শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

বেন ওকরির গল্প : জাতবিদ্বেষী বর্ণবাদী লোকটি

অনুবাদ : খুরশীদ শাম্মী

ঘটনাটি ছিল যুদ্ধের সময়ের। আমরা দলবেঁধে একটি দেয়ালে বসেছিলাম এবং আমার উদ্দেশ্য ছিল ঐ দুজন মানুষের সাথে দেখা করা। কিন্তু ওদের একজন ছিল জাতবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী। তার এক হাতে ছিল একটি চার্ট এবং আঙুলের ডগায় ছিল আঠা। সে আমাকে বলেছিল  যে তাঁর এমন কোনো উপায়
নেই যে তৃতীয় শ্রেণির একজন সাদা মানুষের সাথে করমর্দন করতে পারে। আমি আশ্চর্য হয়েছিলাম। কারণ ঐ লোকটিও ছিল একজন সাদা মানুষ। আমি তাকে আলিঙ্গন করলে সাদরে সে তা গ্রহণ করবে, কিন্তু আরেকজন সাদা মানুষ যে তার চাইতে নিঁচুজাতের তাঁকে সে নিজে থেকে ছুঁবে না। অন্য লোকটি এতে এতটাই ক্ষুদ্ধ হলো যে সে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলো। আমি তার পিছু নিলাম, কিন্তু সে এত বেশী জোরে হাঁটছিল যে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল। দলে ফিরে গিয়ে আমি আমার অবস্থানের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন হলাম।

যে লোকটি কথা বলা শুরু করেছিল সে চলে গেল। আমি বাকীদের মধ্যে অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কে জাতবিদ্বেষী বর্ণবাদী ছিল, সেকথা বলার আমার কোন উপায় ছিল না।  তখন আমি লক্ষ করলাম যে একজন সাদা বর্ণের তরুণ, চলে যাওয়া সেই লোকটির জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে ছিল ছোট্ট গোলাকার ফ্রেমের চশমা। সে আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছিল। আমি তাকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করলাম। একটি মেয়ে আমার দিকে হাত নাড়িয়ে চলে গেল। সে ছিল আমার পরিচিত একজন। চশমা পরা তরুণটি চট করে তার তালিকাটি মিলিয়ে দেখল এবং তখনই ওয়াকিটকি নিয়ে জরুরি কল করে বললো;
জি, স্যার। সে আমাদের একজনকে হ্যালো বলেছে
জি, হ্যা, স্যার।

এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, জাতগত বিশুদ্ধতায় গ্রহণযোগ্য মানুষদের সাথে আমার সম্পর্কটা কি সেটা সে খতিয়ে দেখছিল। আমি সচেতন হলাম যে সে একটি অস্বচ্ছ সংগঠনের সাথে যুক্ত। এছাড়া তারা আর কি করে? আমার মত মানুষ হত্যা করে? আমি নিরাপত্তাহীন বোধ করলাম। তাড়াহুড়ো করে দল ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম। তালিকাটি নিয়ে চশমা পরা তরুণটিও ওয়াকিটকি সহ আমাকে অনুসরণ করল। অনেকটা দৌড়েই আমি একটা মাঠ পার হলাম। সে তাঁর হাঁটার গতি আরো বাড়ালো। আমি কোথায় দৌড়াচ্ছিলাম, কোথায়ইবা দৌড়াতে পারতাম, কোন জায়গায়ই বা আমার জন্য নিরাপদ ছিল? অন্ধকার গাঢ় হয়ে এলো। লোকটি আমার ঠিক পেছনেই লেজ ধরে অনুসরণ করতে থাকল। ফিসফিস-ধাঁধালো মাঠ পেড়িয়ে অন্য প্রান্তে যেতেই তাকে হারিয়ে ফেললাম।  খুব দ্রুতই রাত নেমে এলো। হঠাৎই একটু দূরে টর্চ লাইট হাতে আবার তাকে দেখতে পেলাম। সবুজ গ্রামের অন্ধকার নিস্তব্ধতায় সে হেঁটে গেল। তার পেছনে নীল আলোর ছটায় স্থানীয় ছোট শহরটিকে অদ্ভূত দেখালো। আমার ভেতরটা বলে উঠল; তাকে ধরো, পালিয়ে যেওনা। একটা উদ্দেশ্য নিয়ে, ভয় দেখিয়ে এগিয়ে যাও। তুমি যতটা না তাকে ভয় করছো, তার চেয়ে বেশী সে তোমাকে ভয় পাচ্ছে।

আমি দৌড়ানো বন্ধ করলাম। এবং ভেতরে ঘৃণা নিয়ে বড় বড় পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। তাকে ইতস্তত দেখালো। আমি কাছে গেলাম এবং তার চোখের দিকে  স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। তাঁর চশমার পেছনে ছিল কাঁচুমাচু ভীতশঙ্কিত চোখ এবং খুব সাধারণ নির্দোষ একটা চেহারা, যাকে কোনভাবেই আঘাত করার মতন মানসিকতাই আমার ছিলনা। তাকে আমি অন্ধকারে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে গ্রামের দিকে পা বাড়ালাম। আর পেছনে ফিরে তাকাইনি, একটুও গ্রাহ্য করিনি।    

                              




অনুবাদক
খুরশীদ শাম্মী
গল্পকার। সাংবাদিক।
কানাডার টরেন্টো শহরে থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন