বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

রঞ্জনা ব্যানার্জী' র কোন এক লোলিটার গল্প

জীবন বড়ই বিচিত্র। কখন কোথায় কীভাবে বাঁক নেবে কেউ জানে না। আমার কথাই ধরুন, ঘটনার কোন চরিত্র না হয়েও ঘটনার সাথে জুড়ে গেছি। যে মিথ্যার ভার বইতে না পেরে সে চলে গেল, সেই মিথ্যার সত্য আমি বয়ে বেড়াচ্ছি। 

গল্পটা যার তাকে আমি প্রথম দেখি হোটেলের লবিতে। বছর পাঁচেক আগে। সেবার তিন সপ্তাহ্‌’র জন্যে বাচ্চাদের নিয়ে একাই দেশে গিয়েছিলাম। দেশে তখন ঈদের ছুটি। আমরা ভাইবোনেরা বাচ্চাকাচ্চা সমেত কক্সবাজার চলে গিয়েছিলাম। শেষমুহূর্তে হুট করে নেয়া সিদ্ধান্ত তাও বুকিং পেতে কষ্ট হয়নি, কিন্তু চেক ইন করতে গিয়েই আমরা আটকে গেলাম। রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা, রিসেপশন ডেস্কের কাছে যেতেই দেখি দুই রিসেপসনিস্টের সাথেই তরুণীর জোর তর্ক চলছে। বোঝা গেল ওর রুমের বাথরুমে ঝামেলা। রুম পাল্টানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে এরা ভুলে বসে আছে। তরুণী হেভি খেপেছে। ম্যানেজারকে এক্ষুণি চাই তার। আমাদের উসখুস টের পেয়েছিল হয়তো, হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে সবগুলো মুখে দ্রুত চোখ বুলায় ও, তারপরেই সুর নরম করে রিসেপশনিস্টকে বলে, ‘ঠিক আছে কাল সময় দিলাম। নইলে নো পেমেন্ট ম্যানেজারকে বলে দেবেন।’ এরপর একবারও পেছনে না তাকিয়ে লিফটে উঠে যায় সটান। আমরা সবাই এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করি, ‘বাব্বা কী তেজ!’ 

পরদিন সকালেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। ইনানি বিচে জলে-বালিতে, রোদে তেতে বেলা শেষে রাস্তার পাশের হোটেলে রূপচাঁদার লাল ঝোল আর শুটকি দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম। আমার মাইগ্রেনের সমস্যা। অতটা সময় খোলা আকাশের নিচে রোদ লাগিয়েছি, প্রমাদ গুনছিলাম। আশঙ্কা সত্যি হল। বার্মিস মার্কেটে পা রাখতেই ব্যথা শুরু হয়ে যায়। প্ল্যান ছিল সূর্যাস্ত দেখে, রাতের খাওয়া সেরে তারপর হোটেলে ফিরব কিন্তু প্রতি কদমে ঘাই দিচ্ছিল মাথার ভেতরে অতএব অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার কারণে ফিরতে হয়েছিল সবাইকে। 

হোটেলে ফিরেই ওষুধ গিলে ঘর অন্ধকার করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম; খাওয়া দাওয়া করিনি। পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। জানালা দিয়ে সূর্যোদয় না দেখলেও ভোরের আকাশের রঙের খেলা দেখলাম। খিধেয় পেট চোঁচোঁ করছিল। অন্যেরা তখনও বিছানায়। সাতটার দিকে আমি একাই নামলাম। ব্রেকফাস্ট নুকেই ওর সাথে দেখা। একা একা কফিতে চুমুক দিচ্ছে। এক্কেবারে অন্যরকম লাগছিল দেখতে। একঢাল কোঁকড়া চুল। সাদা স্কার্ট আর হাল্কা নীল ছোট হাতা টপ। 

টোস্ট আর কফি নিয়ে ওর টেবিলেই বসলাম। বাথরুমের অবস্থা জানতে চাইলাম। গালে টোল ফেলে হাসল, ‘ভাগ্যিস আজ দেখা হ’ল নইলে তো ‘মিস বাথরুম’ হয়েই জুড়ে থাকতাম আপনার মেমোরিতে।’ প্রাণখুলে হাসলাম দু’জন। নিমেষেই ওকে ভাল লেগে গেল। ওর চোখ জোড়া অসাধারণ, জলজ সবুজ ছোপ। আগের রাতে অত নিবিড় করে খেয়াল করি নি। বয়েস ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। একটা ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে পড়ায়। আগে ঢাকায় কোন এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার ছিল। এত ব্যস্ততা হাঁফ ধরে গিয়েছিল তাই চাকরি পাল্টানো । একাই এসেছে ছুটি কাটাতে। বাহ্‌ বেশ রোমান্টিক তো! ও হাসে ‘যাদের দোকা নেই তারা তো একাই আসবে নাকি?’ আমি অপ্রস্তুত হাসি। বেশ কথা বলে ও। এক ঘন্টারও বেশি আমরা গল্প করেছিলাম। জানাল রুম না পাল্টালে ওকে হোটেল পাল্টাতে হবে। আমার ফেইস বুক নেই তাই যোগাযোগের জন্যে স্কাইপ আইডি বিনিময় করি । একটু পরেই অন্য সবাই নেমে আসে নিচে আর ও ম্যানেজারের সাথে বোঝাপড়ার জন্যে উঠে যায়। 

আমাদের আর দেখা হয়নি। 

কানাডায় ফেরার পর যথারীতি ‘থোড় বড়ি খাড়া’র জীবনে ঢুকে যাই। প্রায় ছ’মাস পরে হঠাৎ একদিন স্কাইপে ওর এড রিকোয়েস্ট। এড করার সাথে সাথেই ওর ফোন। সহজে আলাপ জমাবার অসাধারণ শৈলী ছিল ওর। প্রথম দিন অনেক কথা হয়েছিল। 

এরপর প্রায়ই স্কাইপে গল্প জমাতাম আমরা। বাংলাদেশের রাজনীতি, হঠাৎ সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান, হিজাবের সংস্কৃতি, অদিতি মহসিনের গান, পরমব্রতের সিনেমা কিছুই বাদ যেত না। প্রায় এক বছর আমরা নিয়মিত কথা বলেছি। দু’জনে অনলাইনে থাকলে কাজের ফাঁকে মেসেজ চালাচালিও করেছি। ওর পরিবারের সবার কথা জানা হয়ে গিয়েছিল আমার। ও জেনেছে আমার পরিবারের হালহকিকত। ওর ছোট বোন পিউ মেডিকেলে পড়ে। মা শিক্ষকতা করতেন একসময়। বাবা পাকশী কাগজ কলের কর্মকর্তা ছিলেন পরে ঢাকায় একটা বিদেশি ব্যাংকে যোগ দিয়েছিলেন। অবসরে যাওয়ার এক বছরের মধ্যেই স্ট্রোক আর সেই কারণেই ওর ফের ঢাকায় ফেরা। আবার ফিরেছে কর্পোরেট জীবনে। একটা ফার্মাসিউটিক্যালে মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে কাজ করছে এখন। ও কিন্তু নিজের পরিবার নিয়ে খুব একটা বিস্তৃত বলতে চাইতো না। আলগোছে বুড়ি ছুঁয়ে যেত। কিন্তু আমার পরিবারের সবার কথা খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতো। তবে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য আমরা কখনও স্কাইপে ভিডিও কল করিনি। আমাদের কারো মনেই আসে নি। 

প্রায়ই ও বাংলাদেশ সময় রাতের দুটো তিনটের দিকে ফোন দিত, আমার এখানে তখন বিকেল। একদিন জানতে চাইলাম, ‘এত রাতে ফোনে কথা বল সকালে ওঠো কীভাবে?’ ও খুব হাসল, ‘প্যাঁচারা কবে রাতে ঘুমিয়েছে?’ আমি বলি, ‘চোরেরাও কিন্তু রাতে কাজে যায়।’ হাসতে হাসতে উত্তর দিল, ‘অফিসে চোখ মেলে মাছের মত ঘুমাই, তাই কেউ টের পায়না।’ 

মাঝে মাঝেই কথা নেই বার্তা নেই ডুব দিত। স্কাইপে এক নাগাড়ে অফ লাইন দেখতাম। আবার ভুস করে ভেসে উঠত একদিন। মেসেজ দিত ‘ফোন দেব কাল’ বা ‘তুমি কাল ফ্রি?’ জিজ্ঞেস করলে বলতো, ‘এত কাজের চাপ ছিল দম ফেলার সময় পাইনি।’ 

সেবার প্রায় দু’মাস ধরে ও অফলাইন। একদিন হঠাৎ দেখি মেসেজ ‘ঠিকানা টা দেবে? চিঠি দেব।’ কীসের চিঠি? বিয়ের কার্ড কি? জিজ্ঞেস করব কাকে? ওতো অফলাইনে। যাই হোক ঠিকানা পাঠিয়ে দি।। ও উত্তর দেয় না। ফোনও করে না। প্রায় পনের ষোল দিন পর দেশ থেকে আমার নামে একটা পার্সেল আসে। প্রেরকের নাম দেখেই হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে বিচ্ছিরি ভাবে প্যাকেটটা ছিঁড়ি আমি। নবোকভের ‘লোলিটা’! দেশ থেকে কেউ ইংরেজী বই পাঠায়? অদ্ভুত তো! তারপরেই বেরোয় পেট মোটা চিঠিটা।বইয়ের প্রথম পাতায় টানা হাতে লেখা, ‘তোমার আমার দেখা, তাঁর ইশারার দাবী’, স্বাক্ষরে ওর নাম। আমি হাসি, ‘মারফতি!’ কিন্তু এত বড় চিঠি! আমার তর সয় না। প্রায় পাঁচ পাতার ফুল স্কেপ কাগজে লেখা। এক বসায় লেখেনি। ঘটনার খেই হারিয়েছে কোথাও আবার অনেক পরে রেশ মিলেছে। চিঠির শুরুতেই অনুরোধ ছিল যেন পড়েই নষ্ট করে ফেলি। কথা রাখিনি। দু’বছর ধরে জরুরি কাগজের ফাইলে চিঠিটা সযতনে তুলে রেখেছি। 

ওর মনের তোরঙ্গে এমন এক গাঢ় সকালের গল্প লুকোনো ছিল আমি একটুও বুঝিনি। তের বছর বয়েসে ও ধর্ষিত হয়েছিল, যদিও ধর্ষণ শব্দটা ব্যবহার করেনি কোথাও। ধর্ষক ওর কাকুর বন্ধু। ওর বয়ানে, 

‘আগেরদিন বৃষ্টিতে ভিজে আমার সর্দি জ্বর। স্কুলে যাইনি। উনি ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করলেন,‘কী খবর কেমন আছ এখন? শুনলাম শরীর খারাপ?’ আমি ধড়মড় করে উঠে বসেছিলাম। উনি গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। ‘তুমি খুব সুন্দর! লোলিটা’ আমি লজ্জায় মরি। ‘আমার নাম লোলিটা না।’ উনি আমার চুল সরিয়ে চোখে চোখ রাখেন, ‘তুমিই আমার লোলিটা।’ আমি জানি আমার চোখ অন্যরকম। দু’হাতে আমার মুখ তুলে উনি হঠাৎ আমাকে চুমু খান। জীবনের প্রথম অথবা শেষ প্রাপ্তবয়স্ক চুমু। আমি কেঁপে উঠেছিলাম। তারপরে উনি আমার ঘরের দরজা ভিজিয়ে দিলেন। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। এরপর কীভাবে কী হ’ল আমি জানি না। আমি বাধা দিই নি। একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু অন্যরকম ভালোও লাগছিল। ওঁকে আমার স্বপ্নের রাজকুমারের মত লাগছিল। বয়েস টয়েস সব তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। অনেকক্ষণ উনি আমাকে জড়িয়ে শুয়ে ছিলেন। মিনু মাসি রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত। মা স্কুলে, বাপি অফিসে। একসময় উনি সন্তর্পণে দরজা খুলে বেরিয়ে যান। ন্যায়-অন্যায় নিকেশ করার মত মনের স্থিতি ছিল না। আবেশের ঘোরেই ডুবে ছিলাম।’ 

একটা তেরো বছরের মেয়েকে বয়স্ক এক লোক ওর বয়ঃসন্ধির টলমল সময়ের সুযোগ নিয়ে নিজের বিকৃত লালসা মেটাল তবুও তাকে শেষ মুহূর্তেও ধর্ষকের অভিধা দেয়নি ও বরং নিজেকেই দোষী ভেবেছে। 

‘সেই সুনসান সকালে তেরো বছরের ফুটফুটে নিষ্পাপ আমিই প্রেমাক্রান্ত হয়েছিলাম। মা বাবা পড়শির দেয়া ভাল মেয়ের তকমাটা সামলাইনি! কতশত প্রেমপত্র আমি না পড়েই ফেলে দিয়েছি আর সেই আমিই কী না নিজেকে সঁপে দিয়েছিলাম বাবার বয়েসি লোকটার কাছে তাও যিনি কেবল দু’দিনের জন্যে থাকতে এসেছিলেন সৌজন্যের খাতিরে! গোলমাল আমার মধ্যেই। প্রথম দেখাতেই মজেছিলাম আমি। সুদূর আমেরিকা থেকে এসেছেন। কাকুর বন্ধু। পরিবেশবিদ। ট্যাক্সাস ইউনিভার্সিটিতে পড়ান। আর্সেনিক নিয়ে কাজ করছেন। সেই কাজেরই অংশ হিসেবে রাজশাহী আসা। কাকু থাকেন দুবাইয়ে। কাকু পইপই করে বলে দিয়েছিলেন যেন দাদা বৌদির সাথে দেখা করে যান তাই অসম্ভব ব্যস্ত স্কেজ্যুল থেকে সময় বের করেছেন। ঘরে ঢুকেই জানিয়েছিলেন দু’দিনের বেশি থাকতে পারছেন না। মা’র মুখ আঁধার হয়ে গিয়েছিল। সপ্তাহ ধরে মা ঘর পাট করেছেন। সানন্দার রান্নার রেসিপি দেখে এটা সেটা রেঁধেছেন । 

কাকুর বন্ধু তো কাকুই। কিন্তু আমার কেন অমন হল? প্রথম দেখাতেই বিবশ আমি। কী সুন্দর! আমার তেরো তাঁর হয়তো পঁয়ত্রিশ বা আটত্রিশ। কাকুর এমনই বয়েস। এক মাথা ঝাঁকড়া অবাধ্য চুল। আর বুকের ভেতর তোলপাড় করা হাসি! আমি চোখ তুলে তাকাতে পারছিলাম না। 

সে রাতে খাওয়ার আয়োজন দেখে বলেছিলেন, 
‘ও বউদি তোমার বোন টোন নেই? আমি তো তোমার প্রেমে পড়ে গেলাম।’ 

মা হাসছেন খিলখিল। ‘নারে ভাই।’ বাবা বলছেন, ‘এ্যাই আমার এক পিস বউ, ওদিকে তাকাবে না।’ 

আমার বুক কেঁপে উঠেছিল। আড়চোখে উনি আমাকে দেখছিলেন। আমার পেটের ভেতর তখন হাজার প্রজাপতির হুটোপুটি। রাতে বাগান ভেসে গিয়েছিল চাঁদের আলোয়। খাওয়া দাওয়ার পরে বাইরে বসেছিল সবাই। আমাকে কেউ ডাকেনি। আমার ভীষণ রাগ হচ্ছিল। 

পরদিন সকালে ওঁর ঘুম ভাঙার আগেই আমি স্কুলে চলে গেছি। কাকভেজা হয়ে ফিরেছিলাম স্কুল থেকে। মা আটকে গিয়েছিলেন টিচার্স কাউন্সিলের মিটিঙে। নইলে একসাথেই ফিরি। ছোট শহর সবাই সবাইকে চেনে। পাড়ার অন্যদের সাথে দল বেঁধে ফিরছিলাম। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই মেঘ ভেঙে বৃষ্টি। মিনু মাসি আমাকে দেখেই তেড়ে এলেন। ‘রিক্সা নাওনি কেন?’ আর্‌রে ফকফকা আকাশ হঠাৎ বৃষ্টি নামবে আমি জানতাম নাকি? মিনু মাসির খিটখিটানি যায় না। ‘আমাকে শেখাও? এক্ষুণি স্নানঘরে ঢোক। জামা কাপড় দিচ্ছি আমি।’ আমি রেগে কিছু একটা বলতে যাব অমনি চোখ চলে গেল বারান্দায়। আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। পুরু কাচের চশমা ছাড়িয়ে সেই দৃষ্টি আমার গা,হাত,বুক ছুঁয়ে দিল। ভেতরটা সিরসির করে উঠেছিল আমার। প্রায় ছুটে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলাম।’ 

পুরো পরিবারের জীবন থেমে যায় ওর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায়। মায়ের অসুখের চিকিৎসার জন্যে সপরিবারে ইন্ডিয়া যাচ্ছে বলে করিমগঞ্জে সাত মাস কাটিয়েছিল ওরা। ওর বাবা অবশ্য পাকশী ফিরে গিয়েছিলেন। 

‘ইন্ডিয়া নয় আমরা গিয়েছিলাম করিমগঞ্জে। বাড়িটা অশোক মামাই ঠিক করে দিয়েছিলেন। মাঠের মধ্যে একলা একটা বাড়ি। সন্ধ্যে নামলে মাঠ পেরিয়ে হাওয়ারা আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ত। অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে ভেতরটা। একটা মৃত্যুর জন্যেই যেন আগাম বিষণ্ণ আয়োজন। কিন্তু আমরা কেউই মরিনি। না আমি, না পিউ।’ 

বাচ্চার বাবার নাম ও কাউকে বলেনি। এমন কী অশোক মামার হুমকীতেও মুখ খোলেনি। বাড়িতে বাইরের পুরুষ বলতে আসতেন কেবল সাত্তার স্যার। 

‘আমি নিজেকেই দুষছিলাম। এই ঘটনার দায় আমারও। আমাকে তো জোর করেননি। নিদেনপক্ষে পরে মা বাবাকে জানাতে পারতাম। আমি কিছুই করি নি। তাতে মিনু মাসির ভাষায়, ‘খসাবার টাইম’ থাকত। আমি নিজেকে বাজে মেয়েই ভেবেছিলাম দীর্ঘদিন। মুদ্রার উলটো দিকটা দেখিনি। আমি কাউকে নামটা বলিনি। অশোক মামার চোখ রাঙানিতেও ভড়কাইনি। শেষমেশ সবার সন্দেহ গিয়ে পড়ল সাত্তার স্যারের ওপর। আর তো কোন পুরুষ আমাদের বাড়ি আসেনা। স্যার আমাকে হাতে ধরে জ্যামিতি শিখিয়েছেন। বৃত্তি পরীক্ষার জন্যে তৈরি করেছেন। একজনও যদি স্পেশ্যাল এ গ্রেড পায় তো আমিই। সেই সাত্তার স্যারকেই ওরা সন্দেহ করল? আমি হাউমাউ কাঁদছিলাম। তাতে সবার বিশ্বাস আরও পোক্ত হ’ল। মা শাপান্ত করছিলেন, ‘নির্বংশ হ।’ সাত্তার স্যার নির্বংশ হয়েছিলেন কি না জানি না তবে কারা যেন এক রাতে বেদম পিটিয়ে অজ্ঞান করে ফেলে এসেছিল পদ্মার পাড়ে। পকেটের মোবাইল কিংবা মানি ব্যাগের টাকা কিচ্ছু খোয়া যায় নি। পদ্মা তখন শুকিয়ে কাঠ, জল নেই যে ছায়া ধরে রাখবে। পুলিশও কোন কিনারা পায়নি। কেবল সাত্তার স্যার পঙ্গু হাসপাতাল থেকে ফিরলেন অসাড় একজোড়া পা নিয়ে।’ 

সবাই জেনেছিল ওর আরেকটা বোন হয়েছে। করিমগঞ্জ থেকে ওরা সরাসরি ঢাকায় চলে গিয়েছিল। বোনের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা আছে জেনেছিল সবাই। কিছুদিন পরেই পাকশী কাগজকল বন্ধ হয়ে যায়; ওর বাবাও ফিরে আসেন ঢাকায়। 

‘সব মিথ্যে গুলো জুড়ে পিউ নামের ফুটফুটে শিশুটিই কঠিন সত্য হয়ে বাড়তে থাকে আমাদের চোখের সামনে।’ 

একসময় ওর জীবনেও ছন্দ ফেরে। ও ঘুরে দাঁড়ায়। আর তখনই কাকতালীয় ভাবে লোলিটা বইটা ওর হাতে আসে। ও সবে এমবিএ শেষ করে একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় মার্কেটিং এ যোগ দিয়েছে। মুম্বাইয়ে গিয়েছিল ট্রেনিং এ। সেখানেই এক বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে বইটা নজরে আসে। 

‘রাত জেগে বইটা শেষ করেছিলাম। একটা একটা করে ভুল পাপড়ি খসে পড়ছিল। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তবে উনি আমার মুগ্ধতা পড়তে পেরেছিলেন! শিকার অবশ করে আটকে ছিলেন জালে। হাজার হাজার বোলতা মাথায় হুল ফোটাতে থাকে আমার। ঘুমের ছুটি হয়ে যায় চিরদিনের মত। সারাক্ষণ সেই ‘লোলিটা লোলিটা’ ডাক আমার মগজে বাজতেই থাকে। ফিরে এসেই চাকরিটা ছেড়ে দি। একটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে চাকরি নিয়ে শহর ছাড়ি।’ 

চিঠিটা পড়া শেষ করে আমি বসে ছিলাম অনেকক্ষণ। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলছিলাম। হঠাৎ সংবিৎ ফেরে, চিঠি পেয়েছি জানানো দরকার। স্কাইপে ওকে মেসেজ পাঠাতে বসি। কেন যেন মনে হচ্ছিল ইচ্ছে করেই সেটআপে অফলাইন করে রেখেছে। মেসেজ ঠিকই দেখবে। কিন্তু মেসেজ দিতে গিয়েই আবিস্কার করি ও আমার কন্ট্যাক্ট লিস্ট থেকে স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে! কী আশ্চর্য! কবে হ’ল? স্কাইপ সার্চেও ওকে পাইনা। হয় আমাকে ব্লক করেছে নতুবা এ্যাকাউন্ট ডিলিট করেছে। মানে কী? 

উপহার পাঠিয়ে কেউ আড়ালে চলে যায় এ কেমন কথা! গুগল সার্চ দিয়ে অদ্রিশই খুঁজে বার করে ওকে। গ্লোব্যাল ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজারের প্রোফাইল মিলে যায় ওর সাথে। কোম্পানির ওয়েব সাইটের টেলিফোন নম্বরে ফোন দি। মহিলা রিসেপশনিস্ট কাকে চাই শুনে কিছুক্ষণ চুপ, তারপর আমার পরিচয় জানতে চান এবং ‘উনি নেই’ বলে সংযোগ কেটে দেন। 

পরের ক’দিন খুব অস্বস্তিতে কাটে আমার। তারপর হঠাৎ আলোর ঝলকানির মত মনে পড়ে যায় আমার বড় জামাইবাবুর কথা। উনি ডাক্তার। ফার্মাসিউটিক্যাল লাইনের অনেককে চেনেন। অদ্ভুত! এই কথা এতদিন মনে হ’ল না কেন? সাথে সাথেই জামাইবাবুকে ফোন করি। আমার জামাইবাবুর কক্সবাজারে রিসেপশন ডেস্কে সেই ঝামেলার কথা দিব্যি মনে আছে। কিন্তু এত বছর পরে আমার আগ্রহের হেতু বোঝাতে ঘাম বেরিয়ে যায় আমার। দু’তিন দিন পরে সেই অমোঘ সংবাদটি তিনিই জানান। ও নেই। নেই মানে নেই। ঠিক কী হয়েছিল কেউ জানে না। ছুটিতে ছিল তারপর একদিন ঘুমের মধ্যেই হার্ট ফেইলিউর। গুজব আছে ওভার ডোজ স্লিপিং পিল গিলেছিল। আমার চারপাশ কেমন অচেনা মনে হয়। ‘লোলিটা’ বইটা আর পড়া হয় না। 

এক রাতে ওকে স্বপ্নে দেখি। সাদা স্কার্ট আর নীল টপ পরে বালিয়াড়ির ওপর বসে আছে, আনমনা। ঘুম ভেঙে যায়। এত কষ্ট কখনো কারো জন্যে হয়নি আমার। শুনি সময়ই নাকি মনের ক্ষতের মোক্ষম প্রলেপ কিন্তু আমার মনের ভেতরে ও চোরকাঁটা হয়ে রয়েই যায়। 

এই ঘটনার প্রায় এক বছর পরে আমরা দেশে যাই। মনে মনে ঠিক করি ওর বাড়ি যাবই। দেশে পৌঁছেই অদ্রিশকে বলি। ও কিছুতেই সায় দেয়না। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় ওকে রাজি করাতে। বনানীর যে ঠিকানাটা উপহারের খামে লেখা ছিল সেখানে ফ্ল্যাট নম্বর নেই। ওরা ওখানে থাকে কী না কে জানে? তবুও আমরা যাই এক বিকেলে। সিকিউরিটির কাছে ওর নাম না বলে পদবি বলি। একই পদবিতে তিনজন। নাম লাগবে। লোকটা আমাদের জরিপ করতে শুরু করেছে ততক্ষণে। ওর নাম বলতে বাধে। হঠাৎ ‘পিউ’র নাম মনে পড়ে। হাতে চাঁদ পেলাম যেন।‘ও মেডিকেলে পড়ে।’ সিকিউরিটি চিনতে পারে এবং ফোন লাগায়; ওপ্রান্তে যিনি ধরেন তাকে আমাদের নাম এবং কানাডা থেকে এসেছি জানানো হয়। আমরা জানি কেউ একজন নামছে আমাদের নিয়ে যেতে। আমরা উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করি। 

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে যে এল তাকে দেখে আমার আর রা সরে না; এত মিল! 

-কবে এসেছেন আপনি? 

-আমাকে চেন? 

ও মিষ্টি হেসে বলে, ‘আপনাকে দিদিভাই বলে ডাকত।’ এইটুকু বলেই ও থমকায়। ‘আপনাকে আমি জানাতে পারিনি। স্কাইপ ডিলিট করে দিয়েছিল। কোথাও আপনার ফোন নাম্বার লেখা ছিল না। ও নেই। আপনি জানেন?’ ওর চোখ ছলছল। আমি নীরবে সায় দি। চোখ জ্বলতে থাকে আমারও; নিজেকে সামলাই। কীভাবে জানি ও তা জানতে চায় না। 

ঘরে ঢুকে দেখি হুইল চেয়ারে বসা সৌম্যকান্ত ভদ্রলোক। ওর বাবা। মা আসেন একটু পরে। কপাল জুড়ে লাল টুকটুকে টিপ। ওর মতই সবুজ ঘেষা চোখের রঙ। ওঁরা দু’জনেই জানেন আমার কথা। পরিচয় পর্বের পরে বড় বিপন্ন লাগে নিজেকে। কথা খুঁজে পাই না। চুপচাপ সবাই বসে থাকি। না চাইলেও বিষাদ ছুঁয়ে থাকে আমাদের। আমি কিছু চকোলেট এনেছিলাম পিউ’র জন্য। অদ্রিশ মনে করিয়ে দেয়। কথা বলার একটা ছুতো তৈরি হয়। ধীরে ধীরে কথার পিঠে কথা বাড়ে। আমি ওর চলে যাওয়ার খবরটা জামাইবাবুর সূত্রে জেনেছি জানাই। অদ্রিশের সাথে চোখাচোখি হয় আমার, আমি চিঠি এবং ‘লোলিটা’ বইটার কথা চেপে যাই। ওর বাবা জানান ইনসমনিয়া ছিল ওর। ওভারডোজ ঘুমের ওষুধ নিয়েছিল। ওর মা চোখে আঁচল চেপে কাঁদতে থাকেন। 

না খেয়ে কিছুতে আসতে দিলেন না ওঁরা। অপূর্ব হাতের রান্না মাসিমার। খাওয়ার পর ওর ঘরে যাই। ছিমছাম সাজানো। দেয়াল জুড়ে পিউর ছবি। ওর কেবল একটা। হাসি মুখে সরাসরি যেন তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওর চোখ দুটো বড় বেশি সবুজ লাগে হঠাৎ। 

ফেরার সময় পিউ বলল, ‘আমিও কি আপনাকে দিদিভাই ডাকতে পারি?’ আমি ওকে কাছে টেনে বলি, ‘আমাকে তুমি মাসি ডেক। তোমার বয়েসি মেয়ে আছে আমার। আমি তোমার আরেকটা মা।’ 

কানাডা ফিরে এসে ‘লোলিটা’ বইটা পড়েছিলাম। লোকটা কি ‘লোলিটা’ পড়েই অনুপ্রাণিত হয়েছিল? নাকি সে ‘লোলিটা’ উপন্যাসের সাইকো ‘হাম্বার্ট হাম্বার্ট’ এর মতই লোলিটাদের টোপ গিলিয়ে নিজের বিকৃতি মেটাতো? আমার কখনও জানা হবে না। 

আজ দেশে পিউ’র সাথে কথা বলেছি। দু’বছর আগে এইদিনে ও চলে গিয়েছিল। চিঠিটা বার করি। শেষবারের মত পড়ি। তারপর আগুন ধরিয়ে চুপচাপ দেখি ছাই হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে সেই নাম, সেই বৃষ্টিভেজা দুপুর, তেরো বছরের কিশোরীর সত্য মিথ্যার দ্বন্দ্বে বেড়ে ওঠা এবং জীবন থেকে ছুটি নেয়ার গল্প। জানি আমার মনের গোপন ঘরে এই গল্প নির্বিঘ্নে পা গুটিয়ে ঘুমাবে না। আড়মোড়া ভাঙবে। আমাকে জ্বালাবে। তবুও এ্রর ভার আমাকে নিতেই হবে ।

৫টি মন্তব্য:

  1. পাঠককে ধরে রাখে এমনি মুন্সিয়ানা। অন্য রকম গল্প নি:সন্দেহে। টান টান ভাষা।

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ লেখনী, মনে কষ্ট,চোখে জল, এরপরেও মুগ্ধতা আর মুগ্ধতা।। এত সাবলীল লেখা প্রতিটা গল্পই যেন এক একটা জীবনের বাস্তবতা।। পারেন কি করে সাধারণকে অসাধারণ করে জীবন্ত করতে???

    উত্তরমুছুন
  3. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন