শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

নাহিদা আশরাফী'র গল্প : তালেব বুড়ার বিজয় দর্শন

কুয়াশা যখন হালকা সরে যেতে থাকে শর্ষে ক্ষেতগুলোকে অই সময়ে লেপ-কাঁথা ঠেলে বেড়িয়ে আসা কিশোরী মেয়ের মুখের মতো লাগে। আলপথ দিয়ে হেটে যেতে যেতে তালেব বুড়ার চোখে ভরপেট খাবারের পর ঢেকুর তোলার তৃপ্তি লেগে আছে।
অথচ গত দু'দিন জাউভাত ছাড়া কিছুই মুখে দেয়নি সে। শহরে যাবার পূর্ব প্রস্তুতি আর কি। খুব বিপদে না পড়লে শহরের ছায়া মাড়ায় না সে। গ্রামের একেবারে কোনার দিকে যে করাত কল আছে একমাত্র সেই করাতকলের সাথেই শহরের তুলনা করে সে। এই দুই জায়গাতেই তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে,গলা শুকিয়ে যায়। কোন কিছু খেতে পারে না,ঘুমুতে পারে না। মাথা ঘুরতে থাকে। অবশেষে বমি করে ভাসায় সব। শহর মানেই এক আতঙ্ক তালেব বুড়ার কাছে। তার মধ্যে বুড়ির এই উৎপাত। বুড়ির সাথে উপরে উপরে চটলেও মনে মনে খুশীই হয়েছে সে। কতদিন পর শহরে ছেলের কাছে যাচ্ছে। হাতের বোচকাগুলো দুই হাতে সামলানো বেশ মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। পাকান পিঠা,খেজুরগুড়, শশার মোরব্বা,বেগুনের আচার, হাঁস ভুনা,দুধে ভেজানো চিতই পিঠা, ডাল ভাজা আরও যে কি সব। তবু এত কিছু ঝঞ্ঝাট আর আতঙ্ক ছাপিয়েও এবারের শহর যাত্রা তার কাছে এক অন্যরকম আনন্দের।

ছেলেটা লেখাপড়া শেষ করে কোথাও চাকরী না পাওয়া অবধি একটা দুশ্চিন্তা কাজ করছিলো মাথায়। কিছুদিন ধরেই বেশ দুর্ভাবনায় ছিলো। এই বর্ষার আগে ছেলেটার চাকরী না হলে ধারকর্জে পা বাড়াতে হতো। বিষয়টা তালেব বুড়ার জন্যে কষ্টের আর অপমানের। এক আধপেটা খেলেও ধারকর্জে নামেনি কখনও। বুড়ো-বুড়ি একমাত্র ছেলের লেখাপড়ার খরচ জুগিয়ে পারলে তিনবেলা খেয়েছে। না পারলে একবেলা খেয়ে থেকেছে। তবু এ বাড়ির সুনাম নষ্ট হতে দেয়নি। গতমাসে তাই ছেলের চাকরী পাবার চিঠিটা পেয়ে অনেকটা হালকা হয়েছে সে।

তিন ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট তালেব বুড়া। সবচেয়ে বড় ভাই একজন ভাষা সৈনিক। মুক্তিযুদ্ধে দু পা হারিয়েও জীবন সংগ্রামে দমে যাননি। একদিনের জন্যেও কারো করুণার পাত্র হননি। দুই হাতে ভর দিয়ে কাজ করেছেন,বাগান করেছেন,মাছ চাষ করেছেন,হাস মুরগি পেলেছেন। ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার কতবার বলেছে," মাসুদ মিয়া একবার আইসা চেয়ারম্যান সাবরে কও। তুমি আসলেই তোমার মুক্তিযোদ্ধা ভাতার ব্যবস্থাডা হইয়া যাইতো।" বড় ভাই হেসে উত্তর দিতো, "দুইখান মাত্র পা-ই তো গেছে এই দেশের জন্যে। পঙ্গু তো শরীরে হইছি। মনের দিক দিয়া পুরাই ঠিক আছি। যেদিন মনের দিক দিয়া পঙ্গু হমু সেদিন যামুনে। আর আমার লাগবো না, আমার ভাতাডা অন্য কাউরে দেন, যার কোন গতি নাই।" বিরাশি বছর বয়সে সংগ্রামী এই বীর সৈনিক একদিনের জন্যেও কারো উপর নির্ভরশীল না হয়ে হাসতে হাসতে পরপারে চলে গেলেন। মেজোভাই মিজান মুক্তিযুদ্ধেই শহীদ হন। 

যুদ্ধকালীন তালেব বুড়ার বয়স মাত্র চৌদ্দ। যুদ্ধে তার কাজ ছিলো বাড়িতে রাখা অস্ত্র,গোলাবারুদ, চিঠি মুক্তিবাহিনীর হাতে পৌঁছে দেয়া। মায়ের রান্না করা ভাত তরকারী থেকে শুরু করে পাকবাহিনীর ভিতরকার সব খবরাখবর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সরবরাহের কাজ ছিলো তার। এক সময় তাদের বাড়িটার নামই হয়ে যায় মুক্তি বাড়ি। আজও তাদের গ্রাম ছাড়িয়ে আরও দু'দশ গ্রামে এই নামেই তাদের বাড়ি পরিচিত। 

এই বাড়ির ছেলে হয়ে সাহায্যের জন্যে কারো কাছে হাত পাতবে এটা কিছুতেই মেনে নেয়া সম্ভব নয় তার পক্ষে। তাই একরকম আতংক আর অস্থিরতায় দিন কাটছিলো তালেব বুড়ার। বর্ষা আসার আগে চাকরীটা না পেলে তার আশাভরসা টুকুও বর্ষার জলে ধুয়ে যেত। ভাগ্যিস আষাঢ়ের আগেই ছেলেটা সুসংবাদ দিলো। গত সপ্তহেই ছেলেটার পোস্টিং হয়েছে ঢাকায়।আনন্দে আত্মহারা ছেলের মা তাই অনেকটা জোর করেই তাকে ঢাকা পাঠাচ্ছে। তার ঢাকা আগমনের কথা অবশ্য ছেলেকে ইচ্ছে করেই জানায়নি তালেব বুড়া। ছেলের হাতে খাবার দিয়ে রাতটুকু থেকে সকালেই আবার ফিরে আসবে । রাতটুকু থাকার একটাই কারন। দুটো বিষয়ে ছেলেকে বলা।এক- পুলিশের এই চাকরীটা সে যেন সততার সাথে করে। ছেলের তো কোন পিছুটান নেই। নেই কোন দায়ভারও। ছোট ভাইবোন টানতে হবে না। দরকার হলে মা-বাবাকেও সহযোগিতা করবে না। গ্রামে যা আছে তা দিয়ে দুই বুড়ো বুড়ির চলে যাবে। কিচ্ছু দিতে হবে না তাদের। তবু সে যেন সৎ পথে থেকে দেশের সেবা করে। এই পোষাক গায়ে তোলার আগে যে শপথ বাক্য পাঠ করেছে তার মর্যাদা যেন এতটুকু মলিন না হয়। প্রয়োজনে ছেলের হাত ধরে অনুরোধ করবে। সে কোন বাড়ির সন্তান সেটা যেন তার মাথায় থাকে। 

ছেলেকে আর একটা অনুরোধ করবে বলে ভেবে রেখেছে। পাশের বাড়ির মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু মতিন মিয়ার মেয়েটাকে সে যেন বিয়ে করে। মতিন মিয়ার স্ত্রী বিয়োগ ঘটেছে কন্যার জন্ম দিতে গিয়ে। বড় ছেলে মারা গেল গত বছর। বোনটাকে উত্যক্ত করতো পাড়ার কিছু বখাটে। প্রতিবাদের পুরষ্কার পেল ছেলেটা নিজের জীবন দিয়ে। তাতেও কি মেয়েটা রক্ষা পেল? ছেলের মৃত্যু আর মেয়ের বেইজ্জতি সইতে না পেরে ভারসাম্যহীন হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয় মতিন মিয়া। একা অসহায় মেয়েটা ভিটেমাটি ছেড়ে পাশের গ্রামে মামার বাড়ি চলে যায়। এখন সেই ভিটেমাটি দখলের পায়তারা চলছে। মেয়েটি যদিও ও'র সমবয়সী তবু রুপে গুনে অনন্যা। তাছাড়া এই একটি পরিবারের কাছেই এ বাড়ির অনেক ঋণ। সে ঋন টাকা- পয়সার নয় ভালোবাসার, কৃতজ্ঞতার,সহমর্মিতার। ছেলেকে বলবে মেয়েটাকে যেন বিয়ে করে। এতে মেয়েটাও নিজেদের কাছে রইলো,বাপের ভিটেটাও ফেরৎ পেল আর তালেব বুড়াও কিছুটা ঋণমুক্ত হলো। তালেব বুড়াকে বাঁচাতে গিয়েই না ডান পা'টা হারিয়েছিলো মতিন মিয়া।

বাস থামতেই আরেক প্রস্থ মেজাজ খারাপ হয় তালেব বুড়ার। এত কিছু সামলে নামতে গিয়ে অল্পের জন্যে চিতই পিঠার হাড়িটা পড়ে যায়নি। সব সামলে বাস থেকে নেমে একটা বেবিট্যাক্সি নেবার কথাই ভাবে। টাকা একটু বেশি লাগবে। তা লাগুক। রোজ রোজ তো আর সে শহরে আসছে না। তাছাড়া বুড়ি এত কষ্ট করে এসব বানিয়েছে। কোনটা নষ্ট হলে বুড়ির চেয়ে কোন অংশেই কষ্ট কম হবে না তার। তাই লোকাল বাসের চিন্তা বাদ দিয়ে একটা বেবিট্যাক্সি থামাতে হবে। শহরের এত হুটোপাটা দেখলেই মাথা ঘোরে তার। কেমন দিকভ্রান্ত লাগে নিজেরে ।হাতের বোচকা বুচকি গুছিয়ে একটা বেবিট্যাক্সি থামানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে সে।

হলোটা কি এই শহরের? খালি বেবিগুলো হাত ইশারায় ডাকলেও সারা পাচ্ছে না। ডাকতে ডাকতে গলা ব্যথা হয়ে গেল। উল্টো চালকেরা ইশারায় কি একটা বোঝাতে চাইলো। ওদের এইসব ইঙ্গিত কিছুই বুঝছে না সে। হচ্ছেটা কি? এদিকে খাবারের মৌ মৌ গন্ধে বেশ কিছু পথশিশু,ভিখিরি আর কিছু বেওয়ারিশ কুকুর তার চারপাশে ভীর জমাচ্ছে। মহা মুসিবত। এখন এই বোচকা বুচকি নিয়ে কি করে হাটবে সে। এগুলো সাথে না থাকলে বাসস্ট্যান্ড এর বাইরে গিয়ে কিছু একটা চেষ্টা করা যেত। এখন মনে হচ্ছে ছেলেকে জানিয়ে এলেই ভালো করত।এত ঝঞ্জাট পোয়াতে হত না। নাহ একটা বিহিত করতে হবে। আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। তাকে ঘিরে জটলা ক্রমেই বাড়ছে। ক্ষুধার্ত পথশিশুদের দেখে সে নিজেও ঠিক থাকতে পারছে না। বোচকা বুচকি খুলে ওদের এখানে বসিয়ে খাওয়ালে তালেব বুড়া স্বস্তি পেত। কিন্তু পরক্ষনেই ছেলের কথা ভেবে, ছেলের মায়ের কথা ভেবে এ চিন্তা থেকে পিছিয়ে যায়। অনেকটা সামনে পরেই তাই একটা বেবিট্যাক্সি দাড় করালো।

- চাচামিয়া মরবার শখ হইছে? মরবার চাইলে ট্রাক বা বাসের সামনে গিয়া খাড়ান।আমার এই ছোট্ট বেবিটার সামনে খাড়াইলেন ক্যালা?
- বাবা আমার কতাখান একটু শোনেন। অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া আছি বাবা। একটা বেবি থামাইতে পারি নাই। এত মালসামানা নিয়া নড়তেও পারতেছি না। তাই বাধ্য হইয়া সামনে পইড়া আপ্নেরে দাড় করাইলাম। মনে কিছু নিয়েন না বাবা। বাবাজি আপ্নে আমারে একটু কষ্ট কইরা উত্তর শাহজাহানপুর নামায়া দিয়া আসতে পারবেন? বাস থিকা নাইমা অনেক সময় ধইরা দাঁড়াইয়া থাকতে থাকতে আমি অসুস্থ হয়া পড়তেছি বাজান। এইটুক উপকার করেন।
সম্ভবত তালেব বুড়ার কথায় বেবিওয়ালার মনেও মায়া হলো। তাই আর শুরুর মেজাজ না দেখিয়ে গলার স্বর কিছুটা নরম করে বল্লো, "চাচামিয়া, কি করুম কন? শালা ..... ।এগো লাইগা যাত্রী নিয়া বাসস্ট্যান্ডের ভিতর দিয়া বাইর হইতে পারি না। যাত্রীসহ যাইতে দেখলেই হালার পুতেগো মাথা গরম হইয়া যায়। কমসে কম পঞ্চাশ ট্যাকার নিচে ছাড়বো না। এই জন্যে কোন বেবিওয়ালাই বাসস্ট্যান্ডের ভিতর থিকা যাত্রী লইবার চায় না। আপ্নে কাকা কষ্ট কইরা মাল সামানা নিয়া বাসস্ট্যান্ডের বাইরে যান। অইখান থিকা তুইল্লা নিমু।
-ওহ! সবাই তাইলে ইশারা কইরা তাই বুঝাইবার চাইছে। আমিই বুঝবার পারি নাই। কিন্তু এইডা তো অন্যায়। আপ্নেরা বাবা সার্জেন্টগো সাহায্য নেন।
- হা... হা...হা ।কাকা আপ্নে পুরাই দেশি মাল। বুঝছি নতুন আইছেন শহরে। চাচা ট্যাকা তো হ্যারাই লয়। শিয়ালের কাছে মুরগী বন্ধক দিতে কইলেন? বলেই আর এক প্রস্থ ঠা ঠা করে হাসলো বেবিট্যাক্সি চালক।
লজ্জায় তালেব বুড়ার মাথা নুয়ে এলো। বেবিওয়ালার দেয়া গালিগুলো মনে হয় তাকেই বিদ্ধ করেছে। ছেলেকে যে করেই হোক বোঝাতে হবে এমন কাজ সে যেন মরে গেলেও না করে, মনে মনে ভাবে তালেব বুড়া। তার নিশ্চিত বিশ্বাস ছেলে তার যে বাড়ির সন্তান সেই বাড়ির সম্মানের বিষয়টা সে মাথায় রাখবে।

- বাবাজি আমার হাত-পা আর চলতেছে না। আর দেখেন কত মাল সামানা। এইগুলা টাইনা ক্যাম্নে যাই? কিছু কি করন যায় না বাবা?
বেবিওয়ালার সম্ভবত দয়া হলো।
- চাচামিয়া ফালাইলেন বিপদে। কি আর করা, চলেন। এগো তো দয়া মায়া নাই। যাত্রী দেখলেই টাকা দিতে হইবো। টাকা না দিয়া পার পাওন যাইবো না। বেশি ক্যাচাল করতে গেলেই দিবো কেস বসাইয়া। আর আপ্নেও চাচামিয়া এই অসুস্থ শরীর নিয়া একা একা ঢাকা আসনের দরকার কি? তাও এত্ত বোঝা বইয়া। যাউজ্ঞা উঠেন। মায়া বড় খারাপ জিনিস। যার থাকবো বিপদে হেই পড়বো। যার নাই, তার বিপদও নাই। উঠেন চাচামিয়া। আল্লাহ ভরসা।

যেন অথই সাগরে কূল পেল তালেব বুড়া। বোচকাবুচকি নিয়ে উঠে পরলো বেবিতে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো বটে কিন্তু বাইরের দিকে তাকিয়ে মনটা হুহু করে উঠলো। সে চোখ ফিরিয়ে নিলো । অসহায় দৃষ্টি এমনিতেই তাকে খুব বিদ্ধ করে। প্রানপণে সে চাইছে বেবিট্যাক্সিটা তাড়াতাড়ি চলুক। ক্ষুধার্ত আর অসহায় মুখগুলো থেকে দ্রুত পালানোর চেষ্টা একরকম। তবু বুকের ভেতরটা চিনচিন করতে লাগলো ওদের জন্যে। ঢাকা শহরে এত মানুষ এমন ভয়াবহ জীবনযাপন করে আর সে তার ছেলের জন্যে এত রকমারি খাবার নিয়ে এসেছে। এই চিন্তা তার ভেতরে এক অপরাধবোধ তৈরি করে। হঠাৎ ব্রেক কষায় তালেব বুড়া শুধু নয় তার চিন্তাও ধাক্কা খেল।

- চাচামিয়া বহেন। খাটাস গুলারে ঠান্ডা কইরা আহি। নইলে তো যাইবার পারুম না।
চালক কিছু কাগজপত্র নিয়ে নেমে যেতেই তালেব বুড়া বেবির জানালা দিয়ে দেখার চেষ্টা করলো। দুজন ট্রাফিক পুলিশ তার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়ানো। বেবিওয়ালা খুব অনুনয় বিনয় করে দেন দরবার করছে- বিষয়টা সুস্পষ্ট। আহারে মায়া লাগছে চালকের জন্য। তার অনুরোধ রাখতেই না বেচারাকে এমন বিপদে পড়তে হলো। তালেব বুড়া অদ্ভুত এক দ্বিধা-দ্বন্দে আছে। একবার ভাবছে বেবি থেকে নেমে বেবিওয়ালার পাশে দাঁড়াবে সে আবার পরক্ষনেই অন্য ভাবনাও মাথায় আসছে। উপকার করতে গিয়ে না আবার ক্ষতি হয়ে যায়।

হঠাৎই তুলনামূলক কম বয়সী পুলিশটি ড্রাইভারকে একটা ধাক্কা দিতেই তালেব বুড়া আর বসে থাকতে পারলো না। ছি! ছি! এতটা নোংরা মানসিকতা? পবিত্র পোষাকে পবিত্র পেশাকে এইভাবে অপমান করে? একটুও বুক কাঁপে না? এগো রক্তে এতটুকু সম্মানবোধ, দেশপ্রেম,আদর্শ নাই? এ কোন ভবিষ্যৎ তৈরি হইতেছে? কোন মানুষের রক্ত শরীরে থাকলে বাপের বয়সী একজন মানুষের সাথে এমন কাজ কি করে করে? তালেব বুড়া বেবি থেকে নামতে নামতে বিড়বিড় করেই যায়। 'আমার পুলা জীবনেও এমন করবার পারবো না। এমন শিক্ষা কি তারে দিছি? দ্যাশে থাকতে যেই পুলা কোনদিন মাথা উঁচু কইরা কথা পর্যন্ত কয় নাই সে নিশ্চই এমন জঘন্য কাজ করতে পারবো না। কখনই না।' ট্রাফিক পুলিশকে সে জিজ্ঞেস করবে এমন করনের সময় একবারও কি তার হাতটা কাঁপল না? একবারও কি নিজের বাবার কথা মনে পড়ে নাই? তালেব বুড়া ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে কম বয়সী পুলিশটা এবার ড্রাইভারের পকেট হাতরাতে শুরু করেছে আর পাশে দাঁড়িয়ে বয়সী পুলিশটা খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসছে। তার মনে হচ্ছে সিনেমার কোন ভয়ংকর দৃশ্য দেখছে সে।

তালেব বুড়া অবশ্য কমবয়সী পুলিশের চেহারার দিকে চোখ পড়ার পর আর এগোতে পারেনি। হঠাৎই তার মনে হতে লাগলো সে যা দেখেছে সব মিথ্যে। এই দিনটা,দুপুর বেলাটা,গ্রাম থেকে এত কষ্ট করে শহরে আসাটা, সাথে নিয়ে আসা খাবারগুলো,এই বেবিট্যাক্সি, বেবির ড্রাইভার,এই দৃশ্য সব সব মিথ্যে। সে আসলে কোথাও নয় তার গ্রামেই আছে । সে ঢাকা আসেনি। কোন ভয়ঙ্কর কুৎসিত দৃশ্য তার চোখে পড়েনি। সে ভুলে যেতে চায় তার কোন ছেলে আছে। গর্ব করে যার নাম রেখেছিলো বিজয়। যাকে সে দেশসেবার মন্ত্র শিখিয়েছিল। ভুলে যেতে চায় তার রক্ত সরোবরে কোন পদ্ম ফোটেনি। সেখানে জন্মেছে এক আফ্রিকান মাগুর যে সব কিছু গিলে খাচ্ছে নয়তো খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করছে। সব কিছু তার চারপাশ ঘিরে ঘুরছে। এই সব আলো, আকাশ, সময়, দৃশ্য সব এক ঘূর্ণি বলয়ের সৃষ্টি করছে। আর তালেব বুড়া সেই ঘূর্ণিপাকে পড়ে তলিয়ে যাচ্ছে গহীন থেকে গহীনে। আবার হঠাৎই মনে হলো না কিছুই ঘুরছে না। সে মহাকাল ধরে এখানেই দাঁড়িয়ে আছে। তার কোন অতীত নেই,বর্তমান নেই। নেই কোন ভবিষ্যতের আশাচিত্র।

ঘন্টা তিনেক পর পরন্ত এক বিকেলে উৎসুক জনতা খুব মজার একটি দৃশ্য দেখতে পেলো। এক শাদা পাঞ্জাবী পড়া বৃদ্ধ তার চারপাশে অনেকগুলো খাবারের প্যাকেট খুলে নানা সুস্বাদু খাবার পরম তৃপ্তিতে রাস্তার ক্ষুধার্ত পথশিশু আর বেওয়ারিশ কুকুর গুলোকে খাওয়াচ্ছে। তার চোখে মুখে এক আভাবনীয় তৃপ্তির আনন্দ,সন্তান বাৎসল্যের সুখ।

1 টি মন্তব্য: