যাল সায়েন্স পড়ায়। জয়ন্তর কাছেই পি-এইচ. ডি. করেছে। ইউসুফের গবেষণার বিষয় ছিল গোরু নিয়ে রাজনীতি। বিষয়টা বেশ অভিনব। আমাদের দেশের গো-মাতার রক্ষাকর্তা এবং গো-ঘাতকেরা যে রাজনীতি করেন, সেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে কীভাবে বার বার নিরীহ প্রাণী গোরুকে সামনে নিয়ে আসা হয় তা দেখিয়েছে ইউসুফ। ১৮৫৭ সালের সিপাহি যুদ্ধের সময় রোহিলাখণ্ডে মুসলিমরা ঘোষণা করেছিল- হিন্দুরা যদি স্বাধীনতার এই যুদ্ধে যোগ দেয়, তবে ভারতবর্ষে গো হত্যা বন্ধ করে দেওয়া হবে। সেই থেকে শুরু। ১৮৭১ সালে লর্ড মোয়ার নির্দেশে হান্টার সাহেবের 'দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস' প্রকাশিত হয়। ওই বইটিতে হিন্দু ও মুসলমানকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বলে বর্ণনা করা হয়। ব্রিটিশদের ডিভাইড অ্যান্ড রুল রাজনীতির শুরু। গোরুকে তাঁরা ব্যবহার করতে থাকল। নানা কৌশলে গো-হত্যা নিবারণের জন্য বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংস্থাকে উসকে দেওয়া হয়। আবার মুসলমানদের বোঝাতে লাগল দেখ, হিন্দুরা তোমাদের খাদ্য খাবার স্বাধীনতায় কীভাবে হস্তক্ষেপ করছে। ১৮৯১ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত ১০০ বছরে গো-হত্যা আর গোরক্ষা নিয়ে ছ-শোটা দাঙ্গা বাধে।

প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় গোসদন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নেওয়া হয় যেখানে কর্মক্ষমতাহীন গোরুগুলিকে আমৃত্যু লালনপালন করা হবে। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকীতে অবশ্য ব্যাপারটা বাতিল হয়। ১৯৫৫ সালের উত্তরপ্রদেশের সরকার গোসম্বর্ধ্বন তদন্ত কমিটিগঠন করেন। ওই কমিটি রিপোর্টে বলে গোজাতির সমস্যা জাতীয় প্রতিরক্ষার মতোই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গোজাতির সমস্যা ভারতের অন্যতম প্রধান সমস্যা ।

এইসব অনুসন্ধানকার্য যখন চলছিল, বাড়িতে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল ইউসুফ এবং ওর স্যার জয়ন্তর মধ্যে, ওরা সংবিধানের ৪৮ ধারা, গোরু সম্পর্কে নেহরুর বক্তৃতা, জিন্নার মন্তব্য খুঁজে যাচ্ছিল, তখন শ্যামলী বলেছিল, তোমরা বিবেকানন্দ পড়েছ, বিবেকানন্দ! ওরা মার্কসিস্ট । বিবেকানন্দ তেমন পড়েনি। শ্যামলী তখনি বিবেকানন্দ রচনাবলির বাসের টিকিটের পেজ মার্কিং করা জায়গাটা খুলে দিয়েছিল।

স্বামীজি- আপনাদের সভার উদ্দেশ্য কী ?

প্রচারক- আমরা দেশের গোমাতাগণকে কসাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করে থাকি। স্বামীজি- আপনাদের আয়ের পন্থা কী?

প্রচারক- মাড়োয়ারি বণিক সম্প্রদায় এ কাজের বিশেষ পৃষ্ঠপোষক।

স্বামীজি- মধ্যভারতে এবার ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হয়েছে। আপনাদের সভা দুর্ভিক্ষকালে কোনো সাহায্যদানের আয়োজন করেছে কি?

প্রচারক- আমরা দুর্ভিক্ষে সাহায্য করি না। কেবলমাত্র গোমাতৃগণের রক্ষাকল্পেই এই সভা স্থাপিত।

স্বামীজি- যে দুর্ভিক্ষে আপনাদের লক্ষ লক্ষ জাতভাই মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হল তাদের অন্ন দিয়ে সাহায্য করা উচিত মনে করেননি?

প্রচারক- না, লোকের কর্মফলে, পাপে এই দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। যেমন কর্ম, তেমনই ফল হয়েছে।

স্বামীজি- আপনাদের গোমাতারাও আপন আপন কর্মফলেই কসাইয়ের হাতে যাচ্ছেন ও মরছেন। আমাদের ওতে কিছু করার প্রয়োজন নেই।

প্রচারক একটু অপ্রতিভ হইয়া বলিলেন হাঁ আপনি যা বলেছেন তা সত্য। কিন্তু শাস্ত্র বলে গোরু আমাদের মাতা। স্বামীজি হাসিতে হাসিতে বলেন- হাঁ, গোরু আমাদের যে মা তা বিলক্ষণ বুঝেছি- তা না হলে এমন সব কৃতী সন্তান আর কে প্রসব করবেন?

এই অংশটুকু থিসিসে ঢুকিয়েছিল ইউসুফ। পি-এইচ. ডি. হবার পর মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিল। গোদুগ্ধের ছানার তৈরি। দুপুরে খেয়েছিল। অনেকবার করে বলেছিল ওদের দেশের বাড়িতে যেতে। পুকুরের মাছ, ঘরের গোরুর দুধ, মুরগির ডিম, টাটকা সবজি...। দুটো দিন থাকলেও দেখবেন বেশ ফ্রেশ লাগবে। গত সাত-আট বছরে যাওয়া আর হয়নি। ইতিমধ্যে হরিপাল কলেজে চাকরিও পেয়ে গেছে ইউসুফ। ওর স্যারের সঙ্গে যোগাযোগও কমে গেছে। তবু বছরে দু-একবার এখনও বাড়িতে আসে।

তারকেশ্বর থেকে দশঘড়ার বাসে চাপতে হয়। হাজিপুর এগারো কিলোমিটার। একটা অটো রিজার্ভ করে নিল ওরা। মুড়ি তেলেভাজাও কেনা হল। তারকেশ্বরে অনেক তেলেভাজার দোকান, তেলেভাজাও হরেকরকম আর বড় বড়। তারকেশ্বরের ঘিঞ্জি এলাকা ছেড়ে যেতেই বেশ লাগছে। হলুদ হয়ে থাকা সরষের খেত, বেগুনি ধনে খেত, সাদা ফুলকপির খেত, সরু কলো রাস্তা। বেশ লাগছে শ্যামলীর। রাস্তার দু-পাশে বাবলা গাছ ঝুঁকে আছে। যেন তোরণ। মাঠের মধ্যে আঙুল দেখাল ইউসুফ। মাঠ যেখানে আকাশে মিশেছে, ওখানে চিড়েতনের তিনটি পাপড়ির মতো তিনটি খেলনার গ্রাম। ইউসুফ বলল মাঝখানের গ্রামটা হাজিপুর।

হাজিপুর গ্রামপঞ্চায়েতের নির্বাচনে মুসলিম স্বার্থে, ইসলামের ইজ্জত কায়েম করার জন্য মুসলিম কনফারেন্স প্রার্থী মহম্মদ ইকবালকে চাঁদ-তারা চিহ্নে ভোট দিন।

জয়ন্ত বলল, ভোট হয়ে গেছে তো বহুদিন!

ইউসুফ বলল, ভোট হয়ে গেছে, চিহ্ন রয়ে গেছে।

পিচ রাস্তা থেকে কিছুটা হেঁটে যেতে হয় কাঁচা রাস্তা দিয়ে। গোরুর গাড়ি যায় বলে রাস্তার মাঝ বরাবর একটা কুঁজ উঠেছে। একটা রোগা মসজিদ, তাগড়া দুটো মাইক ফিট করা। কিছু খড়ের চালের বাড়ি ঝুঁকে পড়েছে। দেয়ালে মাটির চাপড়া। বিদ্যুতের পোস্টও রয়েছে। পোস্টে চাঁদ তারা। একটা কোঠাদালান। বাইরেটা সিমেন্ট-বালির পলেস্তারা পড়েনি এখনও। ইটের ওপরেই কিছুটা অংশে সাদা চুনকাম করে আলকাতরায় লিখে রাখা হয়েছে- মুসলিম কনফারেন্স প্রার্থী মহম্মদ ইকবালের নির্বাচনী কার্যালয়।

ইউসুফ বলল, ইকবাল আমার ছোট ভাই।

সামনের দিকে কোঠাদালান, তারপর উঠান, উঠানের শেষে একটা দোতলা মাটির বাড়ি। খড়ের চাল। ইউসুফ একটা ঘরে বসাল। ঘরে বইয়ের আলমারি, টিভি, ফ্রিজ, চৌকি। ঠাসা ঘর। দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের একটা ছবি। আর একটা দেয়াল ঘড়ি। ঘড়িতে সাতটা বেজে রয়েছে। কিন্তু তখন বেলা দেড়টার কম নয়। ইউসুফ হুকুম করতেই লোকজনরা পুকুর থেকে বালতি বালতি জল এনে নতুন কোঠার বাথরুমের চৌবাচ্চাটা ভর্তি করতে লাগল।

কোঠাদালানটার লম্বালম্বি বারান্দা। পরপর কয়েকটা ঘর। একটা ঘরের লোহার শেকল খুলে ইউসুফ বলল এটা আমাদের গেস্টরুম। এই ঘরে থাকবেন। ঘরে একটা বড় তক্তপোশ। পরিষ্কার চাদর। কভারে এমব্রয়ডারি করা ফুল-লতাপাতার মাঝখানে লেখা খোদার মেহেরবানি।

শ্যামলী চুল খুলে বারান্দায় দাঁড়াল। শস্যের গন্ধ। উঠোনের একপাশে স্তূপাকার ধান, উঠোনের একপাশে লম্বা চালাঘর। দেয়াল নেই। সেখানে সারি সারি ধান সেদ্ধ করার উনুন। মাঝখানে একটা উচ্ছে মাচা। মাটির দোতলা বাড়িটার একতলায় রান্নাঘর। একটি পূর্ণগর্ভা নারী উঁকি দিল, তারপর ঘোমটা টেনে ঢুকে গেল।

ইউসুফ বলল, আমার ছোট ভাইয়ের বউ ।
মানে ইকবালের?
হ্যাঁ।
ইকবাল কোথায়?
ওর কত কাজ...।
মা কোথায়?
ওই বাড়িতে থাকেন।
ওই মাটির বাড়িতে।
হ্যাঁ। ওই বাড়িতে কত ঘর। মা আসতে চান না। ওই বাড়িতেই আমরা থাকতাম। বাবা থাকতেন। বাড়িটা দেখুন হেলে পড়েছে, মা তবু ওই বাড়ি ছাড়বেন না। চলুন যাই, দেখা করে আসি।

একটু অন্ধকার অন্ধকার ঘর। সাদা শাড়ির উপর একটা ধূসর বালাপোশ জড়িয়ে বসে আছেন জানলার ধারে। কপালে দীর্ঘদিন নামাজ পড়ার কালচে দাগ। ইউসুফ বলল, মেহমান এনেছি মা, আমার স্যার। আর বউদি। আমার নিজের লোক!

ইউসুফের মা উঠে দাঁড়ান। বলেন, আপনাদের কথা কত শুনেছি। আপনারা যে মেহেরবানি করে এসেছেন, বড় খুশি হলাম। আপনাদের জন্যই আমার ছেলে সরস্বতী পেয়েছে।

সরস্বতী পেয়েছে কথাটা শুনে জয়ন্ত শ্যামলীর দিকে একবার তাকাল।

বসুন। একটু শরবত বানিয়ে দি।

মাটির দেয়ালে একটা কুলঙ্গি। কুলঙ্গিতে একটা রুহ্‌-আফজার বোতল। কয়েকটা কাচের গেলাসও আছে। জাগে জল নেই। মাটির দেয়াল কেটে বানানো জানালায় মুখ গলিয়ে ওই বৃদ্ধা হাঁকলেন ও নেহার, পানি নে আয় লো...

বলল, ইউসুফটা শাদি করছে না। ওকে ধরে বেঁধে শাদি দিয়ে দাও দেখি। বাড়িতে একটা মোটে বউ। একটা বউতে হয় ? এতবড় বাড়ি...। খুব সাহস, তুমিতে চলে এলেন ইউসুফের মা।

রুহ্‌ মানে আত্মা। কাচের গ্লাসে রুহ্‌-আফজা ঢেলে চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে বলেন, তোমাদের কথা ও মানবে। একটা নক্‌খি নে আসতে বলো।

কাজের মেয়ে নেহারবানু পানি নিয়ে এলে ইউসুফের মা শরবত করতে থাকেন। জয়ন্ত দেখে কুলঙ্গিতে একটা বই। ইসলামি আধুনিকতা ও মাছলা মাছায়েল, মহম্মদ ইকবাল প্রণীত। বইটার এরকম অদ্ভুত নাম দেখে জয়ন্ত বইটা টেনে নিল। পৃষ্ঠা উলটে দেখল, উৎসর্গ; আম্মাজানকে। সূচিপত্রটা দেখতে লাগল জয়ন্ত। নারীর বৈশিষ্ট্য। অধিকাংশ নারী জাহান্নামি হবে। যাদের শাদি করা হারাম। পর্দা কী ও কেন। কুরআনের আলোকে পর্দার গুরুত্ব। পর্দার উপকারিতা ও বেপর্দার কুফল। নারীর সুন্নত। ওযুর ফজিলত...

দাও, বইটা দাও।

একটু দেখছিলাম। ইকবালের লেখা তো...

কী আর দেখবে ওটা, দাও। বইটা টেনেই নিল ইউসুফের মা। বলল ছেলেটাকে জিনে পেয়েছে।

ইউসুফ বলল আসুন বউদি, বেলা হয়ে যাচ্ছে। স্নান সেরে নিন।

বারান্দায় একটা ফোল্ডিং টেবিল পেতে দেয়া হয়েছে। তিনজন বসেছে। ইউসুফের মা নীচে নেমে এসেছে। রান্নাঘর থেকে খাবার বয়ে আনছে নেহারবানু-কুলসুমরা, নতুন কোঠায় রাখছে, ইউসুফের মা প্লেটে সাজিয়ে দিচ্ছে। জয়ন্ত জিজ্ঞাসা করল, ইকবাল খাবে না? মা বললেন, ওর কথা বোলো না। শাকভাজা, মাছভাজা, ডাল, মাছের ঝোল, মাছের টক। বড় পুকুর থেকে মাছ ধরে পাশের ছোট পুকুরটাতে রাখা হয় যেন দরকার মতো তোলা যায়। সেই মাছ। খুব স্বাদ। তবে বড্ড রসুনের আধিক্য মনে হল জয়ন্তদের। পালং শাকে পেঁয়াজ দিয়েছে কেন?

বিছানাও রেডি। ইউসুফ বলল, একটু ঘুমিয়ে নিন। শ্যামলী বলল, ঘুমোব না। বরং গ্রাম দেখব।

কী আর দেখবেন! সেই তো দারিদ্র্য।

ওরা এবড়োখেবড়ো মাটির রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। হাড়জিরজিরে বলদ। হাড়জিরজিরে পেট ফোলা শিশু। মাদ্রাসা। সাদা আলখাল্লা আর মাথায় টুপি পরা, থুতনিতে দাড়ি রাখা কয়েকজন। একটা দোকানের পাঁচিলে দুনিয়ার মজদুর এক হও ঝাপসা হয়ে গেছে। বরং সদ্য লেখা দুনিয়ার ইসলামি ঐক্য জিন্দাবাদ জ্বলজ্বল করছে। ইউসুফ বলল, পাশাপাশি তিনটে গ্রামের সবাই মুসলমান। কিন্তু গ্রামপঞ্চায়েতে মৌলবাদীরা জেতেনি। এখন ওরা খুব অ্যাকটিভ। পাশের গ্রামের ক্লাবঘরে লাদেনের ছবি পাওয়া গেছে। অন্যরা এসে ছবিটা সরিয়ে নেয়। আমার ভাই মৌলবাদীদের একজন পাণ্ডা।

কেন, ও এরকম হল কেন? জয়ন্ত জিজ্ঞাসা করল।

সেটাই আশ্চর্য। আমাদের বাড়ির পরিবেশটা একদম অন্যরকম। আমাদের বাড়িতে কখনো গোরুর মাংস ঢোকেনি। মা বলেন- প্রতিবেশীর মনে দাগা দেয় গোস্ত হজম হয় না। যদিও কোনো হিন্দু প্রতিবেশী নেই। হিন্দু গ্রাম অনেক দূরে। আমাদের বাবাও খুব ধার্মিক ছিলেন। নমাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন, কিন্তু বাংলা সন তারিখের জন্য দেউলপুরের বাজার থেকে মনসার ছবিওলা কিংবা রাধাকৃষ্ণের ছবিওলা বাংলা ক্যালেন্ডার ঘরে টাঙিয়ে রাখতে দেখতাম। এই পরিবেশে থেকেও ইকবাল কেন এমন হয়ে গেল জানি না।

ওরা একটা চৌরাস্তার মোড়ে পড়ল। সাইকেল ভ্যানে করে কিছু লোকজন। ইউসুফ বলল হাট ফেরত লোকজন। দেউলপুরে আজ হাটবার। একটা ফাঁকা বিড়ির প্যাকেট ফেলল একজন কেউ ভ্যান রিকশা থেকে। প্যাকেটে লেখা জয় রাম বিড়ি। ইউসুফ বলল, দেউলপুরের হাটে ইকবাল মার খেয়েছিল। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর। একটা তর্কাতর্কি হয়েছিল। ইকবাল সেখানে বোকার মতো কিছু বলতে গিয়েছিল। এরপর থেকেই ওর মধ্যে একটা পরিবর্তন।

একটা সাইকেল রিকশা। বাজার করে রিকশায় ফিরছেন দুজন বৃদ্ধ মুসলমান। রিকশার পেছনে একটা স্টিকার- জয় শ্রীরাম।

ইউসুফ বলল, দেউলপুরের গ্রাম পঞ্চায়েতে ওরা জিতেছে। দেউলপুরের হাটে একটা রামমন্দির হয়েছে। এইসব গাঁয়ের মুসলমান চাষিরা ওই হাটে গিয়েই লাউটা-মুলোটা বিক্রি করে। ওদেরও চাঁদা দিতে হয়েছে। এইসব অঞ্চল কয়েক বছরে কেমন হয়ে গেল। এরকম হত না যদি সবাই কথায় কাজে এক হত। যা ভাবে তা বলে না, যা বলে তা করে না।

হুবহু শ্যামলীর কথাটাই বলল ইউসুফ। শ্যামলী বলেছিল তোমাদের ডিসঅনেস্টির ছিদ্রপথেই এইভাবে ভাইরাসগুলো ঢুকেছে।

সন্ধের সময় বাড়ি ফিরল। বারান্দায় মিটিং চলছে। ইকবালের দলবল।

ইউসুফ বলল, বড্ড কষ্টে আছি স্যার। বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে করে না।

চলে যাও না। বিয়ে করো। হরিপালে কলেজের কাছাকাছি থাকো।

ইউসুফ হাসল। বলল হরিপালে ঘরভাড়া পাব? কেউ ভাড়া দেবে? কোনো বাড়িওয়ালাও দেবে না। আমি যে মুসলমান।

এ মিটিংয়ে ইকবাল বলছে, যাঁরা বলে ইসলাম পুরোনা হয়ে গেছে তাঁরা মিথ্যে বলে। ভুল বলে। কোরানেই আছে রেডিয়ো অ্যাক্টিভিটির ব্যাখ্যা। ফিজিক্স কেমিস্ট্রি সব কোরানে আছে। কিন্তু আমাদের তা জানতে হবে। আর ইসলামি গানের কথা বলি, ওইসব গানও আধুনিক করতে হবে। যেমন একটা উদাহরণ, যেটা আমি রচনা করেছি--

তোমারি রহমে ইলেকট্রন প্রোটন
পবিত্র নূর ফোটন রাশি
আর এন এ ডি এন এ তুমি গড়িয়াছ
তোমার ইচ্ছায় কাঁদি আর হাসি
আমাদের মনে কালিমা যা ছিল
কলেমায় তা সব মুছিয়া যায়
ব্রিচিং যেমন জীবাণুনাশক
আল্লার নাম তাহারই প্রায়।

শীতের সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে এল। একটু যে দরকার ছিল। ওদের মিটিংয়ে চা আসছে। ইউসুফ ওদের থেকে কয়েক কাপ চা চেয়ে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল ।

বারান্দায় চলছে ইসলামি আলোচনা। আর এই ঘরে ইউসুফ এবং জয়ন্তর মধ্যে শুরু হল অন্য তত্ত্বকথা। কার্ল মার্কস কতটা মার্কসবাদী ছিলেন, এঙ্গেলস মেয়েদের যোগ্য সম্মান দিতেন কিনা, অর্মত্য সেন কি সত্যিই বামপন্থী...

শ্যামলী ধীরে ধীরে ওই দোতলা মাটির ঘরটির দিকে হেঁটে যায়। শীত গাঢ় হচ্ছে। জোনাকিরা খেলছে। রান্নাঘর থেকে মাংসের গন্ধ ভেসে আসছে। মাটির ঘরের কাছে গেলেই মাটির নিজস্ব গন্ধ। কম পাওয়ারের আলো জ্বলছে ঘরে। ইউসুফের মা খাটে বসে রেদিয় রেডিয়োতে কৃষিকথার আসর শুনছে। শ্যামলীকে দেখতে পেয়ে উঠে বসলেন। বললেন, এসো গো মেয়ে।

কী রকম রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল শ্যামলী এই আহ্বানে।

বোসো।

কাচা চাদরে রোদুরের গন্ধ। দেয়ালে দুলদুল ঘোড়া বাঁধানো ছবিটা আগে লক্ষ করেনি।

উনি বললেন, এ বাড়িতে অনেকেই আসে। আমার এই মাটির ঘরে কেউ আসেনাকো। সব কোঠাদালান থেকেই চলে যায়। তুমিই এলে।

কী অবলীলায় তুমি বলছেন এই গ্রাম্য মহিলা। শহুরে সুন্দরী বিদুষীকে তুমি বলার, আপন করার এই স্মার্টনেস কোথা থেকে পেলেন এই অশিক্ষিতা মহিলা? শ্যামলীর খুব অবাক লাগে।

গ্রাম দেখলে?
হুঁ।
কী বুঝলে...?
শ্যামলী কিছু বলে না।
কোঠাদালানের বারান্দায় ইকবালের মিটিন্‌ চলছে।
হুঁ, দেখলাম।
ছেলেটা আমার বয়ে গেছে। লস্টো।
কিছু বলেন না?

কথা লেবে না। ওকে জিনে পেয়েছে। কুলঙ্গিতে ওই বইটা দেখতে পায়। ইসলামি আধুনিকতা। পর্দার উপকারিতা হেডিংয়ে শ্যামলী পড়তে থাকে--

''নারীদের অবশ্য মনে রাখতে হবে আগুনের সাথে দাহ্য পদার্থের যে সম্পর্ক, টকের সঙ্গে জিহ্বার যে সম্পর্ক, একজন যুবতীর সঙ্গে একজন পুরুষেরও সেই সম্পর্ক। টক দেখলে যেমন জিহ্বায় পানি আসবে, তেমনি একজন বেপর্দা যুবতীকে দেখলেই একজন পুরুষের যৌন সাগরে ঢেউ খেলতে শুরু করবে। এক ধরনের মাছির কথা ধরা যাক, যারা পাকা ফলের রস খেতে ভালোবাসে। তারা ফলের দোকানে গিয়ে শুধু ভোঁ ভোঁ করে, কিন্তু ফলের আবরণ থাকাতে ফলের রস খেতে পারে না। যদি একবার ফলের খোসা খুলল তো মাছিগুলো ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়। পর্দা হল ফলের আবরণের মতো। সুতরাং মা বোনেরা, এবার নিশ্চয়ই বেপর্দার কুফল বুঝতে পেরেছেন...

শ্যামলী জিজ্ঞাসা করল, এই বইটা পড়েছেন?
বৃদ্ধা বললেন, আমি পড়তে জানি না।
আপনি জানেন না কী লেখা আছে?
জানি। খারাপ কথা লেখা আছে।

অদ্ভুত লাগে শ্যামলীর। কী করে এই তেজ পেলেন এই রমণী?

তারপর অনেক গল্প হল। আখের গুড় বানানোর গল্প, কাবাব বানানোর গল্প, কেয়ামতের গল্প, ইস্রাফিলের গল্প, ধর্মকথা হল।

শ্যামলী জানল ওঁর বাবা ছিলেন একজন কবি। খোদার সঙ্গে কৃষ্ণ মিশিয়ে গান বাঁধতেন।

শ্যামলী হাঁটুতে থুতনি রেখে শুনল। মনে হয় কথকতা শুনছে। তার চারপাশে মাটির বাড়ির সোঁদা গন্ধমাখা দেয়াল।

পাশের একটি ঘর আছে। ওই ঘরে কয়েক বস্তা ধান। ধানের কী আশ্চর্য গন্ধ। একটা তক্তপোশও পাতা। তক্তপোশের পাশেই জানলা। শ্যামলীর খুব ইচ্ছে হল রাত্রে এই মাটির ঘরেই শোয়। মাকে বলল, এখানে শোব।

মা বললেন, এখানে শুবি কী রে কোঠাদালান থাকতে...।

শ্যামলী বলল, ভীষণ ইচ্ছে করছে যে...।

খাওয়াদাওয়ার পর আবার মাটির ঘরটায় চলে এল শ্যামলী। আবার গল্প হল অনেকক্ষণ। শ্যামলী একটু হাত বুলিয়ে দিল ওই বৃদ্ধার মাথায়। গল্প করতে করতে জানল ওই বৃদ্ধাও গান বাঁধেন। একটা গান শোনালেন বৃদ্ধা ওই কঁপা গলায়--

মানুষ যদি না হইত-
কে গাহিত খোদার নাম
কবি যদি না লিখিত
কে জনিত বৃন্দাবন ধাম।

ওমা! এ যে দেখি- সেই রবীন্দ্রনাথের আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হত যে মিছে। শ্যামলী যেন বুঝতে পারছে- ওর এই তেজ এল কোথা থেকে।

রাত্রে বিছানা পেতে দিলেন ওই বুড়ি। পাশের ঘরের তক্তপোশে। মাথার বালিশে ফুল লতা। একটা মশারিও খাটিয়ে দিলেন। শ্যামলীর আজ অদ্ভুত সুন্দর দিন কাটছে। বালিশটা একটু নিচু। নিচু বালিশে একটু অসুবিধে হয় শ্যামলীর। ওর হাতের ব্যাগটায় ফোমের লাইনিং দেয়া আছে। ব্যাগের ভিতরে ছোট্ট একটি চুবড়িতে তারকনাথের প্রসাদ। কেউ জানে না। চুবড়িটা ব্যাগ থেকে বার করে ধানের বস্তার ফাঁকে রেখে দিল শ্যামলী। ব্যাগটা বালিশের ওপর রাখল। তারপর ধানের গন্ধ পেতে পেতে ঘুমিয়ে পড়ল। ভোরবেলা ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। ভোর দেখতে বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে গেল শ্যামলী। কিছুক্ষণ ভোর দেখল প্রাণ ভরে। জয়ন্ত উঠে গেছে। বলল- -এবার চলো।

তারকেশ্বর স্টেশনে পৌঁছে শ্যামলীর মনে হল তারকেশ্বরের প্রসাদ ইউসুফের বাড়িতে ফেলে এসেছে। ওই নকুলদানা বা বেলপাতার জন্য দুঃখ নেই। ওই নকুলদানা হয়তো নিজে খেত না, বুবানকেও দিত না। জয়ন্তকে দেবার তো কোনো প্রশ্নই নেই। কিন্তু মিথ্যে কথাটা ধরা পড়ে যাবে। তারকনাথের পুজোর কথাটা ইউসুফকে বলেনি ওরা, ইউসুফের মাকে নয়। কী ভাববে ইউসুফ? একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার হয়ে গেল। জয়ন্তকে কিচ্ছু বলল না শ্যামলী। ব্যাপারটা পুরো চেপে গেল।

দু-দিন পরে ইউসুফ হাজির। শ্যামলীর বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। নিশ্চই ওই চুবড়িটা পাঠিয়ে দিয়েছেন ওর মা। কী বলবে ইউসুফকে ?

ইউসুফ বলল, মা এটি পাঠিয়ে দিলেন। বললেন আজই যা। এই ব্যাগে কী আছে আমি জানি না। মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কী এমন দরকারি জিনিস আছে এতে? মা বলেছেন, তোদের জানার দরকার নেই। একটা ছোট চটের ব্যাগের মুখটা সেলাই করে দেয়া হয়েছে।

ইউসুফ চলে গেল। শ্যামলী চটের ব্যাগের সেলাইটা খুলল। ভিতরে পলিথিনের ব্যাগ। পলিথিনের ওই ব্যাগের ভিতরে একটা কাগজের বড় ঠোঙা। ঠোঙায় মুগ ডালের বরফি। এর তলায় সেই চুবড়িটা, তাতে বেলপাতা মাখানো নকুলদানা।

প্লাস্টিকের শূন্যতা জুড়ে নিরক্ষর মায়ের পাঠানো অদৃশ্য অক্ষরের আশীর্বাদী বাক্য তৈরি হচ্ছে তখন।

৩টি মন্তব্য: