শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

মেড়ামেড়ীর ঘর || মণীন্দ্র গুপ্ত

ছেলেবেলা থেকে অতি ছোট, একলার মতো, নিভৃত কুটির বানাবার ঝোঁক ছিল আমার। ঘর কত ছোট আর হালকাপলকা হতে পারে আমি তার অনেকরকম নকশা ভাবতাম। স্টিমারের সারেঙের কেবিন, ক্যাপ্টেন স্কটের জাহাজের খুপরিটি, ঢাকনা-খোলা কফিন, এক-তাতামির জাপানী কুঁড়ে, পানের দোকানের নিচে বিড়ি বাঁধার ঘর, গ্রামের ঘরের ভিতে হাঁসের খোঁয়াড়, সাধুর গুহা, নীলগিরির টোডাদের কুটির — ছোট নির্জন ঘরের কত বিচিত্র সম্ভাবনা।

এই-রকম ঘরে আমার প্রথম গৃহপ্রবেশ হলো এক নীরব দুপুরে — বারবাড়ির তক্তপোশটির নিচে মেঝের উপর একটি মাদুর আর একটি বালিশ আর চার-পাঁচখানা গল্পের বই নিয়ে সেই ঘর। অতি শান্তির নীড় — গ্রীষ্মের ছুটির দুপুরে ঠাণ্ডা, পরিচ্ছন্ন। চিৎ হয়ে শুলে মাত্র দেড়হাত উপরে তক্তপোশের কাঠের পাটাতন অর্থাৎ আমার বাড়ির সিলিং। বারবাড়ির ঘরে ঢুকেও কেউ টের পাবে না যে আমি ওখানে আছি। শান্ত জানলা-গলে-আসা আলোয় শুয়ে শুয়ে ‘চারু ও হারু’ পড়ছি।

এটা যদি গ্রীষ্মাবাস হয় তো শীতের অস্থায়ী আস্তানাটি ছিল মায়ের গর্ভের মতো নরম এবং উষ্ণ। শীতের রোদে-ভেসে-যাওয়া বারান্দার রেলিঙে সারাদুপুর লেপ মেলে দেওয়া হতো তপ্ত হবার জন্যে। দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পরে আমি বড় লেপটাকে তাঁবুর মতো করে তার ভাঁজের মধ্যে ঢুকে যেতাম। সঙ্গে থাকত গোটাছয়েক কমলালেবু। সেই লেবুগুলো একটা একটা করে খেয়ে ঘণ্টাদুয়েক পার করে যখন উঠতাম তখন আরামের চূড়ান্ত হয়ে গেছে।

আমাদের ঐ অঞ্চলে ছেলেদের একটা চমৎকার উৎসব ছিল মেড়ামেড়ীর ঘর। পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন ছেলেরা দলে দলে ভাগ হয়ে মেড়ামেড়ীর ঘর তৈরি করত। নদীর ওপারের গাঁ থেকে খড় আর মুলিবাঁশ আনা হতো। মাঠ এবং ফাঁকা জায়গার তো অভাব নেই। অতএব এক-একটা দলের এক-একটা আলাদা ঘর। বাঁশের খুঁটি, বাঁশের আড়া, খড়ের চাল আর বেড়া। মাটিতে পুরু করে খড় বিছিয়ে গদি করা হয়েছে। খড়ের নিজস্ব ওম আছে। সারারাত পৌষের ঠাণ্ডায় নক্ষত্র থেকে, দূরের পাহাড়শিখর থেকে, গাছের মগডাল থেকে ঐ নতুন হলদে খড়ের বাড়িগুলোর উপর হিম ঝরছে। কিন্তু ভিতরে আমাদের ঠাণ্ডা লাগে না।

রাত্রে ঐ মেড়ামেড়ীর ঘরের বাইরে হাওয়া আড়াল করে মাটিতে উনুন পেতে বা স্টোভে রান্না হবে। খিচুড়ি ডিমভাজা বা ভাত-মাংস। সেজন্যে চাঁদা তোলা হয়েছে। গভীর রাত্রে বারবার চা এবং লেড়ো বিস্কুট। সারারাত ছেলেরা ঘুমোয় না। নিজেদের ঘর থেকে চাদরমুড়ি দিয়ে অন্য দলের ঘরে আড্ডা দিতে যায়। বাড়িতে যারা লেপের নিচে বিছানায় শুয়ে আছে তারা মাঝেমাঝেই ঘুম ভেঙে ছেলেদের হুল্লোড় শুনতে পায়। সারারাত হিম পড়ে, লক্ষ্মীপেঁচা আর বাদুড় ওড়ে, পুবের তারারা পশ্চিমে চলে যায়। বড় ছেলেরা লণ্ঠন জ্বালিয়ে ঐ খড়ের ঘরে তাস খেলে। ছোটরা চাদর পেতে ঘুমিয়ে পড়ে।

ভোরে উঠে ছেলেরা শীতের হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে বরাকের জলে স্নান করে এসেই ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। খড়ের ঘর মুহূর্তেই দপ করে জ্বলে ওঠে — তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে সবাই আগুন পোহায়। মাঠে পর পর এখানে-ওখানে খড়ের ঘরে আগুন লাগে, আর ছেলেরা গুনতে থাকে কাদের ঘরে বাঁশের গাঁট ফেটে কটা শব্দ হলো। কান করে শুনলে আগুন চলারও একটা স্রোত চলার মতো সোঁ সোঁ, ঝরঝর, কলকল শব্দ আছে।

রাতের বাসাকে পুরো ছাই করে ছেলেরা এরপর বাড়ি ফেরে। সেখানে মা পিসি-মাসিরা তাদের জন্য পৌষের পিঠে বানিয়ে রেখেছে।

মেড়ামেড়ী মানে কি? শব্দ দুটো কোথা থেকে এসেছে? হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর ‘বেনের মেয়ে’ বইয়ে মেড়া সম্বন্ধে লিখেছেন, — “শীত হইল মেড়া অসুর, তাহাকে আগের দিন মারিয়া পোড়াইবার পরের দিন [দোল] উৎসব। মাঠে মাঠে সারি সারি মেড়া অসুর সাজানো আছে, বাঁশের উপর খড়জড়ান একটা বিকট মূর্তি। … সন্ধ্যাটি হইল, আর ছেলেরা উন্মত্ত হইয়া মেড়ায় আগুন লাগাইতে লাগিল। কতকগুলো ছোট ছোট ঝোপড়ার মত ঘর ছিল, তাহাতেও আগুন লাগাইয়া দিল, আগুন ধূ ধূ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। তাহারা নাচিতে লাগিল, গাইতে লাগিল ও হাততালি দিতে লাগিল, আর কত রকম বাঁদরামী করিতে লাগিল, তাহা আর লিখিয়া কাজ নাই। চতুর্দশীর চাঁদ উঠিল, আগুন তখনও নিভে নাই। তাহারা চারিদিকে একবার চাহিল, একটা হল্লা করিয়া উঠিল, তাহার পর যে যাহার ঘরে গেল।” হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেছেন দোলের আগের সন্ধ্যার কথা, আমি বলছি তার দু মাস আগেকার পৌষ সংক্রান্তির আগের রাত্রির কথা।

কিন্তু বয়ঃসন্ধির কালে কোনো কোনো ছেলের ভাগ্যে এই আনন্দ-উৎসবের রাতও করুণ হয়ে আসে। প্রথম যেবার আমি দলে মিশে মেড়ামেড়ীর ঘরে রাত কাটাব স্থির করলাম, মাসিমা বাধা দিলো। এই হুল্লোড়, এই লাগামছাড়া রাতের মধ্যে তুমি যাবে না। আমিও যাবই। শেষে রফা হলো — আমি বাড়ির মধ্যেই শুকনো লতাপাতা দিয়ে একটা ঘর বানাব, সে-ঘরে রাতের খাবার এনে খেতে পারব, কিন্তু পরদিন ভোরে তাতে আগুন দিতে পারব না।

একা একা তো এই আনন্দ হয় না, অতএব মাসিমাই বলল অঙ্কুর আর তার বোন অলিকে নেমন্তন্ন করতে। আমার সমবয়সী সহপাঠী অঙ্কুর কোনো হুজ্জতে থাকে না, সভ্য, নরম, মাসিমার খুব পছন্দের ছেলে। আর ওরা যখন খাবে তখন লুচি-মাংসই হোক।

আমি ভাঁড়ার ঘরের পিছনে কাঁটাল গাছ ও তেলাকুচো লতায় ছায়া করা একটা সরু নিঃসঙ্গ জায়গা বেছে নিলাম। ডোবার পাড় থেকে শুকনো কলাপাতা টেনে টেনে ছিঁড়ে আনলাম। সারাদিন ধরে খেটে সেই ছায়ায় একটা ঘর বানালাম। তাতে তিনজন বেশ বসতে পারব। ঘরের মধ্যে শুকনো কলাপাতার হালকা বুনো গন্ধ। এখন আমি একাই সেখানে একটু বসে থাকি। শুধু একটা তেলাকুচো লতার আড়াল, তবু সংসারের বাইরের ঠাণ্ডা ছায়া এখানে অনুভব করি।

অঙ্কুর আর অলি সন্ধ্যের একটু আগে এল। মেড়ামেড়ীর ঘরের নিয়ম মেনে আজ রাত্রে ওরা এখানেই থাকবে। আমি এতেই কৃতজ্ঞ। রাত্রে প্লেটে বাটিতে করে খাবার এল — লণ্ঠনের আলোয় ছেঁড়া কলাপাতার কুটিরে মাংস-লুচি। কিন্তু আমার সারাদিনের আশা এবং পরিশ্রম যেন ব্যর্থ। রাত নটা/সাড়ে-নটা পর্যন্ত সহ্য করে মাসিমা আমাদের শুতে যেতে বলল। আমাদের শোবার ব্যবস্থা হয়েছে বারবাড়ির ঘরে। চমৎকার গরম ধবধবে বিছানা। পরপর অঙ্কুর আমি মাসিমা আর অলি। অঙ্কুর জুতো-মোজা গরম জামা খুলে লেপের মধ্যে ঢুকে গেল। আর সারারাত নির্ঘুম থাকার মতো ক্ষমতা আর উত্তেজনা আমার ভিতরে যেন চার্জ করা রয়েছে। আমি কী করে তার সুইচ অফ করি!

মাসিমা খেতে গেছে। অলি ভিজে তোয়ালে দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে তার লম্বা চুল খুলল, চিরুনি চালিয়ে অনেকক্ষণ ধরে আঁচড়ে ফিতে বেঁধে একটা বিনুনি করে ফেলল। মুখে শীতের ক্রিম মাখল। তার কানের সোনার রিং দুটো এবার ঝিকমিক করছে। গরম জামা স্কার্টের নিচে তার সাদা হালকা টেপ ফ্রক। সে আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বিছানার একধারে লেপের ভাঁজ খুলে শুয়ে পড়ল। আমি বসে রইলাম — আমি মেড়ামেড়ীর ঘরের কথা, আজকের দিনের আশা-নিরাশার কথা ভুলে গেলাম। মনের মধ্যে একটা অবুঝ ব্যথা, অস্থির ব্যথা — জলের উপরে কালির ফোঁটা ফেললে যেমন হয় তেমনি — হাত-পা দশআঙুল মেলে ছড়িয়ে যেতে লাগল। মাঝখানে মাসিমার জন্য জায়গা রেখে আমি শুয়ে পড়লাম। শরীর চিৎ হয়ে কাঠের মতো পড়ে আছে। মন কেবলই চলে যায় ঐ মেয়ের দিকে, তার হালকা বালিকা শরীরের দিকে, তার কোল্ড ক্রিমের গন্ধের দিকে। আমি যদি হাত বাড়িয়ে দিই, অথবা গড়িয়ে চলে যাই ওর কাছে, কী হবে? কী হবে? কী হবে? কিন্তু আমি চিৎ হয়ে শুয়ে রইলাম, চোখের পাতা অপলক খোলা, শুকনো গলায় ঢোক গেলার শব্দটুকু পর্যন্ত নেই। ওপাশে মেয়েটি রাতের ফুলের মতো নিশ্বাস ছড়িয়ে দিচ্ছে, সুগন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। মাসিমা তার ঠাণ্ডা হাত পা নিয়ে শুতে এল, হাত ঘষাঘষি করল। আমি নিশ্চল। নিশ্চল থেকে থেকে ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু আড়াইটে-তিনটের সময় ঘুম আচমকা ভেঙে গেল। মাসিমা লেপমুড়ি দিয়ে ঘুমোয়। আমি দুটো নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ঘর অন্ধকার। এইভাবে শুয়ে থাকা অসম্ভব। আমি নিঃশব্দে উঠে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাইরে আসা মাত্র স্নেহময় জগৎ আমাকে জড়িয়ে ধরল। গুরুপদদা আমাকে তারা দেখতে শিখিয়েছিল। উপরে তাকিয়ে দেখি, সিংহরাশি শেষ পৌষের মধ্য আকাশ ছড়িয়ে গেছে, মিথুন আর লুব্ধক হেলে পড়েছে, কৃত্তিকা অস্ত যাচ্ছে। দূরে, অল্প দূরে ছেলেদের খড়ের ঘরগুলো, তাদের লণ্ঠনের আলো, হৈ হুল্লোড়, শীতের কুকুরের ডাক। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। ঐ বিছানায় ফিরে যেতে কেন জানি না অপমান লাগছে।

এত দিনের পরে আজ আর কিছুরই কোনো চিহ্ন নেই, শুধু মনে-পড়াটি আছে — একতরফা মনে-পড়া, এত খুঁটিনাটি মনে-পড়া, লিখতে লিখতে খুঁচিয়ে তুলেছি বলে মনে-পড়া।

এর পরের বছর থেকে মাসিমা আর আমাকে আটকাতে পারে নি। আমি সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে মিলে মণিপুরীদের গ্রাম থেকে খড় এনেছি, পুকুরের কাছাকাছি মাঠে দশবারোজন হেঁটেচলে বেড়াবার মতো ঘর বানিয়েছি — সারারাত বাড়ি ফিরি নি।


[লেখকের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘অক্ষয় মালবেরি’ থেকে একটা চ্যাপ্টার সংকলিত হয়েছে এখানে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন