শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়'এর গল্প : বৃত্ত

গায়ত্রীর তারপর ঠিক কি হয়েছিলো সে কথা আমি জানতাম না।

পরে গায়ত্রীর ছোটবোনের থেকেই শোনা। সেটা ১৯৫২ সাল হবে।
ঘটনার অন্তত বছর আট-নয় পরে।
আমার ফাইনাল ইয়ার। আমাদের কলেজে ফিজিক্স বিভাগে ভর্তি হয়ে এলো গায়ত্রীর ছোট বোন বিজয়লক্ষ্মী। দেখেই চিনতে পেরেছিলাম।
ঠিক ছোটবেলার নাক-মুখ, জন্মদাগ এর জড়ুল সব একই ছিল। আমার পরিচয় পেয়ে তার চোখ দুটো ঘৃণায় ভরে উঠেছিল। যদিও সে জানত আমি সে কাজ করিনি। তাও। বেশ কদিনের চেষ্টায় তাকে বোঝাতে পেরেছিলাম - এক কাপ কফির সাথে গায়ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইতে চাওয়া অমানবিক নয়। হোকনা সে অনুপস্থিত। হোকনা বছর দশ বাদ। ম্যাগমা ও বাইরে এসে ছাই হয়ে ঠাণ্ডা পড়ে যায়। এই ভেবে পণ করেছিলাম। তাতে কাজ হোল। বিজয়লক্ষ্মী আমার সাথে কফি খেতে রাজী হোল।


বছর আস্টেক ওপার

গায়ত্রীর কানের লাল দাগটা দিয়ে রক্ত ঝরছে।
তার মায়ের চোখ লাল।
রক্তচক্ষু তাদের বাবারও।

কালই তোমার ইশকুল যাওয়ার শেষ দিন । চিৎকার করে ওঠেন মধ্য চল্লিশের মা।
লাল গোল টিপ তার মাঝ-কপালে।
ঘামে ধেবড়ে তা আর গোল নেই মোটেই।

হনহন করে পর্দার ওপারে পায়চারী করছেন গায়ত্রীর মায়ের অশীতিপর পিসিমা।

তার ঐরাবতের মত ফরসা কান পেতে রেখেছেন পর্দার ওপারে।

কে তোমার এমন ছবি আঁকল ? সারা ইশকুল তোমার এ ছবি দেখেছে। ছেলেদের ইশকুলের সাথে এমন বিশ্রী মেলামেশাই কবে থেকে শুরু করেছিলে ? একজন ভদ্র ঘরের বাঙালী মেয়ে হয়ে কি করে এই কাজ করলে ? তোমার এ কাজের জন্যে তোমার বোনকেও তাড়িয়ে দেবে ইশকুল থেকে, একথা জানো? সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে অনেক সাহস জমিয়ে এ দূর দেশে এসে তোমাদের ইশকুলে দিয়েছি… বিলিতি কায়দায় বড় করতে চাওয়াই আমদের কাল হোল...

এই সব কথা ঘুরে ঘুরে উঠছে উঁচু সিলিঙের বৈঠকখানা ঘরে। সিলিঙে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে। এমনকি উঁচু তৈল চিত্র গুলোরও ওপর থেকে যেন গরম ইথারের মত এলোপাথাড়ি ভেসে আসছে কানে। গায়ত্রীর জবানী শোনার মন নেই কারো।

তাছাড়া অপমানে, ভয়ে তার কথা বলার ক্ষমতাও সীমিত হয়ে গেছে। সে তার হাত মুঠো করে লম্বা গাউনের স্কার্ট'টিকে শক্ত করে খামচে রেখেছে। গোড়ালির একটু ওপর দিয়ে মিহি বিলিতি স্টকিন্সের হাল্কা গোলাপী আভা উঁকি দিয়ে যাচ্ছে।

সন্ধ্যের পাহাড়, মাখন, রুটি আর মাংসের সুরুয়ার গন্ধে ছেয়ে যেতে থাকে।


তার দুদিন বাদে।

ছেলেদের দিকের হোস্টেলে আমাদের সব ছেলেদের এক করা হল।

সবাই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল। হেরিংবোন শান্ত গলায় দশ বারেরও বেশী জানতে চাইলেন- কে এই কাজ করেছে। এরপর এলোপাথাড়ি ব্যাটন চলতে থাকল। 

কেউ হাজার মারেও মুখ ফুটে জানতে দিলনা- কে একাজ করেছে।

সবাই নীচু হয়ে থাকলে আমি মিস্টার হেরিংবোনের শক্ত চোয়ালের নীচ-ভাগ টা আড়-চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম।

সেখানে কি কি রেখা ফোটে, কখন ও কিভাবে। এগুলি আমার মোটামুটি জানা।

আমি চোখদুটো যথা সম্ভব নীচু করার ভান করে চোখের তারা দুটিকে ওপরের দিকে রাখার চেষ্টা থাকলাম।

আমরা যত অনমনীয় হচ্ছিলাম, মিস্টার হেরিংবোনের মুখের রেখা ততোই স্পষ্ট হতে থাকছিল।

তার সরু সোনালী গোঁফের তলায় সিম-বিচির মত সবজে-সফেদ তিল চকচক করে উঠছিল। যেন দ্যুতি। দিদি'রা দুধ-সর মাখা দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেললে এইরকম জেল্লা দিত তাদের ত্বকে। গালে। চিবুকের নরম চামড়ায়।

অন্য দিন শাস্তি দেওয়ার সময় এই ধরণের রেখা আমি আগে মিস্টার হেরিংবোনের মুখে ফুটে উঠতে দেখিনি ।

এই রেখাটি ছিল একদমই নবীন, বেশ উদ্ভাসপুর্ণ একটি নমনীয় রেখা।

তিনি হাল্কা ডাণ্ডা মেরে ভর্তসনা করে আমাদের যাওয়ার পথ করে দিলেন।

আর আধো-স্বরে বলতে থাকলেন ভয় তোমরা পেয়েইছ। সেই প্রভু যীশুকেই পাও আর শয়তান কে।

আমরা যে যার ঘরে, ডর্মে এসে বসলাম। কেউ কারো সাথে চোখ চাওয়া-চাই করলাম না। যেন জিতে যাব এমন একটা সংকল্প আগে থেকেই করা ছিল। অথচ আমরা কেউ এ নিয়ে আগে কোন আলোচনাই করিনি।

এর দুদিন বাদ আমাদের স্কুলে ইউনাইটেড নেশন-ডে পালনের ডাক পড়ে। সেই বিশেষ অনুষ্ঠানে আমাদের ওপর ইউনিয়ন জ্যাক উত্তোলনের ব্যবস্থাপনার ভার পড়ল।

পরে শুনেছিলাম মিস্টার উডবার্ন এর কাছে মদ খেতে খেতে হেরিংবোন বলেছিলেন- 'এই ভাবেই মেরুদণ্ডে এসব জমিয়ে দিতে হয়'। ঊডবার্ন ও তার সোনালী দাড়িতে ধীর আঙ্গুল চালাতে চালাতে বলেছিলেন- তিনিও ছাত্রদের থেকে ঠিক এরকম ব্যবহারই আশা করেছিলেন। তিনি খুশী যে কেউই দোষ স্বীকার করেনি। ফুরার ও ঠিক এই ভাবেই জার্মানি কে সংগঠিত করেছেন। টিনেজ ইম্পালসে এসব ঘটবেই। একে ভয় পাবার কিছু নেই। বরং খুশী হওয়া যাক যে এরাই আমাদের হয়ে কাজ করবে। কারণ এরা সরব হতে ভয় পায়। নীরবে মেনে চলাতেই ভারতের ঐক্য। এ জাত কোনদিন স্বাধীনতা পাবেনা। বিয়াল্লিশের আন্দোলন ও শেষ। দু একটা বিদ্রোহে কিছু প্রমাণ হয়না। ব্রিটিশরা এমন অনেক বিদ্রোহ এদেশে দেখেছে।

যখন তারা একথা বলাবলি করছিলেন তখন তাদের রুপোলী কাঁটার ফাঁকে ফাঁকে তুলতুল করে ঢুকে পড়ছিল মখমলি ডিমের গোলায় ডুবোনো মোলা'ম কটি অপরূপ মাছ ভাজা। ক্যান্টিনের সবুজ দরজা ঠেলে ধোঁয়া ওঠা সেই সব মাছ ভাজা এনে পরিবেশন করতে করতে শুনছিলেন দর্গা সিং। তার হাতের জাদুতে মাছ হয়ে ওঠে পালক কোমল। যেন দুধে ভেজানো সেমুই। তার হাতের পুডিঙ মুখে পুরে ঘন হয়ে আসে উডবার্নে'র মুখ।

পাচক দর্গা সিং পরিবশন করতে করতে দেখেন শাদা চাইনা প্লেটে মাছ গুলি খেলছে। আবার পরক্ষনেই গলে ধোঁয়া হয়ে সবুজ জানলার কাঁচে ঘষা খেয়ে জল হয়ে জমে যাচ্ছে। জানলার ওপারে কাঞ্চনজঙ্ঘা'র মাথায় তুলোর মত ছোট ছোট বরফ কণা সফেদ ফেনার মুকুট পরিয়ে চলছে। আজকাল তিনি প্রায়ই এইসব মাছেদের সেখানে খেলা করতে দেখেন।


আরও বছর দশ বাদ ।
১৯৬২।

বছর দু'এক হয়েছে, আমি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে এসেছি।

তার আগে কলেজ পাশ করে স্নাতকোত্তর পড়েছি। এর মধ্যে বছর পাঁচেক বাবার ওষুধ কারখানায় দায়িত্ব সামলেছি।

দেশে নতুন কলকারখানা গড়ে উঠছে। দুর্গাপুর, কল্যাণী নতুন নতুন শহর। বাবার ইচ্ছে আমি কলম্বিয়া থেকে ফার্মেসি তে ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরি।

কলম্বিয়ায় আমার ব্যাচে আমি একমাত্র বাঙালী। আর আছে রঘুরামন ও সুন্দরম। রঘুরাম আর সুন্দরম একসাথে ঘর ভাড়া করে থাকে। তারা নিরামিষাশী। আর আমি মাছ, শুয়োর সবই খাই। তাই আমায় দূর থেকে মাথা ঝাঁকিয়ে দু এক কুশল কথা সেরেই তারা অন্য পথ ধরে। তা ছাড়া বোধ করি আমার খাঁটি বিলিতি উচ্চারণে ইংরিজি বলতে পারাও ওঁদের অস্বস্তি'তে ফেলত।

হতে পারে। কে জানে।

যদিও আমার প্রফেসররা আমার অ্যাকসেন্ট খুবই পছন্দ করে ফেলেছেন।

আমাদের প্রফেসরদের বাদ দিলে দু একজন আমেরিকান ও একটি জার্মান ছেলে ছাড়া কেউই প্রায় আমাদের সাথে ঘোরা-ফেরা করেনা। বাকীরা সামনা সামনি সৌজন্য প্রকাশ করলেও, ডাস্টিন ও তার দলবল একেবারেই করেনা। আমাদের ব্যচের একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ ছেলে মাইকের দলের সাথে এদের আদায় কাঁচকলায়। আমি মাইকের সাথে কিছুদিন ঘোরাফেরা শুরু করেছিলাম, তাতে এমনকি ভারতীয়রাও আমাকে এড়িয়ে যেতে শুরু করল। এমনকি বসবাসকারী ভারতীয় পরিবার গুলোও। যারা এখানে অনেকদিন আছেন। এখন মাইকের সাথে কিছুটা বরং দূরত্বই রেখে চলি। বিদেশ বিভূঁইয়ে স্বজাতিরা কে-কখন কাজে আসে। ডাস্টিন ও তার দলবলকে আপাত চোখে রেসিস্ট মনে হলেও ইদানীং তাদের দলে মাঝে-মধ্যেই আশ্চর্যরকম ভাবে একটি বাদামী মেয়েকেও প্রায়ই দেখি। জেনেছি তার নাম নীরজা।

নীরজা ভারতীয় মেয়ে। ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে পড়তে এসেছে। তার চুল কাঁধের কাছে ছাঁটা। আগে তাকে শাড়িতেই বেশী দেখা যেত। শাড়ির ওপর ওভার-কোট জড়ানো। ইদানীং তাকে গাউন, লঙ স্কার্ট এই সবেও স্বছন্দ লাগছে। তার সব সময়ের বান্ধবী হল পামেলা। পামেলা ডাস্টিন দের দলের অন্যতম মেয়ে সদস্য। এই পামেলা'র সূত্রেই হয়ত নীরজা এদের দলে জায়গা করে নিয়ে থাকবে।

পামেলা ব্যালে নর্তকী। ব্যালের পোশাক পরেই সে আমাদের স্টুডেন্ট লাউঞ্জের চেয়ারে এসে বসত। আর ফেনা তোলা বীয়ারের পেয়ালায় বিলম্বিত চুমুক বসাত। কখনো সে একা, কখনো নীরজা ও তার সাথে থাকতো। নীরজা'র সাথে আমাদের ভারতীয় ছাত্রদের কখনো কথা হয়নি। কিন্তু ইঙ্গিতে সে পামেলা কে আমাদের সম্পর্কে অবহিত করত। তাদের অস্পষ্ট কানাকানি আমাদের অস্বস্তিতে ফেলত। আর তখন তাদের ঠোঁটে, ছুঁচে সুতো পরানোর মত একরকম সূক্ষ্ম হাসি তুরতুর করে ফুটে উঠত।

কখনো ইউনিয়ন লাউঞ্জে ব্যালে প্র্যাক্টিস শেষে সে তার স্কার্ট-টাকে যথা সম্ভব গোল গোল ঘোরাতে থাকত। যতক্ষণ না ডাস্টিনদের দৃষ্টি আকর্ষণ হয়। কখনো সাদা স্টকিন্স এর ওপরে তার ঝালর ওলা ছোট স্কার্ট টিকে যতদূর সম্ভব তুলে ধরত আর সূক্ষ্ম ভাবে দু'পায়ের শেষে খাঁজের কাছে এনে ক্ষিপ্রভাবে ফেলে দিত। ডাস্টিনের দল হই হই করে উঠত। নীরজা এসব সময়ে আমাদের সাথে চোখা-চোখি না করে লাউঞ্জের এক কোনে বই নিয়ে মুখের সামনে মেলে ধরত।

আর এসব সময় ডাস্টিন আমাদের ধারে-কাছে দেখে ফেললে জোরে থুথু ফেলার শব্দ করে মুখ থেকে গাম ছুঁড়ে ফেলত।

ডাস্টিন আমায় আজকাল সামনা সামনি ঘৃণা করে। কি এক অদৃশ্য ঘটনাবলে আমার হোস্টেলের ঘর তার ঘরটি'র থেকে মাত্র দু ঘর দূরত্বে। আসতে যেতে তাদের থেকে টীকা টিপ্পনী শোনা এখন রোজকার দস্তুর।

তাদের কাছে আমার ডাকনাম কপার-কারি। সংক্ষেপে সি-সি।

কখনো তারা আমায় কাগজ ছুঁড়ে মারে- যাতে মোটা কালিতে লেখা থাকে আমেরিকান ড্রিম। সঙ্গে অপটু হাতে আঁকা আমার একটা কার্টুন- আমি কাগজ কুড়োচ্ছি জঞ্জাল থেকে। তবে কোথাও আমার নাম লেখা থাকতো না। কে এঁকেছে , তাও না।

কালো বলপেনে আঁকা এই স্কেচ গুলোতে বলপেন দিয়ে আমার খোলা ত্বকের অংশ আড়াআড়ি সূক্ষ্ম দাগ কেটে অল্প ঘন রঙের দেখানো থাকত। আমি খুশী হতাম একটাই কথা ভেবে যে তারা আমার ত্বক পুরো কৃষ্ণাঙ্গ করে দ্যায় নি। হাল্কা রেখাগুলো আমার বাদামী ত্বকের প্রতি একরকম সুবিচার করছে, এই সান্ত্বনা নিয়ে আমি কাগজটা কুড়িয়ে নিতাম। ফেলতাম না। এই কার্টুন গুলোকে কেন জানি আমার নিজের পোরট্রেইট মনে হত। গোরা গুলো সময় খরচা করে এঁকেছে বলেও হয়ত।


সেপ্টেম্বর মাস।

পাতায় পাতায় ঢেকে আছে ক্যাম্পাস। পা ফেলতে গেলেই খসখস শব্দ। খুব মায়া লেগে থাকে এই খসখসে। দু বছর আগে প্রথম যেবার হেমন্ত দেখলাম সেন্ট্রাল পার্কে, আমার চোখ যেন পুড়ে গেসলো। এই এতো রঙ ! বাহার উব্জে উঠছে। যেন মায়ালোক । লাল, হলুদ, মর্চা, বাদামী, বেগুনী, খয়েরী। সব থেকে এই খয়েরী রঙটাই আমায় টানে বেশী। তাকাতে তাকাতে নেশা লেগে যায়। ঝিম হয়ে ওঠে মাথা। এখানে এসে আমার ছবি আঁকার নেশাটা আবার চাগাড় দিয়ে উঠেছে। সময় পেলেই সেন্ট্রাল পার্কে এসে ফলিয়েজ স্টাডি করি প্রায়ই। আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে। দু দিন ধরে হাল্কা বৃষ্টি হয়েছে। তাই পাতার ওপর পা ফেলে চললে আর খরখরানি তেমন শোনা যায়না।

সকাল থেকে শুকনো হাওয়া। সন্ধ্যে থেকেই ডাস্টিনের দল মদ চড়িয়েছে।

ডাইনিং হলে রাতের খাওয়া শেষ করতে গেলাম। আজকাল আমি দেরী করে খেতে যাই। যাতে ডাস্টিন'রা ততক্ষণে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ফেলে। খাওয়া শেষে একটা সিগার ধরানোর লোভ হোল। ওভারকোটটা চাপিয়ে ক্যাম্পাসের মিনি সাঁকোটার দিকে হাঁটতে লাগলাম সিগার ধরিয়ে।

ডাস্টিনের দলবল কে দেখতে পাচ্ছি মনে হচ্ছে। আট দশটি ছায়ামুর্তি'র মত। আমি ভিজে পাতার ওপর পা চেপে চেপে চেপে যত আস্তে সম্ভব পা ফেলে হোস্টেলের রাস্তার দিকে এগোতে থাকি। নারী পুরুষের হাসি'র খলবল আওয়াজ ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।

সকালে ঘুমের ভেতর মাথায় দাপাদাপি শুরু হোল। কারা যেন বুট জুতো পরে মাথার ভেতর ফুটবল খেলছে।

ঝপ করে ভেঙ্গে গেলো ঘুমটা। কিন্তু আওয়াজ টা এখনো পাচ্ছি।

স্টুডেন্ট হাউসিং এ চারিদিকে পুলিশ আর লোকজনে ছয়লাপ।

ডাস্টিনে'র দলবল কে পুলিশের ভ্যানে তোলা হচ্ছে। তাদের শরীরে নানা ক্ষত।

হোস্টেল থেকে বেরোতে পারছেনা কেউ। পুলিশ বাইরে থেকে সীল করে দিয়েছে।

শুনলাম মেয়ে দুটিকে অচৈতন্য অবস্থায় হাসপাতাল পৌঁছনো হয়েছে।

এক হপ্তা বাদ, আমি ভারতীয় জানতে পেরে নীরজা'র এক কাকা আমার কাছে এসেছিলেন। সাক্ষ্য প্রমাণ জোগাড়ে। নির্যাতন অপেক্ষা এটিকে খুনের চেষ্টা প্রমাণ করতেই তারা উৎসাহী বেশী। ডাস্টিনে'দের দলের গতিবিধি ভাল ছিলনা এ নিয়ে আমায় সাক্ষ্য দিতে হবে। মেয়েটি মৃত্যু''র সাথে যুদ্ধ করছে। এই দৃশ্য দেখে ও শুনে আমার মনে কোন স্বদেশ বোধ এলনা। ডাস্টিন'কে এই সুযোগে ফাঁসানোই যেত। ছেলেটি যেমনই হোক, ফেঁসে গেলে আমারো ক্ষতি। এর দলবল অনেক ছড়ানো। আমায় ছেড়ে দেবনা। তা ছাড়া মনে মনে তো আমিও জানি মেয়েটি ছোট স্কার্ট তুলে কিনা করত। এ জিনিশ তো কারুরই কখনো নজর এড়ায়নি। নীরজাও শাদা আমেরিকান বর জুটিয়ে নেয়ার তালে ছিল নিশ্চয়ই।

না মহামান্য জাজ। ডাস্টিন সেদিন তার নিজের ঘরেই ছিলেন। আমরা সান্ধ্য খানা সেরে রাত এগারোটা অব্ধি পুল খেলার পর ঘুমোতে চলে যাই। তিনিও আমার সাথেই ঘুমোতে গেছিলেন।

আর মনে হয় মেয়ে দুটি নানা মানসিক সমস্যায় ভুগত।

সাক্ষ্য দিয়ে ফিরে এলাম ঘরে।

নিউইয়র্কের দক্ষিণ পন্থী কাগজ ডেইলি নিউইয়র্ক লিখেছে- এটি নিছক ধর্ষণ নয়। মেয়ে দুটির সম্মতিতে'ই এই ঘটনা ঘটেছে।

ডেমোক্র্যাটদের একটি কাগজ, আর্বান ইউ.এ.সে তে শুধু পামেলা'র কথাই লেখা হয়েছে - এর মানে সেই ছেলেটিকে সে ভালো বাসত। সে চাইত ছেলেটি আসুক তার জীবনে। এ -জন্যেই হয়ত মিলিত হতে চেয়েছিল। কিন্তু সব বন্ধুরাই তার ওপর জোর খাটাবে এ কথা সে হয়ত ভাবেনি।

কেস চলাকালীন, এই কাগজের অফিসের সাথে মেয়ে দুটি''র পরিবার যোগাযোগ করলে তারা শেষ মুহুর্তে পিছিয়ে যায়।

শুধু এরই মধ্যে নিউইর্ক টুডেতে একটি অদ্ভুত খবর ছাপা হয়েছিলো। পরে তারা সে খবরটি হাশ -আপ করে দ্যায়। নিউইর্ক টুডে লিখেছিল- ফরেন্সিক রিপোর্টে তাদের ভ্যাজাইনায় নাকি এক অদ্ভুত সূত্র মিলেছে। দুটি অদ্ভুত খয়েরী রঙের ছোট ছোট মাছ। মাছ দুটি এ ওর লেজ মাথা মুখে ধরে এক বৃত্ত গঠন করে রয়েছে।

শেষ দিকে পামেলা'র ক্যাথলিক পরিবারও তাকে আর বিশেষ সাহায্য করেনি। এক মাস বাদ থেকে নীরজা'র ও আর কোন খোঁজ পাইনি। কাগজ গুলিও এখন নীরব হয়ে এসেছে।

আমি এ ঘটনার পর হোস্টেল ছেড়ে দিয়েছি এক মাস মত হোল। হোস্টেলের খাবার-দাবার আর ভালো লাগছিল না। অ্যাস্টোরিয়ায় একাই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি। কদিনেই চমৎকার মাছের ঝোল রান্না করেতে শিখে নিয়েছি। দিনের শেষে বাঙালীর পাতে দুটি ঝোল ভাত। সেমিস্টারের মেয়াদও শেষ হয়ে এলো।

**********

অক্টোবর

রাস্তায় আজ একটা বড় অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।
ফিরতে রাত হবে ভেবে আমি বিকেল থাকতে উঠে পড়ি।
ডাস্টিন আমায় গভীর ধন্যবাদ জানায়।

আজ থেকে আমাদের দৃঢ় বন্ধুত্ব জারী থাকল- আমার হাত দুটো উষ্ণ ভাবে জড়িয়ে নেয় সে।
ডাস্টিন আমায় পৌঁছে দিতে চেয়েছিল ঠিকই।
কিন্তু সদ্য পাওয়া দুর্লভ বন্ধু প্রস্তাবে মেজাজটা রাজা হয়ে উঠল।

আমি ডাস্টিনকে বল্লাম - আমি সাবওয়ে চড়ে বরং নির্বিঘ্নে তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাব। রাইডের কোনই প্রয়োজন নেই।

আমার মন খুবই ফুরফুরে ছিল যে অবশেষে আমিও আন্তর্জাতিক হয়ে উঠলাম। সাহেবদের ইশকুলে পড়েও এতোটা গণ্ডী ছাড়াতে পারিনি। সে আনন্দের চোরা স্রোতে আমি রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকলাম। এমন, যেন পাখির পালক। মাটির কাছাকাছি এসেও ধুলো খাচ্ছেনা। আমার হাল্কা হয়ে উড়ে যাছে।

এইভাবে গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের সামনে এসে পড়লাম। আমার একটুও সাবওয়ে ধরার ইচ্ছে হলনা।

আমি আরও হাঁটতে থাকলাম। এইভেবে যে একজন ইমিগ্রেন্ট হিসেবে আমার আন্তর্জাতিক হওয়ার রেখাটি ক্রমশ বড় হচ্ছে।

ফরটি সেকেন্ড স্ট্রীট ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফার্স্ট অ্যাভিনিউ তে এসে পড়লাম। ঈস্ট রিভারের ধারে নীলচে আলো ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুউচ্চ জাতিসঙ্ঘ দপ্তর।

জাতিসঙ্ঘ দপ্তরের সামনে কারা যেন হাত ধরাধরি করে মানব বৃত্ত করছে।

সাদা, কালো, বাদামী, পীত সব মানুষরা একে একে এখনো বৃত্ত টিকে বড় করছে। মনটা আজ অন্যরকম। কি মনে হোল, আমিও তাদের মধ্যে ঢুকে পড়ি। ইন্ডিয়া-চায়না বর্ডারে যুদ্ধ লেগেছে আজ দিন সাতেক হল। আমার পাশের লোকটি চীনা না ভিয়েতনামের একথা বুঝে ওঠার সময় হলনা। আমি আস্তে করে বৃত্ত থেকে সরে আসি। দু'পা পাশে পাশে হেঁটে একটি সোনালী চুলের মেয়ের হাত ধরলাম। এখন আমার আরেক পাশে রয়েছে এক হাফপ্যান্ট পরা কিশোর। বোধ করি বাবা মায়ের সাথে এসে থাকবে।
আরও কয়েকজন এসে বৃত্তে যোগ দিলো। ঈস্ট রিভারের জল হেমন্তের পড়ন্ত রোদে চিকচিক করছে।

কয়েকজন লম্বা চুলের ছেলে গীটার নিয়ে এল। এরপর গান বাজনা হবে মনে হচ্ছে। আমার বেশ ভালো লাগতে শুরু করেছে। আরেকটু থেকে যাব ঠিক করলাম।

তেমন দেরী হলে বরং ট্যাক্সি নিয়ে নেব। পকেটে চার ডলার আছে । অ্যাস্টোরিয়া যেতে খরচ হবে - বড়জোর তিন ।
সে যাক।

*************









1 টি মন্তব্য:

  1. এইরকম ভাষ্যের আঙ্গিকে বলা খুব কঠিন। যেন সামনে বসে শুনছি। আবার একটা অস্বস্তিময় রেশও টেনে ধরে রাখছে।

    উত্তরমুছুন