শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

মাইকেল ম্যাকলাভার্টি : একটি হাফ ক্রাউন

ভাষান্তর: সালেহা চৌধুরী

সন্ধ্যার কিছু আগে এগারোজন ছেলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে নানা সব পুরণো জিনিস সংগ্রহ করছিলো। চেয়ে চিন্তে যা পাবে তাই তারা দেবে আজকের বনফায়ারে। পনেরো অগাষ্টের বন ফায়ারের রাত আজ। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা চিৎকার করে বলছে --পুরণো কাগজ, কাঠের বাক্স, পুরণো আসবাব, ফেলে দেওয়া খাটের গদি, পুরণো বইপত্র যা দেবেন তাই সমাদরে গ্রহণ করা হবে।
তারা সকলকে আঙুল দিয়ে সেই পাহাড়ের মত উঁচু আবর্জনার স্তুপ দেখিয়ে বলছিলো --ওখানে যাবে সব। সেই জঞ্জালের পাহাড় ক্রমাগত উঁচু হয়ে উঠছে। রাস্তার মাঝখানে, বনফায়ারের জন্য প্রস্তুত। আর দু ঘন্টা পরে সারা মুখে রং মেখে, সং সেজে, মাথায় উঁচু হ্যাট চাপিয়ে মা মেরীর নামে গান গেয়ে তারা সেই জঞ্জালের পাহড়ে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। তারপর সেই লেলিহান শিখার চারপাশে নাচতে নাচতে ঘুরতে ঘুরতে গান করবে বনফায়ারের রাতে। এ এক পুরণো বনফায়ারের উৎসবের রাত।

বাড়ি বাড়ি ঘুরে যা সংগ্রহ হলো টানতে টানতে কোনোমতে এনে ছুঁড়ে ফেলতে লাগলো সেই আবর্জনার পাহাড়ে। সবাইকে ছেলেরা বললো--সন্ধ্যায় আসতে ভুলবেন না। কারণ এমন বনফায়ার এর আগে আর কখনো হয়নি। আপাতত এরা এ রাস্তার শেষ বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এ বাড়িতে বাস করেণ এক নিঃসঙ্গ বৃদ্ধা। এ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তারা বেশ চিন্তা করছে। চাইবে কি চাইবে না সেই চিন্তা। দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলবে কিছু দিতে না না ধাক্কা না দিয়েই চলে যাবে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বেশ একটু তর্ক বিতর্ক শুরু হয়েছে। এ বৃদ্ধাকে তারা ভয় পায়। এ বাড়ির সামনে বল খেলতে যদি বল জানালায় বা দেয়ালে হঠাৎ করে আঘাত করে, ধাক্কা দেয় ছেলেপুলেদের সেই রাগি বৃদ্ধা পুলিশের ভয় দেখায়। সারাক্ষণই আপনমনে বিড় বিড় করে কি যে বলে কেউ জানে না। আবার কখনো হাতের লাঠি নিয়ে তাড়া করে ওদের। কিন্তু ছেলেরা ভাবছে আজ রাত অন্য রাতের চাইতে ভিন্ন। এ রাতে ছেলেরা ভয় পাবে না। বনফায়ারের রাতে কেউ কি ভয় পায়? এসব ছেলেপুলের মধ্যে যে বয়সে ও লম্বায় বড় সে এসে দরজায় আঘাত করে। সে দল ভেঙ্গে একটু সামনে এগিয়ে আসে। দরজায় আঘাত করবার পর প্রথমে কোন সাড়া পাওয়া গেল না। অন্যরা বলতে লাগলো-- ওকে আমরা দেখেছি। ও বাড়িতে আছে। উপরতলার জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে ও আমাদের দেখছিলো। আমরা পর্দার ফাঁকে ওর মুখ দেখেছি।

আবার দরজায় আঘাত। এ দলের বড় ছেলেটির মনে হলো কে যেন ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে আসছে। আস্তে খুলে গেল দরজা। বৃদ্ধার মুখ দেখার আগেই তারা চিৎকার করে বলতে লাগলো-- আজকের রাত বনফায়ারের রাত। বনফায়ারে জ্বালাতে এ রাতে তুমি কি আমাদের কিছু আমাদের দিতে পার? ওদের মনে হলো কথা শুনে যেন সেই নিঃসঙ্গ বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন। সে হাসির আভায় ছেলেপুলেদের সাহস বেড়ে গেল। তারা এবার সমস্বরে বলতে লাগলো--বনফায়ারের জন্য কিছু দিতে হবে। ঠিক আছে? বেশ একটু আবদার তাদের আবেদনে। রহস্যময়ী বললেন-- তোমরা সকলে বাড়ির পেছনে যাও। ওখানে বনফায়ারে জ্বলবার মত একটি জিনিস রাখা আছে। ছেলেপুলেরা বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলে ফিসফিস করে বলে--মতলব কিরে বাবা? ওখানে গেলেতো গায়ে একবালতি পানি ঢেলে দেবে না? বলে একটু আস্তে হাসে ওরা। বৃদ্ধাকে ঠিক বিশ্বাস হয় না।

খানিকপরে বাড়ির পেছনের পুরণো জং ধরা গেট খোলার শব্দ শোনা গেল। অনেকদিন পর দরজা খুললে যেমন শব্দ হয় ঠিক তেমন। বৃদ্ধা পেছনের দরজায় দাঁড়িয়ে ওদের উদ্দেশ্যে বলছেন--ওই যে দেখেছো ওই জিনিস! ও কি তোমাদের বনফায়ারে পুড়বার উপযুক্ত হবে? একটি পুরণো ভাঙ্গা কালো তিনজন বসাবার মত সোফা সেখানে পড়ে আছে। ছাতলা পড়ে গেছে ওখানে পড়ে থাকতে থাকতে। আসল চেহারা বোঝা মুশকিল। একটি পা ভাঙ্গা। ইটের উপর ভর দিয়ে কোনমতে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে একা অনেকদিন ধরে খোলা আকাশের নিচে। খানিকপর হৈ চৈ করে সেই ভাঙ্গা সোফার পরীক্ষা শুরু করলো তারা। স্প্রিং  ঠেলে বেরিয়ে আসছে। ছেলেরা সেই ভাঙ্গা স্প্রিং  পায়ে দিয়ে “জ্যাক ইন দ্য বক্স” হয়ে হাঁটতে লাগলো। এই ভাবে সকলে মিলে সেই স্প্রিংকে টেনে টুকরো টুকরো করতে লাগলো। সকলেই স্প্রিং  পায়ে দিয়ে “জ্যাক ইন দ্য বক্স” হয়ে হাঁটতে চায়। তারা অনেক্ষণ ধরে স্প্রিং  ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে যা খুঁজে পেল সে একটা হাফ ক্রাউনের কয়েন। যে প্রথমে পেয়েছে এ পয়সা তার। এই বলে ওরা প্রথমে এই নিয়ে কিছুক্ষণ চিৎকার করলো নিজেদের মধ্যে। -- না না এই কয়েন আমরা কেউ নিতে পারি না। এই হাফ ক্রাউন ওই বৃদ্ধার। ওকে ফিরিয়ে দিতে হবে।--না দেব না বলে চিৎকার করলো কয়েকজন। এটা আমার কারণ আমিই প্রথম ওকে খুঁজে পেয়েছি। দলের নেতা এগিয়ে এল এবার। সে ভাল ছেলে। বললো গম্ভির মুখে--যার এই হাফ ক্রাউন কয়েন তাকেই ফিরিয়ে দিতে হবে। তারপর বাঁকি সকলে একই কথা বলতে লাগলো। যার এই কয়েন তাকেই ফিরিয়ে দিতে হবে। তখনো একটি ছেলে হাতে কয়েন নিয়ে বলছে-- এটা আমার। কারণ আমি একে খুঁজে পেয়েছি।

কিন্তু তার কথা কেউ শুনলো না। তারা আবার ধাক্কা দিল সেই নিঃসঙ্গ, রাগী বৃদ্ধা রমনীর দরজায়। তারা বললো কি ভাবে স্প্রিংএর  ভেতরে আটকে থাকা একটি হাফ ক্রাউন তারা খুঁজে পেয়েছে। সেই বৃদ্ধা কয়েনটি হাতে নিলেন। ভালমত পরীক্ষা করলেন। বলেন --তোমরা কি সত্যি বলছো এই তোমাদের কারো নয়? ছেলেরা বলে--এমন পুরণো কালের কয়েন আমরা কোথায় পাব? এটি রূপোর এবং এর এককোনে একটা ছোট্ট ফুটো আছে। তিনি অনেকক্ষণ এক দৃষ্টে সেই ফুটোর দিকে তাকিয়ে থাকেন। বেশ কিছুক্ষণ কোন কথা বলেন না। ততক্ষনে ছেলেপুলেরা পায়ের স্প্রিং  খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।--এ হাফক্রাউন তোমরা রেখে দাও। এ দিয়ে তোমরা চকলেট কিনে খেও। বলেন সেই বৃদ্ধা, ধীর কণ্ঠে।

ছেলেপুলেরা হৈ হৈ করতে করতে সেই সোফা কাঁধে তুলে নিয়ে খুশী হয়ে  রওনা দেয়। ওরা এমন করে সোফাকে কাঁধে করে নিয়ে চলেছে মনে হয় সোফা নয় একটি কফিন কাঠের বাক্স।

সেইসব ছেলেদের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে বুকের হাঁপর থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার। বৃদ্ধার সমস্ত শরীর তখন কাঁপছিলো। এরপর তিনি রান্নাঘরের আগুনের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। রকিং চেয়ারের শক্ত হাতল ধরে প্রাণপনে নিজেকে সামলাতে চান। বলেন নিজেকে শুনিয়ে, বলেন নিজেকে--আমি শান্ত হব আমি শান্ত হব। তার মনে পড়ে যায় আজ থেকে পনেরো বছর আগের এক রাতের কথা। যে রাতে তার একমাত্র ছেলে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল। এবং আর কখনো সে বাড়িতে ফিরে আসেনি। কোথায় সে চলে গেছে তিনি তা জানেন না। ওকি এখনো বেঁচে আছে না মারা গেছে? এ কথা হয়তো তার পক্ষে আর কখনো জানা সম্ভব হবে না। চিঠির আশায় থাকতে থাকতে এখন তিনি ক্লান্ত। প্রতিদিন পোস্টম্যানের পথের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন। তার দুই বিবাহিত মেয়েদের কাছ থেকে চিঠি এসেছে। কিন্তু বাড়ি ছেড়ে যাওয়া ছেলের কাছ থেকে কোন চিঠি আসেনি। তার দীর্ঘ প্রার্থনার উত্তর চিঠি হয়ে তার কাছে কখনো পৌঁছায় নি।

তার চোখ বেয়ে দর দর করে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করলো। বেদনা, যন্ত্রনা, মনস্তাপ ও আশাভঙ্গের চোখের জল। আজ বুঝতে পারলেন তাহলে সেদিন তার ছেলে মিথ্যে বলেনি। যখন সে বলেছিল--বোনেদের হাফ ক্রাউন সে চুরি করেনি। যদিও এই কারণে ভেঙ্গে যায তার ঘর। তিনি একা হয়ে গেছেন চিরদিনের মত। এখন সে কথা শুনবার জন্য কেউ নেই তার চারপাশে আজ। কাঁধ একটু ঝাঁকিয়ে তিনি চুলোর আঁচ বাড়িয়ে দিলেন। বিশ্বাস করেছেন, সমস্ত অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করেছেন। আজ তিনি ছেলের সব কথা বিশ্বাস করতে রাজি। আজ যদি ছেলে এই রান্নাঘরে তার সামনে এসে দাঁড়ায় তিনি হাঁটু মুড়ে বসে ক্ষমা চাইবেন তার ছেলের কাছে। আবার বুকের হাঁপর থেকে বেরিয়ে আসে অর্ন্তভেদী দীর্ঘশ্বাস। বলেন--কোথায় তুমি আজ? তুমি জীবিত না মৃত জানি না বাপ। কিন্তু আমার সোনার ছেলে আজ আমি তোমার সব কথা বিশ্বাস করবো বলে রাজি। তুমি সেদিন সত্যিই তোমার বোনের হাফক্রাউন চুরি করনি। এই সোফাতে গত পনেরো বছর হলো সেই হাফক্রাউন লুকিয়ে ছিল। বলতে বলতে তিনি দোলেন। রকিং চেয়ারে ক্রিক ক্রিক শব্দ হয়।

কি করে সে রাতের কথা তিনি ভুলে যাবেন? যে রাতে তাদের ঝগড়া হয়। যে রাতে সেই ঝগড়ার পর পরই তার ছেলে চিরতরে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তারপর? এমন কোন রাত নেই, এমন কোন সকাল যখন তিনি তার ছেলের জন্য প্রার্থনা করেন নি। কিন্তু কেন সেদিন তিনি তার ছেলেকে বিশ্বাস করেন নি? ওতো ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলেছিল বোনেদের হাফ ক্রাউন ও চুরি করেনি। তিনি হয়তো বিশ্বাস করতেন যদি তার বোনেরা এত জোর দিয়ে এত দৃঢ়তার সঙ্গে কথা না বলতো। তারা ভয়ংকর জোর গলায় বলছিল তার ভাই ছাড়া আর কেউ এই হাফ ক্রাউন নেয়নি। যে ভাষায় বোনেরা ঝগড়া করছিলো ভাবতেও এখন তার ভয় হয়। এমন ভাষা মেয়েরা শিখেছিল কোথায়? তিনি তো মেয়েদের এমন ভাষা শেখাননি। তাহলে? এখন তিনি মনের ভেতর থেকে পুরো ঘটনাটির তুলে আনলেন। কি হয়েছিল সে রাতে? তার মনে পড়ছে। সব কিছু মনে পড়ছে। সেদিন সন্ধ্যায় তার দুই মেয়ে বাথটাবে নিজেদের ভালমত ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে বাইরে যাবার জন্য প্রস্তুত করছিলো নিজেদের। সন্ধ্যায় তারা দুজন বাইরে যাবে এমন ইচ্ছা ওদের। আর তিনি তখন ওদের রাতের খাবার তৈরী নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ওরা দুজন হাসতে হাসতে গান করছিলো আর বলছিলো আমরা দুজন আজ “ক্লোনাডর্” সিনেমা দেখতে যাব। তিনি ভাবলেন--আমি তখন বলেছিলাম কোথা থেকে টাকা পাবে সিনেমা দেখতে? ওরা উত্তরে বলেছিল আমাদের কাছে একটি হাফ ক্রাউন আছে তাই দিয়ে। আমি ওদের প্রশ্ন করেছিলাম--কোথায় পেয়েছো তোমরা হাফক্রাউন? উত্তরে বলেছিল তারা--এ আমাদের হাফ ক্রাউন। আমাদের কাছে কাছে ছিল। বলেছিল ওরা--এ হাফ ক্রাউনের এক ধারে একটি ছোট ফুটো আছে। এবং ছোট ফুটো থাকা খুব লাকি। মেরি ওর এ্যাপ্রোনের পকেট থেকে হাফক্রাউন নিয়ে ফায়ার প্লেসের ম্যান্টল পিসে রেখে দিয়েছিল। রেখেছিল ঘড়ির পাশে। কয়েনটি ঘড়ির পাশে থাকার কথা মনে থাকবার কারণ যখন কয়েনটি হারিয়ে যায় ওরা অনেকবার ঘড়ি উল্টে পাল্টে সেই কয়েন খুঁজছিলো। বার বার ফুলদানি, মোমবাতি দানি সবকিছু নেড়ে চেড়ে তোলপাড় করে সেই কয়েন খুঁজে হয়রান হয়েছিল ওরা দুজন। না ওরা কোথায় কয়েনটিকে খুঁজে পায়নি। এবার তিনি আবার ভাল করে মনে করতে চেষ্টা করলেন কি হয়েছিল সে সন্ধ্যায়? তোলপাড় করে খোঁজার আগে কি হয়েছিল? হ্যাঁ মনে পড়ছে। তিনি বলেন। আমি ওদের সন্ধ্যার খাবার বানিয়ে দিয়েছিলাম। আমি চা ঢেলে দিয়েছিলাম। ওদের দেখেছিলাম। আমি হাফ ক্রাউনটিকে ছুঁয়েও দেখিনি। ধরে দেখিনি কয়েনটির একপাশের ফুটো। তবে মনে আছে কয়েনটি রাখার কথা। আমি ওই ঘরে বসে শুনছিলাম জিমি এসেছে বাড়িতে। ওর কাজ শেষ করে। জিমি ভাল ছেলে। আমার মেয়েদের মত ভাড়াটিয়ার মত সে বাড়িকে ব্যবহার করে না। সে জানে এই বাড়ি তার। বই পড়তে ভালবাসে। মেয়েরা কখনো একদিন কখনো দুইদিনের জন্য বাইরে যায়। আমার কি হলো সে নিয়ে ওরা ভাবে না। জিমি সবসময় ভাবে। আমি কোথায় ছিলাম যখন জিমি বাড়িতে এসেছিল? আমি তো ওর সঙ্গেই ছিলাম। সে ওর তেল লাগা কাজ করবার পোশাক বেসিনে রেখে খুব ভাল করে পরিস্কার করছিলো। আমি তো সেখানেই ছিলাম। আমার সেলাই মেসিনের তেলের মত ওর কাপড়ের গন্ধ। আমার মনে আছে কাপড়ের তেল তুলতে তুলতে ও মনের আনন্দে গান করছিলো। এ গান, সে গান। কোনটার সঙ্গে কোনটার মিল ছিল না। একসময় চার্চের হিমও গাইতে শুরু করেছিল। আমি জিমির জন্য একটি ডিম সেদ্ধ করলাম। ও বলছিলো-- আজ রাতে আমি কোথাও যাব না। মেরি আর এ্যানের পরে আমি খাব। এমন কথাও বলেছিল ও। হে আমার ঈশ্বর ও বলেছিল সে রাতে আজ আমি কোথাও যাব না। ও সোফায় শুয়ে ছিল। ওর মুখখানা ধোওয়া মোছায় ঝক ঝক করছিলো। ওর পায়ের জুতো খুলে আমি বলেছিলাম ওকে চপ্পল পরে নিতে। ওর চপ্পল জোড়া আমি চুলোর কাছে ধরে গরম করছিলাম। মেয়েদের খাওয়া হয়ে গেলে এঁটো থালাবাসন তুলে নিয়ে আমরা খেতে বসলাম। মেয়েরা দেয়াল আয়নায় মুখ দেখছিলো চুল বাঁধতে বাঁধতে। জিমি জিজ্ঞাসা করেছিল--আজ রাতে কোথায় চলেছো তোমরা?

-- সিনেমা দেখতে। উত্তর দিয়েছিল ওরা।

--কে নিয়ে যাচ্ছে তোমাদের?

--আমরা আমাদের নিয়ে যাচ্ছি। আবার কে নিয়ে যাবে?

--তোমাদের বোধকরি কোথাও কোন গুপ্তধন আছে। না হলে প্রতিরাতে কি করে সিনেমায় যাও তোমরা?

--তুমি তো কখনো আমাদের সিনেমায় নিয়ে যাও না। কখনো বল না কোথায় যেতে। মেয়েরা বলেছিল জিমিকে। উত্তরে জিমি বলেছিল--আমার কাজ কি করে নিয়ে যাব? সময় কোথায়?

এরপর মেরি এসে বসেছিল সেটিতে। এ্যানি উপরে গিয়েছিল কোট আনতে। আমি বাইরে গিয়েছিলাম চুলোর জন্য কয়লা আনতে। কয়লাগুলো সবসময় ভেজা থাকে। খানিকপর দেখি মেরি ম্যান্টলপিসের সামনে দাঁড়িয়ে ওর কয়েন খুঁজছে। আমাকে জিজ্ঞাসা করলো আমি ওর হাফ ক্রাউন কয়েনটি দেখেছি কিনা? আমি উত্তরে বলেছিলাম--কয়েনটাকে আমি ঘড়ির পাশেই দেখেছিলাম। মেরি বলেছিল-- এখন ওটা আর ঘড়ির পাশে নেই। এরপর ঘড়ি , ফুলদানি ওলোটপালোট করে ওরা কয়েন খুঁজছিলো।--মা তুমি নিয়েছো? আমাকে প্রশ্ন করেছিল এ্যান।
--না। আমি উত্তর দিয়েছিলাম। বলেছিলাম--তোমাদের ওই কয়েন আমি ছুঁয়েও দেখিনি।

এরপর এ্যানি উপর থেকে এসেছিল কোট নিয়ে। দুই বোনে এরপর নানা কথা, নানা ঝগড়া, তোলপাড় খোঁজ। এরপর ওরা জিমির দিকে তাকিয়ে বলেছিল-- এত কষ্ট না দিয়ে আমাদের কয়েন দিয়ে দাও।

জিমি এমন কথায় হেসে উঠেছিল জোরে। আর তাইতেই আমার মনে হয়েছিল আসলে দুই বোনকে বোকা বানানোর জন্য জিমি এমন কাজ করছে। ওরা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলেছিল--জিমি এসব ঠং ঢাং বাদ দিয়ে আমাদের কয়েন আমাদের দিয়ে দাও। দেরী হয়ে যাচ্ছে।

--আমি তো বললাম আমি তোমাদের কয়েন নেই নি। বলেছিল জিমি।

--মিথ্যাবাদী! গর্জন করে উঠেছিল ওরা।

আমি বলেছিলাম এত জোরে চিৎকার না করতে। কারণ এমন চিৎকার করে কথা বললে পাশের বাড়ির লোকজন কি মনে করবে? এবার মেরি তার সেই ভীষন রাগের ভাষায় প্রচন্ড চিৎকার করে বলেছিল--মিথ্যাবাদী আমাদের কয়েন ভাল চাওতো বের করে দাও। মেঝেতে পা ঠুকে আগুনের দৃষ্টিতে জিমিকে পুড়িয়ে দিয়ে বলেছিল সে। জিমি তখনো বেশ শান্ত স্বরে কথা বলছিলো। বলেছিল ও --তোমাদের বলেছি না এই কয়েনের চেহারা আমি দেখিনি।

মেরি রেগে বলেছিল--তোমার কাপড় ধুতে যাবার আগে ঘড়ির পাশে তোমার তোমার কলারের বোতাম খুলে রেখে গিয়েছিলে না? ওখানেই তো কয়েনটি ছিল। তোমার কলারের বোতাম এখনো আছে আর কয়েন চলে গেছে?

আমি বলেছিলাম-- লক্ষী বাপ কয়েনটি দিয়ে দাও তো কেন মিছেমিছি দুষ্টামি করে ওদের কষ্ট দিচ্ছ?

--আমি তোমাকে বলেছি না ওই হতচ্ছাড়া কয়েনের চেহারা পর্যন্ত আমি দেখিনি।

--তুমি একেবারে পাকা চোর। মেরি বলেছিল। আর তক্ষুণি জিমি লাফিয়ে উঠে মেরিকে আঘাত করেছিল। আর এরপর মেরি এমন সব কথা বলতে শুরু করেছিল যা ফাক্টরিতে কাজ করা মেয়ের মুখেই শোভা পায়। আমি ওদের থামাতে প্রাণপন চেষ্টা করেছিলাম। বলেছিলাম--বোনের গায়ে হাত তোলা তোমার ঠিক হয়নি জিম।

--আমাকে ও চোর বলছে আর আমি ওর গায়ে হাত তুলবো না? উত্তরে বলেছিল জিমি।

--তুমি একটা কাপুরুষ। তুমি মেয়েদের গায়ে হাত তোল। জিমি এরপর বসে পড়েছিল সোফায়। বোনের গায়ে রেগে উঠে হাত তুলে ও খানিকটা অনুতপ্ত বুঝতে পারছিলাম। আমিও মেঝের লাইনো সরিয়ে সোফা ও কার্পেটে কয়েনটি খুঁজতে শুরু করেছিলাম। মেরি বলেছিল--খুঁজে লাভ নেই। তোমার এই প্লেবয় লুকিয়ে রেখেছে।

--জিমি বাবা দিয়ে দাও। ম্যান্টলপিস থেকে কয়েনতো উড়ে চলে যায় নি। এ কথার পর জিমি একদৃষ্টে আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। সে দৃষ্টির কথা আমার মৃত্যু পর্যন্ত মনে থাকবে। --ও তুমিও তাহলে আমাকে বিশ্বাস কর না? আমাদের মাথার উপর যে ঈশ্বর আছেন তার নামে শপথ করে আমি বলছি হাফকয়েন আমি নেইনি।

আমি ওকে ওর সবগুলো পকেট উল্টে দেখাতে বলেছিলাম। ও যখন ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলেছিল ও নেয়নি তারপর এমন কথা বলা আমার ঠিক হয়নি। হায় আমার ইশ্বর! আজ তুমি আমাকে ক্ষমা করো। আস্তে করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল জিমি। সে দৃশ্য আমি কি করে ভুলে যাব? এরপর উপরে নিজের ঘরে গিয়ে সেখানে ও কি খুঁজেছিল কে জানে। এরপর দেখলাম সশব্দে দরজা বন্ধ করে ও চলে গেল। হায় ইশ্বর কোথায় যাচ্ছে জিমি।
-- কোথায় আবার? বাইরে গিয়ে হাফক্রাউন খরচে করবে। বলেছিল দুই বোন।

আমি উপরে উঠে ওর ঘরে গেলাম। দেখলাম ঘরের কোন কিছু সঙ্গে নেয়নি। কেবল কোট হ্যাঙারটি শুন্যে দুলছে। আর নিচে নেমে দেখি ওর ওভারকোটটি হল থেকে উধাও। ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।

--আপদ বিদায় হয়েছে। রেগে বলেছিল মেরি।

আমি সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম ও আর ফিরে আসবে না। আমার কথাই সত্যি হয়েছে। ও আর ফিরে আসে নি। এরপর চলে গেছে পনেরো বছর।

সেই নিঃসঙ্গ বৃদ্ধা চেয়ারে দুলছে। তার দুচোখ ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে। একসময় চোখ মুছে সেই নিরানন্দ রান্নাঘরে তাকায়। সারা ঘরে চুলোর একঘেয়ে আলো ছাড়া আর কোন আলো নেই। কেঁপে উঠলো তার সারা শরীর একবার চুলোয় কয়লা দিতে গিয়ে। কারা যেন বাইরের দরজায় দ্রুত আঘাত করছে। চমকে তাকালেন বাইরে। এরপর আর একটু জোরে দরজায় শব্দ। নিচে নামতেই সেই ছেলেরা চেঁচিয়ে উঠলো --তাড়াতাড়ি আসুন। এক্ষুনি বনফায়ার শুরু হবে।

কি ভাবলেন একটু। তারপর একটা শাল গায়ে চাপিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। রাস্তার সব আলো নেভানো। কেবল সেখানে মানুষের পায়ের শব্দ। শোনা যায় তাদের নানা কথাবার্তা। আর প্যারাফিনের গন্ধ। ছেলেরা সারা মুখে রং মেখে সং সেজে আগুনের পাশে হৈ চৈ করছে। নানা সব রাবিশে আগুনের আঁচ বাড়াতে চেষ্টা করছে। লোকদের উচ্চকণ্ঠ আগুনের শব্দ ছাপিয়ে জেগে ওঠে। সেই পুরণো সোফার আগুন আকাশে উঠছে। একটি বাইসাইকেলের টায়ার জ্বলছে। নানা সব ডালাপালা সহ পুড়ছে সেই টায়ার। সেই আগুনের লেলিহান শিখা ও খেলা দেখে সরে এলেন বৃদ্ধা। দাঁড়ালেন সেখানে যেখানে এত আগুনের আঁচ নেই। যেখানে প্যারাফিনের গন্ধ নেই। যেখানে বাতাস একটু ঠান্ডা। কেউ তাকে খেযাল করেনি। তারা সকলে আগুন ঘিরে ঘুরছে আর গাইছে “হেল কুইন অব হেভেন”! গান হওয়ার সঙ্গে সকলের হাততালি চিৎকার সবগুলো বাড়ির ছাদ পেরিয়ে আকাশে চলে গেল। যেন নীল আকাশে উঠে গেল একটি আলোর রকেট। সেই গোলমাল চিৎকার ভীত করে তুললো বৃদ্ধাকে। বাড়ির কাছে এসে আবার ফিরে তাকালেন তিনি। ওরা পিয়ানো আর্কোডিয়ান বাজাতে শুরু করেছে। তিনি পিয়ানো আর্কোডিয়ানের বাজনা শুনবার জন্য দাঁড়ালেন না।

বাড়ির করিডোরে একা, দুই হাত জড়ো করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন--হে আমার পরম পিতা আজ রাতে জিমি যেখানেই থাকুক না কেন তুমি একবার ওকে গিয়ে বল আমি ওকে বিশ্বাস করি। আমার পক্ষ থেকে কেবল একবার হে পরম পিতা।--জিনি ফিরে এসো আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।


(হাফ ক্রাউন সেকালের মূল্যে দুই শিলিং আর ছয় ফার্দিং)

(আয়ারল্যান্ডের শক্তিশালী কথা সহিত্যিক মাইকেল ম্যাক লাভার্টি। ১৯০৭ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। বেলফাস্টে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। চল্লিশ ও প াশের দশকে তিনি আটখানি গীতময় নভেল রচনা করেন। আর লেখেন অসংখ্য মুঠো মুঠো অপুর্ব অনবদ্য সব গল্প। বেশির ভাগ গল্পেই বেলফাস্টের কর্মজীবি মানুষের জীবন ঘিরে যেসব ঘটনা ঘটে তারই কথা আর আছে আয়ারল্যান্ডের নিজস্ব পারিবাবিরক কাহিনী। তিনি মারা যান ১৯৯২ সালে। বেলফাস্টে তার শিক্ষকতার বিষয় ছিল অংক এবং ফিজিক্স। তাঁর জগৎজাড়া খ্যাতি বয়ে আনে ছোটগল্প। যেখানে অনেক গল্পে আঠাশ বছরের শিক্ষকতার নানা সব ঘটনা ও কাহিনী অবিস্মরণীয় ভাবে পাঠককে মোহাবিষ্ট করে এবং মোহাবিষ্ট করে আরো নানা বিষয়। বর্তমান গল্পটি আমাকে এত বেশি অভিভুত করে আমি তখনই ঠিক করি একে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করবে, ছোট এক ভুলবোঝা এবং চিরকালের মত একা হয়ে যাওয়া এক বৃদ্ধার গল্পা)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন