বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম'এর গল্প : গল্পটা দুজনের

ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় পানশালায়। সত্যি কথা বললে গল্পটা লিখতে সুবিধে হয়। মাঝে মাঝে সাকুরায় যেতাম প্রায় বছরদুই একটানা। এখন অবশ্য বনানীর পিকিং এ আসি। লেখকদের জন্য কখনো একা থাকা বাধ্যতামূলক আর সেজন্য পানশালা উৎকৃষ্ট। কোন নারী সঙ্গ আমার নেই মানে স্ত্রী বা প্রেমিকা, বহুবছর হয়েছে দেশের বাড়ি যাইনা। সেখানে পুরনো স্মৃতি লেপ্টে থাকা ছাড়া অবশিষ্ট নেই বিশেষ কিছু। বলা যায় লেখা ও পানীয়ের নেশাটা হচ্ছে জীবনের আকর্ষণ।
আমার পুর্বসূরীরাও চমৎকার সব গল্প বলে গেছেন পানশালা নিয়ে। সৈয়দ শামসুল হকের ‘আনন্দের মৃত্যু’ বইতে পড়েছিলাম কবি আর তার বন্ধু প্রতিদিন শাহবাগের পানশালায় বসে অদ্ভুত এক মানুষের মুখোমুখি হতেন। লেখক হিসেবে এইসব উদাহরণ উৎসাহিত করে। আর দশজন পানাহারিও হয়ত নিজের জন্য এইরকম একটা কিছু ব্যাখ্যা দাঁড় করাবেন। আজ পিকিং-এ ঢ়ুকতেই ওয়েটার কাছে এলো। অর্ডার নেবার মতো মুখ নিচু করে ফিসফিস করে জানালো, আমাকে একজন খুঁজছেন। এমন জায়গায় কেউ খুঁজছে শুনেই প্রথমে মনে হলো ডিবির লোক। মাত্র মাস তিনেক হলো স্থান বদলেছি তাছাড়া কেউ জানেওনা এখানে আসি। এটা খোঁজার জায়গাও না, ফোনে চেষ্টা করবে না পেলে অফিসে, সেখানেও ফেল মারলে চিরকূট রেখে আসবে বিনয়ের সাথে। আতংক ও আগ্রহ দুটোই কাজ করছে একসাথে। ওয়েটারকে বললাম, নাম জানো? 

সরি স্যার নাম জিজ্ঞেস করিনি। বললেন, দেখলেই চিনবেন। 

এখনো আছেন?

জি, তবে কাষ্টমার সিকিউরিটির কারণে আপনি এসেছেন কিনা বলা হয়নি। ইচ্ছে করলে দূর থেকে দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কন্টাক্ট করবেন কিনা। যাহ বাবা এতো দেখছি সোয়া সের, ভালো বখশিশ চায় মনে হয়। তবে যেহেতু কোন অপকর্মের তালিকায় নাম নেই ঝামেলা বাড়াতে ইচ্ছে হলোনা। বললাম, আসতে বলো তাকে। আমার জন্য অপেক্ষারত মানুষটি এলেন এবং তাকে দেখে বিস্ময় গোপন করে হাত বাড়িয়ে বললাম, জানতাম খুঁজে বের করবেন।

- তাই কোনো ঠিকানা না রেখেই ঠিকানা পাল্টালেন?

- তা নয় তবে জানেনতো কোথাও শেকড় গজিয়ে গেলে লেখকরা সেখান থেকে সরে যেতে চায়।

- এটা কি লেখক ধর্ম?

- জানিনা, তবে আমার হয়। কোথাও আটকে গেলেই কিছুদিন পর গায়ে শ্যাওলা জন্মানো অনুভূতি আসে। ভালো আছে আপনার মেয়ে ? বলুন কেন খুঁজছিলেন?

তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে বরং আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, গল্পটা লিখেছেন?

- কেন পড়তে চান? 

- না শেষটা বলা হয়নি তাই।

তিনি অনুমতি না নিয়েই গল্পের শেষটা শুরু করলেন। শুনে আমার কেমন লাগছিল সেটা পড়ে বলছি। একজন সাধারণ মানুষ এমন ভালো বক্তা হতে পারে, অবিশ্বাস্য। এতদিন তাকে বেশ নিরীহই মনে হতো। আমাদের দেখা হলো প্রায় মাসতিনেক পর। এটা চতুর্থ বা পঞ্চমবারের মতো দ্যাখা হতে পারে। অফিস সেরে সপ্তাহে দুদিন সাকুরায় বসতাম তখন। আমরা দুজন মুখোমুখি দুটি টেবিলে বসেছিলাম। একদিন, দুদিন এবং তৃতীয় দিন। এরপর আবিস্কার করলাম দুজনই একে অপরকে দেখছি এবং আমরা দুজনই একা। ভদ্রলোকের বয়স আমার চেয়ে বছর পাঁচেক বেশি হবে বলেই ধারণা। এসব যায়গায় যারা একা আসে তারা অন্যের সাথে সেধে কথা বলেনা কারণ তারা নিজের সাথে থাকতেই আসে। চতুর্থ দিন ইচ্ছে করে টেবিল বদলে বসে একটা স্বস্তি পাচ্ছিলাম। সারাক্ষণ মুখের সামনে কেউ তাকিয়ে থাকলে ভালো লাগে নাকি কারো? মাত্র এক পেগ নিয়েছি, ভাবছি আজ বেশি নেবনা কাল সকালেই মিটিং আছে। প্রায় মিনিট ত্রিশ পড় খুক খুক কাশির শব্দে তাকিয়ে দেখি পাশে দাঁড়িয়ে আছেন ভদ্রলোক। আপনার সাথে বসতে পারি ?

অনুমতি না দেওয়ার মতো অভদ্র নিশ্চই আমি নই। তিনি বসে নিজের জন্য অর্ডার দিলেন। হাতে ঘড়ি পড়েন। চুলটা বেশ যত্নে আচড়ানো। ভদ্রতা করে আমার জন্য অর্ডার করতে চাইলেন। আশ্বস্ত করলাম, ওরা আমার পছন্দ জানে। বেশ কিছুক্ষণ অল্প আলোর মধ্যে আমরা মুখোমুখি বসে আছি। পিলারের সাথে এক কোনায় টেলিভিশনে শব্দহীন আইপিএল খেলা চলছে। মুম্বাই ইন্ডিয়ানস ব্যাঙ্গালুরুকে টার্গেট দিয়েছে। দু’একজন গ্লাসে সিপ নিতে নিতে বোবা খেলা দেখছে। একজন অযথাই মুম্বাইয়ের হয়ে বাজি ধরতে সঙ্গীকে জোড় করছে। সে রাজি হচ্ছেনা। বেচারা বাজি ধরার মানুষ না পেয়ে হতাশ হয়ে ওয়েটারকে আবার অর্ডার দিলো। আমি খুব একটা খেলা দেখিনা তবে এখানে মানুষ দেখতে ভালো লাগে। পেটে খানিকটা যাওয়ার পরই কারো শব্দ একেবারে উদারায় নামে আবার কারো মেজাজ গামা লেভেলে উঠে যায়। আমার সামনে যে বসে আছে সেও কিছুক্ষণ বোবা টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে রইল। কাট গ্লাসের তরল শেষ হচ্ছে কিন্তু সাদা পিরিচগুলোতে দৃশ্যমান অনুসঙ্গের দিকে কারো আগ্রহ নেই। তিনি শুরু করলেন- একাই আসেন?

- অধিকাংশই তাই আসে, আপনিও যেমন এসেছেন।

- লেখেন?

- পড়েছেন কোন বই?

- না তবে বইয়ের দোকানে পাতা উল্টানোর সময় মনে হয় ফ্ল্যাপে দেখেছি।

- শার্প আপনি, ব্যাক পেজের ছবি দেখে মিলিয়ে ফেললেন! এবার আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনিও একা আসেন?

- বলতে পারেন, একা হতেই আসলে আসি। খাওয়াটা ম্যান্ডেটরি না।

- কেন, বন্ধু সঙ্গ বা বাসায় ফিরতে ভাললাগেনা?

- তেমন নয় বিষয়টা, এখানে বসে ভাবি।

- আপনিও লেখেন নাকি ?

- লিখি তবে অপ্রকাশের জন্য।

- কি রকম?

- যা যা ভেতরে লেখা হয় সেসব যেন ভুলেও প্রকাশ না হয় সেই কৌশল রপ্ত করি এখানে বসে বসে।

- আপনিত মজার মানুষ। তা বলুনতো আমার সাথে পরিচিত হতে চাইলেন কেন?

- মনে হচ্ছিল যা ভাবি তা আসলে কারো না কারো সাথে শেয়ার করা দরকার নয়তো এ থেকে আমি বের হতে পারবোনা। আসলে পরিচিত মানুষ বা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সব কথা বলা যায়না। আপনাকে দেখে মনে হলো আপনার বই দেখেছি। অপরিচিত একজন লেখককে বলা যায়, লেখকরা অন্যরকম হন। 

- হয়ত আপনার কথা ঠিক। চাইলে শেয়ার করতে পারেন আপনার ভাবনাটা মানে যেটা অপ্রকাশিত রাখার কৌশল রপ্ত করতে আসেন।

- পরে বলি আজতো মাত্র প্রথম বসলাম আমরা তবে আপনাকেই বলবো।

এই প্রথম আমি পানশালা থেকে ফেরার পর অস্বস্তিতে রাত কাটলো। সাদামাটা হলেও লোকটার চোখ বেশ ধারালো। বেশ কয়েকবার মনে হলো, এমন কি গল্প হতে পারে যা অপরিচিত মানুষকে বলতে হয়। পরপর দুদিন কখনো সাকুরায় যাইনা। গ্যাপ দেই, শরীরের জন্যই। আজ গেলাম। কেন যেন ভদ্রলোকের গল্পটা টানছে। মনে হচ্ছে দারুণ খোরাক অপেক্ষা করছে। লেখকদের হরেক রকম মানুষের সাথে পরিচয় হয়। মানে তারা যেচেই পরিচিত হতে যায় আরকি। বিশেষ করে যারা মানুষকে উপজীব্য করে লেখেন তাদের মিশতে হয়। মানুষের কাছ থেকে গল্প নিয়ে সেই গল্পটাই লিখতে আবার নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে হয়। অফিস সেরে সন্ধ্যার দিকে বসলাম, নাহ লোকটা আসেনি। পরাপর কয়েকদিন তার দেখা নেই। ভালো যন্ত্রণা হলো দেখি। একটা গল্প নিজে থেকে বলবে বলে ঝুলিয়ে রাখলো শ্রোতাকে। সপ্তাহখানেক পর ঢুকে দেখি মূর্তিমান বসে আছেন। নিজেই তার টেবিলে গেলাম। ম্লান হাসলেন। এ কদিনে চেহারা খারাপ হয়েছে।

- কয়েকদিন আসেননি। ঝামেলায় ছিলেন?

- মেয়েটা অসুস্থ্য।

- একটা গল্প বলতে চেয়েছিলেন। 

- জি এখন আর ঠিক বলতে ইচ্ছে করছেনা।

- বলে দেখুন স্বস্তি পেতে পারেন।

- বিষয়টা হাস্যকর কিন্তু প্রতিমুহূর্তে ভাবাচ্ছে বলে অস্থির হয়ে আছি। শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো ভাবনাটা আসছে বারবার। আসলে হয়েছে কি আমার একটাই মেয়ে। বয়স পাঁচ। 

- মেয়ে নিয়ে সমস্যা?

- কিছুটা ওইরকম।

মনে মনে ভাবলাম, যাহ বাবা এবার না ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের সিদ্ধান্ত চেয়ে বসে। অবশেষে পাঁচ বছরের মেয়ের গল্প শুনতে হবে।

- তো কি হয়েছে আপনার বাচ্চার?

- না ওর কিছু হয়নি আপাতত কয়েকদিন ধরে জ্বরে ভুগছে। সমস্যাটা অন্য।

- যেমন?

- আমার বারবার মনে হয় মেয়েটা আমার না।

এবার নড়েচড়ে বসলাম। বেশ একটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কেন মনে হয় আপনার না?

- আমার সাথে কিছুতেই কোন মিল নেই। 

- তা না থাকতেই পারে তাই বলে এমন ভাবনা? যদি কিছু মনে না করেন আপনার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক কেমন?

- সেটাই সমস্যা আসলে ও হচ্ছে আমার দ্যাখা সবচেয়ে শান্ত মানুষ। স্কুলে পড়ায়। স্কুল, বাসা আর মেয়ের বাইরে ওর জগত নেই। নানাভাবে খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছি। এমনকি আপনি শুনলে হয়তো খুব ছোট ভাববেন আমাকে, প্রায়ই ওর মোবাইল চেক করি, এখনো করি কিন্তু সামান্য সন্দেহ করার মতো কিছুই কখনো চোখে পড়েনি। 

- সরাসরি জিজ্ঞেস করার সুযোগওতো নেই মনে হচ্ছে।

- অসম্ভব। আমার স্ত্রী খুব আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ। এ ধরনের কথা বললে ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে।

- যেহেতু সে যথেষ্ট ম্যাচিউরড মানে আপনার কথা ধরেই বলছি, আপনার সমস্যা বুঝিয়ে বললে সহজেই সমাধান হতে পারে। আর এ ধরনের ভাবনাও আসলে আপনার কেন হচ্ছে বুঝতে পারছিনা।

- নিজেও জানিনা কিন্তু বিশ্বাস করুন, পাঁচ বছরের একটা মেয়ে তার সামান্য কিছুতেও মিল থাকবেনা বাবার সাথে?

- বাচ্চা হাসপাতালে হয়েছিল?

- জি।

- ইদানিংতো হাসপাতালের অনেক রকম ঘটনা শোনা যায়। সেখানে কোন ঝামেলা হতে পারে মনে হয়?

- কি রকম?

- আসলে দেখুন অনেক মানুষই এখনো সেকেলে আছেন। যেহেতু মেয়ে সন্তান। হতে পারে হাসপাতালে ওই একই সময় কোনো গোড়া পরিবারের মহিলারও ডেলিভারি ছিল এবং তার পরিবারের আশা ছিল ছেলে সন্তান হবে। টাকার বিনিময়ে এ্যাপেন্ডিক্স অপারেশনের সময় কিডনি রেখে নিচ্ছে হাসপাতালগুলো সেখানে একটা বাচ্চা বদলে দেয়া খুব অসম্ভব না। ভদ্রলোক সামান্য হাসলেন। এই সুযোগটা একেবারেই নেই কারণ আমার চাচাতো বোন ডাক্তার, ওর হাতে ডেলিভারি হয়েছে। তার কেয়ারেই ছিলেন আমার স্ত্রী পুরোসময়। 

- কিছু মনে করবেন না, আপনার স্ত্রীর কোন গোপন সম্পর্ক থেকেওতো থাকতে পারে সেখানে যদি কিছু। না আমি আসলে একটা বাজে সম্ভাবনার কথা শুধু মনে করলাম। আপনি এভাবে ভাববেন না। হতেও পারে আসলে সে আপনারই সন্তান কিন্তু আকস্মিক কোন কারণ ছাড়াই ভাবনাটা মাথায় এসেছে আর আপনি তা থেকে বের হতে পারছেন না। প্রকৃতি অনেকভাবে নিষ্ঠুর আচরণ করে মানুষের সাথে।

- বিশ্বাস করুন আমি কোলে নিয়ে অনেকবার তার গায়ের গন্ধ নিয়েছি। চোখ দেখেছি, হাত-পা, ঘুমাবার ধরণ, খাওয়া কিছুতেই আমার সাথে মিল নেই।

এবার আমার হো হো করে হাসার পালা। একটু ব্যঙ্গ করেই বললাম, একটা শিশু আপনি তার গায়ের গন্ধ শুকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। আশ্চর্য, নিজে একটা সন্দেহ ভুলতে সাকুরায় এসে বসে থাকেন বলে ভাবেন বাচ্চার গায়েও সাকুরার গন্ধ পাবেন? ভদ্রলোক বেশ মর্মাহত হয়েছেন আমার কথায়। তার দৃষ্টি বলে দিচ্ছে, মনে মনে ভাবছেন একজন ভুল মানুষের কাছে তিনি তার গোপন অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে মানুষটা স্বাভাবিক না। জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা সাকুরায় এসে বসে থাকার আগে আপনি কি রোজ বাড়ি ফিরে টিভিতে সিরিয়াল দেখতেন? এসব বেশ ইফেক্ট করে মানুষের মনে।

- না কখনোই তা নয়। আমি যে দায়িত্বে কাজ করি সেখানে সিরিয়াল দেখার মতো বালখিল্য মনোভাব নিয়ে কাজ করা যায়না। আসলে আমার স্ত্রীর একটা আচরণ সন্দেহটা প্রবল করেছে। সে মেয়েটাকে আমার কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে। ধরুণ রাতে ও হটাৎ বললো, বাবার কাছে ঘুমাবো। ওর মা কোনভাবেই সেটা হতে দেবেন না। এমনকি আপনি বিশ্বাস করবেন না কখনো আমার সাথে মেয়েটাকে একা বের হতে দিতে চায়না।

- অদ্ভুত সমস্যাতো তবে এটা মায়েদের অতিরিক্ত কনশাসনেস থেকে হতে পারে। আপনি হয়তো ঠিক তাকে যত্ন করতে পারবেন না এমন আশংকা থেকে করতে পারেন। শুনুন আপনাকে দুটো গল্প বলি। একটা স্টোরি টেলারের কাছ থেকে শোনা অন্যটা সত্যি। এক লোক পশুপাখি পালতে পছন্দ করে। একদিন বিশাল একটা সাপ কিনে নিয়ে এলেন বাড়িতে। তার একটি মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে থাকেন বাড়িতে। ভদ্রলোক আমাকে থামিয়ে দিলেন, আপনি আমাকে নিয়ে গল্প বানাচ্ছেন?

- না প্রথমেই বলেছি গল্পটা আমার শোনা। আপনি শুনতে না চাইলে বলবো না।

- বলুন

- তো সেই লোক সাপ নিয়ে আসার পর তাঁর স্ত্রী খুব নাখোশ কিন্তু তিনি সাপ পুষবেনই। একদিন তারা বাড়িতে ছিলনা। সাপটার খিদে পেলে ভদ্রলোকের কুকুরটা খেয়ে ফেললো। সাপটার একটা অভ্যাস ছিলো। সে কোন কিছু খাওয়ার আগে সেই জিনিসের পাশে যেয়ে তার মাপ নিতো। তা কুকুরটা খেয়ে ফেলা দেখে ভদ্রলোকের স্ত্রী খুব ভয় পেলেন। সে কান্নাকাটি করে অনুরোধ করলো সাপ মেরে ফেলতে। লোকটা কথা শুনলনা। একটা আস্ত কুকুর খেয়ে দিন কতক সাপ পড়ে রইলো ঝিম ধরে। সবাই ভাবলো যাক বাবা হয়তো বুঝেছে সে অন্যায় করেছে। এরপর আরেকদিন ভয়াবহ ঘটনা ঘটলো। প্রায় মাসখানেক হয়েছে কুকুরটা সে হজম করেছে। একদিন ভদ্রলোকের স্ত্রী পাশের রুমে ছিলেন হটাৎ গোঙানোর মতো একটা শব্দ পেলেন এবং ছুটে এসে যা দেখলেন তা ভয়াবহ। সাপের মুখের ভেতর থেকে মেয়ের পায়ের জুতো জোড়া দেখা যাচ্ছে। মহিলা অজ্ঞান হলেন এবং জ্ঞান ফিরলে মানসিক ভারসাম্য হারালেন। সাপ নিয়ে কিছু বলার শক্তিও হারিয়ে ফেললেন। এরপর অনেকদিন চলে গেল। মহিলা একটু একটু সুস্থ্য হয়েছেন। একদিন রান্না করছিলেন, ছুটির দিন। স্বামী প্রবর বাড়িতেই। মহিলার কী মনে হতে হটাৎ বেডরুমে এলেন। দেখলেন বিছানায় লোকটি ঘুমাচ্ছে আর তারপাশে সাপটি শুয়ে লোকটিকে মাপছে। মহিলা সামান্য মুচকি হেসে সেখান থেকে সরে গেলেন।

গল্প শুনে আমার শ্রোতার দৃষ্টি বদলে গেছে। সম্ভবত তিনিও কোন কথা খুঁজে পাচ্ছেন না। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিলেন তারপর বললেন, এটা সত্যি?

- আগেই বলেছি স্টোরি টেলারের কাছ থেকে শোনা। 

- দ্বিতীয় গল্পটা?

- এটা আমার এক কাজিনের ঘটনা। শীতের মধ্যে একদিন ভোররাতে ও উঠেছে স্বামী অফিস যাওয়ার আগে নাস্তা বানাতে। ওর ছেলেটা বাবার পাশে ঘুমানো ছিলো। প্রায় এক ঘণ্টা পর কাজ শেষ করে বেড রুমে এসে দ্যাখে বাচ্চাটা খাটে নেই কিন্তু স্বামী প্রবল নাক ডাকছেন। বাচ্চা খুঁজে পাওয়া গেলো খাটের নিচে। সে মাত্র গড়াতে শিখেছে। মা খাটের একপাশ থেকে উঠে গিয়েছে সেই যায়গা দিয়ে গড়িয়ে সে খাট থেকে মেঝেতে পড়েছে, কার্পেট ছিলো বলে তেমন শব্দও হয়নি বাচ্চাটাও ব্যাথা পায়নি। কিন্তু সে হামাগুড়ি দিয়ে খাটের নিচে চলে গেছে এবং আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেক শীত ছিল, প্রায় ঘণ্টাখানেক ওভাবে থেকে বাচ্চা নীল হয়ে গেছে জমে। তারপর যা হয় নিউমনিয়া, বাচ্চাটাকে বাঁচানো যায়নি। এই ঘটনার পর আমার সেই কাজিন আর স্বামীর সাথে থাকে না।

- আপনার মিথ্যে ও সত্যি দুটো ঘটনাই অদ্ভুত।

- কিছুটা অদ্ভুত হয়তো কিন্তু এই যে আপনার মনে হচ্ছে আপনার সন্তান আপনার না অথচ এর কোন কারণ নেই এই ভাবনাটাওতো কম অদ্ভুত না। আসলে আপনাকে বলতে চেয়েছি, সন্তানের বিষয়ে মায়েদের সবসময় একধরণের ইনসিকিউরিটি কাজ করে হয়তো তা থেকে আপনার স্ত্রী এমন কিছু আচরণ করেন যা স্বাভাবিক না সেকারণেই আপনার মনে সন্দেহ জন্মেছে।

- আচ্ছা আপনার কথা সব মানলাম কিন্তু বলুনতো মেয়ের সাথে আমার কোথাও কোন মিল নেই কেন?

- লোকটার মধ্যে রিপিটেশন সিনড্রম প্রবল। হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম, আপনার যদি নাও হয় এখন আর কি করা যাবে বলুন?

- কিছু করার নেই আমি এই বাচ্চাটাকে খুব ভালোবাসি। 

- আপনার মধ্যে আসলে প্রবল স্ববিরোধিতা কাজ করছে এ বিষয়ে। 

- হয়তো আপনি ঠিক। কিন্তু আজ মনটা ভালো নেই। মেয়েটার জ্বর বেড়েছে। ও ঈদ করতে দাদাবাড়ি যেতে চায়, ওর মা রাজি না। আরেকটা কথা জানেন? যেদিন থেকে মনে হচ্ছে মেয়েটা আমার না তখন থেকেই ওর একটা না একটা অসুখ লেগেই আছে।। 

যদিও এসব অর্থহীন কথা তবুও আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম কারণ এসব কষ্টের কোন সমাধান লেখকরা দিতে পারেন না। তবে না দেখা মেয়েটার জন্য মায়াও হলো, বড়জোড় গল্পটা লিখতে পারি। তাতে কিছু ডালপালা বানাতে হবে, মেয়েটার বয়স বাড়াতে হবে। ভদ্রলোকের স্ত্রীর চরিত্রটা স্পষ্ট করতে হবে। গল্পের নাম দেয়া যেতে পারে ‘সংশয়’। ভদ্রলোককে হালকা করতে বললাম, আপনি হয়তো বুঝতে পারছেন না, আপনার স্ত্রী আসলে এবার ছুটিতে তার বাবার বাড়ি যেতে চাইছে। এনিওয়ে আপনাদের একই শহরে বাড়ি?

- না আমার যশোর, ওর রাজশাহী। 

- কিছু মনে করবেন না, আমাকে কেন আপনার সংশয়ের কথাটা বললেন? 

- আসলে আপনি লেখেন কিনা! লেখকরা সংবেদনশীল হয়, আমার মনে হলো কেউ লিখলে আমি একটু স্বস্তি পাবো। আরও একটা কথা, এমন ব্যক্তিগত অনুভূতি বলতে একটা বিষয় হয়তো আমাকে আরও এগিয়ে দিয়েছে।

- কি সেটা? আমি ভালো শ্রোতা?

- তা হয়তো আপনি আছেন তবে আপনার সাথে আমার মেয়ের চেহারার অদ্ভুত মিল রয়েছে। 

ভদ্রলোকের সাথে এই পর্বের আমার এখানেই শেষ। এরপর আর সাকুরায় যাওয়া হয়নি গত তিনমাসে। ইচ্ছে করেই যাইনি। তিনি আমাকে খুঁজতে বনানী পর্যন্ত চলে এসেছেন দেখে বিস্মিত হইনি তা নয়। তবে তা চেপে গিয়েই কথা শুরু করলাম। 

- আপনি কি শুধু গল্পের শেষটা বলবেন বলেই আমাকে খুঁজছিলেন?

- ধরুণ তাই

- এখন বলবেন?

- সে জন্যই এসেছি

- ধরুন মেয়েটার বাবা এমন সন্দেহ থেকে গোপনে খোঁজ খবর নিয়ে সত্যিটা আবিষ্কার করলেন। এবং জানলেন যে তার স্ত্রীর একজন প্রেমিক ছিল বটে বিয়ের আগে।

আমি ভদ্রলোকের কথা শুনছি।

ছেলেটার বিয়ে করার পরিস্থিতি নেই এবং এই বাস্তবতা দুজনই ভালো জানেন। কিন্তু ইমোশনটা অনেষ্ট ছিলো। ফলে বিয়ের খবরটা যখন মেয়েটা জানালো দুজনই প্রচণ্ড ইমোশনাল হলো এবং মুহূর্তে তাদের সেই আবেগ বাঁধ ভাংলো, ফলাফল মেয়েটা। কিন্তু ভদ্র মহিলা নিজেও বুঝতে পারেন নি আসলে মেয়েটা কার সন্তান। যতো বড় হতে থাকলো ততো তার চেহারা স্পষ্ট হচ্ছে আর সে জন্যই তার ভয়। সেই ভদ্রলোক বিষয়টা ধরে ফেললেন এবং পানশালায় এসে আপনার মতো এক লেখককে পেয়ে গল্পটা করলেন। 

আমার নিঃশ্বাস আটকে আসছিল ভদ্রলোকের কথায়। তবু খুব শক্ত থাকার চেষ্টা করছি। স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর এনে বললাম তাহলে আপনি জেনেছেন যে আপনার স্ত্রীর একটা ভুলের কারণে এমন হয়েছে? এটুকুই লিখতে হবে গল্পের শেষে তাইতো?

না আমার কথা শেষ হয়নি। আপনাকে বলেছিলাম কেন আপনাকে এতো ব্যক্তিগত অনুভূতি শেয়ার করলাম।

- মনে পড়ছেনা, লেখক বলে?

- না বলেছিলাম আপনার সাথে আমার মেয়ের চেহারার মিল আছে।

- আমি নিঃশ্বাস চেপে বসে আছি।

- আমার মেয়ের জ্বর বলেছিলাম। 

- হ্যা মনে পড়েছে

- আমার মেয়েটা নেই।

- বুঝতে পারছিনা কি বলছেন?

- যদিও বায়োলজিক্যাল বাবা নই তবুও যেহেতু সে বাবা ডাকতো বিশ্বাস করি আমিই আসল বাবা। আচ্ছা গল্পের শেষটুকু লিখতে পারবেনতো নাকি আমার মৃত মেয়ের জন্য আপনারও কষ্ট হবে?



- উঠে যাবো কিনা ভাবছি কিন্তু পা মনে হচ্ছে মাটিতে গেঁথে আছে। কোথাও পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে, যাওয়ারও যায়গা নেই। বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু প্রায় ছয় বছর হলো রাজশাহী যাইনা আমি। ভদ্রলোকের গল্পটা লেখা হলোনা আমার।

৭টি মন্তব্য:

  1. ঝরঝরে, মেদহীন গল্প। একটানে পড়লাম। লেখককে শুভেচ্ছা। আরও লিখুন।

    উত্তরমুছুন
  2. বাহ্। দুর্দান্ত মঞ্জুরী আপা। ব্রাভো।

    উত্তরমুছুন
  3. " বহুস্তরিয় গল্প ‘গল্পটা দুজনের’। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটা সাসপেনশন নিয়ে পড়তে হয় গল্পটি। জমজমাট গল্পটি সাব-লজিক আর এন্টি-লজিকের দ্বৈরথ। একদিকে সন্দেহের সাপ গিলে খাচ্ছে পোশা কুকুর, ঔরসজাত সন্তান, শেষ পর্যন্ত নিজেকে আর স্ত্রীকে করছে উন্মাদিনী; অন্যদিকে সন্দেহের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনার বীজ অঙ্কুরোদগম ঘটাচ্ছে লুকানো সত্যের সুটকেস। যেখানে লেখকের অতীত জীবন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে এক চাকুরিজীবীকে, আর চাকুরিজীবী খুঁজে নিচ্ছেন অপরাধী লেখককে। অনেকটা অপরাধ শাস্তি খুঁজে পাওয়া আর শাস্তির অপরাধ খুঁজে পাওয়ার মতো বিখ্যাত সাহিত্য চিন্তা। "
    সূত্র : ‘রক্তমূলে বিচ্ছেদ’র সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম : গল্পের পাল বংশীয় শিল্পী
    লিংক : http://www.galpopath.com/2017/04/blog-post_22.html
    # অলাত এহসান

    উত্তরমুছুন
  4. অদ্ভুত !! ভীষণ ভালো লাগলো ।

    উত্তরমুছুন
  5. সকলের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা। সময নিয়ে পড়েছেন। কেও এমনকি আলোচনাও করলেন কিছুটা।

    উত্তরমুছুন