বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

চিনের গল্প : নকশি কুশন

মূলঃ লিং শুহুয়া
অনুবাদঃ ফজল হাসান

মাথা নিচু করে নিবীড় মনে বাড়ির বড় মেয়ে, যাকে সবাই মিসি নামে ডাকে, একটা কুশনের উপর নকশি কাজ করছে । আজ ভীষণ গরম পড়েছে । ঘামে ভিজে সারা শরীর চিটচিটে হয়ে আছে । বাইরে এত বেশি গরম যে জিহ্বা বের করে টেবিলের নিচে চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া কুকুরটারও কিছু করার নেই ।
জানালার পাশে মাছিগুলো ভনভন করে এলোপাথারি উড়ছে । যুবতী মেয়েটির পেছনে দাঁড়িয়ে হাত পাখা দিয়ে চ্যাং-মা নিজেকে বাতাস করছেন । তার সারা মুখে ঘামের ফোঁটা নিচে গড়িয়ে পড়ছে । বারবার তিনি রুমাল দিয়ে ঘাম মোছেন, কিন্তু পরক্ষণেই আবার ঘামের ফোঁটা জমে । যেইমাত্র তিনি নাকের ঘাম মোছে, ঠিক তখনই আবার মুখে ঘাম জমে । তিনি লক্ষ্য করেন, মিসিরও প্রায় একই অবস্থা । গরমে চোখমুখ লাল হয়ে গেছে । পড়নের পাতলা লিনেনের সাদা জামা ঘামে ভিজে তার পিঠের সঙ্গে লেপ্টে আছে । চ্যাং-মা কথা না-বলে থাকতে পারলেন না । তিনি বললেন, ‘খানিকক্ষণ বিরতি দিয়ে শরীরটা ঠান্ডা করে নাও । আমি জানি, মুনিব বলেছেন আগমিকালই কুশনগুলো পাঠয়ে দিবেন। কিন্তু তিনি তো নির্দিষ্ট করে সময় বলেননি – সকালে, নাকি বিকেলে ?’

‘তিনি বলেছেন, আগামিকাল দুপুরের মধ্যেই কুশন পাঠাতে চান । তাই আমাকে তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে হবে । কাছে এসে আমাকে বাতাস করো,’ বলেই মিসি মাথা নিচু করে পুনরায় সেলাই কাজে মনোনিবেশ করে ।

চ্যাং-মা হেঁটে বাম দিকে যান । তিনি যেই হাতপাখা দিয়ে বাতাস করা শুরু করবেন, ঠিক তখনই নকশি কুশনের উপর তার দৃষ্টি আটকে যায় । তৎক্ষণাৎ তিনি মুখে উহ্ এবং আহ্ আওয়াজ করে প্রশংসার ভঙ্গিতে বললেন, ‘আমি সব সময় ভাবি, গল্পে যেসব অনিন্দ্য সুন্দরী এবং সর্বগুণে গুণান্বিতা মেয়েদের বর্ণনা থাকে, ওগুলো গল্পকারের মনগড়া সৃষ্টি । আগে আমি কখনই জানতাম না, আসলে সেই ধরনের কোনো মেয়ে আদৌ আছে কি না । আহা ! কি সৌভাগ্য, আমাদের মাঝে সেরকম একজন মেয়ে আছে । মেয়েটি পেঁয়াজের কচি ডগার মতো তরতাজা এবং নকশি কাজে তার হাত অত্যন্ত পাকা । কুশনের উপর আঁকা নকশি পাখিটা সত্যি অপূর্ব এবং অতুলনীয় ।’

সরাসরি মুখের উপর চ্যাং-মার প্রশংসা শুনে পলকের জন্য মিসির গালে লজ্জার এক ঝলক রক্তিম আভা ফুটে ওঠে এবং দ্রুত তা মিলিয়ে যায় ।

বাকপটু চ্যাং-মা পুনরায় কথা বলা শুরু করেন, ‘ঠিক আছে, এই এক জোড়া কুশন মিনিষ্টার পাই-কে যখন উপহার হিসেবে দেওয়া হবে, তখন যারা দেখবে, নিঃসন্দেহে সবাই এই কুশনের ভূয়সী প্রশংসা করবে । আমি বলতে চাই না, ওখানে কতজন ঘটক উপস্থিত থাকবে । তবে আমি হলপ করে বলতে পারি, অনেক ঘটক এসে আমাদের দরজায় করাঘাত করবে এবং কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে আমাদের পটানোর চেষ্টা করে । আমি শুনেছি, মিনিষ্টার পাইয়ের দ্বিতীয় পুত্র সুদর্শন এবং বিয়ের জন্য যোগ্য পাত্র । ওর বয়স আনুমানিক কুড়ি বছর । আমি আগামি দিনের মহা পরিকল্পনার সুন্দর দৃশ্য স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি । নিশ্চয়ই তোমার মনে আছে, গত বছর জ্যোতিষী ম্যাডামকে বলেছিল, এ বছর তোমার ভাগ্যাকাশে সৌভাগ্যের নক্ষত্র উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়াবে ।’

‘বাজে বকো না, মা,’ চ্যাং-মাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য মিসি সেলাই বন্ধ করে হালকা ধমকের সুরে বললো । সেই সময় লজ্জায় তার চোখেমুখ পুনরায় আরক্তিম হয়ে ওঠে ।

মুহূর্তেই সমস্ত ঘর নিস্তব্ধতার কালো চাদরে ঢেকে যায় । শুধু সাটিন কাপড় ফুঁড়ে সুঁই ঢোকা এবং বেরোনোর অস্পষ্ট শব্দ এবং বাতাসের হালকা আওয়াজ চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে । হঠাৎ বাঁশের পর্দার উল্টোদিক থেকে একটা কিশোরীর কন্ঠস্বর ভেসে আসে, ‘চ্যাং-মা, আমি এখানে ।’

‘কে, সাইয়ুনইউ ? এই প্রচন্ড গরমের সময় তুমি এখনে কি করছো ?’ রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে চ্যাং-মা জিজ্ঞেস করেন । সিয়ায়ুনইউর পড়নে নীল পাৎলুন এবং জামা । তার সারা মুখে ঘামের ফোঁটা জমে আছে । গরমে তার মুখটা মিষ্টি কুমড়োর মতো টকটকে লাল হয়ে আছে । একসময় সাইয়ুনইউ বাঁশের পর্দা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে এবং দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মিসির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ।

‘চ্যাং-মা, গতকাল আন্টি বলেছেন যে এক জোড়া কুশনের উপর নকশির কাজ করতে মিসি নাকি ছয় মাস ব্যয় করেছে,’ হড়হড় করে এক নিঃশ্বাসে সিয়ায়ুনইউ বললো । তারপর একপলকের জন্য থেমে দম নিয়ে পুনরায় সে বললো, ‘আন্টি আরও বলেছেন, কুশনের নকশি করা পাখিটা শুধুমাত্র আঁকতে নাকি তিরিশ ধরনের সূতা ব্যবহার করা হয়েছে । আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারি না, কুশনের ওপর পাখিটার কাজ করতে এত ধরনের সূতা কেন লেগেছে । আন্টি বলেছেন, আমি যদি বিশ্বাস না করি, তাহলে তার সঙ্গে এসে যেন নিজের চোখে দেখে যাই । এক বা দু’দিনের মধ্যেই কুশনগুলো উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হবে । তাই আমি দেখার জন্য খাবার খেয়ে চলে এসেছি । চ্যাং-মা, আমি কি কাছে এসে ভালো করে একবার দেখতে পারি ?’

ইতিমধ্যে মিসি কুশনের কাজ শেষ করেছে । মেয়েটির আবদার শুনে চ্যাং-মা মুখ টিপে হাসলেন এবং মিসিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘মিসি, সিয়ায়ুনইউ তোমার নকশি কুশন দেখতে চায় । ঠিক আছে ?’

মিসি মাথা তুলে সিয়ায়ুনইউকে পরখ করে । ওর পড়নের কাপড় নোংরা । মেয়েটি ধূসর রঙের একটা রুমাল দিয়ে মুখ মোছে । হা করা মুখের ভেতর থেকে দু’পাটি বড় এবং হলুদ দাঁত বের হয়ে আছে । বিস্ফারিত দৃষ্টিতে সে মিসির দিকে তাকিয়ে আছে । কোনো কিছু না ভেবেই মিসি ভ্রুকুটি করে বললো, ‘ওকে এখন যেতে বলো । পরে একসময় এসে দেখে যাবে ।’

চ্যং-মার বুঝতে অসুবিধা হলো না, এই মুহূর্তে মিসির অগোছালো চুল কেউ দেখুক । চ্যং-মা চটজলদি সিয়ায়ুনইউয়ের দিকে ঘুরে বললো, ‘তোমার নাকের ওপর ঘাম জমে আছে । এখন যাও এবং মুখ মোছো । আমার ঘরে পানি আছে । এমন গরমের দিনে তোমার ঘর্মাক্ত মুখ দেখিয়ে মিসিকে রাগিয়ে তুলো না ।’

পলকেই হতাশার একখন্ড কালো মেঘ উড়ে এসে সিয়ায়ুনইউর সমস্ত মুখ ঢেকে দেয় । সিয়ায়ুনইউ ভাবলো, মিসির মা যখন চলে যেতে বলেছেন, তখন অযথা দাঁড়িয়ে থেকে কোনো লাভ নেই । তার বিবর্ণ মুখ দেখে চ্যাং-মার অনুশোচনা হলো । তবুও বড় বড় চোখ করে তিনি হালকা ধমকের স্বরে বললেন, ‘যাও, আমার ঘরে গিয়ে ভালো করে হাতমুখ ধুয়ে নাও । আমি এক্ষুনি আসছি ।’

অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে সিয়ায়ুনইউ দরজার পর্দা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে যায় । সূঁইয়ের ভেতর নতুন সুতা ঢুকিয়ে মিসি মাথা তুলে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখে সিয়ায়ুনইউ জামার ভাঁজ করা হাত দিয়ে কপালের ঘাম মোছে । বাগানে বড় পাত্রের মধ্যে ডালিম গাছের লাল ফুলগুলো সূর্য্যের আলোয় যেন অগ্নিশিখার মতো জ্বলছে । এই দৃশ্য দেখার পর গরমে মিসি আরো বেশি হাঁসফাঁস করে এবং সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে । সেই মুহূর্তে সে অনুভব করে তার বগলের নিচেও ঘাম জমে জামা ভিজে গেছে।

এরই মাঝে চোখের পলকে দু’বছর কেটে গেছে । মিসি তখনও তার নিজের ঘরে বসে একাগ্র মনে নকশি কাজ করে যাচ্ছিল । এই দু’বছরে সিয়ায়ুনইউ তার মায়ের মতো লম্বা হয়ে গেছে । সে সবকিছু গুছিয়ে রাখার অভ্যাস রপ্ত করে নিয়েছে, এমনকি মায়ের অনুপস্থিতিতে ঘরের সমস্ত কাজ করে ।

গ্রীষ্মের কোনো এক অপরাহ্নে সিয়ায়ুনইউ আলোর পাশে বসে এক জোড়া কুশনের কিনারা সেলাই করছিল। সে সময় মিসি তাকে ডাকে । সিয়ায়ুনইউ সূঁই-সুতা রেখে রীতিমতো এক দৌঁড়ে মিসির ঘরে প্রবেশ করে । মিসির পা টিপে দেবার ফাঁকে সে বললো, ‘মিসি, গত পরশুদিন বুড়ি মা আমাকে এক জোড়া সুন্দর কুশন কভার দিয়েছেন । কুশন কভারের একপাশে মাছরাঙা এবং অন্যপাশে ফিনিক্স পাখির ছবি ।’

‘এখন আমাকে বলো না যে, পাখিগুলো অর্ধেক ছিল,’ সিয়ায়ুনইউর দিকে সরাসরি তাকিয়ে মিসি উপহাসের ভঙ্গিতে বললো ।

‘জানো, এই কুশন কাভার নিয়ে একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে । ওগুলোর জন্য আমি আমার ধর্ম-বোনদের সঙ্গে রীতিমতো ঝগড়া করেছি । আসলে ওয়াং আরহ্-সাও ওগুলো আমার ধর্ম-মাতাকে উপহার দিয়েছিল । তিনি বলেছেন, ওগুলো বড় কুশনের জন্য । নতুন কুশন কভারগুলো দেখতে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ছিল । একটিতে পদ্মফুল ও মাছরাঙার ছবি ছিল এবং অন্যটিতে ছিল পাথরের ওপর বসা একটা ফিনিক্স পাখির ছবি । যেদিন কুশন কভারগুলো আমার ধর্ম-মাতাকে দেওয়া হয়েছিল, সেদিনই তিনি ওগুলো চেয়ারের ওপর রেখেছিলেন । কিন্তু সন্ধ্যেয় তাস খেলার সময় এক মদ্যপ অতিথি একটা কুশনের ওপর বমি করেছিল । অন্য কুশনটি আরেকজন ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে তার ওপর পা দিয়ে বসেছিল । ফলে মসৃন সাটিন কাপড়ের কুশন কভার জুতার কাদায় ময়লা হয়ে যায়। ধর্ম-মাতা পরবর্তীতে ওয়াং আরহ্-সাওকে ওগুলো ফেরত নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছিলেন, কিন্তু সে নেয়নি। অবশেষে ধর্ম-মাতা ওগুলো আমাকে দিয়েছেন। যে রাতে কভারগুলো আমার ঘরে নিয়ে আসি, তখন থেকেই আমি ওগুলো ভালোবাসতে শুরু করি এবং ওগুলোর সৌন্দর্য্যে অভিভূত হয়ে আমি যারপরনাই তারিফ করি । সত্যি, কুশন কভার দু’টি অত্যন্ত সুন্দর । চল্লিশ ধরনের রঙিন সূতা দিয়ে ফিনিক্স পাখির লেজের নকশি কাজ করা হয়েছে । মাছরাঙা পাখির চোখ জোড়া দেখলে মনে হয় যেন ওগুলো সত্যি জীবন্ত । চোখের কালো মনি থেকে একধরনের উজ্জ্বল দ্যুতি ঠিকরে বেরিয়ে আসছে । আমি জানি না, চোখের জন্য কি ধরনের সূতা ব্যবহার করা হয়েছে ।’

সিয়ায়ুনইউর একটানা কথা শুনে মিসির বুক ধ্বক করে ওঠে । একপলকের জন্য থেমে সিয়ায়ুনইউ পুনরায় বলতে শুরু করে, ‘সত্যি, এ ধরনের ঘটনা খুবই দুঃখজনক । কয়েকদিন আগে ধর্ম-মাতা এসে আমাকে কুশন কভার দিয়ে বলেছেন, আমি যেন ময়লা অংশ কেটে আবার নকশির কাজ করি । তুমি কি বিশ্বাস করবে, আমার ধর্ম-বোন কত ছোট ? অথচ ও অনুযোগ করে বলেছে যে আমি নাকি ধর্ম-মাতাকে পটিয়ে সবকিছু হাতিয়ে নিই ।’

সিয়ায়ুনইউর এসব খুঁটিনাটি কথাবার্তায় মিসির কোনো মনোযোগ নেই । তখন তার মনে শুধু দু’বছর আগের সেই প্রচন্ড গরম দিনের স্মৃতি ভাসতে থাকে । সেই সময় সে এক জোড়া কুশন কভারের ওপর নকশি কাজ করেছিল । সেই কুশন কভারের একদিকে ছিল মাছরাঙা পাখি এবং অন্যদিকে ছিল ফিনিক্স পাখির ছবি । তখন এত বেশি গরম পড়েছিল যে দিনের বেলা ঘরের ভেতর বসে নকশির কাজ করা অত্যন্ত কষ্টকর ছিল । অনেকদিন সে রাত নেমে আসার অপেক্ষায় থেকেছে । যাহোক, কুশনের কাজ শেষ করার পর সে পুরো দশদিন চোখের সমস্যায় ভুগেছে । একসময় তার কুশনের কাজের সঙ্গে সিয়ায়ুনইউর কুশনের কাজ তুলনা করার জন্য মিসি সিয়ায়ুনইউকে কুশন আনতে বললো ।

সিয়ায়ুনইউ কুশন হাতে ফিরে এসে বললো, ‘মিসি দেখো, সাটিনের ওপর সুন্দর নকশি কাজগুলো কেমন ময়লা হয়ে গেছে । আমি শুনেছি, পাখিগুলোর ছবি আগেই করা আঁকা হয়েছিল । এখন শুধু সুতার কাজ করা হয়েছে । দেখো, পাখিগুলোর ঝুটি এবং ঠোঁট কি সুন্দর টকটকে লাল । ওয়াং আরহ্-সাও বলেছে, মাছরাঙার চোখের মনি জোড়া আসল মুক্তা । তবে বিবর্ণ পদ্মফুল এখন আর সুন্দর দেখায় না । পাতাগুলোও অনেক বড় এবং কুশনের ওপর রীতিমতো বেমানান লাগছে । এছাড়া পাথরের পাশে একটা ফুল রয়েছে ।’

মিসি ফাঁকা দৃষ্টি মেলে কুশনের দিকে তাকিয়ে থকে । সিয়ায়ুনইউর শেষ কথাটা তার কানের ফুটো গলিয়ে মস্তিস্কে পৌঁছায়নি । সেই সময় তার শুধু মনে পড়ে, পাখির ঝুটির নকশি কাজ করার সময় সে তিনবার খুলে পুনরায় তৈরি করেছিল । তার ঘর্মাক্ত মুখ থেকে অজান্তেই হলুদ সুতার কাজের ওপর ঘামের ফোঁটা পড়েছিল । কাজ শেষ করার পর তার নজরে পড়ে । অস্পষ্ট আলোয় সে অবচেতন মনে কাজ করার সময় সবুজ সুতা ব্যবহার করে দ্বিতীয়বার ভুল করেছিল । হালকা গোলাপি রঙের পদ্মফুল সে হাত দিয়ে স্পর্শ করার সময় সাবানতা অবলম্বন করতো, এমনকি ধরার আগে হাত ভালো করে ধুয়ে পাউডার মেখে নিতো । পদ্মফুলের পাতাগুলো তৈরি করার সময় সে বারো ধরনের সবুজ সুতা ব্যবহার করেছিল । যাহোক, নানান বাঁধা-বিপত্তি পেরিয়ে সে একসময় কুশন কভারের কাজ শেষ করতে পেরেছিল । অবশেষে সেই কুশন দু’টি পাই পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পর আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবীরা ঠাট্টা তামাশা করে তাকে অনেক কথা শুনিয়েছে । সে শুধু নিঃশব্দে হেসেছে এবং লজ্জায় তার মুখমন্ডল আরক্তিম হয়েছে । রাতের বেলা ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্ন দেখেছে তার লজ্জাবতী মুখ এবং সুন্দর পোশাক পড়া আপন অবয়ব, এমনকি কতজন সুন্দরী তরুণী তাকে অনুসরণ করবে এবং কতজন বন্ধু-বান্ধবীর চেহারায় ফুটে উঠবে হিংসার ছবি । কিন্তু সেটা যে নেহায়েত অলীক স্বপ্ন ছিল, তা বুঝতে তার বেশি সময় লাগেনি । তবে সে কখনই সেই স্বপ্ন আবার দেখতে চায় না, কিংবা ভাঙতেও চায় না । অথচ আজ আবার সেই নকশি কুশন দেখার পর তার স্মৃতির বেনোজলে পুরনো ঘটনার একেকটা ছবি ভেসে উঠতে থাকে ।

মিসির এই মৌনতা সিয়ায়ুনইউর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি । তবে তার দৃষ্টি পড়ে কুশনের উপর । সে বললো, ‘মিসি, তুমি এগুলো খুব পছন্দ করো, তাই না ? সত্যি এগুলো অত্যন্ত সুন্দর । সময় করে তুমি আমার এই কুশনের মতো অন্য আরেক জোড়া কুশন বানাও না কেন ?’

সিয়ায়ুনইউর প্রশ্নটা মিসি ঠিকমতো শুনতে পায়নি । ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে নিঃশব্দে আলতো করে মাথা দোলায় ।

লেখক পরিচিতিঃ আধুনিক চীনা কথাসাহিত্যের অন্যতম নারী লেখক লিং শুহুয়া । তার জন্ম ১৯০০ সালে, চীনের বর্তমান রাজধানী বেইজিংয়ে । তিনি তার পিতার চতুর্থ স্ত্রীর গর্ভে জন্মেছেন । তার পিতা ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা এবং একসময়ের বেইজিং শহরের নগরপিতা । বিদেশি সাহিত্যে পড়াশুনা করার জন্য তিনি ১৯২২ সালে ইয়াংজিং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন । কিন্তু পড়াশুনা সমাপ্ত না করেই তিনি ‘মে ফোর্থ আন্দোলন’-এর মুখপত্র ‘কন্টেম্পরারী রিভিউ’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক চেন ইউয়ানকে বিয়ে করে হুনান প্রদেশে গমন করেন । পরবর্তীতে তিনি চীন সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে ইউনেস্কোতে কাজ করেন । তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘দ্য টেম্পল অফ ফ্লাওয়ার্স’ (১৯২৮), ‘ও্যম্যান’ (১৯৩০), ‘টু লিটল্ ব্রাদার্স’ (১৯৩৫) এবং ‘এনসিয়েন্ট মেলোডীস’ (১৯৫৩) । বলা হয়, গল্প এবং উপন্যাসের কাহিনী নির্বাচনে তিনি ছিলেন রক্ষণশীল এবং লেখার চিরায়ত নিয়মাবলীর প্রতি কখনও বিরোধিতা করেননি । সাহিত্য কর্মের জন্য সমালোচকেরা তাকে চীনের ‘ক্যাথারিন ম্যান্সফিল্ড’ আখ্যায়িত করে । লেখিকা ছাড়াও তিনি একজন প্রথিতযশা অংকনশিল্পী ছিলেন । লেখালেখির ফাঁকে নিজের অনেক বইয়ের প্রচছদ এঁকেছেন । তিনি ১৯৯০ সালে মৃত্যবরণ করেন ।

গল্পসূত্রঃ ‘নকশি কুশন’ লিং শুহুয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প । অনূদিত গল্পটি ইংরেজিতে ‘দ্য ইমব্রয়ডার্ড পিলো’ গল্পের অনুবাদ । চীনা ভাষা থেকে গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ম্যারি চ্যান। ইংরেজিতে গল্পটি ১৯৭৫ সালের বসন্ত সংখ্যা ‘রেনডিশনস্’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় । চীনা ভাষায় মূল গল্পটি ১৯২৮ সালে প্রকাশিত ‘টেম্পল অফ ফ্লাওয়ার্স’ গল্পসংকলনে অন্তর্ভুক্ত । নারীবাদী এই গল্পটিতে লেখিকা তৎকালীন চীনের সামাজিক পরিবেশে মহিলাদের মানসিক যন্ত্রণার চিত্র অত্যন্ত সহজিয়া ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন ।

‘নকশি কুশন’ একটি নারীবাদী গল্প । এই গল্পটিতে লেখিকা লিং শুহুয়া তৎকালীন চীনের সামাজিক পরিবেশে মহিলাদের মানসিক যন্ত্রণার চিত্র অত্যন্ত সহজিয়া ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন ।




অনুবাদক ফজল হাসান


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন