রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

কিংবদন্তি আর মায়াজালের আবরণ পেরিয়ে

পরোচিস্তা খাকপোর
অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত

এই বছর বার্ন্স অ্যাণ্ড নোবল-এর Discover Great New Writers কার্যক্রমের পঁচিশ বছর পূর্তি হয়েছে। এই উপলক্ষে, কর্মকর্তারা তাঁদের প্রিয় লেখকদের কাছে কার্যক্রমের প্রথম পাঁচ বছরে নির্বাচিত লেখাগুলির পুনর্মূল্যায়ন করতে অনুরোধ জানিয়েছেন – কারণ সেই সব লেখার অনেকগুলিই – যেমন বেন ওকরির The Famished Road – যেখানে এক স্বতন্ত্র আধুনিক সম্প্রদায়ের কাহিনী কেবলমাত্র য়োরুবার কিংবদন্তির চোখ দিয়ে বলা হয়েছে – সাহিত্যের ইতিহাসের এক খণ্ডমুহুর্তকে চিহ্নিত করেছে।


বেন ওকরির তৃতীয় উপন্যাস – ১৯৯১’র The Famished Road এর প্রধান চরিত্র মুখে হাসি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল; আমার দ্বিতীয় উপন্যাস – ২০১৪’র The Last Illusion এর প্রধান চরিত্রের হাসবার ক্ষমতাই ছিল না। এই বিপরীত মেরুতে অবস্থান অবশ্য এই দুই চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গীর পরস্পরবিরোধীতার ইঙ্গিত করে না। যদি কোন বই সম্বন্ধে আমাকে ঋণ স্বীকার করতে হয়, তাহলে আমি এই উপন্যাসটির কথাই বলব যেটি ওকরিকে ৩২ বছর বয়সে বুকার প্রাইজ় এনে দিয়েছিল – যে সময় আমি সদ্য কৈশোরে পা রেখেছি।

নব্বইয়ের দশকের সাহিত্য জগতে এই উপন্যাস কতখানি সাড়া জাগিয়েছিল সেটা রেডিওব্যাণ্ড (নামক একটি ইংরেজী রক ব্যান্ড) এর একটি সঙ্গীতের প্রেরণা হিসেবে এই উপন্যাসের কথা বলা হয়েছে। থম ইয়র্ক বলেছেন ১৯৯৫তে তাঁদের অ্যালবাম “The Bends” এর গান “Street Spirits (Fade Out)” এই উপন্যাসের অনুপ্রেরণায় রচিত হয়েছিল। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। এই উপন্যাস ওকরি এবং আফ্রিকান সাহিত্যকে সর্বসাধারণের কাছে পরিচিত করিয়ে দিয়েছিল। ওকরি হয়ত এই আবেগকে তত প্রাধান্য দিতে রাজী হবেন না।

The Famished Road-এ অ্যাজ়ারোর (ল্যাজ়ারো কিংবা ল্যাজ়ারাস নামের অপভ্রংশ – যেটা লেখক উল্লেখ করতে ভোলেন নি) জীবনের ঘটনা এবং দুর্ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সে হল একজন অ্যাবিকু মানে য়োরুবার কিংবদন্তির ভুতে পাওয়া বালক। অ্যাজ়ারো – তার পরাবস্তব সত্ত্বার তাড়নায় মৃত্যুর অপর পারে ফিরে যাবার হাতছানি আবার ইহজগতের ভালবাসার মানুষদের সাথে কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হবার আকুতি – এই দুই টানাপোড়েনের শিকার। ওর বাবার বক্সার হবার বাসনা; যাদুকরি/বার-মালিক মাদাম কোটোর খদ্দের টানবার স্বার্থে ওর যাদুক্ষমতার প্রতি আগ্রহ আবার ওর রক্তের ওপরেও লোভ, কারণ সেটার নাকি যৌবন ধরে রাখার ক্ষমতা ছিল; দুই পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক দলের (‘বড়লোকদের দল’ আর ‘গরীবদের দল’) অবিরত লেগে থাকা সংঘর্ষ এবং দুর্নীতি – এই রকম নানা ধরনের ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে তাকে এগিয়ে চলতে হয়। ওকরির চরিত্ররা পর্যায়ক্রমে বাস্তব আর পরাবাস্তব জগতের মধ্যে আসা যাওয়া করে। কাহিনীর পটভূমিকাও আফ্রিকার কর্কশ শহুরে বস্তিজীবন আর মোহময়-ছায়াময় স্বপ্নজগতের মধ্যে ক্ষিপ্রগতিতে অবস্থান বদল করে।

তৃতীয় বিশ্বের যে নামগোত্রহীন মহানগরীর উল্লেখ রয়েছে সেটা খুব সম্ভব ওকরির উত্তর ঔপনিবেশিক নাইজিরিয়ার প্রতিচ্ছায়া, যদিও তিনি সেখানে বহিরাগত। ওকরি নিজে য়োরুবা নন (যদিও তিনি ওদের ভাষায় কথা বলতে পারতেন)। “যাদু-বাস্তববাদ” কথাটির সম্বন্ধে তাঁর যথেষ্ট আপত্তি আছে, তবু তাঁর কল্প-জাগতিক ধারায় উত্তরণ নিয়ে অনেক কথাই বলা হয়ে থাকে, বিশেষ করে যখন তাঁর পূর্ব সাহিত্যকৃতির কল্পনায় ও নিষ্পাদনে বাস্তবেরই প্রতিফলন ঘটেছেঃ “আমি যাত্রা শুরু করলাম – যেটাকে বলতে পারি – উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দির বাস্তবতাবাদের নকশা দিয়ে – প্লট, চরিত্র, সম্প্রসার, প্লট এবং ঘটনার বিন্যাস, প্রতিটি ঘটনার মধ্যে যৌক্তিক সম্পর্ক। কিন্তু কালক্রমে উপন্যাস রচনার এই ধারা লক্ষ্য করে বুঝতে পারলাম যে বাস্তবতাবাদের মূল সমস্যা হল এটি বাস্তবকে পূর্ণমহিমায় প্রকাশ করতে পারে না। যেমন ধরুন, গতানুগতিক বাস্তবতাবাদের সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন কিংবদন্তির সহাবস্থান আমি লক্ষ্য করে দেখেছি। কি ভাবে বাস্তবকে তার পরিপূর্ণ মহিমায় প্রকাশ করা যায়, এই বিষয়ে অনুসন্ধান করতে করতে আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে বাস্তব আর বাস্তবতাবাদ এক নয় – তাই অভিমুখ বদলানোর প্রয়োজন, প্রয়োজন বর্ণনাকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাবার।”

এই উপন্যাসের উদ্ভাবনী কৃতিত্ব সম্পুর্ণরূপে এবং অতিসরলিকৃতভাবে আফ্রিকার লোককথার ওপর আরোপ করার প্রবণতা সম্বন্ধেও লেখক যথেষ্ট সন্দিহান। ওঁর অনুপ্রেরণার সাম্ভাব্য উৎস ওঁর বাবার দার্শনিক বইয়ের লাইব্রেরি। (ওকরির বাবা নাইজিরিয়া থেকে লণ্ডনে চলে এসেছিলেন আইনজীবি হবার জন্য।) “কার্যতঃ আমার পাঠক এবং সমালোচকদের অনেকেই এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করতে ভুলে যান। The Famished Road উপন্যাসটি মূলত এক দার্শনিক প্রহেলিকা – আমার কাছে অত্যন্ত জরুরি ধাঁধা – বাস্তব বলতে কি বোঝায়? বাস্তবতা আসলে ব্যক্তিনির্ভর – লালনপালন, ধারণা, মানসিকতা, ধর্মবিশ্বাস, আর অভিজ্ঞতা – এই সব কিছু মিলিয়ে সপ্রতিবন্ধ।”

ওকরির সর্বপ্রসিদ্ধ উপন্যাস – এবং অন্তত পশ্চিমের দৃষ্টিতে আফ্রিকান ঘরানার এক স্বতন্ত্র ধারার বাহক – The Famished Road এর মাহাত্ম্য বর্ণনা করার জন্য এটিকে বিভিন্ন ধরণের তকমায় ভূষিত করা হয়েছে – কল্পনাপ্রবণ, যাদু-বাস্তব, পরীক্ষামূলক, আধুনিকতাবাদী, উত্তর-আধুনিক, প্রগতির পুরোধা ইত্যাদি। অর্থাৎ, নানারকমের মাপকাঠিতেও এই উপন্যাস স্বতন্ত্র। The Famished Road রীতিমত দুষ্পাচ্য উপন্যাস – কাহিনীর বিন্যাস অরৈখিক, চক্রাকারে আবর্তনশীল, পুরোদস্তুর উপাখ্যান নির্ভর (অসংখ্য পরষ্পর সম্পর্করহিত উপাখ্যানের সন্নিবেশে রচিত এই মহাকাব্যিক উপন্যাস), প্রতি পদক্ষেপে যৌক্তিক ঘটনাপরম্পরা আর প্রথাগত সাহিত্যের ধারাকে অবজ্ঞা করে যাওয়ার প্রচেষ্টা। ওকরির গঠনপ্রণালী কিংবা রচনাশৈলির গভীর চর্চা না করেও – হয়ত খানিকটা যুক্তিসঙ্গত কারণেই – তাঁকে গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেজ় আর সালমান রুশদির সঙ্গে নিরন্তর তুলনা করা হয়েছে নিশ্চিতভাবেই তাঁর পীড়াদায়ক যাদু বাস্তবতার জন্য, আর নাইজেরীয় সাহিত্যের ধারাকে বহন করে চলার জন্য – চিনুয়া আচেবের সঙ্গে। নতুন প্রজন্মের আফ্রিকান সাহিত্যের প্রতিনিধিত্ব কে করেন এই কথা আচেবের জানতে চাওয়া হলে তিনি স্পষ্ট করেই ওকরির নাম করেন।

সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় লোকাচার আর রহস্যময়তার উপাদান থাকা মানেই সেখানে যাদুবাস্তবতার স্পর্শ রয়েছে। The Famished Road উপন্যাসে এই সব উপাদান স্থানও পেয়েছে। তা স্বত্বেও এই শৈলির উদ্ভাবনের কারণ হিসেবে কেবল কিছু উদ্ভট বিষয়বস্তুর অবতারণাকেই চিহ্নিত করা যায় না। এটিই হল এই ধরনের শৈলির গুরুতর ভ্রান্তি। যেমন ধরা যাক, পশ্চিমী পাঠকরা পুরাকথাকে স্বাভাবিক কারনেই ইতিহাস বলে ভুল করে ধরে নিতে পারেন, যেহেতু তাঁরা লেখকের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সম্বন্ধে অবহিত নন। একজন পশ্চিমী সাহিত্যিকের এই ধরনের লেখাকে কৌশলী লেখা বলে মনে করা হলেও, তৃতীয় বিশ্বের একজন সাহিত্যিকের লেখাকে কেবল ব্যতিক্রমী অজ্ঞেয় ভাবনার প্রকাশ বলে ভাবা হবে। সে কারনেই The Famished Road কে শুধু মাত্র এক যাদু বাস্তব উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করা হলে – যদিও এটি সেই ধরনেরই উপন্যাস – এর মাহাত্ম্যকে কিছুটা খাটো করা হবে। এটিকে একটি রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবেও চিহ্নিত করা দরকার, যেখানে আফ্রিকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নাগরিক জীবন যে সব প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে সেটাও তুলে ধরা হয়েছে।

অবশ্য এই উপন্যাস নিজগুণেই স্বতন্ত্র, একে কোন বিশেষ শ্রেণীতে ফেলা অসম্ভব।

মাত্র গত ডিসেম্বরে The Guardian পত্রিকায় এমন একটি ব্যাপার নিয়ে লেখেন যেটি শুধু মাত্র আমার কাছে প্রিয় তাই নয়, বরং বলা যেতে পারে একটি লেখার মাধ্যমে শুধু একজন লেখক নন একটি সংষ্কৃতিকে সামগ্রিক ভাবে আলোচনার জন্যও জরুরি । আমার কোন লেখার মধ্যে শিল্পকর্ম না খুঁজে নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধান করলে কেন আমার উষ্মা জন্মায় সেটি জানার জন্য প্রয়োজন। ওকরি কেবল মাত্রু বিষয়বস্তু অনুসন্ধানের জন্য পাঠের বিপদ সম্বন্ধে বলেছেন, “কালো এবং আফ্রিকান লেখকদের রচনার উপলব্ধির ব্যাপারে একটা অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়। বিষয়বস্তুর নিরিখে তাদের গুরুত্ব বিচার করা হয়। আমরা ফ্লবেরের লেখা তার সৌন্দর্যের জন্য পড়ি; উদ্ভাবনী ক্ষমতার জন্য জয়েস পড়ি; ভার্জিনিয়া উলফের লেখনীর কাব্যগুণের কদর করি; আর জেন অস্টেনকে তাঁর মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণের জন্য সমাদর করি। কিন্তু যখনই আমরা কোন কৃষ্ণকায় বা আফ্রিকান লেখকের লেখা পড়ি তখন আমরা বিষয়বস্তুর অনুসন্ধান করি – যেমন, ক্রীতদাসপ্রথা, ঔপনিবেশিক ইতিহাস, দারিদ্র, গৃহযুদ্ধ, কারাদণ্ড, স্ত্রী লিঙ্গচ্ছেদন – অর্থাৎ সংক্ষপে বলতে গেলে বাকি দুনিয়ার দৃষ্টিতে সেই বিষয় সমূহ যা আফ্রিকার এবং কৃষ্ণকায় জনগনের যন্ত্রণাগুলিকে প্রতিফলিত করে। এইসব বিষয়বস্তুর প্রেক্ষিতে তার মান নির্ধারিত হয়। কিন্তু কেন? আমরা জানি কেন – কারণ যাঁরা পশ্চিমের বাসিন্দা – যাঁদের জীবনে এই ধরনের কষ্ট বিরল – তাঁরা এই ধরনের সাহিত্যের মধ্যে সাময়িক উত্তেজনা আর অবসর বিনোদনের অবকাশ পান।”

আমার এই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন শেষ করার আগে, আমি The Famished Road উপন্যাসের কিছু ভিন্নধর্মী রম্য অনুচ্ছেদ থেকে উদ্ধৃতি দিতে চাই যেগুলি বোঝার জন্য পূর্বাপর সম্বন্ধ জানার প্রয়োজন পড়ে না। “অস্তিত্বজনিত সংগ্রামের তীব্রতা”-কে আর কে এত আশ্চর্যজনকভাবে তালিকাভুক্ত করতে পারবেন একেবারে উপন্যাসের প্রথম পাতায় – যেমন ওকরি করেছেন? “অতৃপ্ত সাধ, সন্নিবেশিত জাগতিক অবিচার, প্রেমজ জটিল সমস্যা, পিতামাতার অজ্ঞতা, মৃত্যুর মত রূঢ় সত্যের মুখোমুখি হয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অপার সৌন্দর্যরাশির মধ্যে এক বিস্ময়কর উদাসীনতায় বেঁচে থাকা।” অথবা, “প্রেম মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। মানুষ মৃত্যু সম্বন্ধে ততখানি ভীত নয়, যতখানি ভালবাসা সম্বন্ধে। পাহাড়ের চেয়ে হৃদয়ের বিশালত্ব অনেক বেশি। একটি মানবজীবন সমুদ্রের চেয়ে গভীর। আমাদের চেতনার গভীরে আশ্চর্য ধরনের মাছ আর সামুদ্রিক জীব এবং বিশালাকায় উদ্ভিদ অবস্থান করছে। সম্পূর্ণ মানবেতিহাস আমাদের হৃদয়ের অনাবিষ্কৃত মহাদেশ।” আর আমি জানি, এখানেই শেষপর্যন্ত সমালোচকরা ভুল করেন, শেষ পঙতির প্রতিভাস থেকে সিদ্ধান্তে আসতে চেষ্টা করেন। কিন্তু যখন ওকরি বলেন যে এই সমগ্র যাত্রাপথ কেবলমাত্র একটি অনবগুণ্ঠিত কাহিনীবিন্দুর বিভ্রমকে অতিক্রম করে যায়, কারণ, “স্বপ্নও জীবনের সর্বোচ্চ বিন্দু হতে পারে” , তখন তাঁর ওপর ভরসা রাখুন। যদিও The Famished Road উপন্যাসের কাহিনীর সিংহভাগ আমাদের এক অলীক অশরীরী জগতে টেনে নিয়ে যায়, আমরা যদি এর স্পর্শনাতীত, অনুচ্চার্য, ভাস্বর আর নির্ভার উৎকর্ষ – যা যে কোন সফল সাহিত্যকীর্তির প্রাণশক্তি – এই আবরণকে পেরিয়ে যেতে পারি, তাহলেই আমরা এই উপন্যাসের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারব।

1 টি মন্তব্য:

  1. নবীরুল ইসলাম বুলবুল১০ নভেম্বর, ২০১৭ ৮:৫৮ PM

    অনবদ্য। সুন্দর। সুখপাঠ্য।

    উত্তরমুছুন