রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর্বান্তর

দেবেশ রায়

এক

একজন সৃষ্টিকর্মীর সারাজীবনের কাজ যখন একটা সমগ্রতায় আমাদের কাছে ধরা পড়ে তখন সেই সমগ্রতাকে আমরা নানা ছোটো-ছোটো ভাগে আবার টুকরো-টুকরো করে নিতে যে-চাই সেতু ঐ সমগ্রতার ধারণাটা আছে বলেই। তা না থাকলে ঐ ছোট-ছোট টুকরোগুলো হয়ে ওঠে ঐ সৃষ্টিকর্মীর সমগ্রতার বিরোধী। আর তার ফলে সেই টুকরোগুলো একটা স্বাতন্ত্র্য পেয়ে যেতে পারে- যেন ঐ টুকরোটা সমগ্রের চাইতে বড়। চিত্রশিল্পীদের কাজে নানা প্রভাব ও ঝোঁক অনেক প্রত্যক্ষ বলেই বড় প্রায় সব শিল্পীকেই আমরা বুঝে নিতে চাই এই রকম নানা পর্বে তার কাজগুলোকে ভাগ করে- করে।
পিকাসোর একেবারে কিশোর বয়সের আঁকা ত্রুটিহীন পোট্রেট দেখে আমাদের মালুম করতে হয় যে, ঐ মহাশিল্পীকে কোন সহজ সিদ্ধি অতিক্রম করে নিজের পরাক্রান্ত রূপায়ণশক্তির যোগ্য আঁকার ধরন আবিষ্কার করতে হয়েছিল। 'নীল পর্ব', 'গোলাপি পর্ব' তাই পিকাসোর ক্ষেত্রে বিকাশের স্তর-পরম্পরা নয়, হয়ে ওঠে নিজের অঙ্কনের কাছে পৌঁছবার জন্যে পেরনো এক-একটি পর্ব। আমাদের নিজেদের যামিনী রায় যে পোট্রেট বা থিয়েটারের সিন-সিনারি আঁকতেন তার ভেতর থেকে তার নিজস্ব অঙ্কনকে খুঁজে পান নি- পোট্রেট বা সিন-সিনারির রঙ আর রেখা সম্পূর্ণ বর্জন করে তিনি তার নিজস্বতায় পৌঁছেছিলেন। কখনো-কখনো এমন তর্ক দেখা যায় যে যামিনী রায় তার পটচিত্রগুলো আঁকতে শুরু করার পরেও কখনো- কখনো পোট্রেট এঁকেছেন। সে-তর্কে যামিনী রায়ের ছবি আঁকার এই পর্বভাগকে কৃত্রিম এক নাটকীয়তায় দেখা হয় গোটা পর্বের এই ক্রম ভুলে গিয়ে যে যখন পোট্রেট আর থিয়েটারের সিন-সিনারি তিনি আঁকছেন তখন পটচিত্র আঁকেনই নি। এখানে পর্বভাগের উদ্দেশ্য যামিনী রায় কী করে 'যামিনী রায়ের ছবি?'-তে পৌঁছলেন সেটাই দেখা । কিন্তু এরই বিপরীত এক পদ্ধতিতে আর এক যুগন্ধর শিল্পী নন্দলাল তাঁর বিকাশের পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। সেখানে বর্জনের এমন নাটকীয়তা বা নিজেকে আবিষ্কারের অবিকল এমন তাড়না নেই। খুব সম্প্রতি সত্যজিৎ চৌধুরী তীর 'নন্দলাল' বইটিতে আমাদের জানিয়েছেন সারা জীবনই নন্দলাল প্রকরণের সঞ্চয় বাড়িয়ে যান কী ভাবে ও তাঁর ক্ষেত্রে কোনো প্রকরণই অবান্তর হয়ে পড়ে না কেন। সেখানে নন্দলালের আত্মবিকাশের পর্বভাগের চিহ্নগুলো নাতিস্পষ্ট, নাতি-উচ্চারিত। রামকিঙ্করের ছবিতে কোনো ভাস্কর্য গুণ নেই-- সে-ছবি এতই বেশি ছবি, সে-ছবিতে রেখার ভারতীয়তার চাইতে রঙের তীব্র প্রক্ষেপ অনেক বেশি স্পষ্ট। কিন্তু তাঁর ভাস্কর্যে রঙের এই প্রক্ষেপণের সমতুল্য বিমূর্তন প্রথম দিকে ছিল না, বরং তাঁর 'সাঁওতাল পরিবার'--ভাস্কর্যে রেখার ভারতীয় বিন্যাস অনেক বেশি স্পষ্ট, রেখার সে-বিন্যাসে মূর্তির পেশিও ঢাকা পড়ে যায়। তিনি যখন "সুজাতা', 'রবীন্দ্রনাথ' গড়েন তখন মূর্তির অন্য এক বিমূর্তমাত্রা তাঁর আঙুলে এসে গেছে। এমন শিল্পীর ছবির পর্ব ভাগ ও ভাস্কর্যের পর্ব ভাগ একটি মাত্র নীতিতে করাই যাবে না, বা এই দুই ধরনের শিল্পকর্মের জন্যে যদি--যা দুই ভিন্ন পর্বক্রম তৈরি করে নেয়া যায়, চিত্র ও ভাস্কর্য মেলানো তার যে-- সমগ্রতা সেই সমগ্রতা বোঝার পক্ষে তা আর কার্যকর হবে না। 

রবীন্দ্রনাথের পর্ব-পর্বান্তর বেছে নেয়া দিনে-দিনেই জটিলতর হয়ে উঠেছে। এককালে 'মানসী', 'সোনার তরী', 'চিত্রা', 'খেয়া', 'গীতাঞ্জলি', 'বলাকা', 'পুনশ্চ' দিয়ে যদি-বা তাঁর প্রায় সত্তর বছরব্যাপী কাব্যচর্চাকে বেশি সরল করে বুঝে নেয়া যেত, এখন তাঁর কবিতার পর্বভাগের নীতিকে তাঁর গান অবান্তর করে দেয়, তাঁর গদ্যরচনার পর্বচিহ্ন মুছে যায় তাঁর ছবির যুক্তিতে। পঁচিশ-তিরিশ বছরের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সমগ্রতা এমন জঠিল হয়ে উঠেছে বলেই হয়ত আধুনিক রবীন্দ্রচর্চায় রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকারেরও এক বেশ যোগ্য ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের এই ক্রমজটিলতাতে হাঁপিয়ে গিয়ে কখনো কখনো আমাদের মনে হচ্ছে--পর্ববিভাগের এই প্রক্রিয়াটিই অপ্রয়োজনীয় আবার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের অস্থির হয়ে উঠতে হয় এই জটিল সমগ্রতাকে বোঝার তীব্র কৌতুহলে।

পর্বান্তর নির্দেশের চেষ্টা এভাবেই কখনো শিল্পীর জীবনের বাস্তবের ওতপ্রোত হয়ে যায়, কখনো ঘটে শিল্পীর জীবনের বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্নতা, কখনো চিহ্নগুলি থাকে প্রকট, কখনো আমাদেরই কতকগুলো চিহ্ন দেগে দিতে হয়। 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বোঝার জন্যে এই পর্বচিহ্নের জটিলতা যে--সবচেয়ে বেশি ঠেকে তার একটি কারণ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ নেওয়ার মত বাস্তব একটি রাজনৈতিক ঘটনা দিয়ে তাঁর নিজের জীবনের পর্বান্তরকে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন ও আমরা সেই পর্বান্তরচিহ্ন তাঁর সাহিত্যে খুঁজে নিতে চেয়েছি। যদি সেই পর্বান্তর তাঁর গল্প-- উপন্যাসেও নাটকীয়ভাবে উচ্চকিত থাকত-- যেমন তলস্তয় নিজেই তার উপন্যাসগুলোকে চিহ্নিত করেছিলেন তার জীবনের শেষ পর্বে বা যেমন ঘটেছিল যামিনী রায়ের-- তা হলে হয়ত তাঁর জীবনের পর্বান্তরকে সাহিত্যের পর্বান্তরে বুঝে নিতে আমাদের কোনো অসুবিধে হত না। কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কমিউনিস্ট হওয়ার আগেই এমন অনেক গল্প-উপন্যাস লিখেছেন যা তিনি কমিউনিস্ট হওয়ার পর লিখতে পারতেন বা কমিউনিস্ট হওয়ার পরেও তিনি এমন গল্প-উপন্যাস লিখেছেন যা তিনি কমিউনিস্ট হওয়ার আগে লিখতে পারতেন 'অহিংসা' ও 'চতুষ্কোণ'-এর একালের ভুল তারিখের ভিত্তিতে--এই রকম একটা ধারণাও আমাদের বিব্রত করে আসছিল। 

এই ধারণার পেছনে নিশ্চয়ই এ-রকম একটা বিশ্বাস কাজ করে যে কমিউনিস্ট হওয়ার সঙ্গে লেখার বিষয় ও ধরনের একটা প্রয়োজনীয় যোগ আছে; কমিউনিস্ট লেখকের লেখা থেকে বোঝা যায় যে তিনি কমিউনিস্ট; অকমিউনিস্ট লেখকের রচনা পড়ার প্রত্যাশা আর কমিউনিস্ট লেখকের রচনা পাঠের প্রত্যাশার ভেতরও ফারাক আছে । এখানেই এই প্রশ্নটা তৈরি হয়ে যায়-- কমিউনিস্ট লেখকের এই বৈশিষ্ট্যটা কী, তার সম্পর্কে প্রত্যাশার পার্থক্যই-বা কোথায় আর এমন বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্যের কারণই-বা কী? 

কিন্তু এই প্রশ্নের আগেও, বা হয়ত এই প্রশ্নের সঙ্গেই, আরো একটা প্রশ্ন তৈরি হয়ে আছে। কমিউনিস্ট পাটিতে যোগ দেয়াটাই-বা কেন চিহ্নিত হবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের পর্বান্তির হিসেবে? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন কমিউনিস্ট পার্টিতে এসেছিলেন-- তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ও সে-রকম কংগ্রেসের আইন-অমান্য, অসহযোগে যোগ দিয়েছিলেন, তিনি সারা জীবনই কংগ্রেসে ছিলেন। সতীনাথ ভাদুড়ীও আইন-অমান্য ও অসহযোগে যোগ দিয়েছিলেন, পরে তিনি কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টিতে যোগ দেন । তারাশঙ্কর ও সতীনাথের এই রাজনৈতিক বিশ্বাস ও কাজকর্ম তাদের উপন্যাসগুলোর ভেতর এক ধরনের ঐতিহাসিক নিশ্চয়তা এনেছে। বিভূতিভূষণ ও আরো অনেক লেখকই গান্ধীজীর আন্দোলন, ইংরেজ-ভারতবাসীর সম্পর্কে ইত্যাদির কথা বলেছেন কিন্তু সে-কথাগুলো তাঁদের গল্প-উপন্যাসে বড় জোর পরিপ্রেক্ষিতের কাজ করে । 

তারাশঙ্কর ও সতীনাথের গল্প-উপন্যাসের কাহিনী, চরিত্র, চরিত্রগুলোর ভেতরকার সম্পর্ক রাজনৈতিক যুক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, রাজনৈতিক যুক্তিতেই তৈরি। রাজনৈতিক সেই সমগ্রতাবোধের জন্যেই হয়ত তারাশঙ্করের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল 'চৈতালী ঘূর্ণি' থেকে 'হাঁসুলিবাকের উপকথা'য় পৌঁছুনো। দুর্গা মুচিনী 'গণদেবতা'য় অতটা প্রাধান্য পেয়েও প্রধান চরিত্রের একটি হয়ে ওঠে না-- হাঁসুলিবাকের উপকথা'য় তারাশঙ্কর মুচি-কাহাদের একমাত্র চরিত্র করে তোলেন। 'জাগরী' থেকে 'ঢোঁড়াইচরিত মানস'-এ সতীনাথ পৌঁছুতে পেরেছিলেন রাজনীতির জ্ঞান-অভিজ্ঞতা দিয়েই হয়ত। রাজনীতির প্রত্যক্ষতা যার উপন্যাস-প্রয়াসের অন্যতম প্রধান একটি অবলম্বন নয়, তেমন কোনো লেখকও এ-রকম লিখতে পারতেন কিনা এমন সম্ভাব্য পাল্টা ওকালতি প্রশ্নের জবাবে বলে রাখা নিরাপদ আমরা কোনো সাধারণ সূত্রে পৌঁছচ্ছি না, বাংলা উপন্যাসের এই দু-জন লেখকের প্রসঙ্গেই কথাগুলো আপাতত বলা।

কিন্তু তারাশঙ্কর বা সতীনাথ সম্পর্কে আলোচনায় তাদের এই রাজনৈতিক বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার কথা লেখকের তত্ত্ববিশ্বের (ইডিওলজি) যুক্তি হিসেবে আসে না কেন? 'ধাত্রীদেবতা', 'গণদেবতা' ও 'জাগরী'তে রাজনীতি সংক্রান্ত তথ্য প্রাসঙ্গিক, সে-তথ্য বাদ দিয়ে কাহিনী বা চরিত্রগুলোকে বোঝা যাবে না । তাই এই উপন্যাসগুলোর বেলাতেই সেই রাজনীতির কথাটা পাঠককে জেনে নিতে হয়। কিন্তু 'হাঁসুলিবাঁকের উপকথা' বা 'ঢোঁড়াই চরিত মানস'-এর লেখকদের রাজনীতি আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় ঠেকে না। 

ঠেকে না যে তার অন্য ধরনের নজিরও দেয়া যায়। তারাশঙ্কর বা সতীনাথের রাজনীতিবোধ আমাদের কাছে তাদের লেখক পরিচয়ের আবশ্যিক উপকরণ নয় বলেই তারাশঙ্করের 'আগুন', 'পঞ্চ পুত্তলী', 'আরোগ্যনিকেতন', 'বিচারক', 'মঞ্জুরী অপেরা', 'সপ্তপদী' পড়ে বা সতীনাথের 'অচিন রাগিণী' পড়ে এই রচনাগুলো ও তাদের রাজনীতির সঙ্গতির প্রশ্নটি কখনো পাঠনের মনে ওঠে না। এমন-কি তারাশঙ্কর কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন যে সময়, তখনকার রচনা 'মন্বন্তর'-এর প্রসঙ্গেও রাজনীতির কথাটা অবান্তর থেকে যায়। কিন্তু সেখানেও তো এমন প্রশ্ন উঠতে পারত, ওঠা উচিতও হয়ত, 'ধাত্রীদেবতা-গণদেবতা'র রাজনীতি ও 'মন্বন্তর'-এর রাজনীতির ভেতর কোথায় বদল ঘটে যাচ্ছিল। 

তাঁদের রাজনীতির কথাটি তারাশঙ্কর ও সতীনাথের আলোচনায় এখনো প্রাসঙ্গিক হয়ে না ওঠায় এই দুই প্রধান ঔপন্যাসিকের রচনাগুলোতে স্থানাঙ্ক ও উপাঙ্ক সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা তৈরি হতে পারছে না । ব্রিটিশ সাম্রাজ্যশক্তির প্রতিবাদী জাতীয় আস্ফালনের প্রধান ধারণা থেকেই এদের রাজনীতির প্রত্যক্ষতা অর্জিত হয়েছিল-- দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে-রাজনীতি আর প্রতিবাদী রাজনীতির অংশ নয়, সাম্রাজ্য-শক্তির সঙ্গে তার বিরোধিতাও আর সক্রিয় নয়। ফলে, হাঁসুলিবাকের উপকথা' (১৯৪৮) বা 'ঢোঁড়াইচরিত মানস' (১৯৪৯) পড়বার জন্যে লেখকের রাজনীতি সম্পর্কে অনাগ্রহী হলেও পাঠক আর তেমন ক্ষতি বোধ করছে না। বরং যে-কংগ্রেস-এর নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনে এই দুই লেখকই সক্রিয় ছিলেন স্বাধীনতা লাভের পর সেই কংগ্রেসই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে; তখন রাজনীতির দ্বান্দ্বিকতা নতুন মাত্রা পেয়েছে, রাষ্ট্রক্ষমতার পক্ষ বদল ঘটে গেছে। জাতীয় আন্দোলনের ভেতর থেকে উৎসারিত দেশের মানুষের সঙ্গে অন্বয়ের যে-মহৎ সংরাগ 'হাঁসুলিবাকের উপকথা' ও 'ঢোঁড়াইচরিত মানস' পর্যন্ত ঔপন্যাসিককে নিয়ে যেতে পারে সে সংরাগ এই বই দুইটি রচনাকালের জাতীয় রাজনীতির সত্য আর ছিল না। 'ঢোঁড়াইচরিত মানস'-এ যখন গাছের লাউয়ের গায়ে গা নহী বাওয়ার আবির্ভাব পাঠক পড়ছে তখন গান্ধীজি মারা গেছেন, গান্ধীজির সারাজীবনের প্রতিশ্রুতি ব্যর্থ হয়ে গেছে, নতুন ভারতরাষ্ট্র গান্ধীবাদ থেকে সরে আসছে ইতিহাসের যুক্তিতেই হয়ত, কিন্তু যে-মূল্যবোধ গান্ধী-আন্দোলন থেকে জাতীয় জীবনে সঞ্চারিত হয়েছিল সেই মূল্যবোধও ধ্বস্ত হয়ে যাচ্ছে অসহায় দেশবাসীর সামনে। গান্ধী আন্দোলনেরই পঁচিশ বছর ধরে যে-দেশ দেশবাসীর আপনি হয়ে উঠেছিল, স্বাধীনতার পরপরই তা অচেনা অপরিচিত হয়ে যায়। সেই সময় 'হাঁসুলিবাকের উপকথা' অনেকখানিই টানে কাহারদের জীবনের অজ্ঞাত রহস্যের কারণে আর 'ঢেঁড়াইচরিত মানস' এক ঐতিহাসিক উপন্যাসের মত দূরবতী ঠেকে। কিন্তু প্রকাশকালে এত অপঠিত, প্রকাশের পর পঁচিশ বছর ধরে প্রায় অপরিচিত ঢোঁড়াই-এ আমাদের আগ্রহ নতুন করে জেগে ওঠে দেশের নানা দিকে হরিজন-গিরিজন-আদিবাসীদের নানা রকম বিক্ষোভ-বিদ্রোহের সত্তরের দশকে । যখন লেখা হয়েছিল, ঢোঁড়াইয়ের রাজনীতি তখন অতীতের রাজনীতি, তখনকার পক্ষে অপ্রাসঙ্গিক । যখন পড়া হল ঢোঁড়াই তখন অতীতের রাজনীতির অপ্রাসঙ্গিকতা থেকে মুক্ত হয়ে ঢোঁড়াইয়ের চৈতন্যবিকাশের আখ্যান হিশেবে আর এক নতুন রাজনীতির আধার। রচনাকালে এ-উপন্যাস দুটির কোনোটিরই কোনো রাজনৈতিক intervention ছিল না। সেজন্যে পাঠকও এ-উপন্যাস দুটিকে বা তার লেখকদের রাজনীতিকে রচনার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক ভাবে নি। পাঠের বহুবাচনতা একটি মহৎ উপন্যাস নিহিত রেখে দিতে পারে যোগ্য সময়ের অপেক্ষায়। তেমন মাহেন্দ্রক্ষণে প্রয়োজনীয় পাঠের নির্ভুল উঠে আসা ক্লাসিকসের সনাতন লক্ষণ । 'ঢোঁড়াইচরিত মানস' তার রাজনীতির অব্যবহিত থেকে মুক্ত হয়েই ক্লাসিক হতে পারল । কিন্তু তার রাজনীতি যতদিন অব্যবহিত থেকেছে ততদিন ঢোঁড়াইয়ের রাজনীতি বা তার লেখকের রাজনীতিতে আমরা আগ্রহ বোধ করি নি। 

তারাশঙ্কর ও সতীনাথ ভাদুড়ীর চাইতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যায় অনেক কম রাজনৈতিক গল্প উপন্যাস লিখেছেন । তাঁর এমন কোনো গল্প-উপন্যাস নেইই যেখানে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন পুরো উপন্যাসের ঘটনাগুলোকে বা চরিত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে। 

কিন্তু তাঁর বেলাতেই রাজনীতিই হয়ে ওঠে কেন পাঠক-সমালোচকের প্রধান বিবেচনা আর কমিউনিস্ট পার্টিতে তাঁর যোগ দেয়ার ঘটনাটাই কেন হয়ে ওঠে তাঁর সাহিত্য জীবনের একটা প্রধান বিভাজিকা?

একটা কারণ--কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়াটা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে একটা সচেতনতার পরিণতিতেই মাত্র ঘটতে পারে, সেটা ধরে নেয়া। সচেতনতার যে-পরিবর্তন একজন লেখককে পরিণত বয়সে কমিউনিস্ট পার্টিতে টেনে নিয়ে যায়, সে পরিবর্তন তাঁর সাহিত্যকে প্রভাবিত করবেই, এটাও মনে করা হয়। 

আরো একটা কারণ হয়ত নিহিত আছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম দিকের রচনার তত্ত্ববিশ্ব সম্পর্কে প্রচলিত এই ধারণায় যে, সে-বিশ্বে ফ্রয়েডিয় চিন্তাভাবনা একটা প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করেছিল। মার্কসতত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত দর্শনের সঙ্গে ফ্রয়েডতত্ত্বের সম্পর্ক--এটাও সেই প্রচলিত ধারণার মধ্যে ছিল। ফলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়াটা একটা নাটকীয় পর্বান্তরের আভাস এনেছিল । 

দ্বিতীয় প্রসঙ্গটিতে আমরা পরে আসব। তার আগে প্রথম প্রসঙ্গটির সূত্রেই একটু আগে উত্থাপিত আমাদের প্রশ্নটিতে ফিরে যাওয়া দরকার-- একজন কমিউনিস্ট লেখকের কাছে কোনো বৈশিষ্ট্য কি প্রত্যাশিত ছিল, তেমন প্রত্যাশার কারণই বা কী? 

কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বিশ্বাস বা সক্রিয়তা দ্বারা নির্ধারিত নয়। মার্কসবাদী দর্শনে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি সম্পূর্ণ আদর্শ-আনুগত্য, শ্রমিকশ্রেণীর ভূমিকায় আস্থা ও নেতৃত্বপ্রধান দৃঢ় শৃঙ্খলাপরায়ণ একটি পার্টির প্রতি ব্যক্তিত্ব-নিরপেক্ষ বাধ্যতা- এগুলো কমিউনিস্ট পাটিতে যোগ দেয়ার আবশ্যিক শর্ত ছিল। একজন লেখক বা শিল্পী নিজের সৃষ্টিশীল সক্রিয়তাকে যখন এতগুলো বাধ্যতার দ্বারা সীমাবদ্ধ করতে চান, তখন তাঁর সৃষ্টিশীলতা আর পুরনো ঘাত-প্রতিঘাতের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না, এটাই ধরে নেয়া হয়। কমিউনিস্ট পার্টিতে চিন্তা বা কর্মের ঘাত-প্রতিঘাতের কোনো জায়গা নেই, অথচ একজন লেখক তেমন সংঘাত ছাড়া লিখতেই পারেন না- এই দ্বন্দ্বের নিরসন কীভাবে ঘটবে তাও একজন কমিউনিস্ট লেখক সম্পর্কে পাঠককে বিশেষভাবে কৌতুহলী করে তোলে। 

এমন কৌতূহল ও প্রত্যাশা দু-দিক থেকে তৈরি হয়েছে। আমাদের শিল্প-সাহিত্য চেতনা লালিত হয়েছিল প্রধানত ইংরেজ নন্দনচিন্তায় । এমন কি ইউরোপীয় নন্দনচিন্তার অইংরেজ জার্মান বা ফরাসি সংস্করণের সঙ্গেও আমাদের কোনো পরিচয় ছিল না। ইংরেজ নন্দনচিন্তায় শিল্পী-সাহিত্যিকের স্বাধীনতাবোধ কোনো সময় প্রায় সমাজনিরপেক্ষও হয়ে যেতে চায়, আবার বাস্তবতার সঙ্গে লেখকের সম্পর্কের এক ধরনের সার্বভৌমতাও সেই নন্দনচিন্তায় স্বীকৃত। সেই মিলটনের 'এ্যারিওপ্যাগিটিকা' থেকে শুরু করে ডিকেন্স-লরেন্স-ভার্জিনিয়া উলফ-জয়েসে বাস্তবতার বিপরীত উপস্থাপন ছিল ইংরেজি সাহিত্যের ঐতিহ্য। রোমান্টিক কবিরাও সেই ঐতিহ্যেরই পোষকতা করেছেন। তাতে শিল্পী-সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত বিদ্রোহের স্বায়ত্তশাসনই সবচেয়ে বেশি মূল্যবান। এই ধারণায় আমাদের নন্দনচিন্তা এত বেশি লালিত যে শিল্পী-সাহিত্যিকের স্বাধীনতাকে আমরা অন্য সব স্বাধীনতার চাইতেও বেশি মূল্যবান মনে করে থাকি। স্বাধীনতার সেই বোধ মনন কর্মের বেলাতেও বিস্তারিত হয়ে থাকে। এই স্বাধীনতার কথা ত প্রধানত সৃষ্টিকর্ম ও মননকর্মীরাই বলে থাকেন--তাই এই স্বাধীনতার মূল্য তুলনীয় অন্য অনেক স্বাধীনতা থেকেও অনেক বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। এই স্বাধীনতা কী করে কমিউনিস্ট পার্টিতে প্রশ্রয় পাবে আর সেই লেখকই বা নিজের সৃষ্টির স্বাধীনতাকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলার সঙ্গে কী করে মেলাবেন-- এই নিয়ে আমাদের একটা সংশয় ছিল । সেই সংশয় থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির একজন লেখক সম্পর্কে কতকগুলো বিশেষ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সে-প্রত্যাশা কোনো-কোনো সময় হয়ত আশঙ্কাই ছিল। অন্যদিকে তখনকার কমিউনিস্ট আন্দোলন স্তালিনীয় নেতৃত্বে সংগঠন ও বিপ্লবচিন্তাকে একটা যান্ত্রিক অনমনীয় আকার দিয়েছিল। সেই যান্ত্রিকতায় কমিউনিস্ট পার্টির দলগত শৃঙ্খলা প্রায় পৌঁত্তলিকতা হয়ে উঠেছিল। পার্টির জন্যেই সব কিছু-- এই বিশ্বাস থেকে ব্যক্তির উদ্যোগকে অনেক কম মূল্য দেয়া হত। অথচ শিল্প-সাহিত্য ত সম্পূর্ণতই এক ব্যক্তি উদ্যোগ । সেখানেও সেই ব্যক্তিলেখক বা শিল্পীকে তার ব্যক্তি ক্ষমতায় পার্টির প্রয়োজনীয় কথাই বলতে হবে- এটাই ছিল প্রত্যাশিত। পার্টির এই প্রত্যাশা পার্টিভুক্ত লেখকদের ভেতর অনিবার্যতই চারিয়ে যেত। সেখানেই কমিউনিস্ট লেখক সম্পর্কে অন্য এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হত । এমন কি বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে পার্টির যা লাইন, গল্প-উপন্যাস-কবিতাতেও সেই লাইনই প্রমাণিত হবে-- এমন প্রত্যাশা শুধু সম্ভবই ছিল তা নয়, বহু-বহু দিন, এমন কি হয়তো এখনো, কমিউনিস্ট লেখকের রচনার প্রাথমিক বিচার হত পার্টির লাইন ধরে। সেই বিচারে কমিউনিস্ট পার্টি যে-প্রত্যক্ষ শ্রেণীসংগ্রামে জড়িত, শিল্প-সাহিত্যেও শ্রেণী-সংগ্রামের সেই প্রত্যক্ষতাই দাবি করা হত। সেই দাবি তৈরি হতে পারত লেখক-শিল্পীদের প্রত্যক্ষণের ভিন্নতর কোনো উপায় বা অবলম্বন অস্বীকার করেই। কমিউনিস্ট পার্টির স্তালিনীয় সেই সংগঠনের পার্টির জ্ঞানতত্ত্ব ও শিল্পসাহিত্যের জ্ঞানতত্ত্ব একাকার হয়ে যেত। প্রায় সব সময়ই শিল্পসাহিত্যেরই মূল্যে। ফলে যে-বিশেষ ধরনের অভিজ্ঞতাকে ভাষা দেয়ার জন্যে একজন লেখক লিখতে চান, কমিউনিস্ট পার্টি অভিজ্ঞতার সেই বিশেষত্বটাকেই অস্বীকার করতে চাইত। সেই কারণেই একজন লেখকের কমিউনিস্ট পার্টিতে সক্রিয় হয়ে ওঠা সাধারণভাবে সেই লেখকের সৃষ্টিশীলতার বিপরীতেই প্রায় সময় স্থাপন করা হত। বুদ্ধদেব বসু এ-রকমই মন্তব্য করেছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য সম্পর্কে। 

কিন্তু আমাদের বাংলা সাহিত্যের প্রাদেশিক সীমার মধ্যেও একটি বিশেষ কালে দেখা গেল যে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে গভীর সম্পর্কই কোনো কোনো কবি ও ঔপন্যাসিককে নতুন সৃষ্টিকর্মে উৎসাহিত করেছে। একই বুদ্ধদেব বসু মন্তব্য করেছিলেন বিষ্ণু দের কমিউনিস্ট পর্বের কবিতাগুলো সম্পর্কে যে বিষ্ণু দের কলমে আন্দোলন, রাজনীতি আর রাজনীতির ভূগোলও কবিতা হয়ে ওঠে। সভাষ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুর উচ্ছ্বসিত আবেগ ত বাংলা আধুনিক কবিতার ইতিহাসেরই বিষয়। চল্লিশের দশকের বাংলা কবিতায় আধুনিকতার ভাষা তৈরি হচ্ছিল প্রধানত কমিউনিস্ট কবিদের কাব্যে ও তাঁদের সহযাত্রীদের রচনায়। গল্প-উপন্যাসেও তারাশঙ্করের দেশজ্ঞাননির্ভর উপন্যাসমালা থেকে যে-ঔপন্যাসিকরা প্রেরণা ও সমর্থন পেয়েছিলেন, তাঁরাও কমিউনিস্ট আন্দোলনেরই শরিক ছিলেন । এই কবি ও ঔপন্যাসিকদের রচনায় তাঁদের বিশ্বাসের সত্য এক স্পষ্টতায় উচ্চারিত হত। সে বিশ্বাসের সত্য অনেক সময় হয়ত অভিজ্ঞতার সত্য ছিল না, আবার অনেক সময় হয়ত ছিলও। কিন্তু শুধু বিশ্বাসের সত্য পরিবহণেও তো সাহিত্য তার শ্রেষ্ঠতা অর্জন করতে পারে । বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কমিউনিস্ট আন্দোলন একদিকে ভাষার আধুনিকতার নতুন উৎস খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে কবিতা ও গল্প-উপন্যাসে বিষয়ের আধুনিকতা ব্যক্তি-নিরপেক্ষ ব্যঞ্জনা পেয়েছে। সেদিক থেকে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়াটা অন্তত ৪০-এর দশকে কোনো প্রবল বিদ্রোহের ব্যাপার ছিল না।



দুই


মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়ার ঘটনাটি তার সাহিত্যের সঙ্গে যে-এমন জড়িয়ে যায় তার এক গভীরতর কারণ নিহিত আছে হয়ত তার গল্প-উপন্যাসের একান্ত নিজস্ব কোনো নির্দিষ্ট ধরনে। আর সেই নির্দিষ্ট ধরনটি যে কী তা নিয়ে পাঠক আর লেখকের মধ্যেও হয়ত ছিল এক অনুচ্চারিত দ্বন্দ্ব। 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠক তাঁর 'পুতুলনাচের ইতিকথা, 'দিবারাত্রির কাব্য', 'পদ্মানদীর মাঝি', 'জননী' উপন্যাস আর 'অতসী মামী', 'প্রাগৈতিহাসিক' ও 'সরীসৃপ'-এ সংকলিত প্রথম দিকে লেখা ছোটগল্পগুলো থেকে এমন একটা ধারণা তৈরি করে নিয়েছিলেন--কথাসাহিত্যিক হিসেবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ব্যক্তির নিয়তিই শেষ পর্যন্ত প্রধান । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সময়কার রচনা সম্পর্কে এ রকম ধারণা যে এখনো প্রচলিত তা বিভিন্ন সমালোচনা নিবন্ধে চোখে পড়ে। এমন ধারণা গড়ে উঠেছিল এই রচনাগুলোর একটা বিশেষ ধরনের পঠনের ফলে। সেই বিশেষ ধরনের পঠনও সম্ভব হয়েছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনীবিবরণের কতকগুলো মৌলিক ও নির্দিষ্ট ঝোঁকের ফলেই ।

মানিকের এই প্রথম দিকের রচনাগুলোতে প্রায় একটা ছক গড়ে উঠতে চায় যেন। একক ব্যক্তি ও ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক ব্যক্তির ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারছে না, তার হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে অনবরত, প্রতিরোধহীন। অথচ প্রতিরোধের একটা আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তির ভেতর কোথাও উজ্জীবিত হতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারে না । কোনো এক অস্পষ্ট নিয়তিবোধ এই কাহিনীগুলো থেকে সংক্রমিত হতে চায় । 

এর পরের স্তরে মানিক সেই অস্পষ্ট নিয়তিবোধকে আর একটু স্পষ্ট চেহারা দেন। সেখানে সেই অস্পষ্ট নিয়তি, ব্যক্তির নিজেরও অজ্ঞাত প্রবৃত্তিতে, একটা স্পষ্ট আধার পায় যেন। এই সময়কার গল্পগুলো নিয়েই ফ্রয়েডিজমের কথা, চেতন-অচেতনের প্রসঙ্গ বারবার ঘুরে-ফিরে আসে। এমন হতেও পারে যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ত ফ্রয়েডইজমের কোনো কোনো তত্ত্বে ব্যক্তিসংক্রান্ত তার জিজ্ঞাসার একটা উত্তর পেতে পারেন বলে মনে করছিলেন । তেমন গল্পও তিনি একাধিক লিখে থাকতে পারেন। আমাদের পাঠকদের কাছে সেই গল্পগুলো একটা অদ্ভুত প্রাধান্য পেয়ে আসছে।

'জলার্ক'-- চতুর্দশ সংকলনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে বিস্তৃত গ্রন্থপঞ্জি সরোজ দত্ত তৈরি করেছেন তা থেকে আরো জানতে পারি ১৩৪৬ পর্যন্ত মানিকের তিনটি গল্পগ্রন্থে--'অতসী মামী', 'প্রাগৈতিহাসিক' ও 'সরীসৃপ'-এই গল্পগুলো সংকলিত হয়েছে 'অতসী মামী', 'নেকী', 'বৃহত্তর-মহত্তর', 'শিপ্রার অপমৃত্যু', 'সর্পিল', 'পোড়াকপালী', 'আগম্ভক', 'মাটির সাকী', 'মহাসঙ্গম', 'আত্মহত্যার অধিকার', 'প্রাগৈতিহাসিক', 'চোর', 'যাত্রা', 'প্রকৃতি', 'ফাঁসি', 'ভূমিকম্প', 'অন্ধ', 'চাকরী', 'মাথার রহস্য', 'মহাজন', 'বন্যা', 'মমতাদি', 'মহাকালের জটার জট', 'গুপ্তধন', 'প্যাক', 'বিষাক্ত প্রেম', 'দিক পরিবর্তন', 'নদীর বিদ্রোহ', 'মহাবীর ও অবলার ইতিহাস', 'দুটি ছোটগল্প', 'সরীসৃপ'। এই সময়ে লেখা আরো কিছু গল্প ১৩৫২-এ প্রকাশিত 'হলুদ নদী সবুজ বন' আছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আধুনিক পাঠক এই বইগুলোতে চেতন-অবচেতনের নকশা বা যৌনতার অপ্রতিরোধ্যতা খুঁজে পাবেন কম গল্পেই। কিন্তু সমষ্টির ভেতর আটকে যাওয়া কোনো ব্যক্তির সমাধানহীন যন্ত্রণা অথবা সমষ্টির অন্তর্গত থেকেই ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার কথা এই সব গল্পে এখন আমরা প্রায়ই পেয়ে যেতে পারি।

আর এর বিপরীতে 'দিবারাত্রির কাব্য' ও 'চতুষ্কোণ'-এ পাঠক ব্যক্তির আবেগ-আকাঙ্ক্ষা-যৌনতার এক বিমূর্তনের বিবরণ দেখে তত্ত্বেরই যেন একটা অর্ধস্পষ্ট ছকে। বাংলা গল্প-উপন্যাসের পাঠকের পক্ষে এ অভিজ্ঞতা ছিল নতুন। এর আগে ইতিহাস বা সমাজের একটা ভিত্তিতে গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে ও তাদের অন্তসম্পর্কের কাহিনী পাঠক পড়েছে। সেই ইতিহাস ও সেই সমাজ বদলেছে, বদলেছে ব্যক্তির কাহিনীও। বাংলা গল্প-উপন্যাস প্রেমেন্দ্র-অচিন্ত্যের 'পাঁক' 'বেদে' হয়ে তারাশঙ্করের 'চৈতালী ঘূর্ণি'--'রাইকামল' ও বিভূতিভূষণের 'পথের পাঁচালী'তে পৌঁছে গেছে। কিন্তু সেই পঠন অভিজ্ঞতায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প-উপন্যাসগুলোকে পাঠক সম্পূর্ণ মিলিয়ে নিতে পারছিল না। ব্যক্তির নিয়তি যে-মানিক অনেক সময় প্রায় ছকে ফেলে দিচ্ছিলেন তাও পাঠকের কাছে ছক বলে ধরা পড়ছিল না। কারণ এমন ছকও তার অচেনা। আবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কাহিনী-বিবরণের গদ্যের মৌলিকতা ও শক্তি থেকে বিষয়ের ছকের ভেতরও সঞ্চারিত হচ্ছিল এমন এক বেগ--যা বাংলা গল্প-উপন্যাসের পাঠকের পরিচিত নয়। বিষয়ের ছক কখনো কখনো ভেঙে যাচ্ছিল। অন্য এক আঘাতেও--মানিক তাঁর কাহিনীকে স্বচ্ছন্দে স্থাপন করছিলেন আমাদের সামাজিক জীবনের বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন শ্রেণীতে। ফলে সংলাপের ধরন বদলে যাচ্ছিল, বদলে যাচ্ছিল চরিত্রদের ভেতরকার সম্পর্কের নানা টানাপোড়েন।

১৩৪৬ থেকে ১৩৫০-৫১ র মধ্যে 'বৌ' ও 'সমুদ্রের স্বাদ' নামে দুটি গল্প সংকলনে বেরয়। তাতে এই গল্পগুলো ছিল 'দোকানীর বৌ', 'কেরানীর বৌ', 'সাহিত্যিকের বৌ', 'বিপত্নীকের বৌ', 'তেজী বৌ', 'কুষ্ঠরোগীর বৌ', 'পূজারীর বৌ', 'রামার বৌ', 'উদারচরিতানামের বৌ', 'প্রৌঢ়ের বৌ' 'সর্ববিদ্যাবিশারদের বৌ', 'অন্ধের বৌ', 'জুয়াড়ির বৌ', 'সমুদ্রের স্বাদ', 'ভিক্ষুক', 'পূজা কমিটি', 'আফিম', 'গুণ্ডা', 'কাজল', 'আততায়ী', 'বিবেক', 'ট্রাজেডির পর', 'মালী', 'সাধু', 'একটি খোয়া'। এই সময় তাঁর উপন্যাস হচ্ছে-- 'সহরতলী', 'ধরা বাঁধা জীবন', 'অহিংসা' । 

বৌ-গল্পক্রমে মানিক এক একটি চরিত্রকে ধরেছেন আর-একটি চরিত্রের সম্পর্কের সূত্রে। সেখানে ব্যক্তিপরিচয়ের অবলোপই সেই বৌদের নিয়তি । এ-নিয়তি প্রবৃত্তি-আশ্রিত নয়। 'সমুদ্রের স্বাদ' গল্পটি এই সময়ের আগে লেখা। অন্য গল্পগুলোতেও ব্যক্তির কাহিনী অনেক বেশি সমষ্টিনির্ভর । সমষ্টি যে লেখককে কী ভাবে ভাবিত করছে তার একটা অন্য রকম সাক্ষ্য পাই গল্পগুলোর নামকরণেও । 'সমুদ্রের স্বাদ'-এর নতুন গল্পগুলোতে নামকরণ লেখকের কোনো মন্তব্য নয়, অনেক জায়গাতেই সমষ্টির দিকে ইঙ্গিত । এমন কি 'অহিংসা'র মত উপন্যাসেও লেখক তার কাহিনীকে মাঝে মাঝেই যে 'লেখকের মন্তব্য' দিয়ে ব্যাখ্যা করেন তাও কি কাহিনীর গতিকে বারবারই ব্যক্তি অতিরেক থেকে ঘুরিয়ে আনার জন্যেই? 'অহিংসা' উপন্যাসটির প্রধান লোকটি তার নিজস্বতায় সমষ্টিকে ছাড়িয়ে উঠতে চায়, তার সম্পর্কগুলিও সমষ্টির রীতিনীতির ভেতর আটকে থাকতে চায় না কিন্তু সে সমষ্টিকে ছাড়িয়ে উঠে যেতে পারে না, সমষ্টির রীতিনীতিকেও সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করতে পারে না। বরং যেন এ উপন্যাসে ব্যক্তির নিয়তি তত নিশ্চিত নয়, আবার সমষ্টির চেহারাও খুব স্পষ্ট নয়। এ দুইয়ের মাঝখানে উপন্যাসে কোথায় একটা ফাঁকা থেকে গেছে।

লেখক বা শিল্পীর পরবর্তী রচনা তাঁর পূর্ববর্তীর রচনার অর্থ পাল্টে দেয়। কিন্তু সেই পরিবর্তিত অর্থ অনেক সময় তাঁর পুরনো পাঠকরা মেনে নিতে চান না। সেই মেনে নিতে না-চাওয়াটা কোনো সচেতন প্রতিক্রিয়া সব সময় নয়। হয়ত, পঠন আর রচনার মধ্যেই আছে এক বিপরীত গতি । লেখকের রচনা পড়ে পাঠকের প্রত্যাশা তৈরি হয়ে ওঠে। সেই প্রত্যাশাকেই তিনি মিটিয়ে নিতে চান লেখকের পরবতী রচনায় । লেখকের কোনো রচনাই তাঁর পূর্ববর্তী রচনার পুনরাবৃত্তি নয়, পাঠকও সে-পুনরাবৃত্তি পড়তে চান না। কিন্তু প্রতিটি রচনার মৌলিকতার মধ্যেও পাঠক একটা যোগসূত্র রচনা করে যেতে পারবেন-- এমন প্রত্যাশাই পাঠকের থাকে। যখনই কোনো লেখক একটু বেশি রকম নাটকীয়তায় তাঁর পূর্ববতী রচনা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেন--তখনই তাঁর পুরনো পাঠকসমাজে একটা আলোড়ন আসে, কিছু পাঠক হয়ত সেই নাটকীয় নতুনত্বের সঙ্গে আপোষ করে নেন, আবার কিছু পাঠক হয়ত নিজেকে সরিয়ে নেন, আবার এই নতুনত্বের জন্যেই লেখক আবার নতুন কিছু পাঠক পেয়ে যেতে পারেন। 

কিন্তু লেখকের পক্ষে তাঁর প্রতিটি রচনাই তার পূর্ববর্তী রচনার পাঠ বদলে দেয়। লেখা হয়ে যাবার পরই কেবল তিনি নিজে আবিষ্কার করতে পারেন তিনি কী লিখেছেন। প্রাথমিক পরিকল্পনার সঙ্গে এই রচনা-উত্তর পঠনের পাঠগত কোনো সম্পর্কও না থাকতে পারে বা কিছু সম্পর্কও হয়ত থাকতে পারে-- অন্তত লেখক কোথা থেকে শুরু করেছিলেন সেটা বোঝার জন্যে। কিন্তু লেখক পড়ে যান ক্রমাগতই এক অলিখিত রচনায়। সেই লেখাটি হয়ে ওঠে তার পরবর্তী রচনা। 

আমাদের পক্ষে তাই উজিয়ে গেলে হয়ত অনুমান করা সম্ভব লেখক তাঁর পূর্ববর্তী রচনার কোন পাঠ থেকে পরবর্তী রচনার দিকে এগিয়েছিলেন। 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কমিউনিস্ট পর্বান্তরে লেখা গল্পগুলো এক সময় 'উত্তরকালের গল্পসংগ্রহ' নামে বেরিয়েছিল--তাঁর মৃত্যুর পরপরই। এই নামকরণের মধ্যেই নিহিত আছে গল্পগুলোকে একটু স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করার প্রবণতা। এমন একটি সংগ্রহে যে-গল্পগুলি রাখা হয়েছিল সেগুলো সবই যে মানিক বাবু কমিউনিস্ট হওয়ার পরে লেখা তা নয়। কিন্তু এই সংগ্রহ থেকে হয়ত আমরা মানিকবাবুর কমিউনিস্ট পর্বান্তরের কাহিনীবিবরণের গতিপথটা বুঝে নিতে পারি। এই গতিপথটা উপন্যাসে সব সময় এত স্পষ্ট নয়-প্রধানত উপন্যাস-কাহিনীর ব্যক্তির কারণেই । 

গল্পগুলোকে পর-পর পড়ে গেলে আমরা দেখতে পাই প্রায় কালানুক্রমিকতা মেনে নিয়েই যেন মানিক বাবু দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ-পরবর্তী কালোবাজার, যুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী বেকারি, যুদ্ধ-পরবর্তী তেভাগা ও শ্রমিক আন্দোলন-এই সমষ্টি জীবনের কাহিনীগুলো লিখে গেছেন। পর-পর পড়ে গেলে এই গল্পগুলোর বিচ্ছিন্ন বিশিষ্টতার চাইতে তাদের অখণ্ড সমষ্টিবোধই আমাদের কাছে বেশি গ্রাহ্য হয়ে ওঠে। আর পাঠক হিসেবে এই গল্পগুলোর সেই অখণ্ড সমষ্টিবোধ গ্রহণ করার প্রক্রিয়াটা যদি আমরা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করি তাহলে সময়, মানুষজন আর ঘটনার কালানুক্রমিকতা আর ব্যক্তিতে প্রায় একটি উপন্যাস পাঠকের মনে সংগঠিত হয়ে উঠতে চায়। কথাসাহিত্যের আধুনিক নানা অভিজ্ঞতায় উপন্যাসের বা ছোটগল্পের গঠন সম্পর্কে প্রাচীন ধারণার নানা বদল ঘটেছে। সেই নতুন ধারণা দিয়ে মানিক বাবুর এই ছোটগল্পগুলোকে যদি আমরা আকারগতভাবে চিহ্নিত করতে চাই তাহলে হয়ত বলব-এগুলো একটাই কাহিনীবিবরণ-ন্যারেটিভ ডিসকোর্স। 

আমাদের এই অনুমানটি স্পষ্টতর করার প্রয়োজনে 'উত্তরকালের গল্পসংগ্রহ'-এর কিছু গল্পকে আমরা প্রধান ঘটনার দিক থেকে তালিকায় সাজাতে পারি। এ গল্পগুলোর বেশির ভাগই ছোট, ঘটনার বিস্তার খুব বেশি নয়, তাই প্রধান ঘটনা কোনটি এটা নির্ণয় খুব একটা অসুবিধেও হয় না।

দুর্ভিক্ষ : আজকাল পরশুর গল্প
দুঃশাসনীয়
নমুনা
গোপাল শাসমল
শত্রুমিত্র
যুদ্ধের পর : প্রাণের গুদাম
ছাঁটাই রহস্য
চক্রান্ত
ধান
দাঙ্গা : খতিয়ান
ছেলেমানুষি 
আন্দোলন : ছেঁড়া
টিচার
একান্নবর্তী 
দীঘি
গারেয়ন
হারানের নাত জামাই
ছোট বকুলপুরের যাত্রী 

এই তালিকাটির মধ্যেই স্বাধীনতা-পরবর্তী দু-একটি গল্প হয়ত ঢুকে গেছে। এর পরের গল্পগুলো নিশ্চিতই স্বাধীনতা-পরবর্তী-সেই গল্পগুলোর কাহিনী বিবরণ আলাদাভাবে দেখার। প্রধানত প্রাক-স্বাধীনতা গল্পের এই ক্রমে দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ-পরবর্তী বেকারি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও দাঙ্গা এবং নানা ধরনের আন্দোলন-- এই কালক্রমটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আর সে কারণেই এই গল্পগুলোর ভেতর আমরা এই এক সময়ের কাহিনীবিবরণের ধারাবাহিকতা পেয়ে যাই । 

কাহিনী বিবরণের এই ধারাবাহিকতা পাওয়া সম্ভবই হত না যদি এই গল্পগুলো ব্যক্তি নিয়েই লেখা হত । কাহিনী বিবরণের এই ধারাবাহিকতা একটা গল্পের সঙ্গে আর একটা গল্পকে যে গ্রথিত করে দিতে পারে তা সম্ভব হয়, কারণ একই সমষ্টিজীবন এই সবগুলো গল্পের স্পর্শগ্রাহ্য ভিত্তি কিংবা নিকট পরিপ্রেক্ষিত। সেই সমষ্টির ভিত্তি কিংবা পরিপ্রেক্ষিত, যাই বলা যাক না কেন, এই গল্পগুলোতে এত প্রধান যে তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিলে কোনো গল্পই আর গল্প থাকে না । অনেক গল্পই হয়ত ঘটনার দিক থেকে ব্যক্তিরই গল্প । কিন্তু তেমন কোনো ব্যক্তিগত ঘটনাও এই গল্পগুলোতে স্বতন্ত্র মর্যাদা পায় না, যা সমষ্টির সঙ্গে গল্পটিকে যুক্ত করে দিচ্ছে না। এই গল্পগুলোর ব্যক্তি সব সময়ই সমষ্টির অংশ বা এই ব্যক্তিদের মাত্র সেটুকুই এই গল্পগুলোতে বলা হচ্ছে। সেখানেই সমষ্টি জীবনের ভিত্তি বা পরিপ্রেক্ষিতের ধারাবাহিকতার যোগসূত্র। সমষ্টি এমনই প্রধান যে কোনো গল্প শুধু পরিপ্রেক্ষিতের বর্ণনাতেই নির্মিত হতে থাকে অনেক সময় । একটা উদাহরণ নেয়া যাক যেখানে পরিপ্রেক্ষিতটা ব্যক্তির জীবনের সত্য হয়ে উঠছে গল্পটা অনেকখানি এগোনোর পর আর তা সত্ত্বেও গল্পটা সমষ্টিতা থেকে চ্যুত হয় না।

... নিঃশব্দে ছায়া বেরিয়ে এসে হনহন করে এগিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাবে জমকালো কতকগুলি গাছের ছায়ার গাঢ় অন্ধকারে, নয়তো কাছাকাছি এসে পড়ে থমকে দাঁড়াবে, চোখের পলক একটা চাপা উলঙ্গিনী বিদ্যুৎ ঝলকের মতো ফিরে যাবে বেড়ার ওপাশে। ডোবাপুকুরে বাসন মাজবে ছায়া, ঘাট থেকে কলসী কাঁখে উঠে আসবে ছায়া। ছায়া কথা কইবে ছায়ার সঙ্গে, দিদি, মাসী, খুড়ী বলে পরস্পরকে ডেকে হাসবে কাঁদবে অভিশাপ দেবে অদেষ্টকে, আর কথা শেষ না করেই ফিরে এদিকে-ওদিকে এ-কুঁড়ে ও-কুঁড়ের পানে চাইবে বিড়বিড় করে বকতে-বকতে। বিদেশীর সামনে পড়ে গেলে চকিতে ঝোপের আড়ালে অ-তরাল খুঁজে নিয়ে ভীত করুণ প্রতিবাদের স্বরে ছায়া বলবে, 'কে, কে গো ওখানে?'
[দুঃশাসনীয়]


এ গল্প কোনো সময়ই এই পরিপ্রেক্ষিতের চাইতে বেশি ঘন হয় না, গল্প শেষ হয় এই পরিপ্রেক্ষিতেরই অপরিবর্তনীয়তার ইঙ্গিতে। সেই ইঙ্গিতটি স্পষ্ট হয় কিছু ব্যক্তিগত ঘটনার উল্লেখে মাত্র। 

এই পরিপ্রেক্ষিতটি গল্পগুলোতে তৈরি হয় কাহিনী বিবরণের সুত্রেই, কাহিনীর সঙ্গে লেখকের মন্তব্য যেখানে মিশে যায় বাক্যগঠনের প্রক্রিয়ায়। জাল-বিয়ের অছিলায় মেয়েকে বিক্রি করে দিতে সম্মত হওয়া ব্রাহ্মণের। 

তালাধরা কানে শঙ্খঘণ্টা সংস্কৃত শব্দের গুঞ্জন শোনে, চুলকানি ভরা ত্বকে স্নান ও তসরের স্পর্শ পায়, পড়া মড়ার স্মৃতিভ্রষ্ট নাকে ফুলচন্দনের গন্ধ লাগে। বন্ধ করা চোখের সামনে এলোমেলো উল্টোপাল্টাভাবে ভেসে আসে ছাতনাতলা, যজ্ঞাগ্নি, দানসামগ্রী, চেলিপরা শৈল, সারি সারি মানুষের সামনে সারি সারি কলাপাতা। 

মনে যেন পড়তে থাকে শৈলের বাপ ।

কচুশাক দিয়ে ফ্যানভাত দুটি খাওয়ার সময় সারি সারি লোকের সম্মুখে সারি সারি কলাপাতা দেওয়ার জন্য আলগা উনানে চাপানো বড় বড় হাঁড়ি ও কড়াইকরা অন্নব্যঞ্জনের গন্ধ ও সান্নিধ্য যেন কেশবের নিঃশ্বাসকে চিরকালের মতো টেনে নিয়ে দ্রুত উপে যায়। কে করে বাপ সেটা অগ্রাহ্য করার পক্ষে তাই আবার হয় যথেষ্ট ।
[নমুনা]

'উত্তরকালের গল্পসংগ্রহ'-এ গল্পের স্বল্প আয়তনে শুধুই সমষ্টির ভেতর নতুন কোনো বোধের সঞ্চার বা পুরনো কোনো বোধের ধ্বংসের মাধ্যম মাত্র হয়ে উঠেছে। সমষ্টির বোধের এই বিপর্যয়ই এই গল্প সংগ্রহের কাহিনী বিবরণের মূল আবিষ্কার। ব্যক্তি তখনই ব্যক্তি হয়ে ওঠে যখন সে সমষ্টির একটা আবরণ পায় । হয় সেই আবরণের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে অথবা সেই আবরণের বিরোধিতায় ব্যক্তি তার চরিত্র অর্জন করে। কিন্তু মানিক বাবুর এই কমিউনিস্ট পর্বের গল্পগুলোতে সমষ্টি-কখনো দেশ, কখনো সমাজ এমন দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে যে ব্যক্তিত্ব আর সেখানে কোনো আকার পায় না। তাই গল্পগুলো এক প্রায় অদ্ভুত পরাবাস্তবের জগতে আমাদের নিয়ে যেতে চায় অতিবাস্তবের একেবারে দলিলি বা খবরের কাগুজি বিবরণের ভেতর দিয়ে । সেখানে গ্রাম থেকে শহরে চলে যাওয়া বাড়ির বৌ ফিরে আসে, আবার ফিরে আসে না, সেখানে না-খেতে পাওয়া মা তার হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে খোঁজে কিন্তু সে মেয়ে এলে চিনতে পারে না, সেখানে 'কাপড় যে দিতে পারে না এমন মরদের পাশে শোবে না বলে' একটি মেয়ে 'পুকুরের জলের নীচে, পাঁকে গিয়ে শুয়ে রইল, বিয়ের অছিলায় চুরি করে আনা বৌকে যখন চাল বেচে লাল হয়ে যাওয়া ব্যাপারী ভোগ করে তখন মেয়ের দালাল হিন্দু বিয়ের মন্ত্রের সংস্কারে খেপে ওঠে আর নতুন টাকার 'মন্ত্রবলে' ঠাণ্ডা হয়ে যায়, সেখানে বৌকে কন্ট্রাক্ট দেয়ার সাহেবের কাছে জমা রেখে নতুন কন্ট্রাক্টর হুকুম তামিল করতে ছোটে। আবার এরই সঙ্গে সঙ্গে গাঁয়ের সকলের জন্যে কাপড় জোগাড় করতে কাপড়ের চোরাচালানদারকে খুন করা হয়, একটি মেয়েকে বাঁচাবার জন্যে দুই বুড়ি বিধবা বাঁটহাতে দাঁড়িয়ে থাকে, মদন তাঁতি গামছা বোনার দাদন নিতে অস্বীকার করে, কংক্রিটের কারখানার মালিক ও ম্যানেজারের গোপন ষড়যন্ত্র মজুর ফাঁস করে দেয়, সরকারি কর্মচারীদের স্ট্রাইক থেকে বাড়ি চলে এসে আবার অস্থির হয়ে সে-কর্মচারী শহরে ফিরে যায়, দেয়ালে কার্টুন আঁকার নতুন বিদ্যায় এক কর্মচারী কারখানায় ছাঁটাই রহস্য ফাঁস করে দেয়। 

এরই ভেতর সমষ্টির আর-এক মাত্রা এই গল্পগুলোর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিল । সেই গল্পগুলোতে সমষ্টির ধ্বংস সমষ্টির ক্ষয়ের চাইতেও প্রধান হয়ে উঠেছে সমষ্টির প্রতিরোধ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই কমিউনিস্ট-পর্বান্তরের পরের গল্পগুলোতে সমষ্টির মৃত্যু, আর সমষ্টির প্রতিরোধ প্রায় পর পর এসেছে। মৃত্যু আর ধ্বংসের গল্পগুলোতে কোনো জায়গায় ডাইড্যাকটিজম নেই। সেখানে বিবরণে অলঙ্কারহীন বাস্তব। লেখকের প্রত্যক্ষ মন্তব্য যদি কোথাও ঢুকে যায়, সেটা ঢোকে কাহিনীর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে, কাহিনী নিয়েই সে-মন্তব্য। ফলে লেখকের বিবরণ, ভিসকোর্স তৈরি হয়, সেই মন্তব্য কাহিনীর ভেতর থেকেই।

শৈলর রসকস শুকিয়ে গিয়েছে। মনে তার দুঃখবেদনা মানে অভিমান কিছুই জাগে না। খিদের বালাইও যেন তার নেই। কালাচাঁদের সঙ্গে যেখানে হোক গিয়ে দুবেলা পেট ভরে খাওয়ার কথা ভাবলে তার শুধু ঘন ঘন রোমাঞ্চ হয়। তার নারীদেহের সহজ ধর্ম রক্তমাংসের আশ্রয় ছেড়ে শিরায় গিয়ে ঠেকেছে। পাঁচড়া চুলকিয়ে সুখ হয় না; রক্ত বের হলে ব্যথা লাগে না । অথচ পেটমোটা ছোট ভাইটার কাঁচা পেয়ারা চিবানো পর্যন্ত তার কাছে রোমাঞ্চকর ঠেকে।
[নমুনা]

কিন্তু প্রতিরোধের গল্পগুলোতে লেখকের বিবরণ প্রায়ই কাহিনী থেকে আলাদা একটা ডাইড্যাকটিজমে শেষ হয় । এমন কি তাঁর বাক্য রচনার বৈশিষ্ট্যে যেখানে কাহিনী বিবরণ, ন্যারোটিভ ডিসকোর্স ও লেখকের বিবরণ একই বাক্যে আসে, সেখানেও লেখকের বিবরণটিকে আলাদা করা যায় ।

আমার দেশের মাটিতে আমি সমান তালে চলতে পারি না যোগীর সাথে । ...যোগী সামলে সুমলে টেনে নিয়ে চলে আমায়। তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি আমার হিসাব নিকাশ বিশ্লেষণের ভুল। যোগী ডাকাত মহাভারতের সেই মুনি নয়।

...ইংরেজের জেল থেকে ছাড়া পেয়ে খুঁজে খুঁজে মন্দ বস্তি থেকে হারানো বৌকে ফিরিয়ে এনে সে আজ শুধু এই কারণে অখুশি হতে নারাজ যে বৌ তার যে--ছেলে বা-মেয়ের মা হবে সে তার জন্মদাতা নয়। সে বাপ হবে তার পরিবারের, ছেলে বা মেয়ে যাই হোক সেটা আজেবাজে খেয়ালে-সেব সব খেয়াল তাদেরই মানায়, তাদেরই ফ্যাসান, যারা ছিনিয়ে খেয়ে বাঁচার প্রবৃত্তিটা পর্যন্ত কেঁচে দিয়ে মারতে পারে লাখে-লাখে মা-বাপ ছেলেমেয়ে-অনর্থক অখুশি হতে রাজি নয় মানুষ।
[ছিনিয়ে খায় নি কেন]
আমরা আমাদের এই নিবন্ধের এই শেষে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর্বান্তরের গল্পগুলির পঠনের কয়েকটি সঙ্কেতে পৌঁছুতে চাই।

১. সমষ্টির প্রতিরোধের গল্পে লেখকের যে বিবরণকে আমরা ডাইড্যাকটিক বলে চিহ্নিত করছি কাহিনীতে তার সংস্থান কিন্তু ঘটছে মানিক বাবুরই নিজস্ব গদ্যরীতিতে। তা ডাইড্যাকটিক হয়ে উঠেছে শুধু এই কারণে যে লেখকের এই বিবরণ বা ডিসকোর্স শুধু কাহিনীর সীমাটুকু মানছে না।

২. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প-উপন্যাসের সেই আদিকাল থেকে লেখকের বিবরণ অত্যন্ত স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট | কাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে লেখকের বিবরণের একটা কখনো বিকল্প কখনো সমান্তরাল প্রবহমানতাই তার গল্প-উপন্যাসের আঁতাতকে বাঁধে। তার পর্বান্তরের গল্পেও লেখকের সেই বিবরণই কাহিনীর ধনুর ছিলাকে টানটান রাখে ।

৩. যে সমষ্টির প্রতিরোধের কাহিনীতে আমরা শেষ পর্যন্ত এই পর্বান্তরে পৌঁছই (তার খুব স্পষ্ট উদাহরণ হয়ত 'শিল্পী', 'ছোট বকুলপুরের যাত্রী', 'হারানের নাতজামাই', 'ছিনিয়ে খায় না কেন', এই গল্পগুলো) সেই সমষ্টির কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাক্‌ পর্বান্তর বিশিষ্ট রচনাগুলোর নির্ভর ছিল। 'পুতুলনাচের ইতিকথা', 'পদ্মানদীর মাঝি'-কখনোই ব্যক্তিজীবনের আধারমাত্র নয়, সেখানে এক-একটি গ্রামের প্রকৃতি ও জনসমষ্টি আর সেই সমষ্টি উপাদানগুলোর বৈচিত্র ঔপন্যাসিকের কাহিনীবিবরণকে গড়ে তোলে। নিজের এই পুরনো লেখাগুলোর ভেতর থেকে সমষ্টি চরিত্রের এই পঠনই হয়ত মানিকবাবুর নিজের কাছে সত্য হয়ে উঠেছিল চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে। নিজের লেখার এই পঠনই হয়ত তাকে সমষ্টির মৃত্যু কাহিনীতে এত তন্ময় করে তুলেছিল। 

আমরা তখন পেয়েছি একটির পর একটি গল্পের ছোট আকারগুলোর মিলিত সন্নিবেশে উপন্যাসের অসংগঠিত বিস্তার। দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, দাঙ্গার সেই মৃত্যু কাহিনীর ধারাবাহিকতা এসে পৌঁছেছে প্রতিরোধের সমগ্রতায় ।

এই কটি সঙ্কেতে পৌঁছে আমরা আমাদের প্রধান জিজ্ঞাসটিকে চিহ্নিত করতে পারি মাত্র--মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়ার পথে ও সদস্য হওয়ার পরে যে-গল্প-উপন্যাসগুলো রচনা করেছিলেন সেগুলো কাহিনী বিবরণের ও লেখকের বিবরণের দিক থেকে তাঁর প্রাক্‌-কমিউনিস্ট পর্বের রচনাগুলো থেকে কি সম্পূর্ণতই বিচ্ছিন্ন ও পৃথক, নাকি, এই দুই পর্বের ভেতর তাঁর কাহিনী বিবরণের ও লেখকের বিবরণের নিজস্বতাই প্রয়োজনীয় সেতুটি নির্মাণ করে রেখেছে।




দেবেশ রায়

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন