শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭

জয়ন্ত দে'র গল্প : রসিক স্যারের ঘোড়া

আমি লেখক। ছোট পাবলিশারের ছোট লেখক। বই লিখি আবার ট্রেনে-বাসে বিক্রিও করি। তবে আজ ইচ্ছে ছিল বাসের জানলার ধারে বসে ঘুমোব

অফিসবাবুদের মতো ঘুম মারতে মারতে হাওড়া যাব। টিকিট চাইলে 'হাওড়া' বলে ভাড়া দেব। ভাড়া ফুল দেব কিন্তু চোখ হাফ খুলব। চোখ হাফ কেন? আমি ঘুমোচ্ছি। আমি অফিসবাবু হয়েছি। লজেন্স নিয়ে হকার উঠলে, লজেন্স কিনব।
টাকায় তিনটে। একটা মুখে, দুটো ব্যাগে। আমলকী উঠলে ঘুম-ঘুম হাত বাড়িয়ে স্যাম্পেল আমলকী নিয়ে মুখে ফেলব। কিনব না। যদি বই নিয়ে হকার ওঠে, ঝপ করে চেয়ে খুলে দেখব, কোন পাবলিকেশন। দেবদূত পাবলিকেশন নাকি!

কিন্তু কপাল যাবে কোথায়-- সে তো আমার সঙ্গে! ফলে বসবি তো বস প্রতিবন্ধী সিটে। তখন সামনে ফাঁকা সিট, জানলার ধার, বসে পড়েছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই বুঝেছি এটা প্রতিবন্ধী সিট। মানে তৈরি থেকো। তবু বেশ আসছিলাম। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে বাসটাও গড়াচ্ছিল।

কিন্তু ওই যে বলে কপাল! হঠাৎ চোখ খুলে দেখি আবছা একটা মানুষ। মানুষটা প্রায় আমার ওপর ঝুঁকে। তার মাথাটা থরথর করে কাঁপছে। দম-ফুরিয়ে-যাওয়া ঘড়ির কাঁটার মতো হাতটা গায়ের সঙ্গে সেঁটে।

আমি উঠে দাঁড়ালাম আর মানুষটা হুড়মুড় করে সিটের ওপর পড়ল। আমি বললাম, লাগল স্যার?

মানুষটা কড়া চোখে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, এটা হ্যান্ডিক্যাপ সিট! মানুষটার গলার আওয়াজে আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল! কী আশ্চর্য! আমি মানুষটাকে চিনতে পারিনি! কিন্তু ওই কড়া চোখের চাউনি, বাঘের মতো গলা যে আমার বড় চেনা। ইনি তো রসিকবাবু। রসিক গোলদার!

রসিকবাবু এখানে এলেন কোথা থেকে? এই কলকাতা শহরে!

আমি গিয়েছিলাম অবনী পাত্রের বাড়ি। উনি দেবদূত পাবলিকেশনের মালিক। আমার একজন প্রকাশক। গরিব লেখকের গরিব প্রকাশক। শিয়ালদা লাইনের কোন এক হকার টাকা মেরে দিয়েছিল। বই নিয়ে টাকা দেয়নি। তাকে ধরতে কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ার টেমার লেন থেকে সোজা বনগাঁ লোকালে। বনগাঁ লোকাল থেকেই অবনীবাবুর পা হড়কে গেল। ব্যস। এখন প্লাস্টার করে শুয়ে। ওঁকেই দেখতে গিয়েছিলাম। কুঁদঘাটে। তা ওঁর স্ত্রী না-খাইয়ে ছাড়বে না। আমি কিন্তু কিন্তু করছিলাম। রোগী দেখতে গিয়ে তার বাড়ি পাত পেড়ে আসব! শেষে অবনীবাবুই ধমক কষালেন, খান না মশাই! বলছে এত করে। এত লেখেন টেখেন মানুষের মন বোঝেন না! আরে হাতের সামনে লেখক পেয়েছে-- তা কোনও মেয়েছেলে তাকে না খাইয়ে ছাড়ে! অগত্যা বসে গেলাম খেতে। লইট্যে মাছের রসারসা। খেয়ে ফেললাম প্রচুর। কিন্তু এত রসের খাবার খেয়ে অবনীবাবু যে কী করে এমন বেরসিক কে জানে! না হলে হাত ধুয়ে না বসতে বসতে বলেন, যান, পঞ্চাশটা লেটার আর পঞ্চাশটা কবিরাজি নিয়ে বাসে বিক্রি করতে করতে চলে যান। তাতে বাসভাড়াও সেভ হল, আর দিনটাও ফালতু গেল না, ক'টা পয়সা এল।

অমন পয়সার মুখে আগুন!

কথাটা আমার মুখে এসে গিয়েছিল। বলিনি। অত বোকা আমি নই। বুকের কথা মুখে ফোটালেই বিপদ। প্রকাশক মানুষ দুম করে কী ভাবতে কী ভেবে বসবেন! হয়তো ভাববেন, দু'কড়ির লেখক চ্যাটাং চ্যাটাং বাক্যি মারছে। আসলে লেখক আর প্রকাশকের সম্পর্কটা বড় জটিল। এ ভাবে, আমি না থাকলে তোকে লেখক বলে কে চিনত! ও ভাবে, আমার লেখা ছেপেই তো এত ফুটুনি মারছ!

অথচ কী আশ্চর্য! অবনীবাবু ভাবছেন, আমি লেখক সেজে কী সম্মানই না পাচ্ছি। এই যেমন তার বউ কত যত্নে পাত পেতে খাওয়াল। এ লেখক বলেই তো! এমনি নিশ্চয়ই ঘরে-বাইরেও মিলছে। আর আমি ভাবতাম, আমাকে বিক্রি করে অবনীবাবু কত কামাচ্ছেন! কিন্তু এখন তো তাঁর বাড়ি এসে দেখলাম, দাঁত বের করা, সিমেন্ট-বালি খসা দেওয়ালে নেড়া ছাদ চাপানো ভাঙাচোরা একটা বাড়ি। আর ভাতের পাতে কালিয়া-কোপ্ত নয়, লাইট্যে মাছের রসা!

আমি বেশ বুঝতে পারি, অবনীবাবু বই বিক্রির কথা তাঁর জন্যে নয়, আমার জন্যেই বলেছেন। যাতে আমার দিনটা বেকার না যায়। আমার দুটো পয়সা হয়। কিন্তু এখন কে কাজ করবে? তা হলে এই খাওয়ার স্বাদটা কী থাকল! আমি এখন অফিসবাবু হয়ে বাসের জানলার ধারে বসে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাওড়া যাব! পাঁচিশটা লেটার, পঁচিশটা কবিরাজি ব্যাগের ভেতর সেঁধিয়ে পড়ে থাকে।

সাধারণত আমি হকারি করি না। তবে অভাব অনটনে পঁচিশ কপি-পঞ্চাশ কপি বই নিয়ে কলকাতা শহরের বাসে বাসে দু'চক্কর লাগিয়ে দেব।

তবে আজ কলকাতায় এসে আমাদের দেউলপুর স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক রসিকবাবুর সঙ্গে এভাবে দেখা হবে ভাবতে পারিনি।

আমি বললাম, স্যার, ভাল আছেন?

কী মনে হচ্ছে? ভাল থাকলে কখনও লোক তুলে হ্যান্ডিক্যাপ সিটে বসি? অনেকদিন পরে স্যার আপনাকে দেখলাম।

হুম! তা রিটায়ারই তো করেছি চার বছর হয়ে গেল। তা তোমাকে তো ঠিক মনে পড়ছে না। কোন ইয়ারে মাধ্যমিক? তোমাদের সময়ে ফাস্ট বয়ের নাম কী ছিল? আমার বুকের ভেতর তখন বুড়বুড়ি। স্যারের প্রশ্নের আগেই উত্তর দিয়ে দিলাম। আর স্যারও আন্দাজ করে ফেললেন আমাকে। তবে ঠিক আমাকে নয়, আমাদেরকে। বললেন, ও তুই তা হলে গুবরে পোকাদের একজন। তা করিস কী এখন?

স্যারের গলায় 'গুবরে পোকা' শুনেই আমার চারদিক কেমন হুড়মুড় করে উঠল। অনেকদিন পর মনে পড়ল আমি রতন পাল নই, আর. পাল নই, মানুষ নই, আমি গুবরে পোকা!

স্যার বললেন, তা গুবরে পোকা কাজকম্ম কিছু করা হয়, না ভ্যানভ্যানানিই সার!

আমি বললাম, আমার স্যার একটু অন্য লাইন। লেখালিখি, বইপত্তর এই নিয়েই আছি।

অ্যাঁ, বলিস কী রে! তুই আছিস লেখালিখি বইপত্তর নিয়ে, সব্বনাশ!

রসিক স্যারের কথায় হঠাৎ আমার নিজের মুখটা পালটে গেল। তিনি যেন আমাকে দুম করে ঢুকিয়ে দিলেন ফ্ল্যাশব্যাকে। স্যারের মুখে সেই ব্যঙ্গ! স্যার সারা ক্লাসরুম ফাটিয়ে চিৎকার করছেন। আজ স্যারের তোপের মুখে আমি। ইংরেজি স্যার আর এল জি, রসিকলাল গোলদার তাঁর ক্লাসের ডানদিকের শেষ বেঞ্চের ছাত্র রতন পালকে বলছেন, ব্যাটা মুদির ছেলে ইংরেজি শিখে তোর কোন কম্মে লাগবে। যাঃ! যাঃ! যোগ বিয়োগ কর, নামতা শেখ, তা হলেই হবে। পাল্লা মেরে খদের ঠকাবে- সে শিখবে ইংলিশ! যা, বাপের কাছ থেকে দাড়িপাল্লা ধরা শেখ, ওজনে কম দেওয়া শেখ-ফিউচারে কাজে লাগবে।

স্যারের কথা শুনতে শুনতে আমার ঠোঁট নড়েছিল। কী ভেবেছিলাম, কী বলেছিলাম, মনে নেই। সত্যিই কি কিছু বলেছিলাম? হয়তো স্যারের কথা শুনতে শুনতে ঠোঁট দুটো লজ্জায় কেঁপে উঠেছিল থরথর করে!

রসিক স্যার বললেন, কী বলছিস রে বিড়বিড় করে?

আমার দু'বেঞ্চ আগে বসা রাজীব বলল, স্যার, ও বলছে, ওর বাবা কম দেয় না।

সারা ক্লাস হ্যা হ্যা করে হাসছে। মন্মথ আমার হাত চেপে ধরল। ওর করুণ মুখ। আজ আমার পালা। গতকাল ছিল ওর। সারা ক্লাস যখন রসিক স্যারের কথার মজায় হাসে আমরা তখন পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকি। আমরা হাসি না। আমরা, শেষ দিকের বেঞ্চে জট পাকিয়ে বসে থাকা, আমরা সবাই এক। আমরা, আমি শ্রীরতন পাল মুদির ছেলে। মন্মথ সরকার দর্জির ছেলে। আমাদের কেউ গোয়ালার গোরু। কেউ কেরোসিন তেলওয়ালার ব্যাটা, ময়রার পো, পিয়োনের ছাবাল। আমাদের একজন কেষ্টার ছা। কেষ্টদার পান-বিড়ির দোকান বটতলার মোড়ে। সেই কেষ্টার ছা বিশ্বনাথ বিশু বলল, দাঁড়া, আজ দাঁত কেলিয়ে কথা বলা রাজীবকে ক্যালাব!

বিশু আমাদের মতো না। ও খুব মাথা গরমে ছেলে, গায়ে হেভি জোর। ক'দিন আগে যখন রসিক স্যার বিশুকে ট্রানস্লেশন জিজ্ঞেস করলেন, নদীর ধারে একটা বাঁদর গাছের ওপর বসে, বিশু বিড়বিড় করছিল। হয়তো ইংরেজি করার জন্য বাংলা কথাগুলো সাজাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই রসিক স্যার বললেন, তুই কি মন্ত্র পড়ছিস বাপ? কী মন্ত্র, জোরে জোরে বল।

স্যারের কথায় বিশু মাথা নিচু করল। আর স্যার বিশুর মুখের কাছে কান নিয়ে গিয়ে চিৎকার জুড়লেন, শুনেছি, মন্তরটা হল- কেষ্টার ছা, পান বিড়ি খা!

স্যার মন্ত্রের মতো কথাটা বলেই চলেছেন, বলেই চলেছেন, আর সারা ক্লাস হাসছে। সেই সেদিন থেকেই বিশু ফুঁসছে। আজ ও ছাড়বে না। ঠিক তাই। ছুটির পর রক্তারক্তি কাণ্ড। বিশু এমন ঘুসি চালাল রাজীবের নাক-মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরুচ্ছে। সারা স্কুলে হইহই ব্যাপার। ব্যস, আমরা শয়তানের দল হয়ে গেলাম। এক-একটা গুবরে পোকা।

রসিক স্যার ক্লাসে ঢুকেই আমাদের বের করে দিতেন। এই ক্লাস থেকে বের করার জন্য ইংরেজিই যথেষ্ট। প্রথমেই আমাদের পটাপট দাড় করিয়ে দিতেন। তারপর গলায় নানারকম সুর খেলিয়ে বলতেন, টেনস বল। ট্রানস্লেশন বল। পারলে আবার ট্রানস্লেশন। আবার। ভুল আমাদের হবেই। আর ভুল হলেই আমাদের ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। ধুস শালা, রসিক স্যারের ক্লাস থেকে আমরা নিজেরাই বেরিয়ে যেতম।

সেই রসিক স্যার আমার সামনে বসে। তার পাথরের মতো হাত বাসের সিটে এলিয়ে পড়েছে। তার মাথা কাঁপছে। কথা কিছুটা জড়ানো।

স্যার বললেন, তা লেখালিখির লাইনে আছিস বললি।

আজ্ঞে।

তা কী লিখিস?

প্রকাশক যখন যেটা চায়। এ টু জেড। সবকিছু।

যেমন ?

লিটারেচার, প্রফেশনাল, মেডিকেল, কুইজ।

বলিস কী রে! একই অঙ্গে এত রূপ!

ওই তো বললাম, প্রকাশক যদি চায়।

রসিক স্যারের চোখেমুখে ধন্দ!-- লিটারেচার থেকে মেডিকেল-- এক অস্ত্রে সব বধ-- তা কী করে হয় ?

কেন হবে না স্যার, অস্ত্র যে কলম। পৃথিবীর সব থেকে জোরালো অস্ত্র।

কাঁপা মাথা হঠাৎ ঘাড়ের ওপর লকপক করে ওঠে।-- না না, একজন সব বিষয়ে জানবে, লিখবে, ব্যাপারটা এত সোজা নয়!

কেন সোজা নয় স্যার, খবরের কাগজের রিপোর্টাররা যে-কায়দায় জানছে লিখছে, সেই কায়দা আর কী।

আমার কথা শুনে রসিক স্যারের মাথাটা ঘাড়ের ওপর ঝুলে পড়ল। তারপর হঠাৎ তেড়েফুঁড়ে উঠে বললেন, দেখা তবে কী কম্ম করলি।

স্যারের কথায় আমিও উত্তেজিত। খপ করে হাত ঢুকিয়ে ফেলেছিলাম ব্যাগের ভেতর। আমার আঙুলে আঙুলে আমার লেখা বইগুলো খলবল করে উঠল। তারা এতক্ষণ গায়ে গা দিয়ে সবকটা মিলে আমাদের কথা শুনছিল। এখন ব্যাগের ভেতর আমার হাত পেয়ে ছোট ছোট মাছের মতো ঠুকরে দিল। ওরা কলকল করে বলল, যাব না। তোমার মান-অপমান বোধ নেই? টেনস বলে, ট্রানস্লেশন বলে, তোমরা কি রেহাই পেতে? আমরাও রেহাই পাব না।

বইগুলোর কলকল কথায় আমার সংবিৎ ফেরে। ঠিক তো, আমার বইগুলো নিয়েও তে রসিক স্যার ব্যঙ্গ করতে পারেন। আমি ব্যাগের ভেতর ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিই। ওদের পিঠ থাবড়ে বাহবা দিই। সত্যি, কী বুদ্ধি বইগুলোর! ওদের লালচে নিউজপ্রিন্টের খলখলে শরীরে হাত ছুঁইয়ে থাকি।

হাসিহাসি মুখে স্যারকে বলি, এই কম্ম করেই তো স্যার বেঁচেবর্তে আছি। মা আছে, একটা বোন, সংসার দেখছি। লেখা তো আমার স্যার পেট চালানোর ধান্দা। জীবিকা। বরং স্যার অন্য জিনিস দেখুন।-- ততক্ষণে আমার আঙুল ব্যাগের ভেতর ফাইলে ঠেকেছে। ফাইলে রাখা দুটো খবরের কাগজ স্যারের হাতে তুলে দিই। এই কাগজ দুটোয় আমার গল্প আছে। মুখ আলো করে স্যারকে দেখাই-- এই লেখাটা আমার।

দু'চোখ ঠিকরে রসিকবাবু দেখেন। তারপর নাক কুঁচকে বলেন, এ তো অনেকদিনের পুরনো রে!

আমি মুখ মুছে ডাহা মিথ্যে কথা বলি।-- প্রকাশকের বাড়িতে পড়েছিল। আজ উদ্ধার করলাম। কিছুতেই দেবে না। বই করবে। ওর খুব ইচ্ছে আমার একটা গল্পের বই বের করে।

তা বই করলি না কেন? ফেরত নিলি!

দরাদরিতে পোষাচ্ছিল না। আর একটা জায়গা থেকে ভাল অফার পেয়েছি। এরা বড় প্রকাশক। আমি প্রফেশনাল ম্যান!

তাই! বলিস কী রে!

রসিক স্যার দু'চোখ সরু করে আমাকে দেখোন।-- গল্প লিখে পয়সা পাওয়া যায়!

পাওয়া যায় স্যার, যথেষ্ট পাওয়া যায়। ঠিক ঠিক ক্লিক করে গেলে বাড়ি গাড়ি- কী চাই!

রসিকবাবু ঠোঁট বেঁকান, বড় ফাস্ট হয়ে গেছে লাইফ। এখন কে পড়ে রে এইসব গপ্পটপ্প?

কী বলছেন স্যার! খবরের কাগজে এক সিএম স্পেসের দাম জানেন, সেখানে এতখানি জায়গা নিয়ে এক-একটা গল্প প্রকাশিত হয়। না পড়লে কি এ-সব ছাপা হত? রসিক স্যারের কাঁপা ঘাড় কাঁপে, না না, ওগুলো দিয়ে আসলে খবরের কাগজের ওই বিশাল পেট ভরানো হয়।

ক্ষতি কী স্যার! এতে গ্যাস অম্ল হয় না। পেট ছেড়ে দেয় না। রাজনীতির কচকচানি আর ধর্ষণের রগরগে বর্ণনা না-পড়ে নয় দুটো গল্পই পড়লেন!! এতে মনও ভাল থাকে, বদহজমও হয় না।

না না, কোথায় সেইসব লেখক ? মান বড় পড়ে গেছে। এখন গাধাকে দাঁড় করানো হচ্ছে রেসের মাঠে। আরে গাধা কি দৌড়োয় ?

জীবনটাই তো স্যার রেসের মাঠ। তা সেই রেসের মাঠে ঘোড়ার পাশে গাধাও যদি দৌড়োতে চায়, ক্ষতি কী স্যার? গাধা যদি দৌড়োতে চায় তাতে কী অন্যায় আছে? আসলে যে যার নিজের দৌড়টাই তো দৌড়োয়। এ-দৌড় বেঁচে থাকার দৌড়। আর সে-দৌড়ে যদি আপনারা একটু সাহায্য করেন তো গাধারাও প্রাণে বল পায়। পায়ে জোর পায়!

যাঃ! তা কখনও হয়? গাধা গাধা-- ঘোড়া ঘোড়াই!

তবু স্যার, গাধা যদি একটু সাহায্য পায়-- সেও দৌড়োবে স্যার।

রসিক স্যার মাথা নাড়িয়ে হাসেন, দৌড়োতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে মরবে! আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি। আমরা গাধা। শয়তান। গুবর পোকা। তা হলে বিশু? আবার মুখ খুলি স্যারের সামনে।

স্যার, কেষ্টার ছেলে বিশু, বিশ্বনাথ ডাক্তার হয়েছে।

কেষ্টার ছেলে বিশু! পান বিড়ি! কী ডাক্তার ? হোমিওপ্যাথ?

না স্যার, পাক্কা এম বি বি এস।

রসিকবাবু মাথা ঝোঁকান, ও বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে।

তা হলে ওই দরজির ছেলে কী করে কলেজে পড়ায় ?

বলিস কী রে! শুনে ভাল লাগছে। একটা লেখক, একটা ডাক্তার, একটা প্রফেসর। বাঃ! বাঃ! ওরা কবে এত পড়াশোনা করল ? তুই কবে কাব্যচর্চা করলি-- কিছুই টের পেলাম না!

আপনি যদি কিছু মনে না করেন তবে বলি।

বল না, বল, এখন আর মনে করার কী আছে! তুই কি আর সেই তুই আছিস! আপনি চকমকি ঠুকেছেন। তাতে যার বুকের ভেতর বারুদ আছে সে ঠিক জ্বলে উঠেছে। সেই জ্বলনেই তো কেষ্টার ছা ডাক্তার হল, দরজির ছেলে প্রফেসর হল। আর সবার খবর তো জানি না।

এ-দলে তো তুইও আছিস!

না স্যার, আমার বুকের ভেতর বারুদ ছিল না।

কে বলল ছিল না! তা হলে এতগুলো বই লিখলি কী করে ?

বেঁচেবর্তে থাকার জন্য স্যার, পেটের ধান্দায়।

আরে পেটের ধান্দায় তো তুই মদ বিক্রি করিসনি। বরং বলতে পারি দুধ বিকোতে বেরিয়েছিস। বল কেমন সেল হয় তোর বই?

স্যার যদি সাহস দেন তবে বলি, আমি এখন বাংলা বাজারে বেস্ট সেলার। এই বাজারে যা গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ দেখেন তা সব পাঁচশো, হাজার ছাপা হয়। আর আমার বই এক একটা ইম্প্রেশনে পাঁচ হাজার। আসলে যত ছাপবে তত খরচ কমে যাবে।

এত বই কে পড়ে? কারা?

আমি জানলার বাইরে তাকাই, হাওড়ায় বাস ঢুকছে। চারদিকে মানুষ আর মানুষ। ফিসফিস করি, এরা। এরাই আমার পাঠক। আমার কথা রসিকবাবু শুনতে পান না। আমি শোনাতে চাই না। আমি জানলার বাইরে হা-চোখে ওদের দেখি, থইথই করছে। রাস্তাঘাট সব যেন ওরা দখল করে নিয়েছে। ট্রেনে বাসে এরাই আমার ইংরেজি লেটার-রাইটিং বই ঝপাঝপ কিনে ফেলে। আপনার অফিসে, ছেলের স্কুলে, লিভ অ্যাপ্লিকেশন করতে চান, মিটার খারাপ--ইলেকট্রিক বিল বেশি আসছে--চিঠি লিখবেন। এরকম পঞ্চাশটি চিঠি আছে এই বইয়েতে। বলুন তো, তাজমহল বানাতে কত দিন লেগেছিল? কত মজুর কাজ করেছে? বলুন তো, জিব্রাল্টর প্রণালী কাকে বলে? কুইজ ক্যুইজ! এরা কেনে। কিংবা বাচ্চার পেট ফাঁপলে-- কোন পাতা, কান পাকলে-- কোন মূল? কবিরাজি। অথবা বর্ষাকালে কী খাবেন না, অমাবস্যায় কী ছোঁবেন না, এরা কেনে, এরা পড়ে। এরা জনতা। আমজনতা। পাবলিক।


দুই

আমি ট্রেনের যাত্রী, স্যার বাসের। তবু স্যারের সঙ্গে চলি বাস স্ট্যান্ডের দিকে। স্যার যাবেন বালি। স্যারের লকপকে শরীরটা থমকে থমকে হাঁটে। আমি এই ভিড়, ধেয়ে-আসা মানুষের স্রোতের বিরুদ্ধে স্যারকে আগলে আগলে চলি। স্ট্যান্ডে বাস নেই। স্যারকে একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসাই। হাঁপাতে হাঁপাতে রসিকবাবু বললেন, আজ সারা দিনটা খুব ভাল কাটল। তোর সঙ্গে দেখা হল। তোদের ভাল ভাল খবর পেলাম। ছোট ছেলের বাড়ি গিয়েছিলাম। সেখানেও ভাল খবর।

আপনার ছোট ছেলে ?

হ্যাঁ, ও তো ভবানীপুরে ফ্ল্যাট কিনেছে। সেই ফ্ল্যাটে তালা মেরে এখন আমেরিকা যাচ্ছে। তাই ছেলেটার সঙ্গে একটু দেখা করে গেলাম। আর বড় ছেলে তো কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। বাঙ্গালোরে গাড়ি-বাড়ি। এলাহি ব্যাপার। বুঝলি, আমার দুটো ছেলেই একেবারে রেসের ঘোড়া। চাবুক!

স্যার, ওরা কেউ তা হলে আপনার সঙ্গে থাকে না?

হঠাৎ যেন রসিকবাবুর গলা আটকে গেল। মাথাটা শক্ত হয়ে ঘাড়ের ওপর চেপে বসেছে। বললেন, থাকলে কি আর এই শরীর নিয়ে ওদের সঙ্গে দেখা করতে আসতে হয়।

এই শরীর নিয়ে আপনি এলেন-- ওরা আপনাকে পৌঁছাতে এল না ?

না! রসিকবাবুর চোখের কোণে জল। বললেন-- থাক আমার কথা। তোদের কথা বল।

আমার আর কী কথা স্যার! তবু যদি বলেন একটা জিনিস দেখাই। আমরা যে-এলাকায় থাকি, আপনি তো জানেন স্যার, বড় গরিব এলাকা। ক'জন আর লেখাপড়া জানে! কিন্তু আমাকে সবাই লেখকটেখক বলে একটু গণ্যমান্য করে। ফলে দরকারে প্রয়োজনে সবাই ছুটে আসে। এই ছুটে আসা মানেই চিঠি লিখে দিতে হবে। হরেক কিসিমের দরখাস্ত। অ্যাপ্লিকেশন। তাদের সবার এক কথা, বাংলা চলবে না, ইংরেজি চাই। এদিকে আপনি তো জানেন আমার ইংরেজির কী দশা! আমি খুব আতান্তরে পড়ে যাই স্যার। তাই বুদ্ধি করে আসার সময় ট্রেন থেকে একটা লেটার-রাইটিংয়ের বই কিনেছি। এখন খুব ভয় হচ্ছে, হাটে-মাঠের বই, সেই বই থেকে টুকে চিঠি লিখে দেব, সে-চিঠিতে যদি ভুল থাকে, বড় বেইজ্জত হয়ে যাব। স্যার একটু উলটেপালটে দেখে দেবেন-- বইটা ঠিক আছে কি না? আমি ব্যাগ থেকে আমার লেখা লেটার-রাইটিং বইটা বের করি। বইটা স্যারের কোলে রাখি। স্যার কেমন ঘেন্না ঘেন্না মুখ করে কোলে-রাখা বইটার দিকে তাকান।

আমি গলায় কাকুতি এনে বলি, একটু কষ্ট করে দেখে দিন স্যার, ভুল থাকলে ছুড়ে ফেলে দেব। আমার পাঁচ টাকা জলে যায় যাক। কিন্তু এই বই দেখে ভুল ইংরেজি চিঠি লিখে মানইজ্জত খোয়াব না।

স্যার কিছুটা বিরক্তির গলায় বললেন, এইসব রাস্তাঘাটে বসে ইংরেজি দেখা যায়?

হয় স্যার, খুব হয়, আপনি ভাত টেপার কায়দায় দেখুন, দু-একটা ভাত টিপেই আপনি গোটা হাঁড়ি মালুম পেয়ে যাবেন। আপনার জহুরির চোখ।

রসিক স্যার বইটা খুলে চোখের সামনে রাখেন। বললেন, তুই বাসের দিকে নজর রাখ-- এলেই বলবি। আমি একটু চোখ বুলিয়ে দেখি। কী বিদ্যা ফলাল!

স্যার একটা একটা করে লেটার পেরিয়ে পাতা উলটে যাচ্ছেন।

বাস এল। ফিসফিস করলাম, স্যার বাস।

স্যারের চোখ আটকে বইয়ের পাতায়। আমার মনে হল স্যার যেন খুঁজছেন, ভুল খুঁজছেন। ভুল পেলেই আমাকে ঘর থেকে বের করে দেবেন। সেই ভয়েই তো আমি স্যারকে বলেছি, ট্রেনে কিনেছি। তবু...। স্যারের চোখে যেন আঠা লেগে গেছে। আমি আবার ডাকলাম, স্যার বাস।

স্যার আমার মুখের দিকে তাকালেন। তারপর ভাজ-করা অবস্থায় বইটা আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। ধরা গলায় বললেন, আমাকে একটু ধর তো। টেনে তোল।

মাটির ওপর দু'পায়ের ভরে দাড়িয়েও স্যার আমার হাত ছাড়লেন না। কেমন যেন থরথর করে কাঁপছেন। কাঁপতে কাঁপতে বললেন, শোন সাদামাটা ইংরেজি। কিন্তু ভুল নেই কোথাও।

স্যারের শরীরের সমস্ত ভার নিয়ে আমি উড়তে উড়তে ভাসতে ভাসতে চলেছি বাসের দিকে। সাদামাটা ইংরেজি। কিন্তু ভুল নেই কোথাও। আঃ! আজ মুদির ছেলেকে ইংরেজিতে ইংরেজিতে হয়রান করে রসিক স্যার ক্লাস থেকে বের করে দিতে পারেননি। পাতার পর পাতা উলটে, লাইন থেকে শব্দ দু'চোখে বিঁধিয়ে ভুল পাননি। সাদামাটা। কিন্তু ভুল নেই। শত ইচ্ছে থাকলেও রসিকবাবু আজ আমাকে তাড়াতে পারেননি।

রসিকবাবুকে হেঁচকা মেরে টেনে বাসে তুললাম। সব সিট ভরে গেছে। প্রতিবন্ধী সিটের জানলার ধারে স্যারকে বসিয়ে দিলাম। বাস ছেড়ে দিচ্ছে। স্যারকে প্রণাম করে হঠাৎ কী মনে হল। বললাম, আপনাকে একা ছেড়ে আপনার ছেলে ঠিক কাজ করেনি। স্যার।

খপ করে রসিকবাবু আমার একটা হাত চেপে ধরলেন। বললেন, রেসের ঘোড়া কখনও মাল বহন করে না রে বোকা! ওরা শুধু দৌড়োয়। আমার ছেলেরা যে রেসের ঘোড়া!

রসিক স্যারের গলা ধরে চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল। স্যার জানলার দিকে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, কী পলিউশন--চোখ জ্বলিয়ে দিল। মানুষ বাঁচবে কী করে বল তো? পলিউশন নিয়ে কিছু লিখেছিস, পরিবেশ নিয়ে কিছু লেখ। বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে চারপাশ!


তিন

আমি ট্রেনের জানলার ধারে বসে। হাওয়া যেন উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই হাওয়া যেন আমার বুকের ভেতর ঢুকে পড়ছে হুহু করে। আমি কোলের ওপর রাখা ব্যাগের ভেতরে হাত রাখলাম। স্যারের দেখা বইটা ভাজ-করা অবস্থায় আছে। হঠাৎ ব্যাগ থেকে বইটা বের করে ভাজ-করা পাতায় চোখ রাখলাম। আর তখনই আমার চোখ আটকে গেল। এ-পাতায় একটা স্কুলের ছুটির অ্যাপ্লিকেশন। কিন্তু চিঠির স্কুলের নামটা যে আমাদের স্কুলের। তবে কি এই স্কুলের নামে এসে রসিক স্যার থেমে গিয়েছিলেন। তাঁর দু'চোখে আঠা হয়ে গিয়েছিল! রসিকবাবু কি তবে স্কুলের নাম দেখেই বুঝতে পারলেন এ-লেখাটা আমার। এ-বইটা আমারই। আমি তার কাছে লেখক সেজেছি কিন্তু এ-বইয়ের লেখক-পরিচয় দিতে লজ্জা পেয়েছি। আমি সেই লেখক--সেই রেসের ঘোড়া নই।

আমি ট্রেনের জানলার হুহু হাওয়ায় চিৎকার করে উঠলাম, রেসের ঘোড়া কখনও মাল বহন করে না স্যার। ওরা শুধু দৌড়োয়। ট্রেনের হাওয়ায় হাওয়ায় আমার সঙ্গে রসিকবাবুর গলাও শুনলাম। যেন আমার সঙ্গে গলা মেলাচ্ছেন। তবু আজ আমি রসিকবাবুকে ছাড়ব না। ক্লাস রুম থেকে কিছুতেই মাথা নিচু করে বেরিয়ে যাব না। বরং রসিকবাবুর চোখে চোখ রেখেই বলব, রেসের ঘোড়া দৌড়োচ্ছে--পলিউশন নয় স্যার, আপনি কাঁদছিলেন।


৭টি মন্তব্য:

  1. জয়ন্ত দে নামটা প্রথমবার মাথায় গেঁথে গিয়েছিল এই গল্প পড়ে। যেমন অনবদ্য ডিটেলিং তেমনি অসামান্য অনুভূতি নিয়ে চর্চা। এখনও গল্পটা পড়তে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়।

    উত্তরমুছুন
  2. জয়ন্ত দে নামটা প্রথমবার মাথায় গেঁথে গিয়েছিল এই গল্প পড়ে। যেমন অনবদ্য ডিটেলিং তেমনি অসামান্য অনুভূতি নিয়ে চর্চা। এখনও গল্পটা পড়তে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়।

    উত্তরমুছুন