শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

জয়দীপ দের গল্প : স্ট্রাইকার

বাসটার নম্বর কতো; সেভেন এ না বি? নূরুদ্দিন তাকে ফেলে যাওয়া হলুদ বাসটাকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করে। বিশেষ একটা লাভ হয় না। ভারী শরীরের হলুদ বাসটা ঝোলা পশ্চাদ্দেশ দোলাতে দোলাতে চলে যায়। থাক, নিজেকে নিজে প্রবোধ দেয় নূরুদ্দিন। ফেরার সময় পথটা আবার ভালো করে বুঝে নিলে হবে। এবার প্যান্টের পকেট থেকে ঠিকানাটা বের করে হাতে নেয়। সর্বনাশ, হরেন পই পই করে বুঝিয়ে দিয়েছিল কি করে যেতে হবে। তার এখন কিসসু মাথায় নেই।
স্মৃতি এবং দৃষ্টি দুটো নিয়ে আফসোস করে নূরুদ্দিন। কী তীক্ষè দৃষ্টি ছিল তার। সাব অর্ডিনেটরা চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে সাহস পেত না। অফিসের সব ফাইল আদেশ পরিপত্রের নম্বর ঠোঁটের ওপর লেগে থাকত। কেরানি ব্যাটারা কোন নোট দেয়ার আগে চৌদ্দবার দেখে নিত। ভুল হলে পরিণাম যে ভয়ংকর, তা সবার জানা ছিল। সেই ক্ষুরধার মানুষটা ক্ষয়ে গেলে আর কতটুকুই বা ক্ষইবে। সোনালী অতীতকে ভর করে নূরুদ্দিন সোজা হয়ে দাঁড়ায়। অস্থিসন্ধির বেয়াড়া ডিস্কপ্লেটগুলো নীচ থেকে তাকে টেনে ধরে। মনে করিয়ে দেয় বয়স হয়েছে। খাঁচা নিয়ে গৌরবের আর কিছু নেই। 

মুক্তোর মতো ঝকঝকে দিনটা। ফালগুনের মিষ্টি রোদে ভেজার অলস অলস আয়োজন চারদিকে। পারত কেউ ঘরের বাইরে পা ফেলতে রাজি নয়। পার্ক স্ট্রিটে তাই ন¤্র ভিড়। নিষিদ্ধ জুয়াড়িদের মতো এখনো এখানে ওখানে লুকিয়ে গুলতানি মারে বিগত রাতের কুয়াশা। আর কাঁটা বিছানো শৈত্যভাব। নূরুদ্দিন মাফলারটা ভালো করে কানে মাথায় জড়িয়ে নেয়। ঠিকানা দেখানোর জন্য কেউ একজনকে খুঁজে। শহরটা যেহেতু বাঙালির, টাউট বাটপার থেকে সাবধান না থেকে উপায় নেই।

দাদা, এই এড্রেসটা কোথায় বলতে পারবেন।

মোছওলা এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক অফিসের ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। ঠিকানাটা হাতে নিয়ে মুচকি মুচকি হাসেন, দাদা কি ওপার থেকে এসেছেন?

আজ্ঞে।

ভদ্রলোকের তামাটে মুখটা কানছোঁয়া হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

দাদার বাড়ি কনে। মোগো বাড়ি বরিশাল।

বাহ দারুণ বলতে পারেন তো আপনি। আমি চট্টগ্রামের লোক।

দাদা গো আপনে সূর্যসেনের দেশের মানুষ, হায়রে... আগে কইবেন তো। তা দাদা ঠিকানাটা তো একটু দূর আছে। কেমনে যাইবেন। এদিকে আমার বাস বোধয় আইয়া পড়লো। একটা কাজ করেন, সোজা গিয়ে দুইটা গলি পর বামে মোড় নিবেন, তারপর কাউরে জিগাইলে... আইচ্চা দাদা আসি, নমস্কার।

ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে বাসের দিকে ছুটল।

খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগুতে লাগলেন নূরুদ্দিন। এক কেজি মিষ্টি নেয়া দরকার। মিষ্টির দোকানগুলো এখনো খুলে নি। মিষ্টির দোকান খুঁজতে খুঁজতে দুটো গলি শেষ হয়ে গেলো। বায়ে মোড় নিল। পঁচিশ-ছাব্বিশের এক শীর্ণকায় যুবক খালি রাস্তায় দাঁড়িয়ে রোদ পোহাচ্ছে। আর আশেপাশে কেউ নেই। ছোকড়াকে ভরসা করার মতো মনে হলো নূরুদ্দিনের। তার পর মন বলল কি আর আছে তার হারানোর।

ভাই ঠিকানাটা কোথায় বলতে পারবে।

দাদু কি পূর্ববঙ্গ থেকে এসেছেন?

জি।

আপনি মুসলিম। আমিও। আব্দুস শাদসাদ। দোকানে কাজ করি। এই ঠিকানা আমার যাওয়ার পথেই। চলেন এগিয়ে দেই। ছেলেটা উচু দালানটার দিকে তাকিয়ে বলল, রুকসানা মে যারা হু...

জানালা থেকে একটা গলা বের হলো, আইয়ে জি।

তুমি কি বিহারী।

ছেলেটা মৃদূ হাসল। না। আমার বিবি মুজাফরাবাদের।

ও।

তবে আমি মুসলমান। এই পরিচয়টি দিতেই জোরে জোরে উর্দু হিন্দি মিশিয়ে বলি। ছেলেটি বলতে বলতে পকেট থেকে একটা টুপি বের করল। সাদা কুশিকাটার টুপিটা পরে নিল মাথায়।

কি বলো এসব!

জি চাচাজি। এমনেই তো ওরা... তাই বর্ণচোরা হতে চাই না। জোর গলায় নিজের আইডেন্টি দেই। ইমানদার একবার কবরে যায় চাচা।

তোমাদের এখানে কি এখনো এসব আছে?

পৃথিবীর কোথায় নেই বলেন। আপনার দেশে আছে না। মাইনরিটি অলটাইম মাইনরিটি।

তা ভাই তোমার নামটা কি যেন বলেছিলে?

শাদসাদ।

তা শাদসাদ, এসব নিয়ে এখনো কলকাতায় মারপিট হয়?

হবে না কেন, হরদম হয়। সমানে সমানে ফাইট হয়। আমরা ওদের বাপদের খাইও না পড়িও না। সুযোগ পেলে দেই লাগিয়ে-

শামসাদের সঙ্গে টুকটাক আলাপ চলতে থাকে। একসময় সুন্দর একটা ছ’তলা ভবনের সামনে এসে দাঁড়ায় তারা।

এই বিল্ডিং কো তিনতলা মে। আপ খুঁজে লিয়ে চাচাজি।

দারোয়ানকে শুনিয়ে জোরে জোরে বলে চলে গেলো শাদসাদ।

মাঝবয়সী দারোয়ানটি সরু চোখে তাকালো তার দিকে। বিরক্তি নিয়েই ঠিকানার চিরকুটটি হাতে নিল। 

কি নাম বলব।

নূরুদ্দিন। ফরম চিটাগং।

বাংলাদেশ?

ইন্টারকমটা হাতে তুলে আবার রেখে দিল।

যান চাচা, ভেতরে যান। আমার দাদায় বিক্রমপুরের লোক আছিল। 

ভয়ংকর চেহারাটা মুহূর্তে বিনয়ে দ্রবীভূত হয়ে গেলো। নূরুদ্দিন ব্যাপারটা উপভোগ করল। দারোয়ান লিফটে উঠিয়ে দিয়ে তাকে ৪-এর বোতাম টিপ দিয়ে দিল।

চাচা চাইরে নাইম্যাই ডানের ফেলেটটা।

ধন্যবাদ।

দারোয়ানের হাসি ছড়ানো মুখের উপর দরজাটা বন্ধ হয়ে গেলো।

নকশাকাটা সুন্দর দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে অস্বস্তিতে পড়ে গেলো নূরুদ্দিন। এভাবে খালি হাতে আসাটা ঠিক হলো না। সব নষ্টের গোড়া ওই শাদসাদ ছোকড়াটা। ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই তো সব ভুলে গেলো।

দু’বার দরজায় জোরে বাড়ি দিতেই কর্কশ আওয়াজ শোনা গেলো।

কে কে।

কিছু না বলে নূরুদ্দিন দাঁড়িয়ে থাকল। লম্বা কাঠের চামচ হাতে মাঝ বয়সী এক মহিলা দুম করে দরজাটা খুলেই বলল, চোকের মাতা কেয়েচেন। ডোর বেল দেকেন না। এভাবে আঘাত করলে তো দরজার রং টিকবে।

নূরুদ্দিন শরমিন্দায় পড়ে গেলেন। আসলেই তো, কাজটা ঠিক হয়নি।

পেছন থেকে স্কার্ট পরা এক কিশোরী এগিয়ে এলো।

কাকে চাই।

এটা কি শ্রী হেমাঙ্গ রায়চৌধুরী মহাশয়ের বাড়ি।

আজ্ঞে। আপনার পরিচয়টা-

আমি নূরুদ্দিন আহমেদ।

আপনি কি চট্টগ্রাম থেকে এসেছেন।

হ্যা গো বোন, আমি চট্টগ্রামের লোক। 

মেয়েটি হেসে উঠল, আপনার কথা শুনেই বুঝেছি দাদু। এতো মিষ্টি করে এখানকার লোকজন কথা কইতে পারে না। আসুন, ভেতরে আসুন-

তা ভাই তুমি-

আমি উনার মেঝো ছেলের মেয়ে। সুগ্রীবা।

আসলেই তো, এতোক্ষণ খেয়াল করিনি, তুমি সত্যি সুগ্রীবা।

সুগ্রীবা হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ল, দাদু এখনো মেয়েদের খেয়াল করেন?

করি তো হা হা হা... সুন্দরী নাতি নাতনী থাকলে তাকাবো না।

চা দেই? আপনাকে একটু বসতে হবে। ঠাকুরদার শরীর বিশেষ ভালো না। ঘুমের ঔষধ দিয়ে ঘুম পাড়ানো হয়। তাই উঠতে একটু -

না না ঠিকাছে, আমি বসছি। তোমার ঠাকুরমা?

আপনি বুঝি জানেন না, উনি তো আজ থেকে আঠারো বছর আগে গত হয়েছেন।

ও। জানতাম না গো বোন।

আপনাদের সাথে ঠাকুর দা’র বোধহয় তেমন যোগাযোগ হয় না।

হত। তার পর দুপক্ষের ব্যস্ততার কারণে কেউ আর-

আচ্ছা দাদু একটা জিনিস জানার বড়ো আগ্রহ ছিল। সেদিন কারা জিতেছিল? নিশিডাঙা না ক্ষেত্রপুর।

সুরলোকের ছলনাময়ীদের মতো সুগ্রীবা যেন তাকে স্মৃতির গহ্বরের কিনারায় এনে ধাক্কা মারল। বৃদ্ধ নূরুদ্দিন পালকের মতো ভাসতে ভাসতে ডুবে যেতে লাগল স্মৃতির সুড়ঙ্গে।

তখন গ্রামের অবস্থাপন্ন বাড়িগুলোর ভেতরে যোগাযোগ ছিল খুব নিবিড়। হিন্দু না মুসলমান সেটা বিবেচ্য ছিল না। এসব বাড়ির ছেলে ছোকড়ারা একসঙ্গে স্কুলে যেত। স্থানীয় স্কুলগুলো থেকে ম্যাট্রিক পাস করে পাড়ি জমাত কলকাতায়। পড়াশোনায় হিন্দুর ছেলেরাই ছিল এগিয়ে। মুসলমান অভিভাবকরা অন্য বিষয়ে যেমন তেমন, পড়াশোনার ব্যাপারে চাইতেন হিন্দু ছেলেদের সঙ্গে যেন তাদের সন্তানদের সদ্ভাব তৈরি হয়। এভাবে নূরুদ্দিনের বড়ো ভাই নাজিমউদ্দিনের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে শ্যামলের। বিপিন উকিলের ছেলে শ্যামল ক্লাসের সেকেন্ড বয়, কিন্তু খেলার মাঠে তার ধারে কাছে আসার কেউ নেই। ছিপছিপে গৌরবর্ণের ছেলেটা চিলের মতো ছোঁ মেরে বলটা নিয়ে ঢুকে পড়ত ডি বক্সে। তখন এতো অফসাইড টপসাইড জানা ছিল না। মুহুর্মুহু করতালিতে হয়ে যেত গোল।

মাঝে মাঝে এ গ্রামের সাথে ও গ্রামের ম্যাচ হতো। দুটো গ্রামের অবস্থাপন্ন পরিবারের ছেলে আসত খেলতে। সুঠাম শরীরের সুন্দর সুন্দর যুবকদের খেলা দেখতে গ্রামের লোকজন ভিড় জমাত ইউনিয়ন বোর্ডের মাঠে। সেই খেলা শুধু খেলাই ছিল না, ছিল ইজ্জতের সওয়াল। দুই গ্রামের যুবকরাই চেষ্টা করত চুন ফ্ল্যাগ রঙিন কাগজ দিয়ে মাঠ সুসজ্জিত করত। শহরের টেইলার দিয়ে শর্টস জার্সি বানিয়ে আনা হত। হাটু পর্যন্ত মোজা টেনে নতুন জুতো জার্সিতে সুসজ্জিত হয়ে খেলোয়াড়রা নামত মাঠে। মাঠের এক পাশে টেবিলের ওপর সুন্দর কাপড় বিছিয়ে তাতে সাজিয়ে রাখা হতো শিল্ড ও মেডেল। শেষের দিকে মাইকও আনা হতো মহকুমা থেকে। গ্রামবাসীর জন্য এই ম্যাচ ছিল বিশেষ এক আনন্দের দিন।

এরকম এক মাঘ ফাল্গুনের সকালের কথা। ইউনিয়ন বোর্ডের মাঠে ফুটবল খেলা হবে। ছেঁড়া ছেঁড়া মানুষের ভিড় জমতে লাগল। ক্ষেত্রপুর থেকে সুন্দর সুবেশী যুবকরা আসতে লাগল সাইকেলে চেপে। মাঠের একপাশে সাইকেলগুলো শুইয়ে দিয়ে তারা নেমে পড়ল ওয়ার্ম আপে। এদিকে নিশিডাঙার একজন বাদে সব খেলোয়াড় এসে গেছে। নিশিডাঙার ক্যাপটেন নাজিমউদ্দিন খুব চিন্তিত। তাদের বাড়ির রাখাল কালুকে পাঠানো হলো বিপিন উকিলের বাড়িতে। কিছুক্ষণ পর ছুটতে ছুটতে আসল কালু।

ভাইজান, হিতেরা তো নাই। ঘরত তালা।

ওবুক, কি কছ?

মাইনসে কদ্দে রাইতিয়া হিতেরা ফুইট্যে (পালিয়েছে)।

পুরো নিশিডাঙা ফুটবল দল ছুটল বিপিন উকিলের বাড়িতে। তাদের মেইন স্ট্রাইকার নেই। তারা খেলবে কাকে নিয়ে। বিপিন উকিলের শূন্য ভিটে দেখে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল সবাই।

কি দাদু বললে না যে।

সুগ্রীবার প্রশ্নে স্মৃতির পাতকুয়া থেকে যেন উঠে এলো নূরুদ্দিন, না গো বোন, সেদিন আর খেলাই হয়নি। মেইন স্ট্রাইকার ছাড়া আমরা মাঠে নামব কি করে বলো?

গৌরাঙ্গ রায়চৌধুরী ওরফে শ্যামলের নাতনি মুখ কালো করে তাকিয়ে রইল নূরুদ্দিনের দিকে। নূরুদ্দিন বাষ্পে ঝাপসা হওয়া চশমা মুছে।

ফিশ ফ্রাই আর চা এলো। নূরুদ্দিন খিধের পেটে বাধ বিচার না করে খেতে লাগল।

এসময় সুগ্রীবা আর কাজের ঝি মিলে এক বৃদ্ধকে ধরে নিয়ে আনল ড্রইং রুমে। মাথায় মাংকি ক্যাপ, গলায় সার্ভিকাল কলার, গায়ে উলের সুয়েটারের ওপরে চাদর।

কাঁপা কাঁপা হাত তুলে বৃদ্ধের প্রশ্ন, কে তুমি ভাই।

দাদা আমি নূরু।

নূরু... স্মৃতির নথি-পত্তর ওল্টাতে লাগলো হেমাঙ্গ।

আঁই নুরু বদ্দা ... ওনারার নুরু...

ওবুক তুঁই আইসো না... ওবুক আর ভাই আইসেরে ... আঁর বুক পুড়েদ্দে...

বৃদ্ধের মরণ কান্না দেখে হকচকিয়ে গেলো সুগ্রীবা আর কাজের মহিলাটি। নূরুদ্দিন দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল শ্যামলকে। সুযোগ পেয়ে এতোদিনের চাপাকান্নার মুখ থেকে ছিপি সরিয়ে দিলো নূরুদ্দিন। দুই বৃদ্ধের আর্তনাদে পাশের ফ্ল্যাটের লোকজন ছুটে এলো।

কি হয়েছে রে সুগ্রীবা ... দরজা খুলতেই পাশের বাড়ির মাশীমার প্রশ্ন।

দেশ থেকে আমাদের অতিথি এসেছেন গো।

ও বাঙালদেশ থেকে-

শ্যামলকে শুইয়ে দেয়া হলো বিছানায়। শ্যামলের শিয়রে বসে বসে গল্প করতে লাগল নূরুদ্দিন। একে অপরের পরিবারে খোঁজ খবর নিতে লাগল। নিজামউদ্দিনের মৃত্যুসংবাদ শুনে আরেকদফা কান্নাকাটি শুরু হলো।

মরনোর আগে আঁর বদ্দা কইল গিয়ে তোঁর লগে দেহা করিবার লাই, ইলাই আস্যি দে-

(মরনের আগে দাদা বলে গিয়েছিলো- তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য, এজন্য আসছি)

শ্যামল প্রশ্ন করে করে তার স্মৃতির গ্রামকে আবার তুলে আনে তার ঝাপসা হয়ে যাওয়া চোখের মণিতে। খবর নেয় চট্টগ্রাম শহরের। তার গ্রাম ও জেলার প্রভূত উন্নতি শুনে সে রীতিমতো বিস্মিত। বারবার বলে, শরীর পড়ে গেছে, নইলে এবার নূরুর সাথে ঘুরে আসতাম।

নূরুদ্দিন শ্যামলের মাথায় হাত বুলিয়ে চট্টগ্রামে অঞ্চলিক ভাষায় বলতে থাকে, দাদা তুমি না স্ট্রাইকার ছিলে। সবসময় বল নিয়ে সবার আগে ছুটতে, সেই তুমি কেন পালিয়ে এলে রাতের অন্ধকার।

ভয়ে রে।

কিসের ভয়?

মায়ার।

আবার দু’জন মিলে কাঁদে।

দাদা কত চিঠি লিখল তোমাকে, তুমি আর এলে না।

ধক করে জ্বলে ওঠে শ্যামলের চোখ, কিসের জন্য যাবো! কি নিরাপত্তা আছে ওই দেশে আমার?

কি বলো এসব দাদা! আমরা ছিলাম না। কে কি করত বলো তোমায়।

আমি কোন করুণার জীবন চাইনি।

ভুল বললে ভুল। তোমার মাতৃভূমিতে তুমি থাকবে, কার কিসের করুণা! তুমি তোমার অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে থাকবে।

নতুন বাবুকে তোরা বাঁচাতে পেরেছিস?

সেটা অন্য অধ্যায় দাদা। আমরা তো এক নতুন দেশ গড়েছিলাম; তুমি আমি সবাই একসঙ্গে থাকার মতো করে।

সেই দেশে কি সংখ্যালঘুরা এখনো নিরাপদ?

শ্যামলের প্রশ্নটা শুনতেই শামশাদের চেহারাটা তার চোখে ভেসে উঠল। নূরুদ্দিন থেমে বলতে লাগল, পৃথিবীর কোথাও সংখ্যালঘুরা কেন কোন মানুষ নিরাপদ? নিরাপত্তা একটা বোধের ব্যাপার। আজ এদেশে রাস্তার মারামারিতে কোন মুসলিম মারা গেলে যেভাবে দেখা হয়, হিন্দু মারা গেলে কি একইভাবে দেখা হয়? তাই বলে এদেশের সব মুসলিম কি দেশ ছাড়া হবে?

তা অবশ্য খারাপ বলিস নি।

দাদা আমাকে একটু বাইরে যেতে হবে। একজনকে নিয়ে আসব। আগেই বলে নেই সে মুসলিম। তার সামনেই কিছু প্রশ্নের মীমাংসা করা যাবে।

কে লোকটা?

আসার পথেই দেখা। শাদসাদ নাম। এখানেই কোন একটা দোকানে নাকি কাজ করে। আশা করি একটু খুঁজলেই পাওয়া যাবে।

শামশাদের সন্ধানে উঠে পড়ে নূরুদ্দিন। ভাবে, পথের ছেলে শাদসাদ যে সত্যটা অনুভব করেছে এতো শিক্ষিত মানুষ শ্যামল তা পারল না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন