রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

খোদার কাছে চিঠি

গ্রেগরিয়ো লোপেস ই ফুয়েন্তেস
 অনুবাদ : সাকী সেলিমা

গোটা উপত্যকায় একটিমাত্র ঘর। ছোট্ট পাহাড়ের মাথায়। কাছেই একটি নদী দেখা যায়। গোয়ালঘরের পরেই পাকা ভুট্টা আর নতুন ফুল আসা বরবটি লতার খেত। এবার ফলন ভালো হবে।


এখন কেবল দরকার আকাশ-ভাঙা বর্ষার। কমসে কম, মাটির গা ভেজানোর মতো ক’পশলা বৃষ্টির। বৃষ্টি হবে না এমন সন্দেহ করা, আর গাঁয়ের মাটি ও মানুষের সারা জীবনের অভিজ্ঞতার শিক্ষাকে সন্দেহ করা এক কথা।

গাঁয়ের বুড়ো-বুড়িদের অভিজ্ঞতায় লেনচোর অগাধ বিশ্বাস। তাই কিছু না করে সারাটা সকাল কেবল ঈশান কোণে মেঘের সন্ধান করেই কাটিয়ে দিল সে।

এক সময় হঠাৎ বউকে শুনিয়ে বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল, ‘এই দেখ দেখ বিষ্টি!’

বউটি তখন রান্নাবান্নায় ব্যস্ত, বলল, ‘খোদায় দিসে।’

বড়রা সবাই মাঠের আগাছা তুলতে শুরু করল, খেতে না ডাকা পর্যন্ত শিশুরা উঠোনে খেলায় মেতে রইল।

লেনচোর কথাই ফলল। খাবার সময় ঠিকই বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হয়। দেখা গেল সত্যিই ঈশান কোণে বড় বড় মেঘের পাহাড়। বাতাস ঝরঝরে আর মনোরম।

গায়ে বৃষ্টির সুখ লাগাবার ইচ্ছায় লেনচো কিছু একটা খোঁজার অজুহাতে গোয়ালঘরের দিকে বেরিয়ে পড়ল। ঘরে ফেরার সময় বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠলো, ‘বাহ্বারে এ তো আসমান ভাঙা পানির ফোঁটা না, এ যে নয়া মোহরের নাহান। বড় গুলান যেন্ রূপার আধলি আর ছোট গুলান সিকি।’

লোভীর মতো ওর চোখ আটকে থাকল পাকা ভুট্টা আর কাঠি জড়িয়ে-থাকা ফুলে ভরা বরবটির লতায়। তখন সবকিছু একপরত বৃষ্টির পানিতে ভিজে আছে। হঠাৎ কোথা থেকে ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করল। সাথে শিলাবৃষ্টি। শিলা তো শিলা নয় যেন রুপোর মোহর। ছেলেমেয়ের দঙ্গল হৈ-হৈ করে বৃষ্টি মাথায় করে মুক্তোর মতো বরফ কুড়োতে ছুটে গেল।

লেনচো জানে শিলাবৃষ্টি জিনিসটা ভালো নয়। সে দোয়া-দরুদ পড়তে থাকল যেন তাড়াতাড়ি শিল পড়া থেমে যায়।

শিলাবৃষ্টি সহজে থামল না। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বাড়ির ছাদে, বাগানে, পাহাড়ে, ভুট্টার খেতে এবং সারা উপত্যকা জুড়ে শিল পড়তে থাকল। দেখতে দেখতে সমস্ত মাঠ শাদা হয়ে গেল। যেন লবণে ঢেকে আছে। গাছের পাতা আর বরবটির সব ফুল ঝরে পড়ল। লেনচোর মন বিষণনতায় ভরে গেল। ঝড় শেষ হলে সে ছেলেমেয়েদের ডেকে বলল :

‘পঙ্গপাল আইলেও এর থন বেশি ফসল থুইয়া যাইত...হিলের বিষ্টি আমাগো লাগি কিসসু রাইখ্যা গেল না। এই সন আমাগো পেটে ভুট্টা আর বরবটির দানা পড়ার আশা নাই।’

শোকের আঁধারে ডুবে গেল রাত।

‘হগল মেহনত বরবাদ অইল আমাগো।’

‘এ বালার থন রহম করার আমাগো কেও নাই।’

‘এ বছর আমাগো উপাসে মরণ লাগব।’

উপত্যকায় একলা দাঁড়িয়ে থাকা ঐ ঘরের মানুষগুলোর মনে এত কিছুর পরেও একটু আশা ছিল--খোদার মেহেরবানি।

‘হইত্যাশ হইয়ো না’, লেনচো তার পরিবারকে সান্ত¡না দিল। ‘আমাগো কিসমত এবার খুবই মন্দ তয় এই কথা ভুইলো না খোদায় কাউরে না খাওয়াইয়া মারে না। হেরা কয়ত কেউ না খাই মরব না।’

সকাল হবার আগেই লেনচো অনেক কিছু ভেবে ফেললো। রবিবারে গ্রামের গির্জার মাথায় ও বহুবার দেখেছে সেই ত্রিশূল চিহ্ন যার ভেতরে একটা চোখ। ওরা ওকে বলেছে, ওটা খোদার চোখ। উনি সব দেখেন। এমনকি মানুষের মনের গভীর গোপন ইচ্ছেগুলোও।

লেনচো খুব সাধারণ চাষী। যদিও গরুর মতো পরিশ্রম করে সারাদিন মাঠে, তবু লিখতে--পড়তেও একটু শিখেছিল সে।

সেদিন ছিল রবিবার, ছুটির দিন। লেনচো দিনের আলো থাকতে থাকতেই একটা চিঠি লিখতে শুরু করল। ঠিক করল চিঠিখানা সে নিজেই নিয়ে যাবে শহরের পোস্টাপিসে। চিঠিটা খোদাকে লেখা।

‘খোদা’, সে লিখল, ‘এবার যদি তুমি আমাগো দিকে চোখ তুইলা না চাও তইলে আমি আর আমার পরিবার ভুখা থাকমু। আমার ১০০ পেসো না অইলে এবার বাঁচুম না, হেইটা দিয়া বীজ কিনুম আর ফির ফসল আহন তক্ খাবার কিনুম। এইবার হিলের তুফান...।’

খামের ওপর লিখল ‘খোদা’। তারপর চিঠিটা ভরে চিন্তিত মনে শহরের পথে রওনা হলো। পোস্টাপিসে গিয়ে একটা স্ট্যাম্প বসিয়ে চিঠিটা ডাক বাক্সে ফেলে দিল।

সেখানে একজনই চিঠিটা হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে পোস্টমাস্টারকে দেখালো--খোদাকে লেখা চিঠি। মোটাসোটা ভালোমানুষ পোস্টমাস্টারও হাসতে শুরু করলেন, কিন্তু শিগ্গিরই তিনি গম্ভীর হয়ে গেলেন। চিঠিটাকে টেবিলের ওপর রেখে নাড়তে নাড়তে বললেন:

‘আহা কী বিশ্বাস! এ লোকের মতো যদি আমারো এমন বিশ্বাস থাকত! নিজের বিশ্বাসে কী আস্থা! যা সে ফলবে বলে আশা করে তা যেন ফলবেই! খোদার কাছে চিঠি!’

এ চিঠি পাঠানো তো অসম্ভব। বিশ্বাসের এমন নজির মিথ্যে হোক এটাও পোস্টমাস্টার চান না। তিনি ঠিক করলেন নিজেই চিঠির উত্তর দেবেন। খুলে দেখলেন এ চিঠির উত্তর দিতে কাগজ, কালি, কলম আর সদিচ্ছার চেয়ে বেশি কিছু দরকার। তবু তিনি অটল থাকলেন নিজ সিদ্ধান্তে। তিনি কেরানির কাছে কিছু টাকা চাইলেন, নিজের বেতন থেকে কিছু দিলেন। বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে ‘দয়া-দাক্ষিণ্যের’ কথা বলে কিছু আদায় করলেন।

লেনচো একশত পেসো চেয়েছিল। অত জোগাড় করা অবশ্য তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। অর্ধেকের চেয়ে সামান্য বেশি জোগাড় হলো। খামের ওপর লেনচোর নাম লিখে টাকাগুলোর সাথে একটা ছোট্ট চিঠি কেবল ‘খোদা’ লেখা খামের ভেতর ভরে দিলেন।

পরের রোববার লেনচো খুব সকাল সকাল চলে এলো চিঠি আছে কি না খোঁজ করতে। ডাকপিয়ন নিজেই চিঠিটা তার হাতে দিলেন, আর পোস্টমাস্টার ঘরের খোলা দরজা পথে তাকিয়ে দেখছিলেন সুখী সুখী ভাবে--যেন একটা ভালো কাজ করেছেন এমনি তৃপ্তিতে।

লেনচো খামের ভেতর টাকা দেখে একটুও অবাক হলো না। এমনই গভীর তার বিশ্বাস--টাকা গুনে দেখে সে খুব রেগে গেল।... খোদা কখনো এমন ভুল করতে পারে না, লেনচোর যা দরকার তার চেয়ে কম তিনি কখনো পাঠাতে পারেন না।

লেনচো তখুনি পোস্টাপিসে কালি আর কলম চেয়ে নিল। সকলের ব্যবহারের জন্য যে টেবিলটি রাখা ছিল তার ওপরই সে লেখা আরম্ভ করল। যথাসাধ্য চেষ্টায় মনের যাবতীয় রাগ আর অবিশ্বাস প্রকাশ করতে চেষ্টা করল। লেখা শেষ হলে একটা টিকিট কিনল, তারপর জিব দিয়ে ভিজিয়ে, মুঠা করা হাতের একটা ঘুষি দিয়ে খামের ওপর লাগিয়ে দিল।

ডাকবাক্সে ফেলার সাথে সাথেই পোস্টমাস্টার চিঠিটা তুলে নিয়ে খুলে ফেললেন। চিঠির মধ্যে লেখা :

‘খোদা তুমি আমাকে যে টেহা ফাডাইছ আমার হিসাব মতন হেইডা খালি ষাইট পেসো। বাকি টেহাগুলান আমারে তাড়াতাড়ি ফাডাইয়া দিও। আমার খুব দরকার। পোস্টাপিসে ফাডাইয়ো না, পোস্টাপিসের কেরানিগুলান চোরের গুষ্টি। --লেনচো।’


অনুবাদ পরিচিতি

সাকী সেলিমা (১৯৪৬): জন্ম বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণরসায়নের স্নাতক। নিউইয়র্কস্থ আলবার্ট আইনস্টাইন মেডিকেল কলেজে কর্মজীবন শেষে অবসর নিয়েছেন। পারিবারিক সূত্রে ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্যচর্চা করে আসছেন।

1 টি মন্তব্য:

  1. অনুবাদে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারটা ভালো লাগে নি। এর কোন দরকার ছিল না। এতে গল্পের মান বাড়ে নি।

    উত্তরমুছুন