শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

বেন ওকরির গল্প : কৃষ্ণবর্ণ রাশান

অনুবাদ : রুখসানা কাজল

প্রথমবার ব্যর্থ হয়েছিলাম, কিন্তু এবার আমরা আশা করছি যে ‘ইউজিন ওনেজিন’ চলচ্চিত্রটির একটি অসাধারণ রঙিন চিত্ররূপ দিতে সফল হব। 

স্যুটিং টিমে আমরা ছিলাম চারজন। স্থানীয়ভাবে যেসকল যন্ত্রপাতি সহজলভ্য সেগুলোই আমরা ব্যবহার করবো ঠিক করেছিলাম।
ঠিক হল আলো প্রক্ষেপণের জন্য আমাদের মধ্যে একজনকে রান্নাঘরে থাকতে হবে। ট্রেনটি যখন চলতে শুরু করবে তখন রান্নাঘরে যে আছে তাকে ঐ আলোর সংকেত জ্বালাতে হবে। যা কিনা ট্রেন চালককে আগুন এবং গতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। চলন্ত ট্রেন এবং তাতে জ্বলতে থাকা আগুনের চিত্রটি দিয়ে একটি নতুন দৃশ্যপটের সূচনা হবে, যেখানে মহিলাদের একজনকে সাইকেলে চড়ে এগিয়ে যেতে দেখা যাবে। এরপর আরেক দৃশ্যে অন্য একটি চরিত্রকে তার কাজটি করতে দেখা যাবে।

প্রতিটি কাজই ছিল অত্যন্ত সুসমন্বিত এবং পরবর্তি দৃশ্যাবলিও চুড়ান্তভাবে সাজানো ছিল। যেন একবারেই সাফল্যের সাথে সমস্ত ঘটনা ক্যামেরা বন্দী করা সম্ভব হয়। প্রত্যেকের এরকম টান টান মানসিকতা ছিল যে এখুনি এই দৃশ্যগুলোকে সাফল্যের সাথে উতরে নিয়ে যেতে হবে, নইলে আর কখনো করা সম্ভব হয়ে ওঠবে না। যথা সময়ে আলোকধারী ব্যক্তি আলো তুলে ধরেছিল এবং ট্রেন চালক সে আলো দেখে তার ভূমিকা যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল। অন্যান্য দৃশ্যাবলীও সাফল্যের সাথে গ্রহন করা হয়েছিল। 

এটা এত ভাল একটি সমন্বিত কাজ ছিল, এবং চুড়ান্তভাবে একটা শটের সাফল্যের উপর নির্ভর করছিল, যা আসলে একবারই ঘটবার বিষয়। নইলে আর কখনই ঘটবেনা।

প্রক্ষেপনকারী আলোটা তুলে ধরলো, ট্রেন চালক সে আলোটা দেখতে পেল, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দৃশ্যবলীরও সঠিক চিত্রায়ন হল। ট্রেনটি যখন দ্রুতগতিতে চলে গেলো, আমি খোলা প্ল্যাটফর্মে লাফিয়ে পড়লাম। নেমেই চরম বিস্ময়ে একজন কৃষ্ণবর্ণ মানুষের মুখোমুখি হলাম। যে ছিল বিলাসবহুল ট্রেনটির একজন গুরুত্বপূর্ন কর্মী। প্রথম শ্রেণীর যাত্রীদের দেখভালের দায়িত্ব ছিল তার উপর। চমৎকার একটি লাল জ্যাকেট পরেছিল সে যার দুই কাঁধে লাগানো ছিল সৈন্যদের জ্যাকেটের মত ব্যবহৃত উজ্জ্বল ধাতব ঝালর। তার গায়ের কালো রঙটি এমন গাঢ় ছিল যেন গভীর ঘন নীল মনে হয়। যখন আমি চলন্ত ট্রেন থেকে প্ল্যাটফর্মে লাফিয়ে পড়লাম লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। আমাকে বিস্মিত করে বলে উঠলো, 
‘স্বাগতম ডাবচাংকা’

এমন ভাব করল যেন সে আমার সারাজীবনের চেনা। আবারও সে চেনা মানুষের মতন হেসে উঠল।

লোকটির হাসিতে মুগ্ধ আমি স্বপ্রণোদিত হয়ে তার বানানো ঘন মাখনে গড়া পনির ছড়ানো একটা স্যান্ডউইচ তুলে নিলাম। যে স্যান্ডুউইচটি আমি তুলে নিয়েছিলাম সেটিতে আসলে তার কামড় দেয়া ছিল, কিন্তু তাতে আমি কিছু মনে করিনি। তখন আমি ধীরগতি হয়ে আসা ট্রেনটি থেকে লাফিয়ে বের হলাম। কৃষ্ণবর্ণ রাশান লোকটিও আমার সাথে লাফিয়ে নেমে পড়ল। ট্রেনের এই স্বল্প বিরতিকালে লোকটি তার অবশিষ্ট স্যান্ডুউইচের জন্য কিছু ক্যাভিয়ার আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে স্থানীয় দোকানগুলোর দিকে অভিজাত ভঙ্গীতে ছুটে গেল। 

কিন্তু আমাদের ক্রু-দলের একজন ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে লাফিয়ে নেমে পড়ল এবং আমার মতই কিছু না বলে নিজে নিজেই সেই সুস্বাদু চমৎকার মাখন পনির মাখা শেষ স্যান্ডুউইচটি তুলে নিল। আমি দেখতে পেলাম,  কৃষ্ণবর্ণ রাশান লোকটি বিনম্র আতঙ্কে বিস্মিত হয়ে আমাদের ক্রু সদস্যের গোগ্রাসে স্যান্ডুউইচ খাওয়া দেখছে। এটা খুবই হাস্যকর দৃশ্য ছিল। 

যাই হোক, শেষ পর্যন্ত প্রতিটি দৃশ্য ভালোভাবে চিত্রায়ন সম্ভব হল। স্কুল শিক্ষিকা এবং কুরাগিন দুজনেরই দিনটি ভাল গেল। ট্রেনটি ছিল কালো রঙ করা এবং সুন্দর। ঐদিনের সব রঙই খুব নিখুঁত ছিল। মহিলারা তাদের ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেছিল। সব সমন্বিত চিত্রায়নের কাজই দারুণভাবে সফল হয়েছিল। আর গভীরভাবে আমরা অনুভব করছিলাম যে একটি মহৎ ক্লাসিক রাশান কাজ নিয়ে ঘরে ফিরছি। এটা ছিল চিত্রগ্রহনের শেষ দিন।

অবশেষে, পুশকিনকে গৌরবান্বিত করা গেল। 




অনুবাদক
রুখসানা কাজল
কথাসাহিত্যিক। কবি। শিক্ষক।
ঢাকায় থাকেন।


1 টি মন্তব্য:

  1. বেন ওকরির ভাবনাগুলো বেশ অদ্ভূত। পড়ে মজা পাচ্ছি।

    উত্তরমুছুন