রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

কাজুও ইশিগুরো' র গল্প : পারিবারিক ভোজ


নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭; জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক কাজুও ইশিগুরো ,ইশিগুরো এখন পর্যন্ত ৮টি বই লিখেছেন যা এখন পর্যন্ত ৪০টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ২০০৮ সালে ‘দি টাইমস’-এর এক জরিপ মতে, ১৯৪৫ সালের পর ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবশালী ৫০ জনের মধ্যে তিনি ৩২তম |

--------------------------------------------------------------------

কাজুও ইশিগুরো-র গল্প্
পারিবারিক ভোজ" 
 অনুবাদ করেছেন - ফজল হাসান

ফুগু একধরনের সামুদ্রিক মাছ, যা জাপানের উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে পাওয়া যায় । এই মাছ খেয়ে আমার মা মারা গিয়েছেন । সেই থেকে এই ফুগু মাছ আমার জীবনে একটা বিশেষ ভূমিকা দখল করে আছে । মাছের যৌনাঙ্গের লালাগ্রন্থির দুটো ভঙ্গুর প্রকোষ্ঠের ভেতর একধরনের বিষ জমা থাকে । রান্নার আগে মাছ কাটার সময় এই দুটো প্রকোষ্ঠ অতি সাবধানে কেটে ফেলতে হয় । তা নাহলে মৃত্যু অনিবার্য । তবে দুঃখের বিষয় যে, আসলে বিষাক্ত এই প্রকোষ্ঠ দুটো পুরোপুরি ফেলা হয়েছে কি না, তা বলা খুবই মুশকিল । একমাত্র খাওয়ার সময় তা বোঝা যায় ।

ফুগুর বিষে আক্রান্ত হলে রোগী প্রচন্ড ব্যথায় কাতর থাকে এবং বেশীর ভাগ সময় মৃত্যু ঘটে । রাতের আহারে কেউ এই মাছ খেলে সারারাত ঘুমের ভেতর ব্যথা অনুভব করে । তখন সে কয়েক ঘন্টা প্রচন্ড ব্যথায় বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে এবং পরদিন সূর্য্য উঠার আগেই এই নশ্বর পৃথিবীর মায়া ছেড়ে না-ফেরার দেশে পাড়ি দেয় । যুদ্ধের পর জাপানীদের কাছে এই মাছ অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠে । তবে কঠিন আইন-কানুন প্রবর্তনের আগে লোকজন এই ফুগু মাছ কিনে এনে রান্নাঘরে কাটতো এবং রান্নার পর খাওয়ার জন্য বন্ধুবান্ধব এবং আশেপাশের প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রণ করতো ।

মায়ের মৃত্যর সময় আমি বাড়ীতে ছিলাম না, ছিলাম ক্যালিফোর্নিয়ায় । সেই সময় কোনো অজ্ঞাত কারণে মা-বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেকটা শিথীল ছিল । ফলে মায়ের মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল নই । তবে মায়ের মৃত্যুর দু’বছর পরে আমি যখন টোকিওতে ফিরে যাই, তখন পুরো ঘটনা জানতে পারি । কখনই আমার মা ফুগু মাছ খেতে পছন্দ করতেন না । অথচ এই ফুগু মাছ খেয়েই তার মৃত্যু হয়েছে । যাহোক, একবার তিনি এক বিশেষ অনুষ্ঠানে নিয়মের বাইরে গিয়েছিলেন এবং সেটাই তার কাল হয়েছে । পুরোনো এক স্কুল জীবনের বান্ধবী একবার মাকে দাওয়াত করেছিল এবং মা খুব ভয়ে ছিলেন যদি তিনি না করেন, তাহলে হয়তো তার বান্ধবী মনে কষ্ট পাবে । তিনি কোনোমতেই বান্ধবীর মনে কষ্ট দিতে চাননি । বিমানবন্দর থেকে কামাকুরা এলাকার বাড়ীতে যাওয়ার পথে গাড়ী চালানোর সময় বাবা আমাকে ঘটনার বিশদ বলেছেন । আমরা যখন বাড়ী পৌঁছি, তখন শরতের রৌদ্রকরোজ্জ্বল একটা সুন্দর দিন প্রায় শেষ হয়ে আসছিল ।

‘তুমি কি বিমানে কিছু খেয়েছিলে ?’ সহজত ভঙ্গিতে বাবা জিজ্ঞেস করেন । সেই সময় আমরা বাবার চায়ের ঘরের তাতামি মেঝেতে বসেছিলাম ।

‘ওরা আমাকে হালকা খাবার দিয়েছিল ।’

‘নিশ্চয়ই তোমার ক্ষুধা পেয়েছে । কিকুকো ফিরে এলেই আমরা খাবার খাবো ।’

আমার বাবা ছিলেন দুর্দান্ত একজন সুপুরুষ । তার থুতুনি ছিল বিশাল, পেটানো এবং ভুরু ছিল ভয়ঙ্কর কালো । অতীতের দিকে তাকালে এখন আমার মনে হয়, চৌ এন-লাইয়ের চেহারার সঙ্গে বাবার চেহারার সাদৃশ্য রয়েছে । তবে চৌ এন-লাইয়ের সঙ্গে বাবার এই তুলনা শুনলে তিনি কখনই উচ্ছ্বসিত হবেন না । কেননা বিশেষ করে বাবা তার শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত নির্ভেজাল সামুরাই রক্ত নিয়ে যারপরনাই গর্বিত । তার আটপৌড়ে উপস্থিতি খোশমেজাজী কায়দায় গল্প করার পরিবেশ তৈরী করে না, এমনকি আমরা যদি কোনো বিষয়ে চুড়ান্ত মতামত দিই, তাহলে তিনি সেটা অযথা যুক্তিতর্ক দিয়ে বাঁকা ভাবে ব্যাখ্যা করবেন । সত্যি বলতে কি, সেই সন্ধ্যায় আমি যখন তার মুখোমুখি বসেছিলাম, তখন অকস্মাৎ স্মৃতির পাতায় শৈশবের একটা ঘটনা ভেসে উঠে । ‘বুড়ো মহিলাদের মতো কথা বলার জন্য’ একবার তিনি আমার মাথায় আঘাত করেছিলেন । স্বাভাবিক ভাবেই বিমান বন্দরে পৌঁছানোর পর থেকে আমাদের আলাপচারিতার মাঝে প্রায়শই মৌনতা এসে পথ আগলে দাঁড়ায় ।

‘ব্যবসার খবর শুনে আমি খুবই দুঃখিত,’ একসময় আমি চারপাশের নীরবতাকে ভেঙে বললাম । তিনি জোরে মাথা নাড়েন ।

‘আসলে ঘটনা সেখানেই শেষ হয়নি । ব্যবসা শেষ হয়ে যাওয়ার পর ওয়াতানাবি আত্মঘাতি হয় । সে অপমান নিয়ে কিছুতেই বাঁচতে চায়নি ।’

‘তাই ।’

‘আমরা একসঙ্গে সতের বছর ব্যবসার অংশীদার ছিলাম । সে ছিল সত্য এবং ন্যায়পরায়ন একজন মানুষ । তার এই সৎ চরিত্রের জন্য আমি তাকে প্রচন্ড সম্মান করতাম ।’

‘আপনি কি পুনরায় ব্যবসা শুরু করতে চান ?’ আমি জিজ্ঞেস করি ।

‘আমি – আমি এখন অবসরে আছি । আমার বয়স হয়েছে । এখন নতুন কিছু শুরু করার মতো আমার শক্তি বা মনোবল নেই । ইদানিং ব্যবসার ধরণ পাল্টে গেছে । ভিনদেশীদের সঙ্গে ব্যবসা করতে হয় । শুধু তাই হয় । সবকিছুই তাদের মর্জি মতো হতে হয় । আমি বুঝতে পারি না, কেমন করে আমরা এই পরিস্থিতিতে এসে পৌঁছেছি । ওয়াতানাবিও বুঝতে পারেনি ।’

বলেই বাবা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়েন । তারপর নিজেকে স্বাভাবিক করে বাবা পুনরায় বললেন, ‘সে খুব ভালো মানুষ ছিল । ন্যায়নীতির মানুষ ।’

চায়ের ঘর থেকে বাগান স্পষ্ট দেখা যায় । আমি যেখানে বসেছি, সেখানে থেকে পুরনো আমলের পানির কুয়া ঠাহর করতে পারছি । ছেলেবেলায় এই কুয়াটা আমার কাছে ভূতুরে লাগতো । ওটা এখন গাছপালার ঝোপের আড়ালে সামান্য দেখা যায় । ইতিমধ্যে সূর্য্য অনেকটা পশ্চিমাকাশের নীচে নেমে গেছে এবং বাগানের অনেকটা অংশ ছায়ায় ঢাকা ।

‘আমি খুবই খুশী হয়েছি যে, তুমি ফিরে আসার জন্য মনঃস্থির করেছ,’ বাবা বললেন । একটু থেমে তিনি আরও বললেন, ‘আশা করি, নিশ্চয় অল্প কয়েকদিনের জন্য আসোনি ।’

‘ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে আমি এখনও সঠিক কিছু জানি না ।’

‘আমি অতীত ভুলে যেতে চাই । যদিও তোমার মা তোমার ব্যবহারে অসন্তুষ্ট ছিল, তবুও সে মনেপ্রাণে চেয়েছিল তুমি ফিরে আসো ।’

‘আপনার সমবেদনার জন্য আমি কৃতজ্ঞ । আমি তো বলেছি, ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে আমি এখনও কিছু জানি না ।’

‘এখন আমি বুঝতে পেরেছি, তোমার আসার পেছনে অন্য কোনো খারাপ মতলব নেই,’ বাবা বললেন । ‘অন্য অনেকের মতো, তোমাকে কেউ প্ররোচনা করেনি ।’

‘মনে হয় আমাদের প্রসঙ্গ পাল্টানো উচিত ।’

‘ঠিক আছে । আরও চা ঢালবো ?’

সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতর একটা মেয়েলী কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হতে থাকে ।

‘অবশেষে,’ বাবা উঠে দঁড়িয়ে বললেন, ‘কিকুকো এসেছে ।’

বছরের পর বছর ধরে আমাদের মতের অমিল থাকা সত্ত্বেও আমার এবং বোনের মধ্যে একটা সুসম্পর্ক রয়েছে । আমাকে দেখার পর সে এত বেশী খুশি হয়েছে যে, সে রীতিমতো স্তম্ভিত এবং বাকরুদ্ধ । যখন বাবা তাকে ওসাকা এবং তার ইউনিভার্সিটির পড়াশুনা নিয়ে প্রশ্ন করে, তখন তার স্বম্বিত ফিরে আসে । সে বাবার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব দেয় । তারপর সে আমার দিকে তাকিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন করে । কিন্তু তার চোখেমুখে একধরনের উৎকন্ঠা ফুটে উঠে । কেননা তার ভয় হচ্ছিল, প্রশ্ন করলে যদি কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয় । কিছুক্ষণ পরে কিকুকোর আসার আগের চেয়েও আমাদের কথাবার্তায় আরও বেশী ভাটা পড়ে । একসময় বাবা উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘আমাকে রান্নাঘরে খাবার তৈরী করতে হবে । যাহোক, আমি যদি তোমার মনে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকি, আমি দুঃখিত । আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো । কিকুকো তোমার দেখভাল করবে ।’

ঘর থেকে বাবা বেরিয়ে যাওয়ার পর কিকুকোর চোখেমুখে প্রসন্ন ভাব ফুটে উঠে । কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে উৎফুল্লতার সঙ্গে তার ওসাকার বন্ধু-বান্ধবী এবং পড়াশুনা সম্পর্কে তুমুল গল্প শুরু করে । তারপর হঠাৎ করে সে থেমে যায় এবং বাগানে যাওয়ার জন্য বারান্দায় এসে দাঁড়ায় । আমরা বারান্দার সেলফে রাখা পুরনো জুতা পায়ে দিয়ে বাগানে নেমে আসি । ইতিমধ্যে দিনের আলো প্রায় নিভে গেছে । চারপাশে হালকা অন্ধকার জমাট বাঁধতে শুরু করেছে ।

‘আধঘন্টা ধরে সিগারেটের জন্য আমার প্রাণটা হাঁসফাঁস করছ ।,’

বলেই কিকুকো কোনো সংকোচ কংবা দ্বিধা না করে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে তাতে অগ্নিসংযোগ করে ।

‘তাহলে তুমি সিগারেট খাও কেন ?’ আমি প্রশ্ন করি ।

কিকুকো ঘরের দিকে মুখ ফিরিয়ে কাঁধ নেড়ে শ্রাগ করার মতো বিশেষ ধরনের অঙ্গভঙ্গি করে । তারপর সে শব্দ করে হেসে উঠে ।

‘ওহ্, তাই !’ আমি বললাম ।

‘বলতে পারো ? এখন আমার একজন ছেলেবন্ধু আছে ।’

‘তাই ?’

‘আমি জানি না, কি করবো ? এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিইনি ।’

‘তা বোঝা যায় ।’

‘জানো, সে আমেরিকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছে । আমার পড়াশুনা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে আমাকে নিয়ে আমেরিকায় যেতে চায় ।’

‘তা বুঝতে পেরেছি । কিন্তু তুমি কি আমেরিকায় যেতে চাও ?’

‘আমরা যদি যাই, তাহলে দুজনে মিলে হিচ-হাইক করবো,’ কিকুকো আমার মুখের সামনে হাত তুলে বিশেষ কায়দায় বুড়ো আঙুল নাড়ায় । ‘লোকজন বলে, এটা নাকি সাংঘাতিক বিপদজনক । কিন্তু আমি ওসাকাতে করেছি এবং ভালোই লেগেছে ।’

‘তবে তুমি যদি মনঃস্থির করতে না পারো, তাহলে ?’

বাগানের মধ্যে আমরা একটা সরু পথ ধরে ধীর গতিতে হাঁটতে থাকি । এই সরু পথের শেষ প্রান্তে পুরনো আমলের আমাদের সেই কুয়া । আমাদের হাঁটার ফাঁকে কিকুকো অযথা ঘনঘন সিগারেট ফুঁকছিল ।

‘যাহোক, ওসাকাতে আমার অনেক বন্ধু-বান্ধবী জুটেছে । ওখানে আমি ভালোই আছি । জানি না, ওদেরকে ছেড়ে আমি আদৌ অন্য কোথাও যেতে পারবো কি না । আর সুইচি - ওকে আমি ভীষণ পছন্দ করি । কিন্তু এখনও আমি পুরোপুরি সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি যে, আমি ওর সঙ্গে আরো বেশী জড়িয়ে পড়বো, নাকি সরে যাবো । তুমি কি বুঝতে পারছো, আমি কি বলতে চাচ্ছি ?’

আমাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে কিকুকো হঠাৎ হাঁটার গতি সামান্য বাড়িয়ে দেয় এবং আমার আগে কুয়ার কাছে গিয়ে পৌঁছে ।

‘তোমার কি মনে পড়ে,’ আমি যখন কিকুকোর কাছে এসে পৌঁছি, তখন সে বললো, ‘তুমি বলতে এই কুয়া কেমন করে ভূতুরে হলো ?’

‘হ্যাঁ, আমার মনে আছে ।’

আমরা দু’জনেই কুয়ার দিকে তাকাই ।

‘মা সবসময় আমাকে বলতেন, এটা সেই শাক-সবজির দোকানের মহিলা, যাকে তুমি সেই রাতে দেখেছিলে,’ কিকুকো বললো । একটু থেমে সে কথার রেশ ধরে আরো বললো, ‘কিন্তু আমি মার কথা বিশ্বাস করিনি এবং কখনোই এখানে একাকী আসিনি ।’

‘মা একই কথা আমাকেও বলেছেন । তিনি আরো বলেছেন যে, মহিলা নাকি স্বীকার করেছিল, আসলে সে একটা ভূত । সে কোণাকুণি যাওয়ার জন্য আমাদের বাগানের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল । আমার মনে হয়, দেওয়াল টপকে যেতে তার অসুবিধা হয়েছিল ।’

কিকুকো খিকখিক করে হেসে উঠে । তারপর সে কুয়ার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ায় এবং বাগানের চারপাশে দ্রুত দৃষ্টি বুলিয়ে আনে ।

‘তুমি জানো, মা কখনই তোমাকে দোষারূপ করেননি,’ কিকুকো মোলায়েম স্বরে বললো । আমি চুপ করে থাকি ।

আমার নীরবতা দেখে কিকুকো পুনরায় বলতে শুরু করে, ‘মা সবসময় আমাকে বলতেন, দূর্ঘটনার জন্য বাবা কখনো মহিলা এবং তোমার বিচার সুষ্ঠভাবে করেননি । তিনি আরও বলেছেন, তারা কেন আমাকে কড়া শাসন করেছেন এবং আমার উপর বেশী নজর রেখেছেন । তাই তো আমি তাদের দৃষ্টিতে ভালো মেয়ে হয়েছি ।’

বলেই কিকুকো মুখ উঁচু করে উপরের দিকে তাকায় এবং তার চোখেমুখে একধরনের বিষণ্নতার ধূসর মেঘ এসে জমা হয় । কন্ঠস্বরে সহানুভূতির কয়েক টুকরো বরফকুচি মিশিয়ে সে স্বগোক্তির মতো করে বললো, ‘বেচারী মা ।’

‘হ্যাঁ, সত্যি, বেচারী মা ।’

‘তুমি কি ক্যালিফোর্নিয়া ফিরে যাচ্ছো ?’

‘আমি জানি না । ভেবে দেখবো ।’

‘ওর – ওর, অর্থাৎ ভিকির, কি হয়েছে ?’

‘সব শেষ হয়ে গেছে । এখন কিছুই নেই,’ আমি সাদামাটা ভাবে বললাম । তারপর চারপাশে ইতিউতি তাকিয়ে পুনরায় বললাম, ‘এখন ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতি আমার খুব একটা পিছুটান নেই ।’

‘তুমি কি মনে করো, আমি ওখানে যাই ?’

‘কেন নয় ? আমি জানি না । হয়তো তোমার ভালো লাগবে,’ বাড়ির দিকে তাকিয়ে আমি বললাম । তারপর প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য তাড়া দিয়ে বললাম, ‘চলো, ভেতরে যাই । রান্নাঘরে বাবাকে হাত দিই ।’

কিন্তু আমার বোন আরেকবার মুখ নীচু করে কুয়ার ভেতর তাকায় । ‘আমি কোনো ভূত দেখতে পাচ্ছি না,’ সে বললো । তার কন্ঠস্বর আশেপাশের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে ।

‘ব্যবসা মন্দা হওয়ার জন্য বাবা কি খুব কষ্ট পেয়েছেন ?’ আমি জিজ্ঞেস করি ।

‘জানি না । এ বিষয়ে তার সঙ্গে কোনো কথা বলা যায় না ।’

বলেই কিকুকো হঠাৎ আড়মোড়া ভাঙে এবং ঘুরে আমার দিকে মুখ করে পাল্টা প্রশ্ন করে, ‘তিনি কি বুড়ো ওয়াতানাবি প্রসঙ্গে কিছু বলেছেন ? সে কি করেছিল ?’

‘শুনেছি সে আত্মঘাতি হয়েছে ।’

‘কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয় । সে তার পুরো পরিবার, অর্থাৎ স্ত্রী এবং দুই মেয়ে, নিয়ে একসঙ্গে আত্মহত্যা করেছে ।’

‘ওহ্, তাই !’

‘মেয়ে দুটি পরীর মতো ফুটফুটে ছিল । ওরা যখন ঘুমিয়ে ছিল, তখন সে গ্যাস ছেড়ে দেয় । তারপর সে মাংস কাটার ছুড়ি দিয়ে নিজের পেট কাটে ।’

‘হ্যাঁ, বাবা বলছিলেন যে, ওয়াতানাবি একজন নীতিবান মানুষ ছিল ।’

‘অসহ্য,’ কিকুকোর চোখেমুখে প্রচন্ড বিরক্তির ভাব ফুটে উঠে । সে কুয়ার দিকে মুখ করে ঘুরে বসে ।

‘সাবধান । পড়ে যেতে পারো,’ আমি বললাম ।

‘আমি কোনো ভূত দেখতে পাচ্ছি না,’ সে বললো । ‘তুমি সবসময় আমার কাছে মিথ্যা বলো ।’

‘কিন্তু আমি কখনই বলিনি যে, কুয়ার ভেতর ভূত থাকে ।’

‘তাহলে কোথায় থাকে ?’

আমরা দু’জনে আশেপাশের গাছপালার দিকে তাকাই । বাগানের গাছের ফাঁকে আবছা অন্ধকার ছড়িয়ে আছে । একসময় আমি গজ দশের দূরে একটা খালি জায়গার দিকে আঙুল তুলি ।

‘আমি ওখানে দেখেছি । ঠিক ওখানে ।’

আমরা দু’জনেই সরু দৃষ্টি মেলে খালি জায়গার দিকে তাকাই ।

‘দেখতে কেমন ছিল ?’

‘আমি স্পষ্ট করে দেখতে পারিনি । তখন অন্ধকার ছিল ।’

‘কিন্তু নিশ্চয়ই তুমি একটা কিছু দেখেছিলে ।’

‘একজন বুড়ো মহিলা ছিলাম । সে ঠিক ওখানে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছিল ।’

তখনও আমরা সম্মোহিতের মতো খালি জায়গার দিকে তাকিয়ে থাকি ।

‘মহিলার পড়নে সাদা কিমোনো ছিল,’ আমি বললাম । ‘মহিলার মাথার চুল খোলা ছিল এবং কিছু চুল বাতাসে এলোমেলো উড়ছিল ।’

কিকুকো কনুই দিয়ে আমার হাতে খোঁচা দিয়ে বললো, ‘চুপ করো । আবার আমাকে ভয় দেখাচ্ছ ।’

বলেই সে সিগারেটের পোড়া অংশটা ছুড়ে ফেলে । তারপর সে উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙে এবং শরীরের ভাঁজে একধরনের স্বস্তির ভাব অনুভব করে । পা দিয়ে কয়েকটা পাইন গোটা লাথি মেরে মুখটা বাঁকা করে ভেংচি কাটে । ‘চলো, ভেতরে যাই । খাবার বোধহয় তৈরী হয়ে গেছে,’ সে বললো ।

তখনও বাবা রান্নাঘরে । পলকের জন্য একবার মাথা তুলে আমাদের দিকে তাকিয়ে তিনি পুনরায় কাজে মনোনিবেশ করেন ।

‘রান্নার কাজ করার সময় বাবা চুপচাপ থাকতে পছন্দ করেন,’ হাসতে হাসতে কিকুকো বললো । সেই সময় বাবা শান্ত-শীতল দৃষ্টিতে কিকুকোর দিকে তাকান ।

‘এ কাজের জন্য আমি রীতিমত গর্ব অনুভব করি,’ বাবা বললেন । ‘কিকুকো, এখানে এসে আমাকে সাহায্য করো ।’

কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার বোন একটুও নড়েনি । তারপর একসময় সে সামনের দিকে এগিয়ে যায় এবং দেরাজ থেকে একটা অ্যাপ্রোন বের করে গায়ে জড়ায় ।

‘এই সবজিগুলো রান্না করতে হবে,’ কিকুকোকে লক্ষ্য করে বাবা বললেন । ‘বাদবাকী রান্নার দিকে শুধু খেয়াল রাখতে হবে ।’

বলেই বাবা কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার দিকে তাকালন । ‘আমি আশা করেছিলাম, তুমি ঘুরে ঘুরে পুরো বাড়িটা দেখবে,’ অবশেষে তিনি মন্তব্যের সুরে বললেন । তারপর হাত থেকে চপস্টিকগুলো নামিয়ে রাখার সময় বললেন, ‘তুমি অনেকদিন আগে দেখেছিলে ।’

আমরা রান্নাঘর থেকে বেরোনোর সময় আমি মনের অজান্তে পেছন ফিরে কিকুকোর দিকে তাকাই । ও তখন পেছন ফিরে আছে ।

‘ও খুব ভালো মেয়ে,’ নরম গলায় বাবা বললেন ।

বাবার পেছনে পেছনে আমি এক ঘর থেকে অন্য ঘরে প্রবেশ করি । আমি ভুলেই গিয়েছিলাম আমাদের বাড়ীটা কত বড় । একটা দরজা খুললেই আরেকটা ঘর দেখা যায় । কিন্তু প্রতিটি ঘরই মোটামুটি ভাবে ফাঁকা । একটা ঘরে বাতি জ্বালানো হয়নি । বাইরে থেকে জানালা গলিয়ে ঈষৎ আলো এসে দেওয়ালের গায়ে ঠিকরে পড়েছে । আমরা সেই দেওয়ালের দিকে তাকাই ।

‘এই বাড়ীটা একজন মানুষের বসবাস করার জন্য অনেক বড়,’ হতাশার সুরে বাবা বললেন । ‘এখন প্রায় সবগুলো ঘরই আমি ব্যবহার করি না ।’

অবশেষে বাবা একটা বন্ধ ঘরের দরজা খোলেন । ঘরটা বই এবং কাগজপত্রে ঠাসা । এছাড়া ঘরর ভেতর ফুলদানিতে ফুল এবং দেওয়ালে ছবি টাঙানো । হঠাৎ ঘরের এক কোণায় একটা নীচু টেবিলের উপর আমার দৃষ্টি আটকে যায় । টেবিলের কাছে এসে আমি ভালো করে তাকিয়ে দেখি প্লাষ্টিকের একটা যুদ্ধজাহাজের প্রতিকৃতি । এই ধরনের প্রতিকৃতি সচরাচর ছোট ছেলেমেয়েরা তৈরী করে । প্রতিকৃতিটা একটা খবরের কাগজের উপর রাখা হয়েছে ।

হঠাৎ বাবা হেসে উঠলেন । তিনি টেবিলের কাছে এসে প্রতিকৃতিটা হাতে তুলে নেন ।

‘ব্যবসা লাটে উঠার পর থেকে আমার হাতে প্রচুর ফাঁকা সময় থাকে,’ বাবা বললেন । তিনি আবারও হাসতে থাকেন, কিন্তু এবারের হাসিটা অন্যরকম । মুহূর্তের মধ্যে তার মুখমন্ডল শান্ত হয়ে যায় । একসময় তিনি আপনমনে বললেন, ‘আরেকটু সময় ।’

‘মোটেও ঠিক না । আপনি তো সবসময় নিজেকে ব্যস্ত রাখেন ।’

‘হয়তো খুব ব্যস্ত ।’ বাবার ঠোঁটের ফাঁকে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠে । ‘বোধহয় আমাকে আরও বেশী ‘ভালো’ বাবা হওয়া উচিত ছিল ।’

আমি শব্দ করে হেসে উঠি । বাবা মনোযোগ দিয়ে প্লাষ্টিকের প্রতিকৃতি দেখতে থাকেন । তারপর তিনি উপরের দিকে তাকান । ‘আমি বিষয়টা তোমাকে বলতে চাইনি । তবে আমার মনে হয়, এখন বলার সময় হয়েছে । আমার বিশ্বাস, তোমার মা কোনো দূর্ঘটনায় মারা যায়নি । তার মাথায় অনেক দুশ্চিন্তা ছিল, এমনকি মনের ভেতর হতাশাও ছিল ।’

আমরা দু’জনেই প্লাষ্টিকের প্রতিকৃতি দেখতে থাকি ।

‘সত্যি,’ শেষপর্য্যন্ত আমি বললাম, ‘মা কোনোদিনও আশা করেননি যে, এই বাড়ী থেকে আমি চিরদিনের জন্য অন্য কোথাও চলে যাই ।’

‘স্বভাবতই তুমি বুঝবে না । তুমি এ-ও বুঝবে না, বিষয়টা অনেক বাবা-মার কাছে কতটুকু কষ্টকর । তারা শুধু সন্তানদের হারায় না, বরং এমন কিছু হরায়, যা তারা নিজেরাও বুঝতে পারে না,’ বাবা প্রতিকৃতিটা হাতে নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন । তারপর হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে তিনি বললেন, ‘আঠা দিয়ে এই ক্ষুদ্রাকৃতি গানবোটগুলো ভালো করে লাগানো দরকার, তাই না ?’

‘হয়তো । তবে মনে হয়, ঠিকই আছে ।’

‘যুদ্ধের সময় আমি এরকম একটা জাহাজে কাজ করেছি । কিন্তু সবসময় আমার উদ্দেশ্য ছিল বিমান বাহিনীতে কাজ করা । তোমার জাহাজ যদি প্রতিপক্ষের বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়, তখন বেঁচে থাকার একমাত্র পথ হচ্ছে সাঁতার কেটে কোনো খড়কুটার আশা করা । কিন্তু যুদ্ধ বিমানে – সবসময় একটা শেষ অস্ত্র থাকে,’ প্রতিকৃতিটা টেবিলের উপর রেখে বাবা বললেন । ‘আমার মনে হয় না, তুমি আদৌ যুদ্ধটুদ্ধ পছন্দ করো ।’

‘আলাদা ভাবে না ।’

বাবা দ্রুত ঘরের চতুর্দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে আনেন । ‘এতক্ষণে অবশ্য খাবার তৈরী হয়েছে,’ বাবা বললেন । ‘নিশ্চয়ই তোমার ক্ষুধা পেয়েছে ।’

রান্নাঘরের পাশের ঘরে আলো-আঁধারিতে টেবিলের উপর রাতের খাবার প্রস্তুত । ঘরের ভেতর আলোর একমাত্র উৎস হচ্ছে টেবিলের উপর ঝোলানো বিশাল লন্ঠন । তাই চারপাশ ছায়ায় ঢাকা । খাওয়া শুরু করার আগে নিয়ম অনুযায়ী আমরা একে অপরের দিকে কুর্নিশ করার মতো মাথা নোয়াই ।

খাবারের ফাঁকে আমাদের মধ্যে কদাচিৎ কথা হয় । আমি যখন খাবার সম্পর্কে হালকা মন্তব্য করি, তখন কিকুকো ফিকফিক করে হাসতে থাকে । আগের মতো তার চোখমুখে ঘাবড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি ফিরে আসে । অনেকক্ষণ বাবার মুখে কোনো কথা নেই । একসময় আমাকে উদ্দেশ্য করে বাবা বললেন, ‘নিশ্চয়ই জাপানে ফিরে আসাটা তোমার কাছে অদ্ভূত ঠেকছে ।’

‘হ্যাঁ, একটু তো পরিবর্তন লাগছেই ।’

‘ইতিমধ্যে আমেরিকার জন্য হয়তো তোমার মন খারাপ লাগছে ।’

‘সামান্য, বেশী না । আমি তেমন বিশেষ কিছু ফেলে আসিনি । শুধু কয়েকটি খালি ঘর ।’

‘ওহ্, তাই ।’

আমি টেবিলের উল্টো দিকে তাকাই । আলো-আঁধারিতে বাবার মুখটা কেমন যেন কঠিন দেখাচ্ছে । আমরা নিঃশব্দে খাবার খেতে থাকি ।

হঠৎ ঘরের শেষ প্রান্তে আমার দৃষ্টি আটকে যায় । তারপরেও আমি খেতে থাকি । কিন্তু একসময় আমার হাত অবশ হয়ে আসে । আমি হাত নাড়াতে পারি না । অন্যান্যরা আমার অসহায় অবস্থা বুঝতে পেরে হা করে চেয়ে আছে । আমি পলকহীন দৃষ্টি মেলে বাবার ঘাড়ের উপর দিয়ে উল্টোদিকের আবছা অন্ধকারের দেওয়ালের উপর তাকিয়ে থাকি ।

‘তিনি কে ? ছবিতে কে তিনি ?’

‘কোন ছবি ?’ বাবা শরীর খানিকটা ঘুরিয়ে আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে জিজ্ঞেস করেন ।

‘উল্টোদিকের দেওয়ালে টাঙানো নীচের ছবিটা । একজন মহিলা সাদা কিমোনো পড়ে আছেন ।’

বাবা হাত থেকে চপস্টিক নীচে নামিয়ে রাখেন । প্রথমে তিনি ছবিটা দেখলেন এবং তারপর আমার দিকে তাকালেন ।

‘তোমার মা ।’ বাবার কন্ঠস্বর অত্যন্ত ভারী শোনালো । ‘আশ্চর্য্য, তুমি কি তোমার নিজের মাকে চিনতে পারোনি ?’

‘আমার মা ! আবছা অন্ধকারে আমি ভালো করে দেখতে পাইনি ।’

কয়েক সেকেন্ড আমদের মুখে কোনো কথা নেই । একসময় কিকুকো উঠে দাঁড়ায় । তারপর সে দেওয়াল থেকে ছবি নামিয়ে আনে এবং টেবিলের কাছে ফিরে এসে আমার হাতে তুলে দেয় ।

‘ছবিতে তাকে অত্যন্ত বয়স্কা লাগছে,’ আমি বললাম ।

‘মৃত্যুর অল্প কয়েক দিন আগে তার এই ছবিটা তোলা হয়েছিল,’ বাবা বললেন ।

আমি লজ্জিত গলায় আবারও বললাম, ‘দেওয়ালের অন্ধকারে আমি স্পষ্ট দেখতে পাইনি ।’

আমি তাকিয়ে দেখি, বাবা একটি হাত প্রসারিত করে আছেন । আমি ছবিটা তার হাতে তুলে দিই । তিনি একবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে কিকুকোর দিকে এগিয়ে ধরেন । সুবোধ বালিকার মতো আমার বোন উঠে গিয়ে ছবিটা পুনরায় দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখে ।

টেবিলের মাঝখানে একটা বড় পাত্রের ঢাকনা এখনো খোলা হয়নি । কিকুকো যখন ফিরে এসে চেয়ারে বসে, তখন বাবা সামনের দিকে ঝুকে পাত্রের ঢাকনা খোলেন । ঢাকনা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই আটকে পড়া ধোঁয়া ভুস করে বেরিয়ে এসে লন্ঠনের চারপাশ ঘিরে ধরে । তারপর তিনি পাত্রটা আমার দিকে সামান্য ঠেলে দেন ।

‘নিশ্চয় তুমি ক্ষুধার্ত,’ বাবা বললেন । তার মুখের একদিক অন্ধকারে ঢেকে আছে ।

‘ধন্যবাদ,’ বলেই আমি চপস্টিক হাতে নিয়ে সামনের দিকে মুখ বাড়াই । ‘এটা কি ?’

‘মাছ ।’

‘গন্ধটা খুবই সুন্দর ।’

স্যুপের মধ্যে মাছের লম্বা টুকরা রান্নার পরে সংকুচিত হয়ে গোলাকার দেখাচ্ছে । আমি মাছের একটা টুকরা বাটির মধ্য তুলে নিই ।

‘নিজে তুলে নাও । প্রচুর খাবার আছে ।’

‘ধন্যবাদ ।’

বলেই আমি বাটিতে আরেকটু তুলে নিই এবং পাত্রটা বাবার দিকে এগিয়ে দিই । আড়চোখে লক্ষ্য করি তিনি কয়েক টুকরা মাছ তার বাটিতে তুলে নিলেন । তারপর কিকুকো ওর বাটিতে মাছের স্যুপ নেওয়ার সময় আমরা দু’জনে ওর দিকে তাকাই ।

বাবা মাথাটা সামান্য নীচু করেন । ‘নিশ্চয়ই তোমার ক্ষুধা পেয়েছে,’ তিনি পুনরায় বললেন । তিনি বাটি থেকে মাছের খানিকটা মুখে তুলে নিয়ে খেতে শুধু করেন । আমিও এক টুকরা মাছ মুখে দিয়ে চিবোতে শুরু করি । মাছটা নরম এবং আমার জিহ্বার নীচে আমি টের পাই ।

‘খুবই সুস্বাধু,’ আমি বললাম । ‘কি মাছ ?’

‘শুধু মাছ ।’

‘সত্যি, খুব মজা হয়েছে ।’

আমরা তিনজনে নিঃশব্দে খেতে থাকি । এরই মাঝে কয়েক মিনিট কেটে গেছে ।

‘আরেকটু নাও ।’

‘আরও আছে ?’

‘আমাদের জন্য প্রচুর আছে,’

বলেই বাবা পুনরায় পাত্রের ঢাকনা তোলেন এবং আবারও ভুস করে ধোঁয়া বেরিয়ে আসে । আমরা সবাই সামনের দিকে ঝুকে যার যার বাটিতে আরও স্যুপ তুলে নিই ।

‘এই শেষ টুকরা আপনার জন্য,’ আমি বাবাকে বললাম ।

‘ধন্যবাদ ।’

আমাদের খাওয়া শেষে বাবা দু’পাশে দু’হাত মেলে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙেন এবং আত্মতৃপ্তির সঙ্গে গভীর হাই তোলেন ।

‘কিকুকো,’ আমার বোনকে ডেকে বাবা বললেন, ‘দয়া করে আমাদের জন্য এক পাত্র চা বানাবে ।’

আমার বোন বাবার দিকে তাকায় এবং কোনো টুঁ শব্দ না করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় । একসময় বাবা উঠে দাঁড়ালেন ।

‘চলো, অন্য ঘরে যাই । এই ঘরে ভীষণ গরম ।’

আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে বাবাকে অনুসরণ করি এবং আমরা বসার ঘরে এসে বসি । বিশাল টানা দরজা খোলা । বাগান থেকে হুড়মুড় করে বাতাস এসে ঢুকছে । কয়েক মুহূর্ত আমরা চুপচাপ বসে থাকি ।

‘বাবা,’ অবশেষে আমি মৌনতাকে ভেঙে ডাকলাম ।

‘হ্যাঁ, বলো ।’

‘কিকুকো বলেছে, ওয়াতানাবি-স্যান সপরিবারে আত্মহত্যা করেছে ।’

বাবা মুখ নীচু করে হ্যাঁ-সূচক ভঙ্গিতে মাথা দোলান । কয়েক মুহূর্ত তিনি গভীর চিন্তায় ডুবে যান । ‘ওয়াতানাবি কাজে খুবই নিষ্ঠাবান ছিল,’ শেষপর্য্যন্ত বাবা মুখ খোলেন । ‘ব্যবসায় ধ্বস নামার পরই সে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে । আমার মনে হয়, সে ভুল বুঝেছে ।’

‘তাহলে আপনি কি মনে করেন, সে যা করেছে, ভুল করেছে ?’

‘কেন, অবশ্যই । তুমি কি অন্য কিছু ভাবছ ?’

‘না, না । অবশ্যই অন্য কিছু ভাবছি না ।’

‘কাজ ছাড়া আরও অন্য বিষয় আছে ।’

‘হ্যাঁ ।’

আমাদের মাঝে আবার মৌনতা এসে ভীড় করে । বাগান থেকে পোকামাকড়ের পাখা ঝাপটানোর শব্দ ভেসে আসছে । আমি অন্ধকারের দিকে তাকাই । কুয়া দেখা যাচ্ছে না ।

‘তুমি এখন কি করবে, কিছু ভেবেছ ?’ বাবা জিজ্ঞেস করেন । ‘তুমি কি কিছুদিন জাপানেই থাকবে ?’

‘সত্যি বলতে কি, এখনও আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত কিছু ভাবিনি ।’

‘তুমি যদি এখানে, অর্থাৎ এই বাড়ীতে, থাকতে চাও, আমার কোনো অসুবিধা নেই । তবে তুমি যদি একজন বুড়ো লোকের সঙ্গে থাকতে আপত্তি না করো, তাহলে অনায়াসে থাকতে পারো ।’

‘ধন্যবাদ । এ বিষয়ে আমি ভেবে দেখবো ।’

আমি আরেকবার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাই ।

‘কিন্তু অবশ্য,’ বাবা বললেন, ‘এ বাড়ী এখন বিষণ্ণ বাড়ী । কোথাও আনন্দের লেশটুকু নেই । তবে সন্দেহ নেই, তুমি একদিন আবার আমেরিকায় ফিরে যাবে ।’

‘হয়তো । কিন্তু এখনও আমি নিশ্চিত নই ।’

‘একদিন ঠিকই চলে যাবে ।’

বেশ অনেকক্ষণ বাবা তার হাতের উল্টোদিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবলেন । তারপর তিনি মাথা তুলে আমার মুখর দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন ।

‘আগামী বসন্তে কিকুকোর পড়াশুনা শেষ হয়ে যাবে,’ বাবা বললেন । ‘তারপর সে হয়তো এখানে ফিরে আসবে । ও খুব ভালো মেয়ে ।’

‘হয়তো সে ফিরে আসবে ।’

‘তখন হয়তো পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে ।’

‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয় ।’

আমরা আরেকবার মৌনতার গভীরে আকন্ঠ ডুবে যাই এবং কিকুকোর চা নিয়ে আসার দীর্ঘ প্রতীক্ষায় বসে থাকি ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন