বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য'র গল্প : কুয়ো

রাত এগারোটা বাজতে না বাজতেই লোডশেডিং। গত কয়েকদিন ধরে এটা শুরু হয়েছে। কে একটা অলিখিত নিয়ম তৈরি করে দিয়েছে, সাড়ে দশটার পর পরই গোটা পাড়ার সমস্ত বাড়ি এবং দোকানপাটের আলো নিভে যাবে। কয়েকটা গ্যারাজ এবং ক্লাবের ছাদও আছে। সেখানেও থাকবে না আলো। ব্যাপারটা নিয়ে বিদ্যুৎ সংস্থাকে জিজ্ঞাসা করলে তাদের একটাই দায়সারা উত্তর- জলের পাইপের কাজ চলছে। কিছুদিন বাদেই ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা নেই… এটুকু বলে দিয়েই তারা খালাস। কবে পুরো ঝামেলাটা ঠিক হবে, তা কেউ জানে না।

অফিস থেকে ফিরতে প্রতিদিনই রাত হয়ে যায় বিমলের। শহরের একটি নামকরা ওষুধের দোকানে কাজ করে ও। নামে দোকান হলেও আসলে প্রাইভেট লিমিটেড। তা সেই প্রাইভেট লিমিটেড বন্ধ হতে হতে সাড়ে ন’টা। তারপর সহকর্মীদের সঙ্গে চা-সিগারেট খেতে খেতে পাঁচ-দশ মিনিট আড্ডা মেরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাড়ে দশটা হয়েই যায়। ইদানীং ওদের প্রাইভেট লিমিটেডের অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। গত মাসে দু’দফায় অর্ধেক মাইনে পেয়েছিল। এ মাসে এখনও পর্যন্ত হয়নি। দুজন প্রাণী দিয়ে তৈরি একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের দায়িত্ব ওর ঘাড়ে। দায়িত্বের ভালো নাম- বউ আর ক্লাস ফোরের মেয়ে। মেয়ে ফ্রক পরে। ওদের একতলা বাড়িতে দেখার মতো জিনিস বলতে- একটি উঠোন, একটি কুয়োতলা, চারটে বড়ো গাছ। নারকোল, আম, পেয়ারা আর বাতাবি। বহুদিন ফল ধরে না কোনওটায়। কুয়োতে জল ফুরিয়ে গিয়েছে, তাও হল অনেকদিন। শুকিয়ে যাওয়া কুয়োর উপর বাতাবি গাছ ঝুঁকে পড়েছে বয়সের চাপে। নিয়মিত দুধটা, ডিমটা পেলেও বুনাইয়ের কাঠামোটি ক্ষয়াটে। তবু, ক্ষয়াটে হলেও, মেয়ে তো! আর কয়েকদিন বাদেই একটু একটু করে জল-হাওয়া পেয়ে একদম গোটা মানুষটি হয়ে উঠবে। তখন কী হবে! যা দিনকাল! ব্যাপারটা মাথায় ঢুকে গিয়ে পাখির বাসা বানিয়ে ফেললে ওর এগারোটা-দশটা ডিউটির মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ ওলোটপালোট হয়ে যায়। ঘুমটা নষ্ট হয়ে যায় তার ফলে। খালি গায়ে পাজামা পরে বিছানায় এ পাশ ও পাশ করে। পাশের ঘরে বউ আর মেয়ে। কিডনির একটা সমস্যার জন্য বউ দিনে ছশো মিলিলিটারের বেশি জল খেতে পারে না। সারাদিনে অল্প একটু পেচ্ছাপ করে। বউ কয়েকমাস হল মেয়েকে নিয়ে আলাদা শোয়। ভূতের ভয় বলে ঘরে কুড়ি ওয়াটের একটা বালব জ্বালিয়ে রাখে। মাঝরাতে জল খেতে উঠে প্রথম কয়েকদিন ভেজানো দরজা ঠেলে এই ঘরে চলে আসত বিমল। দেখতে পেত, বিয়ের সময় ওর শ্বশুরের দেওয়া বড়ো সেগুনকাঠের খাটে শুয়ে আছে দুটো প্রাণী। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে। দেওয়ালের ক্যালেন্ডারের ছবির কালীঠাকুরের জিভের উপর বসে আছে টিকটিকি। একটি কাচের বলের ভিতরের মতো নিস্তব্ধ ও শূন্য চারপাশ। কোনও শব্দ নেই। কোনও মাসকা লাগানো কোলাহল নেই। এই জায়গা থেকে একটি ‘বলো হরি’ রব উঠলে গোটা পৃথিবীটাই যেন নড়েচড়ে বসবে। এর মধ্যেই নিজের ডান-পা মায়ের কোমরে তুলে দিয়ে শুয়ে আছে বিমলের মেয়ে। ক্লাসে এক থেকে তিনের মধ্যেই থাকে বরাবর। কিন্তু ইংরাজি গ্রামারে বড্ড দুর্বল। কোথায় ‘ইজ’ বসবে এবং কোথায় ‘আর’- তা এখনও ধরতে পারে না ভালোমতো। মুখ থেকে লালা পড়ে বিছানাটা ভিজিয়ে দিচ্ছে। একেবারে বাবার স্বভাব। একবার শরীরটাকে ঘুমের মধ্যে বেঁকিয়ে নিয়ে মা’কে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। দৃশ্যটি সুন্দর। এরপর আর কিছু দেখার নেই। বিমল নিজের ঘরে ফিরে আসে। তখনও লোডশেডিং-এর এমন বাড়বাড়ন্ত শুরু হয়নি। নিজের বিছানায় শুয়ে এই মেয়েটিকে নিয়েই দুশ্চিন্তা করে বিমল। ওদের এই মফসসলের পাড়া থেকে কিছুটা দূরত্বেই রেললাইন। প্রথম ট্রেনের হুইসল বাতাসের চাপে গুঁড়ো হয়ে গিয়ে জানলা দিয়ে সটান এসে থপ করে বসে পড়ে ওর বিছানায়। তারপর ভোর হয়। মনের মধ্যে ন’বছরের মেয়েকে বিষয় করে মাঝারি সাইজের বিভিন্ন গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তে বেসরকারি সংস্থার কেরানীটি অত:পর টের পায় পৃথিবীতে আবার একটা নতুন ব্যাপার শুরু হল।

বাড়ি ফিরে খেয়ে নেয় বিমল। টেবিলে খাবারটা চাপা দেওয়াই থাকে। টুয়া রান্না করে রেখে দিয়ে দশটার মধ্যে শুয়ে পড়ে। ওর জন্য অপেক্ষা করার লোক বলতে, মেয়ে। বিমল সকালের জলখাবারটা নিজে বানিয়ে নেয়। ভোরে ওঠা ওর চিরকালের অভ্যাস। দু’কাঠা জায়গা নিয়ে ওদের বাড়ির উঠোন। সেখানে পায়চারি করে। উঠোনকে ঘিরে চারখানা গাছ। ফল না ধরলে তাদের পাতা তো আছে। সেই পাতাই এই আষাঢ়ের ডামাডোলে উঠোন-বোঝাই করে ফেলে দেয় তারা রোজ। বিমল সেগুলো ঝাঁটা দিয়ে পরিষ্কার করে। রোজ সকালে উঠে এই পাতা পরিষ্কার করা ওর এক নেশা। কাজটা করতে করতে প্রায়ই নিজেকে নানারকম স্বাদ-আহ্লাদ দিয়ে গড়ে ওঠা অফুরন্ত এক মেশিন বলে মনে হয়। উঠোনের পাশেই কুয়ো। বিমলের বাবা বলরামের তৈরি করা জিনিস। সত্তর বছর আগে বাংলাদেশ থেকে এখানে এসে জমি কিনে প্রথম যে কাজটা বলরাম করেছিল, তা হল, এই কুয়োটা বানানো। বড়ো করে বানানো কুয়ো। চারপাশের আর পাঁচটা বাড়ির লোকও এখান থেকে জল নিয়ে যেত। এত পরিষ্কার আর ঠাণ্ডা জল। সময়টা স্বাধীনতার কিছু পরে। কুয়োতে এখন আর জল নেই। বছরখানেক হল অনেক ইতিহাস-ভূগোলকে গর্ভে নিয়ে ওটা একদম শুকিয়ে গিয়েছে। অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিল কুয়োটা বুজিয়ে দেওয়ার। মজে যাওয়া কুয়ো নিয়ে হবেটা কী! বিমল প্রাণে ধরে কাজটা করে উঠতে পারেনি। যতই হোক, বাবার করে যাওয়া জিনিস। কুয়োতে তিনটে দড়ি আটকানো। এই তিনটে দড়ির নাম দিয়েছে বুনাই- বাবা, মা আর আমি। আগে ওই দড়িগুলোতে বালতি লাগানো ছিল। তিনটে দড়ি থাকার একটাই কারণ- এক জায়গার দড়িতে একটু ঢিলে ধরলেই তার থেকে বালতিটা খুলে নিয়ে পাশে একটা তাজা দড়ি বেঁধে সেখানে লাগিয়ে দেওয়া হতো বালতিটা। ঢিলে ধরে যাওয়া দড়িটা ফেলে দেওয়া যেত। কিন্তু বিমলের তা ভালোলাগে না। কিছুই ফেলতে ইচ্ছা করে না। এতদিন ধরে কুয়োর সঙ্গে ওদের সম্পর্ক। বুড়ো হয়ে গিয়েছে। মরেও গিয়েছে হয়তো। কিন্তু জাতটা তো দড়ির। তাই ছেড়ে যায়নি। মানুষ হলে হয়তো যেত। এখনও কুয়োর গায়েই লেগে আছে তাদের ঈষৎ ভেবলে যাওয়া কঙ্কাল। বাতাবি গাছের পাতা তাদের বাতাস করছে। বিমলের মনে কী এক বিশ্বাস- কুয়োটা ঠিক জলে ভরে যাবে আবার একদিন। মিষ্টি, টাটকা জল। তাতে সরাসরি গ্লাস ডুবিয়েই জল খাবে ও আর ওর মেয়ে বুনাই। এক গ্লাস করে সেই জল খেতে দেবে দড়িগুলো আর বাতাবি গাছটাকেও। সেই জল খেয়ে শরীরগুলো ভর্তি করে ফেলবে ওরা। উঠোনটাকে আরও বেশি চওড়া মনে হবে তখন। 

পানীয় জল ওদের এলাকায় সুলভ নয়। এই এলাকায় টিউবওয়েল অনেকগুলো। কিন্তু এখন আর ওগুলো ব্যবহার করে না কেউ। আগে করত। এখন আর করে না। সবকটা কলতলাতেই মিউনিসিপ্যালিটির বোর্ড লাগানো। হলুদ রঙের বোর্ড। তাতে কালো কালিতে লেখা- এই জল পানের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। এখানে আর্সেনিক আছে… ‘এখানে আর্সেনিক আছে’ বাক্যটা দেখলেই বিমলের মনে হয়, কথাটা আসলে ‘এখানে কুকুর আছে’-র ভঙ্গিতে লেখা। আর্সেনিক কি কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে? বা, কুঁইকুঁই? ও তা জানে না। তবে, ও জানে অন্য একটা ব্যাপার। একটা স্বপ্ন। যা বিমল অন্তত চারবার দেখেছে। একই স্বপ্ন চারবার চারটে আলাদা ঘুমের মধ্যে দেখে ফেলা ইয়ার্কির কথা নয়। স্বপ্নটা অনেকটা এইরকম- একটা লেজওয়ালা চারপেয়ে জীব টিউবওয়েলের মতো মুখ নিয়ে কালো শরীরটা নিয়ে মাটি থেকে মোটামুটি সাড়ে তিনফুট উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে চক দিয়ে লেখা- এখানে আর্সেনিক আছে… কুকুরটা দাবনা দুলিয়ে চলেছে। তার পিঠে ওয়াটার বটল নিয়ে বসে আছে বুনাই… স্বপ্নটা যতবারই দেখে, ততবারই বিমলের ঘুমটা দুমড়ে যায়। বাথরুমে গিয়ে দেখে, পেচ্ছাপটাও হচ্ছে না ভালো করে। অথচ ও রোজ চার লিটার করে ফ্রেশ জল খায়।

বাড়ি ফিরে রাতের খাবারটা খেয়ে মেয়েকে নিয়ে জল আনতে যায় বিমল। রোজকার রুটিন। এলাকার টিউবওয়েলগুলো পেরিয়ে চলে যায় দক্ষিণদিকে প্রায় দুশো মিটার। ওই জায়গাটার জলে এখনও আর্সেনিক ধরেনি। মেয়ের হাতে ওর স্কুলে নিয়ে যাওয়ার ওয়াটার বটল। এক লিটার জল ধরে ওতে। বিমলের হাতে একটা বালতি। সেখানে ছ’টা দু’লিটারের বোতল এ ওর গায়ে শোয়ানো। এই বোতলগুলো এক সময় কোল্ডড্রিঙ্কে ভরা ছিল। এখন জলের বোতল হয়ে গিয়েছে। এই বারো লিটারই ওদের সারাদিনের খাবার জল। এক-চতুর্থাংশ ব্যবহার হয়ে যায় রান্নার কাজে। বাকিটা ওরা খায়। খেয়ে দেয়ে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বিমল। এগারোটা বাজে। পৌঁছতে আধঘন্টা। ফিরতেও তাই। মেয়ের পরেরদিন সকালে স্কুল। বারণ করে। তবু বাবাইয়ের সঙ্গে ওর আসা চাই। লোডশেডিং-এর মধ্যে ওরা বেরিয়ে পড়ল। বুনাই বলল, বাবা আকাশে বাতাসা এসেছে, দেখো। কথাটা শুনে বিমল মাথা তুলে তাকাল। সামনের কোনও একদিন বোধহয় পূর্ণিমা। মাঝারির থেকে একটু বড়ো সাইজের একটা চাঁদ উঠেছে। মেয়েটা কিছুতেই চাঁদকে ‘চাঁদ’ বলবে না। ওর কাছে চাঁদ মানে বাতাসা। মুড়ি দিয়ে খাওয়ার জিনিস। কয়েকদিন বাদে এই চাঁদই নিশ্চিন্ত জ্যোৎস্না হয়ে নেমে এসে এই রাস্তা, কলতলা, কুয়োতলায় পড়ে থাকবে ভরভরন্তভাবে। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বিমল বলে- ওটা চাঁদ। কতবার বলেছি তোকে। মেয়ে কোনও জবাব দেয় না। ফ্রকের খুঁট পাকাতে পাকাতে গলায় ওয়াটার বটল ঝুলিয়ে বাবার সঙ্গে চলেছে। চারপাশে পাকিয়ে পাকিয়ে উঠেছে মাতৃগর্ভের অন্ধকার। বিমলের মনে হয়, এই অন্ধকারেই একদিন শুয়েছিল ও আর ওর মেয়ে। মায়ের শরীরের রক্ত টেনে নিয়ে বিচিত্র আনরিয়েল হাসি হেসেছিল দুজনে আলাদা আলাদা করে। মেয়ের গ্রামারটা দুর্বল। এই জল আনতে যাওয়ার সময় ওদের মধ্যে একটু পড়াশোনা হয়। সে জিজ্ঞাসা করল- বল তো, তারা ‘জল আনতে যাচ্ছিল’ ইংরাজি কী? মেয়ে একটু ভেবে নিয়ে বলল- দে আর গোয়িং টু স্কুল… 

- ওরে, স্কুল না! জল আনতে যাচ্ছিল। জল!

- ও। জল। তাহলে ওয়াটার।

- পুরোটা কী হবে?

- পারব না। বড্ড কঠিন। তুমি এত কঠিন পরীক্ষায় ফেলো কেন আমাকে, বাবাই?

কথাটা শুনে কেন জানি একটু চমকে উঠল বিমল। আর কথা বলল না।

একটি মধ্যবয়স্ক পুরুষ এবং তার সন্তান অন্ধকারের মধ্যে জল আনতে যাচ্ছে। তাদের হাতে বালতি আর বোতল। পাখিদের কোনও ডাক নেই এখন। শব্দ যা শোনা যায়, তা বড়ো চাপা। দুপুরের দিকে বৃষ্টি হয়েছিল। তার হিম ওদের জড়িয়ে রয়েছে। একটি বিড়াল গোঙাতে গোঙাতে রাস্তা পার হয়ে গেল। জ্বলজ্বল করা চোখদুটো স্পষ্ট দেখা গেল তার। এই অন্ধকারকে দেখে মনে হয়, জিনিসটা জীবনের লক্ষণ নয়। মেয়ে আগে আগে চলেছে। তার পিছনে বাবা। রাস্তায় বর্ষার কাদা। কাদার পৃথিবী। কয়েকটা পরিত্যক্ত টিউবওয়েল পেরিয়ে গেল ওরা। সেখানে এখন ফরফর করে লতা গজিয়ে উঠেছে। তার ভিতর দিয়ে সরীসৃপ যাতায়াত করে নির্দ্বিধায়। 

ওরা পৌঁছে গেল। 

বুনাই একটা করে বোতল ধরবে কলের মুখে। বিমল পাম্প করবে। এটাই নিয়ম। আজও তাই করল। কলের থেকে একটু দূরেই একটা ডোবা। সেখান থেকে বাতাস আসছিল। বাতাস পিছলে পিছলে যাচ্ছিল। সে কখনও এক জায়গায় দাঁড়াবে না। এই তার নিয়ম। কল টিপতে টিপতে সেই বাতাসের মধ্যে জমাট হয়ে থাকা একটা চেনা গন্ধ আচমকা পেয়ে বিমল স্তব্ধ হয়ে গেল। এই গন্ধটা মাস চারেক আগেও পেয়েছিল। তখন ওর সঙ্গে জল নিতে আসত ওর বউ- টুয়া। সেই রাতেও এরকম অন্ধকারই ছিল। যার গায়ের গন্ধ, সে নিজের নাম বলেছিল- বুনো। তাকে দেখা যাচ্ছিল না। তবে সে আছে। জল খেতে চেয়েছিল ওদের কাছে। বিমল কল টিপে দিয়েছিল। টুয়া একটু সাইড করে দাঁড়িয়ে ছিল পিছনে। রাস্তায় ওরা তিনজন ছাড়া আর কোনও প্রাণী নেই। লোকটা অন্ধকারে কখন জল খেল আর কখন উঠে গেল, তা বিমল টেরই পায়নি। ও কল টিপেই যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা ঝটপটানির শব্দ পেয়ে থামল। অজগর যেভাবে মুরগীকে ধরে, পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে, সেরকম একটা শব্দ। মুহুর্তখানেক। তারপরই তা থেমে যায়। কী হয়েছিল, তা বিমল জানে না। কিন্তু সেদিনের পর থেকে টুয়া আর বাড়ির বাইরে বেরোয় না। সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে পড়ে থাকে। সেই গন্ধটাই আবার। আজকে। এখন। ‘একটু জল হবে?’- এটুকু বলেই তুখোড় লোকটা একদম চুপ। ভসভস করে বাতাস ছাড়ছে মুখ দিয়ে। সেই বাতাস ডোবা থেকে উঠে আসা বাতাসের ভিতর আটকে গিয়েছে। আর এগোতে পারছে না। লোকটাকে আজকেও দেখা যাচ্ছে না। বিমল পাম্প করতে আরম্ভ করে। কলের মুখ থেকে সরে এসে বুনাই ওর বাবার গেঞ্জির খুঁটটা ধরে রয়েছে। ও ভয় পেয়েছে। ভয় পেয়েছে বিমলও। কিন্তু তা কাউকেই বোঝানো যাবে না। সে মেয়েটাকে সঙ্গে করে এনেছে। সে তার বাপ। মেয়েটার ইংরাজি গ্রামারটা এখনও ভালোভাবে রপ্ত হয়নি।

ওরা বাড়ি ফিরে আসছিল। মাত্র দুটো বোতলই ভরতে পেরেছে বিমল। মেয়েটার ওয়াটার বটল ভর্তি হয়েছে অর্ধেকটা। মেয়ের একটা হাত এখন ওর হাতে। একমুঠো গরম। মেয়েকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে ভয় পায় ও। বাবা আর মেয়ে জলের বোতল নিয়ে হেঁটে যেতে থাকে। অন্ধকারের দিকে তাদের স্থির দৃষ্টি। মেয়ের ফ্রক পরা কাঁধে হাত রাখে বিমল। আর ইংরাজি না, একটা গান করি আয়… কথাটা শুনেও কোনও জবাব দেয় না বুনাই। বিমল আবার বলতে গেল একই কথা। তখনই চেঁচিয়ে উঠল বুনাই- বাবাই, ওই দেখো! ওরা বাড়ির কাছে চলে এসেছিল। বাড়ির গেটের কাছেই কুয়ো। আলো চলে এসেছে। উঠোনের সেই ম্যারম্যারে আলোতেই বিমল দেখল, এতদিন ধরে কুয়োর সঙ্গে আটকে থাকা তিনটে দড়ির মধ্যে একটা দড়ি খুলে পড়ে গিযেছে। তা আর নেই।
বুনাইয়ের ড্রয়িং খাতার আঁকাটির তিনজনের মধ্যে একজনের জায়গাটি শূন্য হয়ে গিয়েছে। কিন্তু, কে মুছে গেল আসলে? 

হাতে বালতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ওষুধের দোকানের কর্মী বিমল অনুভব করছিল, ধীরে ধীরে এক অজ্ঞাত শীতকালের দিকে চলে যাচ্ছে ও।







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন