রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

উর্দু কথাসাহিত্যিক ইসমত চুঘতাই'এর সাক্ষাৎকার

[বর্তমান সাক্ষাৎকারটি ১৯৭২ সালে ‘ মেহফিল’ এ প্রকাশিত হয়েছিল। উর্দু সাহিত্যে ইসমত চুঘতাই এর গুরুত্ব কে মনে রেখে সাক্ষাৎকারটিকে কে ইংরাজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন দেবাশিস মজূমদার ।।]



উর্দু ছোটো গল্পের সূচনা পর্বের পথিকৃৎ হিসাবে আপনাকে গণ্য করা হয়,আপনার একদম প্রথম দিককার লেখালিখি নিয়ে সংক্ষেপে বলুন।



আমি নিজে কখনও এই ধরনের মান নির্ধারণের বিষয়ে বিশ্বাস করি না। কোনও বিষয়কে ‘মান’ দিয়ে বিচার করি না। আমি যখন লিখতে শুরু করেছিলাম তখন একটা প্রথা চালু ছিল – হয় রোমান্টিক বিষয় নিয়ে লেখা হত অথবা প্রোগ্রেসিভ কোনও বিষয় নিয়ে লেখা হত। যখন আমি লেখালিখি শুরু করেছিলাম ,লোকেরা ভীষণ আহত হয়েছিল, কারণ আমি খুব খোলাখুলি লিখতাম। প্রথমদিকে লোকেরা মনে করত যে সেগুলি আমার ভাই আজিম বেগ চুঘতাই অন্য নামে লিখছে। সেও খুব আহত হয়েছিল আর বলেছিল,কে আমার নামে আর আমার মত করে লিখছে? আসলে আমাদের ধরন ছিল একই রকম ,কারন আমরা ছিলাম ভাই-বোন।


আপনার প্রথম দিককার ছোটো গল্প গুলির মধ্যে কয়েকটি নিয়ে বলুন যা আপনাকে উর্দু লেখালিখির জগতে স্থায়ী আসন দিয়েছিল?

‘স্থায়ী আসন’ বলতে আপনি কী বলতে চাইছেন? আসলে আপনারা সাহিত্য বলতে যা বলেন আমি সেই জাতীয় লেখা লিখিনি। আমি লিখেছি খুব সহজ ভাষায়। যে রকম আমি কথা বলি। আমি ব্যাকরণসম্মত ভাবে অশুদ্ধ বাক্যই ব্যবহার করতাম।কারণ কথা বলার সময় আমরা প্রচুর অশুদ্ধ বাক্যই ব্যবহার করি। আমি এই ভাবেই লিখে থাকি। আপনারা জানেন যে আমার উর্দু খুবই দুর্বল। কারণ আলিগড়ে সমস্ত বিষয়গুলি আমি ইংরেজিতে পড়েছি। আমি ইতিহাস,ভূগোল,অঙ্ক সমস্তই ইংরেজিতে পড়েছি।উর্দু আমার মাতৃভাষা ছিল না এবং সেই অর্থে এই ভাষায় লেখা আমার কাছে যথেষ্টই অসুবিধার মনে হয়েছিল। সব সময়ই আমি ইংরেজিতে লিখেছি। উর্দু ভাষা নিয়ে চর্চা করার সময় আমি খুব কমই পেয়েছি। উর্দু সেইসময় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আমার নিজের ভাষা থাকায় আমরা একে গুরুত্ব দিই নি। আমার উর্দু ছিল খুবই দুর্বল আর দুর্বলতায় ভরা।কিন্তু আমি যে ভাবেই হোক লিখতে শুরু করেছিলাম। আর আমি লিখেছিলাম খোলামেলা মনোভাব থেকে।



এই ‘খোলামেলা’ মনোভাব নিয়ে আমাদের কিছু বলুন।

এই বিষয়টি এসেছিল আমাদের পরিবার থেকে। আমাদের পরিবারের সবাই ছিল খুব খোলামনের। আমার বাবা, আমার ভাইয়েরা, এমনকী আমরা মেয়েরা কখনও আলাদা আলাদা ভাবে বসিনি।আমার বাবা ছিলেন খুবই প্রগ্রেসিভ আর উদার মানসিকতা সম্পন্ন। তিনি শিক্ষায় বিশবাস করতেন আর আমার ভাইদের সঙ্গে ঘোড়ার পিঠে চড়া থেকে সমস্ত বিষয়ে সমান সুযোগ দিয়েছিলেন।

এই খোলামেলা মনোভাব আপনার ব্যক্তিত্বের যেমন অংশ হয়েছে তেমনই আপনার লেখালিখির মধ্যেও নিজের পথ খুঁজে নিয়েছে। যা থেকে আপনি দ্রুত সুনাম কুড়িয়েছেন?

হ্যাঁ, আসলে দুর্নাম । আমার প্রথম লেখা একটি নাটক ‘সাকি’ পত্রিকার জন্য লেখা হয়েছিল। আমি এটা স্কুলের জন্য লিখেছিলাম।স্কুলের জন্য অথবা সাংস্কৃতিক জমায়েতের জন্য আমি প্রায়ই লিখতাম। এরপর আমি আমার ছোটো গল্প ‘গেলা’ (ইডিয়ট) তারপর আরও দু-তিনটে লিখেছিলাম। এরপর আমি লিখেছিলাম ‘লাহাফ’( দ্য কুইল্ট বা লেপ )। আপনারা জানেন আমি যখন প্রথম ‘লেপ’ লিখেছিলাম ( এটা লেসবিয়ানিজম্ নিয়ে লেখা)তখন এগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনাই হত না। আমরা মেয়েরা এই বিষয়টা নিয়ে সবসময়ই আলোচনা করতাম। কিন্তু আমরা সম্পূর্ণ তথ্যটা জানতাম না। আমি এই নিয়ে কোনও বই বা কোনও সাহিত্য পড়িনি। তাই যখন আমি গল্পটা লিখেছিলাম তখন আমি আমার বয়সী এক ননদকে গল্পটা দেখিয়েছিলাম।সে কয়েকটা চরিত্রকে চিনতে পেরেছিল আর বলেছিল – এটা অমুক,ওটা তমুক ইত্যাদি। তারপর এটা আমার এক বান্ধবীকে পড়িয়েছিলাম। তার বয়স ছিল ১৪।সে আমার লেখা পড়তে খুব ভালোবাসত। কিন্তু সে যখন এই লেখাটা পড়ল তারপর বলল, এটা কী? তুমি যা লিখেছ, আমি এইটা বুঝতে পারছি না। আমি বললাম আমি ব্যাখ্যা করতে পারব না।যখন পরে সে বড় হয়েছিল তখন সে বুঝতে পেরেছিল। যখন আমি লেসবিয়ানিজম্ বিষয়টা নিয়ে লিখেছিলাম তখন আমি ভেবেছিলাম আমি কী বোকা। এটা এমন একটা বিষয় যা মহিলারাই করত। আমি ভাবতাম পুরুষরা শুধু বেশ্যাগমন করত। কারন মেয়েরা তা করতে পারত না বলে তারা এটা করত।সত্যিই সেই সময় আমি খুব বোকা ছিলাম। আমি এটা জানতাম না। কারণ কেউ কখনও এটা আলোচনা করে না। তারা যৌনতার আলোচনা করত কিন্তু এই দৃস্টিকোণ থেকে নয় বা পারভার্সান থেকে নয়। যেই আমি এটা লিখেছিলাম ,এটা প্রায় পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের মত ফেটেছিল। লোকজন বিভিন্ন, বিচ্ছিরি নামে ডাকতে শুরু করেছিল আমাকে। কেউ আমার ঠিকানা জানত না , তারা আমার সম্পাদকদের চিঠি লিখেছিল।



কোন পত্রিকায়?

‘ আদব-ই-লতিফ’ আর ‘সাফি’তে। লাহাফ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল আদাব- ই- লতিফ-এ। লোকজন বলেছিলএটা খুব খুব নোংরা গল্প আর আমি খুব নোংরা মানুষ যে একটা নোংরা পরিবার থেকে এসেছি। তারা আমার সম্বন্ধে প্রচুর নোংরা বিষয়ে বলল। তারপর আমি বিয়ে করেছিলাম। ‘লাহাফ’ গল্পটা বেরিয়েছিল ৪২ সালে। আমি তার দু-মাস পরে বিয়ে করেছিলাম। প্রথম প্রথম যখনএই ধরনের বিষয় নিয়ে চিঠি আসত পত্রিকা দফতর আমাকে একটি মেয়ে মনে করে চিঠি দপ্তরেই নষ্ট করে দিত। পরে যখন আমার বিয়ে হয় তারা বলেছিল যে আমি একজন দায়িতব্বান মানুষ। সুতরাং তারা সব চিঠিগুলো আমায় পাঠিয়েছিল। তারপর বান্ডিল বান্ডিল চিঠি আমি নিয়েছিলাম ,সব নোংরা নোংরা মন্তব্যে ভরা। আমি কিন্তু কখনই ভীত হই নি। আমি আবার কখনও একই ভুল করি নি। আপনারা যদি আমার লেখার দিকে নজর রাখেন দেখবেন যে আমি খোলামেলা শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করেছি।তাই যখন কেই ‘ লাফাহ’ শব্দটা ব্যবহার করে আমি খুবই নার্ভাস হয়ে পড়ি।

কিন্তু গল্পটা উর্দু ছোটো গল্পের জগতে অবশ্যই একটা ‘ ব্রেক থ্রু’

কিছু সমর্থক আমার পক্ষে এসেছিল। তারা বলেছিল যে গল্পটা সব দিক থেকে ঠিক আছে। কিন্তু গল্পটা নিয়ে আমার দুঃখ ছিল, তাই আমি বলেছিলাম যে আমি দুঃখিত।



সেই সময়ে আপনার সমর্থকদের মধ্যে কারা কারা ছিলেন?

প্রথম নাম মাজনুম গোরখপুরী,উনি এটার উপর একটা লেখাও লিখেছিলেন। যদিও সেই লেখাটি আমি দেখে উঠতে পারি নি।তারপর কৃষাণ চন্দর এবং অবশ্যই সাদাত হাসান মান্টো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন