শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

বেন ওকরির গল্প : ধ্বংসের শহরে সঙ্গীত

অনুবাদ : আফসানা বেগম

বোমায় ধ্বংস হওয়া এক শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। উপড়ানো রাস্তা, ভেঙে পড়া ব্রিজ আর দুমড়ে মুচড়ে মাটিতে সমান হওয়া বাড়িঘর দেখে ফিরছি। দোকানগুলোর সামনের কাচের ঘেরাটোপ উধাও। ভিতরের জিনিসপত্র ইচ্ছেমতো লুটপাট করে নেয়া হয়েছে।
একসময়ের ঝলমলে বাণিজ্যিক শহরটা কেবল ইটের টুকরোর স্তূপ এখন। বাদ্যযন্ত্রের একটা দোকানে দেখলাম পিয়ানোগুলো ভেঙেচুরে তক্তার মতো হয়ে পড়ে আছে। সবখানে সবকিছু উলটপালট।

চাইলেও ভুলতে পারব না এমন সব দৃশ্য চোখে পড়ল। একদল মানুষকে দেখলাম, ঘুমের মধ্যে যাদেরকে পাথর মেরে মৃত্যুর দরজা পার করে দেয়া হয়েছে। বহুতলের এক ইমারতের উঁচু তলায় ঘটেছে এই অনাচার। হতভাগ্য মানুষগুলো তাদের শ্বেতশুভ্র মশারির মধ্যে অঘোরে ঘুমাচ্ছিল। আর ভিন্ন মতের মানুষেরা সেখানে পাথর হাতে পৌঁছে গেছে। ঘুমন্ত মানুষগুলো যখন কোনো স্বপ্নে বিভোর, তাদেরকে পাথরে আঘাত করে হত্যা করেছে তারা।

যেতে যেতে উপস্থিত হলাম এককালের চাকচিক্যময় এক ইমারতের সামনে। যাকে ঘিরে শোকগ্রস্থ কিছু মানুষ হা হুতাশ করতে ব্যস্ত। আরবীয় একজন যাজক সেখানকার মেঝেতে পড়ে পড়ে কাঁদছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে একসময় হলুদ এক টুকরো কাচ হাতে উঠে দাঁড়ালেন। কাচের টুকরোটা হাতে নিয়ে দেখাতে লাগলেন উপস্থিত লোকজনকে। যাজকের চারপাশের মেঝেতে নীল, সবুজ আর হলুদ কাচের টুকরো গড়াগড়ি খাচ্ছিল। সেসবের দিকে চোখ যেতেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো। ওই ইমারতটা আসলে ছিল খ্রীষ্টানদের একটা চার্চ। চার্চের সামনের দিকটাতে ছিল বাইবেলের নববিধান ভাগের সাধু আর বিশেষ সম্মানিত ব্যক্তিদের মূর্তি, রঙবেরঙের নকাশাদার কাচ দিয়ে বানানো। আস্ত চার্চটাই ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে তখন। মূর্তির শরীরের কাচের টুকরো যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তারপর হঠাৎ চার্চের অতীত রূপের একটা ছবিতে চোখ পড়তেই দেখলাম কত অসামান্য ছিল তার কারুকাজ! আর কেবল তখনই ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা আন্দাজ করতে পারলাম।

শহরটা তখন দখলের রাজত্ব। শেতাঙ্গদের উপস্থিতি মানুষকে অতিষ্ট করে তুলেছিল। কিন্তু কিছুতেই তারা শেতাঙ্গদের কবল থেকে মুক্তি পায়নি। অস্থায়ী সরকারের ভিতরের এক লোকের সঙ্গে সরকারি একটা অফিসে গিয়েছিলাম আমি। প্রবেশের সারিতে আমাদের সামনে দুজন শেতাঙ্গ অপেক্ষায় ছিল। অফিসে ঢোকার মুখে আগন্তুকদের তল্লাশি করা আর পাসপোর্ট জমা রেখে একটা টোকেন হাতে ধরিয়ে দেয়ার নিয়ম ছিল সেখানে। আমাদের সামনের দুজন শেতাঙ্গকে পাসপোর্ট তো জমা রাখতে হলোই না, এমনকি তাদেরকে তল্লাশিও করা হলো না। যা হোক, তাদের পরে যখন আমার পালা এল, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। চরম বিরক্তিতে আমি আমার পাসপোর্টটা তাদের টেবিলের উপরে ছুঁড়ে দিলাম। নির্বোধ কর্মকর্তাটিকে শুনিয়ে বলে দিলাম, “আপনারা দখল হওয়া রাষ্ট্র নিয়ে আক্ষেপ করেন, অথচ যারা আপনাদের দখলের স্বাদ দিয়েছে তাদের জন্য আইন অনায়াসে শিথিল করতে পারেন। এদিকে, আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছেন যেন আমি জঘন্য কোনো অপরাধী। মানে হলো গিয়ে, যারা আপনাদের মাথায় বোমা মেরেছে তাদের জন্য নিয়ম সুবিধার আর অন্যদের জন্য ভোগান্তির। ভণ্ডের দল কোথাকার!”

তার হাত থেকে টোকেনটা নিয়ে আমি হনহন করে হেঁটে গেলাম। বিরক্তিতে মন ভরে ছিল। তবে বিরক্ত হয়ে ছিলাম বলেই হয়ত তাদের প্রতি মোহ কেটে গেল।

কিন্তু তবুও, ওই প্রাচীন শহরে তাণ্ডব চালিয়ে তাকে লণ্ডভণ্ড করতে দেখে নিজের ভিতরে যে আঘাত বা ক্রোধ বোধ করছিলাম, তা এতটুকু কমল না। শহরের বিখ্যাত জাদুঘর থেকে কালোত্তীর্ণ সম্পদ লুটে নেয়া হয়েছে। শহরের বিশাল পাঠাগার থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে অমূল্য বই আর নথি। ছোটো ছোটো এলাকাগুলো দড়িছেঁড়া উন্মত্ত কুকুরের মতো এক দল লোকের সন্ত্রাসে ঠাসা। ধর্মীয় উন্মাদনার প্রবল উত্থান আনাচে কানাচে। অধিবাসীদের বাড়িছাড়া করা হয়েছে। মানুষের উপরে নির্বিচারে আক্রমণ করে হত্যা করা হয়েছে। প্রাচীন একটা সংষ্কৃতি ঝুর ঝুর করে ধ্বসে গেছে; বিকৃত হতে হতে নরকে গিয়ে ঠেকেছে। সবখানে শুধু আশার আলোবিহীন অরাজকতা। অথচ এতকিছুর পরেও, নিয়তির উপরে বিশ্বাস রেখে মানুষের মধ্যে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবার আকাঙ্ক্ষা  কোথাও যেন দেখতে পেলাম আমি।

ধ্বংসপ্রাপ্ত ভুক্তভোগী এক শহরে দাঁড়িয়ে এ হয়ত শুধুই আকাশ কুসুম কল্পনা। যেদিকে যাই, কেবল কালো নেকাবে আবৃত মায়েদের আর্তনাদ কানে আসে। মৃত সন্তান কিংবা হারানো স্বামীর অন্তর্ধানের কাহিনি উচ্চারণ করতে গিয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে তারা।

তারপর একদিন হতভাগ্য সে শহরের কোথাও আকস্মিক সঙ্গীত বেজে ওঠে। মুর্ছনার এক গভীর প্রবাহ বয়ে যায়। সাতদিনের বিরতিহীন বোমা নিক্ষেপের পরেও শহরটিতে সামান্য যে কয়টি ইমারত তখনো আস্ত ছিল, তার মধ্যে সঙ্গীতায়োজনের উপযুক্ত একটি ইমারত থেকে স্তব্ধ আদিম বাতাসের হলকা যেন হুট করে মুক্ত হয়। কেউ জানত না সঙ্গীতের স্রষ্টা কে। পরিচয় না জানলেও তার সঙ্গীত তাদের আমোদিত করে, দুঃসহ কষ্টের উপরে শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দেয়। তাদের সময় থমকে যায় অথচ তারই মধ্যে পরিস্থিতি বদলায়। শুদ্ধ সঙ্গীতের সুমধুর সুর ধ্বংসে বোনা পরিবেশ দখল করে নেয়। তারপর সেই সুরের আবেশ কেঁপে কেঁপে সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। আকাশ ভেদ করে এঁকে বেঁকে নক্ষত্রদের জড়িয়ে ধরে। বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত শহরের পরতে পরতে বেমানান মাধুর্যসমেত সুরের অলীক ভ্রমণ চলতে থাকে। সুমধুর সঙ্গীতের জাদুমন্ত্রের ছোঁয়ায় ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিটি জিনিস মুহূর্তে যায় বদলে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি, বোমায় ধ্বংস হওয়া এক শহরে দাঁড়িয়ে ম্যোৎসার্টের সঙ্গীত শুনতে কেমন লাগতে পারে, তার সুরের ব্যঞ্জনা আরো কত গুণ বেড়ে যেতে পারে, আঘাতের উপরে শান্তির পরশ বোলাতে আদতে যে সুরের সৃষ্টি। সে সুরের পরশে টুকরো ইটের হাজার স্তূপের ভিতর থেকে ঝলমলে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি উঁকি দেয়।

আবারো ভেঙে গুঁড়িয়ে যাওয়া স্তম্ভগুলো দেখে ফিরি আমি, চাপা এক ক্রোধের সাক্ষী হয়ে থাকি। আমার হৃদয়ে তখন ম্যোৎসার্টের সুরের প্রতিধ্বনি, যেন চোটের উপরে মোলায়েম বরফের আদর।





অনুবাদক
আফসানা বেগম
অনুবাদক। গল্পকার।
ঢাকায় থাকেন। 

৬টি মন্তব্য:

  1. ঝরঝরে অনুবাদ।
    ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  2. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  3. বাহ... গল্পটা যেমন চমৎকার... অনুবাদটা ঝরঝরে... ধন্যবাদ অনুবাদককে...

    উত্তরমুছুন
  4. অনুবাদ প্রাঞ্জল। গল্পটি ভালো। মনে থাকবে।

    উত্তরমুছুন
  5. 'সে সুরের পরশে টুকরো ইটের হাজার স্তূপের ভিতর থেকে ঝলমলে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি উঁকি দেয়।' কী অসাধারণ বর্ননা!বেন ওকরির লেখাতে এমন হাজারো হীরের কুঁচি ছড়িয়ে রয়েছে। খুব ভাল অনুবাদ।

    উত্তরমুছুন