রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

শিপা সুলতানার গদ্য : মানবগ্রন্থ

...কিছু লিখি!

যা ইচ্ছা। যা ইচ্ছা মানে- গল্প, ডায়েরি, প্রিয়/সদ্য পড়া কোনো বই নিয়ে অনুভূতি।

কিন্তু কেনো লিখবো ভাবলাম এখন। লিখলে প্রিয় উপন্যাস নিয়েই লিখতাম কিন্তু কেনো লিখবো তোমার উপন্যাস নিয়ে। সেই উপন্যাসে কি আমার কথা, আমার কথা মানে তোমার মায়ের কথা আছে? বান্ধবী? বোন? ভাবীর কথা?
কেনো আমি বারে বারে তোমার কথাই লিখবো! শত শত বছর থেকে তুমি লিখে যাচ্ছ তোমার কথা, আমার কথা কোথায়!

তুমি নারীগমণ করছো, তোমার ক্লান্তি ঝেড়ে আসছো, কিন্তু দশজনের মতো তুমি আমাকে গালি দিতে কুন্ঠাবোধ করছো না। শূড়িখানায় বসে মাল টানতে টানতে তুমি বিরাট কামেল উপন্যাসখানা ফাঁদলে, আমার কথা কই? গাছপালা, পাখ পাখালি, শিশির, সোনালী ডানার চিল, প্রথম কদম ফুল, বরষা, মাধবীলতা নিয়ে হাজার পৃষ্টা যে ভরিয়ে তুললে, সেখানে আমি কই? আমি মানে ব্রম্মা, ব্রম্মা মানে জন্মদাত্রী, তোমার জন্মের কথা কই? তবে কেনো আমি লিখে যাব লিখেই যাব কোন ফর্মে কি উপন্যাস লিখেছ তুমি, কোন কোন জায়গায় হুতিয়ে দিয়েছ ওমুক তমুককে। কোন ছন্দে লিখেছ, অক্ষরবৃত্তে না মাত্রবৃত্তে, মধ্যযুগ না প্রস্তরযুগ, আধুনিক না উত্তরাধুনিকদের কাইত করে দিয়েছ তুমি। কেনো জগতের সবাই, সবকিছু আছে তোমার কলমের আগায়, আমার কথা নেই কেনো! এই কেনো যাতে প্রশ্ন না তুলি, তাই তুমি আমার লিখে যাচ্ছ শরীর, আমার কোমরের মাপ, বুকের গড়ন, চলার ধরন, আমার চোখ তোমার চোখে পড়ে, আমার চিরল হাসি, আমার ছলাকলা, আমার নিপুন ভঙ্গি, কিন্তু আমি কই? আমি কেনো নাই তোমার সাহিত্যে? আমি মানে আমার থেকে তোমার জন্মের কথা, আমার বিগব্যাং পিরিওডের কথা কেনো তুমি লিখো নি? কেনো আমি যখন লিখি, কেনো ভাবি যে আমার কথা লিখলে তোমাকে করুণা করা হবে, তুমি মাথা নত করে ফেলবে, তুমি বেদনাক্রান্ত হবে ভেবে আমি কেনো আমার কথা না লিখে হাওয়া বাতাসের কথা লিখি। আজ যদি লিখি, আজ যদি তোমার কথা, তোমার শৌর্যবীর্যের কথা, তথাকথিত পুরুষবন্দনা না লিখে আমার কথা লিখি, মানবগ্রন্থের কথা লিখি, তুমি পড়বে? পড়তে তোমার গন্ধ গন্ধ লাগবে, ভয়ে বমি বমি ভাব হবে তাই এড়িয়ে যাবে, সম্পাদককে লেখাটি তুলেও দিতে বলতে পারো, তবু আমি লিখবো। না পড়লে নাই, তবু আমি মানবের কথা লিখবো, লিখবো আমার ভেতর থেকে কীভাবে তুমি লিখতে শিখলে, তুমি কীভাবে আমার কথা না লিখেই জগতে পাঠশ্য হয়ে রইলে, তুমি করুণ হলেও আমি লিখবো, না পড়লে নাই…

আমি লিখতে চাই আমার মায়ের অসুখ, মাকে দেখতে যাবো কিন্তু পারবো না, আমি এভাবে জার্নি নিতে পারবোনা। আমার ভেতরের তুমি বিপদগ্রস্ত হবে। তুমি আমার ভেতরে এলেই আমার রক্তপাত বন্ধ হয়না। সামান্য নড়লে রক্ত, বমি করলে রক্ত, জোরে হাঁটলে রক্ত, দিনে দুই তিনবার রক্ত দেখে আমি আৎকে উঠি, তুমি ভাল আছ তো! এ রক্ত তোমার শরীরের নয়তো। হার্টবিট ফার্স্ট হয়ে যায় দশমাস, তোমার কোনো ক্ষতি হবে না তো? তুমি ডানপাশে লাথি মারো, হাত বুলিয়ে পাশ ফিরে বসি, তুমি তখন বামে লাথি দিলে, তুমি দিলে কলিজা বরাবর লাথি, জগত অন্ধকার হতে হতে কিছু একটা ধরে ফেলি যেনো পড়ে গেলে তোমার কষ্ট না হয়। হাঁটতে হাঁটতে ট্রাফিক সিগনালে আটকে পড়ি। সত্য নয় তবু মনে হয় দুই পায়ের ফাঁকে নেমে এসেছ তুমি, না হয় তোমার একটি হাত, একটি কচি পা, যদি তুমি ব্যথা পাও নড়লে, ফের রেড লাইল জ্বলে উঠে, হর্নের পর হর্ন বাজে, আজরাইলের মতো লরি দেখে চমকে উঠি তবু নড়তে পারিনা, ফের গ্রিন লাইট জ্বলে উঠে, দু পায়ের ফাঁকে এমন ভাবে হাত রাখি, যেন তুমি খেলতে খেলতে নেমে এলেও ভয় না পাও। তুমি কি জানো সেই চোখের জলের ভার কতো? তুমি তার একফোটা লিখেছ তোমার মহান কাব্যে? তোমার কবিতা মানে তোমার প্রসব, একেকটি কাব্যগ্রন্থ তোমার সন্তান। তোমার লজ্জা করে না এই কথা বলতে? মোটেও লজ্জা করেনা এমন হাস্যকর কথা লিখতে? তোমার মতই এক কবি আমার সাথে থাকে, আমার হাত ধরে রাখে, আমার পিঠ মালিশ করে দেয়, আমার সাথে জেগে রয় দশমাস, সে বলেছে যেনো এই কথা ফাঁস করে দেই, যেনো এই ডাঁহা মিথ্যা উদলা করে দেই তোমার কাছে, জগতের কাছে।

কবিতা তোমার সন্তান? কবিতা লিখতে দিনে নয়বার বমি করো? সারারাত গলা পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে রাখো? মৃত ফুফুর সাথে লুকোচুরি লুকোচুরি খেলো জেগেবসে? কতোবার কেঁদে উঠো অনাকাংক্ষিত রক্ত দেখে? কবিতা তোমায় জাগিয়ে রাখে মাসের পর মাস, কবিতা তোমার জননাঙ্গে লাথি মেরে কুকড়া করে ফেলে প্রকাশ্যে, প্রিয় রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে ঝমঝম করে মুতে ফেলো তুমি কবিতার মতো? যে কবি আমার সাথে থাকে, বলেছে, যেনো আমি তোমাদের ভন্ডামির কথা বলে দেই, যেনো প্রকাশ্যে বলি, এক মুহূর্তর সমান নয় তুমি আমার ব্যথার।

কবিতা লিখতে গিয়ে প্রিয় পুরুষের সঙ্গ থেকে দশমাস সামলে রাখো নিজেকে? যদি রক্তপাত বেড়ে যায়, যদি তুমি কেঁদে উঠো ভেতরে আমার, কবিতা তুমি প্রসব করো? তোমার লজ্জা করেনা এমন নির্লজ্জ হতে? তবে আমি কেনো তোমার কথাই লিখবো, তোমার মহান কাব্যগাঁথা গাইবো সারিন্দা বাজিয়ে।

তুমি আমার কথা নয় হে, তুমি লজ্জা ভুলে তোমার কথা লিখো। এ কোনো লজ্জা নয়, চোখ তুলে দেখো এ কোনো গন্ধের কথা নয়, কেবল জন্মের আগের কথা লিখো, একবার লিখো, আমি লিখবো তোমার জন্মের কথা। কিভাবে তুমি লিখতে শিখলে আমা হতে বেরিয়ে। জন্মের কথা লিখতে সাহস লাগে জানি, সেই সাহস তোমার এখনো হয় নাই। একবার সাহস করো, কেবল একবার লিখো, ভয় পেও না, জন্মে জন্মে আমি তোমার হাত ধরে থাকবো, আমি তোমার কথা লিখবো আবার...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন