রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে'র গল্প : মিশিগানের বুকে

অনুবাদ : আফসানা বেগম

জিম গিলমোর হর্টসন বে থেকে ক্যানাডায় এসেছিল। কামারের দোকানটা সে কিনেছিল বুড়ো হর্টনের কাছে থেকে। কালোমতো ছোটোখাটো জিমের ছিল লম্বা হাত আর চওড়া মোচ। তাকে দেখতে কামারের চেয়ে ঘোড়ার পায়ে নাল লাগানোর মানুষের মতোই লাগত বেশি, এমনকি তার গায়ে চামড়ার অ্যাপ্রনটা থাকলেও। সে থাকত কামারের দোকানটার উপরের তলায় আর সামনের রেস্তোঁরা, ডি জে স্মিথে খাবার খেয়ে নিত।

লিজ কোটস, স্মিথের রেস্তোঁরায় কাজ করত। মিসেস স্মিথ, যে কিনা বিশালদেহী আর পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে এক মহিলা, বলতেন, লিজ কোটস হলো গিয়ে পরিচ্ছন্নতায় তার দেখা সবচেয়ে পারদর্শী মেয়ে। লিজের সুন্দর পা দুটো বরাবর ছাপা সুতি কাপড়ের অ্যাপ্রনে ঢাকা থাকত। জিম লক্ষ করেছে তার চুলগুলোও থাকত পিছনে গুছিয়ে বাঁধা। লিজের হাসিখুশি মুখ জিম বরাবর পছন্দ করত তবে তাকে নিয়ে এর বেশি কিছু ভাবেনি কখনো।

লিজ অবশ্য জিমকে খুব পছন্দ করত। জিম যেভাবে দোকান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটা ধরত, সেই ভঙ্গিটা তাকে আকর্ষণ করত। জিম রাস্তায় বেরোলো কি না দেখার জন্য প্রায়ই সে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি দিত। জিমের মোচটা তার ভালো লাগত। হাসার সময়ে জিমের অতিরিক্ত সাদা দাঁতের ঝলকানি দেখতেও তার বেশ লাগত। জিমকে যে কোনো দিক দিয়েই একজন কামারের মতো দেখতে নয়, এই বিষয়টি লিজের দারুণ লাগত। ডি জে স্মিথ আর মিসেস স্মিথ জিমকে এত পছন্দ করে তা ভাবলেও লিজের ভালো লাগত। একদিন লিজ ভেবে অবাক হলো যে জিমের শক্ত বাহুর উপরে কালো লোমগুলোকেও সে কত পছন্দ করে! বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে হাত ধোয়াধুয়ির সময়ে বরাবরের উন্মুক্ত অংশ ছাড়া জিমের হাতের বাকি লোমগুলো যে এত সাদা দেখায়, তা দেখেও লিজ বিস্মিত হলো। এরকম একটা বিষয় নিয়ে ভালো লাগা তৈরি হওয়াতে লিজের নিজের কাছেই ভারি অদ্ভুত লাগল। 

হর্টসন বে-র ওই জায়গাটা ছিল এমন যেখানে বয়ন আর শারলেভইক্স শহরের মধ্যেকার বড়ো রাস্তার পাশে মাত্র পাঁচটা বাড়ি। স্মিথের, স্ট্রাউডের, ডিলওয়ার্থের, হর্টনের আর ভ্যান হুসেনের বাড়ি ছাড়াও, সেখানে ছিল বড়ো একটা দোকান আর পোস্ট অফিস। সেসবের সামনে উঁচু পাঁচিল। কখনো সামনে একটা-দুটো ওয়াগন বাঁধা থাকত। চারদিকে দেবদারু গাছে ঘেরা ছায়া সুনিবিড় পরিবেশে পাঁচটা বাড়ি দাঁড়িয়ে থাকত। বাড়িগুলোর সামনের রাস্তাটা বালুময়। সেই পথ ধরে সামনে-পিছনে যে কোনো দিকে এগোলেই খামার আর কাঠের কারখানা চোখে পড়ত। রাস্তা ধরে উপরের দিকে গেলে মেথোডিস্ট চার্চ আর উলটো নীচের দিকে নামলে টাউনশিপ স্কুল। জিমের কামারের দোকানটা ছিল লাল রঙের আর স্কুলের দিকে মুখ করা।

কাঠের কারখানার মাঝখান দিয়ে বালুতে ঠাসা রাস্তাটা খাড়া নেমে গেছিল সমুদ্রের দিকে। স্মিথের বাড়ির পিছনের দরজায় দাঁড়ালে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে লেক হয়ে নীচের দিকে সমুদ্রের তীর অব্দি দৃষ্টি প্রসারিত হতো। বসন্ত আর গ্রীস্মকালে ওই দিককার দৃশ্যটা দারুণ লাগত। সমুদ্রের দিকটা উজ্জ্বল নীল। অন্যদিকে, শারলেভইক্স আর মিশিগান থেকে প্রবাহিত বাতাসে লেকের পানির উপরিভাগ ফেনায় ফেনায় সাদা। স্মিথের বাড়ির পিছনের দরজায় দাঁড়িয়ে লেকের উপরে ছোটোখাটো জাহাজগুলোকে বয়ন শহরের দিকে রওনা দিতে দেখতে পেত লিজ। সে যখন জাহাজগুলোর দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকত, মনে হতো তারা স্থির দাঁড়িয়ে আছে, এতটুকু নড়ছে না। কিন্তু দেখা বাদ দিয়ে ভিতরে গিয়ে আরো কিছু বাসন মেজেঘষে আবার সেখানেই এসে দাঁড়ালে জাহাজগুলোকে আর দেখতে পেত না। ততক্ষণে তারা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যেত। 

তখন সবটা সময় লিজ কেবল জিমের কথাই ভাবত। অবশ্য জিম তাকে খুব একটা নজর করত বলে মনে হতো না। নিজের দোকান থেকে শুরু করে সে ডি জে স্মিথের রেস্তোঁরা, এমনকি রিপাবলিকান পার্টি কিংবা জেমস জি. ব্লেই নিয়েও গল্প করত। সন্ধ্যা হলে সে বাইরের দিকের ঘরের বাতির পাশে বসে মনোযোগ দিয়ে দ্য টলেডো ব্লেড অথবা গ্র্যান্ড র‌্যাপিডস পত্রিকা পড়ত। কখনোবা সন্ধ্যার পরপর হাতে বড়ো একটা বাতি ঝুলিয়ে স্মিথের সঙ্গে সমুদ্রের তীরে চলে যেত বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে। সেবারে শরৎ কাল এলে সে স্মিথ আর শারলে ওয়াইম্যানের সঙ্গে একটা ওয়াগনে করে রওনা দিল। যাবার সময়ে তারা তাবু, খাবারদাবার, কুড়াল, নিজেদের রাইফেল আর দুটো কুকুরকে সঙ্গে নিল। আর তারপর চলে গেল পাইন গাছময় সমতল এলাকাটা ছাড়িয়ে ভ্যানডারবিল্ট পেরিয়ে তারা চলে গেল হরিণ শিকারে। রওনা দেবার আগে লিজ আর মিসেস স্মিথ, দুজনে মিলে তাদের জন্য চার দিনের খাবার রান্না করে দিয়ে দিল। লিজের ইচ্ছে ছিল জিমের জন্য আলাদা করে বিশেষ কিছু রান্না করে দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিসেস স্মিথের ভয়ে তা করতে পারল না। আলাদা কিছু রান্নার জন্য মিসেস স্মিথের কাছে বাড়তি ডিম আর ময়দা চাইতে তার লজ্জা লাগল। নিজেই অবশ্য সেসব কিনে এনে রাঁধতে পারত, কিন্তু রান্নার মাঝপথে মিসেস স্মিথ তাকে ধরে ফেললে কী বলত সেটাও ভেবে পেল না। ধরে ফেললেও মিসেস স্মিথ হয়ত তা স্বাভাবিকভাবে নিতেন, কিন্তু তারপরেও লিজের সেটা ভেবে আতঙ্ক লাগল বলে তেমন কিছু করতে গেল না।। 

জিম যত দিন হরিণ শিকারে ব্যস্ত থাকল, লিজ তার কথা ভাবতে লাগল। জিম চলে যাওয়াতে তার চারপাশটা বিষণ্ণতায় ভরে গেল। জিমকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে লিজের ঘুম হারাম হয়ে গেল। আবার দেখল যে জিমকে নিয়ে লাগাতার ভাবাটাও অদ্ভুত মজার এক ব্যাপার। নিজেকে ভাবনার হাতে ছেড়ে দেয়া চমৎকার এক প্রশান্তির। জিম ফিরে আসার আগের রাতে লিজ দু’চোখের পাতা এক করতে পারল না। কিংবা তার মনে হলো যে সে মোটাও ঘুমায়নি, কারণ, ভাবনা আর ঘুমিয়ে থাকা নাকি থেমে থেমে স্বপ্ন দেখা-- সবকিছু মিলিয়ে তার মাথার মধ্যে গ-গোল পাকিয়ে গেল। লিজ যখন উঁচু রাস্তা থেকে তাদের ওয়াগনটাকে বাড়ির দিকে নেমে আসতে দেখল, তার শরীরটা কেমন অবশ অবশ লাগল। মনে হলো ভিতরে ভিতরে সে যেন অসুস্থ। জিমকে দেখার জন্য তার আর তর সইছিল না। মনে হলো কেবল জিমকে এক নজর দেখলেই সে সুস্থ হয়ে যাবে। বাড়ির সামনে বিশাল দেবদারু গাছের নীচে একসময় ওয়াগনটা এসে দাঁড়াল। লিজ আর মিসেস স্মিথ বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। গাড়ি থেকে নেমে আসা প্রত্যেকের মুখে দাড়ি হয়ে গেছে ততদিনে। ওয়াগনের পিছনে দেখা গেল শিকার করা তিনটা হরিণ। পিছনের বাকসোটার বাইরে হরিণগুলোর সরু পা বেরিয়ে ছিল। মিসেস স্মিথ মিস্টার স্মিথকে চুমু খেলে মিস্টার স্মিথ তাকে জড়িয়ে ধরলেন। জিম এগিয়ে এসে বলল, ‘হ্যালো, লিজ।’ জিম হাসলও খানিকটা। লিজ জানত না জিম ফিরে এলে ঠিক কী হবে, তবে তার মন বলছিল যে কিছু একটা নিশ্চয় হবে। অবশ্য তেমন কিছুই হলো না। লোকগুলো কদিন বাদে ঠিকঠাকমতো বাড়ি ফিরে এল, এই যা। ওয়াগনের পিছনে ঢাকনা দেয়া বস্তাগুলো জিম টান মেরে সরাতে লাগল। উন্মুক্ত হরিণগুলোর দিকে লিজ তাকিয়ে থাকল। একটা ছিল খুবই বড়ো, শক্ত হয়ে সেঁটে ছিল ওয়াগনের মধ্যে। ওটাকে ওয়াগন থেকে নামাতে বেশ অনেকটা টানাহেঁচড়া করতে হলো।

“এটাকে কি তুমি গুলি করেছিলে, জিম?” লিজ জানতে চাইল।

“হ্যাঁ। কী, হরিণটা চমৎকার না?” জিম ওটাকে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পিঠে ঝোলাল।

শারলে ওয়েইম্যান রাতের খাবার খাওয়ার জন্য স্মিথের ওখানে থেকে গেল। শারলেভইক্সে ফিরে গিয়ে খাবার খেতে গেলে অনেক রাত হয়ে যাবে। তাই তারা সবাই হাতমুখ ধুয়ে সামনের দিকের ঘরটাতে খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। 

“গাড়িতে এখনো ওটার খানিকটা পড়ে আছে না, জিমি?” ডি জে স্মিথ জানতে চাইল। জিম বাইরে বেরিয়ে আস্তাবলের দিকে এগোল। তারপর সেখানে রাখা ওয়াগনটা থেকে হুইস্কির জার বের করে নিয়ে আসল। শিকারে যাবার সময়ে জারটা ভরে নিয়ে গিয়েছিল তারা। ওটা ছিল চার গ্যালন হুইস্কি ধরার মতো বিশাল এক জার আর তখন তলানির অল্প একটু হুইস্কি ওপর-নীচে ছোটাছুটি করছিল। জারটা টেনে নিয়ে স্মিথের ঘর পর্যন্ত আসতে জিমের বেশ কষ্ট হলো। বিশাল ওই জারটা উপুড় করে সেখান থেকে ঢেলে খাওয়াটাও বিরাট এক কসরতের ব্যাপার। আর তা করতে গিয়ে জিমের শার্টের সামনে দিকে কিছুটা হুইস্কি ছলকে পড়ে গেল। হুইস্কির অপেক্ষায় বসে থাকা দুজন জিমের অবস্থা দেখে হেসে ফেলল। ডি জে স্মিথ হুইস্কির জন্য গ্লাস চাইলে লিজ গিয়ে গ্লাস নিয়ে এল। ডি জে তাদের তিনজনের জন্য গ্লাস ভরে ঢালল। 

“যা হোক, তোমার জন্যই চমৎকার একটা শিকারে যাওয়া হলো, ডি জে,” শার্লে ওয়াইম্যান বলল।

“শেষের হরিণটা কিন্তু ভীষণ বড়োসড়ো, জিমি,” ডি জে উত্তর দিল।

“তবে যে কটাকে আমরা ধরতে ব্যর্থ হয়েছি, এই গ্লাস তাদের কথা মনে করে, ডি জে,” গলায় হুইস্কি ঢালতে ঢালতে বলে উঠল জিম।

“এই হুইস্কির স্বাদটা যে কোনো পুরুষের ভালো লাগার মতো।”

“একদম। বছরের এই সময়টাতে তোমার যাবতীয় যন্ত্রণায় মলম লাগাতে এর উপরে আর কিছু নেই।”

“আরেকজন কই, বলো তো?”

“আরে বাদ দাও, আমাকে দেখ কত্ত মজা করে খাচ্ছি, ডি জে।”

“পরেরবারে ওই ছোট্ট নদীটার ধারে যাব, বুঝলে?”

“নিশ্চয়, আগামি বছরে।”

জিমের খুব ভালো লাগল। হুইস্কির স্বাদ আর খাওয়ার পরে শরীরে ছড়িয়ে যাওয়া অনুভূতিটা সে পছন্দ করে। আরামদায়ক বিছানা আর গরম গরম খাবারের কাছে, সবচেয়ে বড়ো কথা নিজের দোকানটাতে ফিরে আসাতে তার আনন্দ হলো। সে আরেক গ্লাস হুইস্কি ঢেলে নিল। রাতের খাবারের জন্য একসাথে যারা বসল, প্রত্যেকেই হাসাহাসি করার মানসিকতায় ছিল কিন্তু ভাব দেখাল খুব গম্ভীর। টেবিলে খাবার দেয়া হয়ে গেলে লিজ সেখানেই বসল। উপস্থিত সবার সঙ্গে খাওয়াটা সেরে নিল। সেদিন রাতের খাবার খুব ভালো হয়েছিল। লোকেরা পেট পুরে খেল। রাতের খাবারের পরে তারা আবার বসার ঘরে গিয়ে বসল। লিজ তখন মিসেস স্মিথের সঙ্গে মিলে বাসনকোসন পরিস্কার করে ফেলল। কাজ শেষ হলে মিসেস স্মিথ উপরের তলায় চলে গেলেন। খানিক বাদে মিস্টার স্মিথও উপরে রওনা দিলেন। জিম আর শার্লে তখনো বাইরের ঘরে বসে ছিল। লিজ রান্নাঘরে চুলার পাশে বসে জিমের কথা ভাবতে ভাবতে একটা বই পড়ার ভান করছিল। লিজের অত তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যেতে ইচ্ছে করেনি কারণ সে জানত যে জিম একসময় ওই ঘর থেকে বেরিয়ে আসবে আর লিজ তখন তাকে ভালোমতো দেখবে। জিম না থাকার সময়টাতে যেমন তাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল, তাই তখন আর দেখার সুযোগ হারানো যায় না। তারপর লিজ জিমের পিছুও নিতে পারে জিম বিছানায় যাওয়া পর্যন্ত। 

লিজ গভীর মনোযোগ দিয়ে জিমের কথা ভাবছিল, আর তখনই জিম বসার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। জিমের চোখগুলো চকচক করছিল। তার চুলগুলো খানিকটা কোঁকড়ানো। লিজ দ্রুত তার হাতের বইয়ে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করল। জিম তার চেয়ারের ঠিক পিছনে এসে দাঁড়াল। এতটাই কাছে যে লিজ জিমের নিশ্বাস স্পষ্ট অনুভব করতে পারল। জিম পিছন থেকে তাকে লিজকে জড়িয়ে ধরল। জিমের সুঠাম বাহুর নীচে লিজের স্তনদুটি ফুলে-ফেঁপে উঠল। তার হাতের সামান্য নাড়াচাড়ায় লিজের স্তনের বৃন্তগুলো জেগে উঠল। লিজ ভয়ে কেঁপে উঠল। ওভাবে কেউ কোনোদিন তাকে ছুঁয়ে দেয়নি। আতঙ্কের মধ্যেও তার মনে বলে চলল, “সে আমার কাছে এসেছে। শেষপর্যন্ত সত্যিই সে আমার কাছে এসেছে!”

ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে লিজ বুঝতেই পারছিল না তার কী করা উচিত, তাই তার শরীরটা নিজের অজান্তেই শক্ত হয়ে এল। জিম তখন তাকে চেয়ারের সঙ্গে ঠেসে ধরে ক্রমাগত চুমু খেতে লাগল। জিমের ঠোঁটের ছোয়াটা এত তীক্ষè, এত ধারাল, এতটাই আঁটোসাটো যে লিজের মনে হলো সে যেন আর সহ্য করতে পারবে না। আর খানিক পরেই লিজের ভিতর থেকে কিছু যেন বদলে গেল যখন সেই একই তীক্ষè ছোঁয়া তার কাছে কোমল আর মধুর মনে হলো। জিম যখন তাকে চেয়ারের সঙ্গে আরো বেশি চেপে ধরল, লিজের মনে হলো সে যেন কিছু চায়, তখনই। অথচ জিম তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “চলো একটুখানি হেঁটে আসি।” 

রান্নাঘরের দেয়ালের হুকে ঝোলানো নিজের কোটটা নিয়ে নিল লিজ। তারপর দুজনে রওনা দিল। জিম তার শক্ত বাহুতে জড়িয়ে রাখল লিজকে। কয়েক পা হাঁটতেই বারেবার তারা থামল আর একে অন্যের শরীরে নিজেকে চেপে ধরতে লাগল। জিম তখন লিজকে ক্রমাগত চুমু খেতে লাগল। সে রাতে আকাশে চাঁদ নেই। বালুর রাস্তাটাতে তারা গোঁড়ালি ডুবিয়ে হাঁটতে থাকল। গাছে ছাওয়া রাস্তাটা ধরে এগোতে এগোতে তারা সমুদ্রের তীরের গুদাম পর্যন্ত চলে গেল। সমুদ্রের ফেনাগুলো স্তূপ হয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে তীরে এসে আঁছড়ে পড়ছিল। সমুদ্রের তীরের ওই অংশটায় ঘন কালো অন্ধকার। সেখানে তখন শিরশিরে ঠান্ডা অথচ জিমের সঙ্গে থাকার জন্য লিজ যেন ভিতর থেকেই উত্তপ্ত। গুদামের বেড়ে থাকা ছাদের নীচে তারা দুজনে বসল। জিম লিজকে নিজের দিকে টেনে নিল। লিজ ভয়ে কাঠ। জিমের একটা হাত লিজের কোলের উপরে। আরেকটা হাত ততক্ষণে তার জামার ভিতরে ঢুকে স্তনের উপর অস্থির ঘোরাফেরা করছে। লিজ আতঙ্কিত হয়ে গেল যে এরপর জিম না জানি কী করবে! আবার আতঙ্ক উপেক্ষা করে সে আরো বেশি করে নিজেকে জিমের দিকে ঠেলে দিল। জিমের যে হাতটা তার কোলের উপরে ভারি লাগছিল, সেটা তখন সেখান থেকে সরে গিয়ে লিজের পা বেয়ে ওঠা শুরু করল। তারপর আরো খানিকটা উঠে গেল। 

“আর না, জিম,” লিজ আঁতকে উঠল। জিমের হাত তখন পিছলে লিজের পায়ের আরো উপরের দিকে চলে গেল। “এটা ঠিক না, জিম, এটা ঠিক না।” না জিম আর না তার বড়োসড়ো ওজনদার হাতটা লিজের মুখ থেকে উচ্চারিত সতর্কবাণীর ধার ধারল। 

জায়গাটা খুব শক্ত যেখানে তারা বসে ছিল। জিম হঠাৎ কী এক উদ্দেশ্যে লিজের জামাটা তুলে ধরল। লিজ প্রচ- ভয় পেয়ে গেল কিন্তু যে কারণে জিম জামাটা সরিয়েছিল তাতে তারও সমর্থন ছিল। তার মনে হচ্ছিল অভিজ্ঞতাটা তাকে পেতেই হবে কিন্তু তা পাওয়া থেকে ভয়টাও কিছুতে কাটছিল না।

“বাদ দাও, জিম। তোমার এখন এটা করা উচিত না।”

“আমাকে করতেই হবে। আর আমি করছিও। তুমি ভালোমতোই জানো যে আমাদের করতেই হবে।”

“না না, আমরা এখনো এমন কিছুই করিনি, জিম। আমাদের করতেই হবে কেন! উহ্, এটা যে উচিত না। ওহ্, এত বড়ো আর খুব ব্যথাও দিচ্ছে যে। এমন কোরো না তুমি, জিম। জিম, কোরো না দোহাই লাগে। আহ্।”

গুদামের পাটাতনে হেমলক কাঠের তকতাগুলো খুবই শক্ত আর মসৃণও নয়। উপরে গুঁড়ো গুঁড়ো কাঠ লেগে ছিল। তার উপর শীত আর লিজের তুলনায় ইয়া ওজনদার জিম। জিম বেশ ব্যথা দিয়েছে তাকে। এক একসময় এতটাই কুঁকড়ে যাওয়ার মতো অস্বস্তি হচ্ছিল যে জিমকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিল সে। তারপর জিম একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। আর নড়ল না। লিজ কোনরকমে নানান কসরত করে জিমের শরীরের নীচ থেকে বেরিয়ে এসে বসল। শেষে দাঁড়িয়ে তার স্কার্টটা ঠিকঠাক করে নিল। গায়ের কোটটা ঝাড়ল আর চুল ভালোমতো গুছিয়ে নিল। জিম তার মুখটা সামান্য খোলা রেখে ঘুমিয়ে ছিল। লিজ জিমের মাথার কাছে ঝুঁকে এল। তার গালে একটা চুমু এঁকে দিল। জিম তখনো ঘুমে। লিজ জিমের মাথাটা দুহাতে সামান্য উঠিয়ে ধরে ঝাঁকাল। জিম মাথা ঘুরিয়ে নিয়ে ঢোক গিলল বারকয়েক। লিজ তখন কান্না শুরু করল। লিজ শক্ত পাটাতনের শেষ মাথায় চলে গেল। নীচের পানির দিকে তাকিয়ে থাকল। সমুদ্রের তীর থেকে ভেজা ভেজা বাতাস ভেসে আসছিল। তার তখন ভয়ানক শীত লাগতে শুরু করল। শীতে কাঁপতে কাঁপতে মনে হলো যা কিছু সে এতক্ষণ অনুভব করেছে, সব হাওয়া। জিম যেখানে শুয়ে ছিল, ধীর পায়ে লিজ সেখানে ফিরে এল। জিম তখনো ঘুমে, আরো বেশি করে নিশ্চিত হতে লিজ তাকে আরেকবার ধাক্কা দিয়ে দেখল। তারপর কাঁদতে শুরু করল। 

“জিম,” সে ডাকল। “জিম, ওঠো না, জিম।”

জিম কোনোরকমে একবার চোখ খুলল একটু তারপর আরো চেপে শরীরটা সংকুচিত করে ঘুমিয়ে পড়ল। লিজ নিজের গা থেকে কোটটা খুলে ঝুঁকে এল জিমের দিকে। কোট দিয়ে তাকে ঢেকে দিল। শরীরের চারপাশে কোটটা সাবধানে সুন্দর করে গুঁজে দিল। তারপর সে কাঠের পাটাতন থেকে উপরের দিকে বালুর খাড়া রাস্তাটায় এসে দাঁড়াল। বালু দলে দলে নিজের বিছানায় ঘুমানোর জন্য চলে গেল। জঙ্গল হয়ে সমুদ্রের তীর থেকে ঠান্ডা বাতাস বয়ে যেতে লাগল তখন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন