রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

ইশিগুরোর দুটি উপন্যাসের পাঠপ্রতিক্রিয়া

কাজুও ইশিগুরোর দুটো উপন্যাস ‘নেভার লেট মি গো’, ‘অ্যান আর্টিস্ট অফ দ্যা ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’ সম্বন্ধীয় কিছু কথা-

রিমি মুৎসুদ্দি

(Never let me go, never let me go
Never let me go, never let me go)


And the arms of the ocean are carrying me
And all this devotion was rushing over me
And the questions I have for a sinner like me
But the arms of the ocean deliver me

বিষণ্ণতা জীবনবোধের একটা অংশ। কাজুও ইশিগুরোর উপন্যাস ‘নেভার লেট মি গো’ পড়তে পড়তে ক্রমশ বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিলাম। ‘নেভার লেট মি গো’ উপন্যাসটি ক্যাথি, টমি আর রুথ- এদের ভালবাসার গল্প, যন্ত্রণার গল্প, একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। উপন্যাস পাঠের আগে জানতাম এটি একটি কল্পবিজ্ঞানের কাহিনী। কিন্তু পড়তে পড়তে বিজ্ঞানের উপস্থিতি ভুলে শুধুই এক গভীর দার্শনিক অনুভূতি জেগে উঠল। মানুষের প্রতিটি চেতনাই আসলে মৃত্যুচেতনা। জীবনভর এই একটাই অপেক্ষা অথচ মানুষ চেয়েছে এই অপেক্ষাকে দীর্ঘায়িত করতে। অথবা অমরত্বের সন্ধানেই তার যাবতীয় গবেষণা।

অর্থনীতির একটা তত্ত্ব হল ‘Theory of rationality’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী যে কোন র‍্যাশেনাল মানুষই প্রাপ্তি আর ত্যাগের মধ্যে নির্বাচন এমনভাবে করেন যাতে তাঁর নিজস্ব চাহিদা সম্পূর্ণরূপে পরিপূর্ণ হয়। এই উপন্যাস পড়ে সেই তত্ত্বের কথাই মনে পড়ে যায়।

হ্যালিশাম-একটা স্কুল। ক্যাথি এই স্কুলের একজন গাইড। এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা মানব সন্তান নন। তারা প্রত্যেকেই ক্লোন। তাদের প্রত্যেকেরই জীবনের একটাই উদ্দেশ্য। নিজেদের অঙ্গ দান করে যারা সত্যিকারের মানব সন্তান তাদের সুস্থ রাখা এবং মানুষের আয়ু দীর্ঘায়িত করা। এইভাবে নিজেদের একটা একটা করে অঙ্গ অন্য মানব দেহে প্রতিস্থাপন করতে করতে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়াই এই ক্লোনসন্তানদের ভবিতব্য।

এদের শারীরিক ও মানিসিক সুস্থতার জন্য স্কুলের বেশকিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। স্মোকিং এখানে এক অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। ছাত্র ছাত্রীদের উৎসাহ দেওয়া হয় ছবি আঁকায়। তাদের আঁকা ছবির প্রদর্শনী হয় এবং একজন ম্যাডাম সেইসব ছবি কিনেও নেন। তবু কখনও ব্যতিক্রম হয়। তাদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অঙ্গ দানের ফলে কেউ যখন ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ছে আরেকজন যে নিজেও অপেক্ষা করে রয়েছে এই যন্ত্রণার সে ভালবেসে ফেলে অপরজনকে। অসুস্থ টম সুস্থ মানুষদের সঙ্গে জোর করে ফুটবল খেলতে গেলে হ্যালিশামের অন্য বাসিন্দারা তার পাশে থাকে। ছোট ছোট ঘটনায় বা দৃশ্যে লেখক প্রত্যক্ষভাবে না বলেও বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রত্যেকটা ক্লোনমানুষের মননশীলতা। আর শুধুমাত্র স্বার্থের কারণে সেই মননশীলতার সৃষ্টি ও ধ্বংস যেন মানবসভ্যতার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া তার আত্মমগ্নতা ও লোভের পরিণতি।

ইশিগুরোর গল্প বলার দক্ষতায় কোন নীতিকথা নেই। অথচ বিষণ্ণতায় ভরা এই আখ্যান যেন চক্ষু, কর্ণ ও সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ করে দেয়। জাগ্রত করে এক গভীর দার্শনিকতায় ভরা মানবিকতাবোধ।

২.
রবার্ট ফ্রস্টের The Death of the Hired Man –কবিতায় একটা অংশ ছিল- ‘Home,’ he mocked gently.

‘Yes, what else but home?
It all depends on what you mean by home.
....
‘Home is the place where, when you have to go there,
They have to take you in.’

‘Home’- শব্দটা আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ সহজ হলেও ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন অনুভূতি। কোথাও দীর্ঘদিনের জন্য বেড়াতে গেলে ফিরে আসার সময় অনেকের মনে হয় প্রত্যাবর্তন। ‘Sweet Home’ কথাটাই মাথায় আসে। আবার দীর্ঘদিনের পরবাসের পর বাড়ি ফিরে এলে এক অন্য ধরণের অনুভূতি। আর বরাবরের জন্য বাড়ি ছেড়ে, ভিটে ছেড়ে যারা অন্য কোন দেশে অন্য কোন সমাজে কখনও বাধ্য হয়ে কখনও আবার উচ্চতর জীবনযাপনের জন্য চলে আসে তাদের কাছে ‘Home’ শব্দটা শুধুমাত্র বাড়ি নয়, ফেলে আসা স্মৃতিসত্তাও বটে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হ্যাংওভার সাহিত্যে, ইতিহাসে এমনকি রাজনীতিতেও কতটা কেটেছে আর কতটা রয়ে গেছে সে প্রশ্ন তর্কযোগ্য। সদ্য নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ইশিগুরোর উপন্যাস ‘An Artist of the Floating World’ পড়লে কিছুটা সেই হ্যাংওভার ফিরে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পরও জাপান রাজনৈতিকভাবে কখনও ভুল স্বীকার করে নি। 

হিটলার, মুসোলিনি থেকে স্পেনের জোসে অ্যান্টোনিয়ো যেখানে নিজেদের দেশেই ফ্যাসিস্ত ও যুদ্ধাপরাধী বলে সমালোচিত সেখানে জাপানে তোজো একদিকে যেমন ‘ফ্যাসিস্ত যুদ্ধনায়ক’ আবার আরেকদিকে তিনিই ফ্যাসিবাদ বিরোধী দক্ষিণপন্থী জঙ্গি পার্টির নেতা। ‘An Artist of the Floating World’-একটি ইতিহাসাশ্রিত উপন্যাস। যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানে নতুন প্রজন্মের কাছে যুদ্ধাপরাধী বলে চিহ্নিত চিত্রকর মাসুজি ওনোর কাহিনী। জাপানের অসংখ্য তরুণ যোদ্ধার সাথে ওনোর নিজের ছেলেও যুদ্ধে নিহত। তাঁর স্ত্রীও গত হয়েছেন। দুই মেয়ে নোরিকো আর স্টেসুকো-র কাছে ওনোর নিজেকে অপরাধী মনে হয়। একসময় যে ওনোর জগত ছিল সামুরাই তরবারি, জাপানের ট্রাডিশানাল কোটো মিউজিক থেকে গেইশা আকর্ষণ। 

রাজতন্ত্র বলতেই যে শিল্পীর চোখে ভেসে উঠত মাল্টিকালারড কিমোনোয় সুসজ্জিত, প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো রাজদরবার আলোকিত করে উপস্থিত সেইসব গেইশারা, যাদের লাল টুকটুকে চেরির মতো ঠোঁটের দিকে তাকালে তাঁর মনে হতো পৃথিবীতে এর থেকে সুন্দর আর কিছু হতে পারে না। সেই ওনো যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তরুণ প্রজন্মের চোখে দোষী সাবস্ত্য হন এবং তিনি নিজেও নিজেকে দায়ী করেন। চেষ্টা করেন তাঁর মেয়েদের কাছে ও মেয়ের হবু শ্বশুরবাড়ির কাছে নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইতে। অথচ, কোথায় যেন এমন একটা অবজ্ঞা সবার মধ্যে এমনকি তাঁর নিজের মেয়েদের মধ্যেও ফুটে উঠেছে যে কেউই তাঁর এই অনুতপ্ত হওয়াকে তিলমাত্র গুরুত্ব দিতে নারাজ।

উপন্যাসের শেষে ইশিগুরো এক গভীর দার্শনিক প্রশ্ন রেখে গেছেন- সব ভুলই কি সত্যিকারের ভুল?






লেখক পরিচিতি
রিমি মুৎসুদ্দি
গল্পকার। প্রাবন্ধিক। অর্থনীতিবিদ।অধ্যাপক।
দিল্লীতে থাকেন।

1 টি মন্তব্য: