শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

ইকবাল তাজওলীর গল্প : দেশের গল্প

‘হায়রে বরাকোর পাঙাশ মাছোর মজা! হায়রে আশ্বিন- কার্তিকোর বাছা- লারিয়ার স্বাদ! ইতা স্বাদ আমি কুনো কানো পাইছি নারে!’


যখনই ভরদুপুরে খেতে বসে বাজার থেকে কিনে আনা দেশি মাছের স্বাদ টের পাই, তখনই বৃদ্ধা মায়ের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা স্বগতোক্তি, তাঁর ফেলে আসা চিরচেনা স্বদেশ-স্বভূমির কথা মাঝে-মধ্যে মৃদু অস্বস্তির সৃষ্টি করলেও পরক্ষণেই মায়ের আবেগ- অনুভূতি অবচেতন মনে নিজের মধ্যে স ারিত হয়ে যায়।

আমি রিফিউজির সন্তান। আমি দেশ দেখিনি। মায়ের কাছ থেকে শুনে শুনে নিজ শিকড় সম্পর্কে জেনেছি; ধারণা নিয়েছি। সেই কবে প াশের দশকে মা তাঁর জন্মভূমি চিরতরে ছেড়েছুড়ে পূর্বপাকিস্তানের মফস্বল এক শহরে স্বামীর কর্মস্থলে চলে এসেছিলেন, তারপর আর ফিরে যাওয়া হয়নি।

ঊধারবন্দ, বাঁশকান্দি,বেরেঙ্গা, দুধপাতিল,মধুরামুখ কত সব আদুরে নাম! সব নামই মায়ের কল্যাণে মুখস্থ হয়ে গেছে। একজন লোক, কোন এক জায়গায় না গিয়েও সে জায়গা সম্পর্কে যে মোটামুটি ভালো ধারণা পারে , আমিই তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ।

আমার বাবা- মা দুজনেই ওপার থেকে এসেছেন। নরাধম ইংরেজরা(চক্রান্ত করে দেশটা ভাগ করল। নরাধম ছাড়া আর কীইবা বলার আছে।) ভারতবর্ষ ত্যাগ করার বছর দুয়েক আগে জি. সি. কলেজ খেকে পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে বাবা সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। বাড়ি থেকে আপিসে যেতেন। মধুরার পার ঘেষে তিন-চারশ গজ হেটে জুড়িন্দা নৌকায় বরাক পেরিয়ে তারপর মালুগ্রাম হয়ে আপিসে যেতেন।

হায়রে কী শান্তি।

বাবার সব শান্তি-স্বস্তি শেষ হয়ে গেল ৪৭- এ। বাবা-মায়ের অতি আদরের ছোট ছেলে অপশনের গ্যাড়াকলে পড়ে ঐ বছরই দেশ ত্যাগ করলেন। ‘পাকিস্তানিরা ভারতবর্ষ ত্যাগ কর।’ ভারত সরকারের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, সদ্য বিয়ে করে থিতু হওয়া বাবা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।

তখনও দাদি বেঁচে আছেন। হায়রে কী আহাজারি! ছোট ছেলের জন্যে তাঁর মনটা ডুকরে কেঁদে ঊঠল। ছেলের জন্যে কত কিছু করলেন! নফল নামাজ পড়লেন। রোজা রাখলেন। শফিনা খতম দিলেন। শেষ-মেশ, বহু চেষ্টা-চরিত্র করে মখা মামুকে খুঁজে বের করে তাঁর পায়ে পড়লেন। মখা মামুর মুখ থেকে একটা কথাই শোনা গেল,‘ পাকিস্তানি বেটার মা।’

দেশ ত্যাগ করলেও বাবা দেশের কথা ভুলেননি। সময় ও সুযোগ পেলেই তাঁর জন্মভূমিতে ফিরে গেছেন। জন্মভূমির আকাশ-বাতাস নিয়ে মেতে ঊঠেছেন। গভীর রাতে যখন তাঁর বাঁশি থেকে করুণ সুর ঝরে পড়ত, লোকে তথন বলত,‘ আমাদের শামসুদ্দিন আহমদ পাকিস্তান থেকে ফিরেছে।’ লোকে তো আর জানতো না, নিজভূমে পরবাসী শামসুদ্দিন আহমদ বাঁশিতে কেন করুণ সুর তোলেন।

৫০- এর দশকেই যাতায়াত ব্যবস্থায় পাসপোর্ট - ভিসা লেগে গেল। যাওয়া- আসা কঠিন হয়ে গেল। বাবা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। অথবা, আইনকে ভয় পেতেন। তাই আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অন্যভাবে গেলেন না। সেইসময়ে আমার বড়ভাইয়ের জন্ম। বেঁচে ছিলেন বছর তিনেক। পাসপোর্ট-ভিসা-পারমিশন ইত্যাদি বারো ভূতের চক্করে পড়ে বাবার আর প্রথম সন্তানের মুখ দর্শন করা হল না। এরপরে দাদিও আর বেশিদিন বাঁচলেন না। একদিন হুট করে মরে গেলেন।

বাবা আর ফিরে গেলেন না।

মা পড়ে গেলেন বিপদে। শাশুড়িবিহীন বাড়িতে একা থাকা তাঁর সমীচীন মনে হল না। নিজের বাবার বাড়ি ফিরে গেলেন। স্বামীর সঙ্গে কেবল চিঠি-পত্রের মাাধ্যমে যোগাযোগ থাকল।

এদিকে সুযোগ বুঝে চক্রান্তকারীরা বাবার বিষয়-সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার জন্যে তৎপর হল। বাড়ি দখল করার জন্যে মাকে ‘পাকিস্তানি’ তকমা গায়ে লাগিয়ে কোর্টে মামলা দায়ের করল, আমারই বড়চাচার বড়ছেলে। বর্গাচাষীরাও সুযোগ বুঝে ধানিজমি দখল করার জন্যে উঠেপড়ে লাগল। আর বাবা যে লোকটাকে মাঠাই মামা বলে ডাকতেন, সেই লোকই প্রথম সুযোগে এক হাল( ১২ কিয়ার) জমি দখল করে নিল।

সব জেনেশুনে বাবা তাঁর শ্বশুর বাবাকে চিঠি লিখলেন, বললেন, তাঁর মেয়েকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার জন্যে। মা আর কী করবেন। সব ভেবে-চিন্তে দেশ ত্যাগ করা সমীচীন মনে করেই বড়মামাকে সঙ্গে নিয়ে চিরতরে জন্মভূমি ত্যাগ করে এলেন।

পূর্বপাকিস্তানেই আমাদের চার ভাই-বোনের জন্ম হল। একেকজন একেক শহরে।

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি বাবা এ শহরে স্থায়ীভাবে চলে এলেন। থিতু হলেন নদীর পাড়ে। নদীর পাড়ে বাড়ি ছিল, তাই এখানেও নদীকে বেছে নিলেন। কিন্তু, দুধের স্বাদ কি আর ঘোলে মেটে?

চেনা- অচেনা কত লোক আমাদের এ নতুন বাড়িতে আসা-যাওয়া করতে লাগল। সবাই দেশের মানুষ। সবাই আত্মীয়। বাবা-মায়ের আনন্দ আর ধরে না। শিলচর যেন উঠে এসেছে এ তল্লাটে। বাবা যে এত খোশমেজাজি তা আগে বলতে গেলে জানতামই না। প্রায়ই, দেশের আত্মীয়দের সঙ্গে গল্প-গুজব আর আনন্দ করতে করতে অট্টহাসিতে ফেটে পড়তেন।

তখনও বাবার ফিরে যাওয়ার আকাঙ্খা ছিল। তাঁর এই ফিরে যাওয়ার আকাঙ্খা উস্কে দিয়েছিলেন বড়যাত্রাপুরের খলিল মাস্টার।

খলিল মাস্টার সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন নিজভূম কাছাড়ে। কিন্তু, বাবার আর ফেরা হল না। রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য হলেন। তবে, একটিবারের জন্যে হলেও তাঁর মাতৃভূমি দেখার আকাঙ্খা ছিল। কিন্তু, অবসর নিয়ে এলপিআরে থাকা অবস্থায় একদিন বলা নেই-কওয়া নেই, একুইট মাইয়ো অডিয়েল ইনফ্রাকশনে হঠাৎ মরে গেলেন।

তাঁর আর মা-মাটি-দেশ দর্শন করা হল না। হায়রে দূর্ভাগ্য!


মায়ের ডাক শোনা গেল।

‘টিংকু। এই টিংকু।’

জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি, মা পত্রিকা হাতে উঠোনে বসে নদীর পানে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছেন।

হয়ত তাঁর ঝাপসা চোখে সুরমার বদলে বরাক ভেসে উঠেছে। বরাক নিয়ে মায়ের কত গল্প! সুরমা দিয়ে বয়ে যাওয়া বড় বড় মাল বোঝাই কার্গোজাহাজ মায়ের চোখে কোন জাহাজই না! জাহাজ হল, সেই চল্লিশের দশকে মায়ের কৈশোরে দেখা দুধপাতিল সরকারি ঘাটে বাগানের জন্যে বয়ে আনা কয়লাবাহী জাহাজ; বিশাল জাহাজ।

হায়রে বিশাল জাহাজ! মায়ের বিশ্বাসে চিড় ধরাই না। এই নিয়েই তো সারাটা জীবন পার করে দিলেন। বয়সও তো আর কম হল না। মধ্যষাটে চলে যাওয়া মায়ের বিশ্বাস অটুট থাক।

মায়ের কাছে যেতেই, মা, স্থানীয় একটি পত্রিকার হেডিং মেলে ধরলেন। দেখি, লেখা,‘প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে শিলচর টাউন ক্লাবের সিলেট আগমন।’ মা পুরো সংবাদ ইতিমধ্যেই পড়ে নিয়েছেন। বললেন,‘ পারলে, খেলা দেখতে যাইস। আর, কিতা বড়লস্কর পুয়া একটা ক্যাপটেইন, তার বাড়ি কানো, খবর লইস। উদারবন্দ-কড়ইকান্দি বড়লস্কর বাড়ি তো আমার নানি বাড়ি।’

হেসে ফেললাম। কোথাকার, কোন বড়লস্কর-টস্কর, সবাই মায়ের আত্মীয়!

বললেন,‘ আশোস কেনে। আশিস না। ইএ-ডির বানদোর(বাঁধের) উফরে দিয়া মউদরার পুল পার অইয়া আটিয়া(হেটে) কত উদারবন্দ গেছি। আমার বুবাইর(বড়বোনের) বাড়িও উদারবন্দ।’

বললাম,‘ মা, তুমি সারাদিন খালি উদারবন্দ-দুধপাতিল-মউদরামুক জফো কেনে? তুমার মুকো(মুখে) আর কুনো মাত নাইনি! যে জায়গা ছাড়িয়া আইসো, ইতা বাবিয়া(ভেবে) মনরে অত কষ্ট দেও কেনে!’

মা মনে হয় রাগ করলেন। রেগে গিয়ে উঠোন থেকে উঠে ঘরে যেতে যেতে বললেন,‘ আমারে আসমার বাড়িত দিয়া আয়। তুইন এক প-িত, আর তোর বইন নাঈমা আরেক প-িত। বয়স ত্রিশ পার অই যার, আবো(এখনও) বিয়া বর না। প্রফেসারনি অইসোত বালা, বিয়া তো বইতে, না তান বারিস্টার লাগে। খবিসোর জাত।’

মায়ের কথায় বিব্রতবোধ করলেও রাগ উঠে না।

নাঈমা আমার চেয়ে বছর দুয়েক ছোট। ওর কারণে আমিও একাকিত্ম ঘোচাতে পারছি না। মা যে প্রায়ই এই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন, ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরে যান, ঘর ভরতি জনমানুষ্যি থাকলে হয়ত এরকমটি হত না।

পুরো বাড়িতে ছোটআপার মেয়ে নিম্মি সহ আমরা চারজন বসবাস করি। নিম্মি অনার্স পড়তে এসেছে। আর, আজিজের মা সকাল থেকে সন্ধ্যাবধি থাকে। আজিজের মা আমাদের কাজের মহিলা। কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে এই আজিজের মা না থাকলে মাকে একা থাকতে হত।

এখন সকাল দশটা। আমাদের এ তল্লাটে অদ্ভুত একটা নিয়ম চালু আছে। আর তা হল, সাধারণত বেলা এগারটার আগে কোন মার্কেট-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে না। একটু পরেই জিন্দাবাজারের উদ্দেশে বেরিয়ে যাব। ব্যবসা আছে। চারটা ডাল-ভাতের সংস্থান তো করতে হবে।

ঘরে গিয়ে বালিশের নিচ থেকে গোল্ডলিফ একটা বের করে তাতে অগ্নিসংযোগ করে সুখটান দিতেই মায়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। আজিজের মা খুব সম্ভবত মাছ কাটতে বসেছে। কারণ, মা আজিজের মার সঙ্গে মাছের গল্প শুরু করে দিয়েছেন। অবধারিতভাবে, কিছুক্ষণ বাদে হয়ত বলবেন,‘ হায়রে বরাকোর পাঙাশ মাছোর মজা, হায়রে আশ্বির-কার্তিকোর বাছা-লারিয়ার স্বাদ...।’

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন