বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

সুমী সিকানদার'এর গল্প : ইনটুইশান

সাদা মলাট করে মন ভাল লাগছে। বেশ কিছু বইয়ের চকচক ঢেকে দিলাম মলাট দিয়ে, কত্ত খুঁজে খুঁজে যে বইগুলো কিনলাম । কিছু মেলায় পেয়েছি । এই মেলাটা আবার হয় সাধুপুরে । এটা কুষ্টিয়ার একটা গ্রাম। বছরে একদিনের মেলা সারাদিন থেকে সারারাত চলে। সাথে সাথে খাঁচার ভিতর অচিন পাখি চলতে থাকে সাধু- সমাজিদের কন্ঠে। সাথে তামাক, হুক্কা, বিড়ি ,তাড়ি। 

এই মেলাটা খুব মজার বেঞ্চ পেতে বই বিক্রি হয় । বিরাট মাঠ , মাঠ ভর্তি ধুলা ধুলার উপরে টেবিল টেবিলের সব বইয়ের গা ভর্তি ধুলা । কোন সামিয়ানা নেই কিচ্ছু না।শুধু এক দঙ্গল ঋতুপর্ণ হাওয়ার সীসাহীন রাজত্ব।

নতুন পুরোনো সব বই পাওয়া যায় নতুনও। একশ বছরের পুরানাজামানার আঁকার বই পেয়ে তোমার জন্য কিনেছি। কিছু পুরস্কার প্রাপ্ত রাইটারের বই, কিছু প্রেমের কবিতাও। হয়তো তেপান্তরের ওপার থেকে তোমাকে নিরহং প্রেম শেখাবে কবিতার কাটাকুটি। তোমার নাম দেয়া হয়েছে বইপোকা। প্রিয় মানুষের জন্য প্রিয় এক নাম , আমি ডাকবো।

সব গুলো বইয়ে একবার ভেবেছি তোমার আসল নাম লিখি গোটা গোটা। কিন্তু নামটা বিচ্ছিরি আমার ভালো লাগে না । তাই সব বইয়ের কোনায় লিখেছি বইপোকাকে উইপোকা। তুমি কি জানো উইপোকারা অন্ধ হয়। তারা দেখতে পায় না। বাধ্য হয়েই তাদের বইই খেতে হয়। একমনে চুপচাপ বইয়ের পাতার পর পাতা ছিদ্র করে তারা চেনা অচেনা সব বই খেতে থাকে। মানুষের কিন্তু সহজিয়া বোধ আর চোখ তার সাথেই থাকে। তবু যত্রতত্র চলে অন্ধ আচরণ।

অমিতাভ বহু বছর ধরে পার্থ এ আছে। নিজের একলাই জীবন । মাঝে মাঝে দেশ থেকে মা আসেন । কিম্বা আসে মায়ের পার্সেল। বাইরে থকে দরজা খুলে সে ঘরে ঢুকলো। একগাদা জিনিস হাতে। সপ্তাহের গ্রসারি,মোবাইল, ফুল, আর পার্সেল। কে যেন পার্সেল পাঠিয়েছে অনেকদিন বাদে। তাকে তো পাঠানোর সেরকম কেউ নেই। কে পাঠালো? খুব খুশী লাগছে কিন্তু কেন জানি খুলতে ইচ্ছে করছে না। 

পার্সেল টেবিলে রেখে সে বাজার নিয়ে কিচেনে গেলো । চট করে চিকেন আর ডাল বসিয়েছে। দ্রুত হাতে সালাদ কাটছে। নেট থেকে সে রেসিপি ট্রাই করে প্রায়ই। ভাল কুক অমি। ফাঁকে ফাঁকে ফেইসবুকিং। গুচ্ছের মেসেজ এসেছে। সবাই শুধু লিখে কথা বলতে চায়। যেন আশেপাশে কথা বলার জনমানব নেই । যেন সবাই এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে স্বেচ্ছায় অবস্থান করছে, সেখান থেকে পরিত্রাণের কোন ইচ্ছেও নেই । 

সুজানা আস্তে করে করে দরজায় ঠেলা দিয়ে ভেতরে ঢোকে। তার হাতের সারপ্রাইজ ‌ গিফট প্যাক, কেক। । পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকতেই ফাঁকা, নাহ অমিতাভ নেই ঘরে, লিভিং এ নেই , ওয়াসরুমেও নেই। তার মানে সে কিচেনে ।

থাক সে আগে কেকের মোম রেডি করবে। দুই বছর আগের এই দিনে তাদের প্রথম দেখা এবং তারপর অনেক কিছু। চুপচাপ নিজের বানানো কেকের গার্নিশ করতে লাগলো ।‘’ ফার্স্ট ডেট’’ লিখে সে কিচেনে উঁকি দিতেই দেখে চুলায় কি যেন ফুটছে, আর অমি ল্যপটপে মগ্ন। 

সে পেছন থেকে চট করে অমির চোখ ধরে ফেললো। অমির গলায় খুশী ।
‘’ও রিয়েলি, আপনি কি আমার সুজান ? বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায়। এক হাতে সুজানা কে টেনে নেয়। সুজানা চট করে তার ঠোঁট চেপে ধরেছে। তীব্র চুমুতে আবিষ্ট অমি পুরোই সুজানার আয়ত্তে। চুমু শেষ করে মিটমিট হাসে সুজানা। 
‘’বুঝেছি বুঝেছি, অনেক মিস করেছেন আমাকে। ‘’ অমি আদর করে আপনি বলে সুজানা কে।
‘’ আজ কোন দিন মনে আছে? ‘’
‘’মনে নেই আবার দাঁড়াও সব রিপিট করতে হবে।‘’ 
‘’এ্যই মোটেই না আমি সকালে ফিরেছি। এখন দৌড় দিবো চলো খাবো খিদে লেগেছে অনেক কাজ।‘’ সুজানা তাড়া লাগায়।
‘’কোন যাওয়া নেই’’। অমি ঘোষনা দেয়। ‘এখন আমি চিংড়ি রেঁধেছি খাবো চলো আর রাতে আমাদের আজ ডিনার।‘

‘’শোন না , শোন না’’ সুজানা রিকোয়েস্ট করতে থাকে। অমির শোনার মুহূর্ত নেই। ডুবে যেতে কিসের দেরি। দিনভর ডুবে থাকে ওরা দুজন। লেসের পর্দা কারুকাজ করা রোদ ফেলে তাদের পিঠে। সুজানার খোলা পিঠে আঙ্গুল দিয়ে আঁকতে দারুন পছন্দ করে অমি। কড়ে আঙ্গুলে লেখে কনিষ্ক কবিতা। প্রবল এক ‘ না’ থেকে কিভাবে যেন অনিবার্য ‘হ্যাঁ’ তে এসে পৌছে গেছে তারা। অনুচ্চ স্বরে ধীর পায়ে সুজানা তার অহরহ নেপথ্য ইশারা । 

বই পাঠানোর পর থেকে অস্থির লাগছে। কই কোন মেসেজ তো আসেনি। তুমি কি পাওনি ? এরকম তো হবার কথা না । নিজেকে সামলিয়ে অপেক্ষা করছি। অস্থির না হওয়াই ভালো। তুমি পেয়ে কী ভীষন অবাক হবে। তোমার চোখ জোড়া গেয়ে উঠবে । এখান থেকেই দেখে নেবো তোমার স্বপ্নালু মুখ। শুধু ছবিতে চেহারার আদল পাওয়া যায় ! এভাবে ছাড়া কিভাবে তোমার কাছে যাবো ? কিভাবে পৌছানো যায় একের পর এক অচেনা পথে চেনা ভঙ্গীতে। তোমার লেখা পাওয়ার আগ পর্যন্ত ভাবনার নৈশ ভ্রমণে ডুবে থাকি উপচানো শূন্যতায়।

ডিনার শেষে আইক্রিম পার্লার হয়ে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত। ঘুম চোখে ঘরে ঘুকতেই অমি দেখলো টেবিলে পার্সেলটা একা সেই সকাল থেকে । ইশ ভুলেই গেছে। সময় গেছে সাইকেল চেপে।

কাটার নিয়ে এক টানে পার্সেল খুলে ফেললো । ভেতর থেকে লাফিয়ে এলো সাদা আলো। সব সাদা বই। এতো গভীরতা আর কোন রঙে নেই।এত সব সাদা কেমন মোহ তৈরী করেছে। সব বইয়ের নাম উপরে পেন্সিলে লেখা। পেন্সিলের লেখায় যত মায়া আছে মানুষের মনে ততো নেই। আলতো করে সে এক এক বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টে চমকে যায়। কোনায় ছোট করে সীসে লেখা ‘বইপোকা কে উইপোকা।‘ 

এই কাজ তো শুভমিতির। এক সেইই জানে এই বইগুলো তার দরকার। মিতি কে ভাবতে গিয়ে কিছুটা অস্থির হয় অমিতাভ। তার সব জানিয়ে দেয়া দরকার ছিলো । জানাতে পারেনি। মনের অনেক গহীন থেকে গাঢ ভালবাসে মিতি । অমি অনেক বার ফেরাতে চেয়ে পারেনি। তাকে নিয়ে মিতির আনন্দকে নিজের চোখে দেখতেও কেমন ঝাপসা লাগে। কিছু না বলার ভয়াবহতায় আচ্ছন্ন হয়ে পরে অমি। তার চোখে ভীড় করে শালবনের বিস্তার, বিছানো সবুজাভ আর আঙ্গুলে মিতি। না না মিতি নয় সুজানা। অমির এই নিঃশব্দকে মিতি বড় শব্দময় করে তোলে । অমির মন কেবল পাতা উল্টায়।

কানে হেড ফোন হাতে বই। আয়েস করে চিড়েভাজা খাচ্ছে মিতি । ঘরের পিছন দিকের জানালা তার খুব প্রিয়, সেখানে ইজিচেয়ার পাতা। পাশেই লাগোয়া ঝিল দেখা যায়। মন খুব ভাল কিম্বা খুব খারাপ মিতি এখানে এসে বসে। বৃষ্টি হলে পায়ে পায়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে পরে। কারো অপেক্ষার দুঃখ সে নেয় না। সারা গায়ের থৈ থৈ জল পায়ে লুটিয়ে পরতে পরতে তাকে ভালবাসে। এই সময় কেউ যদি বলতো মিতিময় , বৃন্দাবনী বৃষ্টিতে ভিজো না ঘরে যাও। যত বাঁধ ভাঙ্গা প্রেম মিতির মনেই । মুখে তার অজস্র ভুল বানানের ভীতি। 


জলের ওপর বাঁশের পাটতন এক বৈঠা চলাচল। অল্প দুরত্বে একজন দুইজন পার হয়। বুকে কচুরিপানা নিয়ে জল স্ফূর্তিতে থাকে। কী সুন্দর সবুজ কচুরিপানা আর তার বেগুনি ফুল। আহা দুজনে মিলে ভাসতে ভাসতে অনেক সময় স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। অনেক সময় গল্পের শেষ খুঁজতে খুঁজতে দৃশ্যের বাইরে দিশাহারা মিলিয়ে যায়। মিতির চোখ তৃষ্ণার্তের মতো বেগুনিটুকু খোঁজে পায় না । যেভাবে সে অমি কে খোঁজে, অমির দিনরাতের টাইপ করা আংগুল খোঁজে, পায় না।

অমি মন প্রাণ দিয়ে তার কথা শোনে। মিতির নিজের প্রায় সব কথাই কটকট করে বলা হয়ে গেছে। এই মানুষকে সে এক সকালের টানাকবিতায় জড়িয়ে ফেলেছে। আলগা হতে চায় না। সারাজীবন কচুরিপানার মতোই ভাসবে পূর্বিতায়-পশ্চিমে কিম্বা দিশাহীনে। সব ফুল তো আর মাটি পায় না। 

মিতি কে ভাবতে গিয়ে কিছুটা অস্থির হয় অমিতাভ। মিতিকে তার সব জানিয়ে দেয়া দরকার ছিলো । জানাতে পারেনি। মনের অনেক গহীন থেকে গাঢ ভালবাসে মিতি । অমিতাভ অনেক বার ফেরাতে চেয়ে পারেনি। তাকে নিয়ে মিতির আনন্দকে নিজের চোখে দেখতেও কেমন ঝাপসা লাগে। কিছু না বলার ভয়াবহতায় আচ্ছন্ন হয়ে পরে অমি। তার চোখে ভীড় করে শালবনের অনাবিল বিস্তার, বিছানো সবুজাভ আর আঙ্গুলে মিতি্র আঙ্গুল। না না মিতি নয় সুজানা। অমির এই দোটানা এই নিঃশব্দকে মিতি বড় শব্দময় করে তোলে । অমির মন কেবল পাতা উল্টায়।

দ্রুত মোবাইলে মেসেজ দেখে সে। সারাদিনে জানিয়ে দেখা উচিৎ ছিলো। মিতি নিশ্চয়ই চিন্তায় আছে। মিতিই পালটা লিখে রেখেছে। 

‘’শোনো হে বইপোকা , সারাদিন তোমার কোন আওয়াজ নেই। আজ আমার সাথে কি প্রেম স্থগিত? মন চাইলেই যেতে পারিনা তাই অক্ষরে যাই তোমার কাছে। একা বসে বসে কেবলি ছবিগুলোর কথা মনে পড়ছে যে এঁকেছে তার কথাও।কী যে সুন্দর আঁকো তুমি। এতোটা মুগ্ধ হইনা তোমার কথাতেও।

তুমি আমাকে ভালোবাসো না সেই ভরসায় বলছি । ভালবাসি তোমাকে। 
সেই অধিকারেই নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছি। ভেবে দেখলাম আমাদের খুব একান্ত হেলান দেয়া নির্ভার সময়গুলো এখন বেদুইন। বার বার খেই হারায়। তাই মন পাল্টেছি । রাগের পর রাগ বিক্রি করেও তো রাগ যাচ্ছে না। ডালিমফুল এঁকে তার ঘ্রাণ পাওয়া যায় না। ঘ্রাণ এক রকম শক্তি সেটা নিয়ে জন্মাতে হয়। সম্পর্কের এক কোনা ধরে গেলে পুরোটাতেই পোড়া গন্ধ লাগে। বরং বইগুলো বুকে চেপে শুঁকে নিও, আমি ভাবনায় দেখি। তোমার অচেনা ভঙ্গীটা বড়প্রিয় , চিরকুট মুহূর্ত। চোখে জল আসে আমার । ‘’
এই মাত্র একটা মুহূর্ত চলে গেলো তুরন্ত। সে আর ফিরবে না । মিতিকে সব কথা বলার জন্য কোন মুহূর্তই তার ভাবনায় ছিলো না। সে কি ইঙ্গিত দিলো ? সে কি টের পেলো ! অমির নিজস্ব আনন্দ আজ মিতির জন্য আঘাতময় হয়ে উঠবে। নিজেকে এতদিন পর স্বার্থপর মনে হচ্ছে অমির। মাথার উপরে পাখা চলছে বাইরে থেকেও হাওয়া আসছে ঘরে। বইয়ের পাতা উড়ছে ফর ফর করে। পাতার নাচানাচিতে বার বার দেখা যাচ্ছে কোনায় লেখা , বইপোকাউইপোকা............ বইপোকাউই পোকা। 
দেখা না হওয়াটাও এক রকমের অন্ধত্ব।

২টি মন্তব্য:

  1. আমিও তাই বলব, শেষ লাইন।
    গল্পকার সুমীর গল্প ভালো লাগছে।

    উত্তরমুছুন