বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

সাগরিকা রায়ের গল্প : একটি ধূসর নম্বর

ঘোয়াওওওস !! ট্রাকটা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল !

৩১ নং ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে খানিকটা গেলে বাঁ দিকের ঢালু রাস্তাটা সোজা চলে গেছে কলসবাড়ি গ্রামের দিকে । এখানে বেশির ভাগই ক্ষেতমজুর শ্রেণির মানুষ । দু চার ঘর ভদ্রলোক আছেন ।
জমিজমা নিয়ে ভারি ব্যস্ত তাঁরা । ঘটনাচক্রে একটি স্কুল আছে । খুব বেশিদিন হয়নি বয়স । এরই মধ্যে ভিজে ন্যাতা ! এস এস সি দিয়ে সদ্য চাকরি নিয়ে এখানে এসেছি । ভারি বুনো জায়গা বলে মনে হয় । অন্তত সোনারপুরে থেকে কলকাতাকে রোজ দেখে কলসবাড়ি বুনো হবে এ আর এমন কথা কী ? বেস্পতিবার হাট বসে । সেদিন স্কুল ছুটি থাকে । হাটের মাঝখানে স্কুল । ছুটিটা সেই কারণে নয় । কারণটা হল ছাত্রদের অনেকেই স্বয়ং হাটে দোকান দেয় । পাট, ধান , চাল নিয়ে বসে । বাকিদের কেউ কেউ বাবা-কাকার সঙ্গে ব্যবসাদারি শিখতে যায় । হাতে খড়ি । আমার ভালই হল । সারাদিন হাটে ঘোরাঘুরি করি । কোনো দোকানে খানিক বসে , দাঁড়িয়ে ব্যবসার হালহদিশ বোঝার চেষ্টা করি । এরই মধ্যে কোনও ছাত্র হাটে অন্য ছাত্রের দোকান থেকে ট্যালটেলে চা এনে দেয় স্যারের জন্য । বিশ্রি স্বাদ । আমার মুখভাব দেখে ছাত্রের বাবা টিটকারি দেয় –এগুলান তোদের ছার খায় ? ঘুরার পিছছাপ ! শুনে আমি সুন্দর মুখ করে খেয়ে নিই । কী দরকার ঝামেলায় যাওয়ার !

চড়া রোদে হেঁটে সেদিন চলে গেলাম রাঙালিবাজনা । নামটা এতটাই মোহময় যে আকুল হয়ে পড়েছিলাম । শনিবার স্কুল থেকে বের হয়ে মোড়ের দোকানে সিঙ্গারা –চা খেয়ে সবে উঠে দাঁড়িয়েছি , খোকন পাল এসে দাঁড়াল । এই ছেলেটি স্কুলের ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন । ঢ্যাং ঢেঙ্গে লম্বা ,ছোট্ট মুখের খোকন আমার দিকে অবহেলার দৃষ্টি হেনে বলল –এ বছর ফুটবলটা লম্বা হল, না চ্যাপ্টা হল , বুঝলাম না ।

আমি বুঝলাম । খেলাধূলোর ডিপার্টমেন্ট আমার হাতে দেওয়া হয়েছে । আমি এখনও এই বিষয়ে কোনও আলোচনায় যাইনি । খোকন আমাকে শোনাল কথাটা । জবাব না দিয়ে আমি উঠলাম । আজ রাঙ্গালিবাজনায় যাব ভাবছি । তাড়াতাড়ি বের হতে পারলে ফিরবো ঠিক সময়ে ।

কলসবাড়ি থেকে খুব বেশি দূরের নয় । ছায়ায় ছায়ায় হেঁটে যেতে ভারি ভাল লাগছে । এই রাস্তায় ট্রাফিক খুব। এমন ধুম ধাম মালবাহী ট্রাকগুলো আসে , ঘাড়ে পড়বে যেন । এখানেই কোথাও ধাবাটা আছে । শুনেছি তরকা রুটি খেতে আসে বহু ভোজনরসিক । ট্রাক ড্রাইভারদের রেস্ট নেওয়ার জন্যই এই ধাবা । ট্রাকগুলো সোজা চলে যাবে অসম , ধুবড়ি আর কোথায় কোথায় ...! আমার ভূগোল জ্ঞান সীমিত । অঙ্ক নিয়ে ভেবেছি সারাজীবন । কিন্তু নিজের জীবনের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে সাধারণ সরল অঙ্কে গোল্লা পেয়ে এখন শুধু ফাইভ টু টেন হাতে রইল ব্ল্যাক বোর্ড - চক । খড়ি ।

বাপস ! আট্টু হলেই পিন্ডি দেওয়ার লোক দরকার হতো। ট্রাকটা পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে ঘাঁক ঘাঁক করে রাগ দেখাল পিষতে পারেনি বলে ! মনে মনে কথা বলতে গিয়ে রাস্তার মাঝখানে গিয়ে পড়েছিলাম । দোষ আমারই । সাইডওয়াকে চলে যেতে যেতে পিছন ফিরে দেখে নিলাম আরও ট্রাক আসছে কিনা । চারপাশে গুচ্ছের গাছ নেই এখন আর । খানিক চিহ্ন শুধু । গাছের নীচে ছোটখাটো চায়ের দোকান । পাশে গোটা তিনেক রিকশা । মনে হল ধাবার কাছাকাছি এসে গেছি। এতক্ষনের নির্জনতা একটু করে ভাঙছে যেন । বাতাসে মানুষের গন্ধ পাঁউ ! কিছুটা এগোতেই দেখি যা ভেবেছি , তাই । সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ট্রাক । লম্বা মোটা পাইথন । বন –রাজ্যে পাইথন ছাড়া অন্য কিছু মাথায় এলনা । এত ট্রাক ! এখানে কি এত ড্রাইভার,খালাসি সবার থাকা – খাওয়ার ব্যবস্থা আছে ? আছে নিশ্চয় । নাহলে এরা থাকছেই বা কোথায় ! রাস্তা বর্ষায় বেহাল হয়ে পড়ে । হবেই । দিনরাত মালবাহী ভারী ট্রাক চলাচল করছে ! রাস্তা মেরামতির জন্য টোল আদায়ের ব্যবস্থা হয় শুনেছি । এখানেও কি হয়েছে ? এসব রাস্তার মাল বহনের ক্ষমতা কত ? যা ক্ষমতা ,তার বহুগুণ বেশি ওজন সামলাতে গিয়ে এমন হয় দশা ! গ্রাম সড়ক যোজনায় কত বছরের গ্যারান্টি থাকে ? পাঁচ বছর ?

-দেখেন বাবু , এই লম্বরটা । এইখানে এই লম্বরের টেরাক গাড়ি আছে বাবু ? এক গ্রামীণ মহিলা একটুকরো বিবর্ণ কাগজ বাড়িয়ে দিয়েছে আমার দিকে।

চমকে উঠিনি । মহিলাটিকে দূর থেকেই ঘোরাঘুরি করতে দেখেছি ।ট্রাকগুলোর ফাঁকফোকর দিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল । এতক্ষণ আমি একে নিয়ে কিছুই ভাবিনি । এখন অবশ্য মাথায় চিড়িক করে ঢুকে গেল মহিলাটি । বড় বিষণ্ণ মুখ । অরেঞ্জ কালারের ফুল ফুল শাড়ি বহু ব্যবহারে বিবর্ণ । তেলহীন চুল সাপটে বাঁধা । শুকনো চেহারা । বয়স পঞ্চাশও হতে পারে চল্লিশও হতে পারে । শরীর ও মনের ওপর দিয়ে যত ঝড় জল বয়ে গেছে , তার সবটুকু চিহ্ন মুখে লেপে রেখেছে সময়। স্থানীয় মানুষ মনে হয় ! একটা ট্রাকের নাম্বার নিয়ে ঘুরছে ! কেন ? গন্ধ পাঁউ ! কেমন যেন মন কেমন করা গন্ধ ! সাহিত্যের চোখে নয় , এখানে আমার চোখে অঙ্ক আছে। একসারি ট্রাক , একটি মহিলা , আর একখণ্ড বিবর্ণ কাগজে লেখা একটা নাম্বার । অঙ্কটা কী?

-দেখি কাগজটা । হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে দেখি পুরনো হয়ে যাওয়া কাগজ ভাঁজে ভাঁজে নোংরা হয়ে গেছে । মহিলার মুখে উদ্বেগ । ভারি ব্যাকুল দৃষ্টি আমার মুখে নিবদ্ধ । আমি কাগজের ভাঁজ সাবধানে খুলি । পেন্সিল দিয়ে একটা নাম্বার লেখা হয়েছিল । পাঞ্জাব বোঝা যাচ্ছে । নাইন নাইন তারপরের সংখ্যা ঝাপসা , কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা , একটা জিরো একেবারে শেষে এইট ...কি ? নাকি সিক্স !

-চিনেন বাবু ? এই লম্বর আলা টেরাকটা আসছে কিনা জানো ? দেখবা একটু ? আমি শালা খঁজিবার না পারি ! আমারে দেখিলে উয়ারা হাসে । কী করিম কছেন ! সরু সরু চোখের ভাষায় অনুযোগ কাঁপে থরথর করে । ভারি আশ্চর্য হলাম বলাই বাহুল্য । এই গ্রামদেশে কত দূর দুর থেকে ট্রাক আসে নানা পণ্য নিয়ে । খানিক বিশ্রাম নিয়ে চলে যায় কোন অজানা অচেনা জায়গায় । এই রমণীর সঙ্গে কীসের যোগাযোগ ট্রাকের নাম্বারের ? নাম্বারটা এই মহিলা পেল কার থেকে ! কোন আত্মীয় কি ? এত ব্যাকুলতা কার জন্য ?

প্রশ্নটা করেই ফেললাম। শুনেই ক্ষুব্ধ হল যেন । হাত বাড়িয়ে কাগজের টুকরোটা নিয়ে নিল আমার হাত থেকে । শীর্ণ হাতে লাল প্ল্যাস্টিকের চুড়ি হল হল করছে! কাগজটা নিয়ে পেছন ফিরে চলে যেতে যেতে আমার দিকে তাকাল । সেই চোখেও অনুযোগ , আর বাড়তি হিসেবে ছিল এক বিশাল মরুভূমির জলশূন্য হাহাকার ! দৃষ্টি দেখে ধাক্কা খেলাম । না জেনে কি দুঃখ দিলাম ? কিন্তু কিচ্ছু বলিনি তো ! শুধু নম্বরটা কোথা থেকে পেল সেটাই...। হয়তো সেটাই ওর বহু কষ্টে লুকিয়ে রাখা হাহাকার ! অজান্তে সেই ব্যাথায় ছুরি চালিয়ে দিয়েছি । যাদের কাছে আজ অব্দি এই কাগজটা নিয়ে গেছে , সবাই একই প্রশ্ন করে ! বলল তো ! উয়ারা হাসে ! হয়তো আমাকে ওদের মত ভাবেনি বলে আমার কাছে এসেছিল !

কেমন গল্প গল্প গন্ধ ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার সামনে । সাঙ্ঘাতিক একটা রোমান্টিক গল্প আমার সামনে নৃত্য করছে , কিন্তু আমি তাকে ধরতে পারছিনা ! অঙ্ক সলভ না করে আমি উঠিনা । এখানে অঙ্ক সলভ করতে হলে ওই মহিলাকে দরকার । কিন্তু মহিলা দ্রুত হেঁটে চলে গেল সামনের হাতির পাল ট্রাকগুলোর আওতায় । যখন আর দেখা গেলনা , তখন আর এসব নিয়ে ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলাই শ্রেয় ছিল । ঝেড়েই ফেললাম। ধাবার মশলা চায়ের লোভ আছে । সেটুকু মিটিয়ে নেব আজ । আমি এগিয়ে গেলাম । দড়ির খাটিয়া ছড়িয়ে রাখা এদিক ওদিকে । তারই একটাতে বসে পড়েই উঠতে হল । খুব হল্লা চিল্লা এখানে ! জোর গলায় ফরমাশ করতে হবে । কিভাবে করবো সেটাও শিখে ফেললাম মুহূর্তে । একজন গাট্টাগোট্টা লম্বা চওড়া পাঞ্জাবি ড্রাইভার পুরুষালি হাঁক পাড়ল - আবে , থোড়া ইধার দেখ , কুছ চায় সায় তো লে আ । এভাবে কথা বলার ঢঙটা বেশ লাগল । কিন্তু এসব রপ্ত করতে সময় চাই এই মিনমিনের । এমন হাঁক পাড়ার ক্ষমতা থাকলে অদিতি আমার কাছে থাকতো । ওর একটা ফোন পাওয়ার জন্য লেলিয়ে মরতাম না ! …নিজেকে কুকুর মনে হয় ! যে কুকুর একটুকরো রুটির জন্য হেদিয়ে মরে! অদিতি আমাকে খুব তাড়াহুড়ো করে ভুলে গেল । নিজেকে দুবেলা চড় থাপ্পড় মেরেও অদিতিকে ভুলতে পারছিনা ! একদিন দেখেছিলাম রুবির সামনে । চাকরি করছে শুনেছি । খুব ঝকঝকে দেখাচ্ছিল ওকে । সেদিন আমার মনে হয়েছিল কলকাতা থেকে পালাতে হবে । বারবার অদিতি সামনে আসবে , আর আমি বারবার মৃত্যু কামনা করবো নিজের ! এভাবে চলেনা । বলতে গেলে সেই কারণেই অনেক দূরে চাকরি পেয়ে পিছপা হইনি । কণাদ বলেছিল –ওদিকে নাকি খুব ম্যালেরিয়া হয় , পারবি থাকতে ?

পারছি তো ! বুকের ভেতরে রাগ গুম গুম করে । জোরসে হাঁক দিই – আবে , মশলা চায় দে ভাই ইধর !

সেই যে শুরু হল । এখন রোজ একবার ধাবায় চা না খেলে আমার ভাল লাগেনা । কখনও তরকা রুটি খাই । কাঁচা পেঁয়াজ কামড়ে খেতে জানতাম না । ট্রাক ড্রাইভারদের একজন এই আনপড় গাওয়াড়কে পাঞ্জাবি খানা খাওয়াতে শেখাল । কাঁচা পেঁয়াজ কামড়ে খেতে শিখলাম । লস্যি এল আমার কাছে নিবিড় ভালবাসায় । কিছু কিছু পাঞ্জাবি শব্দ শিখেছি । আগে হিন্দিতে সড়গড় ছিলাম না । এখন বেশ বলতে পারি । সেদিন মাকে ফোন করে ‘আব্বে ইয়ার ‘ বলে ফেলেছি । মা রেগে গেল –আমি তোর ইয়ার ?

এখন খুব মেঘ করে আছে আকাশে । বর্ষা গেল বলে । গাছের গায়ে লকলকে সবুজ আলো জ্বলজ্বল । বর্ষার জল খেয়ে গাছের পাতা এই মোটা মোটা হয়ে আছে । ধাবা থেকে ফেরার ফের সেই রাস্তা । বিশাল ট্রাক ধাবার উদ্দেশ্যে ঘাই মেরে ছুটছে । আমার গায়ে ঝলকে উঠছে হেড লাইটের জোরালো আলো । আমাকে দেখেই ফের অন্ধকারে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে ট্রাকগুলো । ধাবায় যাবে । চায় সায় খাবে । ফের চলে যাবে কোথায় ...কে জানে !রাতে এদের কেউ কেউ নারী-সংগ করে শুনেছি । আজই দেখলাম দুটো লেগিন্স আর কুর্তি পরা লিপস্টিক মাখা মেয়ে । ছম্মক ছল্লো হাবভাব ! যেমন ভাবে ভেতরে ঢুকে গেল , বোঝাই যায় এখানে নতুন না। অন্ধকারে আসে , অন্ধকারে চলে যাবে । ভোরে ট্রাক চলে যাবে যে যার গন্তব্যে ! কেউ আর কারও খোঁজ রাখেনা ! এভাবে কত কত নারী আসে যায় ! কখনও দেখা হয় ফের ? তখন কি একে অন্যকে চিনতে পারে ? হয়তো চেনে । হয়তো চেনেনা । বা চিনলেও চেনেনা । যে ব্যবসার যা ! এখানে প্রেম , ভালবাসা , ভাললাগার জায়গা নেই ! আদিম ব্যবসা ! চলছে , চলবে !

আমি আবার সেই অন্ধকারে ডুবে ডুবে হাঁটছি । এভাবে কতকাল হাঁটছি মনে নেই ! আদিমকাল থেকে এই ভাবে হেঁটে আসছি । সেমেটিক যুগ থেকে মরুভূমির ওপর যাযাবরের জীবন যাপন করে আসছি । আমার কোনও ঘর নেই । স্থায়ী আস্তানা নেই । কোথায় যাব জানিনা । কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে নেই । জন্ম জন্ম এভাবেই চলছে ! আর , আমি কৃষিকাজও জানিনা ! এই ঘন অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে পড়লাম । অদিতিকে ফোন করবো ? হাতে ফোন নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি । অদিতি আমার ফোন রিসিভ করবে না! করে না ! প্রথম প্রেমে ডুবে থাকার মেয়ে না ও । কবে কোন এক গ্রামে বেড়াতে গিয়ে কিশোরী জীবনের প্রথম প্রেমের স্বাদটাকে ভুলে গেছে অদিতি । আমি নির্বোধ বলেই উড়ে যাওয়া বেলুনকে ধরতে চাই । কোথায় আছে অদিতি এখন ? আমার কথা কি একেবারেই মনে হয়না ওর ? সব ভুলে গেল !

বৃষ্টি শুরু হল । ভিজতে ভিজতে আমার ভাড়া - বাসায় ফিরতে থাকি । আজ বেশি দেরি করেছি,এমন নয় । এখানে বিকেল ডুবলেই রাত নেমে আসে । গাঁ গঞ্জের মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে তাড়াতাড়ি করে । কেউ কেউ লম্ফ জ্বেলে তিন পাত্তি খেলে হাটের দোচালায় রাত নটা সাড়ে নটা পর্যন্ত । এখন কেউ নেই । রাস্তা সুনসান । ঝিপ ঝিপ বৃষ্টি গা ছেড়ে নেমেছে । সারারাত ধরে বৃষ্টি ঝরবে । একটু বৃষ্টিতেই ঠান্ডা পড়ে । শেষ রাতে হালকা চাদর দরকার হয় । কলকাতায় এমনটা ভাবাই যায়না ! ধাবায় রুটি তরকা খেয়ে এসেছি । ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ব । বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই অন্ধকারে বৃষ্টি মেখে ঘরে এল অদিতি । ভেজা শরীরে ঝড় উঠেছে । আজ তুফান উঠবে এই খানে । অদিতি বৃষ্টির শব্দের মত ঝম ঝম করে হাসল । অন্ধকারেই হাত বাড়ালাম - এস । আজ আমার কাছে থাক । তোমার শরীর ছুঁয়ে থাকি । অদিতি চলে যাচ্ছিল পেছন ফিরে । ডাকলাম না। আমি নারীসঙ্গ করতে চাইনি কেবল । যেখানে মনই নেই , সেখানে…। পাশ ফিরে শুলাম । গুড নাইট অদিতি! অদিতির দোপাট্টা মিলিয়ে গেল অন্ধকার মেখে।

দড়ির খাটিয়ায় বসতেই খাটিয়া ক্যাক করে উঠল । পাশের খাটিয়া পুরো দখল করে একজন চুড়ো করে ভাত ডাল নিয়ে বসেছে । সঙ্গে গোছা রুটিও আছে । আমার দিকে তাকিয়ে ঠা ঠা হেসে উঠল – মশলা চায় কে লিয়ে ? আ যা , বইঠ যা ইয়ার ।

আমার মশলা চায়ের নেশাটা সবাই জেনে গেছে দেখছি। আমি হেসে ফেললাম । থাবা থাবা ভাত মুখে তুলছিল লোকটা । খানিক বিশ্রাম নিয়েই ফের রওনা হবে সামনের লম্বা রাস্তা ধরে । কোথায় চলে যাবে কে জানে !

-এই লম্বরটা কুন টেরাকের ? বলেন মোকে ।

চমকে তাকিয়ে দেখি সেই মহিলা ! হাতে টুকরো কাগজ । নিশ্চয় ওতে নাম্বারটা আছে । আশ্চর্য তো ! আগেও দেখেছি একে । আমার সঙ্গে কথাও হয়েছিল । কে এ ? কোথায় থাকে ? পাগল বলে মনে হয়নি আমার ! কিন্তু কাকে খুঁজে ফিরছে ? এই মহিলা কি রোজ এখানে কাউকে খুঁজতে আসে ? আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে ভাত খানেওলা লোকটি মজা করে হাসল – মুঝে পতা হ্যায় তুসি কেয়া শোচতি । উসানে ইকা কাহানি হ্যায় ।

-কাহানি ? মতলব ? কেয়া কাহানি ?

-হামারে য্যায়সা এক্কে ডাইভার ইঁহা আয়ে থে । ইনকো সাথ লাভ হুয়া । উনহে বাক গয়ে ইসিকো ছোড়কে । উসি দিনসে ইয়ে আওরতনে টেরাক কি নাম্বার লেকে ঢুঁড়টা । ম্যানু জানতা মনজিতকে । ও ফির লোটেঙ্গে নেহি ।

-মনজিত কৌন ? আমি সব কিছ একটু দেরিতে বুঝি । এই মহিলা এখানে যারা আসে , তেমনই এক ট্রাক ড্রাইভারের প্রেমে পড়ে । কিন্তু সেই প্রেমিক একে আশা দিয়েও পালিয়ে গেছে । এখন প্রেমের একমাত্র নিশানা বলতে একটুকরো কাগজে সেই ট্রাক ড্রাইভারের ট্রাকের নাম্বার । হয়তো সেই প্রেমিক ভুল করেই নাম্বারটা দিয়ে ফেলেছিল পথে পাওয়া প্রেমিকাকে ! মনজিত কি সেই ড্রাইভারের নাম ?

-আব্বে ইয়ার । দুনিয়া ইতনা আজিব হ্যায় । উসি নেহি সমঝি।

আমার হাতের চায়ের গেলাস দিয়ে গেল কেউ । গরম চা । দুধ আর এলাচএর গন্ধে ভরপুর । অন্যদিন আমেজ আসে এই গন্ধে । আজ ওই মহিলা আর মনজিতের কাহিনী শুনে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হল মনজিতকে । আর মহিলাকেও বলিহারি । প্রেমের স্বাদ মেটেনি এখনও ! চা খেতে ইচ্ছে ছিলনা কেন কে জানে । কে বা এই মহিলা , কে বা মনজিত ! এরা সম্পর্কে আমার কিচ্ছু হয়না। আসলে এই যে ঝিমিয়ে আসা বয়সের একটি মানুষ এভাবে বছরের পর বছর ঘুরে মরছে কোন এক মনজিতের খোঁজে , এটাই আমাকে বিরক্তি জোগাচ্ছিল । কোন মানে হয় ! বোকামিরও একটা লিমিট থাকে !তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি মহিলাকে। কেমন একরকম এলোমেলো চেহারা । সারাদিন খায়নি হয়তো । কোথায় থাকে ? কে আছে এর ? এমন বর্ষাভেজা সন্ধ্যেতে একা একা পাগলের মত একজনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে ! কতদিন আগে মনজিত এসেছিল এখানে ? এখন মহিলার যা বয়স বলে মনে হচ্ছে , মাঝবয়সে পৌঁছে গেছে । বয়সের প্রতি পরতে যৌবনের ঘটনা বয়ে বেড়াচ্ছে ! সত্যি কি আসবে মনজিত কখনও ! চরম সত্যটা এই মহিলা বুঝতে পারছে না । সেদিন থেকে লক্ষ্য করছি মহিলাটিকে । দীন দরিদ্রই বলা যায় । ওর সম্পর্কে আরও শুনলাম । ভাইয়ের আশ্রয়ে থাকে । জোরজার করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল । তা , নতুন বরের কাছে প্রথমেই এই কাগজ দেখিয়ে টেরাকের খোঁজ জানে কিনা জিজ্ঞাসা করেছে। বলা বাহুল্য বিয়ে টেকেনি । এখন সারাক্ষন রাস্তায় রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে । ভাই কখনও ডেকে নিয়ে খাওয়ায় । ওর খিদে অন্যখানে । সে খিদে মিটবে না কখনও । আগ্রাসী খিদে নিয়ে অপেক্ষা করে মনজিতের জন্য । চোখে অসীম অপেক্ষার ছাপ পড়ে গেছে । জীবনে খিদে তো একটিই মাত্র । কোথায় আছে সেই মনজিত ! কোথায় রেখে রেখে চলে গেছে এমন কত কত নারীকে ! অন্ধকারেও যে নারী আলো পেয়েছিল ! ভুলতে পারেনি এক- দু রাতের প্রেমিককে !

বাড়িওলার সাতখানা নারকেল গাছ । আজ ডাব পেড়েছে । বিকেলে স্কুল থেকে ফিরতেই দুটো ডাব দিয়ে গেল বাড়িওলা জীবনবাবুর ছেলে নরু । তেষ্টা ছিল । একটা ডাব কেটে খেলাম । জল মিষ্টি । ডাবের খোল ফেলতে গেছি পুকুর ধারে , অদ্রিজা বাড়িওলার ভাগ্নি ওখানে দাঁড়িয়ে চুল খুলছিল । কালো লেগিন্স , লম্বা ঝুলের কামিজ পরা মেয়েটি জলপাইগুড়িতে থাকে । কলেজে পড়ে । আমাকে দেখে মিচকি হাসল । হাসিতে কী ছিল । আমি ভড়কে গেলাম । অদ্রিজা চোখে বাণ হেনে লজ্জা লজ্জা মুখে ছুটে পালিয়ে গেল । আমার মনে হল , এখানে আর থাকা যাবেনা । অদ্রিজা আমাকে নিয়ে অন্য কিছু ভাবলে ভুল করবে । মাঝে থেকে আবার ঝুট ঝামেলায় পড়া !...... কিন্তু মেয়েটা বেশ ! এই একা জীবনে ওর সংগে একটু কথা বলা , গল্প করায় ক্ষতি কী ? সব সময় প্রেম নিয়ে ভেবে সময় কাটে ? ধুস ! ডাবের খোলা ছুড়ে ফেলে দিলাম আবর্জনার স্তুপে ।

স্কুল ছুটি হয়ে গেল । আজ রেনি ডে । সকাল থেকে তুমুল বর্ষণে পৃথিবী যেন ডুবে যাবে আজ । নিজে রান্না করে খাই । বারান্দায় একফালি জায়গা চাটাইএর বেড়া দিয়ে ঘিরে ছোট রান্নার ব্যবস্থা করা আছে । স্টোভ জ্বেলে খিচুড়ি চাপিয়ে দিলাম । সঙ্গে আলুর চিপস আছে । দু চারটে চিপসের প্যাকেট এনে রাখি । রান্নাবান্না ভাল লাগেনা । এই ঝিমঝিমে দুপুরে শুয়ে শুয়ে বই পড়তে ইচ্ছে করে । যাঃ , বৃষ্টির জলের ঝাপটা আসছে । খিচুড়ির কড়া নিয়ে ঘরে ঢুকে গেলাম । এখানে বসে খাওয়া যাবেনা । বারান্দা জলে ভিজে গেছে । দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসলাম । জানালা দরজা বন্ধ বলে গুমোট লাগছে । দরজায় টোকা শুনে খুলে দেখি ভিজে চুব্বুস হয়ে এসেছে অদ্রিজা । কপালের ওপর নেমে এসেছে ভিজে চুলের গুছি । হাতে বাটি । কী আছে ওতে ?

অদ্রিজা সুন্দর করে হাসে –ডিম কষা । আমি করেছি । আপনি রান্না করলেন কেন ? ভাত দিয়েই যেতাম । দেখলাম রাঁধছেন …।

-না না , আমি খিচুড়ি করেছি ।

- ঘরে জলের ছাঁট আসছে । ইসস ! বলে দরজায় খিল তুলে দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাসল অদ্রিজা । হাসি দেখে আমার মহুয়া ফুলের গন্ধের কথা মাথায় এল । এই গন্ধ পেয়েছিলাম অদিতির শরীরে । আজ ফের ঘরে বুঝি মহুয়া ফুটেছে ! ঘন বর্ষা মহুয়ার গন্ধ ডেকে এনেছে ঘরে , আমার শরীরে !

-বেশ করেছেন রেঁধেছেন । বলে আমার বিছানার ধারে বসে পড়ল উমা । কী মেখেছে , মন কেমন করা গন্ধে ঘর ভরে গেল । এই বৃষ্টিতে এঘরে এল ও ? বাড়ির লোক কিছু বলবে না ? এভাবে এত কাছে এসে বসল …ঘোর বৃষ্টিতে আমি যে ভিজে যেতে পারি…অদ্রিজা বোঝেনা ! কতদিন ভিজিনি । অদ্রিজা জানেনা ? ওড়না আমার মুখের ওপর বুলিয়ে দিয়ে ও আমার কাছে এগিয়ে এল –কেউ কি জানে আমি এসেছি ? আপনি এমন কেন ? দেখেও দেখেন না ! হিসহিস করে অদ্রিজা। ওর চুলের ঝাপটা আমার চোখ ঢেকে দেয় । ঘন শ্বাসে আমার শরীর তোলপাড় করে ওঠে । … ঘরের ভেতরে বৃষ্টি নামল । আমি ভিজে যেতে যেতে…।

অদ্রিজা কখন চলে গেছে জানিনা । বৃষ্টি ধরেছে যখন , তখন গেছে হয়তো ! জানালা খুলতেই সোঁদা গন্ধে ঘর ভরে গেল । বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকি । কিচ্ছু ভাল লাগেনা । খাওয়া হলনা । খিচুড়ি ঠান্ডা জল । অদিতি কি আজ এসেছিল ? ফিরে গেল ! দুটোদিন কেটে গেল। অদ্রিজা আজ হোস্টেলে ফিরে যাচ্ছে । আসবে সামনের উইকে । আমি জানাতে পারলাম না আমি পছন্দমতো জায়গায় চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছি । গতকালই আপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়েছি । এই স্কুলে আজ শেষ দিন । অদ্রিজা কষ্ট পাবে । কিন্তু আমি ওকে ডাকিনি । ও-ই কাছে এসেছিল । আমার মনে কোন খেদ বা অপরাধবোধ নেই । শরীর ডেকেছে । এই সম্পর্কে আমার মন ছিলনা । হয়তো অদ্রিজা আমাকে খারাপ ভেবে কষ্ট পাবে । কিন্তু অদ্রিজা আমার মন টানেনি । শরীরকে ও মন ভাবে ! হয়তো !

বিকেলে ধাবার দিকে যাচ্ছিলাম । রাস্তায় জায়গায় জায়গায় জল জমে আছে । একটু ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে । জলো হাওয়ায় কেমন মন খারাপ করা গন্ধ । হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি, পাশ দিয়ে ট্রাক যাচ্ছে সারি সারি । ধাবার দিকে যাচ্ছে ওরাও আমার মত । কেন যেন ধাবার দিকে যেতে যেতে সেই মহিলাকে মনে পড়ল । এই ওয়েদারে কি আসবে সে ?

বাতি জ্বালিয়ে রেখেছে ধাবায় । টুনিও জ্বলছে । বড় বড় উনুনের ধোঁয়ায় অল্প আলো ছায়া ধোঁয়া মিলে মিশে এক রহস্যময় দুনিয়া যেন । কিছু ছায়া ছায়া মানুষ নড়াচড়া করছে । আদিম পৃথিবী ! আমি এগিয়ে গেলাম। জটলা করে কিছু আলোচনা হচ্ছে । আমি খাটিয়া দখল করে চায়ের জন্য অপেক্ষা করি । পরিচিত একজন ড্রাইভার রুটি মাংস নিয়ে এদিকে আসছে । আমার পাশ দিয়ে যেতে যেতে হাসল – আরে ইয়ার , কেয়া হোনা থা , হুয়া কেয়া !

-মানে ? কী বলতে চায় লোকটা ?

-আরে , উসি মনজিতনে আজ আ গয়ে ইহাঁপ্পে । দুসেরা ট্রাকমে । দেখ কে আ । লেকিন উসিনে আজ নেহি আয়া ।

মানে ? সেই মনজিত নামের লোকটা আজ এখানে আছে , অথচ সেই রমণী সে কথা জানেনা ! এত বছরের প্রতীক্ষা ব্যর্থ ! মনজিতকে চলে যেতে দেওয়া যাবেনা । কেউ কিছু না বললেও আমি আটকাবো । কোথায় সেই লোকটা । দ্রুত হেঁটে লোকটার দেখানো দিকে যাই । সারিবদ্ধ ট্রাকের ভেতর থেকে একজন বয়স্ক ট্রাক ড্রাইভার উৎসুক মুখে দাঁড়িয়ে কী যেন বলছে । এই কি মনজিত ? ওকে ধরেছে এখানকার লোকেরা । কথাবার্তা হচ্ছে । মনজিত ভেবড়ে গেছে । লোকটা এত এত জায়গায় যায় , এই জায়গার কথা ভুলে গেছিল । কতজনকেই তো নম্বর দিয়েছে বা দেয় , কে আর মনে রাখে ! ওর জন্য কেউ যে কোথাও অপেক্ষা করে আছে ,সেটা লোকটা ভাবেইনি ! কেউ গিয়ে এরই মধ্যে সেই মহিলাকে প্রায় টেনে এনেছে । অবিন্যস্ত চেহারা , বিভুল চাউনি মহিলাটি ট্রাকএর সারির ভেতরে ঢুকে পড়ল । কে একজন পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিল – তোমার মনজিত এসেছে । এই যে দেখ ।

মনজিত মাথা নেড়ে সম্পর্ক অস্বীকার করে যাচ্ছে । মহিলাটি গিয়ে মনজিতের সামনে ধূসর হয়ে যাওয়া কাগজটা এগিয়ে দিল –এই লম্বরটা কুন টেরাকের বাবু ? দেখেন না একবার ।

চরাচর নিষ্প্রভ হয়ে গেল । সব আলো নিভে গেল । মনজিতকে চিনতে পারেনি মহিলা । প্রেমিকের মুখ মনে নেই । মনে আছে কেবল একটি নম্বর । একটি ট্রাকের নম্বর । আর কিছু নয় ! সব সম্পর্ক একটি নম্বরের সঙ্গে!

মনজিত অপেক্ষা করেনি । গাড়ি নিয়ে তখনই পালাল । ট্রাকটা চোখের আড়াল হয়ে গেল । তখনও মহিলাটি কাগজ দেখিয়ে ওদিকে কাকে ধরে কী বলছে ।

বাসায় ফিরে আসতে আসতে আজকের ঘটনা চোখের সামনে ভাসছিল । সারাজীবন একটি নম্বর নিয়ে বেঁচে থাকবে মহিলাটি । ও কি পাগল ? ঝেপে বৃষ্টি নামল । ভিজতে ভিজতে মনে ছিলনা আমার সঙ্গে ছাতা আছে । মন বলছে মোবাইল ফোনটা পকেটে আছে । একটি নম্বর আছে ওখানে । সেই নম্বরে ফোন করলে কেউ রিসিভ করেনা ! আর কিছু নেই আমার কাছে । সব বিবর্ণ !ধূসর ! আচ্ছা , উমার কাছে কি আমার দেওয়া ফোন নম্বর আছে ?

হোয়াও !...। পাশ দিয়ে আরও একটি ট্রাক বেরিয়ে গেল অজানার উদ্দেশ্যে ।

1 টি মন্তব্য: