রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

আর্হেন্তিনার গল্প : নিরন্তর নরক

আন্দ্রেস নিউম্যান 

অনুবাদ: শামসুজ্জামান হীরা

বাবা যখন হাসপাতালে কাটাচ্ছিলেন, হাসপাতালের আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যারেজেই গাড়ি রাখা আমার কাছে যৌক্তিক বলে মনে হত। ছোট গহ্বরটির প্রবেশমুখের ওপরে আমি গাড়ি থামাতাম এবং আমার শাদা ওপেল গাড়িটাকে ঢাল গড়িয়ে নিচে নামতে দিতাম। বাটনে চাপ দেওয়ার জন্য থামতে হত, তারপর প্রতিরোধক-দণ্ডের নিচ দিয়ে নেমে গিয়ে একটা জায়গা খুঁজতে শুরু করতাম। সবসময়ই কোনও না-কোনও জায়গা পেয়ে যেতাম আমি।

হাসপাতালে যেতে আমি একদম পছন্দ করতাম না, লিফটের বিরাট খোপে আঁটোসাঁটো হয়ে থাকা, অ্যামোনিয়ার গন্ধমাখা, জীবাণুনাশক, অতি পরিচ্ছন্ন, কিন্তু কেমন কৃত্রিম বায়ু সেবন করা — পঞ্চম তলা পর্যন্ত না পৌঁছা অবধি এই অবস্থা। এসব সত্ত্বেও প্রশান্তির এমন ভান করতাম যে আমার কোনও অসুবিধা নেই। অসুস্থ লোকেদের বেডের মাঝখান দিয়ে যাওয়া, যেন কোনও মাইনফিল্ড — আমাকে ছুঁয়ো না, মৃত্যুকে ছুঁতে দিও না আমায় — এবং তারপর, হ্যালো বাবা, কেমন আছো? সবকিছু ঠিকঠাক তো? বিশ্রাম নাও। 

হাসপাতালে যেতে আমি ঘেন্না করতাম, যদিও আমি ভালোবাসতাম গ্যারেজে নামতে এবং ধীরেসুস্থে আমার শাদা ওপেলটাকে নিয়ে ওখানে কৌশলে চালাতে। কালো অ্যাসফাল্টের উদরের ভেতর ডুবে যাওয়াটা আমাকে এক অদ্ভুত ধরনের প্রশান্তি দিত। আমি গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে রাখতাম, এবং সেই ধূসর, লাল, হলুদ গ্যারেজের ভেতরভাগ, দেওয়াল ও থামের সামঞ্জস্যতা, তার নিরাপদ নিয়ম এবং স্বপ্নময় নৈঃশব্দ্য (আমরা কি শব্দের স্বপ্ন দেখি?) নিয়ে আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য জগত বলে মনে হত। 

সৌভাগ্যের ব্যাপার, ক’সপ্তাহের মধ্যে আমার বাবার অবস্থার উন্নতি হতে লাগল। পরিবারের অন্যদের সঙ্গে আমিও দৈনিক পালা করে বাবাকে দেখতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। এটা সবার জন্যই বিশ্রামের সুযোগ এনে দিল। সময় তুলনামূলকভাবে দ্রুত কেটে যাচ্ছিল, লক্ষ করলাম কী খুশিই না হয়েছিলাম আমরা সবাই। যাহোক, আমি অবশ্য এটাও লক্ষ করলাম, হাসপাতালের গ্যারেজ নিয়ে একধরনের স্মৃতিকাতরতা আমার মধ্যে কাজ করছে। কিন্তু এই অনুভূতি যা খোলামেলা প্রকাশ করা সম্ভব নয়, আমার রুটিনের রদবদল করা থেকে আমাকে সরাসরি বিরত রাখল। কিন্তু সেই মুহূর্ত উপস্থিত হল, যখন যে দিনগুলোতে আমি যেতাম না, একধরনের নতুন উদ্বেগের মুখোমুখী হতাম আমি, যা আমার পক্ষে মোকাবেলা করা শক্ত ছিল: অযৌক্তিকতার উদ্বেগ, যখন তুমি বুঝতে পারো যে, অযৌক্তিকতাই বাস্তব। ক্রমশই বেশি ঘন ঘন, আমি আমার ছুটির দিনগুলোতেও হাসপাতালে যেতে লাগলাম। স্বার্থত্যাগের এই সামর্থ্যের জন্য পরিবারের সবাই আমার ভূয়সী প্রশংসা করতে লাগল। আমার বাবা হলেন অতি উল্লসিত। আমি নিজেকে এক গর্তবাসী প্রাণী হিসাবে অনুভব করতে লাগলাম। 

তারা আমার বাবাকে এপ্রিলের এক সকালে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে দিল। বাড়ি ফেরার পর বাবা যখন সেরে উঠতে লাগলেন তাকে যেমন আগের চেয়ে অনেক প্রসন্ন দেখাল, ঠিক তেমনই কমে গেল অন্যদের ওপর থেকে চাপ। বাবাকে এত খোশমেজাজে এবং আরও ভালো হওয়ার আগ্রহ নিয়ে আমাদের ভেতর পেয়ে আমি তো দারুণ খুশি, কিন্তু একই সঙ্গে কিছু একটার খামতি ছিল আমার মধ্যে। কিছুদিনের ব্যর্থ প্রতিরোধের পর আমি মেনে নিলাম যে, আমাকে আবার ফিরে যেতে হবে গ্যারেজের পার্কিং প্লেসে। প্রথমে শহরের কেন্দ্রস্থলের কিছু গ্যারেজে যাওয়ার উদ্যোগ নিলাম। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি আমি বুঝলাম যে, এটা সে রকম নয়; ঢালুপথ, পেঁচাল গলি, সিঁড়ি — একদম অদ্ভুত ঠেকছিল আমার কাছে। হাসপাতালের ধূসর, লাল এবং হলুদ সরু চলাচলের পথ, যেখানে আমি শিখেছিলাম কী করে নিরাপদ বোধ করতে হয়, এবং এমনভাবে তাদেরকে জানতে শুরু করেছিলাম, যেন আমিই তাদের স্থপতি — সেখানে যাওয়ার আকুল আকুতি পেয়ে বসেছিল আমাকে।

যখনই পারতাম, আমি ওখানে গাড়ি রাখতাম। যখন গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতাম, এক সম্মোহিনী আবিষ্টতা সম্মুখের বের হওয়ার পথের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এবং বাইরে বেরিয়ে আসবার এক সৎ প্রচেষ্টা নিতে আমাকে বাধ্য করত। তখন গ্রীষ্মকাল প্রায় আসন্ন। ওপেলের হেলানো সিটে গা এলিয়ে দিয়ে ও চালু করা রেডিও শুনতে শুনতে হাসপাতালের ভূগর্ভস্থ গাড়ি রাখবার জায়গায় আমি আমার সময়ের একটা বড় অংশ কাটাতে শুরু করলাম। জায়গাটা ছিল শীতল। অসুস্থ লোকদের কাছাকাছি আছি, এই বোধটা, আমি যে সুস্থ এটা আমাকে মনে করিয়ে দিত, আর এটাও যে, আমি চাইলেই অনায়াসে যেকোনও সময় এই স্থান ত্যাগ করতে পারি।

আমি আমার আঁধার ঘরের আনন্দ বেশিদিন উপভোগ করতে সক্ষম হলাম না। জুনের ২২ তারিখে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়লাম আমি। আর তখন থেকে আমাকে পর্যবেক্ষণে রাখা শুরু হল। এই দুর্ঘটনার ফলাফল তেমন খারাপ হয়নি। যখন আমাকে মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় আবিষ্কার করা হল, অ্যামবুলেন্সটিকে শুধু ঢাল ধরে নিচে নামতে হয়েছিল, তারপর ওপরে ফিরে যেতে হয়েছিল হাসপাতালে। এখানে থাকার সবচেয়ে খারাপ দিক যেটা, তাহল গরম এবং অস্বাচ্ছন্দ্যকর জাজিম। যত্ন-আত্তি ভালোই। সেখানে এমনকি ছিল একজন নার্সও, যার নাম আমি জানতে পেরেছিলাম — রোসা, কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, তার একজন আইনজীবী ছেলেবন্ধু আছে, যে সবসময় তার জন্য হাসপাতালের রাস্তার ঠিক উল্টো দিকের বার-এ অপেক্ষা করে। 

অন্যদিনের চেয়ে আজ বেশি গরম, আমার চাদর ভিজে জবজবে। ডাক্তাররা নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, তাঁরা আজ বা আগামীকালের মধ্যে আমাকে ছেড়ে দেবেন। অন্য যে-কারও চেয়ে বাবা আমাকে বেশি দেখতে আসেন। অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে তিনি বেশি স্নেহশীল। তিনি নাস্তার সময় আসেন, লাঞ্চের পর যান, কখনও ফিরে আসেন আমার ডিনারের সময়। আজ রাতে, যেমন, কথা দিয়েছেন, তিনি আসবেন। তিনি এত খুশি ছিলেন যে, যাওয়ার আগে বলেছিলেন, আমার ধারণা, আটটায় এসে পৌঁছে যাব। আর এত ভেবো না বাছা, দুশ্চিন্তা করো না, গাড়িতে মোটেই বেশি সময় লাগে না। তাছাড়াও, হাসপাতালের গ্যারেজে সবসময়ই গাড়ি রাখার জায়গা পাওয়া যায় । তুমি কি দেখেছ, ওখানে গাড়ি রাখা কত সহজ?


------------------------------------------------------------
জর্জ হেনসন-এর ইংরেজিতে করা তর্জমা থেকে 
--------------------------------------------------------------
লেখক-পরিচিতি:অ্যান্দ্রেস নিউম্যান (জন্ম: ১৯৭৭। বুয়েনোস আইরেস, আর্হেন্তিনা) এসপাইনিওল (Español) বা স্প্যানিশ ভাষার একজন ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, কবি, নিবন্ধকার ও ব্লগার। ‘মিক্রোরেপ্লিকাস’ (Microrréplicas) এই নামে তিনি তাঁর নিজস্ব ব্লগ লিখে থাকেন। এটা এল কালচারালের (El Cultural) জরিপে স্প্যানিশ ভাষায় অন্যতম সেরা ব্লগ। তাঁর চতুর্থ উপন্যাস, ‘এল ভিয়াহেরো দেল সিগলো’(El viajero del siglo) স্প্যানিশ লিটেরারি ক্রিটিকস্ অ্যাসোসিয়েশন (Spanish Literary Critics Association) কর্তৃক প্রদত্ত ২০০৯-এর ‘আলফাগুয়ারা’ (Alfaguara)পুরস্কার এবং ‘ন্যাশনাল ক্রিটিকস্ প্রাইজ’ (National Critics Prize) জেতে। ‘এল পাইস’ (El País) এবং ‘এল মুন্দো’ (El Mundo) এই উপন্যাসটিকে স্প্যানিশ ভাষায় লিখিত বছরের পাঁচটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের মধ্যে স্থান দেয়। Traveler of the Century নামে এর ইংরেজি অনুবাদ পাওয়া যায়।





অনুবাদক পরিচিতি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন