রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

ইসমৎ চুঘতাই'এর গল্প : মুঠ্‌ঠি মালিশ


অনুবাদ : বিকাশ গণ চৌধুরী

ভোটের বুথে বেশ জটলা, মনে হচ্ছে যেন কোন সিনেমার প্রথম শো হতে চলেছে। একটা লম্বা লাইন অনন্তে গিয়ে মিশেছে। পাঁচ বছর আগে আমরা এরকমই অনন্ত লম্বা লাইন বানিয়ে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম, যেন সস্তার চাল-ডাল কিনবো, ভোট দেব না। যত লম্বা লাইনই হোক না কেন আমাদের মুখগুলো আশায় ঝকঝক করছিল, আমাদের সুযোগ একসময় আসবেই আসবে।আর দেখো আমরা তখন রাশি রাশি টাকার মধ্যে কোদাল চালাচ্ছি। তিনি আমাদের বিশ্বাসের লোক, সৌভাগ্যের চাবিকাঠি আমাদের নিজের লোকের হাতে। আমাদের সকল দুর্দশা এবার উবে যাবে।

“বাঈ, ও বাঈ ! কেমন আছো ?” ময়লা ওড়নায় নোংরা, হলুদ দাঁত ঢাকা একজন মহিলা আমার হাত চেপে ধরল।

“আরে, তুমি, গঙ্গাবাঈ ...”

“না, আমি রত্তিবাঈ, গঙ্গাবাঈ তো আরেকজন, ও মরে গেছে, বেচারা।”

“কি কপাল ! বেচারা মেয়েমানুষ ...” আমার মন পাঁচ বছর পেছনে চলে গেল, আমি জিজ্ঞেস করলাম, “মুঠ্‌ঠি না মালিশ?”

“মালিশ,” চোখ টিপল রত্তিবাঈ।“আমি ওকে পঁইপঁই করে বারণ করেছিলাম, কিন্তু ও এই মুখপুড়ির কথা শুনবে কেন। কাকে ভোট দেবে বাঈ?”

“আর তুমি, তুমি কাকে দেবে ?” আমরা দুজনেই দুজনকে কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই প্রশ্ন করলাম।

“অবশ্যই আমাদের জাতের লোককে, উনি আমাদের এলাকার লোক।”

“পাঁচ বছর আগেওতো তোমরা তোমাদের জাতের লোককে ভোট দিয়েছিলে, দাও নি?”

মুখ ভেটকে ও বলল, “হ্যাঁ, বাঈ, কিন্তু পরে দেখা গেল ও একটা আসল পয়মাল। ব্যাটা আমাদের জন্য কিছুই করেনি।”

“আর এ লোকটা, এও তো তোমাদের জাতভাই।” 

“ না, এ একদম ফাস্টক্লাস। হ্যাঁ গো বাঈ, দেখো, এ আমাদের জোতজমি দেবে।”

“আর তারপর তোমরা গাঁয়ে ফিরে গিয়ে ধান মাড়াবে।”

“হ্যাঁ বাঈ,” ওর চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠল।


পাঁচ বছর আগে আমি যখন মুন্নি হতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম, সেইদিন রত্তিবাঈ আমাকে বলেছিল যে ও ওর জাতের মানুষকে ভোট দিতে যাচ্ছে। লোকটা চৌপাট্টিতে হাজার হাজার লোকের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিজ্ঞা করেছিল যে যেই মুহূর্তে ও ক্ষমতায় আসবে সেই মুহূর্তেই ও সব কিছু বদলে দেবে। দুধের নদী বইবে, মধুর মতো মিষ্টি হয়ে উঠবে সকলের জীবন। আর আজ, পাঁচবছর পর, রত্তিবাঈয়ের শাড়ি আরও মলিন, ওর চুল আরও রুখুসাদা আর ওর চোখে দ্বিগুণ হতাশা। আবার অন্ধের যষ্ঠির মতো চৌপাট্টির সেইসব প্রতিশ্রুতিতে ভর দিয়ে ও চলেছে ওর ভোট দিতে।


“বাঈ, তুমি ঐ খানকিটার সাথে এত কথা বলো কেন,” আমার বিছানার নিচে বেডপ্যানটা রাখতে রাখতে রত্তিবাঈ ওর সব উপদেশ, পরামর্শের ঝাঁপি খুলে বসল।

“কেন? কী ক্ষতি তাতে ?” আমি যেন কিছু জানি না ভান করে প্রশ্নটা করলাম।

“তোমাকে বলিনি? ও খুব খারাপ মেয়েছেলে, পাক্কা বদমাশ, বেবুশ্যে।”

রত্তিবাঈ আসার আগে ওর সম্বন্ধে গঙ্গাবাঈ ঠিক এইসবই আমাকে বলেছিল: “রত্তিবাঈ একেবারে পয়লা নম্বরের ভবঘুরে।” হাসপাতালের এই দুই গবেট কর্মী যখন তখন এসে একে অপরকে গালমন্দ করতে আগুপিছু ভাবতো না। আমার ওদের সঙ্গে কথা বলতে বেশ ভালই লাগত।

গঙ্গাবাঈ বলেছিল,“ঐ পোদো শঙ্কর, ও আসলে ওর ভাই নয়, ও ওর নাগর, কেন, ও ওর সঙ্গে শোয়।”

রত্তিবাঈয়ের স্বামী শোলাহ্‌পুরের কাছে একটা গ্রামে থাকতো। ওর একটুকরো জমি ছিল আর তাই আঁকড়ে ও পরে ছিল; যা চাষ করতো তার প্রায় সবটাই ধার আর সুদ মেটাতে চলে যেত, নামমাত্র যা কিছু পরে থাকতো তাও কিছুদিনেই শেষ হয়ে যেত। তারপরও রত্তিবাই ধান মাড়াই করে খড় থেকে ধান আলাদা করে ছেলেপুলে নিয়ে বেশ আনন্দে থাকতো। দুই মহিলাই এই স্বপ্নে বিভোর থাকতো যে একদিন তারা তাদের নিজেদের বাসায় ধান মাড়াই করে খুব আনন্দে থাকবে, যেমন কিনা প্যারিসের স্বপ্নে কেউ বিভোর হয়ে থাকে।

“কিন্তু রত্তিবাঈ, তুমি কেন টাকা কামাবার জন্য বম্বে এলে? তোমার বদলে তোমার বর এলে ব্যাপারটা ভালো হত না।”

“আরে বাঈ, ও কেমন করে আসবে? ও তো জমিতে কাজ করে। আমি জমিজিরেত সামলাতে পারবো না।”

“আর তোমার ছেলেপুলেদের কে দেখাশোনা করে?”

“আরে, ওখানে আরেকটা রেন্ডিমাগী আছে,” যত বাজে কথা বলা যায় ও বলল।

“তোমার বর কি ওকে বিয়ে করে নিয়েছে ?”

“হারামীটার সে সাহস নেই। ওটা ওর রাখেল।”

“ ও যদি তোমার না থাকার সুযোগে তোমার ঘরের গিন্নি হয়ে ওঠে, তখন কী হবে ?”

“তা কী করে হবে? আমি ওকে পেঁদিয়ে ফাঁক করে খড় পুরে দেব না ? একবার আমরা যদি ধারদেনা শোধ করে দিতে পারি, আমি ফিরে চলে যাব।”

এটা জানা গেল যে রত্তিবাঈ নিজেই ওই অসহায় মেয়েমানুষটাকে ওর বর আর ওর ছেলেমেয়ের দেখাশোনার জন্য রেখে এসেছিল। একবার যদি চাষের জমি ওদের হয়ে যায় রত্তিবাঈ একেবারে যথাযথ গৃহিনীর মতো বাড়ী ফিরে যাবে, ধান মাড়াই করবে। আর সেই রক্ষিতার কী হবে? ওহ্‌ , ও আরেকটা লোক খুঁজে নেবে যার বউ টাকা রোজগারের জন্য বম্বে গেছে, যার বাচ্চাদের দেখশোনার জন্য কেউ নেই।

“ওর কি কোন বর নেই?”

“কেন, আলবাৎ আছে।”

“তবে ও কেন তার সাথে থাকে না ?”

“ওর বরের যা একটু জমি ছিল তা তো খেয়ে ফেলেছে, ও ত পরের জমিতে জন খাটে, কিন্তু বছরে আট মাস তো ও ছিঁচকে চুরি আর চুরিচামারি করে কাটায়, কিম্বা বড় শহরে ঘুরে বেড়িয়ে সারাদিন ভিক্ষে করে পেট চালায়।”

“ওর কি ছেলেমেয়ে আছে ?”

“আলবাৎ আছে। চার-চারটে, মানে ছিল চারটে, একটা এই বম্বেতে হারিয়ে যায়। কেউ জানে না তার কী হল। দুটো মেয়ে ভেগে গেছে, আর ছোট ছেলেটা ওর সঙ্গে আছে।”

“তুমি গাঁইয়ে কত টাকা পাঠাও ?”

“পুরো একচল্লিশ।” 

“তোমার কীভাবে চলে ?”

“আমার ভাই আমাকে সাহায্য করে।” সেই ভাই গঙ্গাবাঈ যাকে ওর নাগর বলেছিল।

“তোমার ভাইয়ের নিজের সংসার নেই?”

“আলবাৎ আছে।”

“ওরা কোথায় থাকে ? গ্রামে ?”

“হ্যাঁ, পুণের কাছে একটা জায়গায়। ওর বড় ভাই জমিজিরেত দেখে।”

“তুমি বলছো তোমার বড় ভাই,” আমি ওর পেছনে লাগার জন্য জিজ্ঞেস করলাম।

“আরে বাবা, থামো ! ও কেন আমার বড় ভাই হতে যাবে ? আমি গঙ্গাবাঈয়ের মত না। তুমি কি জানো মাসে এমন চারটে দিনও যায় না যে ও প্যাঁদানি খায় না। বাঈ, তোমার যদি কোন পুরোন ছেঁড়াফাটা কাপড় থাকে তো সেটা ঐ পাজী মেয়েমানুষটাকে দিও না; তার বদলে ওগুলো আমায় দিও। ঠিক আছে ?”

“রত্তিবাঈ।”

“বলো, বাঈ।”

“তোমার ভাই তোমাকে পেটায় ?”

“ওই পেঁচোমাগী গঙ্গাবাঈটা তোমাকে এসব বলেছে। না, বাঈ, না খুব একটা প্যাঁদায় না; এই মাঝেসাঝে, যখন খুব গিলে আসে, তখন। কিন্তু তখন আদরও করে।”

“আদরও করে?”

“কেন করবে না ?”

“কিন্তু রত্তিবাঈ তুমি ওই বজ্জাতটাকে ভাই বলো কেন ?”

ও হাসতে লাগল, “বাঈ, আমরা ওরকমই বলি।”

“কিন্তু রত্তিবাঈ, চল্লিশ টাকা রোজগারের পরেও তুমি বেশ্যাগিরি করো কেন ?”

“আর কীভাবে আমি সামলাবো ? খোলি, যে ইঁদুরের গর্তটাতে আমি থাকি, তার ভাড়া তিন টাকা, তারপর লালাকে দিতে হয় পাঁচ টাকা।”

“লালাকে ? কী জন্য ?”

“সমস্ত চাউলি (ভাড়াটে)-মেয়েদের এটা দিতেই হয়, নয়তো ও আমাদের ঘাড় ধরে বার করে দেবে।”

“ তোমরা এইসব ব্যাবসা চালাও, তাই ?”

“হ্যাঁ, বাঈ, মনে হল ও একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।

“আর তোমার ভাই, ও কী করে ?”

“বাঈ, আমার ওটা বলা উচিত নয়, ড্রাগ বিক্রি একটা নোংরা ধান্ধা। যদি কেউ পুলিশকে ঘুষ না দেয়, তো পুলিশ তার পোদে লেগে বার করে দেবে।”

“তুমি বলছো, বম্বের বাইরে বার করে দেবে ?”

“হ্যাঁ, বাঈ।”

এরমধ্যে একটা নার্স দ্রুত ঢুকে এসে ওকে বকতে লাগল, “এখানে কী এত বাগে বক্‌বক্‌ করছো, যাও, ১০ নম্বরের বেডপ্যান সরাতে হবে।” রত্তিবাঈ তার হলুদ দাঁত বার করে হাসতে হাসতে তক্ষুণি ঘর ছেড়ে চলে গেল।

“আপনার কী হয়েছে, আপনি ওই বাজে মেয়েমানুষগুলোর সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘন্টা বক্‌বক্‌ করেন। আপনার বিশ্রামের প্রয়োজন, নইলে আবার আপনার রক্তপরা শুরু হবে।” নার্স আমার বাচ্চামেয়েকে দোলনা থেকে তুলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।


সন্ধেবেলা গঙ্গাবাঈ ডিউটিতে এল। আগে ঘণ্টা বাজিয়ে বিরক্ত না করেই ও সোজা আমার ঘরে এল।

“বাঈ, বেডপ্যানের জন্য এলাম।”

“ওহ্‌ , না, গঙ্গাবাঈ, বসো।’

“নার্সদিদি চেল্লাতে শুরু করবে। খানকিমাগী। ও তোমাকে কী বলছিল ?”

“নার্সদিদি ? ওহ্‌ , ও আমাকে বিশ্রাম নিতে বলছিল।”

“না, নার্সদিদি না। আমি বলতে চাইছি ওই রত্তিবাঈ।”

ওকে ক্ষেপানোর জন্য বললাম, “এই, পোপট লাল গঙ্গাবাঈকে মেরে লাল সুতো নীল সুতো বার করে ছাড়ে।” 

“কুত্তার বাচ্চা, ভুলে যান। ওর সাহসই হবে না।” গঙ্গাবাঈ আস্তে আস্তে ওর মুঠোগুলো দিয়ে আমার পা টিপতে লাগল।

“বাঈ, তুমি তোমার পুরনো চপ্পলটা আমায় দেবে বলেছিলে।’

“ঠিক আছে রে বাবা, নিয়ে নাও,” কিন্তু বলো তো তোমার বরের কাছ থেকে কোন চিঠি পেয়েছ কিনা ?”

“নিশ্চয়ই,” গঙ্গাবাঈ তক্ষুণি চপ্পলটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, “যদি ওই খানকিনার্সটা এটা দেখে তো এক্ষুণি চিল্লামিল্লি শুরু করে দেবে। মাগী ভীষণ তড়পায়।”

“গঙ্গাবাঈ।”

“হ্যাঁ, বাঈ।”

“তোমার গাঁয়ে কবে ফিরে যাবে ?”

গঙ্গার চক্‌চকে চোখদুটো দূরের মাঠের সবুজে যেন ভেসে গেল। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে ধীরেসুস্থে বলল, “রামজী এবার যদি আমাদের প্রচুর ফসল দেন, তো বাঈ, আমি ফিরে যাব। গতবছর বন্যায় আমাদের সব ধান ভেসে গেছে।” 

“গঙ্গাবাঈ, তোমার বর তোমার বন্ধুদের ব্যাপারে জানে ?”

“কী বলছো তুমি, বাঈ ?” ও মড়ার মত চুপ করে গেল। আমি বুঝতে পারলাম ও খুব অস্বস্তিতে পড়েছে। ও তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ বদলাতে চেষ্টা করল, “বাঈ, তোমার তো পরপর দুটো মেয়ে। শেঠ খুব রেগে যাবে, তাই না ?”

“শেঠ –কে ?” 

“তোমার খসম। উনি আরেকটা বৌ নিয়ে এলে কী হবে ?”

“যদি তেমনটা করেন, আমিও আরেকটা বর খুঁজে নেব।”

“তোমরা এমনটা করতে পারো ? বাঈ, তোমরা উঁচু জাতের লোকজন।” আমার মনে হল ও উঁচু জাতের মানুষজনদের নিয়ে মজা করছে। আমি ওকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলাম কিন্তু ও এই বিশ্বাসে অনড় রইল যে দ্বিতীয়বার কন্যাসন্তান প্রসব করার জন্য আমাকে ছেঁচা হবে। আর যদি আমার শেঠ আমাকে মেরে আমার লাল সুতো নীল সুতো বের না করে তো ও একটা থার্ড-ক্লাস শেঠ।

হাসপাতালে থাকা এক নির্জন ঘেরাটোপের মধ্যে বন্দী থাকার থেকে কম কিছু নয়।বন্ধুবান্ধব আর পরিচিত লোকজনরা বিকেলে দু ঘন্টার জন্য আমাকে দেখতে আসে, বাকি সময় আমি গঙ্গাবাঈ আর রত্তিবাঈয়ের সঙ্গে গল্প করে কাটাই। ওদের জন্য নয়, ওরা না থাকলে আমি কবেই একঘেয়েমিতে মরে যেতাম। একটা ছোট্ট ঘুষেই ওরা ওদের সব খবর বলে দিত, তা সত্যি মিথ্যে যাই হোক না কেন। একদিন রত্তিবাঈকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি তো কারখানায় কাজ করতে, তা ও কাজটা ছাড়লে কেন ?”

“ ওহ্‌ , বাঈ, মিলের কাজ হলো গিয়ে এক গেঁড়াকল।”

“গেঁড়াকল ?”

“হ্যাঁ, বাঈ, খুব খাটনির কাজ, তবুও ওটা আমরা মেনে নি, কিন্তু হারামীগুলো কয়েকমাস পরে তোমাকে লাথি মেরে বার করে দেবে।”

“কেন ?”

“ওরা অন্য বাঈদের নেবে।”

“কেন ওরা এমনটা করে ?”

“কেন ? কারণ কেউ যদি পু্রো ছ মাস কাজ করে তো ফ্যাকট্রি আইনে ঢুকে পরে।”

“এবার বুঝলাম।”

সোজা কথায়, কয়েকমাস পরে পরেই সমস্ত কর্মচারীকেই ওরা বদলে দেয়, যদি কেউ বেশি দিন কাজে থাকে তবে তাকে অসুখের ছুটি, মাতৃত্বের ছুটি, ফ্যাকট্রি আইনে যা যা আছে সব দিতে হয়; তাই অরা কয়েকমাস পর পর কাজের লোক বদলাতে থাকে। এভাবে একজন শ্রমিক বছরে বড়োজোর চার মাসের কাজ পায়। এরমধ্যে মহিলারা গ্রামে ফিরে যায়; যাদের এই যাওয়া আসা করার সামর্থ নেই তারা রাস্তার ধারে পচা বাসি শাকসব্জি বেচতে বসে যায়। গালাগালি আর মারামারিতে ফুটপাথ ভরে যায়। আর যেহেতু তাদের এইসব করার লাইসেন্স নেই, তাদের মোড়ের মাথায় বসে থাকা পুলিশকে মালকড়ি খাওয়াতে হয়। তবুও, যখন কোন অচেনা পুলিশ রোঁদে বেরয়, যা প্রায়ই ঘটে, তখন একটা প্রচন্ড হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কেউ কেউ দ্রুত তাদের মালপত্র নিয়ে পাশের গলিতে হড়কে ঢুকে যায়; কেউ কেউ ধরা পরে কাঁদতে থাকে, কাঁদতে কাঁদতে হাহাকার করতে থাকে। কিন্তু পুলিশ ওদের টেনে হিঁচড়ে থানায় ধরে নিয়ে যায়। যখন ঘটনাটা মিটে যায় তখন ওরা আবার দল বেঁধে ফিরে আসে, আবার ছেঁড়া কাপড় বিছিয়ে তাদের জিনিসপত্র নিয়ে বসে। কিছু চালাক একটা কাঁধ ব্যাগে কয়েকটা লেবু আর কাঁচা ভুট্টা নিয়ে এমনভাবে ঘুরে বেড়ায় যেন ওরা নিজেরাই ক্রেতা, আর যখন কেউ পাশ দিয়ে যায়, তখন গলা নামিয়ে বলে, “এ ভাই, ভুট্টা নেবে, মাত্র এক আনায় একটা।” ওদের কাছ থেকে সবজি কেনার অর্থ কলেরাকে দাওয়াত দেওয়া।

সবচেয়ে হতভাগ্যরা এরপর ভিক্ষে করে, আর যদি সু্যোগ পেলে দ্রুত কিছু রোজগার করে নিতে বিমুখ হয় না; ফিট্‌ফাট হয়ে সেজে, অন্তত ওদের ভাষায়, মুখে পান দিয়ে ওরা রেলওয়ে স্টেশনের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। খরিদ্দাররা আসে, চোখে চোখে কথা হয়, লেনদেন ঠিক হয়ে যায়। খরিদ্দাররা বেশিরভাগই উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা গোয়ালা, কিংবা গ্রামে বৌ রেখে শহরে আসা চালচুলোহীন শ্রমিকের দল, কিংবা সেইসব চিরকুমারের দল যারা নোংরা রাস্তা আর ফুটপাতকেই নিজেদের ঘর বলে জানে।

একদিন সকালে বারান্দায় ওই দুই বাঈয়ের উঁচু গলার ঝগড়া শুরু হল। রত্তিবাঈ গঙ্গাবাঈয়ের খোঁপা খুলে দিল। বদলে, গঙ্গাবাঈ রত্তিবাঈয়ের এয়োতির চিহ্ন, ওর কালো পুঁতিরমঙ্গলসূত্র ছিঁড়ে দিল। বেচারা কুঁকিয়ে কুঁকিয়ে এমন কাঁদতে লাগলো যেন সত্যি সত্যি ও বিধবা হয়ে গেছে, ওকে কিছুতেই কিছু বোঝানো গেল না। অদের ঝগড়ার কারণ ছিল প্রসূতিদের পরিস্কার করে বা ক্ষত পরিস্কার করে ফেলে দেওয়া তুলোর সব টুকরো। কর্পরেশনের নিয়ম মোতাবেক ওগুলো পুড়িয়ে ফেলাই দস্তুর, কিন্তু ঘটনায় প্রকাশ যে এই দুই বাঈ ডাস্টবিন থেকে ওই নোংরা তুলোগুলো বার করে, ধুয়ে, বান্ডিল পাকিয়ে বাড়ি নিয়ে যায়। ওদের মধ্যে ইদানিং মন কষাকষি চলায় গঙ্গাবাঈ কথাটা সুপারভাইজারের কানে তোলে। রত্তিবাঈ এই নিয়ে গঙ্গাবাঈকে শাপশাপান্ত করতে শুরু করলে ব্যাপারটা হাতাহাতিতে গিয়ে দাঁড়ায়। দুজনকেই তাড়িয়ে দেওয়া হবে বললেও ওরা এমন কান্নাকাটি আর অনুনয়-বিনয় করতে থাকে যে সুপারভাইজার ব্যাপারটাকে ধামাচাপা দেয়।

রত্তিবাঈ একটু মোটা আর বয়স্ক। আসলে গঙ্গা চাইছিল তুলোগুলো ওই পাক। নাকের পাটা ফুলিয়ে বেডপ্যান রাখতে এলে আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “ওইসব নোংরা তুলোগুলো দিয়ে তোমরা কী কর, 

রত্তিবাঈ ?”

“ওগুলো ধুয়ে শুকিয়ে নি। এক্কেবারে পরিস্কার।”

“তারপর ?”

“তারপর ওগুলো আমরা তুলোর ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করি।”

“গদীওয়ালারা – যারা বড়লোকদের আসবাবপত্রর জন্য গদী বানায়।”

“ভগবান !” রাগে আমার শরীর রি রি করতে লাগল। আমার মনে পড়ল যখন চটে যাওয়া সোফায় তুলো ভরবার জন্য তুলো বার করা হয়েছিল ওগুলো ছিল একেবারে কালোকুষ্টি। ওহ্‌ না, ওগুলোও কি এরকম ক্ষত পরিস্কার করা পূঁজ-রক্ত মাখা তুলোই ছিল ! আমার মেয়ের বিছানার গদীও এই দিয়ে তৈরি ? ফুলের মতো কোমল আর সুন্দর আমার মেয়ে, আর এই রাশি রাশি জীবানু ! ভগবান তোমায় অভিশাপ দেবেন গঙ্গাবাঈ ! ভগবান তোমায় তুলে নেবেন রত্তিবাঈ !

রত্তিবাঈ ভিতরে ভিতরে গুমরাচ্ছিল যেহেতু ওরা আজকে নিজেদের মধ্যে জুতো পেটাপেটি করতে গিয়েছিল। আর যেহেতু গঙ্গা ওর থেকে বয়সে ছোট, ও নিজেকে বেশি দোষী মনে করছিল। এর ওপর আগুনে ঘি ঢেলেছিল গত সপ্তাহে গঙ্গাবাঈয়ের ওর খরিদ্দার ছিনিয়ে নেওয়া। গঙ্গাবাঈয়ের একের পর এক গর্ভপাত, আর জ্যান্ত বাচ্চাটাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলার সময় , যেটা তখনও ওর মুখে নাড়ী ঠুসে দেবার পরও শ্বাস নিচ্ছিল ! লোকজনের ভীড় জমে গেছিল। রত্তিবাঈ যদি চাইতো তবে ঐদিনই গঙ্গাবাঈয়ের হাড়ি হাটের মাঝে ভেঙে ওকে ধরিয়ে দিতে পারতো, কিন্তু ও এইসব গোপন কথা বুকের মধ্যে চেপে রেখেছে। আর ওই নোংরা মেয়েছেলেটার মুখটা দেখ, যেভাবে ফুটপাতে বসে ও অপুষ্ট কুল আর পেয়ারা বেচছে, দেখে মনে হচ্ছে যেন কিছুই হয় নি।

“বন্ধুত্ব এক জিনিস আর কেউ কোন অন্যায় করলে অরেক ব্যাপার, রত্তিবাঈ, হাসপাতালে যাওয়াই কি ভালো নয় ?”

“কেন যাব আমরা ? আমাদের মধ্যে এমন অনেক বাঈ আছে যারা ডাক্তারদের মতই ভালো। একদম ফার্স্টক্লাস।”

“ ওরা কি তোমাদের পেট খালাস করা র জন্য ওষুধ দেয় ?”

“ আলবাৎ দেয়। তোমরা কী ভাবো ? তারপর আছে মুঠ্‌ঠি কায়দা, কিন্তু মালিশ সবচেয়ে ভালো কাজ দেয়।”

“মুঠ্‌ঠি, মালিশ এগুলো কী ?”

“বাঈ, তুমি এসব বুঝবে না,” লজ্জায় রাঙা হয়ে হাসতে লাগল রত্তিবাঈ। কয়েকদিন ধরেই আমার পাউডার-কৌটোটার দিকে ওর নজর। যখনই ও আমাকে পাউডার মাখায় তখনই ও এক চিমটি পাউডার ওর হাতের তালুতে নিয়ে নিজের গালে ঘসে। আমি ভাবলাম ওর পেত থেকে কথা বার করতে ঐ কৌটটাই যথেষ্ট। যখন আমি ওকে ওটা দিতে চাইলাম, ও ভয় পেয়ে গেল।

“না বাঈ, নার্সদিদি আমাকে মেরেই ফেলবে।’

“না ও কিছু করবে না। আমি ওকে বলে দেব যে ঐ পাউডারের গন্ধ আমার ভালো লাগে না।”

“কেন, গন্ধটাতো ভালো, খুব ভালো। আরে বাঈ, তোমার মাথায় কেরা আছে ।”

নানানভাবে জোরাজুরির পর ও আমাকে “মুঠ্‌ঠি” আর “মালিশ” এর বর্ণনা দিল।

পেট হবার প্রথমদিকে “মালিশ” দারুণ কাজ দেয় – ডাক্তারদের মত, এক্কেবারে ফার্স্টক্লাস। প্রথমে বাঈ মেয়েটাকে মেঝেতে টানটান করে শুইয়ে দেয়, তারপর নিজে ছাদ থেকে ঝোলানো বা কোন ডান্ডার সঙ্গে বাঁধা দড়ি আঁকড়ে ধরে, তারপর বাঈ মেয়েটার পেটের ওপর দাঁড়িয়ে পায়ের চাপ দিয়ে মালিশ করতে থাকে যতক্ষণ না ‘অপারেশন’-টা হয়ে যায়। কিংবা বাঈ মেয়েটাকে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড় করায় আর নিজে চুল আঁচড়ে টাইট করে মাথার ওপরে একটা খোঁপা বানায়; তারপর ওটাকে সরষের তেলে চুবিয়ে মেয়েটার দু পায়ের মাঝখানে ভেড়ার মতো ঢুঁসোতে থাকে। অনেক মেয়েমানুষ যারা বাচ্চা বিয়নোর ব্যথার সঙ্গে অভ্যস্ত তাদের এতে কিছু হয় না। তারপর আসে “মুঠ্‌ঠি”। তার তেলে চুবোনো নোংরা বিবর্ণ হয়ে যাওয়া নখগুলো সমেত বাঈ তার খরখরে হাতটা ঢুকিয়ে সেই ধুক্‌পুক করতে থাকা প্রাণটাকে গর্ভ থেকে টেনে বার করে আনে।

বেশিরভাগ সময়ই প্রথম চোটেই কোন ঝামেলা ছাড়াই অপারেশানটা হয়ে যায়। কিন্তু অপারেশান করনেওয়ালা বাঈ যদি নতুন হয় তখন দেখা যায় যে বাচ্চাটার একটা হাত ভেঙে গেল, কিংবা ঘাড়তা বেরিয়ে ঝুলঝুল করছে, নতুবা মেয়েছেলেটার শরীরের ভেতরের কোন অংশ যা ভিতরেই থাকার কথা সেটা বাইরে বেরিয়ে এল।

“মালিশ”-এখুব একটা বেশি মারা যায় না, তবে এরপর মেয়েরা সাধারণত নানান রোগের শিকার হয়ে পরে। শরীরটা জায়গায় জায়গায় ফুলে যায়। এমন সব ব্যথা বা ক্ষত দেখা দেয় যা আর সারে না, আর যদি তার সময় হয়ে গিয়ে থাকে তো সে আর বাঁচে না।যখন আর কিছু করার থাকে না, তখন “মুঠ্‌ঠি”, খুব সাবধানে করা হয়। যারা বাঁচে তারা হাঁটতে পারে না। কেউ কেউ টেনে টেনে কয়েকবছর হাঁটে, তারপর ছ্যেঁচড়ায়।


ও কেমন তারিয়ে তারিয়ে ভয়ে ভয়ে এসব বর্ণনা করছে দেখে রত্তিবাঈকে আমি ধাক্কা দিই, ও দৌড়ে পালায়। আমি হাসপাতালের বিষণ্ণ নিস্তব্ধতায় ডুবে যাই। হায় ভগবান ! পৃথিবীতে প্রাণ আনার এই কী মর্মান্তিক শাস্তি –একটা ধোঁয়াশার মধ্যে ভেসে যেতে যেতে আমি ভাবতে থাকি।

ভয়ে আমার গলায় যেন ফাঁস আটকে আসে। আমার জন্য রত্তিবাইয়ের আঁকা ছবিটায় আমার কল্পনা রং চড়াতে থাকে আর তারপর ওগুলোর মধ্যে শ্বাস নেয়।দেওয়ালে জানালার পর্দার ছায়া কাঁপছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওটা গঙ্গাবাঈয়ের “মুঠ্‌ঠি”-র চোটে মরে যাওয়া একটা রক্তে ভেজা লাশ হয়ে যাবে। নোংরা নখওয়ালা একটা হাতের মুঠোর মতো একটা ভয়াল লোহার পাত তার দাঁত দিয়ে আমার মস্তিষ্কের গভীরে কামড় বসাচ্ছে। রক্তের সমুদ্রে ছোট্ট ছোট্ট আঙুল, একটা নেতিয়ে পরা গলা – প্রথম লাঞ্ছনার পুরষ্কার। আমার হৃদয় ডুবে যেতে লাগল, আমার মস্তিষ্ক আর কিছু ভাবতে পারছিল না ! আমি আর্তনাদ করে কাউকে ডাকার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরচ্ছিল না। আমি বেল বাজাবার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু আমার হাত সরছিল না। নিঃশব্দ কান্না আমার বুকের ভেতর শ্বাসরোধ করে দিচ্ছিল।

মনে হচ্ছিল যেন হঠাৎ খুন হয়ে যাওয়া কারো আর্তনাদ হাসপাতালের অভেদ্য নীরবতা ভেদ করে চলে যাচ্ছে। আমার ঘর থেকেই ওই আর্তনাদ জেগে উঠছে, কিন্তু আমি তা শুনতে পাচ্ছি না, শুনতে পাচ্ছি না অচেতন আমার মুখ থেকে ঝরে পরা সব শব্দ।

ঘ্যাচ করে আমার শরীরে মরফিনের সিরিঞ্জ ঢোকাতে ঢোকাতে নার্স বলল, “আপনি কোন ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখছিলেন।” আমি তাকে বলার চেষ্টা করলাম, “না, না, সিস্টার, ওই দেখুন হাঁড়িকাঠের ওপর গঙ্গাবাঈয়ের মালিশের কারণে মরে যাওয়া রক্তে মাখামাখি মৃতদেহটা কেমন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। ওর আর্তনাদ আমার বুকে লোহার শলার মতো বিঁধছে। দূরে আস্তাকুঁড় থেকে আসা একট বাচ্চার দুর্বল কান্নার আওয়াজ আমার মাথার ভিতরে হাতুড়ি পেটার মতো পিটছে। মরফিন দিয়ে আমার অনুভূতিকে ভোঁতা করে দেবেন না। রত্তিবাঈকে ভোটের বুথে যেতে হবে। নতুন নির্বাচিত মন্ত্রী ওদের জাতের লোক। এখন ও ওর ধার সুদসহ ফেরৎ দেবে। গঙ্গাবাঈ খুশি খুশি ধান মাড়াবে। আমার মাথা থেকে এই ঘুমের তাকটা তুলে নাও। আমাকে জাগতে দাও। গঙ্গাবাঈয়ের ছেড়ে যাওয়া রক্তের দাগ সাদা চাদরের ওপর বেড়ে চলেছে। আমাকে জাগতে দাও।”

যখন আমার বাঁহাতের একটা আঙ্গুলে টেবিলের ওপারে বসে থাকা কেরানির মতো দেখতে লোকটা নীল কালি দেগে দিচ্ছিল তখন আমি জেগে উঠলাম।

“আমাদের জাতের লোককে ভোটটা দিও, ঠিক আছে,” রত্তিবাঈ আমাকে পরামর্শ দিয়ে গেল।

রত্তিবাঈয়ের জাতের লোকের ব্যালটবাক্স একটা তাগড়াই মুঠির মতো জেগে উঠল আর তার সব ভয়ঙ্কর শক্তি নিয়ে আমার বুকে , মাথায় আছড়ে পড়ল। আমি আমার ভোট বাক্সে ফেলতে পারলাম না।



অনুবাদক পরিচিতি

বিকাশ গণ চৌধুরী




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন