বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

ইরানি গল্প : শুক্রবারের দিনগুলি

মূল: শিবা আরাসতুই
অনুবাদ: ফজল হাসান

দাদাসের দেরি হয়ে গেছে ।

শাহরজাদ কর্নেলের স্ত্রীর মাথার উপর দেয়ালে টাঙানো বড় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে । ঘড়ির প্রতিটি টিকটিক শব্দের সঙ্গে কাঁচের ভেতর এক কোণে নারী অবয়বের দিকে মেকী আইল্যাশের এক জোড়া চোখ পিটপিট করছে । মনে হয় সেই নারী অবয়বের রক্তিম ঠোঁট যেন হেসে উঠছে । যখন ঘন্টার আওয়াজ হয়, তখন চোখের পাতা খোলা থাকে, ঠোঁট জোড়া এক হয় এবং শব্দ করে হুইসল্ বাজে ।
দাদাস এবং তার মা সেলুনে ঢোকার পর থেকে ঘড়িতে সাত বার হুইসল্ বেজেছে । ঘড়ির সঙ্গে রীতিমত পাল্লা দিয়ে কয়েকজন খদ্দেরও শিস দেয় এবং বলে, ‘ওহ্ ... আমার দেরি হয়ে গেছে ...।’ তারপর তারা তড়িঘড়ি করে কর্নেলের স্ত্রীর হাতে টাকা পরিশোধ করে দরজা পেরিয়ে বাইরে চলে যায়।

শুক্রবারের দিনগুলিতে মা সাতসকালে কাজে পৌঁছেন। সেসব দিনে তাঁর কাছে চাবি থাকে । শুক্রবার কর্নেলের স্ত্রী দুপুরের পরে আসে । শাহরজাদও মায়ের সঙ্গে শুক্রবার সেলুনে আসে ।

রাজমিক চুল কুঞ্চিত করার বড় ক্লিপ থেকে এক গোছা কাটা চুল পরিস্কার করে । তারপর সে টুসকি মেরে চুলের ক্লিপ আয়নার পাশে ঝুড়ির মধ্যে ফেলে দেয় । তার হাতের নিচে বিশাল মাথার চুলের মধ্যে আরো এক ডজন বড় ক্লিপ আটকানো আছে । জাহরা ঝাড়ু দিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা ময়লা চুল পরিস্কার করে । একসময় রাজমিক সাহায্য করার জন্য জাহরাকে ডাকে । স্থূল মহিলা, যার চুল কেটে রাজমিক মেঝেতে ফেলেছে, ঘাড়ের পেছন থেকে কাটা চুল পরিস্কার করে। মহিলা চুলের ব্রাশ দিয়ে হালকা ভাবে ঘাড়ের পেছন চুলকায় । শাহরজাদ সেদিকে তাকিয়ে থাকে । অন্য সময়ের মতো কর্নেলের স্ত্রী ফিসফাস করে টেলিফোনে কথা বলছে । একসময় মহিলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টেনেটুনে স্কার্ট পরিপাটি করে । তারপর সে বিল পরিশোধ করার জন্য কর্নেলের স্ত্রীর সামনে কাউন্টারে যায় ।

পরিস্কার করার জন্য রাজমিক বড় ক্লিপ থেকে পঞ্চম বারের মতো গোছা চুল বের করে । ক্লিপে আটকে থাকা চুল বড় এবং গোলাকার ব্রাশ দিয়ে ঠেলে সে একদিকে টেনে আনে । রাজমিকের হাতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাহরা পোর্টেবেল ড্রায়ার নিয়ে সাহায্য করে । সেই সময় দাদাস দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে । বৃষ্টির ফোঁটা তার ছাতার উপর থেকে গড়িয়ে নিচে পড়তে থাকে । কনকনে বাতাস থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সে দরজার পাল্লা বন্ধ করে । সময় দেখার জন্য শাহরজাদ দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায় । দশ মিনিট পরে ঘড়িতে হুইসল্ বেজে উঠলে সে দাদাসের সঙ্গে বাইরে যেতে পারে । তাহলে অনায়াসে তারা পরের শো-তে সিনেমা দেখতে পারবে । শাহরজাদ দাদাসকে জড়িয়ে ধরে এবং টুপ করে চুমু খায় । রাজমিক আয়নার পাশে ঝুড়ির মধ্যে চুল কাটার সরঞ্জাম ছুড়ে ফেলে দাদাসের কাছে যায় । মা তখনও বাথরুমে ময়লা কাপড় ধোওয়ার কাজে ব্যস্ত ।

দাদাসের পড়াশুনা এবং ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে কর্নেলের স্ত্রী জানতে চায় । প্রতি শুক্রবার কর্নেলের স্ত্রী জিজ্ঞাসা করে দাদাস কয়টা বিষয়ে পাশ করেছে এবং প্রতিবারই কর্নেলের স্ত্রী ভুলে যায় । দাদাস অধৈর্য্য হয়ে প্রত্যেক শুক্রবার বানোয়াট এবং উদ্ভট জবাব দেয় । কিন্তু এবার সে কোন কথাই বললো না । বরং সে রাজমিককে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনি কী খবর শুনেছেন?’

রাজমিক এবং দাদাসের কথাবার্তা কর্নেলের স্ত্রী পছন্দ করে না । প্রতি শুক্রবার যখন রাজমিক এবং দাদাস আলাপচারিতায় মশগুল হয়, তখন কর্নেলের স্ত্রী রাজমিকের গানের রেকর্ডের স্তুপ থেকে পছন্দের একটা রেকর্ড তুলে এনে গ্রামোফোনে চাপিয়ে দিয়ে উচ্চ স্বরে বাজাতে থাকে ।

মা পুরো এক ঝুড়ি ধোওয়া কাপড় নিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসেন । ধোওয়ার জন্য প্রতি শুক্রবার কর্নেলের স্ত্রী তার সমস্ত অপরিস্কার কাপড়, ময়লা তোয়ালে এবং অ্যাপ্রোন ঝুড়িতে জমা করেন । মা তাতে কোন উচ্চবাচ্য করেন না । কর্নেলের স্ত্রী মাকে ভালোই উপরি দেন ।

দাদাসের মেজাজ ঠিক নেই । মা তার জন্য উলের যে টুপি বানিয়েছেন, শাহরজাদ সেই নতুন টুপি পড়ে তাড়াতাড়ি বের হতে চায় । এছাড়া সে গলায় লাল উলের শাল পেঁচিয়ে বৃষ্টির মধ্যে দাদাসের কালো ছাতার নিচে একসঙ্গে সিনেমা দেখতে যেতে চায় । জাহরার হাতে চুল শুকানোর যন্ত্র । রাজমিকের জন্য সে অপেক্ষা করে । গ্রামোফোনে নারী কন্ঠে গান বাজে ‘... শুক্রবারের দিনগুলিতে বৃষ্টি না পড়ে রক্ত ঝরে ... ।’ তখনো দাদাসের ছাতা শুকায়নি ।

রাজমিক কর্নেলের স্ত্রী এবং দাদাসকে সিগারেট এগিয়ে দেয় । তিনজন সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে । শাহরজাদের চোখ ঘড়ির দিকে । শুক্রবার এই সময় সিনেমা দেখতে যাওয়ার উপযুক্ত সময় । কিন্তু এই শুক্রবার দাদাসের কোন ইচ্ছে নেই । মা ঠান্ডার মধ্যে বারান্দায় ধোওয়া কাপড় মেলে দিচ্ছেন । একসময় তিনি বললেন, ‘এই বৃষ্টির দিনে কে সিনেমা দেখতে যেতে চায় ?’

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দাদাস বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে । আনমনে সে জ্বলন্ত সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে । রাজমিক খদ্দের মহিলার মাথায় লাগানো বাদবাকি ক্লিপগুলো খুলে চুল সোজা করার কাজে ব্যস্ত হয় । মহিলাদের মাথার চুল সোজা রাখা হাল-আমলের ফ্যাশন । চুল কাটার জন্য যত মহিলা সেলুনে আসে, সবাই মাথার চুল সোজা রাখে । শাহরজাদর পছন্দ কোঁকড়ানো চুল । তবে তার চুল কোঁকড়ানো নয়, এমনকি সোজাও নয় । যাহোক, মায়ের বানিয়ে দেওয়া টুপি সে শীতের সময় ব্যবহার করতে ভালোবাসে । তখন সে চুল নিয়ে ততবেশি মাথা ঘামায় না । এই শুক্রবার দাদাস তার চুল কিংবা টুপি নিয়ে চিন্তিত নয়, এমনকি পছন্দের লাল শালেরও খোঁজ নেয়নি । সিগারেটের শেষাংশ সে ছাইদানীতে ফেলে দেয় এবং বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকে । তার পড়নে সাদা সার্ট । নাহিদ তাকে কিনে দিয়েছিল । শাহরজাদ নাহিদকে ভালোবাসে । নাহিদ সবসময় দাদাসের প্রতি নজর রাখে । সে চায় না দাদাসের মন খারাপ থাকুক, কিংবা রাগান্বিত হোক । দাদাস যেখানেই নাহিদকে দেখে, সেখানেই সে নিজেকে সংযত রাখে । শাহরজাদ নাহিদকে অত্যন্ত ভালোবাসে । মা বলেন, ‘নাহিদ মোটা । প্রথম বাচ্চা জন্ম নেওয়ার পর সে আরো মুটিয়ে যাবে ।’

দাদাস বলে, ‘সে মোটা নয়, বরং ঠাসা গড়ন । তাই তো ভালো ।’

শাহরজাদও তাই ভাবে ।

দাদাস আরো বলে, ‘উপরন্তু নাহিদ তো আর মহিলা নয় যে, সে বাচ্চা জন্ম দিবে ।’

শাহরজাদ ভাবে, ‘কি জঘণ্য !’

মা বলেন, ‘ওয়াহ, ওয়াহ ! তাহলে তাকে তার মতো থাকতে দাও ।’

শাহরজাদ একধনের অনুতাপ অনুভব করে ।

দাদাস বলে, ‘ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমি তাকে শাদী করিনি ।’

শাহরজাদ আবারো একধরনের অনুতাপ অনুভব করে।

মা বলেন, ‘এই বয়সে ভালোবাসা ....’

শাহরজাদ ভাবে, তার আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন । তাহলে সে ভালোবাসার মায়াজালে আটকাবে না।

সেদিন মাঝরাতে যখন বদমেজাজী তিনজন অপরিচিত লোক এসে দরজা ধাক্কাধাক্কি করেছিল । যখন তারা জোর করে বাড়িতে প্রবেশ করে বাবাকে ধরে নিয়ে যায়, তখন মা শাহরজাদকে একলা বাইরে যেতে অনুমতি দেননি । মা ভেবেছেন, লোকগুলো যেন শাহরজাদকেও চুরি করে নিয়ে যেতে এসেছিল। সেই রাতে তিনজনের একজন শাহরজাদের ভীত-সন্ত্রস্ত চোখের দিকে তাকিয়েছিল । সে মুখ বিকৃতি করে বাবাকে বলেছিল, ‘তুমি মানুষ হবে যখন তোমার মেয়ে চোখের সামনে নারী হবে ।’

বাবা লোকটিকে আক্রমণ করেছিলেন । লোকটি ভীষণ জোরে চিৎকার করেছে । শাহরজাদর আশা, সে যেন কখনই নারী না হয়ে উঠে । তার ইচ্ছা সে ছোট থাকবে । সে শুক্রবারের দিনগুলিতে দাদাস এবং নাহিদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যেতে পারে । তখন সে সসেজ স্যান্ডউইচ খায় । বাবা ফিরে না আসা পর্যন্ত সে সপ্তাহের অন্য দিনগুলিতে প্রতীক্ষা করে ।

দাদাস গ্রামোফোন থেকে ডিস্ক বের করে । শাহরজাদ সন্তুষ্ট । অনেক আগে ঘড়িতে ঘন্টা বেজেছিল । নাহিদ বলেছিল, এই সপ্তাহে তারা ‘গাভী’ সিনেমা দেখবে । শাহরজাদ বাঁধা দিয়ে বলেছিল, ‘না, চলো আমরা ‘চিকো এবং ফ্রাঙ্কো’ সিনেমা দেখি ।’

তাদের কথাবার্তা শুনে দাদাস হেসেছিল এবং বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বলেছিল, ‘হ্যাঁ, আরো অনেক গাভী আছে ।’

নাহিদ বলেছে, আগামীতে সে ‘চিকো এবং ফ্রাঙ্কো’ সিনেমা দেখতে নিয়ে যাবে । সেই সপ্তাহে তারা ‘গাভী’ কিংবা ‘চিকো এবং ফ্রাঙ্কো’ দেখেনি । ঘড়ির মাঝে নারী অবয়ব চোখ টিপেনি । মুখ হা করাই ছিল । যখন হুইসল্ বাজে, তখন নাহিদ ভেতরে প্রবেশ করে । কর্নেলের স্ত্রী মাকে চাবি দেয় । ঠোঁটে লিপষ্টিক লাগিয়ে সে বাইরে যাবে । খদ্দের মহিলার মাথায় আর কোন ক্লিপ নেই । দীর্ঘ, কালো এবং মসৃন চুলের মহিলা দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে যায় । জাহরা আয়না পরিস্কার করে । সে বাইরে যায়নি । নাহিদকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি কী নিশ্চিত যে ও-টা টিভিতে দেখাবে ?’

‘তারা ঘোষণা করেছে, মঞ্চে মঞ্চস্থ করবে,’ উত্তরে বললো নাহিদ ।

‘চলো, আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি ।’

কর্নেলের স্ত্রী বাইরে যাওয়ার পরপরই রাজমিক টিভি অন করে । শাহরজাদ ঘড়ির দিকে তাকায় এবং মুখ বিকৃতি করে । মা ভর্ৎসনার চোখে তাকান । তার জন্য রাজমিক সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে । ভেতর থেকে মা দরজা লাগিয়ে দেন । তারপর তিনি সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে টিভির সামনে বসেন । তিনি সিগারেটে ঘনঘন টানেন । শাহরজাদ যখন লোকটির ছবি দেখে, তখন সে তাকে চিনতে পারে । তখনো বৃষ্টির ফোঁটা এসে জানালার কাঁচে আছড়ে পড়ছিল। আদালতের ভেতর লোকটি একটা ডেস্কের উল্টোপাশে বসেছিল । মা দাদাসকে টিভির শব্দ কমাতে বলেন । দাদাস বলে, ‘তার কথা তো অপরাধীর মতো শোনা যাচ্ছে না ।’

রাজমিক বললো, ‘তার কথা প্রচারিত হচ্ছে ।’

লোকটি দু’হাত ডেস্কের উপর রাখে, মাথা উঁচু করে এবং উচ্চ স্বরে কথা বলে । শাহরজাদ কোন এক ক্যাফেতে লোকটিকে দেখেছে । বাবা তাকে সেই ক্যাফেতে নিয়ে যেতেন । লোকটির পুরু গোঁফ সে কখনই ভুলবে না । লোকটি বাবাকে কবিতা পড়ো শোনাতো । বাবা বলতেন, ‘এটা কবিতা না, বরং শ্লোগান।’

লোকটি বলতো, ‘শ্লোগানই আমজনতাকে উজ্জীবিত করে ।’

তখন থেকে শাহরজাদ ‘আমজনতা’ শব্দটি শিখেছে, যা রেষ্টুরেন্টের ভেতর লোকজন হরহামেশা বলাবলি করতো ।

বাবা বলতেন, ‘প্রথমেই আমজনতাকে কবিতা বুঝতে হবে । তারপর তারা সংগ্রামের পথে অগ্রসর হবে।’

শাহরজাদ বাবার কবিতা পছন্দ করে । লোকটির শ্লোগানও তার কাছে খুব ভালো লাগে । কিন্তু সে জানে না, কে আমজনতাকে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং তারা কোথায় যাবে । সে যখন মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তখন মা বলেছেন যে, কেন ওরা বাবাকে মেরেছে এবং ধরে নিয়ে গেছে । মা আরো বলেছেন, বাবার পরিস্থিতির জন্য কবিতাই দায়ী । শাহরজাদের ইচ্ছে বাবা কবিতা না লিখে তাদের সঙ্গে সময় কাটাক । দাদাস বাবার কবিতা পড়ে রাজমিককে শুনিয়েছে । নাহিদও গুনগুন করে বাবার কবিতা আওড়ায় । শাহরজাদের ভয় হয় । লোকটির অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকার চোখ দু’টি তার মনে পড়ে । সে পূর্ণাঙ্গ নারী হতে চায় না, বিশেষ করে তার বাবার চোখের সামনে ।

লোকটি সামনের দিকে ঝোঁকে এবং জনগণের দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকায় । তখনো তার হাত দু’টি ডেস্কের উপর ভর করে আছে । একসময় সে উঠে দাঁড়ায় । তারপর মাথা উঁচু করে সামনের দিকে তাকিয়ে সে তারস্বরে বললো, ‘আমি আদালতে দাঁড়িয়ে আমার জীবনের জন্য মোটেও দর কষাকষি করছি না ।’

জাহরা হাত ধোঁয় । সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ড্রয়ার খুলে লোশন খোঁজে । শব্দ করার জন্য মা জাহরাকে ধমক দেন । জাহরা চুপচাপ বসে থাকে । তার শরীরের পেছনের দিক আয়নার সঙ্গে হেলান দেওয়া এবং সে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে । তার মনে পড়ে লোকটি যখন কবিতা আবৃত্তি করে কিংবা শ্লোগান দেয়, তখন তার মোটা গোঁফের ফাঁক দিয়ে কন্ঠস্বর বেরিয়ে আসে । সে ইরানের বিশাল জনগোষ্ঠীর পক্ষে সামান্য কথা বলে। দাদাস একের পর এক সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে যাচ্ছে । নাহিদ চুপিচুপি তার দিকে নজর রাখে । মা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে অভিসম্পাত দিতে থাকেন ।

বাবাকে টিভিতে দেখার জন্য শাহরজাদ অপেক্ষা করে । সে তার বাবার শূণ্যতা উপলব্ধি করে । মা বলেছেন, বাবা গোপনে ইরান থেকে অন্য একটা দেশে গিয়েছিলেন । বাবাকে সেই দেশ থেকে শাহরজাদের জন্য একটা ইউরোপের পুতুল পাঠাতে মা বলেছিলেন । শাহরজাদ মায়ের কথা বিশ্বাস করেনি । বাবার বন্ধু জোর গলায় টিভিতে বলেছে যে, বাবা শুধু আমজনতার পক্ষে কথা বলেন । তাঁকে যদি বাক-স্বাধীনতা দেওয়া না হয়, তাহলে তিনি চলে যাবেন এবং চুপ করে থাকবেন । এখন সিনেমা দেখতে যাওয়ার সময় নেই, অনেক দেরী হয়ে গেছে । শাহরজাদ চায় না তার বাবার বন্ধু চলে যাক, বরং বসে থাকুক । সে আশা করে, বাবার বন্ধু কথা চালিয়ে যাক । সে মনের গভীর থেকে আশা করে ওরা যদি একটি বার টিভিতে বাবাকে দেখাতো ।

ওরা বাবাকে টিভিতে দেখায়নি । বরং ওরা দু’জন মহিলাকে দেখিয়েছে । একজনের চুল ছিল মসৃন, দীর্ঘ এবং কালো । অন্যজনের চুল ছিল কোঁকড়ানো । শাহরজাদ কাউকেই পছন্দ করেনি । বাবার বন্ধু যদি সত্যি হয়, তাহলে মহিলা দু’জন দর কষাকষি করছে । তারা জনগণের কথা বলেনি, এমনকি বাবার বন্ধুর সুন্দর কথাও উল্লেখ করেনি । তারা দু’জন শুধু নিজেদের জন্য সাফাইসাক্ষী দিয়েছে । তারা প্রাণে বাঁচতে চায় । তারা পুনরায় আসতে ইচ্ছুক এবং চুল কাটার জন্য রাজমিকের তত্ত্বাবধানে আয়নার সামনে বসতে চায় । তারা চায় বারবার তাদের মাথার চুলে ক্লিপ লাগিয়ে ড্রায়ার দিয়ে গরম বাতাস দেওয়া হোক, যাতে রাজমিক তাদের চুল মসৃন করে দিতে পারে । মসৃন চুল খুবই জনপ্রিয় ।

বাবার বন্ধুকে যখন নিয়ে গিয়েছিল, তখন শাহরজাদ ঘাড় চুলকাচ্ছিল । টিভিতে তাকে দেখাচ্ছে । রাজমিক এবং দাদাস চুপ করে আছে । মা নীরবে কাঁদছেন । জাহরা রীতিমত হতভম্ব । নাহিদ সতর্কতার সঙ্গে বৃষ্টি পড়া দেখছে । বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কাঁচে এসে হামলে পড়ছে । বাইরে অন্ধকার। তারা বলাবলি করছিল যে, নির্ঘাত ওরা বাবার বন্ধুকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিবে । লোকগুলো যখন তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন সে দু’জনকে পাশ কেটে গেছে । দু’জনের মধ্যে যার মাথার চুল মসৃন এবং দীর্ঘ ছিল, সে খুশিতে অন্যজনকে, যার মাথার কোঁকড়ানো ছিল, জড়িয়ে ধরে এবং গালে গাল ঘষে অন্তরঙ্গতা প্রকাশ করে । তারপর দু’জনে হাসতে থাকে । তাদেরকে ক্ষমা করা হয়েছে । শাহরজাদ জানে না, কেন একজনকে প্রাণ দিতে হলো এবং দু’জন পার পেয়ে গেল । সে শুধু তার বাবার অনুপস্থিতি গভীর ভাবে উপলব্ধি করে । আনমনে সে ঘাড় চুলচায় । একসময় সে ঘাড়ের চতুর্দিকে গোল করে লাল শাল জড়িয়ে নেয় এবং মাথায় নতুন টুপি পড়ে ।

‘শাহরজাদ, তুমি কী ‘চিকো এবং ফ্রাঙ্কো’ দেখতে যাচ্ছো ?’ নাহিদ জিজ্ঞেস করে ।
যদিও ঢের দেরী হয়ে গেছে, তারপরও মা কোন প্রতিবাদ করেননি ।

‘না,’ জবাবে শাহরজাদ বললো ।

রাজমিক বললো, ‘শাহরজাদ, আমি সসেজ স্যান্ডউইচ আনতে যাচ্ছি । ঠিক আছে ?’

বাসি এবং ঠান্ডা মাংসের গন্ধ শাহরজাদের নাসারন্ধ্র দিয়ে ভুরভুর করে ঢুকে পড়ে । তড়াক করে সে লাফিয়ে উঠে এবং দৌঁড়ে শৌচাগারে ঢোকে । নাহিদ তাকে অনুসরণ করে । শাহরজাদ পেটের ভেতরের সবকিছু উগড়ে দেয় । মা চুলের ক্লিপ এবং ব্রাশ ঝুড়িতে ছুড়ে ফেলেন । জাহরা গুণগুণ করে শুক্রবারের গান গাইছে। শাহরজাদ শৌচাগারের আয়নায় সবকিছুই দেখতে পায়। সে অনর্গল বমি করে । দাদাস এবং রাজমিক অকারণে ঘাড় চুলকায় ।

সেই শুক্রবার থেকে সসেজের গন্ধ পেলেই শাহরজাদের বমি ভাব হয় ।

লেখক পরিচিতি: ইরানের আধুনিক গদ্যসাহিত্যের অন্যতম সফল নারী লেখক শিবা আরাসতুই । তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, গল্পকার, অনুবাদক এবং কবি । তাঁর জন্ম তেহরানে, ১৯৬২ সালে । তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বাস্থ্য বিদ্যায় ডিপ্লোমা অর্জণ করেন । পরবর্তীতে তেহরান শহরে অবস্থিত আজাদ ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ব্যাচেলার ডিগ্রী লাভ করেন । তাঁর প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘আই কেইম টু হ্যাভ টি উইথ মাই ডটার’ ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয় । পরবর্তীতে তিনি আরো দু’টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করেন । এগুলো হলো ‘আফতাব-মাহতাব’ (১৯৯৮) এবং ‘আই অ্যাম নট ভার্জিন’ (২০০৪) । ‘জাস্ট আই স হিম, বিকেইম প্রিটি’ (১৯৯১), ‘বি-বি শাহরজাদ’ (২০০১), ‘দ্য ফার্স্ট ভার্শন’ (২০০৩), ‘দ্য স্কাই ইজ নট এমপ্টি’ (২০০৪), ‘অপিয়াম’ (২০০৫) এবং ‘অ্যাশেইম’ (২০০৫) তাঁর প্রকাশিত উপন্যাস । এছাড়া ‘লস্ট’ (১৯৯৪) এবং ‘লেট’স্ ফিনিশ ইট’ (২০০২) শিরোনামে তিনি দু’টি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন । সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি হিসাবে তিনি একাধিক সম্মানিত পুরস্কার লাভ করেন । ‘আফতাব-মাহতাব’ ছোটগল্প সংকলনের জন্য তিনি ২০০৩ সালে ইরানের সম্মানিত ‘হুশাং গলশিরি লিটারেরী অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘ইয়াল্দা’ সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন । গল্প, উপন্যাস, কবিতা এবং অনুবাদ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি অনেক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা করেন এবং অনেকগুলোতে অভিনয়ও করেন । তিনি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ।
গল্পসূত্র এবং সারকথা: ‘শুক্রবারের দিনগুলি’ গল্পটি শিবা আরাসতুই-এর ইংরেজিতে ‘ফ্রাইডেজ’ গল্পের অনুবাদ । ইংরেজিতে গল্পটি ‘কারুণ.কম’ ওয়েব ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া হয়েছে ।

‘শুক্রবারের দিনগুলি’ গল্পটিতে শিবা আরাসতুই কর্মজীবী নারী এবং গোটা পরিবারের শিশু সদস্যদের দৈনন্দিন জীবনের চাওয়া-পাওয়া এবং সুখ-দুঃখের কাহিনী অত্যন্ত প্রাণবন্ত ভাষায় তুলে ধরেছেন । এছাড়া লেখিকা প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসাবে রাজনীতিকে ব্যবহার করেছেন ।





অনুবাদক
ফজল হাসান

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন