বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

ইরানি গল্প : শরণার্থী

মূল: ফারজানেহ কারামপুর
অনুবাদ: ফজল হাসান

একসময় তারা সীমান্ত পেরিয়ে যায় । তারপর লোকটি মহিলার কাছে পৌঁছে এবং তাকে এক টুকরো রুটি দেয়। লোকটি সারাদিন মহিলার পাশে থেকে হেঁটেছে এবং তার দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেছে । ট্রাকের ভেতর এক কোণায় বসে সে এখন মহিলার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ।
মেঝে থেকে প্রসাব এবং মলের উৎকট গন্ধ ট্রাকের ভেতর বন্ধ হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে । ট্রাকের একপাশের ক্ষুদ্র ফুটো এবং উপরের দিকে সামান্য বড় আরেকটা ফুটো গলিয়ে হিমেল বাতাস প্রবেশ করে । প্রচন্ড ঠান্ডায় মহিলা পড়নের স্কার্ট টেনে খোলা পা ঢাকে। তার চোখেমুখে আতঙ্কের চিহ্ন ফুটে আছে । লোকটির চোখের তারায় বিদ্যুৎ ঝলক । সে মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় থাকে । চটজলদি সে মহিলার দৃষ্টি আকর্ষণ করে । মহিলা খানিকটা উষ্ণতা অনুভব করে । তার সারা শরীরের রন্ধ্রে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে যায় । সে টের পায় ক্রমশ: একটা হাত এগিয়ে এসে তার উরজ চেপে ধরেছে । স্বল্প সময়ের জন্য সে উরজে তীব্র ব্যথা অনুভব করে ।
মহিলা মাথার নীল ফিতা সামনের দিকে টেনে আনে । তারপর সে দু’হাতের তালু দিয়ে মুখ ঢেকে হাঁটুর মাঝে লুকানোর চেষ্টা করে । তার চোখের পাতা বন্ধ এবং সে আশা করে অন্যদের মতো যেন ঘুমাতে পারে । বাইরে হেলমেট পড়া সৈনিকদের দৌঁড়াদৌঁড়ির আওয়াজ শোনা যায় । পীচ ঢালা পথের উপর একই তালে তাদের বুটের শব্দ ভেসে আসে । সারা এলাকা জুড়ে সাইরেনের আর্তনাদ । রোদের উজ্জ্বল আলোয় বেয়োনেট চকচক করছে । বন্দুকের গোড়ার এক একটা প্রচন্ড আঘাতে এক একজনের শেষ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসছে । সৈনিকেরা বিভিন্ন ঘর থেকে মহিলা এবং বাচ্চাদের জবরদস্তি বের করে আনছে । তারপর মনুষ্যহীন ঘরে অগ্নি সংযোগ করে এবং আগুনে বাড়িঘর পুড়ে ছারখার হয়ে যায় । অনেকটা ভয়ঙ্কর মুখের মতো, ঘর থেকে পুরুষদের টেনে এনে গ্রাস করার ভঙ্গিতে প্রতিটি সরু গলির সামনে সৈনিকদের ট্রাক থেমে আছে । ওরা গীর্জার ফাদারকে মাটিতে ফেলে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসে । ফাদার চিৎকার করে কিছু একটা বলতে চেয়েছিল, কিন্ত তার কন্ঠস্বর চারপাশের তীব্র গর্জণের মাঝে হারিয়ে যায় ।

বুড়িমা বললো, ‘ঘরে আগুন লাগিয়ে দাও । ওদের জন্য শুধু ভষ্ম অবশিষ্ট থাকবে ।’
মা সদ্য ধোওয়া পর্দা, হাতে বোনা তার বিয়ের ঝলমলে পোশাক এবং ক্যানারীর খাচাঁর দিকে তাকালেন । অশ্রুতে তার চোখের জমিন ভরে যায় ।

দৌঁড়ানো তো দূরের কথা, নড়বড়ে পা নিয়ে বুড়িমার হাঁটতে খুবই অসুবিধা হচ্ছিল । মা নিজের আঙুল দিয়ে বুড়িমার হাত চেপে ধরেন । ভয়ার্ত এবং ফুঁপিয়ে কান্না চোখের লোকজন শূণ্যে তুলে তাকে ঢেউয়ের মতো বহন করে নিয়ে যায় ।

বুড়িমা গাড়ির ছাদের ছিদ্র দিয়ে শুধু আকাশের তারা দেখতে পারে । রাতের অন্ধকারে দূরের পাহাড় এবং সড়কের বাঁক গল্পের বিশাল দৈত্যের মতো মনে হয় । পাশের ঘুমন্ত মহিলার সঙ্গে তার টক্কর লাগে এবং বুড়িমার ভারী শরীরের অনুভূতি মহিলার চোখেমুখে ফুটে উঠে । প্রতিবার পুরুষ মানুষটির কড়া দৃষ্টি তার কাছে মনে হয় কেউ যেন তার মুখমন্ডলে আগুনের হল্কা ছড়িয়ে দিচ্ছে । লোকটি পুরু গোঁফে আঙুল বুলিয়ে একপলক হাসে ।

‘সবাই ঘুমোচ্ছে । তুমি কী ঘুমোতে পারো না ?’ শান্ত গলায় লোকটি জিজ্ঞাসা করে ।

মহিলা নেতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে দু’হাতের তালুর মধ্যে মুখ লুকায় । হঠাৎ গাড়ি চলতে শুরু করে এবং সে হুমড়ি খেয়ে সামনের ঘুমন্ত মহিলার উপর পড়ে । মহিলার ঘুম ভেঙে যায় । সে বাহুর মধ্যে শিশুকে শক্ত করে ধরে রাখে এবং বিড়বিড় করে কিছু বলে । শিশুটি দুগ্ধহীন মায়ের স্তন চোষে এবং চোখেমুখে পরিতৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে রাখে যেন সে সত্যি দুগ্ধ পান করতে পেরেছে । বাইরে ভীষণ ঠান্ডা বাতাস । কেউ ওভারকোট নিয়ে আসার সময় ও সুযোগ পায়নি । অনেকে পায়ে মোজা পড়ারও ফুরসৎ পায়নি । সে মহিলার ফুলে যাওয়া গোড়ালির গাঁটের দিকে তাকায় । স্কার্টের ফাঁক গলিয়ে গোড়ালির গাঁট বেরিয়ে আছে । প্রচন্ড ঠান্ডায় মহিলার গোড়ালি ফেটে গেছে এবং ক্ষত জায়গার চারপাশে রক্ত ও ধূলাবালি জমে আছে ।

রাস্তার একপাশে গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভার নেমে পড়ে । সবাই ঘুমজড়ানো ঢুলুঢুলু চোখে তার দিকে তাকায় । সবার উদ্দেশ্য করে ড্রাইভার কুর্দিশ ভাষায় বললো যে, তাকে বাম দিকে মোড় নিতে হবে এবং সেখান থেকে সবাই পায়ে হেঁটে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে যেতে পারবে ।

লোকজন অনেক কষ্টে অবসন্ন পায়ের উপর ভর করে উঠে দাঁড়ায় এবং কোন কথা না বলে এক এক করে ট্রাক থেকে নেমে যায় । লাফ দিয়ে নিচে নামার সময় লোকটি মহিলার কোমড় ধরে এবং হাতের কব্জি ঘুরিয়ে আলতো করে তাকে নামায় । লোকটির নিঃশ্বাসে পোড়া সিগারেটের দূর্গন্ধ । গরমে সে ঘেমে গিয়েছে । মহিলা রীতিমত কাঁপতে থাকে এবং পড়নের কাপড় দিয়ে নিজেকে ঢাকতে চাইছে । আশেপাশে থেকে ঝর্ণার শব্দ ভেসে আসে । তারা রাস্তা পাড় হয় । সরু খাল এবং পপলার গাছ অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে আছে । ঘুম চোখে এক বয়স্ক লোক সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেয় । মহিলার পায়ের ফোসকা ভীষণ জ্বালাপোড়া করছে । সে পায়ের মোজা খোলে এবং ঠান্ডা হওয়া সত্ত্বেও পানির মধ্যে পা ডুবিয়ে রাখে । তার পায়ের আঙুল বরফের মতো জমে যায় । সে অনুভব করে একটা হিমশীতল স্রোত তার সারা পায়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে । ভীষণ ক্ষুধায় তার পেট মোচড় দিয়ে উঠে এবং মাথা ঝিমঝিম করে । সে জুতা জোড়া বগলের নিচে চেপে ধরে এবং শক্ত করে শরীরের সঙ্গে কাপড় বাঁধে ।

ইতিমধ্যে যেসব শিশুরা জেগে গেছে, খাবার এবং উষ্ণতার কথা ভেবে ওরা ঘ্যানঘ্যান করে কাঁদছে । ঘাস এবং গাছের পাতার ফাঁক গলিয়ে দূরন্ত হাওয়া শোঁ শোঁ শব্দ করে বয়ে যাচ্ছে । ভয়ার্ত লোকজনের বিড়বিড় করে কথা বলার মতো শব্দ মনে হয় । গাছের ফাঁকফোকড় গলিয়ে আসা চাঁদের আলোয় প্লাবিত রূপালি সড়কের দিকে সে তাকিয়ে থাকে । তার মনে হয় কেউ যেন ঘাড়ের উপর গরম নিঃশ্বাস ছাড়ছে এবং সে উষ্ণতা অনুভব করে ।

খুব ভোরে শরণার্থীরা সেনাবাহিনীর ঘাঁটির দিকে হাঁটতে শুরু করে । ভয়ার্ত দৃষ্টি মেলে তারা ভীষণ নিস্তব্ধতার মধ্যে হাঁটে । রাস্তার উপর পড়ে থাকা নুড়ি পাথরের উপর পা পড়লে ব্যথায় তারা কঁকিয়ে উঠে । ঠান্ডা বাতাসে এক বুড়ো অনবরত কাশতে থাকে । তখনও ছোট ছেলেমেয়েরা গভীর ঘুমে নিমগ্ন । ওদের ঘুমন্ত মাথা মায়েদের ঘাড়ের উপর ঝুলে আছে । রাস্তার বাঁকে এক তরুণ ঘুরে দাঁড়ায় এবং শেষ বারের মতো পেছন ফিরে তাকায় । গাছের পেছনে এবং দূরের গমের ক্ষেতের পরে কন্টকাকীর্ণ ঝোঁপের মাঝে বাতাসে এক টুকরো নীল কাপড় যেন নাচের ভঙ্গিতে দুলছে । তখনও মাঠের মধ্যে মেয়েটির পড়নের স্কার্টের লাল রঙ দূর থেকে দৃশ্যমান ।
খক পরিচিতি: ইরানের সমকালীন নারী ছোটগল্প লেখকদের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী লেখিকা ফারজানেহ্ কারামপুর । তাঁর জন্ম ১৯৫৪ সালে । তিনি ইরান ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিগ্রী অর্জণ করনে । তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে লেখালেখিকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন । এ পর্য্যন্ত তাঁর তিনটি ছোটগল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে । এগুলো হলো: ‘দ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্লটার হাউজ’ (১৯৯৭), ‘দ্য নাইটলি ফিস্ট’ (১৯৯৯) এবং ‘টাইফুন আন্ডার দ্য স্কিন’ (২০০১) । তাঁর একমাত্র উপন্যাস (‘ইনভাইটেশন বাই রেজিস্টার্ড মেইল’) প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালে । ‘দ্য ফরেইন ক্যাম্প’ গল্পের জন্য তিনি ‘এসোসিয়েশন অফ দ্য লিটারেচার অফ এক্সপ্যানশন’ পুরস্কার লাভ করেন । এছাড়া ‘টাইফুন আন্ডার দ্য স্কিন’ ছোটগল্প সংকলনের জন্য তিনি ‘ইয়ালদা’ পুরস্কার অর্জণ করেন । সাহিত্য রচনা ছাড়া ছবি আঁকা তাঁর অন্যতম সখ ।

গল্পসূত্র: ‘শরণার্থী’ গল্পটি ফারজানেহ্ কারামপুরের ইংরেজিতে ‘রিফিউজি’ গল্পের অনুবাদ । গল্পটি মোহাম্মদ মেহদি খোররামি এবং শৌলে ভাতানাবাদি অনূদিত এবং সম্পাদিত ‘এ ফীস্ট ইন দ্য মিরর: স্টোরিজ ফ্রম কন্টেম্পোরারী ইরানিয়ান উইম্যান’ ছোটগল্প সংকলন থেকে নেওয়া হয়েছে ।

ফারজানেহ্ কারামপুরের ‘শরণার্থী’ গল্পটিতে যুদ্ধের কারণে বাধ্য হয়ে একজন নারীর দেশান্তরী হওয়ার কঠিন অভিজ্ঞতার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে ।






অনুবাদক
ফজল হাসান

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন