বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

চী্নের গল্প : রোগমুক্তি (দি কিউর)

মো ইয়ান
অনুবাদ: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

সেদিন বিকেলে রাস্তার ধারে মা কুইসানের বাড়ির ধবধবে সাদা দেয়ালে “দি আর্মড ওয়ার্ক ডিটাচমেন্ট” এর একটি নোটিশ দেখা গেল। নোটিশের ঘোষণা অনুযায়ী পরদিন সকালে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হবে। স্থান যথারীতি আগেরটাই। জিআও নদী উপর যে ব্রিজটা রয়েছে তার দক্ষিণ মাথায়। যেহেতু ব্যাপারটা অত্যন্ত শিক্ষামূলক সেহেতু গ্রামের সুস্থ সবল সকলের উপস্থিত সেখানে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।।
মৃত্যুদ-ের এই ব্যাপারটি সে বছর এত বেশি ঘটেছিল যে জনতা এসব দ-াদেশ অনুষ্ঠানের প্রতি
একেবারেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। আর তাই জোর করে সবাইকে উপস্থিত করাটাই ছিল ভিড় জমানোর একমাত্র উপায়।

ঘরের ভেতর জমাট কাল অন্ধকার থাকতেই বাবা উঠে কুপি ধরাল। চামড়ার জ্যাকেটটি নিজের গায়ে চাপিয়ে সে আমাকে ডাক দিল। এতো হিম-শীতের ভেতর বিছানার উষ্ণ আরাম ছেড়ে উঠতে আমার মন চাইছিল না। বাবা টান দিয়ে আমার কম্বলটা সরিয়ে দিল, “ তাড়াতাড়ি উঠে পড়। আর্মড ওয়ার্ক ডিটাচমেন্ট তাদের কাজকর্ম সকাল সকাল শেষ করতে পছন্দ করে। দেরী করলে আমাদের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।”

অগ্যতা তাকে অনুসরণ করে ঘর থেকে বের হয়ে এলাম। পূবের আকাশ তখন একটু একটু ফর্সা হয়ে আসছে। নির্জন পথঘাট ঠা-ায় একেবারে জমাট বেধে আছে। রাতের বেলায় উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা বাতাসে ধুলোবালি সরে যাওয়ায় ধূসর পথটা পরিষ্কার চোখে পড়ছে। ঠা-ায় আমার হাত পায়ের আঙ্গুলগুলো জমে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কোন হতচ্ছাড়া পাজি বেড়াল ওগুলো আচ্ছামত চিবিয়ে অসাড় করে ফেলেছে। মা কুইসানের পারিবারিক উঠোনটা পার হবার সময় খেয়াল করলাম জানালায় আলো জ্বলছে। ভেতর থেকে অর্গানের বাজনাও শোনা গেল। বাবা নিচু স্বরে বললো, “পা চালিয়ে চল। এখানে আর্মড ওয়ার্ক ডিটাচমেন্ট এর লোকজন ছাউনি ফেলেছে। ওরা এখন চা পানি খেয়ে তৈরি হচ্ছে”।

প্রায় টানতে টানতে সে আমাকে নদীর তীরের মাথায় নিয়ে এলো। এখান থেকে পাথুরে ব্রিজটির অন্ধকার অবয়ব আর নদীর বুকে বরফের কয়েক ফালি সাদা প্রান্ত সরাসরি চোখে পড়ে।

“আমরা কোথায় লুকাবো?”

“সেতুর নিচে”, বাবা উত্তর দিল।

সেতুর নিচের জায়গাটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছাওয়া, পুরোপুরি জনমানবহীন, আর হিম-ঠা-া শীততো আছেই। আমার মাথার চুলগুলো শিরশির করে উঠল। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার মাথার চুলগুলো এমন দাঁড়িয়ে যাচ্ছে কেন?’’

“আমারও তোর মত একই অবস্থা”, বাবা কোন রাখঢাক না রেখেই স্বীকার করলো। “এই জায়গাটায় ওরা এতো মানুষকে গুলি করে মেরেছে যে নিপীড়িত মানুষদের অতৃপ্ত আত্মারা চারিদিকে ছড়িয়ে আছে”।

সেতুর নিচে অন্ধকারে রোমশ কিছু প্রাণীর অস্তিত্ব টের পেয়ে আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম, “ঐ যে ওরা ওখানে।”

বাবা সেদিকে তাকিয়ে আমাকে অভয় দিলো, “ওগুলো অতৃপ্ত আত্মা নয়রে বোকা। ওগুলো মড়া খেকো কুকুর।”

বাবা অভয় দিলেও আতঙ্কে আমি কয়েক পা পিছিয়ে গেলাম। শেষে হাড় অবশ করে দেয়া ঠা-া একটা স্তুপের সাথে ধাক্কা খেয়ে থামতে বাধ্য হলাম। স্তুপটা সেতুরই একটা অংশ। সেখানে দাঁড়িয়ে আমি দাদীমার কথা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। দাদীমার চোখ ছানি পড়ে ঘোলা হয়ে গেছে। এখন কেবল পুরোপুরি অন্ধ হতেই তার বাকি।

পশ্চিম আকাশের তিনটি তারা থেকে আসা ম্লান আলো সেতুর নিচে বাকাভাবে পড়তে পড়তে আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাবে। সময় কাটাতে বাবা তার পাইপটা ধরাতেই তামাকের মিষ্টি গন্ধে জায়গাটা ভরে উঠল। নাক দিয়ে শ্বাস নিতে পারলেও আমার ঠোঁট দুটোতে কোন অনুভূতি পাচ্ছিলাম না। বাবাকে বললাম, “ আমি একটু দৌঁড়ে নেই, কী বলো? ঠা-ায় একেবারে জমে যাচ্ছি।”

বাবা মাথা নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে বলল,“দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা কর, বাছা। সকালের সূর্যের রং লাল থাকতে থাকতেই ওরা বন্দীদের গুলি করবে।”

“আজ ওরা কাকে গুলি করবে, বাবা?”

“আমি ঠিক জানি না”, বাবা বললো।“তবে একটু পরেই সেটা জানা যাবে। আশা করি ওরা এবার কম বয়সের কাউকে মারবে।”

“কম বয়সের কেন, বাবা?”

“কমবয়সীদের শরীর সুস্থ সবল হয়। ফলাফলও তাতে ভাল পাওয়া যায়।”

আমার কৌতূহল তখনও মেটেনি। কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে বাবার ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে যাবার উপক্রম হল।“আর কোন প্রশ্ন নয়। আমাদের সব কথা উপর থেকে শোনা যায়।”, বলে বাবা আমাকে চুপ থাকার ইশারা করলো।

আমাদের কথাবার্তার ভেতরেই আকাশটা মাছের পেটের মত ফর্সা হয়ে গেছে। গ্রামের কুকুরগুলো একজোট হয়ে বিকট স্বরে ঘেউ ঘেউ শুরু করেছে। কুকুরের চিৎকার ছাপিয়ে আমরা মহিলাদের বিলাপের স্বর শুনতে পেলাম। এক মুহূর্তের জন্য বাবা আড়াল থেক বেরিয়ে এসে নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গ্রামের দিকে কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করল। এবার আমি সত্যিই বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। চেয়ে দেখেলাম, সেতুর নিচে ঘুরঘুর করা মড়াখেকো কুকুরগুলো এমনভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছে যেন পারলে ওরা আমার শরীরটাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। আমি এক ছুটে ওখান থেকে পালাতে চাইলাম। কিন্তু কোন এক দৈব শক্তির বলে আমি ওখান থেকে পালিয়ে যাবার ইচ্ছাটাকে শেষমেশ দমন করতে পারলাম। খানিক বাদে বাবা গুটিসুটি মেরে চুপিসারে আমার কাছে ফিরে এলো। ভোরের আবছা আলোতে দেখলাম তার ঠোঁট দুটো কাপছে। তবে সেটা ভয়ে না শীতের কারণে তা বুঝতে পারলাম না। “কিছু শুনলে?” ব্যাগ্র হয়ে জানতে চাইলাম আমি।

“কথা বলিস না।”, বাবা নিচু কণ্ঠে বলল।“ওরা এখুনি পৌঁছে যাবে। কথাবার্তা শুনে মনে হল ওরা আসামীদের বেঁধে ফেলেছে।”

আমি বাবার কাছাকাছি গা ঘেঁষে বসলাম। এক গুচ্ছ আগাছাকে গদি বানিয়েছি আমরা। ওখানে বসে সাবধানে কান খাড়া করে গ্রাম থেকে ভেসে আসা ঘন্টার ধ্বনি শুনতে পেলাম। সেই সাথে একটা লোকের কর্কশ কণ্ঠও শোনা গেল: “গ্রামবাসী, মৃত্যুদ- দেখার জন্য ব্রিজের দক্ষিণ প্রান্তে চলে যান। স্বৈরাচারী জমিদার মা কুইসান-তার স্ত্রী- আর তার আজ্ঞাবহ গাঁয়ের তথাকথিত পুতুল মোড়ল লুয়ান ফেংশান এদের সবাইকে গুলি করে মারা হবে। যারা এই মৃত্যুদ- দেখতে উপস্থিত থাকবে না, আর্মড ওয়ার্ক ডিটাচমেন্ট এর প্রধান ঝ্যাং এর নির্দেশ অনুযায়ী তাদেরকে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে শাস্তি দেয়া হবে।”

শুনতে পেলাম বাবা নিচু স্বরে বিড়বিড় করছে, “মা কুইসানের সাথে ওরা এমন নিষ্ঠুর আচরণ করছে কেন? কেন ওকে মেরে ফেলবে ওরা? নিরপেক্ষভাবে অপরাধ বিচার করলেতো গ্রামের সবার পরে তার শাস্তি পাবার কথা!”

কেন মা কুইসেনকে মৃত্যুদ- দেয়া উচিত নয় সেটা আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করতে চাইলাম। কিন্তু মুখ খোলার আগেই রাইফেলের গর্জন শোনা গেল। আকাশের দিকে লক্ষ্য করে কেউ বাতাসে গুলি ছুড়ল। আমাদের মাথার ওপরে ব্রিজ বরাবর ঘোড়ার খুরের শব্দ পেলাম। ঘূর্ণিঝড়ের মত খট খট শব্দ তুলে ঘোড়সওয়ার বাহিনী ব্রিজটা পার হয়ে গেল। বাবা আর আমি ব্রিজের আড়ালে আরো গুটিসুটি মেরে যেন অদৃশ্য হয়ে যেতে চাইলাম। পাথরের ফাঁক গলে আসা সূর্যের আলোর নরম রূপালী আভার দিকে তাকিয়ে আমরা ঘটনাটা বোঝার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ওপরে ঠিক কি ঘটছে দুজনের কেউই তা বুঝতে পারলাম না। একটা তামাক ভরা পাইপ শেষ করতে যতোটা সময় লাগে তার প্রায় অর্ধেক সময় পার হবার পর কিছু লোকের চিৎকার, পায়ের আওয়াজ আর অস্ত্রের ঝনঝন শব্দ আমাদের দিকে এগিয়ে এলো। আমাদের মাথা বরাবর লোকগুলো হঠাৎ থেমে দাঁড়িয়ে পড়লো। হাঁসের ডাকের মত বেসুরো গলায় একটা লোক বলে উঠলো, “ধুত্তোরি ছাই, ওকে যেতে দে। ওটাকে আমরা কখনোই ধরতে পারব না।”

ছুটন্ত পায়ের শব্দ লক্ষ্য করে আরেকজন লোক কয়েকটা গুলি ছুঁড়লো। আমাদের লুকানোর জায়গার পাশের দেয়ালে গুলির শব্দের তীব্র প্রতিধ্বনি হল। কানে প্রায় তালা লেগে যাবার উপক্রম হল আমার। সেইসাথে বারুদের গন্ধে চারপাশের বাতাসটাও মুহূর্তেই ভারি হয়ে উঠলো।

হাঁসের কণ্ঠের অধিকারী আবারও খেঁকিয়ে উঠলো, “কোন বেজন্মাকে গুলি করছিস তুই? ব্যাটা এতোক্ষণে অন্য দেশে পগারপার হয়ে গেছে।”

“আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি যে ঐ ছোকরা এমনভাবে পালাতে পারবে।”, অন্য একজন মন্তব্য করল। “ওস্তাদ ঝ্যাং, ব্যাটার দৌঁড় দেখে মনে হল, শালা আসলে খামারে কাজ করা শক্তপোক্ত রাখাল ছিল।”

“আমাকে যদি জিজ্ঞেস করিস, তাহলে বলবো হারামজাদাটা ছিল জমিদার শ্রেণীর হুকুমের কুত্তা যার কাজ মনিবের পক্ষে দৌঁড়ে পাল্লা দেয়া।”

কেউ একজন সেতুর রেলিং এর পাশে হেঁটে এসে পেশাব করতে শুরু করল। গন্ধটা ঝাঁঝালো আর অসহ্য।

“চল সবাই, ফিরে যাই”, হাঁসের গলার প্যাক প্যাক শোনা গেল আবার।“হাতে সময় কম, আমাদের আবার মৃত্যুদ- দেবার কাজটা শেষ করতে হবে।”

বাবা ফিসফিস করে অমাকে বুঝিয়ে দিলো, হাঁসের মতো গলায় যে লোকটা কথা বলছে সে আসলে আর্মড ওয়ার্ক ডিটাচমেন্ট এর প্রধান। বিভাগীয় সরকার তার হাতেই দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী বিশ্বাসঘাতকদের সমূলে ধ্বংস করার দায়িত্ব ন্যাস্ত করেছে। ঐ লোকটাকেই অন্যরা ওস্তাদ ঝ্যাং বলে সম্বোধন করছে।

সূর্য যে দিকে সেদিকটাতে আকাশ আস্তে আস্তে গোলাপী রং ধারন করছে। আকাশের খুব নিচের দিকে এক টুকরো পাতলা মেঘ ঝুলে ছিল। একটু পর মেঘের রংও গোলাপী হয়ে গেল। চারপাশের আলোয় এতোক্ষণে দেখতে পেলাম যে, আমরা যেখানে লুকিয়ে আছি তার আশেপাশে কুকুরের জমাট বাধা বিষ্ঠা, কিছু জীর্ণ কাপড়চোপড়, চুলের গোছা আর মানুষের আধ খাওয়া মাথার খুলির একটা অংশ পড়ে আছে। দৃশ্যটা এতো ভয়াবহ যে আমি অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য হলাম। নদীর পাড়ের মাটি খটখটে শুকনো। এখানে সেখানে কেবল বরফে ঢাকা কিছু পানি ভরা গর্ত দেখা যাচ্ছে। ঠা-া বাতাসে নদীর ঢালের শিশির পড়া কিছু আগাছা আর পাশের গাছগুলো শক্ত কাঠের মত দাঁড়িয়ে আছে। উত্তরের কনকনে বাতাসটা এখন খানিকটা কম। আমি পেছন ফিরে বাবার দিকে তাকালাম। ঠা-ায় তার নিঃশ্বাসের বাতাসও দেখা যাচ্ছে। আমারা চুপচাপ অপেক্ষা করতে থাকলাম। আমার মনে হচ্ছিল সময় যেন থমকে আছে। অবশেষে নীরবতা ভেঙ্গে বাবা বলে উঠলো, “ঐ যে ওরা আসছে।”

ঘন্টা আর নির্বাক মানুষগুলোর পায়ের শব্দ মৃত্যুদ- অনুষ্ঠানের জন্য সমবেত হওয়া গ্রামবাসীর আগমন ঘোষণা করলো। তারপরই একটা ভরাট কণ্ঠ চিৎকার করে উঠলো, “ওস্তাদ ঝ্যাং, ওস্তাদ আমার, সারাটা জীবন আমি একজন সৎ মানুষের মতোই চলেছি.....”

বাবা ফিসফিস করে বললো, “এটা মা কুইসানের গলা।”

এবার কান্না ভেজা, আবেগে বুজে আসা আরেকটি কণ্ঠ বলে উঠলো, “ওস্তাদ ঝ্যাং, দয়া করুন...গ্রামের মোড়ল নির্বাচনের জন্য আমরা লটারির আয়োজন করেছিলাম; আমি এ দায়িত্ব নিতে চাইনি...এটা আমার ভাগ্যে ছিল; লটারিতে আমিই সবচেয়ে ছোট খড়টা পেলামÑ আমারই পোড়া কপাল....ওস্তাদ ঝ্যাং, দয়া করুন, আমার মতো ছোটলোকের তুচ্ছ জীবনটা রক্ষা করুন...বাড়িতে আমার আশি বছরের বুড়ি মা আছে...”

বাবা আবারও ফিসফিস করে বললেন, “ওটা লুয়ান ফেংশান।”

লুয়ান ফেংশানের কণ্ঠ ছাপিয়ে আরেকটা তীক্ষè গলা বলে উঠলো, “ওস্তাদ ঝ্যাং, আপনি আমাদের বাড়িতে যখন এলেন তখন আপনাকে আমি মেহমানের সমাদর করেছি, ঘরের সবচেয়ে দামী মদটাই পরিবেশন করেছি। এমনকী আমার আঠারো বছরের মেয়েটাকেও আপনার সেবায় লাগিয়েছি। ওস্তাদ ঝ্যাং, আপনি তো আর পাষাণ হৃদয় নন, তাই না?”

“ওটা মা কুইসানের স্ত্রী”, বাবা বলতেই থাকলো।

সবশেষে, এক মহিলার রাগত কণ্ঠের চিৎকার শোনা গেল, “উউ- লা- আহ্-ইয়াÑ।” “ওটা লুয়ান ফেংশানের বোবা বৌ”, বাবা আমাকে চেনালো ।

এবার শান্ত , স্বাভাবিক স্বরে ওস্তাদ ঝ্যাং বললো, “তোমরা যতোই ঝামেলা পাকাও না কেন তোমাদেরকে মরতে হবেই। সুতরাং চিৎকার চেচামেচি করে কোন লাভ নেই। সবাইকে এক সময় না এক সময় মরতে হয়ই। তোমাদের জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই জীবনের পাট চুকিয়ে ফেলাই ভাল যাতে অন্য কারো রূপে জন্ম নিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারো।”

ঠিক সেই মুহূর্তেই মা কুইসান উঁচু গলায় জনতাকে উদ্দেশ্য করে বললো, “ উপস্থিত ছেলেবুড়ো সবাইকে বলছি, আমি মা কুইসান, কখনো তোমাদের কারো কোন ক্ষতি করিনি। তাই এখন তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ আমার স্বপক্ষে তোমরা কথা বলো...দোহাই লাগে...!”

মা কুইসানের কথায় কাজ হলো। বেশ কিছু লোক হাঁটু গেড়ে বসে মরিয়া কণ্ঠে বলতে লাগলো, “দয়া করুন, মহান ঝ্যাং, ওদের বাঁচতে দিন, ওরা সৎ মানুষ...!”

একটি যুবক কণ্ঠ সবাইকে ছাপিয়ে বলে উঠলো, “ওস্তাদ ঝ্যাং, আমার প্রস্তাব হলো আমরা এই চারটা বেজন্মা কুত্তাকে ব্রিজের উপরে হাতে ভর দিয়ে আমাদের প্রতি মাথা নুঁইয়ে একশবার মাফ চাইতে বলি। তারপর ওদের কুত্তার জীবন ফিরিয়ে দেই। কী বলেন?”

“গাও রেনশান, তোমার বুদ্ধি বটে একখান!”, ওস্তাদ ঝ্যাং বিদ্রুপের কণ্ঠে বলে উঠলো।“তুমি কি বোঝাতে চাইছো যে, আমিÑএই ঝ্যাং কুড, একটা প্রতিশোধপরায়ণ দানব? তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি মিলিশিয়া প্রধানের পদে অনেক দিন ধরে কাজ করতে করতে অকেজো হয়ে পড়েছো!” তারপর সে উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে বললো, “গ্রামবাসী ভাই ও বোনেরা আপনারা সবাই উঠে পড়–ন। এই শীতের ভেতর বেশিক্ষণ ওভাবে হাঁটু মুড়ে বসে থাকাটা অমানবিক। আমার নীতি খুবই স্বচ্ছ। এদের এখন আর কেউই বাঁচাতে পারবেনা। সুতরাং সবাই উঠে পড়–ন, মৃত্যুদ- দেখার জন্য প্রস্তুত হন।” 

“প্রিয় গ্রামবাসী, আমার পক্ষে দয়া করে তোমরা কিছু বলোÑ”, মা কুইসানের কণ্ঠে আবারও অনুনয় ঝরে পড়লো।

“আর সময় নষ্ট করা যাবে না”, ওস্তাদ ঝ্যাং মা কুইসানকে থামিয়ে দিল।“সময় হয়ে গেছে।”

“সবাই সরে দাঁড়ান, জায়গাটা একটু ফাঁকা করুন!”, ব্রিজের মাথায় দাঁড়ানো কয়েকজন যুবক, নিশ্চিতভাবে যারা আর্মড ওয়ার্ক ডিটাচমেন্ট এর সদস্য, তারা ব্রিজের উপরে হাঁটু গেড়ে বসা লোকজনকে ধাক্কাধাক্কি করে সরিয়ে দিলো।

উপায়ন্তর না দেখে মা কুইসান স্বর্গবাসীদের কাছে তার আবেদন পেশ করলো, “আকাশবাসী পূর্বপুরুষেরা আমার, তোমরা কি অন্ধ হয়ে গেছো? আমি, মা কুইসান কি তার সমস্ত ভাল কাজের প্রতিদান হিসেবে মাথায় গুলি খেয়ে মরবো? ঝ্যাং কুড, কুত্তার বাচ্চা, তুই নিজের বিছানায় শান্তিতে মরতে পারবি না। আমার কথা শুনে রাখ, কুত্তার বাচ্চা কোথাকারÑ”

“তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ফেল্!”, ওস্তাদ ঝ্যাং রাগে গরগর করে তার অধীনস্তদের আদেশ দিলো।“নাকী তোরা সবাই বসে বসে হারমখোরটার ফালতু বক বক শুনতে চাস?”

আমার মাথার ওপরে ব্রিজ জুড়ে ছুটন্ত পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। পাথরের সরু ফাকফোকর দিয়ে আমি মানুষজনকে এক পলক দখেতে পেলাম।

“হাঁটু গেড়ে বস হারামজাদা!”, ব্রিজের দক্ষিণ দিক থেকে কেউ একজন হুকুম করলো। “সবাই, পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াও”, উত্তর প্রান্ত থেকে আরেকটা কণ্ঠ বলে উঠলো।

পওÑপওÑপওÑ তিনটা গুলির শব্দ শোনা গেলো।

প্রচ- শব্দে আমার কানে তালা ধরে যাবার উপক্রম হলো। মনে হলো, বধির না হওয়া পর্যন্ত ঐ শব্দ আমার কানে বাজতেই থাকবে। ততক্ষণে আকাশে সূর্য উঠে গেছে। সূর্যের চারপাশে রক্তের মতো আলোর একটা বলয় এমনভাবে মেঘের গায়ে ছড়িয়ে পড়েছে যে দেখে মনে হচ্ছে ওটা দানবাকৃতির ফার গাছের ওপরের কোন আবরণ। ব্রিজের ওপর থেকে সহসাই বড়সড় মোটা একটা মানুষের দেহ ধীরে গড়িয়ে নেমে এলো। মেঘের মতো আকৃতি বদল করতে করতে নিচের বরফ জমা মাটি ছুঁয়ে দেহটা স্বাভাবিক হল তারপর ভোঁতা একটা শব্দ তুলে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল। দেহটার মাথা থেকে স্বচ্ছ রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়তে দেখলাম।

ব্রিজের উত্তর দিক থেকে ভীত সন্ত্রস্ত মানুষের হুড়োহুড়ি শব্দ শোনা গেল। মনে হলো, যে সব গ্রামবাসীকে জোর করে মৃত্যুদ- দেখার জন্য এখানে সমবেত করা হয়েছে তারা আতঙ্কিত হয়ে ছুটোছুটি করছে। পালিয়ে যাওয়া মানুষদের পেছনে আর্মড ওয়ার্ক ডিটাচমেন্ট এর সদস্যরা ধাওয়া করছে তেমন কোন আলামত পেলাম না, বরঞ্চ মৃতুদ- কার্যকর করতেই তাদের বেশি আগ্রহী মনে হলো।

আগের মতোই ছুটন্ত পায়ের আওয়াজ ব্রিজের উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে সরে গেলো। সেই সাথে ব্রিজের দক্ষিনে কর্কশ কণ্ঠের আদেশ শোনা গেল, “হাঁটু গেড়ে বস!” উত্তর প্রান্ত থেকে আরেকটি কণ্ঠ ভেসে এলো, “সামনে থেকে সরে দাঁড়াও!” তারপর আরো তিনটি গুলির শব্দÑ টুপিহীন লুয়ান ফেংশানের জীর্ণ কোট পরা শরীরটা উল্টো হয়ে নদীতীরে পড়ে প্রথমে মা কুইসানের দেহের সাথে বাড়ি খেল তারপর পাশে গড়িয়ে পড়ল।

এরপরের কাজ আরো দায়সারাভাবে সেরে ফেলা হলো। একটানা গুলির শব্দ শুনলাম। তারপর আলুথালু বেশের দুটি মহিলার মৃতদেহ গড়িয়ে নামলো। হাত পা ছড়িয়ে তাদের পুরুষ সঙ্গীদের শরীরের উপর এসে তারা থামলো।

নিজের পুরু পাজামার ভেতরে গরম আর ভেজা কিছুর অস্তিত্ব টের পেয়ে আমি ভয়ে বাবার হাত জাপটে ধরলাম।

আমাদের মাথার ঠিক ওপরেই কমপক্ষে আধা ডজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। আমার কেবলই মনে হচ্ছিলো লোকগুলোর ভারে পাথরের সেতুর মেঝেটা আমাদের মাথার উপরেই ধ্বসে পড়বে। লোকগুলোর বজ্রের মত বাঁজখাই কণ্ঠের শব্দে কানে প্রায় তালা লেগে যাচ্ছিলো। “লাশগুলো কি পরীক্ষা করে দেখবো, ওস্তাদ?”, ওদের একজন বললো।

“কোন কচুটার জন্য শুনি?” ওস্তাদ ঝ্যাং জবাব দিলো। “চারিদিকে ওদের মগজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। স্বয়ং ঈশ্বর নেমে এলেও ওদেরকে আর বাঁচাতে পারবে না।”

“চলো সবাই, এবার যাওয়া যাক! বুড়ো গুয়োর বউ বিনের দই আর তেলের পিঠা বানিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

ভারি পায়ে হিমবাহের গর্জন তুলে লোকগুলো ব্রিজ পার হয়ে উত্তরের দিকে চলে গেলো। তাদের ভারে পাথরের মেঝেটা নড়ে চড়ে আর্তনাদ করে উঠলো। আমার মনে হলো যে কোন মুহূর্তে ওটা নিচে ভেঙ্গে পড়বে।

তারপর আবার নীরবতা নেমে এলো। বাবা আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বললো, “হাবার মতো ওরকম দাঁড়িয়ে থকিস না। তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ফেলি, চল্ ।”

উদভ্রান্তের মতো নিজের চারিদিকে তাকালাম কিন্তু কী ঘটছে কিছুই মগজে ঢুকলো না। এমনকী নিজের বাবাকে পর্যন্ত পরিচিত মনে হলেও সে এখানে কী করছে তা বুঝতে উঠতে পারলাম না।

“হুম?” আমি নিশ্চিত যে সর্বশক্তি দিয়ে কেবল ঐ একটা শব্দই আমি তখন বলতে পেরেছিলাম: হুম?”

“তুই কি সব ভুলে ভাতে দিয়ে খেয়ে ফেলেছিস?”, বাবা প্রায় ধমকে উঠলো।“আমরা এখানে তোর দাদীর রোগমুক্তির জন্য ওষুধ নিতে এসেছি। মড়াখেকোগুলো ফিরে আসার আগেই আমাদের দ্রুত কাজ সারতে হবে।”

বাবার কথাগুলো আমার কানে কেবলই প্রতিধ্বনি তুললো, কথার আগামাথা কিছুই আমি বুঝতে পারলাম না। ঠিক তখনই খেয়াল করলাম বিভিন্ন রংয়ের সাত আটটা বুনো কুকুর নদী তীর থেকে উঠে আমাদের দিকেই আসছে। নদীর পানিতে কুকুরগুলোর দীর্ঘ ছায়া পড়েছে। আমাদের উদ্দেশ্যে ভীষণ জোরে ঘেউ ঘেউ করে চলছে ওগুলো। এতোক্ষণে মনে পড়লো প্রথম গুলির শব্দ হওয়া মাত্রই কুকুরগুলো তারস্বরে চিৎকার করতে করতে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।

বাবাকে দেখলাম লাথি মেরে কয়েকটা ইট আলগা করে জানোয়ারগুলোর দিকে ছুঁেড় মারলো। ইটের ঘা থেকে বাঁচার জন্য ওরা কিছুটা পিছিয়ে গেল। বাবা তাতে থামলো না। কুকুরগুলোকে আরো ভয় দেখানোর জন্য সে কোটের তলায় লুকিয়ে রাখা বাঁকা ছুরিটা বের করে শূন্যে একটু নাচিয়ে নিল। তার গাঢ় ছায়ামূর্তির চারপাশে ছুরিতে প্রতিফলিত হওয়া রূপালী আলোর বলয় অদ্ভূত সুন্দরভাবে ঝিকমিকিয়ে উঠলো। কুকুরগুলোকে সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে লেজ গুটিয়ে পিছিয়ে যেতে দেখলাম। বাবা এই ফাঁকে নিজের কোমরের রশিটা আঁটো করে বেঁধে জামার হাতা গুটাতে গুটাতে বললো, “আমি কাজ শুরু করছি, তুই একটু নজর রাখিস।”

শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া ঈগলের মতোই ক্ষিপ্রতার সাথে বাবা মহিলাদের শরীরগুলো টেনে সরিয়ে ফেললো । মা কুইসানের দেহটাকে খুঁজে পেতেই মৃতদেহটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে হাতে ভর দিয়ে মাথা নুইয়ে সম্মান জানালো সে।“দ্বিতীয় প্রভূ মা”, নরম কণ্ঠে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বলতে থাকলো সে, “বিশ্বস্ততা আর সন্তানোচিত দায়িত্ব পালনের নিজস্ব একটা সীমানা আছে। আপনার সাথে এমনটা করতে আমার নিজেকেই নিজে ঘৃণা করতে ইচ্ছে হচ্ছে।

আমি যেন দেখতে পেলাম মা কুইসান হাত বাড়িয়ে নিজের রক্তাক্ত মুখটা মুছে নিলেন। তারপর ঠোঁটে একটুকরো হাসি ফুটিয়ে বললেন, “ঝ্যাং কুড, তুই তোর নিজের বিছানায় শুয়ে মরতে পারবি না, বলে রাখলাম।”

বাবা একহাতে মা কুইসানের চামড়ার কোটের বোতাম খোলার চেষ্টা করতে থাকলো। কিন্তুু তার হাত তখন অসম্ভবরকম কাঁপছে। আমার দিকে তাকিয়ে হাক ছাড়লো সে, “কইরে দ্বিতীয় পূত্র, ছুরিটা একটু ধর।”

মনে পড়ছে, আমি এগিয়ে গিয়ে ছুরিটা ধরতে চাইলাম। কিন্তু ততোক্ষণে বাবা নিজেই ছুরিটা দাঁতে চেপে ধরে মা কুইসানের বুকের ওপরকার বোতামগুলোর সাথে রীতিমতো ধস্তাধস্তি শুরু করে দিয়েছে। সোনলী হলুদ রঙের গোল গোল বোতামগুলো আকারে শিমের বিচির মতো বড়। চারপাশে কাপড়ের তৈরি বেষ্টনী দিয়ে বোতামগুলো এমনভাবে আটকানো ছিল যে ওগুলো খোলাটা মোটামুটি অসম্ভব একটা কাজ। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাবা ধৈর্য্য হারিয়ে ফেললো। টান দিয়ে বোতামগুলো ছিঁড়ে কোটটা খুলে ফেলতেই কোটের তলায় সাদা আরেক প্রস্থ কাপড় দেখা গেল। সাটিনের তৈরি অন্তর্বাসের মত একটা পোশাক যেটার বুকের কাছে একই রকমের বোতাম লাগানো। বাবা এবার বোতামগুলো খোলার কোন চেষ্টা না করে বরং টান দিয়ে সেগুলো ছিঁড়ে নিলো। সাটিনের কাপড়টার পরে বের হলো লাল রঙের সিল্কের একটা জামা। স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি যে পঞ্চাশ পেরুনো মোটা বুড়ো লোকটাকে প্রতিদিনের পোশাকের নিচে এতোগুলো অদ্ভূত আকর্ষণীয় কাপড় পরতে দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। শুনতে পেলাম বাবাও রাগে গজ গজ করছে। রাগে ফেটে পড়ে হেচকা টানে লাল কাপড়টা সরিয়ে নিয়ে পাশে ছুঁড়ে ফেললো সে। অবশেষে মা কুইসানের নাদুসনুদুস পেট আর সমতল বুক দেখা গেল। হাত বাড়িয়ে বুকটা ছুঁয়েই বাবা তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। আমি দেখলাম উত্তেজনায় তার মুখ সোনালী রঙের হয়ে গেছে। “দ্বিতীয় পূত্র”, আমাকে উদ্দেশ্য করে সে বললো, “দেখতো লোকটার বুক এখনও ধুপধুপ করছে কিনা?”।

মনে পড়ছে, আমি নিচু হয়ে হাত বাড়িয়ে লোকটার বুক স্পর্শ করে দেখেছিলাম। খুব ধীরে, প্রায় খরগোশের সমান হলেও লোকটার হৃদস্পন্দন তখনও চলছিল।

“দ্বিতীয় প্রভূ মা”, বাবা বলে উঠলেন, “আপনার মগজ মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, এমনকী স্বয়ং ঈশ্বরও এখন আপনাকে আর বাঁচাতে পারবে না। সুতরাং দয়া করে এখন একজন সন্তান হিসেবে মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনে আমাকে অনুগ্রহ করে সাহায্য করুন, করবেন তো?”

বাবা নিজের দাঁতের ফাঁক থেকে ছুরিটা বের করে মৃতদেহটার বুকের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বুলিয়ে নিয়ে সঠিক জায়গা খোঁজার চেষ্টা করল। নিজের চোখে দেখলাম, বাবা ছুরিটা চামড়ার ওপর ধরে ঘষে ঘষে কাটতে চেষ্টা করলো। কিন্তু চামড়াটা রাবারের চাকার মতো লাফিয়ে উঠে ছুরির প্রান্ত ফিরিয়ে দিল, চামড়ায় একটা আঁচড়ও লাগলো না। বাবা আবারও চেষ্টা করলো এবং ফলাফল সেই একই হলো। অতঃপর বাবা আবার হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বলতে লাগলো, “দ্বিতীয় প্রভূ মা, আমি জানি এইভাবে মরাটা আপনার প্রাপ্য ছিল না। কিন্তু আপনার যদি কারো সাথে শত্রুতা থেকে থাকে তবে তা ওস্তাদ ঝ্যাং এর সাথে, আমার সাথে নয়। আমি কেবল সন্তান হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি আর তো কিছু না!”

বাবা এ পর্যন্ত মাত্র দু’বার ছুরিটা চামড়ার উপর চেপে ধরার চেষ্টা করেছে কিন্তু তাতেই তার কপাল ঘামে ভিজে গেছে, থুতনির খোঁচা খোঁচা দাড়ি বরফের আর্দ্রতায় সাদা হয়ে তাকে বুড়ো বানিয়ে তুলেছে। হতচ্ছাড়া বুনো কুকুরগুলোকে আবার আমাদের দিকে একটু একটু করে এগিয়ে আসতে দেখলাম। ওদের চোখগুলো জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল, ঘাড়ের রোমগুলো সজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে আছে আর ওদের ক্ষুরধার লম্বা দাঁতগুলো ভয়ানকভাবে বের হয়ে এসেছে। এতোক্ষণে আমার হুঁশ ফিরলো। বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম,“তাড়াতাড়ি করো বাবা, কুকুরগুলো ফিরে আসছে।”

বাবা উঠে দাঁড়িয়ে মাথার ওপর ছুরিটা নাচিয়ে কুকুরগুলোর দিকে পাগলের মতো তেড়ে গেলো। এখান থেকে একটা তীর ছুঁড়লে যতোটা পথ পাড়ি দেয়া যেতো তার প্রায় অর্ধেক দূরত্ব পর্যন্ত কুকুরগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবার পর হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এসে সে মা কুইসানের মৃতদেহকে উদ্দেশ্য করে বেশ উঁচু গলায় বলে উঠলো, “দ্বিতীয় প্রভূ, আমি যদি আপনাকে ছুরি দিয়ে কাটতে না পারি তবে কুকুরগুলো ওদের দাঁত দিয়ে আপনাকে ছিঁড়ে ফেলবে। আমার মনে হয় ওদের চেয়ে আমাকেই আপনার বেছে নেয়া ভাল।”

দেখলাম বাবার চোয়াল আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে গেলো। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। চেহারায় একটা দৃঢ়সংকল্পের ভাব নিয়ে সে ছুরি ধরা হাতটা খাড়াভাবে আবার মৃতদেহের উপর নামিয়ে আনলো। এবার একটা অস্পষ্ট শব্দ তুলে ছুরিটা মা কুইসানের বুকে বসে একেবারে নিচ পর্যন্ত নেমে এলো, ছুরিটা ঝাঁকি দিয়ে একপাশে সরিয়ে দিতেই ফিনকি দিয়ে কালচে রক্তের ধারা বের হলো। কিন্তু দেহটার বুকের খাঁচা ছুরিটাকে আটকে দিলো। “যাহ্, কাটা প্রান্তটা হারিয়ে ফেললাম”, বলতে বলতে বাবা ছুরিটা টেনে বের করে আনলো। মা কুইসানের চামড়ার কোটে ছুরির ফলাটা মুছে নিয়ে, হাতলটা আবারও শক্তভাবে চেপে ধরে পোচ দিয়ে অবশেষে লোকটার বুক পুরোপুরি খুলে ফেলতে সক্ষম হলো সে।

গলগল করে একটা শব্দ হলো আর আমি দেখতে পেলাম ছুরিটা চামড়ার নিচের চর্বিভরা মাংস ভেদ করে হলুদ রংের কিলবিলে খাদ্যনালীটাকে বের করে আনলো, যেটা দেখতে একটা সাপের মতো, কিংবা বলা যায় একটা বিরাটাকার ঈল মাছের মতো; চারপাশে গরম, পূতিগন্ধ ছড়িয়ে পড়লো।

হাত ভরে খাদ্যনালীটাকে উঠিয়ে আনার সময় বাবাকে পুরোপুরি উন্মাদের মতো দেখাচ্ছিলো। অনন্তকাল ধরে অন্ত্রটাকে টেনে হিঁচড়ে বের করতে করতে কাকে যেন শাপ শাপান্ত করতে লাগলো সে, এবং শেষ পর্যন্ত, খাদ্যনালীটা মৃতদেহ থেকে তার হাতে পুরোপুরি বের হয়ে এলো। মা কুইসান তার শূন্য উদর নিয়ে পড়ে রইলেন।

মনে পড়ে, বাবাকে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আসলে কী খঁজছো তুমি?”

“পিত্তথলি। হতচ্ছাড়া পিত্তথলিটা গেলো কোথায়?”, বাবা জবাব দেয়।

বুক আর পেটের মাঝখানটাতে হাত ঢুকিয়ে সে পাগলের মতো হাতড়াতে থাকে। হৃৎপিন্ডের কাছে হাত না পৌঁছানো পর্যন্ত তার এই হাতড়ানো চলতেই থাকে। মা কুইসানের হৃৎপি-টা তখনও ছিল তাজা, টকটকে লাল। এরপর বাবা ওর ফুসফুসটা খুঁজে পেল। তারপর অবশেষে খুঁজতে খুঁজতে লিভারের সাথেই সে ডিম আকৃতির ছোট্ট পিত্তথলিটা পেয়ে গেল। ছুরির মাথা দিয়ে খুব সাবধানে লিভার থেকে থলিটা আলাদা করে হাতের তালুতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো। জিনিসটা ছিল ভেজা ভেজা, পিছলা। সূর্যের আলোতে ওটা এমনভাবে দীপ্তি ছড়াচ্ছিলো যেন হাতের ওপর রক্তবর্ণ সবুজাভ একটা চুনিপাথর বসিয়ে রাখা হয়েছে।

বাবা পিত্তথলিটা আমার হাতে দিয়ে বললো, “এটা শক্ত করে ধরে রাখ। ততোক্ষণে আমি লুয়ান ফেংশান এর টা বের করি।”

এবার বাবাকে মনে হলো দক্ষ একজন শল্যবিদ: যেমন ক্ষিপ্র, তেমন দ্রুত এবং নিঁখুত।

প্রথমেই সে ঘ্যাচ করে শনের দড়িটা কাটল। বেচারা লুয়ান ফেংশান ওটাকে বেল্ট হিসেবে কোমরে পরতো। তারপর জরাজীর্ণ তালিপট্টি মারা কোটের বোতামগুলো টান মেরে পটাপট খুলে ফেলে বাবা ওর হাড্ডিসার রোগা পটকা বুকটা পা দিয়ে চেপে ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে ছুরির চার পাঁচটা পোচ মেরে দিল। এরপর হা হয়ে যাওয়া জায়গাটা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে তালের শাস বের করার মতোই অনায়াসে সে লুয়ানের পিত্তথলিটা বের করে আনলো।

“এখান থেকে এবার ভাগা যাক”, থলিটা হাতে পেতেই বাবা আর দঁড়ালো না।

নদীর পাড়ে কুকুরগুলো লাশের নাড়িভুড়ি নিয়ে কামড়াকামড়ি করছিল। আমরা তার ভেতর দিয়েই দৌঁড় দিলাম। সূর্যের কোনায় লাল আভা এখনো খানিকটা আছে। নদী তীরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সমস্ত কিছু চোখ ধাঁধানো সেই আভায় জ্বলজ্বল করছে।

জাদুরকরী ক্ষমতার অধিকারী ল্ওু দাশান বলেছিলেন দাদীর চোখের ছানিটা খুবই মারাত্মক পর্যায়ে আছে। অন্ত্রের তিনটা ছিদ্র দিয়ে তাপ বের হবার কারণেই অসুখটা নাকী বাড়ছে। “এই রোগের উপশমের জন্য দরকার খুব ঠা-া আর তেতো কোন কিছু”, গম্ভিরমুখে এতটুকু বলে ডাক্তার সাহেব যখন মেঝে অবধি লম্বা কোটের ঝুল উঁচু করে দরজার দিকে রওনা দিলেন তখন বাবা কাতর কণ্ঠে তাকে যাবার আগে ওষুধপত্র কিছু একটা দিতে বললো।

“হুম, ওষুধ চাও তাই না...”, জাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী ল্ওু খানিকক্ষণ ভাবলেন। তারপর বাবাকে শূকরের পিত্ত এনে তার রস দাদীমাকে খাওয়াতে বললেন, “ওতেই তার চোখ পরিষ্কার হবে।”

“ছাগলের পিত্তরস হলে চলবে?” বাবা ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলো।

“ছাগলের পিত্ত চমৎকার জিনিস”, ডাক্তার বললেন, “ভালুকের টা আরো ভাল। এখন তুমি যদি মানুষের পিত্ত আনতে পারোতো....হা হা হা...বুঝেেল তোমার মায়ের দৃষ্টিশক্তি আগের মতো হয়ে গেলেও আমি অবাক হবো না।”

মা কুইসান আর লুয়ান ফেংশানের পিত্তরস সবুজ চায়ের বাটিতে ঢেলে বাবা দুই হাতে বাটিটা দাদীমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো। দাদাীমা বাটিটা ঠোঁটের কাছে ধরে জিভ দিয়ে তরলটুকু স্পর্শ করলেন। “গৌজির বাপ”, সে বললো,“এই পিত্তরসতো মারাত্মক তিতা! এই রস কোথ্ থেকে যোগাড় করলিরে?”

“এটা মা (ঘোড়া) আর লুয়ানের পিত্ত”, বাবা জবাব দেয়।

“কী বললি, ঘোড়া আর লুয়ান? ঘোড়াতো আমি চিনিই কিন্তু লুয়ানটা আবার কী?

নিজেকে আর ঠেকিয়ে রাখতে পারলাম না। বোকার মতো পেটের কথা ফাঁস করে দিয়ে বললাম, “দাদীমা, ঘোড়া নয়, এটা মানুষের পিত্তরস। মা কুইসান আর লুয়ান ফেংশানের পেট কেটে বাবা ওগুলো বের করে এনেছে!” আমার কথা শুনে আতঙ্কে আর্তচিৎকার দিয়ে দাদীমা তাল হারিয়ে ইটের মেঝেতে প্রাণহীন একটা পাথরের মত পড়ে রইলেন।



** গল্পটি মো ইয়ান এর “শিফু, ইউ উইল ডু এনিথিং ফর আ লাফ” গল্পগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। গল্পটির ইংরেজি নাম “দি কিউর”।

অনুবাদক পরিচিতি
মুরতালা রামাত
গল্পকার
ঔপন্যাসিক
অনুবাদক
সিডনি, অস্ট্রেলিয়াবাসী।




শারমিন শিমুল
অনুবাদক
কবি


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন