রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গদ্য

হাসান আজিজুল হক

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হয়ে গেল, মৃত্যুর পরেও কেটে গেল বাহান্ন বছর।মাত্র ৪৮ বছরের জীবনকালে ২৭ বছরের লেখক জীবনে তাঁর রচনার পরিমাণ বিপুলই বলতে হবে।সেদিক থেকে তার অকালমৃত্যু হয়েছে, একথা বলার উপায় নেই, বরং লেখক হিসাবে তাঁর সারা জীবনের সৃষ্টি সামনে রাখলে বুঝতে বাকি থাকে না, তাঁর রচনা পূর্ণ পরিণতিতেই পৌঁছেছিলো; দীর্ঘতর জীবন লাভ করলে তাঁর লেখক জীবনও যে দীর্ঘতর ও পূর্ণতর হতো এমন মনে হয় না। বিশ বছর বয়স থেকে আটচল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর লেখা সকাল-মধ্যাহ্ন-অপরাহ্নের পূর্ণ বৃত্তই ঘুরে এসেছিলো।

লিখতে শুরু করার পর থেকেই তিনি সাহিত্যপাঠকের মনোযোগ পেয়েছিলেন। সাধারণ পাঠকের কথা বলছি না, জনপ্রিয়তার কথাও নয়। আদপে সাধারণ পাঠকের সংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি আর কবে বোঝা যায়? জনপ্রিয়তাই বা ঠিক ঠিক কী করে মাপা যায়? বই বিক্রির সংখ্যা জানতে চেয়ে বা কেমন ধরনের কত পাঠক কিনে বই পড়লেন এই সব খবর নিয়ে কি খুব লাভ হয়? মানিকের বেলায় সাধারণভাবে পাঠকপ্রিয়তার কথা বলা যায় না। কিন্তু বলা চলে সাহ্যিতপাঠক বা সমঝদার পাঠকদের মনোযোগ তিনি শুরু থেকেই পাচ্ছিলেন। এঁদের মধ্যে পত্রিকার ঝানু-সম্পাদক আছেন, সাহ্যিতের সমালোচক আছেন, আর অবশ্যই অনুরাগী প্রাগ্রসর অভিজ্ঞ পাঠকও আছেন। প্রথম গল্প‘অতসী মামী’ ছাপা হবার ব্যাপারে তাঁর আত্মবিশ্বাস মনে রাখার মতো। এই গল্প লেখার আগে হাত মকশোর আরো লেখা কিছু আছে কিনা জানি না, তবে তাঁর আত্মবিশ্বাস থেকে মনে হয় ‘অতসী মামী’ গল্পটিকেও তিনি নেহাত কাঁচা লেখা বলে মনে করেননি। গল্পটি ছাপার পরে ‘বিচিত্রা’র সম্পাদক নিজে এসে দশ টাকা সম্মানী দিয়েছিলেন এবং আরো গল্প চেয়েছিলেন, ছেপেছিলেন আরো দুটি গল্প। বার কতক ‘মানিকলাল, মানিকলাল’ বলে উল্লেখ করলেও সে-সময়ের মহাবিদ্বান জাঁদরেল সমালোচক ধূর্জটীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর প্রথম পর্বের উপন্যাস নিয়ে সপ্রশংস মন্তব্য করেছিলেন। একটা বিশেষ অবস্থান থেকে গোপাল হালদার, সরোজ দত্তর মতো সমঝদার সাহিত্যিকরাও গভীর আগ্রহের সঙ্গে তাঁর প্রতিটি লেখাই পড়েছিলেন, আলোচনা করেছিলেন। তবু চলতি কথায় যাকে জনপ্রিয় লেখক বলা হয়, তেমন জনপ্রিয় লেখক মানিক বন্দোপাধ্যায় তখনো ছিলেন না, আজও নন। তুলনায় তাঁর একেবারে সমসাময়িক দুজন লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠকপ্রিয়তা বেশি ছিল বলেই মনে হয়। অবশ্য মুগ্ধপাঠক, বশীভূত পাঠক, প্রায় আত্মবিস্মৃত পাঠক শরৎচন্দ্রের চেয়ে বেশি আর কারো ছিলো না। নিজের কথা মনে করেই বলতে পারি — তবে তারপরে বিভূতিভূষণ এবং তারাশঙ্করের কথাই বলতে হয়। বিভূতিভূষণ বরাবরই পাঠকপ্রিয়, সত্যজিৎ ছাড়াও, আজও তাই। ‘পথের পাঁচালী’, ‘আরণ্যক’,‘অপরাজিত’ পড়েছেন এমন অনেক অপ্রত্যাশিত অসম্ভব পাঠকের সন্ধান পেয়ে আমি বরাবর আশ্চর্য হয়েছি। বিভূতিভূষণের পরেই কিন্তু জায়গাটা তারাশঙ্করের, মানিকের নয়।

তাহলে কি আমি জনপ্রিয়তার বিপরীতে মৌলিকতার কথা বলতে চাইছি? না, মৌলিকতা নিয়ে কোনো কথা নয়। সে বড়ো প্যাঁচালো বিষয়। বরং খানিকটা আন্দাজ হয় যে, মানিক শুরু থেকেই হতে চলেছিলেন শাসকসাহিত্যিক। তখনকার কথা জানিনা, তবে তখনকার জায়গা থেকে এখন লেখক হিসেবে মানিকের শুরুর সময়টা দেখতে গিয়ে মনে হয়, বাংলা সাহিত্য শাসনের জায়গাটা তাঁর জন্যে ক্রমেই নির্দিষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। একদিনে নয়, মানিককে কোনোদিন সে-ভূমিকা দাবি করতেও হয়নি, চোখ রাঙাতেও হয়নি। কেন মনে হয় এই কথা? তাঁকে নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক, তর্কাতর্কি, বিভ্রান্তি, ভুল-বোঝা, ভুল বোঝা থামাতে মানিকের নিজের আলোচনায় যোগ দেয়া, কখনও কৈফিয়ৎ কখনও আত্মসমালোচনা করা সবই টানা দুটি দশক ধরে যেভাবে দেখা গেছে তাতে একদিকে যেমন সময়ের অস্থিরতা ধরা পড়ে, অন্যদিকে তেমনি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অনড় ধারণার আসনগুলিকেও নাড়াচাড়া করতে দেখা যায়। তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁকে নিয়ে লেখালিখি, বিতর্ক কখনোই একেবারে থেমে যায়নি। বরং তৈরিই হয়ে গেছে সমালোচনা-সাহিত্যের একটি বড় ধারা। এইসব থেকেই তাঁর বিস্ময়কর প্রভাবটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও স্বাভাবিক নিয়মে, ভালো-মন্দ যা-ই হোক, সবকিছু ভিন্নপথ ধরলেও মানিকের প্রতি আগ্রহ কিন্তু অনেক চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে এই বর্তমানে যেন প্রবলই হয়ে উঠেছে। জনপ্রিয়তা নয়, তাহলে এ কি মানিক-সাহিত্যের উৎকট স্বাতন্ত্র্য? হতে পারে অস্বস্তিকর কিন্তু অনস্বীকার্য মানিকের সাহিত্যশাসনের প্রবলতা।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপুল সৃষ্টি নিয়ে বিশেষভাবে বা সাধারণভাবে আমি কোনো আলোচনায় ঢুকতে চাই না। গত পঞ্চাশ বছর ধরে এ-রকম বিশ্লেষণের, মূল্যায়নের চেষ্টা মোটামুটি নিরবিচ্ছিন্নভাবেই চলছে, তাতে আজও ভাটা পড়েছে এমন নয়। গজ-ফিতে-লগি-বৈঠা ইত্যাদি ব্যবহার করে তাঁর সাহিত্যের মৌলিকতা, গভীরতা, প্রকৃতি ও পরিসীমার আন্দাজ নেবার চেষ্টাও চলছে। আমি নিজেও কখনো-কখনো আমার সাধ্যমতো তেমন আলোচনায় মন দিয়েছি; কিন্তু এখানে আমি মূল্যায়ন বা বিচারের প্রসঙ্গটি পাড়তেই চাই না। বাংলা সাহিত্যে বা একালের বিশ্ব-কথাসাহিত্যে তাঁর স্থানটি ঠিক কোথায় সে নিয়ে হাজাররকম কথা হবে, তা আমরা জানি, তারপরেও গণিতের নিয়মে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হতে পারবে না, তা-ও আমাদের জানা। তাই বলে কি এটাও আমাদের জানা নয় বা স্থির নয় যে, সব বিতর্কের উপরে বাংলা সাহিত্যে বা আমাদের চোখে একালের বিশ্বসাহিত্যে তাঁর একটা জায়গা আপেক্ষিক হলেও স্থায়ী হবেই? এটা শিরোধার্য করেই এখন তবে অন্য কিছু কথা।

সাহিত্যের একটা ঐতিহ্য তৈরি হতে কত দিন লাগে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। এমন একটা ধারাই বা কতদিনে সৃষ্টি হতে পারে যাকে বলা যাবে মূলধারা? বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রের অন্তিমপর্ব পর্যন্ত বাংলা কথাসাহিত্যের চিনতে পারার মতো একটা ধারা তৈরি হয়েছে বলে যদি মেনে নিই, তাহলে কি বলতে পারি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা তা থেকে একেবারে ভিন্ন পথে মোড় নিয়েছে? যদি পারি তাহলে একথাটা বলার পরেও আমি নতুন, মৌলিক, অভিনব ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করতে চাই না। প্রায় ধাঁধাঁর মতো, এসব শব্দে সকলের স্বীকার্য সুরাহা হবার সম্ভাবনা প্রায় নেই।

আমাদের মনে পড়বে নতুন-পুরনোর তর্ক গত শতকের বিশের দশকেই উঠে পড়েছে, ঘোষণা দিয়ে বা না-দিয়ে। ‘কল্লোল’, ‘কালি-কলম’ ইত্যাদি সাহিত্য পত্রিকা নতুন সাহিত্যের পতাকা উড়িয়ে দিয়েই কাজে নেমেছে। নতুন, বিদ্রোহী, দুঃসাহসী, আন্তর্জাতিক, আধুনিক, অলজ্জ যৌনতাচেতন ইত্যাদি লবজ দিয়ে শ্রেণীকরণ, বর্গীকরণ তখনই বেশ শুরু হয়ে গিয়েছিল। মানিক একটুখানি দেরিতে এলেন, কিন্তু এ-সবের কোনোকিছুতেই গেলেন না। তাঁর লেখা শুরু হলো তাঁর নিজের লেখক-স্বভাবে। তাই মৌলিক, নতুন এসব না বলে বরং বলা যাক তিনি ঐ-রকম। আলাদা দেখছেন, আলাদা ভাবছেন। মানুষ, সমাজ, সময় যেভাবে দেখছেন, তা একেবারেই ভিন্ন, আর কারো সঙ্গে মিলছে না। বাংলা কথাসাহিত্যের সঙ্গে যোগসূত্র রাখার কোনো ভাবনাই তাঁর মাথায় নেই। তিনি শুরু করছেন সম্পূর্ণ নিজে নিজে। হাত মকশ করবার সময়ও যেন নেই, এক্ষুনি লিখে ফেলতে হবে যা লেখার। সঙ্কল্প করছেন লেখক হবেন, আর কিছু নয়। তাঁর নিজের ভাষায় সাহিত্যের কোন্ শেষ থেকে তিনি শুরু করবেন তা নিয়েও তাঁর চিন্তা নেই। কাজেই প্রথম থেকেই তাঁর লেখা আলাদা আর নতুন। এইটুকুই। এখানে অন্ততপক্ষে মৌলিকত্ব, নতুনত্ব ইত্যাদি প্রসঙ্গ টেনে নিয়ে এসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরাটত্ব বা মহত্ত্ব ঠাহর করবার দরকার নেই। তার চেয়ে তাঁর ভিন্নতা আর নতুনত্বের ধরনটা বোঝার চেষ্টা করাই বেশি কাজের হবে।

‘অতসীমামী’ মানিকের প্রথম লেখা গল্প আর ‘জননী’ প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস হলেও ‘দিবারাত্রির কাব্য’ তাঁর একুশ বছর বয়সের প্রথম লেখা উপন্যাস। ‘জননী’ নানাদিক থেকে আমাদের একটু চমকে দেয়। গল্পটিতে তার নিম্নমধ্যবিত্ত শহুরে চরিত্রগুলি বেশ চেনাই লাগে, তবু তারা সরাসরি যখন আমাদের সামনে আসে, কথা বলে, চিন্তা করে আর নানা আচরণ ও কর্মের ভিতর দিয়ে তাদের ভাবনাগুলির সঙ্গে অন্যান্য বৃত্তি মিশিয়ে নিজেদের প্রকাশ করে, তখন তারা যে আমাদের দেখা, চেনা গতানুগতিক চরিত্রগুলোর মতো মোটেই নয় সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবু ‘জননী’-র খানিকটা চমকে আমরা একটু সময় নিয়েই অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারি কিন্তু এর আগে লেখা‘দিবারাত্রির কাব্য’ যে প্রথম থেকেই আমাদের প্রায় হতবাক করে ফেলে! আমি পাঠকদের ‘দিবারাত্রি কাব্য’-র প্রকাশকাল ১৯৩৬-এ ফিরে যেতে বলি।

আসলে কী ঘটেছিলো ‘দিবারাত্রির কাব্য’ উপন্যাসটিতে? বাংলা ভাষা, বাংলা গদ্য খুব নতুনভাবে ব্যবহার করা হয়েছিলো? রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, ধূর্জটীপ্রসাদ মনে রেখে, ভালো-মন্দ প্রশ্ন শিকেয় তুলে রেখেও কি মনে হবে একজন নতুন লেখক উপন্যাসের গদ্যকে ভিন্নতর উদ্দেশ্যে, ভিন্নতর কাজ করিয়ে নেবার জন্যে একেবারে আনকোরা করে ফেলেছেন? যদি তাই হয়, তাহলে তা করার প্রয়োজন হলো কেন? মানুষ আর তার সমাজকে উল্টো জায়গা থেকে বাঁকা চোখে দেখতে চাইছিলেন বলেই কি ভাষার ঐ তির্যক ব্যবহার? সব রকমের সম্পর্কগুলিকে তিনি কি খুঁড়ে খুঁড়ে দেখতে চাইছিলেন? মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, মানবের সঙ্গে মানবীর সম্পর্ক, প্রেমের সম্পর্ক? আমাদের মধ্যবিত্তের বৃত্তের মধ্যে? প্রেম, শরীর, হিংস্রতা, নিষ্ঠুরতা, বিদ্বেষ-মানব সম্পর্কের বেলায় এসবের অনুপাত কেউ কি মিলিয়ে দিতে পারবে? নাকি মানুষ এইভাবেই একসঙ্গে সব বইতে-বইতে অস্তিত্বের দায়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার বাধ্যবাধকতায় পুড়তেই থাকবে? আরো প্রশ্নঃ ঠিক এই ভঙ্গি, এই জিজ্ঞাসা-কঠিন, অসন্তুষ্ট, অতৃপ্ত ভঙ্গি কি বাংলা উপন্যাসে এর আগে কোনদিন দেখা গেছে? বাংলা উপন্যাসের যে ধরন-ধারন, প্লট, গল্প-বিন্যাস, কোনো একটা কাঠামো, বঙ্কিমচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র পেরিয়ে যা গড়ে উঠেছিলো, তার কোনোরকম ছাপ না রেখেই রচিত হয়ে গেল কি একটি উপন্যাস? কাঠামোর কথা আর কি বলব? আমরা জানি বোধহয় উপন্যাস তিনি লিখেছিলেন-ও না। কী তিনি লিখছিলেন তিনিই জানেন। সম্পদকের পরামর্শেই নাকি তিনি ‘দিবারাত্রির কাব্য’-র একাটি অংশ জমা দিতে গিয়ে ফিরিয়ে এনেছিলেন। সম্পাদক মহাশয় একটি সম্ভাব্য উপন্যাসকে আঁতুড় ঘরেই নুন দিয়ে হত্যা করতে বারণ করেছিলেন।

কী হয়েছিল জানিনা! তবে মনে হয়, এই উপন্যাসটি প্রকাশের পর থেকেই বাংলা উপন্যাস আলাদা একটা ঠিকানা তৈরি করে নিল। বাস করার জন্য আলাদা একটা বাড়ি। পুরনো বাড়িটা রইল, আর অনেকদিন থাকবে হয়ত, আর যাঁরা সেখানে থাকবেন তাঁরা হয়ত খানিকটা মেরামত করে নেবেন, দরকার মতো বাড়াবেন বা সংক্ষিপ্ত করবেন। এই পুরনো বাড়ির পাশেই একজন নতুন লেখক ভিন্ন-একটা নির্মাণ খাড়া করতে চাইলেন। বোঝা গেল, চলতি কাঠামো ভেঙেছে, ভাষা জটিল-কুটিল পথে চলতে শুরু করেছে, মসৃণ প্রশস্ত বড়ো রাস্তা থেকে পাঠকদের নেমে আসতে উস্কানি দিচ্ছে। যা পরিচিত চেনা, তাকে এমন করে চিনতে বলছে যেন তা আবার অপরিচিত অচেনা হয়ে ওঠে।

আমি ভিন্নতার কথা বললাম, নতুন পথের কথা বললাম কিন্তু কোথাও কোনোরকম শ্রেয়তার কথা তুলিনি। এমনকী, আধুনিকতা সমকালীনতার কথাও নয়। পুরনো বাড়ি ছেড়ে দিয়ে সবাই এখানে চলে আসবে, আসাটাতেই বাংলা উপন্যাসে প্রগতি ও আধুনিকতা একথাও বলা হচ্ছে না। ঘটেওনি তেমন। বাংলা উপন্যাস অনেক বদলেছে, প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। ব্যতিক্রম হিসেবে দু-চারজন একেবারে ভিন্নপথে হেঁটেছেন। কিন্তু পুরনো, চেনা ধারাটি ঠিকই বজায় আছে। একজন সতীনাথ ভাদূড়ি, একজন কমলকুমার মজুমদার বা অমিয়ভূষণ মজুমদার কিংবা দেবেশ রায় কি এঁদেরই মতো আরও কেউ-কেউ রয়েছেন, যাঁদের রচনাকে ঠিক বাংলা কথাসাহিত্যের চেনা ধারার সঙ্গে মেলানো যায় না–বাংলাদেশে যেমন সৈয়দ ওয়ালীউল্লোহ বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস–তবু বলতে হয়, বাঁধা, পরিচিত সড়ক ঠিকই রয়ে গেছে। আবার যাঁদের প্রভাবশালী স্বতন্ত্র পথের পথিক বলা হলো, তাঁরা সবাই যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অনুপ্রাণিত এ-কথা বলাও অবশ্য আমার উদ্দেশ্য নয়। বরং তা যে নয়, সেটাই জোরের সঙ্গে বলা উচিত। প্রসঙ্গটা এই জন্যই তোলা যে, মানিকই প্রথম পৌনে এক শতাব্দী আগে বাঙালি উপন্যাস পাঠকদের হকচকিয়ে দেন, উপন্যাস-পাঠের উপভোগ, আনন্দ, স্বস্তি আর আরামকে আয়াস-প্রাপ্য করে তোলেন। উপন্যাস পাঠেই স্তরান্তর ঘটান; প্রবন্ধ, মননশীল রচনা, সমাজবিদ্যা, অর্থনীতি ইত্যাদির সঙ্গে কথাসাহিত্যের তফাৎ কমিয়ে আনেন, উপন্যাসের ধারণাটিকেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন। আমি মনে করি, শুদ্ধ সাহিত্যের ভাবনা মানিক পাঠকের মন থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন। একালের ইতিহাস, রাজনীতি, নীতিবিদ্যা, মনস্তত্ত্ব, সাহিত্যের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেল যেন সাহিত্য ঠিক কী বস্তু সেটা আর নির্ধারণ করা না যায়। উপন্যাসের ভাষা, আঙ্গিক, কাঠামো, বিষয়-প্রসঙ্গ চরম মীমাংসার বাইরেই চলে যায়। সমস্ত আপ্তবাক্য বাতিল হয়ে পড়ে। উপন্যাসের একটা নতুন পথ মানিক যেন জোর করে দেগে দেন। সাহিত্যে কল্পনাবৃত্তি, সৃজনবৃত্তি, উদ্ভাবনবৃত্তির সঙ্গে মেশে বুদ্ধি-বিচার-বিশ্লেষণের শুকনো-নীরস আরো কিছু ভিন্নতর বৃত্তি। ব্যবচ্ছেদে শল্য-চিকিৎসকের হাতে তীক্ষ্ণধার ছুরির যে-কাজ, অনেকটা সেইভাবেই বুদ্ধিকে উপন্যাসের উপজীব্য জীবন ও সমাজের তন্ন-তন্ন বিচারে ব্যবহার করতে চাইলেন মানিক। বুদ্ধিপ্রধান উপন্যাসের সুত্রপাত খানিকটা ধূজর্টীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হাতে হয়েছিল, তবে তা ছিলো গণিতের মতো শুকনো। তিনি তো কথাসাহিত্যিক ছিলেন না। তেতো, কশায়, বিস্বাদ, মিষ্ট দিনের মানুষের জীবনযাপনের রস সেখানে ঠিক মেলেনি। মানিক বুদ্ধির এই শাণিত আর আলোসদৃশ অস্ত্রটি নিয়ে জীবনের খুব ভিতরের কক্ষগুলিতে ঢুকে পড়তে চাইলেন।

‘জননী’ তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। আগে বলেছি অনেকটা চেনাই লাগছিল সেটি, খুব ভড়কে দেবার মতো কিছু আপাতদৃষ্টিতে ছিলো না তাতে। বিশের দশকের শহর-নগরের উপকন্ঠের গ্রাম-শহর মেশানো সমাজের নেহাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গল্প। গল্পের কেন্দ্রে, সংসারের কেন্দ্রে-থাকা মা। খুবই চেনা, কিন্তু একেবারে শুরু থেকেই একটু অন্যরকম। গল্প হাজির করার বেলায় অন্যরকম, চরিত্রগুলির আচার-ব্যবহার অন্যরকম। সাদামাটা, কিন্তু সেইসব আচরণ-ক্রিয়ার পিছনে আবেগ-চিন্তা-অনুভবের, যুক্তি-বিন্যাসের ধরনটা আলাদা, একটু যেন তেরছা, যেন লুকনো-জিনিস বের করে আনার মতো। দেখতে পাচ্ছি, মানিকের স্বতন্ত্র হয়ে যাওয়াটা‘জননী’তে ঠিকই আছে, শুধু ঢাকনাটা আটপৌরে। বরং প্রথম লেখা কিন্তু প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসের পরে প্রকাশিত উপন্যাস‘দিবারাত্রির কাব্য’ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবাক করা আনকোরা, নতুন, পুরোপুরি মানিকীয়। তাঁর রচনা তখন পূর্ণ বিকাশের অপেক্ষায় থাকলেও।

১৯৩৬-এ প্রকাশিত ‘দিবারাত্রির কাব্য’ পড়বার পরে মনে হয় মানিক মনস্থির করেই ভাবতে শুরু করেছিলেন, আমাদের সাহিত্যে মানুষকে এবং মানুষের সমাজ, সংসার, রাষ্ট্রকে ভাসা-ভাসা ভাবে দেখা হয়েছে এতকাল। ছুরির নীচেও ফেলা হয়নি, অণুবীক্ষণের তলাতেও পরীক্ষা করা হয়নি। সুবিধাজনক আর স্বস্তিকর কতগুলো সামাজিক মূল্যবোধ ও ধারণাকে আঁকড়ে ধরে উপন্যাস এতকাল এগুনোর চেষ্টা করেছে। বাঁধা ও ধরে নেওয়া কতকগুলি মানুষীয়-বৃত্তি –— যেমন দয়া, মায়া, সহানুভূতি, সমবেদনা, বাৎসল্য; অন্যপক্ষে লোভ, লালসা, কাম, বাসনা ইত্যাদি অবলম্বন করে সাহিত্যের কাজ চালিয়ে নেওয়া হয়েছে। কোনো কিছুকেই পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। এককথায় বোধহয় গোটা মানব-অস্তিত্বটারই মুখোমুখি হওয়া যায়নি। আমরা জানি, সত্যিকার জীবনে কিছুতেই ফাঁকি চলে না, কড়ায়-ক্রান্তিতে তার পুরো মূল্য শুধতেই হয়। কিন্তু সাহিত্যে চলেছে ক্রমাগত ফাঁকি। জীবনের ছবির সবরকম রঙ সেখানে অনুপস্থিত। অনেককিছুই সেখানে কৃত্রিমভাবে গুছিয়ে নেয়া, উপর-ভাসা, আপ্তবাক্যে ভরা। মন্থন করে দেখা হয়নি মানবিক-চেতন অস্তিত্ব থেকে কী কী উঠে আসতে পারে। অমৃতে আত্মহারা হওয়া হয়ত চলে, কিন্তু জীবন যখন বিষ উগরে দেয়, তাকেও তো গলাধঃকরণ করা দরকার। জীবনটা অবিকল কী, জানা না গেলেও যতোটা জানা যায়, তা জানতে চেষ্টা করা কি হবে না? সাহিত্যের কি সেই দায় একেবারেই নেই?

আমরা দেখছি, একেবারে প্রথম উপন্যাস ‘দিবারাত্রি কাব্য’ থেকেই শুরু হয়ে গেছে জীবনের ভিতর-পিঠ পরীক্ষা করা। সকলের সামনে পাতা-নকশার ভালো-মন্দ বেশ দেখা যায়। উল্টে নিলে মোটা মোটা দাগ, ছেঁড়া সেলাই, রঙের ভিতর-পিঠ চোখে পড়ে। তখন যা কিছু উপায়-উপকরণ দিয়ে জীবন তৈরি সেগুলোকে আঁশে আঁশে ছড়িয়ে ছাড়িয়ে টেনে-ছিঁড়ে দেখা সম্ভব হয়। সাহিত্যের কাজের তখন আর শেষ থাকে না। জীবনকে অনেক খোপে রেখে পরীক্ষা, শুদ্ধ মানব অস্তিত্ব নিয়ে বিচার, এক-একটা বৃত্তি নিয়ে জটিল অধ্যয়ন–এসবই তখন সম্ভব হতে পারে। যেমন প্রেম-‘দিবারাত্রির কাব্য’; অহিংসাবৃত্তি-‘অহিংসা’; সৌন্দর্য, নারীশরীর-‘চতুষ্কোণ’। এই ভাবেই সব সম্ভবপর মানবিক পরিস্থিতি, সম্ভবপর সব সমাজ-সম্পর্ক, তারপর সংগ্রামে লিপ্ত মানুষ, দারিদ্র্যের ফাঁদে, শোষণের জালে আটকানো মানুষ, জানা-অজানা অসংখ্য সম্পর্কের জটিল-কুটিল বাঁধনের মধ্যে উদ্ধারহীন বন্দী মানুষ–লেখকের অনুসন্ধানের কাজ তো অন্তহীন!

‘দিবারাত্রির কাব্য’-র বিষয় কি? সাধারণ কথায়, এককথায়, ‘প্রেম’। যে-কোনো গড়-পাঠককে জিজ্ঞাসা করলে এই উত্তরই পাওয়া যাবে। মোটামুটি সন্তুষ্টই হওয়া চলে তাতে, কারণ ‘প্রেম’ কথাটি দিয়ে কিছু-একটা নিশ্চয়ই আমরা বুঝি। তা নাহলে কথাটা ব্যবহার করে কেন লোকে? বেশ তো কাজ চলে যাচ্ছে–প্রেম করতে, বা অন্যদের প্রেমকর্ম বুঝতে, কারো আটকাচ্ছে না কোথাও। এইরকম একটা নিশ্চিন্ততার মধ্যে পড়া হলো ‘দিবারাত্রির কাব্য’। গেল সব গুলিয়ে। প্রথমে ধ্বংস হয়ে গেল কথাটার গড়পরতা মানে। চলতি, আবছা অনির্ভরযোগ্য ও ব্যক্তিগত যে অর্থটা একরকম করে ছিল, সেটা স্রেফ উবে গেল, তৈরি হলো ফাঁকা একটা জায়গা, তারপর সেই ফাঁকায় এসে জমতে লাগলো সন্দেহ, সংশয়, শ্লেষ-বিদ্রুপভরা নানা প্রশ্ন আর একটার পর একটা পরস্পর নির্ভরশীল, পরস্পর-বিরোধী জিজ্ঞাসার জাল বোনা শুরু হলো: প্রেম কি শুদ্ধ মুগ্ধতা? কতদিনে তা ছিঁড়ে ফেঁসে যায়? প্রেম কি রক্ত-মাংসের অন্ধ তাড়না, একেবারে লৈঙ্গিক? ভীষণ ঈর্ষা, ভয়াবহ বিদ্বেষ, প্রেমের সঙ্গে মিশে থাকতে পারে কি? শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভয়, বিবমিষা, চরম নিষ্ঠুরতা ও হনন-প্রবৃত্তি প্রেমের সহগামী হতে পারে কি? আর ওরাই বা কারা–ঐ হেরম্ব, মালতী, আনন্দ–ওরা? মানিক নিজেই বলেন, ওরা কেউ পুরোদস্তুর মানুষ নয়, কোনো একটা মানবীয় ধারণা বা বৃত্তির ‘প্রজেকশন’ মাত্র। আমরা দেখতে পাই মানিক, খুঁড়তে খুঁড়তে ‘ইনসেস্ট’ অবধি পৌঁছে যান। ‘দিবারাত্রির কাব্য’ পড়তে পড়তে যা ঘটতে থাকে তা শেষ পর্যন্ত এই: যে ধারণা, বিশ্বাস বা এমনকী যুক্তি মনের মধ্যে প্রোথিত-প্রতিষ্ঠিত থাকে তা ভেঙে পড়ছে কিন্তু তাদের জায়াগায় নতুন কিছুই গড়ে উঠছে না, অথচ মনে হয় অনেক হাঁটা হলো, দেখা হলো, আলো-অন্ধকার এল, গলি-ঘুঁজি পেরনো গেল কিন্তু কোনো কিছুতেই নিশ্চিত হওয়া গেল না। উপন্যাস পাঠের শেষে তেতো হয়ে যাওয়া একটা বোধই যেন স্থির হয়: মানুষকে জোড়াতালি দিয়েই জীবনের কালটা খরচ করে ফেলতে হয়।

সাহিত্যে মানিকের মৌলিক কৃত্যের এই জায়গাটা মনে রেখে এইবার ‘জননী’ পড়তে গেলে বোঝা যাবে এ-উপন্যাসের বিষয়টা আলাদা বটে, কিন্তু এর রচনার পিছনে কাজ করছে মানিকের সেই বৈজ্ঞানিক নিরাসক্ত কঠিন লেখক অবস্থান। যা ভাবনাহীন অন্যমনস্ক মেনে নেওয়াকে ভাঙতে ভাঙতে এগোয়, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত বা শেষ সত্য বলে কোনো কিছুকে বানিয়ে তোলে না। আলো ছড়াতে-ছড়াতে যায়, নানা কার্যকারণ সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে — বিষয় যা-ই হোক, সমাজ হোক, রাষ্ট্র হোক, দারিদ্র্য, শোষণ, নিগ্রহ, শ্রেণী-শোষণ, শ্রেণী-দ্বন্দ্ব, শহর-নগর গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা হোক, কোথাও তিনি কোনো লব্জকে পাত্তা দেননি, ঋষি-বাক্যের দোহাই মানেননি। নিজের স্বতন্ত্র চিন্তার প্রাধান্যকেই তিনি অকুণ্ঠে তুলে ধরেছেন। পরপর ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘জীবনের জটিলতা’ ইত্যাদি উপন্যাস আর তাঁর অজস্র ছোটগল্পগুলি পড়লে বোঝা যাবে, যে-মানিকের শুরু ‘দিবারাত্রির কাব্য’-এ, ‘জননী’-তে,‘অতসী মামী’-র গল্পে, সেই একই মানিক দ্রুত পরিণত, সমৃদ্ধ দাপুটে হয়ে উঠছেন। বিষয় ক্রমাগত বদলাচ্ছে — যদিও বিশেষ একটা বিষয়-বৃত্ত নির্দিষ্ট হয়ে উঠছে, তাঁর সমবেদনাগুলি, সমর্থন, সহানুভূতিগুলি ক্রমেই শক্ত চেহারা নিচ্ছে, তবে কিছুতেই বাঁধা-পথে তিনি হাঁটতে চাইছেন না। গল্পের মানুষজন খুব বদলাচ্ছে। মিছিল করে তারা আসছে, এঁদো, বদ্ধ ডোবায় আটকানো গাওদিয়া গ্রামের নানা পেশার মানুষজন, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার লড়াই-এ জোয়াল-আটকানো পদ্মাতীরের গরিবের গরিব মৎস্যজীবী জেলে-সম্প্রদায়, নতুন নতুন মাত্রা নিয়ে তাঁর রচনায় দেখা দিচ্ছে। অল্পদিনের মধ্যেই বস্তুবাদী, জীবনবাদী, বাস্তববাদী ইত্যাদি নানা খেতাব জুটে যাচ্ছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আর মাঝ-চল্লিশে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেবার পর এসে যাচ্ছে একটা স্থায়ী মার্কা–সাম্যবাদী, সমাজবাদী, বামপন্থী লেখক। বলতে কি এসব উপাধির সত্যিকার কোনো নির্দিষ্ট মানে নেই। সাধারণভাবে কিছু একটা বোঝাতে পারে হয়ত। কিন্তু দু-একটি প্রশ্ন তুলতেই, যেটুকু বা বোঝা যায় তা আর ধোপে টেকে না। জীবনবাদী, বস্তুবাদী নয় কোন্ লেখক? অ-বাস্তববাদী লেখক আছে নাকি কোথাও? আমার ধারণা, মানিক নিজেকে কমিউনিস্ট মনে করলেও কোনো খেতাব বা মার্কায় বিশ্বাস করতেন না। তিনি মুখে কি বলতেন, না বলতেন, তা ধর্তব্য নয়। তাঁর সব লেখা, শেষ লেখা পর্যন্ত প্রমাণ দেয়, সাহিত্য হিসেবে দাঁড়াক, যুক্তি-প্রক্রিয়া হাস্যকর হয়ে উঠুক, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিটা ভুয়ো-ঠুনকো মনে হোক, তবু যে-মন্থনকারী, খননকারী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমরা শুরু থেকেই দেখে আসছি, সারাজীবন তিনি তা-ই থেকে গিয়েছিলেন। বৃদ্ধ বটের বাল্য-যৌবন-বার্ধক্য ইত্যাদি সবই আছে, ক্ষীণ বটচারা কোনোরকমে বাড়ে, সেই একদিন সতেজে দেখা দেয় শাখা, পাতা, ফুল-ফল নিয়ে, তারপর আকাশ ছুঁয়ে ফেলে, তারপর একদিন ঘুণ ধরে, ক্ষয়ে যায়, মরতে থাকে আর নেহাত বট বলেই বেঁচে থাকে। এই রকমই অভিজ্ঞতার লোহা-লক্কড়, আদর্শের অমোচনীয় চিহ্ন, ঘুণ-ক্ষয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যেও আমরা দেখতে পাবো।

এখন শেষ প্রসঙ্গ। দুই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। মুক্ত স্বাধীন (?), অদীক্ষিত (?) স্রেফ লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আর ১৯৪৪-এ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়া ‘কমিউনিস্ট’ বা ঘোষিত ‘বামপন্থী’ লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। মানিক একেবারে দুখণ্ড কেন? দশ খণ্ড করতে পারলেই আমাদের স্বস্তি। কারণ একজন লেখক কিছুতেই যে আটকা থাকতে চায় না, কেবলই উপচে-উপচে পড়ে, যে-পাত্রে রাখতে চাই কিছুতেই তাতে ধরতে চায় না। সেজন্যে একেবারে ভাগ-ভাগ খণ্ড-খণ্ড করতে পারলেই আর আলাদা-আলাদা বাক্সে বন্ধ করে ফেললেই লেখক সহজে কব্জা হয়ে যেতে পারে। আমরা ভুলে যাই শুরুতে যেমন কোনো না কোনোভাবে শেষ আছে, শেষেও তেমনি শুরু আছে।

এইবার একটা আলাদা হিসেব করি। সব লেখকই লেখকজীবনের কোনো-একটা পর্যায়ে তাঁর সেরা লেখাগুলি লিখে ফেলেন। তারপরই একটু-একটু করে এগিয়ে আসে অপরাহ্ন, একটু-একটু হেলে পড়া। দেখা যাচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৪৪-এ কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেবার আগে লেখা-শুরুর ১৫-১৬ বছরের মধ্যে মানিক তাঁর সেরা (অন্য কোনো শব্দ এক্ষুনি খুঁজে পাচ্ছি না বলেই এই পুরনো শব্দটি ব্যবহার করছি) লেখাগুলি লিখে ফেলেন। এর মধ্যে উপন্যাস-গল্প দুই-ই আছে। কিন্তু ১৯৪৪-এর পর তাঁর গুরুত্বপূর্ণ লেখা বলতে পাই, উপন্যাস নয়, গল্পই বেশি: ‘আজকাল পরশুর গল্প’, ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’, ‘হলুদ পোড়া’; উপন্যাসের মধ্যে দুই খণ্ডে‘সোনার চেয়ে দামী’, ‘চিন্তামণি’, হয়ত বা ‘দর্পণ’। ভালো-মন্দ রচনা দু-পর্বেই আছে। শেষপর্বের লেখায় দেখা দিচ্ছে নানারকম‘ম্যানারিজম’, অনেক লেখার ক্লান্তি, অভ্যাসে ভাসা-ভাসা লেখা, মনের মধ্যে বেড়ির মতো চেপে বসা চিন্তাভাবনা সৃজন-প্রক্রিয়ার নিপীড়ন। তেমনি প্রথম পর্বেও ছিল একধরনের কচ্লানি, ক্লিনিক্যাল মনোবিকলনের নাছোড় প্রবণতা। শেষ দিকে আরও দেখা দিয়েছিল শ্রেণীতত্ত্বে, শ্রেণীসংগ্রামে নিজের উপর নিজে চাপানো আস্থায় ইচ্ছাপূরণের চরিত্র আর ঘটনার সৃষ্টি করা। সব মিলিয়েই মানিক। লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই কমিউনিস্ট হয়েছিলেন, ফ্রয়েডিয় তত্ত্ব, মার্কসিয় দর্শন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই গ্রহণ করেছিলেন। এই সব তত্ত্ব তাঁকে অধিকার করে লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বানায়নি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন