রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

ফিওদর দস্তয়েভস্কির গল্প : এক হাস্যাস্পদ ব্যক্তির স্বপ্ন

অনুবাদ: অভিজিৎ মুখার্জি

আমাকে নিয়ে হাসাহাসি হওয়ার মতই লোক আমি। আজকাল অবশ্য আমাকে পাগল বলা হচ্ছে। এটাকে আমার পদোন্নতি বলেই গণ্য করা যেত, যদি না এখনও আমাকে সেই আগের মতই হাস্যকর ঠেকত সকলের। তবে আমি আর এখন কিছু মনে করি না এতে— এমনকি যখন আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে, তখনও ওদের বেশ ভালো লাগে আমার— সত্যি বলতে কী, ঠিক ওই তখনই যেন কী কারণে ওদের আমার ভালো লাগে।
আমিও ওদের সঙ্গে হাসি— নিজেকে হাস্যকর গণ্য করে নয়, বরং ওদের ভালবাসি বলেই হাসি— কেবল হাসতামই, কিন্তু ওদের দেখে আমার কষ্টও হয়। কষ্ট হয় একথা ভেবে যে ওরা সত্যটা জানে না, অথচ আমি জানি। একা, কেবল নিজে, সত্যিটা জানার যে কী কষ্ট! কিন্তু ওরা তো সেকথা কখনো বুঝবে না। না, ওরা বুঝবে না।

আমাকে যে হাস্যাস্পদ বলে ঠাওরানো হয়, ভেবে আমি খুবই আহত হতাম। আমার নিজের তো তা মনে হয়নি কখনো। চিরকালই আমি হাস্যকর ওদের কাছে, এবং জন্মে থেকে সেকথা আমি জানি। সম্ভবত আমার যখন সাতবছর বয়েস, তখনই আমি এটা টের পাই, তারপরে আমি স্কুলের পাঠ নিই, বিশ্ববিদ্যালয়েরও পাঠ নিই, কিন্তু তাতে কী হয়েছে? যত এগিয়েছে আমার পড়াশুনো ততই টের পেয়েছি যে আমাকে নিয়ে হাসাহাসি হয়। আর এইভাবে, আমার নিজের দিক থেকে বলতে পারি, যতই ব্যাপারটা নিয়ে খতিয়ে ভেবেছি, বিজ্ঞান জিনিসটা শেষ বিচারে হয়ে উঠেছে এইটেই প্রমাণ এবং ব্যাখ্যা করবার উপায় যে আমি প্রকৃতপক্ষেই হাস্যাস্পদ। জীবনের থেকেও সেই একই শিক্ষা আমি পেলাম। আমি যে কতখানি হাস্যকর সে সম্বন্ধে আমার সচেতনতা বছরে বছরে বাড়তে লাগল ও পরিণত হতে লাগল। সব্বাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত আর সর্বক্ষণই সেটা চলত। আমি যে কতখানি হাস্যাস্পদ সে বিষয়ে যে জগতের সবার মধ্যে আমিই সবচেয়ে সচেতন সেটা কিন্তু ওদের মধ্যে কেউই জানত না, এতটুকু অনুমানও করতে পারেনি, আর এই না জানাটাতেই আমি সবচেয়ে আহত বোধ করতাম, তবে দোষটা পুরোপুরি আমারই : নিজের গুমোরের কারণেই আমার এই জানাটা আমি কারুর কাছে স্বীকার করতে পারিনি। যতই দিন যাচ্ছিল আমার এই গুমোর আরও স্ফীত হয়ে উঠছিল, এবং যদি কারো কাছে স্বীকার করে ফেলতাম যে আমি লোকটা হাস্যকর, মনে হয় সেই রাতেই আমি হয়তো নিজের মগজটিকে ফু দিয়ে নিভিয়ে দিতাম। বয়ঃসন্ধির সময়টায় এ যে কী যাতনা ছিল! একটা আতঙ্ক, যে আমি হয়তো দুর্বল হয়ে পড়ে বন্ধুদের কাছে এটা ফাঁস করে ফেলব। প্রাপ্তবয়স্ক হতে হতে আমার এই বিদঘুটে প্রতিবন্ধকতা সম্বন্ধে আমি ক্রমেই আরো অবহিত হয়ে উঠলেও, কোনও কারণে, কিছুটা অবিচলিত ভাবেই জিনিসটাকে গ্রহণ করতে সক্ষম হচ্ছিলাম। আবারও বলছি— ‘কোনও কারণে’, কেননা আজ পর্যন্ত আমি সে জিনিসের কোনও পরিষ্কার সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে পারিনি। আমার নিজের চেয়েও অনেক অনেক বড় কিছু একটা নিয়ে আমার প্রাণে যে একটা নিরাশ বিষন্নতা স্তূপীকৃত হচ্ছিল, তার কারণেই হয়তো। এই ‘কিছু একটা’ আসলে ছিল ক্রমেই বিশালকায় হতে থাকা আমার একটা বিশ্বাস যে কিছুই অপরিহার্য নয় । অনেকদিন আগেই থেকেই আমার এটা মনে হচ্ছিল, কিন্তু একেবারে নিশ্চিত বিশ্বাসে পর্যবসিত হল হঠাৎ করেই একদিন, গতবছর। হঠাৎই একদিন মনে হল, এই বিশ্ব-জগৎটার অস্তিত্ব থাকুক কিংবা কোত্থাও কিচ্ছুটি না থাকুক আমার তাতে কিছুই আসবে যাবে না। আমার সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে জানলাম এবং অনুভব করতে শুরু করলাম যে আমি যতদিন ধরে আছি ততদিন ধরে কোনও কিছুই ছিল না এবং নেই। প্রথমটায় ভাবতাম যে তার আগে নিশ্চয়ই অনেক কিছুই ছিল, কিন্তু তারপর টের পেলাম যে আগেও কিছু ছিল না, কোনও কারণে মনে হচ্ছিল যে ছিল। ক্রমশই আমি নিশ্চিত হলাম যে কখনোই কিছু থাকবেও না। তখন থেকে হঠাৎ করেই আমার আর লোকের কথায় কিছু মনে হত না, তাদের আর খেয়ালই করতাম না। খুবই ছোটখাটো ব্যাপারেও কথাটা খাটত : যেমন ধরুন, রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে আমি লোকজনকে ভেদ করে চলে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। এমন নয় যে আমি কোনও চিন্তায় তখন গভীরভাবে নিমগ্ন, কেননা চিন্তা করার মত আছেই বা কী, চিন্তা টিন্তা করাই ছেড়ে দিয়েছি তখন : কিছুতেই কিছু আসে যায় না আমার। কোনও সমস্যারও সমাধানের চেষ্টা করতাম না ; না, একটারও না, যদিও অনেক সমস্যাই ছিল। কিন্তু আমার আর কিছু আসে যায় না তাতে, সমস্যাগুলোও দূরে সরে গিয়ে গৌণ হয়ে গেল।

অনেক পরে গিয়ে সত্যটা জানতে পারলাম। নভেম্বর মাসে, আরো সঠিক করে বললে, ৩রা নভেম্বর, সত্যটা আমি জানতে পারলাম, আর তারপর থেকেই আমি আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের কথা মনে করতে পারি। এটা ঘটল এক বিষাদ ভারাক্রান্ত রাতে, যতটা বিষাদ ভারাক্রান্ত রাত হতে পারে আদৌ। হেঁটে বাড়ি যাচ্ছিলাম, দশটা বেজে গেছে, মনে পড়ছে যে আমি তখন ভাবছিলাম, এর চেয়ে অন্ধকার সময় আর হয় না। নৈসর্গিকভাবেও পরিস্থিতি ছিল সেরকমই। সারাদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছিল, এত ঠাণ্ডা আর দমিয়ে দেওয়া বৃষ্টি, এমনকি একটা অশুভ ধরনের বৃষ্টিই বলা যায়, আমার মনে আছে। বলাবাহুল্য, মানুষজনের পক্ষে খুবই প্রতিকূল, আর হঠাৎ করেই দশটার পরে বৃষ্টিটা থেমে গেল, একটা বিচ্ছিরি আর্দ্রতা ছেয়ে রইল, বৃষ্টি যখন হচ্ছিল তখনকার চেয়েও যেন ঠাণ্ডা আর ভিজে ভিজে, সবকিছু থেকে কেমন ভাপ উঠছিল, রাস্তার প্রত্যেকটা কালো পাথরগুলো থেকে, প্রত্যেকটা গলিঘুঁজিতেও, যদি আপনি সেগুলোর একেবারে ভেতরদিকে, অন্ধকার ফাঁক ফোকরের দিকে ঠাহর করে দেখেন। আমি হঠাৎই কল্পনার চক্ষে যেন দেখতে পেলাম যে গ্যাস-লাইটগুলো যদি সব নিভে যায়, তাহলেও মনটা আরেকটু যেন উজ্জীবিত বোধ করতে পারে, কেননা গ্যাস-লাইটগুলোর জন্যই এগুলো সব চোখে পড়ছে, আর তাতেই আরো নিরানন্দ লাগছে। সেদিন আমার প্রায় কিছুই খাওয়া হয়নি, সন্ধের পর থেকে আমি পরিচিত এক ইঞ্জিনীয়ারের ওখানে কাটিয়েছি, ওঁর দুই বন্ধুও ছিলেন সেখানে। সারা সন্ধে আমি একটাও কথা বলিনি, তাতে তাঁরা নির্ঘাত বেশ বোর হয়েছেন। কী যেন একটা উত্তেজক প্রসঙ্গ নিয়ে ওঁরা আলোচনা করছিলেন, এবং সেই নিয়ে নিজেদের মেজাজও হারিয়ে ফেলছিলেন। শুধু শুধুই মেজাজ হারাচ্ছিলেন, কিন্তু আমি দেখলাম, তাতে তাঁদের কিছু এসে যাচ্ছিল না। আমি গিয়ে পড়ে, ঝট করে ওদের বলে বসলাম, “দেখুন মশাই, জানেন তো, আপনাদের কিন্তু আসলে তেমন কিছু আসে যায় না।” ওঁরা কিছু মনে করলেন না এতে, কেবল আমার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন। এর একটা কারণ হল, আমার কথার মধ্যে কোনও ঝাঁঝ ছিল না, নেহাত কিছু না ভেবেই আমি মন্তব্য করে বসেছিলাম। ওঁরা বুঝতেই পারলেন যে আমারও কিছু এসে যাচ্ছিল না, আর তাতেই ওঁরা হেসে উঠেছিলেন।

হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফেরার সময়, গ্যাস-লাইটের কথা ভাবছিলাম, একবার আকাশের দিকেও মুখ তুলে চেয়ে দেখলাম। আকাশ ভয়ানক অন্ধকার, কিন্তু পরিষ্কার চোখে পড়ল, ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ আর তাদের মধ্যে অনন্ত গভীরতার সব গহ্বর। ওরই মধ্যে একটা গহ্বরের ভেতরে চোখে পড়ল মিটমিট করছে একটা ছোট্ট তারা, সেটার দিকে তাকিয়ে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। দাঁড়িয়ে গেলাম, কেননা ঐ ছোট্ট তারাটার কারণে আমার মাথায় একটা আইডিয়া এল : সেই রাতেই আমি নিজেকে শেষ করে দেব। দু’মাস আগেই আমি এটি করতে পুরোপুরি মনস্থির করে ফেলেছিলাম, টাকাপয়সার ভয়ানক টানাটানি সত্ত্বেও একটা দারুণ রিভলভার কিনে সেদিনই সেটাতে গুলিও ভরে ফেলেছিলাম। তারপরে দু’মাস কেটে গেছে যদিও, এখনো ওটা আমার ডেস্কের ড্রয়ারেই রয়ে গেছে ; কিছুতেই কিছু এসে যায় না ভাবটা আমার মধ্যে তখন এতই প্রবল যে আমি চেয়েছিলাম এমন একটা সময়ে ওটা করতে যখন সেই ভাবটা একটু কম থাকবে, কেন— তা বলতে পারব না। আর এই কারণে, দু’মাস ধরে প্রত্যেক রাতে আমি বাড়ি ফিরেছি নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবতে ভাবতে। নজর রাখছিলাম কখন সঠিক সময়টা আসে। এবারে এই তারাটা দেখে আমার মাথায় আইডিয়াটা এল, মনস্থির করে ফেললাম যে এই রাতেই কাজটা সেরে ফেলতে হবে। জানি না কেন ঐ ছোট্ট তারাটা দেখে এই আইডিয়াটা এল।

আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, হঠাৎ করেই ছোট্ট মেয়েটা এসে আমার হাতটা আঁকড়ে ধরল। রাস্তা ততক্ষণে ফাঁকা হয়ে গেছে, আশেপাশে জনপ্রাণীটি নেই। একটু দূরে একটা ড্রশকি দাঁড়িয়ে আছে, ড্রাইভার তার ভেতরে নিদ্রাতুর। মেয়েটার বয়েস বছর আটেকই হবে। ওই ঠাণ্ডায় পরে আছে একটা হতদরিদ্র সূতির ফ্রক আর একটা ওড়না, যদিও সর্বাঙ্গ ভিজে, আমার বিশেষ করে চোখে পড়ল ওর ভেজা, ফেটে যাওয়া জুতোজোড়া। এখনও আমার মনে আছে ওদু’টোর কথা। ওরাই আমাকে নাড়া দিয়েছিল সবচেয়ে বেশি। হঠাৎই মেয়েটা আমার কনুই টেনে ধরে কাঁদতে শুরু করেছিল। ফুঁপিয়ে কান্না নয়, টুকরো টুকরো কথা কেঁদে কেঁদে বলছিল, সর্বাঙ্গ জ্বরাক্রান্তের মত এমন কাঁপছিল যে গুছিয়ে বলতে পারছিল না। কিছু একটাতে ভয় পেয়ে মরীয়া হয়ে বলে উঠছিল : “আমার মা, আমার মা!” ওর দিকে একটু ঘুরলেও, মুখে কোনও কথা না বলে আমি হেঁটেই চলছিলাম, আর ও আমার পেছন পেছন দৌড়ে দৌড়ে আসছিল, আমার কোট ধরে টানছিল, কন্ঠস্বরটাই এমন যা কেবল ভীতসন্ত্রস্ত শিশুরা হতাশ হয়ে পড়লে উঠে আসে। ওই আওয়াজ আমি চিনি। যদিও কথাগুলো অসংলগ্ন, আমি বুঝতে পারছিলাম যে ওর মা কোথাও একটা মুমূর্ষু হয়ে পড়ে আছে, কিংবা অন্য কোনও বিপর্যয় ঘটেছে ওদের, আর ও রাস্তায় ছুটে বেরিয়ে এসেছে, কারুকে একটা কিংবা কিছু একটা পেয়ে মা’র যাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু আমি ওর সঙ্গে যাইনি ; বরং হঠাৎ করেই আমার ওকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা মনে হল। আমি ওকে কোনও পুলিশের খোঁজে যেতে বললাম। ও কাঁদতে কাঁদতে হাত জোড় করে আমার কাছে কাকুতি মিনতি করতে থাকল, সর্বাঙ্গ কাঁপছে। আমার পাশে পাশে দৌড়ে যাচ্ছিল, কিছুতেই ছাড়বে না আমাকে। আমি এবার রুখে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম ওকে লক্ষ্য করে। ও শুধু বলছিল, “বাবু গো, ও বাবু!” তারপর আচম্বিতে আমাকে ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে রাস্তার ওপারে ছুটে গেল : আরেকজন লোক সেখান দিয়ে যাচ্ছে চোখে পড়তেই আমাকে ছেড়ে দিয়ে তার দিকে ছুটে গেল।

বাড়ির পাঁচধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠে এলাম। অনেক ঘর ভাড়াটে, এমন একটা বাড়িতে আমি থাকি। ঘরটা জরাজীর্ণ এবং খুবই অপরিসর, ঘুলঘুলির মত উচ্চতায় একটামাত্র জানালা, অর্ধবৃত্তাকার। আসবাবপত্র বলতে, একটা অয়েলক্লথে ঢাকা সোফা, দু’টো চেয়ার, একটা টেবিল, যার ওপরে আমার বইগুলো রাখা, একটা আর্মচেয়ার, খুবই পুরনো, তবু ভোলতেয়ার আর্মচেয়ার একখানা। বসে নিয়ে একটা মোমবাতি জ্বাললাম, তারপর ভাবতে বসলাম। পাশের ঘরটি একটি প্রকৃত পাগলাগারদ। গত পরশু থেকে ব্যাপারটা চলছিল। ঐ ঘরের বাসিন্দা এক চাকরি খোয়ানো ক্যাপটেন, তার আবার অতিথিরা এসেছেন, জনা ছ’য়েক— জীবনসমুদ্রে পরিত্যক্ত মানুষেরা— ভোদকা খাচ্ছে আর পুরনো একতাড়া তাস দিয়ে স্টস খেলে যাচ্ছে। গতরাতে একবার মারামারি লেগে গেছিল, ওদের মধ্যে দু’জন অনেকক্ষণ ধরে পরস্পরের চুলের মুঠি ধরে টানাটানি করছিল বলে জানতে পেরেছি। বাড়ির মালকিন ওদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু উনি ক্যাপটেনকে ভয়ানক ভয় খান। ভাড়াটেদের মধ্যে এছাড়া আর আছেন শুধু এক শীর্ণকায়া ছোটখাটো মহিলা, এক অফিসারের স্ত্রী, তিনটে ছোট বাচ্চা নিয়ে শহরে নতুন এসেছেন, বাচ্চারা এখানে এসে থেকেই তিনজনই অসুস্থ। মহিলা আর তার বাচ্চারা ক্যাপটেনকে যমের মতো ভয় করে, ভয়ে কম্পমান হয়ে প্রার্থনা করতে করতে রাত কাটায়, আর একেবারে ছোটটা, সে তো একবার ভয়ে ফিটও হয়ে গিয়েছিল। এটা আমি জানি যে ক্যাপটেন মাঝেমাঝে নেভিস্কির ধারে দাঁড়িয়ে লোককে ধরে কিছু সাহায্য করতে বলে। ও কোনো পোস্টে কাজ আর পাবে না, কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে (সেই কারণেই আমি এত কথা বলছি), এই এতগুলো মাস যাবত ও যে আমাদের সঙ্গে আছে, কদাপি একবারের জন্যও আমাকে ঘাঁটায়নি। স্বাভাবিকভাবেই আমি প্রথম থেকেই ওকে এড়িয়ে চলেছি, আর এই ব্যক্তিও আমার সঙ্গে প্রথম আলাপ হওয়ার পর থেকেই আমাকে উটকো লোক বলে ধরে নিয়েছে, ফলত নিজেদের ঘরের ভেতরে ওরা যতই চেঁচাক, যতজন মিলেই হোক—আমার কিছু আসে যায় না। সারা রাত আমি বসেই কাটিয়ে দিই, কিন্তু সত্যি বলছি, ওদের কিছু আমার কানেই আসে না, এতটাই ওদের কথা আমি বিস্মৃত হয়ে থাকি। জানেন তো, আমার একেবারেই ঘুম আসে না ; বছরখানিক যাবত এরকমই চলছে। রাতটা আর্মচেয়ারে বসে কিচ্ছুটি না করে কাটিয়ে দিই। দিনের বেলায় কেবল বইটই পড়ি, স্রেফ বসে থাকি, কিছু ভাবিও না। আমার চিন্তাভাবনা সব অর্থহীন, অসংলগ্ন, এবং সেগুলোকে ওভাবেই এলোমেলো ঘুরে বেড়াতে দিই আমি। প্রত্যেক রাতেই মোমটা পুড়ে শেষ হয়ে যায়। অতএব আমি শান্ত হয়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলাম, রিভলভারটা বের করে টেবিলের ওপর আমার সামনেই রাখলাম। মনে পড়ছে, ওটা ওখানে রাখার সময় আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম, “তুমি নিশ্চিত তো?” এবং তারপরেই উত্তরে বেশ জোর দিয়ে বললাম, “হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত।” অর্থাৎ এবারে আমি নিশ্চিতভাবেই নিজেকে শেষ করে দেব, তবে সেটি করার আগে কতক্ষণ এইভাবে টেবিলে বসে থাকব তা জানি না। আমি নির্ঘাত নিজেকে শেষ করেই দিতাম, যদি না ঐ ছোট্ট মেয়েটার ব্যাপারটা ঘটত।



ব্যাপারটা কেমন ছিল জানেন তো : যদিও আমি কিছুরই তোয়াক্কা করছিলাম না, কিন্তু ধরুন, ব্যথার অনুভূতি তো তখনও আছে। কেউ আমাকে আঘাত করলে আমার ব্যথার অনুভূতি হবে। মানসিক দিক থেকেও একেবারেই তাই : যদি খুব মর্মান্তিক কিছু ঘটে আমার দুঃখ হবে, এ জগতের কোনও কিছুরই তোয়াক্কা না করার এই পর্যায়টার আগেও যেমন হত। সেই রাতে কিছু আগের ঐ ঘটনাটায় আমার দুঃখ বা করুণার অনুভূতি হয়েছিল বৈকি : বিপদে পড়া একটা শিশুকে সাহায্য করা আমার অবশ্যই উচিত ছিল। তাহলে কেন তখন সাহায্য করলাম না? কারণ একটা ভাবনার উদয় হয়েছিল ; মেয়েটা যখন আমার কোট ধরে টানছিল, কান্নাকাটি করছিল, হঠাৎ করেই একটা সমস্যার মুখোমুখি হলাম আমি, এবং সেটার সমাধান করতে পারছিলাম না। একেবারেই অযথা একটা সমস্যা, কিন্তু আমার রাগ হয়ে গিয়েছিল। রাগ হয়েছিল কারণ : সেই রাত্রেই আত্মহত্যা আমি করবই বলে ঠিক করে ফেলায়, জগতের কোনও কিছুতেই আমার ভ্রূক্ষেপ করার কথাই ছিল না। তাহলে কেন হঠাৎ করেই মনে হল যে আমি ভ্রূক্ষেপ করছি, আর ছোট্ট মেয়েটার জন্য দুঃখ হচ্ছে? মনে পড়ছে, মেয়েটার জন্য ভয়ানক দুঃখ হচ্ছিল, সেই দুঃখে মিশে ছিল আশ্চর্য বিষাদ যা ঐসময় আমার পরিস্থিতিতে বেশ অদ্ভুতই। অল্পসময়ের জন্য সেই অনুভূতি এর চেয়ে ভালো করে বর্ণনা করা সত্যিই আমার পক্ষে সম্ভব নয়, আর, এমনকি আমি যখন আমার ঘরে গিয়ে পৌঁছলাম, ভেতরে গিয়ে বসলাম, তখনও অনুভূতিটা রয়ে গেল, বহুদিনের মধ্যে আমাকে এতটা তাড়িত আর অন্য কিছুই করেনি। একটার পর একটা কথা মাথায় এসে ভিড় করছিল। এটা তখন আমার কাছে একেবারেই পরিষ্কার যে আমি যদি তখনও একজন মানুষ থেকে থাকি, যে একেবারে শেষ হয়ে যায়নি, ওই ঘটনাটার সময়ও যদি কিছু অবশিষ্টই ছিল, তাহলে আমি জীবিত ছিলাম বলেই বলতে হবে, ফলত আমার ওই ভূমিকার জন্য আমার কষ্ট, দুঃখ এবং লজ্জাবোধও হওয়ারই কথা। কিন্তু আমি যে তার কয়েক ঘন্টার মধ্যে নিজেকে শেষ করে দিতে যাচ্ছিলাম, তাতে ঐ মেয়েটাকে নিয়ে আমি তখন মাথা ঘামাব কেন, আদৌ লজ্জা কিংবা অন্য কিছুর তোয়াক্কা করব কেন? আমি তখন শেষ, একেবারে কিচ্ছুটি নই। এমনটা কি হতে পারে, আমার যে অবিলম্বেই একেবারে নিশ্চিত আর কোনও অস্তিত্ব থাকবে না, এবং এর ফলে কোথাও কিছুরই অস্তিত্ব থাকবে না, এতেও সেই মেয়েটার জন্য দুঃখ হওয়ার এবং আমার ঐ জঘন্য ভূমিকার জন্য লজ্জা অনুভব করার ক্ষমতা আমার মধ্যে একেবারে অটুটই ছিল? কেননা, যে কারণে আমি ওরকম রুখে দাঁড়িয়ে একেবারে বর্বরের মত চেঁচিয়ে উঠেছিলাম বেচারা শিশুটাকে লক্ষ্য করে, সেটা হল, আমি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলাম যে “করুণা হওয়া তো দূরের কথা, আমার পক্ষে এমনকি অমানুষের মত জঘন্য আচরণ করাও সম্ভব তখন, কেননা আর দু’ঘন্টার মধ্যেই সব কিছু মিলিয়ে যাবে”। আপনারা কি বিশ্বাস করবেন, যদি আমি বলি যে এই কারণেই আমি চেঁচিয়ে উঠেছিলাম? আমি প্রায় নিশ্চিত এখন যে এইটাই ছিল কারণ। আমার কাছে তখন পরিষ্কার যে জীবন এবং জগতের তখন আমার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই, আগেও যেটা ছিল না। আমার এমনকি এরকমই বলা উচিত যে জগতটাকে মনে হচ্ছিল যেন বিশেষ করে আমার একার জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে : আমি নিজেকে শেষ করে দিলেই জগতটাও আর থাকবে না, অন্ততপক্ষে আমার দিক থেকে বিবেচনা করলে। এমন একটা সম্ভাবনার কথা যদি উড়িয়েও দিই যে আমি চলে গেলে কারুর জন্যই আসলে কিছু থাকবে না, যে মুহূর্তে আমার চেতনাটি লুপ্ত হবে, অমনি সমস্ত জগত, যার উদ্ভবই হয়েছে নেহাতই আমার চেতনাতে, তৎক্ষণাৎ সেটিও লুপ্ত হয়ে যাবে, মরীচিকার মতো মিলিয়ে উধাও হয়ে যাবে, কেননা এমন হতেই পারে যে আমাদের এই জগৎ, এইসব মানুষ সবই স্রেফ আমারই অংশ, সবটাই নেহাতই এই আমি। মনে পড়ছে, বসে বসে যখন এইসব যুক্তিজাল বুনছি, মনে ভিড় করে আসা এইসব সমস্যাকে যেন একটা নতুন রূপ দিলাম, আর কিছু এক্কেবারে নতুন আইডিয়াও যেন উপলব্ধী করলাম। যেমন ধরুন, এক অদ্ভুত ভাবনা আমার মাথায় এল : ধরা যাক, যেন আমি একসময় চাঁদে কিংবা মঙ্গলগ্রহে বাস করতাম আর সেখানে, যতদূর কল্পনা করা যায় এমন সব চূড়ান্ত অন্যায় ও ন্যক্কারজনক কাজ করেছি, এবং সেসবের জন্য, একমাত্র দুঃস্বপ্নেই ঘটতে পারে এমন সব তিরস্কার ও অসম্মান সইতে হয়েছে। ধরা যাক, এরপর আমি এসে পড়লাম এই পৃথিবীতে, অন্যান্য গ্রহে যেসব অপরাধ করেছি সেসবের স্মৃতি তখনও আমার চেতনায় পূর্ণরূপে জাগরূক, আর সঙ্গে এও জানি যে কোনও পরিস্থিতিতেই আমার আর কখনো ওখানে ফেরত যাওয়া হবে না— এমতাবস্থায় পৃথিবী থেকে যখন চাঁদের দিকে তাকাব, আমার কি কিছু এসে যাবে? কৃতকর্মের জন্য আমি কি লজ্জাবোধ করব? এসব যাবতীয় প্রশ্নই অযথা এবং অপ্রয়োজনীয় কেননা রিভলভারটা আমার সামনেই রয়েছে এবং আমি আমার সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে জানি যে এবারে অবধারিত ঘটতে চলেছে ঘটনাটি, তবু এইসব প্রশ্ন আমাকে উত্তেজিত করে তুলছিল, একপ্রকার উন্মত্ততা জাগিয়ে তুলছিল। কয়েকটা ব্যাপারের একটা কিছু বিহিত করে ওঠার আগে আর মরতে পারব বলে মনে হচ্ছিল না। এক কথায়, সেই ছোট্ট মেয়েটা আমাকে জীবনদান করেছিল কারণ সেই সমাধান না পাওয়া প্রশ্নগুলোর কারণে আমার আর মরা হল না। ইতিমধ্যে ক্যাপটেনের ঘরের হট্টগোলও স্তিমিত হতে শুরু করেছে : ওদের খেলা শেষ হয়ে শোয়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছে, সঙ্গে কিঞ্চিত গজরানো, ঘুমচোখে পারস্পরিক গালাগালের একটা শোধবোধ। আর এই সময় আমি আকস্মিকই টেবিলের সামনে চেয়ারটায় বসে ঘুমিয়ে পড়লাম, যা আমার এর আগে কক্ষণো হয়নি। কখন যে শুয়ে পড়েছি, তার কিছুই জানি না। আমরা সকলেই জানি, স্বপ্ন হচ্ছে এক বিচিত্র জিনিস : কোনওটা এত বিচ্ছিরি রকমের স্পষ্ট হয়ে রয়ে যায়, প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি, কল্পনা করা কঠিন এমনই একেবারে নিখুঁতভাবে ধরা থাকে, অন্যটা সময় ও পরিসরের হিসেবে এমন দ্রুত ঘটে যায় যে তার যাত্রাপথটা খেয়ালই থাকে না। আমার বিশ্বাস, স্বপ্নকে চালিত করে ইচ্ছে, কোনওরকম কারণ নয়, মনের চেয়েও হৃদয় বেশি কাজ করে সেখানে, তবু মাঝেমাঝে আমার স্বপ্নে যুক্তিবোধ যে কী অসামান্য সব যাদু দেখিয়ে দেয়! ঘুমের মধ্যে আমার যুক্তির ভিতরে অবিশ্বাস্য সব ব্যাপার ঘটে যায়। একটা উদাহরণ দিচ্ছি : পাঁচ বছর হল আমার ভাই আর বেঁচে নেই। মাঝে মাঝে আমি তাকে স্বপ্নে দেখি : আমার নানা ব্যাপারে ওর খুব আগ্রহ, দু’জন দু’জনকে খুবই পছন্দ করি, তা সত্ত্বেও পুরো স্বপ্নটা জুড়েই কিন্তু আমার পুরোপুরি খেয়াল থাকে যে সে মারা গেছে, কবর দেওয়া হয়ে গেছে। তাহলে আমার কেন আশ্চর্য লাগে না যে যদিও বেঁচে নেই, তবু যে সে আমার পাশেই রয়েছে, আমার ব্যাপারে দুর্ভাবনাগ্রস্ত হচ্ছে? আমার যুক্তিবোধ কী করে স্বেচ্ছায় এইসব মেনে নিতে পারে? যাকগে, অনেক হয়েছে। আমার স্বপ্নের কথায় ফেরা যাক। হ্যাঁ, ৩রা নভেম্বর যে স্বপ্ন দেখলাম। যত যা-ই হোক, স্বপ্ন বৈ তো নয়, সেই নিয়ে ওরা তাই এখন আমাকে খেপায়। তবে এটা নিশ্চিত যে স্বপ্নই হোক বা অন্য কিছু, তাতে কিছু আসে যায় না কেননা ওটির মাধ্যমে আমার কাছে সত্য প্রকাশ পেয়েছিল। এর কারণ হল, একবার যদি সত্যকে জানতে পাও, তোমার চোখে ধরা দেয়, তুমি তক্ষুণি জানবে যে এটাই সত্য, এবং এছাড়া অন্য কোনও সত্য নেই, থাকতে পারে না, সে তোমার স্বপ্নেই হোক বা জাগরণে। ঠিক আছে, না হয় স্বপ্নই ছিল— ধরা যাক স্বপ্নই, কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, যে জীবনকে তোমরা অমন ধন্য ধন্য কর, আমি সেটিকে সম্পূর্ণত বর্জন করতে চলেছিলাম, অথচ আমার স্বপ্ন, আমার সেই স্বপ্ন—সেই স্বপ্নই আমার কাছে মেলে ধরল অন্য এক জীবন, একটি পুনরুদ্ধার করা, অসাধারণ এবং সম্ভাবনাময় জীবন।

শুনুন তাহলে।

(বাকিটুকু পরের সংখ্যায় পড়ুন--)


অনুবাদক
অভিজিৎ  মুখার্জি
......

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন