রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

আহমেদ খান হীরক,এর গল্প : বৃক্ষ বৃহন্নলা


ঘর হতে দু’পা ফেলতেই শিমুলের গাছ। শুনলে মানুষ আশ্চর্য হয় যে শিমুল গাছটা আমার প্রিয়। পুরনো গাছ তাই গোড়াটা তার গর্ভবতী মহিলার মতো। গোড়ার একটা অংশ এমনভাবে খাঁজ হয়ে আছে যেন কোনো তরুণী নিতম্ব। আমার প্রিয় অবশ্য সে কারণে না, বা সে কারণেও।

আর গায়ে কাঁটা। বয়স্কার স্তনের বোঁটার মতো লম্বা লম্বা কাঁটা, তীক্ষ্ণ, সুঁচালো। আর চারদিকে দুই হাত বাড়িয়ে দাঁড়ানো কাকতাড়ুয়ার মতোন ডাল। ডালে যখন শিমুল ফুল ধরে তখন মনে হয় এলাকাজুড়ে হোলি খেলা হচ্ছে। লাল লাল লাল। চোখের মণির রঙ তখন কিছুদিন লাল হয়ে থাকে। মণির লাল বুকে গিয়ে জমে। একমাস দুইমাস তিনমাস সেই লাল বুকের ভিতর জমে জমে একটা পাখি হয়ে যায়। পাখি তখন কিচির মিচির করে, ডাকাডাকি করে, উড়ে গিয়ে শিমুল গাছে বসতে চায়। শিমুল গাছে তখন কিন্তু সাদা। ফল তখন ফাটছে, ফেটে উড়ে যাচ্ছে। উড়তে উড়তে দূরে যাচ্ছে। যেতে যেতে ঘুরে যাচ্ছে। জোৎস্নায় পাঁক খাওয়া হাওয়ার মধ্যে শিমুল তুলোর ভ্রমণ আমাকে আছড়ে মারে। শ্বাসরোধ হয়ে আসে, মনে হয় আকাশ খুলে যাচ্ছে, পাতাল উঠে যাচ্ছে, মেঘ এসে হৃদয় ফুঁড়ে ঢুকে যাচ্ছে শরীরের ভেতর।

ফলে শিমুল গাছটা আমার আত্মীয়, প্রেমের কাছাকাছি। প্রেম তবে গোপন প্রেম, পরকীয়ার মতোন গোপন।

আমার একটা জাগতিক প্রেম আছে। একটা নারী। পুরুষও হতে পারতো, তবে হয়নি। প্রেমটা এই শিমুল গাছের কাছাকাছি সুন্দর। উনিশ বিশ। উনিশ নারী, বিশ শিমুল গাছ। নারীর কাছে গেলে খালি শিমুল গাছে কথা মনে আসে— অথচ তার গায়ে কাঁটা নেই। তার স্তন তরুণ, গ্রীবা আলোকিত, ঘ্রাণ মোহনীয়, দৃষ্টি প্রসারিত, ওষ্ঠ গোলাপমথিত। তবু তার কাছে গেলে, তার সাথে দাঁড়ালে বা বসলে বা শুলে— শোওয়ার কিছুটা সময় ছাড়া আমার খালি শিমুল গাছটার কথা মনে হয়। এ কথা সে জানে। কিভাবে কিভাবে জানি জানে। আমি বলিনি, শিমুল গাছটাও বলে নাই, তবু জানে।

একদিন তার বুকের ওপর জাগতে জাগতে তুলোর উড়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম তখন সে, নারীটা, আমাকে বললো প্রথম। বললো যে জানে। বললো নানা কথা বা একটা কথা। তখন আমার খালি শোনার সময় ছিল বলে বলছিলাম না কিছু। সে বললো, নারীটা বললো, তুমার আর কেউ আছে না? আরেকটা কেউ?

আমি সাধারণ পুরুষের মতোই অস্বীকার করলাম সাথে সাথে। বললাম, যদিও বলতে ইচ্ছা করছিল না আসলে, মনে হচ্ছিল হুদা কথা বলে লাভ নাই, এদের বলে তো লাভ নাই, তাও বললাম— যে কিছু কথা নিজের সাথেও বলে নেয়া যায় বা নারীটাকেই বললাম, নাতো, কেউ নাই তো! ‘না তুমার আর কেউ তো আছেই। নাইলে একবার যে মাংস খায় সে বারবার খাইতে চায়— আর তুমি এ মহল্লা মাড়াও না— তুমাকে ডাইকা ডাইকা আনতে হয়... তুমি কোন পিরফকির! এখন কও ওই বেটি কোই থাকে?’

কার কথা বলছে ব্যস্ততায় বুঝতে পারি না। অথবা বুঝতে আমি ঠিকই পারি, কিন্তু নিজেকে বোঝাই যে আমি বুঝতে পারছি না। নারী নারীর মতোই কাতরাতে থাকে, বলতেই থাকে। মনে হয় যে ঘ্যানঘ্যান করছে, স্পষ্ট খারাপ লাগে বিরক্ত লাগে, কিন্তু এ মুহূর্তেই তাকে ছেড়ে দেয়াও যায় না। শরীর ছাড়তে দেয় না। ফলে দাবি ও দ্বন্দ্বের ভেতর আমার শেষ হয়। শেষটা ভালো হয় না ফলে। শেষটা এক ধরনের খারাপ হয়। শেষটা হুদামার্কা হয়। তখন মনেহয় শুরু না হলেই ভালো হতো। হুদাই শুরু হয়েছিল। তখন আবার শিমুল গাছটার কথা মনে হয়। মনে হয় যে শিমুল গাছটার একটা ভাঁজ তরুণীর খাঁজের মতো। মনে হয় নারীটার চেয়ে শিমুল গাছটাতে বেশি কাম আছে। তখন অঙ্ক পাল্টে যায়। গণিত পাল্টে যায়। এএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ঝুলে যায়। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়। ফাঁস হয়ে গেলে আমার সিগারেট কেঁপে যায়, আগুন কেঁপে যায়। নারীটা তখন পেঁচাতে চায়। শরীরের সাথে পেঁচায়, মনের সাথে পেঁচায়। তখন নারীটাকে সাপ মনে হলো। মনে হলো যে আমি টারজান এক। বনের রাজা। নারীটা তখন বললো, বালের রাজা। খালি ফাইট্টা যায়। আমার প্যাট হবে রাজার জন্যি।

আমি বললাম, মানে হুদাই বললাম, এখন মার্কেটে আর রাজা নাই। এগুলান অন্য। নারী বললো, সব কন্ডোমই রাজা। আমার বাপে রাজাই ইউজ করতো। আমি জইন্মা যা চিনছি তার নাম রাজা! আমি বললাম, তাই তুমার পরেও তিনটা... তুমার বাপের খালি ফাইট্টা যাইতো? নারী বললো, বাজে কথা রাখো। তুমার লাইফে আর কে আসছে কউ? সে লাড়কি কই থাকে? কী করে? আমি বললাম, কেউ নাই। কুনো লাড়কি নাই। নারী বললো, লাড়কি নাই তাইলে কি আওরাত? তুমি এখন আওরাত লাগাও? কয় পোলার আওরাত লাগাও?

আমার অঙ্ক আবারো ভুল হয়ে যায়। শিমুল গাছ নব্বই হয়ে যায়। আমি শিমুল গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়াই। বয়স্ক স্তনের বোঁটার মতো কাঁটা। শিমুল গাছের মাথার ওপর দিয়ে মেঘ চলে যায়। সাঁই সাঁই করে চলে যায়। শিমুল গাছের তুলো ওড়ে। স্বপ্নের মতো তুলো ওড়ে। উড়তেই থাকে, উড়তেই থাকে।

শিমুল গাছটার পাশ দিয়ে একটা নদী থাকতে পারতো, থাকলেই ভালো হতো মনে হয়, তবে না থাকলেও তেমন ক্ষতি কিছু তো নাই। নদী নিজেই বানায়ে নেয়া যায়। ছোটতে দলবল নিয়ে বানাতাম, দলবলের সময় শেষ হয়েছে, এখন যা করার করতে হয় একা। প্যান্ট খুললাম, আসলে প্যান্ট খুললাম না; জিপার খুললাম। জিপার একটু কেতাবি হয়ে গেল— আসলে প্যান্টের চেইন খুলে ফেললাম— আসলে শুধু খুললাম, কিন্তু ফেললাম না। কিন্তু খুলে যে ফেললাম তাও ভাবলাম, বা আসলে ভাবলামও না। বেশি ভাবাভাবির ভেতর না থাকাই ভালো।

আরাম করে নদী বানানো শুরু করলাম। নদী বয়ে যেতে থাকলো ধুলো গড়িয়ে বালি গড়িয়ে। নদী বাঁক নিলো, ফের বাঁক নিলো, তারপর ধীরে ধীরে মুখ থুবড়ে মিলায়ে গেল।

নদী মিলিয়ে যায়, নদীরা মিলায়ে যায়। যেভাবে এক নদী ছিল আমার। ছোটবেলাকার নদী। ছোট নদী বাঁকা নদী। নদীটাতে ঢেউ ছিল না, তবে নাম ছিল— বিভিন্ন নাম ছিল— একেক জায়গায় একেক নাম ছিল। পূর্ণভবা ছিল আবার মহানন্দাও ছিল, আরো কিছু নাম ভিন্ন কিছু নাম থাকতে পারে। ছোট নদীতেও বড় বড় নৌকা আসতো। পালতোলা নৌকা আসতো, খয়েরি আর সাদা পাল। ছেঁড়া পাল, মাঝে মাঝে ভালো পালও আসতো— সংখ্যায় কম। পেটটা ফুলিয়ে আসতো, দুলিয়ে আসতো, ঝুলিয়ে আসতো। তারপর রাতভর ভোরভর মাল নামতো, লবণ নামতো, চিনি নামতো, গুরপাটালি নামতো, মাল নামতো, কাপড় নামতো, মাটির হাড়ি নামতো, মাল নামতো... সকাল সকাল মাঝিরা চুলা জ্বালাতো, চুলা নৌকার ওপরই জ্বলতো। নদীর ওপর নৌকা, নৌকার ওপর দিয়ে সরু ধোয়া উড়ে যেতো আকাশে, আকাশে গিয়ে মেঘ হয়ে যেতো।

তখন নিমের দাতন ঘষতে ঘষতে নদী, ঘুরতে ঘুরতে নদী, হুদাই হাঁটতে হাঁটতে নদী, বেলা কাটাতে নদী, নদী কাটাতে নদী। নদীতে তখন সকাল, ভাপ ওঠা সকাল, ঝুলে থাকা লম্বা সকাল। আর সকালে আসতো মুয়াজ্জিন মতি। সাদা আলখেল্লার মতি। দেখলেই সালাম নিতো। সালাম নেয়ার জন্যে চোখের ওপর তাকিয়ে থাকতো। চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতো। চোখের ভিতর তাকিয়ে থাকতো।

তারপর লুঙ্গি তুলে নদীর ঢালে, শিয়ালকাঁটার ঝোপে বসে যেতো মুততে। তখন মুততেই বলা হতো, নাইলে পেশতাব বলা হতো। হাইস্কুলের হেডসার একদিন বললো, বললো মানে জানালো যে পেশতাব বলা যাবে না মুততে বলা যাবে না। এগুলান বললে মান থাকে না। শুনতে খ্যাত লাগে। শুনতে চাষাভুষা লাগে, কুলি মজুর লাগে। চামার চামার লাগে। আমরা তখন থেকে পেশাব বলতে লাগলাম। কারো পেশাব লাগলে ক্লাসে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বলতো, সার আমার পোশ্তাব লাগছে... পোশ্আব লাগছে... নুনু টাইট সার যাইতে দ্যান!

তো মুয়াজ্জিন মতি আজিবভাবে মুততো। জুব্বা গুটিয়ে, লুঙ্গি উঠিয়ে, কালো কালো দুইটা বিচি ঝুলিয়ে, পায়ের গোরা ভাসিয়ে মুততো। তারপর ঘটাতো আরো আজিব ঘটনা। লুঙ্গির ভিতরে আস্ত একটা ঢিল ঢুকিয়ে নিতো, নিয়ে দারুণভাবে নাড়াতে থাকতো লুঙ্গির ভিতরটা, নাড়াতে বোধহয় তার খুব ভালো লাগতো, নাড়াতে নাড়াতে তার মুখ কেমন জানি হয়ে যেতো, চোখ বন্ধ হয়ে যেতো, চোখ কেমন জানি ঘুলঘুলি হয়ে যেতো। তারপর আ আ করে করতে করতে ঢিলটা বের করতো। ঢিলটা পেশতাবে বা অন্য কিছুতে ভিজে থাকতো। ভিজে আরো কালো হয়ে যেতো। সেই কালো রঙের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মতি ঢিলটা ফেলে দিতো। তারপর সে একবার ফেলে দেয়া ঢিলের দিকে একবার আমার দিকে তাকাতো। তার তাকানোটা কেমন যেন ছিল, ওই বয়সে আমি বুঝতাম না, বা বুঝতাম আসলে কিছুটা, সম্পূর্ণ বুঝতাম না, যতোটা বুঝতাম তাও বলতাম না কাউকে। কিছুটা তো বুঝতাম— এ কারণে মুয়াজ্জিন মতি যেখানে আমি তার থেকে একশ হাত পাঁচশ হাত দূরে, তার হাত থেকে দূরে, তার ঘামের গন্ধ থেকে দূরে, মুখের জর্দার গন্ধ থেকে দূরে...

কিন্তু আসমা দূরে যেতে পারেনি। গোবরকুড়ানি আসমা। নয় দশ বছর বয়সের আসমা। হাতে একটা ডালি নিয়ে, হাটবাজার ঘুরে ঘুরে, সে গোবর কুড়াতো। গোবরের ডালি উপচে গেলে নিমতলায় গিয়ে জমা দিয়ে আসতো। এক ডালি গোবরের দাম ছিল দুই টাকা। আসমা সারা সারা দিন দশ পনের টাকা কামাই করে নিতো, তাই সে ইশকুল যেতো না, সে আমবাগান ঘুরে বেড়াতো, টমাটোর খেতের পাশে তাকে দেখা যেতো— গরু থাক আর না থাক দুয়েকটা টমাটো সে ডালিতে নিয়ে নিতে পারতো। নদী ডোবা ঘুরে বেড়াতো। শাপলা তুলতো খুব। হাটবারের এক সকালে নদী আসছিল আসমা। মুয়াজ্জিন মতি নিয়ম মতোই আসছিল, পেশাব করছিল, তার ভিতরেই আসমা আসছিল, তার ভিতরেই আসমাকে পেয়েছিল মতি, মুততে মুততে আসমাকে পেয়েছিল মতি।

অল্প বেলা বাড়তেই নৌকার মাঝিরা নৌকা রেখে হাট চলে যেত; নৌকাগুলান মাওরা হয়ে দীর্ঘক্ষণ নদীর তীরে ঝিমাতো, ঘুমাতো, ঘুমাতে ঘুমাতে আড়মোরা ভাঙতো। ফলে ওই ঘুমন্ত ঝিমন্ত দুলন্ত এক নৌকায় আসমার চিৎকার শোনা গেল— আসমার আওয়াজ কানে আসে, আসমার ভয় শোনা যায়। আমি কেনো যেন দৌড়াই, ছোট বলে দৌড়াই, এখন হলে নিশ্চয় দৌড়াতাম না, ভাবতাম যা হচ্ছে হোক— আমার আর কী!

আমি দৌড়াই। আমি যাই। ছোট বলে যাই। দৌড়াই আর যাই। দৌড়ে দৌড়ে যাই। তেরছা করে রাখা কাঠের সিঁড়ি ধুমধাম পেরিয়ে নৌকার ভেতর গিয়ে দেখি, মানে আধা অন্ধকারেই দেখি যে আসমার পায়জামাটা ছেঁড়া, ছিঁড়ে বিয়েবাড়ি সাজানোর পতাকার মতো ঝুলে আছে এদিক ওদিক, ফালি ফালি হয়ে আছে, আর আসমাও ফালি ফালি হয়ে আছে, দুমড়ে আছে, মুচড়ে আছে, বাঁকা হয়ে আছে, এখন ঘুমিয়ে বা মরে আছে— আর মুয়াজ্জিন মতি, লুঙ্গি ছাড়া মতি, একটা বাঁশের মতোন লম্বা হয়ে, পাছা উদাম করে পড়ে আছে আসমার ওপর। আর জীবন্ত ছিল অন্ধকার, মনে হয় অন্ধকারই সবচেয়ে জীবন্ত ছিল, অন্ধকার সবচেয়ে বেশি নড়ছিল, ঘুরছিল; খ্যাঁ খ্যাঁ করে এগিয়ে এসে ধমক দিচ্ছিল।

পরে মুয়াজ্জিন মতি আমাকে ধরেছিল, নানান কথাবার্তার ভেতর দিয়ে জানিয়ে ছিল কাউকে কিছু না জানাতে। যদি আমি জানাই, কাউকে কিছু বলি, বললে আমার অসুবিধা আছে, সমস্যা আছে, আমাকেও লাশ করে দিবে— লাশ করে শিমুল গাছের তলায় আসমার মতোন কবর দিয়ে দিবে— শিয়াল কুত্তায় খাবে। আমি ছোট ছিলাম তাই আমার কিছুটা সাহস ছিল, এখন আর সাহস নাই, তখন বেশ কিছুটা ছিল; মানে সাহসটা থাকা কিন্তু ভালো না, তাও ছিল। ছোটতে যা হয় আর কী! ভূত ভবিষ্যতের চিন্তা নাই— খালি ধানাই ফানাই— খালি ফালফালি— মানে চিন্তা থাকে না তো ও সময়। মনে হয় সব ভেঙে চুরে দিবো, যা কিছু খারাপ মন্দ কালো সব জ্বালিয়ে দিবো, নষ্ট করে দিবো, ভালো করে দিবো... এ রকম মনে হয়, তখন খুব জ্বালা ধরে, মাথা শনশন করে... ছোটতে মানুষের সাহস থাকে, আমারও ছিল, অল্প সাহস ছিল, কিন্তু ছিল। সাহস ছিল তাই আমি আমার বাপ-মাকে জানিয়ে দিই। আমার বাপের ক্ষমতা ছিল। মানে তার যেন ক্ষমতা থাকে এ রকম করেছিল এলাকাবাসী। ক’রে খুব মসিবতে পড়ে গিয়েছিল। আমার বাপ খারাপ চেয়ারম্যান হয়ে গিয়েছিল। আর খারাপ হওয়ার পর সে বারবার পাশ করতে লাগলো। তখন আর আমার বাপ ফেল করতো না। ফেল করতো না বলে বাপ আর ভালো হয়নি। বা এমনও হতে পারে ফেল করলে বাপ আরো খারাপ হতো, বারেবারে পাশ করায় আর বেশি খারাপ হতে পারে নাই।

তো আসমার কথা মতির কথা আমি মাকে বলি। বলি যে মতি আসমাকে করছে, মাকে বলি যে করছে তারপর মেরে ফেলেছে, দাফন দিছে, আমাকে মতি বলেছে যে মেরে ফেলেছে...

তখন মা জানায় আসমা মরে নাই। শিমুল গাছের তলায় তার কোনো কবর হয় নাই, আসমা মেডিকেলে আছে, বেঁচে আছে, সালামত আছে... আমি তখন আবার বলি যে মতি আসমাকে করছে, আসমা মরুক আর না মরুক আসমাকে করছে।

মা কিছু বলে না। মা চুপ থাকে। মনে হয় বলার কিছু থাকে না। তখন ছোট ছিলাম তাই সাহস ছিল কিছুটা। সাহস থাকার কারণে বিপদ ছিল। সাহস থাকলে বিপদ থাকা সম্ভব। বিপদ থাকবেই থাকবে। সাহস আর বিপদ জামা-জামা মানে জোড়া— মানে যমজ... সাহস আর বিপদ দুই ভাই। ভাই বা বোন একই কথা। ভাই বোন একই কথা মানে লিঙ্গ তো নাই। ভাইও যা বোনও তা— পার্থক্য নাই। সাহস থাকলে তাই বিপদ থাকবে। তাই বিপদে পড়লাম।

মুয়াজ্জিন মতি সব রাতেই আমাদের বাড়ি খেতে আসতো। গপাগপ খেতো। খেতে খেতে আঙুলের ফাঁক দিয়ে খাবার বেরিয়ে যেতো, মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেতো, ঠোঁটের কোণায় একলা খাবার ঝুলে থাকতো। তখন দেখতে তাকে দৈত্যের মতো লাগতো। কেহারমানের মতো লাগতো। কিন্তু মতি হা হা ক’রে হাসতো না, খালি গপাগপ গিলতো আর ফসফস আওয়াজ করতো, ঢকঢক পানি খেতো। আঙুলের ফাঁক দিয়ে খাবারের দুয়েকটা দানা বেরিয়ে যেতো। বেরিয়ে এদিকে ওদিকে পড়তো— তখন মতি চট করে খাবারগুলো তুলে নিতো। মুখে দিতো। বলতো ধর্মে একটা দানা নষ্ট করা নিষেধ আছে। দানা নষ্ট করা পাপ। সে খুব ধর্ম ধর্ম বলতো আর গিলতো। ধর্মের কথা বলতো, ধর্মের কত কথা বলতো, বলতো আর গিলতো, বলতে বলতে গিলতে গিলতে তার মুখ থেকে থুতু বেরোতে। থুতুগুলো ছিটে পড়তো তরকারির বাটিতে ডালের বাটিতে।

তো বাপ আর মতি মিলে বারান্দায় খাচ্ছিল। খুব শব্দ হওয়া টেবিল ফ্যানটা ঘরঘর করে ঘুরছিল। মনে হচ্ছিল ফ্যানের পাখাগুলো ফাঁক পেলে খুলে উড়েই যাবে। ঘরঘর করে ফ্যান ঘুরছিল— আমি তখন বাপ আর মতির সামনে দাঁড়াই। ষাট ওয়াটের বাল্বের সামনে গিয়ে দাঁড়াই, তখন আমার ছায়া লম্বা হয়। শরীরের থেকে ছায়া বড় হয়। আমি বাপের চেয়ে বড় হয়ে যাই, মতির চেয়ে বড় হয়ে যাই। তখন আমার আরো সাহস হয়। আমি বাপকে বলি, আব্বা আব্বা আপনে এ লোকের সাথে খায়েন না। এই লোকটারে তাড়ায়ে দেন। দূর করে দেন। বাড়ি থেকে বাহির করে দেন। দূর করে দেন। এই লোক বদ লোক। এই লোক মুছলমান না— এই লোক কাফির— জেনা করছে এই লোক— এই লোক আসমারে করছে— জেনা করছে— কইরা আসমারে মাইরা ফেলছে, মাইরা নদীর ধারের শিমুল তলায় পুতছে— হারমিটা নিজেই বলছে, হারামিটাকে বাহির করে দেন!

মা তখন বলে ওঠে না না আসমা মরে নাই মরে নাই, আসমা মেডিকেলে আছে, সালামত আছে, খোশহালে আছে... আসমা মেডিকেলে খোশহালে আছে!

মুয়াজ্জিন মতি তখন নাউজিবিল্লা বলে থালায় হাত ধোয়। হাত ধুয়ে ঘাড়ের গামছায় হাত মোছে। বাপও তখন খাওয়া শেষ করে, চুপচাপ খাওয়া শেষ করে। কলপাড়ে ধীরে ধীরে হাত পরিষ্কার করে। গরুর চর্বি পরিষ্কার হতে সময় লাগে। লাক্স সাবান সম্পূর্ণ চর্বি ওঠাতে পারে না। বাপে তখন কাপড় কাচা বল সাবান দিয়ে কচলে কচলে হাত ধোয়। মতি ততক্ষণে আঙিনায় দাঁড়ায়। মা তখন তাকে মোড়া এনে দেয়। মতি মোড়ায় বসে। বসে হামদ কি নাত গাইতে শুরু করে। গলা ছেড়ে গাইতে শুরু করে। মতির কণ্ঠ ভালো— শুনতে ভালো লাগে। মতির হামদ কি নাত শুনতে ভালো লাগে, মতির কণ্ঠ সিরার মতো মিষ্টি লাগে।

কলপাড় থেকে এসেই বাপ হঠাৎ চড়াও হয়, চড়াও হয় আমার ওপর। বাপের হাতে গরু পেটানো লাঠি। বাপ পহেলা লাঠিটা আমার পিঠে আর পাছায় ভাঙে। মারতে মারতে বাপ গোঙাতে থাকে। কী কী যেন বলে। যত বড় মুখ না তত বড় কথা এ রকম কথা স্পষ্ট হয়, মানির মান রাখবার পারে না স্পষ্ট হয় তবে আর কিছু স্পষ্ট হয় না। বাপ খালি গোঙায়, বাপ বাংলা খেয়ে তালের রস খেয়ে যেমন গোঙায় তেমন গোঙাতে থাকে। মা কিছুই যেন হচ্ছে না, না কিছুই যেন হচ্ছে না এভাবে, খুব সাধারণভাবে, স্বাভাবিকভাবে, বারান্দায় বাসনকোসন গোছাতে থাকে। আঙিনায় হামদ কি নাত চলতে থাকে।

সে রাতেই বাপ আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। তাড়িয়ে দেয় মানে সোজা চলে যেতে বলে, বাইরের রাস্তা দেখিয়ে দেয়, দরজা দেখিয়ে দেয়। হয়তো ভাবছিল আমি যেতে চাইবো না, হাতে পায়ে ধরবো, কিন্তু তেমন কিছু হয় না। আমার একবার মনেও হয় হাতে-পায়ে ধরি, কিন্তু ধরতে পারি না। মনে জেদ হয়। সাহস থাকলে জেদও হয়। ছোটবেলায় সাহস জেদ বেশি থাকে। আমি চলে যাই। বাপ তখন মনে করে যে আমি কদিন পর ফিরে আসবো, যে পিঠের ব্যথা ভুলে গেলেই ফিরে আসবো। আমি যখন বেরোই তখন আমিও ভাবছিলাম কদিন পরেই ফিরে যাবো, কিন্তু আর যাওয়া হয় না। অনেক দিন হয়ে যায় আর যাওয়া হয় না। অনেক দিন পর যাওয়ার ইচ্ছাটা মরে যায়। মনে হয় কেনো যাবো বা এসব মনেও হয় না, কিছুই মনে হয় না— তবে আর যাওয়া হয় না।

তারপর একদিন এই শিমুল গাছটা পাই। একটা শিমুল গাছ, তাকে পাই। তখন শিমুল গাছের সাথে থাকতে শুরু করি। শিমুল গাছটাকে ভালোবাসতে শুরু করি। শিমুল গাছটাকে তখন মানুষ মনে হয়, নারী মনে হয়। আমার নারীর চেয়ে বেশি নম্বর পায় শিমুল গাছ। কখনো বিশ পায় কখনো নব্বই পায়, কিন্তু বেশি পায়। আমার নারীর চেয়ে নম্বর বেশি পায়, দিন দিন বেশি পায়।

যখন শিমুল তুলো উড়ে যায়, উড়ে উড়ে দূরে যায় তখন মনে হয় ফেরা যায়— রেখে আসা শৈশবে ফের যাই। যখন মেঘ ওড়ে মনে হয় মতির মুখোমুখি দাঁড়াই, বাপের মুখোমুখি দাঁড়াই, মায়ের মুখোমুখি দাঁড়াই।

কিন্তু আর সাহস নাই। কোনো সাহস অবশিষ্ট নাই। ছোটকালের সাহস নাই, জেদ নাই। সব চামচিকা হয়ে গেছে। চামচিকার মতোন ঝুলে গেছে। নারীটার সামনে একটু সাহস দেখাতে চাই। জোরে কথা বলি, গম্ভীর গলা করি, চোখ গরম করার চেষ্টা করি— কিন্তু হয় না। ঠিকঠাক হয় না। নারীটার ঠোঁটে ঝাঁজ বেশি। ঝাঁজে সাহস হারিয়ে যায়। সাহস গুম হয়ে যায়। সাহস সান্ধিয়ে যায়। সাহম চামচিকা হয়ে যায়।

নারীটা একদিন বলে, দিনে নাকি রাতে বলে? মানে একটা সময়ে বলে, বলে মানে ঝাঁজ তোলে, কণ্ঠে প্রশ্ন তোলে, প্রশ্নে সন্দেহ থাকে, জিজ্ঞাসা করে, ওই শিমুলতলায় তুমি কিসের জন্যি যাও? কুন খানকির কাছে যাও?

আমি কিছু বলি না। মানে বলতে গিয়ে ভাবি যে আসলে কিছু তো বলার নাই। একে কিছু তো বলার নাই। একে কিছু বলা বৃথা। পুরাটাই বৃথা। তখন আমি চুপ থাকি।

তখন নারীটা ফের বলে, একই রকম ঝাঁজ দিয়ে বলে বা ঝাঁজ বাড়িয়ে বলে, চুপ থাকলেই এর ঝাঁজ বাড়ে— এটা আরেক ঝামেলা যে চুপ থাকলেও এর ঝাঁজ বাড়ে, কমে না, ঝাঁজ কমাতে পারে না, নারীটা ঝাঁজ বাড়িয়ে নেয়, মুখ খারাপ করে। বলে, আসমা নামের মাগিটার সাথে তুমি ওখানে দেখা করো না? আসমার সাথে তুমার কী? তারে কয়বার করছো?

আমি তখন নারীটাকে একটা থাপ্পড় মারি। একটা থাপ্পড় তার গালে মারি। জোড়ে মারি। নারীটা উফ করে ওঠে। নারীটা বিছানায় বসে যায়। কিন্তু থাপ্পড় মারার পরও নিজেকে সাহসী মনে হয় না। মনে হয় না কোনো বীরের কাজ করলাম। তখন ভয় হয় খুব। কিসের ভয় বুঝতে পারি না। ফলে ভয় বাড়তে থাকে। ঘাম হতে থাকে। তখন তাকে ঠেলে আমি তার ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। মনে হয় তার সাথে ভালোবাসা চুকে যায়, কাম চুকে যায়, প্রেম চুকে যায়, মন চুকে যায়, শরীর চুকে যায়। নারীটার সাথে সব চুকে যায়।

নারীটার কাছে আর কখনো যাই না। অনেকবার যাওয়ার ইচ্ছা হয় তারপর, হতেই থাকে। নারীটাও আসে। বিভিন্ন কথা বলে, কিন্তু তার কাছে আর কখনো যাই না। খুব যেতে ইচ্ছা করে, কিন্তু যাই না। শিমুল গাছটা যেতে বাধা দেয়। দু’হাত দিয়ে আটকে রাখে। তখন খালি ভয় হয়। মনে হয় সবকিছু চামচিকা হয়ে গেছে। সব কিছু সান্ধিয়ে গেছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন