বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

নাহার মনিকা'র গল্প : পলায়নপর

বেশ কয়েকমাস ছেলে বাড়ি ফেরেনি, তখন ল্যান্ড লাইনে ফোনটা এসেছিল।

ঘ্যাসঘ্যাসে কণ্ঠ- ‘ছেলের দাঁত ঠিক হইছে?’ 

গলা শুনে কিছু বোঝা যায় না। রাস্তার লোক হতে পারে, আবার মনে হয় কোন অফিসের রিভলভিং চেয়ারে বসে কথা বলছে। 

সারাজীবন রান্নাবান্না আর দু’চারটা গল্পের বই পড়া মানুষ আমি, অন্য সময় প্যাঁচঘোচ বুঝতে সময় লাগলেও এই ফোনের কারণ বুঝলাম, কিন্তু লোকটা কে তো জানি না।

স্বাভাবিক স্বরেই পাল্টা জানতে চেয়েছি,-‘ ঠিক হলে কি?’ 

ভাঙ্গা দাঁত আর দাঁতের ব্যথা নিয়ে সেই যে গেল ছেলে তো আর আসেনি।

-‘আবার ভাইঙ্গা দিমু’- এইবার পুরুষ কণ্ঠস্বরটাকে কোমরে ছুরি গুজে রাখা রাস্তার লোক মনে হয়। লোকটা ফোন রেখে দিলে ঘূর্ণিপাকের তোড়ে শত শত প্রশ্ন আমার মাথায় ঘোরে। সিলিং ফ্যানের বাতাস দ্বিগুণ গরম হয়ে নামে। অবচেতনে ততক্ষণে এই ধরনের ফোন কল আবার রিসিভ করার জন্য তৈরী হয়ে গেছি। কিন্তু ফোন আর আসে নি, আমার ছেলেও সহসা বাড়ি এলো না। ক্রমে ক্রমে ফোন আসা বা না আসার বিভীষিকার ভারও ফিকে হয়ে গেলো।

উপর নীচের পাটি মিলিয়ে মুখের কয়েকটা দাঁত ভেঙ্গে এসেছিল ছেলে। মুখ ঠোঁট ফুলে পানিভরা পলিথিনের মত হয়েছিল, ফ্যাকাশে, পাতলা যেন সেফটিপিনের খোঁচা পেলে চুপসে যাবে। এমন ঘটনা ঘটলে চিৎকার করে কান্নাকাটি করা মানায় না। 

স্বামীর ফুপাতো ভাইয়ের ছেলেকে ডেকে আনি, সদ্য পাশ করা ডেন্টিষ্ট। তাকে বিভ্রান্ত দেখায়- ‘এই দাঁত ঠিক করতে বিদেশ নিতে হবে’।

-‘কুচ পরোয়া নেহি, বিদেশ যাবো, তোমরা দেশী ডেণ্টিষ্টরা বাল ফালায়ো’। ফোলা মুখের ভেতর থেকে জড়ানো আমার ছেলের কথাবার্তা অচেনা লাগে। 

দাঁতের ডাক্তার করুণা আর আঁতে ঘা লাগানো হাসি হাসে। পিরিচের কিনারে বিস্কিট রেখে চা শেষ না করে উঠে পরে। অন্ধকার রাস্তায় তার হোণ্ডার আলো শোরগোল তুলে মিলিয়ে যায়। তারপর আমার ছেলের চোখের মত অন্ধকার ঘেরাও করে আমাদের বাড়ি। 

হাই ডোজের পেইন কিলার খেয়ে ছেলে ঘুমায় মরার মত। আমি বারান্দার চেয়ারে বসে বসে পাহারা দেই। আশপাশের বাড়ির স্কুল পড়ুয়ারা ঘ্যান ঘ্যান করে পড়া করে। তাদের বিচ্ছিন্ন স্বর ক্রমে মিলিত কোরাস হয়ে যায়। কান সতর্ক করে থাকি, এই কোরাসের আড়ালে আরো কোন শব্দ আছে? যা শুনতে পাই না। কোন পদশব্দ, চকিত ঝাঁপ, কোন অতর্কিত আক্রমণ। আসলে যে কি নিজেই জানি না। এক দঙ্গল জোনাক পোকার সোচ্চার হয়ে ওঠার ঝিলিক দেখা যায় শুধু।

ছেলের যুবক বয়স, বাড়ি ফেরার ঠিক ঠিকানা নেই। প্রতীক্ষায় থেকে থেকে আমার ভেতরে একজন মা কখনো মুখিয়ে থাকে, কখনো নেতিয়ে পড়ে। এ বয়সী ছেলের কি পরিমাণ ভালোবাসার বরাদ্দ প্রয়োজন, বুঝে কুলিয়ে উঠতে পারি না। 

ময়লা জিন্স, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, কাদা ঘাটা চেহারা বানিয়ে বাড়ি ফেরে প্রতিবার। তারপর বেঘোর ঘুম। ঘুমিয়ে হঠাৎ হঠাৎ স্বপ্ন দেখে। গাগ্ গাগ্ শব্দ হয়, ভয় পেয়ে পাশের ঘরে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙ্গাই, আমার মনে হয় দুঃস্বপ্ন, কিন্তু সে স্বীকার করবে না। মাথার পেছনে থ্যাবড়ানো চুলে অপ্রকৃতিস্থ ভঙ্গীতে ঘুম থেকে জেগে আবার শুয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলেও সে স্বপ্ন ছেড়ে উঠবে না। 

সেবার এসেছে ঠান্ডা লাগিয়ে। শুকনো কাশির দমকে পিঠ বেঁকে যায়, শোয়া থেকে শিরদাঁড়া খাড়া করে উঠে বসে, আবার নুয়ে যায়। মনে হয় অনন্তকাল ধরে কাশির সঙ্গে ওর মল্লযুদ্ধ চলছে। ফুস ফুস থেকে জোর শোঁ শোঁ আওয়াজ শুনতে বুকে কান ঠেকাতে হয় না। প্রথম প্রথম কয়েক রাত ঘুমাইনি, ঠায় পাশে বসে থেকেছি। টোটকা ওষুধের যোগান দিয়েছি। তুলসী পাতা, আদা কুচি। তারপর কয়দিন ওর মাথার কাছে থম ধরে বসে থাকি, ঘুম জাগরণে রাত পার হয়। ছেলে ঠেলে সরিয়ে দেয়, বলে- ‘সেরে যাবে’, ওর নাকি এমন হয় মাঝে মধ্যে, দিন কয় ভোগে তারপর ফুরফুরে ভালো হয়ে যায়! 

এমন ভয়াল কাশি প্রায়ই হয়! নিজের ত্বক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা আমার অস্তিত্বের ধরণ বুঝি না, কি আশ্চর্য! ওর কখন অসুখ হয়, হয়ে সেরে যায় তা আমি টের পাই না! কে জানে, এমনই হয়তো হবার কথা ছিল। কাশির দমক থামলে স্থির মুখে দেখি ওর চোখের বন্ধ পাতায় এই বয়সেই ক্লান্তি জমে আছে।

সারারাত কেশে সকালে ক্লান্ত ঘুম ঘুমায়। আমি নাস্তা নিয়ে বসে থেকে হাঁপিয়ে গেলে ওকে ডাকি।

-‘শাশ...শেষ করতে দাও স্বপ্নটা’। আমি তবু ঠেলতে থাকি। 

সকাল ফুরিয়ে যাচ্ছে। -‘ওঠ্ পাগলা’।

আতকা আসা ঢেকুরের মত ও আবার আমাকে ধাক্কা দেয়। সামলে নেই। 

-‘কি স্বপ্ন দেখতেছিলা বাবা?’ কাশিটা থিতিয়ে এসেছে মনে হচ্ছে। 

- ‘একটা বাস ষ্ট্যান্ড, ছোট্ট ছোট্ট নাকবোচা উপজাতি পোলাপান, তুমি ওদের সঙ্গে ঠেলা গাড়িতে বইসা আড্ডা মারতেছো। তুমি যেন একটা বাচ্চা মেয়ে আম্মা...’ ছেলের চোখের মণি ঝলসে উঠে নিভে যায়। ওকে বলতে ইচ্ছে করে যে এমন জায়গায় আমি কখনো যাইনি।

-‘গাছে ছাওয়া ঠান্ডা একটা রাস্তা। তোমাকে নিয়া যাবো আম্মা। ওইখানে গ্রামটার অর্ধেক ঘরবাড়ি নদীতে ভাইঙ্গা গেছে। আমরা একটা ঘরে ঢুকছিলাম, কিচ্ছু নাই, চকি নাই, লেপ তোষক নাই। ঘরের মাটি উই পোকা খায়া ভুরভুরা করে রাখছে। মানুষগুলি জানে না উইপোকা কেমনে মারতে হয়। ঘরের চালে কয়টা শুকনা ধুন্দুল, ঐগুলি পুইড়া যাওয়ার ভয়ে আগুন দিয়া উই পোকাও মারে না। আশপাশে গাছ টাছ নাই, ধুন্দুলগুলি গায়ে গায়ে বাড়ি খাইলে বিন বিন আওয়াজ হয়। ঘরে একটা বুড়ি, দুই তিনটা বাচ্চাকাচ্চা। কই থেইকা জানি আইনা একথাল মুড়ি খাইতে দিল। কিচ্ছু নাই তাও আপ্যায়ন করে, বুঝ একবার! আমার লাগছে খাসির মাথা দিয়া বুটের ডাইলের ক্ষিদা। শুকনা মুড়ি খাইতে ভাল্লাগে!’

-‘ওইখানে কেন গেছিলি বাবা’?

-‘পলায়া থাকতে আম্মা, ঘটনার পরে লীডারের অর্ডার ছিল’।

***

এরপরের বারে ফেরা একটু অন্যরকম- ওর স্বভাবের বাইরে। দরজায় দাঁড়িয়েই হুকুম, বললো- ‘ঝাল পেয়াজ দিয়ে মুড়ি মাখো, আজকে খাবো’। বলেই বাথরুমে, ঝপঝপিয়ে পানি ঢালছে, সাবান ঘষার ঘ্রাণ পাই রান্নাঘর থেকে। 

-‘আম্মা, খাসির মাথা দিয়ে বুটের ডাল রানতে পারবা না?’

বলে কি ছেলে! গুচ্ছের ছোলার ডাল কেনা আছে। আর খাসির মাথা? সেতো রোজই ঝুলে থাকে মোড়ের কষাইয়ের দোকানে। লোহার আংটায় ঝুলে থাকতে থাকতে টস টসে রক্ত টুপ করে সিমেণ্টের মেঝেতে পরে যায়। রক্ত চোষা গামছা লোহিত বর্ন। সাবান গরম পানি দিয়ে ধুয়েও লাল। লোকটা পিঁড়ির ওপরে বসে বড় গোল গাছের গুড়িতে কোপ দিয়ে থোক থোক মাংস পলিথিনে ভরে দিতে গিয়ে কোমর চাগিয়ে লাল গামছা দিয়ে নিজেই মেঝে মোছে। কাচা মাংসের গন্ধে নাক চেপে দাঁড়িয়ে থাকি আমি। খাসির কল্লা থেকে ছেঁড়া তারের মত আধা-খ্যাচরা রগ বেরিয়ে আছে, জবাই করার সময় কি ছুরিতে ধার ছিল না! আমি সেদিকে তাকালে লোকটা কিছু একটা বলবে, মনযোগ ঘুরিয়ে দিতে চায়। ও জানে আমি কার মা, কোন বাড়িতে থাকি। এত চেনে বলে বিরক্ত হই সেটা বুঝে ফেলে কিনা কে জানে, বহু ব্যবহৃত কাপড়ের মত মুখ নরম করে আনে লোকটা।

বাসা থেকে বাজার হাঁটা পথে দশ বারো মিনিট। নিজেই যাই। কাঁকরোল, সবুজ পটল, লাল ইন্ডিয়ান পেয়াজের পাশে খাসির মগজ আর মাথা ভর্তি ব্যাগ রিক্সার পাদানীতে বসিয়ে ফিরে আসি। ছেলে যখন থাকে না, তখনো সব কিনে ফ্রিজ ভরে রাখি। রান্নাবান্না দেখলে ওর চোখের মণি উদ্ভাসিত হয়। এই একটা কারণে ওর হাসি দেখি আমি। অন্য সময়? নাহ থাক সে প্রসঙ্গে না ই বলি। কোথায় যেন শুনেছিলাম- বাপ, স্বামী আর পুত্রকে বশীকরণের প্রকৃত স্থান হলো খাওয়ার টেবিল, অন্তত আশি ভাগ ক্ষেত্রে।

গোসল সেরে, কলার তোলা গেঞ্জি পরে ছেলে এসে ভেজা চুল আঙ্গুলে ঝাড়ে, খাবার টেবিলের ওপরে শিশির বিন্দু তৈরী হয়। ছেলে চেয়ার টেনে বসে খাবার নেয়, আমি ওর তৃপ্ত মুখ দেখি। সে তারিয়ে তারিয়ে আমড়ার টক থেকে আঁশঅলা আটি খায়। আমি ওর গা ছুঁয়ে দেয়া দূরত্বে বসি। পেপে বাটা দিয়ে ভুনা মাংশের হাড় চিবানো দাঁতের শব্দ শুনতে পাই। অকারণে টেবিলের কোনা হাত দিয়ে মুছি। খেতে খেতে ওর ভেজা চুল শুকিয়ে আসে, ও একগাল হেসে দিলে ওর তৃপ্তি দৃশ্যমান হয়, দাঁতের কালো মাড়ি দেখা যায় । জন্ম থেকেই খাড়া নাক আমার ছেলের। আমি বলতাম- নাক উঁচু। আমার না, গাত্রবর্ণ পেয়েছে ওর বাবার। আড়াল থেকে আমি দু’একবার শুনেওছি, স্বামীর দিকে আড়চোখে চেয়ে মানুষ বলেছে, - ‘এইটা কি বিয়া করছে! কিছু হইল? যেমন কালো তেমন ‘ডি’ শেইপের বৌ’। আমার স্বামীর সম্ভবত আমাকে নিয়ে কোন শংকা, দ্বিধা ছিল না, ভালোবাসা প্রসূত ইর্ষা তো একদম না। পথ আটকানোর মত সুন্দরী ছিলাম না যে। আর আমার অভ্যাস হয়ে গেছে, সর্বত্র যাতায়াতের, একা। 

চাচাতো ভাইদের বাড়ি গিয়ে তাস পেটানো বাবার ছেলের সখ্য সংযোগ ঘটেনি। অথচ আমি চাইতাম ছেলেটার মধ্যে ভালোবাসার বান ডাকুক, বাপের মত ব্যবধান আমাকেও বৃত্তবন্দী করে না ফেলুক। কিন্তু আমি সবসময় ভুল প্রমানিত হই। একটা চাছা ঝিনুক শিলে ঘষে ঘষে ধারগুলো ভোতা আর মসৃণ, ঐ দিয়ে দুধ গেলানো অব্ধি টান ছিল। জোরে কষে তারের দু’ধার বেঁধে রাখার মত, আঙ্গুলের টোকায় প্রিং করে শব্দ তৈরী করতো সে টান, সে শব্দের মধ্যে জের থাকতো,জ্বর থাকতো আর থাকতো জেদ-অভিমান। দুধ দাঁত পরে গিয়ে যখন আধলা করে দাঁত উঠছে, দুশ্চিন্তায় আমার ঘুম হারাম। আমার মত যদি ছেলেরও হাসলে মাড়ি দেখা যায়! যদি দাঁতেও কালচে ছোপ লাগানো থাকে! 

ও জন্মাবার দু’দিন পরে দাই যখন আরেকবার আমার তলপেট ঘি দিয়ে মালিশ করতে এসেছিল, আশ্বস্ত করেছে- না, বুজান আপনের ছেলে পরম সুন্দর, একদম রাজকুমার। এখন এতদিন পরেও একটা গোপন আক্ষেপ মাথা থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে পারি না, তা হলো ও হাসলে দাঁতগুলো মিচমিচে কালো দেখায়। ওর ঝকঝকে দাঁত কি করে এমন হলো, প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানকে এ প্রশ্ন করা যায়, কিন্তু ওর সঙ্গে সেতু তৈরী হতে হতে ভেঙ্গে যায় আমার, ছেলের প্যান্টের পকেট সাফ করতে গেলে, ছেলের ব্যাগ ঘাটলে ভেঙ্গে খান খান হয় সে সেতু। 

ছেলে যেদিন জামিন পেয়ে বাড়ি ফিরেছে তার চেহারা থেকে কাঠিন্য ঠিকরে বের হচ্ছিল। আমি ওর কনুই টেনে ঝুঁকে থাকি- ‘চিন্তা করিস না বাবা’...

-‘কে বললো আমি চিন্তা করতেছি? আম্মা তুমি বরং একদম চিন্তা কইরো না, আমাদের পার্টির লোক আছে। পুলিশের বারোটা বাজায়া দিবে’।

খাওয়া শেষে প্লেটে হাত ধোয় ও। আমি এটো প্লেট নিয়ে ঘরের বারান্দায় এসে উঠানে পানি ফেলি। হাত ধোয়া পানির মধ্যে আলগা দু’একটা ভাত দেখে রাতা মোরগটা দৌড়ে আসে। খুটে খায় ম্রিয়মান পোকার মত ধুলিমাখা হলদে ভাত। ছেলেকে ঘিরে তৈরী হওয়া জটিলতা এভাবে ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে, মোরগটা খুটে খুটে খেয়ে ফেলতো! 

***

আরেকটা ঘটনা ছিল। ভাঙ্গা দাঁত সারাতে ছেলে ঢাকা গেল, তখন একদিন মেয়েটা এসেছিল। একসঙ্গে এখানকার কলেজে পড়েছে। আমার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল, ও যাওয়ার সুযোগ পায়নি। টোপা গাল, চোখদুটো বড় না মোটেও, সেটা অবশ্য গৌণ বিষয়। আমি ছেলের চোখ দিয়ে নিজের পছন্দ দেখতাম হয়তো। ভেবেছিলাম – বাঙ্গময় চক্ষু, শ্যামলা, ঠোঁটে ইষৎ ভাঁজ আছে এমন একটা মেয়ে আসবে। তা ছেলের এমন লালচে ফর্শা পছন্দ, টের পাই নি। মেয়েটার গড়ন মোটা ঘেষে। আমার ছেলে তার বন্ধু এ সুবাদে সপ্রতিভ হয়ে কথা বললো। কোল্ড ড্রিংকস আনিয়ে খেতে দিলাম। দু একবার খিল খিল হাসে শুনে পাশের বাড়ির বুয়া উঁকি দিলে ধমকে দিলাম। যাওয়ার সময় প্রশ্ন- ‘দাঁত কি সেরেছে? ব্যথা কমেছে, জোড়া লাগাতে পেরেছে ভাঙ্গা দাঁত?’

-‘দাঁত না সারলে কি’? 

-‘না সারলে একটু ভাত খাওয়া..., ভাতের সঙ্গে হাড় হাড্ডি চিবানো..., এইতো। সমস্যা না। না, আরো আছে। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝা ছেলে পাত্র হিসেবে উত্তম’।

মেয়েটার পরনে কালো জর্জেটের ওড়না। টিভি সিরিয়ালের নায়িকাদের মত ঝুলানো কানের দুল। 

মেয়েটার জামার চিকন ফিতা ঘাড়ের কাছে এসে গিঠ খেয়ে গেছে, হার্ট শেইপের ফোকর গলে মসৃণ তরল পিঠ। মেয়েটা কি করে জানে আমার ছেলের দাঁত ভেঙ্গেছিল। কারা ভেঙ্গেছিল?

ওকে তিলের খাজা খেতে দিয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে খায়নি। একটা কাগজে মুড়িয়ে দাঁড়িয়ে 

বললো- ‘আপনাকে দিয়ে হবে আন্টি, শক্ত মনের মানুষতো তাই ভেঙ্গে পড়েননি। আমার মা হলে এতদিনে শেষ’...

সেদিন আমার মন তীব্রভাবে এই মেয়ের মা হতে চাইল। 

***

ছেলে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এসে মগে পানি নিয়ে চোখে ছিটায়। চুলের কিছুটা ভিজে যায়। 

-‘আম্মা হালিম বানাতে পারো? বানাইছ কোনদিন? কি কি লাগে’?

এখনতো হালিম মিক্স পাওয়া যায়, শুধু মাংস লাগবে, খাসির মাথা হলে ভালো হয়। মোড়ের কষাইয়ের দোকানে যাবো। গামছা থেকে চুইয়ে ফ্যাকাশে লাল রং গড়াবে!

-‘কাকে মারছিলা বাবা? একদম মরে গেছে? হাসপাতালে নিলে ভালো হবে না’?

-‘চুপ থাকো তো আম্মা! আমি কোন খুন টুন করি নাই’, তবু আমার দাঁতগুলি ভাঙ্গছে’, দাঁত ঘষে আমার ছেলে। একপাটির সঙ্গে আরেক পাটির দাঁতে অনেক ফোঁকর, খুব কাছে গেলে নিঃশ্বাসের ফাঁপা আওয়াজ টের পাওয়া যায়। 

হালিম মিক্স আর মাংশ কিনে আমি দ্রুত হাটি, তাড়াতাড়ি করতে হবে। হঠাৎ আতংক লাগে, দোকানের কষাইটা মনে হয় লাফ দিয়ে আমার পিছু নিয়েছে। ওর হাতে ভারী ছুরি। ছুরিটা নাড়ালে লৌহময় ঠান্ডা বাতাস ধেয়ে আসে। 

বিকেল বেলায় বারান্দায় বসে ছেলে তার হালিমের বাটিতে আদাকুচি বেশী করে নেয়। পাশে আমি ধোয়া ওঠা খাবারে পুরানো পেপার দিয়ে হাওয়া করি। 

-‘পার্টি কি বলছিল একদম মাইরা ফেলতে?’

-‘আম্মা তুমি কি শুরু করলা! সারাক্ষণ টিভি দেখ? নাকি তোমার মাসুদ রানা সিরিজ পড়া বিদ্যা ঝালাইতেছ?’- মুখ থেকে এক টুকরো হাড় থুক করে বারান্দার রেলিং এর নিচে মাটিতে ছুঁড়ে মারে। 

ছোটবেলায় ছেলেটাকে কত গল্প যে শোনাতাম! যুদ্ধের গল্প, প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, বেগম রোকেয়া, মেয়েদের কথা বেশী বলতাম। বিদ্যার দৌড় বাদ দিলে নিজের উৎসাহে যা পারা যায়। পরে ছেলে ইতিহাসে অনার্স ভর্তি হলো, নিজে নিজে পড়ে ভারতীয় ইতিহাস, ইউরোপের ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস। দু’একবার সঙ্গে আনা থান ইটের মত বই আমিও উলটে পালটে দেখেছি। 

আমার চুলে দুই বেনী দেখলে ছোটবেলায় খুব খুশি হতো ছেলে, ভালোবাসতো। হাই জাম্পে প্রাইজ পাওয়া আমার মেডেলটা গলায় ঝুলিয়ে ঘুরতো। স্কুলের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়লেও আমার হাত পা ভাঙ্গতো না শুনে ছেলের চোখের মণি ঠিকরে বেরুতো, গর্বে, খুশীতে। বাপ চাচাদের দিকে কচি হাতের বাইসেপ ফুলিয়ে মল্লযুদ্ধে আহবান করতো। 

-‘আম্মা, নামটা বদলায়ে ফেললে আর ঝামেলা নাই। 

-‘কার নাম? পার্টি কি একদম মাইরা ফেলতে বলছিলো?

-‘কি মুশকিল, পার্টি কি এই নির্দেশ সরাসরি দেয় নাকি? নিজের বিবেচনা লাগে’।

-‘একা তো করিস নাই’। 

পেপার কাটিংগুলি সাবধানে রেখে দিয়েছি। ষ্টীলের আলমারির সেইফটি লক এর ভেতরে। আশপাশের বাড়ি থেকে বাচ্চাকাচ্চা, আত্মীয়দের কেউ কেউ হুট হাট ঘরে ঢুকে যায়। কাগজপত্র আমি সাবধানে রাখি। ওইদিন বা তার পরেও যত পেপারে খবর ছেপেছে সব কিনেছি। তিনজনের ছবিতে দৌড়ের মধ্যেও আমার ছেলের চেহারা বেশি ষ্পষ্ট। 

***

গতবার যেদিন দুজন মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে এলো, দেখলাম ওর ডান পায়ে সব আঙ্গুল পচা জামের মত থ্যাতলানো, ঘিনঘিনে বেগুনী রং। অবচেতন আমাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ফেলে দিলো। কে জানে কিভাবে কোমরের কাছে পাওয়া ব্যথা অনেকদিন নীলবর্ণ থাকলো, পেয়ারা গাছে এসে বসে যে ছোট্ট পাখিটা, তেমন নীল, ব্যথা ওর মত তিড়িক তিড়িক লেজ নাড়ে। 

গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে ছেলে বললো- ‘খাওয়া দাওয়ার খুব কষ্ট। আর এত মাইর দেয়, পরে চোখের সামনে থাল ভইরা ভাত দিলেও আর ঢোক গেলার শক্তি থাকে না। ছালা বাইন্ধা লোহার শক্ত রড দিয়া পিটায়। এই যাত্রা আর দুই চাইরটা বাড়ি বেশী খাইলে আর টিকতে হইতো না...শরীলের ভিতরে রক্তও যখন থেতলায়া যায় তখন ক্ষিদা টিদা উধাও হয়া যায়। আর কি একটা কলাইয়ের ডাইলের সাথে লাল আটার রুটি দেয়, মনে হয় খেড় চাবাইতেছি। একটু ভাত পাক করবা আম্মা?’ 

জামিনে ছাড়া পাওয়ার আগ পর্যন্ত কতবার যে গেলাম, ছেলের সঙ্গে দেখা হয় না। আজকে এখানে তো কালকে অন্য জায়গায়। যেন কেউ আমার ছেলেটাকে পিচকারীর মধ্যে পুরে দিগ্বিদিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে। আর আমি লোফালুফি খেলায় নিরন্তর হেরে যাচ্ছি।

ওর আব্বার বস হেড অফিসে ট্রান্সফার হয়েছে। তদবির নিয়ে তার বসের কাছে গেলাম। আমার স্বামীর নামটাকে চিনতে প্রথমে কষ্ট হলেও মৃত সাবঅর্ডিনেটের স্ত্রী’কে চিনলেন ভদ্রলোক। টেবিলের ওপাশে পুরু কাঁচের চশমার কাছে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনার কথা বলতে জোর পেলাম না। তার বদলে বন্দী ছেলের জন্য একটা চাকরী চাইলাম। মা ছেলের যাতে চলে যায়। ইতিহাসে অনার্স শুনে ভ্রু বাঁকা হলো সামান্য। যা হোক কিছু একটা, টাইপিষ্ট, কেরানী। ইন্সুরেন্স দালাল, ব্রোকার, টেলিফোন অপারেটর কিছু একটা। একটা কোনা খুঁজে পেলে ছেলেকে থিতু করে বসিয়ে দেবো। 

ঢাকা শহরে তদবির করতে আসাটাও আমার জন্য সংগ্রাম। থাকতে হয় খালাতো বোনের বাসায়। পাঁচ ছয় ঘণ্টার বাস জার্নি করে নামি, সঙ্গে বোনকে খুশী করার সরঞ্জামাদি, চালের গুড়া, মুড়কির মোয়া। বাসাতে ঢুকেই তড়িৎ বেরিয়ে যাই। 

দুই মাস পরে যখন জামিনে ছাড়লো। ছেলে শুকিয়ে গেছে, যেন ভেজা কচি কাঠ রোদ্রে ফেটে গেছে। বললো তার খুব ক্ষিদে পেয়েছে। যে রেষ্টুরেন্টে ঢুকলাম তার চারদিকে আয়না। খাবারের অপেক্ষায় থেকে ও আঙ্গুলে চেপে ঠোঁট উচিয়ে ভাঙ্গা দাঁত দেখে। আমি মাথা নিচু করে ওর হাতের আঙ্গুল দেখি, শুষ্ক চামড়া। ফাটা পায়ের গোড়ালী, ধুলিমাখা চুল। ছেলেকে ডলে গোসল করাতে ইচ্ছে করে, ওর কিশোরবেলার মত ঘষে ঘষে। সাবানের ফেনায় নিমজ্জমান হাসি দেখতে ইচ্ছে করে।

আমাদের পাশের টেবিলে একটা মেয়ে একা একা খায়। বুঝতে পারি রাস্তার মেয়ে। ফুপিয়ে কেঁদে কেঁদে ভাত খাচ্ছে, সঙ্গে মাছের দোপেয়াজা। আমি ওর দিকে পেছন ফিরে বসি। জানলা গলে আসা রোদের আঁচও মৃদু হয়। নিজেকে ফেলে আর কারো দুঃখ দেখতে আগ্রহ হয় না। ছেলেকে ওর সব যাতনা ভুলিয়ে দিতে পারতাম! বলি- ‘ঢাকা আসছি, চল একটা সিনেমা দেইখা বাড়িতে যাই, মধুমিতা হলের নাম কত শুনছি!’

-‘ঐ হলটাতো মনে হয় বন্ধ হয়ে গেছে আম্মা’!

-‘বন্ধ হয়ে গেলো! কারা বন্ধ করলো’? 

-‘কেন তুমি কিছু খবর রাখো না? রায়ট লাগার আগে এইসব বন্ধ হইলে ভালো না’?

তাই বলে সিনেমা বন্ধ হবে! আমার দমবন্ধ লাগে, নিজেকে পাউরুটি সেঁকা তন্দুরের ভেতর বন্দী আবিস্কার করি। একটা ফোঁকর গলে চিলতে চাঁদের আলো ছুরির মত তেড়ে আসে, ভীষণ গরম সে চাঁদের আলো। 

-‘আমাকে বিদেশ পাঠায়া দেও। এইখানে কোন ভবিষ্যৎ নাই। পার্টি আর আমাকে বাঁচাইতে পারবে না। রাঘব বোয়ালরা নিজেরাই লুকায়া যাইতেছে’। 

ছেলের ফিস ফিস শুনে আমি কথা ভুলে যাই। তীব্র গরম থেকে ডীপ ফ্রিজে ঢুকে যাই। জগ ভর্তি বরফ খাই কচ কচ করে। মাথার কোষ শুদ্ধ জমাট বেঁধে যায়। 

-‘কিভাবে যাবি? ঐখানে যা না, ওই যে গ্রামটা উপজাতি মহিলা তোরে মুড়ি খাইতে দিছিল, উইপোকা মারতে জানে না, ওইখানে গিয়া লুকায়া থাকতে পারবি না বাবা?’

- কি সব ফালতু কথা বলতেছো আম্মা, আমি কখন ওই জাগায় গেলাম!’ ছেলে হঠাৎ ওঠা রাগ সংযত করতে শিখেছে।

-‘একজন আছে আম্মা, ভালো ছাত্র, বুয়েটে পড়ে। আমার জন্য ভিসা নিয়া দিবে। আমার সঙ্গে চেহারার মিল, শাদাকালো পাসপোর্ট সাইজ ফটো, কেউ বুঝতে পারবে না এইটা আমি না আমার জমজ ভাই!

আমার কি জমজ সন্তান ছিল! হারিয়ে ফেলেছি নার্সিং হোমে, উত্তম সুচিত্রা’র কোন সিনেমার মত, লালু ভুলু, দুই ভাই? সেই ছেলে বড় ব্যারিষ্টারের ঘরে মানুষ হচ্ছে, সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফিরে সেতারে ঝংকার তোলে, তার চক্ষু বোজা! বড় হয়ে জজ হবে, আর আমার ছেলের নামে সত্য বা মিথ্যা মামলা খারিজ করে দেবে। আমি সিনেমাটা দেখতে চাই। কিন্তু মধুমিতা সিনেমা হল আর নেই। 

ছেলে জামিনে ছাড়া পেলে মনে হয়েছিল সব ঠিক। আবার চারপাশ জুড়ে নির্লিপ্তের মত শীতকাল নামে চারপাশে। বাতাসের গা নরম, আদুরে। 

তখন একদিন হন্তদন্ত হয়ে ছেলে ফেরে, একা। মাথায় হলুদ প্লাষ্টিকের টুপি। দমকল বাহিনীর কর্মীরা যা সারাক্ষণ পরে থাকে, সে রকম। গোসল করে মাথা ভেজায় না। খেতে বসে একহাতে মাথা চেপে থাকে। ঘাড়ের কাছে রক্তের ছ্যাকরা ছিটে দেখি। জিজ্ঞেস করলে- হা হা করে হাসে। দাঁতগুলি আগের মত সমান, ঝকঝক করছে।

-‘দাঁত ঠিক করে দিছে আম্মা, কিন্তু তারপর হইলো মুশকিল, মাথার খুলিটা আলগা হয়ে গেল। একটা পাইলে আরেকটা যায়। এইটা আমি বুইঝা গেছি সবকিছু একসঙ্গে ঠিক ঠাক আমি পাবো না। আমারে তুমি বিদেশ পাঠায়া দেও আম্মা। নাইলে কিন্তু প্লেনের চাক্কার সঙ্গে নিজেরে দড়ি দিয়া বাইন্ধা নিমু’।

-‘বাতাসে তোর খুলি উইড়া যাবে। আর মগজ জইমা যাবে বাবা’।

- ‘না, আম্মা তুমি বুঝো নাই, ওড়ার আগে আবার পার্টির লীডারদের কাছে যাবো। দুইটা অফার আছে, ভাঙ্গা দাঁত ভালো করতে চাইলে মাথার খুলি আলগা হয়ে যাবে। আর সব দাঁত দিয়া নকল দাঁতের দুই পাটি পরি, তাইলে খুলি ফেরত পাবো। আমি আমার দাঁত খোয়াইতে চাই নাই, দাঁতের মর্যাদা... এখন ভাবতেছি দাঁত দিয়ে দিবো, কি আছে জীবনে। খালি এইখান থেইকা সরতে হবে’।

অমাবস্যার সন্ধ্যায় আমরা বারান্দায় বসে থাকি। ছেলে গুন গুন করে গান গায়। একহাতে মাথা চেপে আরেক হাত দিয়ে সিগারেট জ্বালায়। লাইটারে অসুবিধে হয় না, দেশলাই হলে মুশকিল হতো, হাত দিয়ে হাওয়া আটকাতে হতো। সিগারেটের লাল আগুন হ্রস্য দীর্ঘ রেখা বানিয়ে অদৃশ্য হয়। আমি অকারণে একটা জোনাক পোকা খুঁজতে থাকি। অনিদ্দির্ষ্ট মতিভ্রম কোন জোনাকি পথ ভুলে চলে আসলে কি হয়!

ছেলে আমাকে বোঝায়, মাথার খুলি গেলে হাতও অকেজো, অন্তত একটা । 

আমি আর বলি না যে দাঁত গেলে আঁতও যায়। প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের দুধ দাঁতগুলির কথা মনে পড়ে। মুখের ভেতর কি সুন্দর মাখন মাখন গন্ধ থাকতো! 

***

অনেকদিন বাড়ি না ফেরা ছেলের প্রতীক্ষা করতে করতে যখন তখন ক্লান্তিতে ঘুম পায় আমার, আবার ঘন গরমে ঘুমের ব্যঘাত ঘটে। পানি পিপাসা পায়। রাস্তার মুখে গেটের কাছে দাঁড়াতে দাঁড়াতে হাত পা ভেঙ্গে আসে আমার। মাথায় আঁচল দিলেও রোদ তালু ভেদ করে মগজের কোষে ঢুকে পড়ে। ছুরির মত ব্যথাবোধ হয়। ছেলেকে মনে হয় দেখি মোড়ের কষাইয়ের দোকানে ঝোলে, কল্লা নীচের দিকে, ছেড়া খোড়া তারের মত রগ বেরিয়ে আছে। ছেলের খুলি খোলা মাথা মেঝেতে রাখা, মায়াময় চোখে তাকিয়ে আছে। দোকানী চিৎকার করে ডাকছে- ‘মগজ নিবেন মগজ, ফ্রেস আছে’।

এই স্বপ্ন আমি আগেও দেখেছি। ভয় লাগে না, বুঝি যে স্বপ্ন। নিজের বাহুতে অন্য হাত বুলিয়ে দিই, শান্তনার মত। স্নেহের মত বলি- এ কেবল স্বপ্ন। ঘরে এসে বেশী করে পানি খাই, জানলা খুলে দিই, কষাইএর দোকানের সামনে কুকুরগুলির তারস্বরে ডাক এত দূরে থেকেও ভেসে আসে। 

পরের দিন ছেলে ফোন করে। সে আসবে, কিন্তু কখন তা জানে না। 

অনিশ্চিত সময় পার করার উপায় খুঁজি। টেলিভিশন দেখতে, ছাপার অক্ষর দেখতে ভালো লাগে না। ভাবি, একটা কাঁথা বুনতে বসে গেলে হয়। বড় কাহিনী থাকবে। রাজা, রাজপুত্র, কোটাল পুত্র, নৌ বহরের বাইচ, বেশ বাঁকা করে সেলাই করবো বৈঠাগুলি। নদীর ঢেউ। কল্পনায় ভর করে ভেতরের ভয় খানিকটা উৎপাটিত হয়। কাঁথার জন্য কাপড় খুঁজি, পুরনো শাড়ি, নরম একরংয়ের থান। 

সন্ধ্যার আগে আগে একটা মোটর সাইকেল বাড়ির পেছন দরজায় থামে। অনেকদিন পর ছেলে ফিরলো, তার মুন্ডিত মাথা চক চক করে, গৌতম বুদ্ধের শিষ্যের মত, ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’ গেয়ে উঠবে। ছেলে মাথায় টোকা দিয়ে দেখালো তার মাথার খুলি জোড়া লেগে গেছে। শুধু কিছুদিন একটা হেলমেট পরে থাকতে হবে। 

কোন রকম খাবারের বায়না ছাড়াই এবার অসময়ে ঘুমোতে চলে যায় ছেলে। আমি এই ফাঁকে আয়েশ করে রান্না চাপাই। দেরী হলে হোক, কতদিন পর ছেলে খাবে! মা ছেলে কতদিন পরে একসঙ্গে বসবো। 

রাত বাড়লে আমি ছেলেকে ঠেলে উঠিয়ে দিই, টেবিলে ধোয়া ওঠা ভাত। হাত ধুতে যাবার আগে বাড়ির সামনে পুলিশের ভ্যান। হাতে বন্ধুক নিয়ে তারা দরজার কড়া নাড়ে। জোরে জোরে। আমি ছেলের ভেজা হাত ধরে টানি।

সে উলটো জেদ করে, বাড়ির পেছনে মোটর সাইকেল পার্ক করা। হেলমেট ছাড়াই লাফ দিয়ে ওঠে। 

-‘আম্মা,পুলিশ আমাকে চিনবে না, আমি সকালে ফিরা আসবো। দাঁতগুলি নেও, গেলাসে কুসুম গরম পানিতে ডুবায়া রাখো, আর আমার জন্য একটু পাতলা জাউ রান্না করো, এখন আর শক্ত হাড্ডি খাওয়া যায় না’। আমার দিকে ছুঁড়ে দেয়া দুই পাটি দাঁত লুফে নেই। ছেলের গাল চুপসে গেছে। বুড়োটে দেখাচ্ছে। আমি সামনের গেটে কড়া নাড়া শুনি। মোটর সাইকেল ষ্টার্ট দিয়ে আমার ছেলে লক্ষণ সেনের মত পালিয়ে যায়।


লেখক পরিচিতি
নাহার মনিকা

কানাডা প্রবাসী
কবি। গল্পকার।

1 টি মন্তব্য:

  1. বার বার পড়েছি, বার বার পড়েছি। এই বিবরণে মায়েরকষ্ট কিম্বা বিগড়ে যাওয়া সন্তানের অসহায়ত্ব আমি আগে কখনো পড়িনি। লেখক কে স্যলুট। ভালবাসা মনিকাআপা।

    উত্তরমুছুন