শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

বেন ওকরির গল্প : গাছি লোকটি যা দেখেছিল

ভাষান্তর : কুলদা রায়

গাছি লোকটি ছিল খুব করিৎকর্মা। পাম গাছ বাইতে খুব পছন্দ করত। বেশি বেশি গাছ বেয়ে বেশি বেশি তাড়ি সংগ্রহ করতে পারত। এক রাতে সে স্বপ্ন দেখল, তাড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে একটি পাম গাছের আগা থেকে সে নিচে পড়ে গেছে। পড়ে সে মরে গেছে।

স্বপ্নটি দেখে তার মাথা খুব আউলা হয়ে গেল। দেরি না করে সেই রাতেই তার বন্ধুর বাড়ি চলে গেল। বন্ধুটির নাম তাবাস্কো। সে এলাকার বিখ্যাত কবিরাজ।

তাবাস্কোর ছিল অনেকগুলো বউ বিবি। তাদের সামলাতে বেচারা খুব কাহিল হয়ে পড়েছে। সেজন্য গাছি বন্ধুর কথা খেয়াল করে শুনতে পারল না। তার বউ বিবিদের পেরেশানি সহ্য করতে না পেরে সে এলিগেটর মরিচ গাছের বিচি চিবুচ্ছিল। সঙ্গে গিলছিল পাম রসের তাড়ি। ব্যাপার দেখে গাছি বেচারা আর দাঁড়ানোর সাহস পেল না। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কবিরাজ তাবাস্কো ছুটে এসে আড়ালে টেনে নিল। খাপছাড়াভাবে কৌতুহলী গলায় তাকে বলল--

একজন শিকারীর সঙ্গে আমার খুব চিন-পরিচয় ছিল। সে একদিন শিকারে বের হয়েছে। একটি অদ্ভুত নীল গাই-হরিণ তার নজরে এলো। নীল গাই- হরিণটির পিছু নিল। একসময় হরিণটি পিঁপড়ের ঢিপির কাছে থামল। তাকে অবাক করে দিয়ে নীল গাই-হরিণটি একটি রমণীতে রূপান্তরিত হলো। এবং নিমিশেই সেখান থেকে ভোজবাজির মতো উবে গেল।

শিকারীটি পিঁপড়ের ঢিপির কাছে অপেক্ষায় রইল। তার ধারণা রমনীটি আবার হাজির হবে। এভাবে অপেক্ষা করতে করতে সে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম ভেঙ্গে সে দেখতে পেল তার চারিপাশের মাটি লাল রঙের পানিতে সয়লাব হয়ে আছে। আরো দেখতে পেল, তাকে পেঁচিয়ে ধরেছে নয়টি ভুত।

সে পাগলের মতোই হয়ে গেল। তাকে সেরে তুলতে আমার তিন সপ্তা লেগেছিল। সেই ভুত তাড়াতে তার মাথার মধ্যে ঢুকতে হয়েছিল আমাকে। এমনকি তার কিছুটা পাগলামি আমার মধ্যেও চলে এসেছিল। কাল তুমি তিনটে কাছিম ধরে নিয়ে আসো। আর এনো এক কাঁদি কোলা বাদাম। তারপর আমি তোমার এই দু:স্বপ্নের ব্যাপারে কিছু করব। আজ রাতে আমি খুব ব্যস্ত।

গাছি লোকটি রাজী হলো। সঙ্গে সঙ্গে বিমর্ষও হলো। সে বাড়ি ফিরে এলো। অভ্যাস মতো এক হাড়ি তাড়ি গিললো। এভাবে সে দু:স্বপ্নকে বাগে আনল। তারপর ঘুমিয়ে পড়ল।

ভোরবেলা সে তার দড়িদড়া গুছিয়ে নিল। নিল যাদুকরী পাচন-লাঠি। তার সাইকেলে বেঁধে নিল তিনটি ঠিলা। দিনের কাজ শুরু করার জন্য বনের মধ্যে দিয়ে সাইকেল চালাতে লাগল। এভাবে চলতে চলতে একটা সাইনবোর্ডের কাছে এসে থামল। সাইনবোর্ডে লেখা--

ডেলটা তেল কোম্পানি : এই এলাকায় তেল উত্তোলন চলছে। এখানে চলাচল করা বিপজ্জনক।

গাছি লোকটি জ্ঞানগম্যি ছাড়াই সাইনবোর্ডের দিকে তাকাল। তারপর সে কয়েক সারি অদ্ভুত  পাম  গাছের সারি তার নজরে এলো। পথে কিছু মাকড়সার জাল পাতা ছিল। গাছগুলোর কাছে পৌঁছানোর জন্য মাকড়শার জালের উপর দিয়ে সাইকেল চালালো। গাছগুলোর লালচে সবুজ বাকলের ঘ্রাণ তাকে মাতাল করে তুলল। দ্রুতবেগে সে তিনটি পামগাছের একটির গুড়িতে যাদুকরী পাচন-দণ্ড বাঁধল। দড়িগুলো বের করল। গাছে উঠতে শুরু করল। গাছের দুপাশে পায়ের চেপে ধরে, দড়িগুলো খাদরে-বাদরে বাকলের উপরে ঠেলে দিয়ে দিয়ে সে খুব দ্রুতবেগে উপরে উঠতে লাগল। তার বুক ব্যথা না করা পর্যন্ত সে উঠতে লাগল। সকালের রোদ ততক্ষণে তেতে উঠেছে। তার দিকে একটা তেরছা রশ্মি দিয়েছে। তাতে তার চোখ অন্ধকার হয়ে এলো। সোনালী আলোগুলো তার চোখে জ্বলে উঠল।  পাম পাতার ডগা থেকে তার হাত ফঁসকে গেল। তার সাঁইত্রিশ বছরের জীবনে এই প্রথমবারের মতো সে গাছ থেকে পড়ে গেল।

যখন তার চেতন হলো, তখন তার কোনো ব্যথা- বেদনা বোধ হলো না। বরঞ্চ অদ্ভুতভাবে তার মনে হলো, পড়ে গিয়ে তার কিছু একটা ভালোই হয়েছে। অবিশ্বাস্য রকমের হাল্কা আর বায়বীয় শূন্য বোধ হচ্ছে তার। কোথায় যাচ্ছে সেটা চিন্তা না করেই সে জ্বলজ্বলে মাকড়সার মিহি জালের উপর দিয়ে হেঁটে গেল। জোনাকি পোকাগুলো তার নাক- কানের মধ্যে ঢুকে গেল। ঝিঁকিমিকি করতে করতেই তারা তার চোখের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এলো। এভাবে সে দীর্ঘসময় ধরেই হাঁটল। তারপর আরেকটা সাইনবোর্ডের দেখা পেল। সেখানে লেখা আছে--

ডেলটা তেল কোম্পানি। এখানে অবৈধভাবে প্রবেশ শাস্তিযোগ্য। তার চারিদিকে অনেক মাটির ঢিপি, কবর ফলক, একটি পাম গাছ এবং লবনাম্বুজ গাছের শ্বাসমূল। সে একটি গাছের গুড়িতে দাগ দিল। হঠাৎ করে সেই দাগটি বড়ো সড়ো ঘায়ে পরিণত হলো। সে জড়াকড়া লাগানো মূলের পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। ক্ষত থেকে সাদা রঙের কষ ঝরছিল। এই কষ বেশ ঝামেলা দিল। গোড়ালির চারিপাশে সেই মূলগুলো পেঁচিয়ে ধরল। তাকে মাটিতে ফেলে দিল। আর তার পায়ে সুড়সুড়ি দিতে লাগল। যখন সে হেসে ফেলল তখন মূলগুলো তাকে ছেড়ে দিল।

সে একটি নদীর পাড়ে এলো। নদীর জল ছিল খুব আঁঠালো। এবং তার কোনো স্রোত আছে বলে মনে হয় না। নদীর কাছে একটি গর্ত। গর্তের মুখে তিনটি  কাছিম  আলসেমি ভরে তাকে দেখছিল। এর একটি কাছিমের মুখ ছিল তাবাস্কোর মুখের মত দেখতে। গাছি লোকটি এ সময় কিছু একটা বলতে যাবে যাবে করছিল, তখনি একটি বহুবর্ণিল সাপ সেই গর্তের ভেতর থেকে বের হলো। একেবেঁকে তাকে পাশ কাটিয়ে নদীতে নেমে গেল। নদী জলে সাপটি সেঁধিয়ে যাওয়ার পরে নদীর জলের রঙ পালটে গেল। হয়ে গেল স্বচ্ছ। আর তা থেকে আলো বের হতে লাগল। সাপের চামড়া একটা গোলাপী রঙের আগুনে পুড়ে গেল। এ সময় গাছি লোকটির পেছনে একটি  কণ্ঠস্বর শোনা গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাতে গেল। তখন   কণ্ঠস্বর বলে উঠল--পেছনে তাকাবে না।

গাছি লোকটি স্থির হয়ে গেল। কাছিম তিনটি কাচের চোখ দিয়ে তার দিকে চেয়ে রইল। তারপর তাবাস্কোর মুখঅলা কাছিম তার দিকে পেচ্ছাপ করে দিল। এটা করতে তার মজাই লাগছিল মনে হলো। এজন্য তার মুখে যে পরমানন্দ দেখা দিল তা সর্বতোভাবেই পৈশাচিক। গাছি লোকটি হেসে উঠল। আর তক্ষুণি  পিছন থেকে একটা ভারী লাঠির বাড়ি এসে লাগল তার মাথায়। সে অতি দ্রুত মাথাটা ঘোরাল বটে, কিন্তু কিছুই দেখতে পেলো না। আবার সে হাসল। সে আরো জোরে বাড়ি খেলো।  তার দেহের সব কিছু গলে গেছে বলে তার মনে হলো। এরপরে দীর্ঘ নৈ:শব্দ নেমে এলো।  তাতে মনে হলো নদীটি ফুলে উঠেছে।

--আমি কোথায়? প্রশ্ন করল গাছি লোকটি।

আবার নৈ:শব্দ। নদীর ভেতর থেকে সাপটি উঠে এলো। সঙ্গে উঠে এলো ঝিকিঝিকি আলোর রশ্মিও। তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সাপটি তার দিকে ঘাড় উঁচু করল। তাকে থু থু দিল। গর্তের ভেতরে ঢুকতে লাগল। সূর্যের রঙে সাপটি ঝিকমিকিয়ে উঠল। গাছি লোকটি কেঁপে উঠল। কাঁপা শেষ হলে তার চারিদিকে এক ধরনের পবিত্রতা ছড়িয়ে গেল। সে চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে পেল, তার শরীর থেকে আরো বহু শরীর বেরিয়ে পড়েছে। সে ঠিক বুঝতে পারছে না, তার ভেতর থেকে মনটি, না শরীরটি বের হয়ে গেছে। 

-- আমি কোথায়?

সেই কণ্ঠস্বর কোনো উত্তর দিল না। শুধু কয়েকটি পায়ের শব্দ শুনতে পেলো। কারা  যেন হেঁটে যাচ্ছে। কারা যেন তাকে নিয়ে কথা বলছে। সেই কণ্ঠস্বরগুলো এমনভাবে কথা বলছে যেন সে এখানে নেই। এই কথাবার্তা তাকে ঘুমুতে দিল না। 

এই জগতে সূর্য কখনো ডোবে না-- কখনো ওঠেও না। এটা যেন একটি স্থির চোখ মাত্র। সন্ধ্যায় সূর্যটি লাল স্ফটিকের মতো হয়ে ওঠে। সকালে হয়ে ওঠে ভাস্বর। কখনোই চোখ বন্ধ করার অনুমতি ছিল না গাছি লোকটির। একদিনের ঘোরাঘুরির শেষে সে গর্তটির কাছে শুয়ে রইল। পাম রসের তাড়ি নিয়ে উলটা পালটা কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগল। তখন মুরগির মতো গন্ধযুক্ত একটা জন্তু কাছে এলো। মাকড়সার জাল দিয়ে তার চোখ ঢেকে দিল। এর ফলে তার চোখ চুলকোতে লাগল। মনে হলো এই চোখের অনেক কৌতুহল আছে। সেগুলো দেখার জন্য  প্রস্তুতি নিচ্ছে সেই চোখ। চোখ খোলা রেখেই গাছি লোকটি ঘুমাবার চেষ্টা করল। তার চেনা জগৎটাকে লাল আলোর মধ্যে ঘুরতে দেখল। দূরের বাজারের দিকে নারীদেরকে সে হেঁটে যেতে দেখল। তাদের সামনে বহু  ধরনের শব্দ হচ্ছে। এই শব্দগুলোকে তারা শুনতে পাচ্ছে না। এ জগতের সাইনবোর্ডগুলো তার সামনে বড়ো হয়ে যাচ্ছে। তেল কোম্পানীর কর্মীরা তখন বন কেটে সাফ করার চেষ্টায় আছে। তার খিদে পেলে আরেকটি জন্তু এলো। জন্তুটিকে সে দেখতে পেল না। তাকে সে পচা গলা নোংরা গিরগিটি, কেন্নো আর গাছের ছাল বাঁকলের মণ্ড খেতে দিল। তেষ্টা পেলে লাউয়ের খোল থেকে চুঁয়ে পড়া সবুজ ঝোল দিল। এর পরে রাতে আরেকটি জন্তু এলো। তার গা থেকে পচা আগাপান্থাস ফুলের দুর্গন্ধ আসছিল। জন্তুটি তার গায়ে উপর চড়ে বসল। সঙ্গম করল।  রাতের সঙ্গমের ফলে কয়েকটি ডিম পাড়ল। তারপর জন্তুটি চলে গেল।

একদিন গাছি লোকটি সাহস করে ডিমগুলো গুনল। মোট সাতটি ডিম। সে চেঁচিয়ে উঠল। নদীটি ফুলে ফুলে উঠল। গর্তের মুখের বাইরের দিকে সাপটি মাথা বের করল। সুর্যের ভেতর থেকে মৃত্যুর ঠা ঠা হাসি গর্জে উঠল। এই হাসি তাকে খুঁজে বের করল। তার গায়ে ভেঙ্গে পড়ল। তাকে ঝাঁকি দিতে লাগল। তার মাথার ভেতরটা অনেকখানি ফাঁকা করে দিল।

সে-রাতে সে পালালো। তার সঙ্গে সবকিছুই পালালো। কিছুক্ষণ পরে সে থামল। গালি দিল এর ভয়ংকর বাসিন্দাদেরকে, পরিবর্তনহীন প্রকৃতিকে। সেখান থেকে বের হতে না পেরে সে হিংস্রভাবে গালি দিতে লাগল। এর ফলে সে কয়েকটি আঘাত খেলো।

তার ডিমগুলোর মধ্যে বিচিত্র শব্দ হতে লাগল। সেই শব্দ গাছি লোকটিকে যন্ত্রণা দিতে লাগল। যেন ডিমের মধ্যে দৈত্যকার কিছু আছে। তার জন্মের সময় হয়েছে। সেজন্য ডিমের খোলস ভেঙ্গে ফেলছে। এই জন্ম প্রক্রিয়ার কারণেই এই ভয়ঙ্কর  গোঙানি শব্দ হচ্ছে।   এই ভেবে সে ধৈর্য ধরতে শিখল। আকাশ দেখতে জানল। বুঝতে পারল মাতাল অবস্থায় সে যে ধরনের  আকাশ দেখতে পায়,  এই আকাশ তার চেয়ে আলাদা কিছু নয়। ডিমের ভেতরে জন্ম প্রক্রিয়ার গোঙানিতে মনোযোগ না দেওয়ার ব্যাপারটাও শিখল। সে আরো শিখে নিল, যখন সে স্থির থাকে তখন তার চারদিকের সব কিছুই তার এই স্থিরতাকে প্রভাবিত করে।

এবং আরেকদিন কণ্ঠস্বরটি তার কাছে এলো। বলল : ‘তোমার পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার উলটো ব্যাপারগুলোই আছে অন্য পৃথিবীতে। এদের সংখ্যা অসীম। এদের কোনো আকার নেই, কোনো পাগলামী নেই, পরমানন্দ নেই। নেই কোনো বিপ্লবী ঘটনাও। কোথাও কোথাও এদের ছায়া থাকলেও থাকতে পারে। তোমাকে পাগল করে দেওয়ার মতো কিছু গল্প আমি বলতে পারি। মানুষ নামের তোমরা খুবই ধীরে চলো। এজন্য তোমরা তোমাদেরই দুই হাজার বছর পেছনে পড়ে গেছ।’

এই কণ্ঠটি তাড়াতাড়ি চলে গেল।

আরেকটি কণ্ঠস্বর শোনা গেল। তাকে বলল :

তুমি দুদিন ধরে মৃত অবস্থায় আছ। এখন জেগে ওঠো।

একটি জন্তু এলো। তার চোখে মাকড়সার জাল ঠেসে দিল। তার চোখ আবার চুলকাল। এবং দেখতে পেল যুদ্ধগুলো তখনো শেষ হয়নি। ঐ কৃষি ফার্মে বেশ কিছু বোমা পড়েছিল। কিছু অদ্ভুত কারণে সেগুলো ফাটেনি। সেগুলো সে সময় হঠাৎ করে ফাটল। এর সঙ্গে কিছু লোক উড়ে গেল। তারা মূল যুদ্ধের শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখানে থেকে যাবে মনে করেছিল। তারা এ সময় চরম দারিদ্যের সঙ্গে লড়াই করছিল। ইতিমধ্যে বেশ কিছু সেঁতু পুনর্নিমাণ করা হচ্ছিল। সেই সেঁতুগুলিকে ভেঙ্গে পড়তে সে দেখতে পেলো। তার চোখ পড়ল, রাস্তাগুলো গভীর বনের মধ্যে চলে গেছে এবং চলে গেছে ম্যালেরিয়া জ্বরের উৎস জলাভূমি পর্যন্ত। বেশ কয়েকটি অনামা খাঁড়িও চোখে পড়ল। আর চোখে পড়ল কয়েকটি পাহাড়। এদের উচ্চতা জানা নেই। সে দেখতে পেল রাস্তার মুখে মানুষের কংকাল  সারি করে পড়ে আছে। অমনোযোগীভাগে ভাবে গাড়ি চালাতে গিয়ে এই  মানুষগুলো দুর্ঘটনায় মারা গেছে। বেশ কিছু কুকুর এই মানুষদেরকে অনুসরণ করছিল। তারা ঝোঁপ-ঝাড়ের ভেতর বাইরে খুঁজে দেখছিল। খুঁজে বের করছিল  রাতের পথের চিহ্নগুলো। খুব তাড়াতাড়ি এই কুকুরগুলো উবে গেল। তারা ঘোমিদ নামের জন্তুতে রূপান্তরিত হলো। নি:সঙ্গ ও অরক্ষিত পথিকদেরকে তারা গিলে ফেলল।

তারপর সে দেখতে পেল, বনভূমিকে জলা করার কাজ চলছে। চলছে তেল উত্তোলনের কাজ। এই দুটো কাজই ব্যর্থ। কয়েকজন ওঝাকে সে পেলো। বন থেকে ভুত তাড়াতে তাদেরকে আনা হয়েছে। তারা মুশলধারে বৃষ্টিপাতকে থামাতে চেষ্টা করছিল। এবং সূর্য যাতে দেরী করে ডোবে সে চেষ্টাও তারা করছিল। এইসব কাজকারবারই ব্যর্থ হয়েছিল। তখন কোম্পানী একজন প্রবাসী বিশেষজ্ঞ লোককে ভাড়া করে এনেছিল। গত যুদ্ধে অব্যবহৃত বেশ কিছু বিস্মোরক বোমা সে প্লেনে করে নিয়ে এসেছিল। বনভূমিতে সেই প্রবাসী বিশেষজ্ঞ লোকটিকে বোমা পুততে দেখতে পেল গাছি লোকটি। বোমাগুলি ফাটার পরে ঘন সবুজ ধোঁয়ার কুণ্ডলী সে দেখতে পেলো। ধোঁয়া সরে গেলে তার চোখে পড়ল-- ভীতিকর তেল আর প্রাণীদেহ বমির মতো মাটির উপরে উগরে পড়েছে। এলাকাটি অবশেষে পরিত্যক্ত হলো। সেখানে যুদ্ধের ময়দানে রক্তের মতো করে আগাপান্থাস ফুল ফুটল।

গাছি লোকটির চোখের সামনেই দলে দলে লোক গুলি খেয়ে মরছে। কেউ কেউ গুপ্ত হত্যার শিকার হচ্ছে। আবার কেউ কেউ অস্ত্র ডাকাতির সময়েও মরছে। সে আরো লক্ষ্য করে দেখতে পেলো যারা গুলিতে মারা গিয়েছিল তাদের গায়ে তাদের নাম লেখা আছে। তার চোখ জ্বালা করা থেমে গেল। আকাশে তামা বিস্ফোরিত হচ্ছিল। তার নিচ দিয়েই সে হাঁটছিল। চারপাশে কোনো পাখি তার চোখে পড়ল না। ক্ষতিগ্রস্থ পাম গাছের উপরে মাকড়সার জাল বোনা হচ্ছিল।

এবং তারপর একদিন পুরনো কালের বীরদের কথা মনে করে সে অনুপ্রেরণা পেলো। গর্তের মধ্যে দিয়ে বেরনোর উপায়ও বের করল। এইরকম একটি অদ্ভুত পরিস্থিতিতে গাছি লোকটি দেখতে পেলো সেই বহুরঙা সাপটি সাজিমাটির মূর্তির আকারে কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছে। বেশ কিছু কুমিরও তার নজরে এলো হ্রদের সবুজ জলের বুড়বুড়ির মধ্যে। একটি বুড়ো লোক বসা অবস্থায় বাইবেল পড়ছিল। হাতে উলটো করে ধরা ছিল বাইবেলটি। লোকটি এই বসা অবস্থায়ই মারা গিয়েছিল। সবকিছুই যেন আগুনে পুড়ছিল। কিন্তু কোনো ধোঁয়া দেখা যাচ্ছিল না। দেয়াল থেকে ঘন কাদার মতো তেল চুয়ে চুয়ে পড়ছিল। সবকিছুকে পুড়িয়ে দিয়েছিল গোলাপী আগুন। কিন্তু কোনো কিছুকেই আগুন ধ্বংস করেনি। তার পিছনে একটি শব্দ শুনতে পেলো। একটি জন্তু নোংরা খাবার ভরা একটি থালা তার হাতে জোর করে গুঁজে দিল। জন্তুটি তাকে বুঝিয়ে দিল এটা তার খাওয়া উচিৎ। বহুরঙা সাপটি কুণ্ডলী পাকানো সাজিমাটির আকার থেকে নিজ থেকে পাক খুলে ফেলল। গাছি লোকটি যখন খাচ্ছিল তখন সাপটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো এবং তাকে নোংরা গল্প বলতে শুরু করল। কালো মানুষদের কিভাবে বৃহৎ সাগরের পারে পশ্চিমা শহরগুলোতে ফাঁসিতে লটকেছে সেই সব গল্প তাকে বলল। কোনো ধরনের শব্দ করা ছাড়াই একটি শিশুর গায়ের চামড়া  কিভাবে তুলে নিয়েছিল এই গল্পটিও সে তাকে বলল। সাপটি হেসে উঠল। সাপটিকে তখন এতো হাস্যকর লাগছিল যে গাছি লোকটি নিজেও না হেসে পারল না। এরপর স্টিলের ধারালো লাঠির কয়েকটি আঘাত তার মাথায় ঢাকের কাঠির গুড় গুড় শব্দ করে পড়ল। তাতে সে জ্ঞান হারাল অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য।

জ্ঞান ফিরলে সে এখান থেকে বেরোবার পথ খুঁজে নিল।  সেই বাইবেল হাতে মৃত লোকটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে সে লক্ষ করল, লোকটিকে ঠিক তার মতোই দেখতে। সে গর্ত থেকে পালিয়ে এলো।

তার অস্থিরতা ততক্ষণে নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। মাটির উপরে পাথরগুলি সে গুনল। মাকড়সার জালগুলোও গুনল। গুনল সূর্যের রংগুলো, নদীর ঢেউগুলো। আর গুনল বাতাস কতবার বয়ে গেল তার হিসেব। সে নিজেকে গল্প শোনাতে লাগল। কিন্তু সে দেখতে পেল-- সে নিজেকে যে গল্পগুলো শুনিয়েছে তার সবই ছিল নাশকতামূলক। এবং একইসঙ্গে আঘাত দিয়ে দিয়ে সেগুলো কাটছাট করা হয়েছে। সে এই আঘাতগুলোও গুনল। তাতে সে অভ্যস্ত হয়ে গেল।

এরপর কণ্ঠস্বরটি আবার এলো তার কাছে। এর আওয়াজ স্বাভাবিকেরভতুলনায় খুবই নিষ্ঠুর শোনাল। কণ্ঠস্বরটি বলল:
‘তুমি কি এই জায়গাটি পছন্দ করছ?’

‘না।’

গাছি লোকটি একটি আঘাতের জন্য অপেক্ষা করল। কিন্তু আঘাতটি এলো  না।

‘তুমি কি চলে যেতে চাও?’

‘হ্যাঁ।’

‘কি তোমাকে থামিয়ে রেখেছে?’

‘কিভাবে থেমে গেছি তা জানি না।’

কণ্ঠস্বরটি থেমে গেল।

আরেকটি কণ্ঠস্বর বলল,

‘তুমি তিন দিন ধরে মরে আছ।’

গাছি লোকটি আকাশ ও মাটিকে দেখেছে নানা কোণ থেকে। সে মদ তৈরির গুপ্ত বিদ্যা জানে। সে আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটাই পেলো। সে কোনো ধরনের চিন্তা ভাবনা ছাড়াই মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনল।

‘যদি তুমি চলে যেতে চাও,’ কণ্ঠস্বরটি বলল, তবে তোমাকে পিটুনি খেয়েই যেতে হবে।’

‘কেনো?’

‘ কারণ, তোমরা, মানুষেরা একমাত্র যন্ত্রণাকেই টের পাও ।’

‘ আমরা টের পাই না।’

আরেকবার নীরবতা নেমে এলো। সে আরেকটি আঘাতের অপেক্ষা করল। আঘাতটি এলো। বাতাসের উপরে মাকড়সার জালের মতো তার ভাবনাগুলো ভাসতে লাগল। সূর্যের বেগুনি দশার মতো গাছি লোকটি স্থির হয়ে রইল। বেশ কিছুক্ষণ পরে কণ্ঠস্বরটি বলল--
যে ভাবনা থেকে আঘাত করা হয়েছে তাকে বদলে দেওয়ার মতো  আরো বেশ কিছু ভাবনাচিন্তা আছে। তুমি   কি সেগুলো  শুনতে চাও?’

‘হ্যাঁ।’

কণ্ঠস্বরটি কেসে উঠল। তারপর বলা শুরু করল--

জীবনের অনেক ভালো বিষয়ও তোমাকে বিষাক্ত করতে পারে। তিন ধরনের শব্দ আছে, দুই ধরনের ছায়া আছে, প্রতিটি ভাঙা মাথার জন্য একটি করে রক্ষাবরণ আছে, যারা অনেক উঁচুতে উঠতে চায় তাদের জন্য আছে সাতটি গর্ত। বিষয়গুলোকে অনুভব করার জন্য আছে এক ধরনের এসিড। এক ধরনের আগুন আছে যা পোড়ায় না, কিন্তু সাধারণ লবণের মতো মাংসগুলোকে গলিয়ে ফেলে। বড়ো মুখগুলো ছোটো মাথাগুলোকে খেয়ে ফেলে। যে হাওয়াগুলোকে আমরা দূরে ঠেলে দিয়েছিলাম, সেই হাওয়াগুলোই আমাদের দিকে আবার ফিরে আসে। তোমার নিজের আগুনে পোড়ার জন্য বেশ কিছু পদ্ধতি আছে। নির্দিষ্ট একটি শব্দ আছে যা আসন্ন সমস্যা সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়। তোমার মনের ভিতরে অনেক দুর্গত এলাকা আছে। তার চারিদিকে হেঁটে বেড়ানোর শব্দই হলো তোমার চিন্তাভাবনা।’

‘ধন্যবাদ।’ বলল গাছি লোকটি।

কণ্ঠস্বরটি চলে গেল। গাছি লোকটি ঘুমিয়ে পড়ল।

যখন তার ঘুম ভাঙল সে তখন দেখতে পেলো গর্তের মুখে তিনটি কাছিম অলসভাবে শুয়ে রয়েছে। তাবাস্কোর মুখওয়ালা কাছিমটির চোখে ছিল শিংযুক্ত চশমা। আর গলায় ঝুলছিল স্টেথিস্কোপ। কাছিমগুলো একটি কোলাবাদাম ভাঙল। নিজেরা ভাগ করে নিল। পণ্ডিতদের মতো করে বই ছাড়াই তারা গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করছিল। বহুরঙা সাপটি গর্ত থেকে বের হয়ে এলো এবং নদীতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। কাছিমগুলোর কাছে আসতেই সে থেমে গেল। গাছি লোকটি তার বর্ণিল চোখ দুটি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল।

‘ আজ রাতে ছয়টি চাঁদ আছে।’ তাবাস্কোর মুখওয়ালা কাছিমটি বলল।

‘ হ্যাঁ, আজ রাতে চাঁদের সংখ্যা ছয়। ‘ অন্য কাছিমগুলো তার সঙ্গে একমত হলো।

সাপটি মাথা উঁচু করল। মহাকাশের দিকে তার জ্বলজ্বলে চোখ রাখল। বলল, ‘ আজ রাতে সাতটি চাঁদ আছে।’

কাছিমগুলো নিরব হয়ে রইল। সাপটি নদীর দিকে এগোতে থাকল। তাবাস্কোর মুখওয়ালা কাছিমটি একটি পাথরের টুকরো তুলে নিল। সাপটির দিকে ছুড়ে মারল। অন্য কাছিমগুলো হেসে উঠল।

‘আজ রাতে কোনো সাপ নেই।’ তাবাস্কোর মুখওয়ালা কাছিমটি জানাল।

কোনো যেন একটি ইঙ্গিতে অন্য কাছিমগুলোও  সাপটিকে আক্রমণ করে বসল। তাবাস্কোর মুখওয়ালা কাছিমটি সাপটির ঘাড় ধরে টেনে আনল এবং স্টেথিস্কোপ দিয়ে তার শ্বাসরোধ করা শুরু করল। অন্য কাছিমগুলো পাথর দিয়ে তার মাথায় আঘাত করল। সাপটি তার লেজ দিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করল। তাবাস্কোর মুখওয়ালা কাছিম ও সাপটি পরস্পরকে জড়াজড়ি করে ধরে  গর্তের মধ্যে পড়ে গেল। নিচ থেকেও তাদের হট্টগোল শোনা গেল। কিছুক্ষণ পরে তাবাস্কোর মুখওয়ালা কাছিমটি উঠে এলো। তবে তার চশমা ও স্টেথিস্কোপ তার সঙ্গে ছিল না। সে অন্যদের মধ্যে জায়গা করে নিল। তারা আরেকটি কোলাবাদাম ভাংলো। তারপর তোবাস্কোর মুখওয়ালা কাছিমটি একটি পাইপ তৈরি করতে শুরু করল। তামাকের বদলে এলিগেটির মরিচের বীজ ব্যবহার করল। সে পাইপে আগুন ধরাল এবং গাছি লোকটিকে কাছে আসার ইঙ্গিত করল। গাছি লোকটি এলো। এসে গর্তের মুখের দিকে কাছিমগুলোর কাছে বসল। তাবাস্কোর মুখওয়ালা কাছিমটি গাছি লোকটির মুখের দিকে কালো ঘন ধোয়া ছুড়ল। তারপর বলল, ‘তুমি ছয়দিন ধরে মরে আছ।’

গাছি লোকটি বুঝল না। কাছিমগুলো তাদের আলাপগুলোকে টেনে নিয়ে গেল আকাশের স্বর্গীয় বস্তুর দিকে।

কিছুক্ষণ পরে এই ধোঁয়ায় ভর করে গাছি লোকটি তার পরিচিত জগতে ভেসে চলল। তার নাকে একধরনের সুড়সুড়ি জাগতে শুরু করল। সে ভেসে চলল ছেলেবেলার সময়ের দিকে। । সেদিন মুখোশ উৎসবে তার মা তাকে পিঠে করে নিয়ে গিয়েছিল। দিনটি ছিল গরম। মুখোশ পরা লোকজন কান ফাটানো শব্দে হৈ হুল্লোড় করছিল। সব জায়গা লাল ধোঁয়ায় ভরে দিচ্ছিল। এর ফলে সাধারণ নশ্বর মানুষগুলো তাদের জাঁকজমকপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়েছিল। সেই সারাদিনটাই তার নাক ছিল গরম। এবং সে রাতে পৌরানিক চরিত্রদেরকে স্বপ্নে দেখল--তারা তার নাকটিকে মুখের যথাস্থানে বসিয়ে রাখতে পারে এবং এ কাজটি করার জন্য তারা পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছিল। সে এই স্বপ্নের মধ্যে বারবার থাকতে লাগল। এই পৌরানিক চরিত্রদের মধ্যে ছিল-- বিখ্যাত কামার। সে জলকে ধাতব বস্তুতে রূপান্তরিত করতে পারে। জটিল পরিস্থিতিতে খ্যাপার মতো আচরণ করে থাকে যে  কুখ্যাত কাছিমটি-- সেও এর মধ্যে ছিল। এবং ছিল সেই ভুতের কবিরাজ যার কাছে রহস্য খোলার চাবি ছিল না। যখন এরা পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে শুরু করল, তখন গাছি লোকটির মা এলো। এক থাল তীব্র ঝালযুক্ত মরিচের গুড়ো ছিটিয়ে তাদেরকে তাড়িয়ে দিল। ফলে তার নাকের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেল।

যখন গাছি লোকটি তার চেনা সেই জগতের মধ্যে ভেসে যাচ্ছিল তখন সেই কণ্ঠস্বরটি আবার এলো। তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। অন্য কণ্ঠস্বরটি বলল, ‘অনেক দেরী হয়ে গেছে। জেগে ওঠো।’

তার গায়ে পড়তে লাগল অদৃশ্য আঘাত। সূর্যের অস্বাভাবিক এক মুহুর্ত ছিল তখন। তার চোখের মধ্যেকার বেগুনি রঙকে বদলে দিয়ে অন্ধকার করে ফেলে।  আঘাত দেয়া থেমে গেলে গাছি লোকটি হাঁচি দিতে লাগল। এই হাঁচিগুলো তার মধ্যে জমেছিল। হাঁচির দমকে দৈত্যকার ডিমগুলো বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হলো। সাপটি তার চকচকে চোখগুলো হারাল। শব্দগুলো ভেঙ্গে মশাদের মৃত্যুকালীন ভনভনাতিতে পরিণত হলো। গর্ত থেকে সবুজ বমি বের হতে লাগল। বমির স্রোতে সাপটি, সাইনবোর্ড আর কাছিমগুলোও ভেসে গেল। গাছি লোকটি স্রোতে ভেসে যাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাল। তার চারিদিক চোখ মেলে দেখল। তার চোখের সামনে দিয়ে একটি নীল মেঘ চলে গেল। তাবাস্কো নামের কবিরাজ তার শরীরের উপর দাঁড়িয়ে ধুপধুনো ওড়াচ্ছিল। এই ধুপধুনোর কারণেই জ্বালা ধরানো ধোঁয়ার উৎপত্তি হয়েছিল। তাদের দুজনের চোখাচোখি হলো। আনন্দে তাবাস্কো চেঁচিয়ে উঠল। সে তার মন্দিরের সাজিমাটির মূর্তির উপরে পবিত্র জল ঢালতে ছুটল। মূর্তিটির দুটি সবুজ কাঁচের চোখ ছিল। মন্দিরের পায়ের কাছে ছিল একটি সবুজ গামলায় দুটি কাছিম।

‘আমি কোথায়?’ শুধালো গাছি লোকটি।

‘আমি দু:খিত-- তুমি প্রথমে কোথায় ছিলে সে বিষয়টি জানার ব্যাপারে মনোযোগ দিতে পারিনি।’ জবাব দিল কবিরাজ।

‘কিন্তু আমি কোথায়’?

‘ তুমি একটি গাছ থেকে পড়ে গিয়েছিলে। তারপর সাতদিন ধরে মরে পড়েছিলে। সকালে তোমাকে কবর দিতে নিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি এই সময়কালে তোমাকে জীবিত করার চেষ্টা-তদ্বির করে যাচ্ছিলাম। এ কাজের জন্য তোমার কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক নেবো না। আসলে তোমাকে আমারই কিছু দেওয়া উচিৎ। কারণ গত কয়েক বছর ধরে কবিরাজী করতে গিয়ে এর চেয়ে মজার কেস পাইনি। পাইনি এরকম ভালো কোনো গপ্পো।




অনুবাদক
কুলদা রায়
গল্পকার।
নিউ ইয়র্কে থাকেন। 

৪টি মন্তব্য:

  1. বেশ বড় গল্প কিন্তু ইন্টারেস্টিং। কুলদা রায় ভালো লেখেন আমি জানি। অনুবাদ করেছেন চমৎকার। সুখপাঠ্য। কোথাও হোঁচট খাইনি।

    উত্তরমুছুন
  2. গল্পটির ভিতরে গল্প লুকিয়ে আছে। পড়তে পড়তে গাছির পরাবাস্তবতায় পাঠক প্রবেশ করছিল। চমৎকার অনুবাদ। বেন ওকেরির গল্পতে কঠিন বাস্তব মিশে যায় অলীক বাস্তবতায়। পরাবাস্তবে। লুন্ঠিত স্বদেশের সামান্য মানুষ গাছি। অচেতন দুঃস্বপ্নে সে আগামীদিনের নিষ্করুণ বাস্তবতাকে দেখতে পায়। স্বাভাবিক গল্পের দিন কি শেষ ? তবে ফর্ম যে গল্পকে দিতে পারে না না রঙ, এই গল্পে তা ধরা যায়।

    উত্তরমুছুন
  3. "কিছুক্ষণ পরে এই ধোঁয়ায় ভর করে গাছি লোকটি তার পরিচিত জগতে ভেসে চলল। তার নাকে একধরনের সুড়সুড়ি জাগতে শুরু করল। সে ভেসে চলল ছেলেবেলার সময়ের দিকে। । সেদিন মুখোশ উৎসবে তার মা তাকে পিঠে করে নিয়ে গিয়েছিল। দিনটি ছিল গরম। মুখোশ পরা লোকজন কান ফাটানো শব্দে হৈ হুল্লোড় করছিল। সব জায়গা লাল ধোঁয়ায় ভরে দিচ্ছিল।..." বাহ্‌ ,কী অদ্ভুত বর্ণনা! যেমন বেন ওকরি লিখেছেন, তেমনি আপনি তা মনের মাধুরী মেখে বর্ণনা করেছেন অনুবাদে। বেশ ভালো লেগেছে।

    উত্তরমুছুন
  4. বরাবরের মত স্বচ্ছ,সাবলীল বাস্তবতা পরাবাসতবতা মিলে মিশে তর তর করে বয়ে গেল যেন। খুব ভাল লাগলো।

    উত্তরমুছুন