শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

বেন ওকরি'র গল্প : সোনালী দোজখ

ভাষান্তর : মৌসুমী কাদের

বাড়িটা ছিল যেন একটি দেশ, এবং এর ঠিক সামনেই ছিল একটা নর্দমা। সেটি নোংরা আবর্জনায় এমন বদ্ধ ছিল যে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল এবং নি:শ্বাসে তা টের পাওয়া যাচ্ছিল। ওখানে একটা মরা গরুও ছিল, যার পা গুলো কাদাজল ভেদ করে বেরিয়ে পড়েছিল। ওটা সবকিছু বিষাক্ত করে দিচ্ছিল।

কিছু মোটা মোটা বইও নর্দমাটিতে জলমগ্ন হয়ে ডুবে ছিল। সন্দেহ করা হচ্ছিল যে ওখানে মরা মানুষের লাশও ছিল, বাহুগুলোও বেরিয়ে আসছিল, যেন ঠিক ঠাওর করা যাচ্ছিলনা তাঁদের। এসব দূষিত আবর্জনার ওপর একদিক উঁচু এবং আরেকদিক নিচু একটি হাসপাতালের খাট বিশ্রান্ত শুয়েছিল। অসুস্থ মানুষগুলো খাটের ওপর শুয়েছিল কারণ সমস্ত অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো নর্দমার অভ্যন্তরে গোপন করা হয়েছিল যা এখন সারা বিশ্বে ফাঁস হতে শুরু করেছে। 

সেই দেশটি যা ছিল একটি বাড়ি, সেখানে আমি দেখেছিলাম হাজার হাজার টেবিল এবং খড়ে ভরা জাজিম। অসংখ্য রোগাক্রান্ত নারী পুরুষ ছিল সেখানে, যাদের আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা নেই। তারা নরকে পড়ে থাকা মৃতপ্রায় মানুষ, বিকট নিশাস্বপ্নে আচ্ছন্ন, যেখান থেকে মৃত্যু ব্যতীত জাগরণের কোন উপায় নেই। মানুষের সারিগুলো যেন অগণ্য সীমাহীন দেখাচ্ছিল। 

অনেক গণ্যমান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সামনে একটি মঞ্চে দাঁড়িয়ে উচ্চপদস্থ খৃষ্টান এক ধর্মযাজক মাইক্রোফোনে বারবার একই কথা আওড়াচ্ছিলেন।

‘এটা একটা স্বামী-স্ত্রীর বিষয়’, ‘একটি বিষয় যা স্বামী-স্ত্রীর’।

উনি ঠিক জানতেন না বিকল্প আর কি বলা যেতে পারে। সমস্যাটা সহজ করে বলার চেষ্টা করছিলেন তিনি, যাতে করে ভাগে ভাগে সেটা মোকাবেলা করা যায়।

লোকজন ভীড় করে দাঁড়িয়েছিল। একটা বিষাদময়তা ছেয়ে ছিল তাদের।

মহামারী প্লেগ এসে পৃথিবীটাকে বিষাদে নিমজ্জিত করে তুললো।

সেই বাড়িটি যা ছিল কিনা একটি দেশ, তার সামনের সেই গুরুত্বপূর্ণ নর্দমাটিতে পড়ে থাকা মরা গরু, জলে ডোবা বই এবং মৃতদেহগুলো অবশেষে জেগে উঠলো। একজন বিশ্ববিখ্যাত রকস্টার সেই বাড়িটার প্রতি আগ্রহ দেখালেন এবং অধিক মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলেন। তাতে করে বাড়িটা নিজেই আরো সচেতন হয়ে উঠল। আর এটি ঘটতে সময় লাগলো অনেক। নর্দমার পাশে প্রায়ই যেসব বাচ্চাদের খেলতে দেখা যেত তারা একটা অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে মরে যেতে লাগলো। এরপর দীর্ঘসময়ের মধ্যে কেউ কিছু করেনি। সবাই এমন ভাব করতো যেন ওখানে কোন সমস্যাই ছিলনা। বা ওটা আসলে কোন সমস্যা না। 

টেবিল এবং জাজিমগুলোতে পড়ে থাকা নগ্ন নারীরা দুঃস্বপ্নের খপ্পরে পড়ে এবং ঘাতক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছিল। একজন নারী যৌন ইশারা করে শরীর মোচড়াচ্ছিল আর হাওয়ার সাথে সঙ্গম করছিল। একারণে নয় যে যে এটা সে করতে চাইছিল, একারণে যে এতে তাঁর নিদারুণ যন্ত্রণা লাঘব হচ্ছিল। 

কেউ কল্পনাও করতে পারেনি কিভাবে ঐ ধোঁয়াশা আবৃত দেহগুলো কষ্টে মোচড়াচ্ছিল; যেন শাস্তি পেয়ে নরকে আটকা পড়েছে তারা। এর মধ্যে লক্ষাধিকেরও বেশী প্রাণ হারানোর পথে ধাবিত। সারা পৃথিবীর মানুষ একাকী নিঃশব্দে এই নিদারুণ মৃত্যুযন্ত্রণা পর্যবেক্ষন করেছে। 

কারো চিন্তা-ভাবনা বাতাসে ভেসে বেড়িয়েছে কিন্তু প্রকাশ পায়নি। কেউ কেউ আবার ভেতরে ভেতরে অশুভ চিন্তাও করেছে। ওরা ভেবেছে; এদের মেরে ফেলাই উচিৎ। কেই বা এই ব্যাপক হত্যার চিন্তাকে প্রশ্রয় দেবে, আসলে যা কিনা একটি ইচ্ছাকৃত গণহত্যার পরিকল্পনা?

ওদের এই দীর্ঘ নিঃসঙ্গ মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে থাকতে আমরা বাধ্য হয়েছিলাম। 

এদের সংখ্যা যাতে আর না বাড়ে আমরা সেটি প্রতিরোধেরও চেষ্টা করেছিলাম। 

নানা ভাবনা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। বিষাদের অধোলোকে সেসবের কিছু চরম,কিছু আধ্যাত্মিক, কিছু বাস্তব ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিলঃ

‘আমাদের বদলাতেই হবে। ‘লিঙ্গ পরিচয়’ কখনই কোন জনগোষ্টির জন্য মৃত্যুদূত হয়ে দাঁড়াতে পারেনা। যদি ইচ্ছেটা মুখ্য হয় তবে রুপান্তর আমাদের হবেই। আমরা নিজেরাই নিজেদের প্রভুতে পরিণত হব এবং একটি সুন্দর নতুন ভবিষ্যতের প্রতি চুম্বাকনুভূতি তৈরী করতে সক্ষম হব।’

সেইদিনটা একদিন সত্যিই এলো যেদিন ঐ বাড়ির লোকজনের মনে হল, যথেষ্ট হয়েছে। একজন মহিলা একজোড়া বুটজুতা ধার করে ঐ নর্দমায় গেল এবং রহস্যভেদ করে খুঁড়ে টেনে তুলতে থাকলো সব। নোংরা জল বুটের ভেতরে ঢুকে গেল, দুর্গন্ধটা অসহনীয় ছিল, কিন্তু তাতেও মহিলাটি অটল ছিল। নোংরা পরিষ্কার করার জন্য তিনি অনেক পরিশ্রম করলেন। একদম একা। আমরা তাকে দেখছিলাম, আবার যেন ঠিক দেখছিলামও না। এবং তারপর, ধীরে ধীরে আরো লোকজন যোগ দিতে লাগল। তারা অনেক কষ্ট করে নর্দমার জলে হেঁটে ঢুকল। তারা হাসপাতালের খাট এবং ডুবন্ত বইগুলোকে টেনে তুললো। তারপর মরা গরুটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ট্রাকের পেছনে ফেলে দিল। তারপর সেটাকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে গভীর গর্ত খুঁড়ে পুঁতে ফেললো। কেউ কেউ মনে করছিল ওটাকে পুড়িয়ে ফেলাই উচিৎ ছিল। যে বাতাসে তারা নিশ্বাস নেয় সেটা মৃত্যুর ঘ্রাণে ভরে থাকবে, এটা অন্যরা ভাবতেই পারছিলনা। 

তারা নর্দমা থেকে মৃতদেহগুলিকে খুঁড়ে বের করে যথাযোগ্য মর্যাদায় কবর দিল। 

একদিনের জন্য এটা অনেক বেশী কাজ ছিল। একটি প্রতীকী দিন। যদিও নর্দমাটিতে আরও গুরুতর গোপন রহস্য ছিল। নোংরা ময়লার মধ্যে তখনও হাসপাতালের খাটটি পড়ে ছিল। কিন্তু নর্দমাটিকে আগের চেয়ে অনেক ফাঁকা লাগছিল। মৃত্যুর সংখ্যাও কমে গিয়েছে। খুব কম লোকই সেই রহস্যময় রোগে আক্রান্ত হচ্ছিল। জনগণ নিজেদের সম্পর্কে ভালো বোধ করছিল। নর্দমাটিকে ঘিরে সেই দীর্ঘ অগ্রাহ্যতারও অবসান হয়েছে। সম্ভবত শিশুরা আবার খেলতে শুরু করতে পারবে সেই বাড়িটার সামনে, যেটা আসলে একটি দেশ ছিল।



অনুবাদক
মৌসুমী কাদের
গল্পকার। অনুবাদক। গায়িকা।
কানাডার টরেন্টো শহরে থাকেন। 

২টি মন্তব্য: