শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

আপেল, ইভ আর আদমের গল্প : অম্লানকুসুম চক্রবর্তী

কি করি বলুন তো? যাই ভাবি তার মধ্যে টেকনোলজি এসে যায়। নাকি টেকনোলজি ছাড়া কিছু ভাবতেই পারি না? এইযে টুকটুক করে টাইপ করে চলেছি আমার ছোট্ট ল্যাপটপটাতে, যাকে আমি অবশ্য ভালবেসে ল্যাপি বলি, তার ডানদিকে একটা আর বাঁদিকে একটা মোবাইল ফোন। একটার সাড়ে চার ইঞ্চি স্ক্রিন। অন্যটার সাড়ে পাঁচ। দ্বিতীয়টা আইফোন। একটায় থ্রিজি, আর আইফোনে ফোর জি। আনলিমিটেড ফোর জি ডেটা ফোকটে দিচ্ছে একটা কোম্পানি। তার ফায়দা লুটছি। ফোরজি থেকে মিউজিক বাজছে। অনলাইনেই শুনছি। আমার ওয়াড্রোবটার উপরে রাখা ব্লুটুথ স্পিকারটা থেকে আওয়াজ চলকে চলকে পড়ছে। প্লেলিস্টটার থিম হল মেলানকলি। আমারই দেওয়া নাম। এখন ইয়ানি বাজছে। পরের বেশ কয়েকটা ট্র্যাকে আছে কেনিজি। এর পর এলটন জন বাজবে। স্যাক্রিফাইস। টু হার্টস লিভিং, ইন টু সেপারেট ওয়ার্ল্ডস। ওফ, কি সিডাক্টিভ একটা টিউন। আমার নিউটাউনের ব্র্যান্ড নিউ ফ্ল্যাটের বারো তলার উপর থেকে দেখা যাচ্ছে বিন্দু বিন্দু কলকাতা। নীল নীল সাদা সাদা বিন্দু। অনেক দূরে দেখতে পাচ্ছি একটা গ্লোব। তার উপরে যেন পুদিনা সস মাখানো তিনটে চিকেন ড্রামস্টিক কোনাকুনি করে সাজানো আছে। কাছে গেলে বোঝা যাবে, ওটা আসলে একটা বাংলা অক্ষর। ব। এই ব অক্ষরটাও গ্লোবালাইজেশন আর মার্কেটিংয়ের যুগে ফেমাস হয়ে গেল। কলেজে বারাসাত না বসিরহাট থেকে কয়েক পিস আসত। আমরা কখনও কারও উপরে খুব ইরিটেটেড কিংবা ফ্রাসট্রেটেড হলে যখন ওহ ফাক্ ম্যান কিংবা নিদেনপক্ষে ওহ শিট টিট গোছের কিছু একটা বলতাম, সেই একই সিচুয়েশনে ওরা বলত, তুমি একটা বড় ব। ব একটা বাংলা স্ল্যাংয়ের অ্যাব্রিভিয়েশন ছিল। আমার জানা সবচেয়ে ছোট অ্যাব্রিভিয়েশন। একটা অক্ষরের কি পোটেনশিয়াল! আমাদের আইসিএসই, সিবিএসই বোর্ডের অ্যারোগ্যান্স পাতি ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ডের ফচকেমির কাছে কেমন ডিগনিটি হারিয়ে ফেলত তখন। অবশ্য ওদের গ্রে ম্যাটার ছিল। না হলে জয়েন্টে ভাল রেঙ্ক হবে কেন। তবে আমাদের জয়েন্ট কোচিংয়ের ফি ছিল এক লক্ষ পঁচিশ হাজার টাকা। সঙ্গে ট্যাব ফ্রি। আর ওরা পাড়ার কোনও পাতি স্যারের কাছে পড়েই ওরকম ড্যাম গুড রেজাল্ট করে ফেলেছিল। 

কি বলতে বলতে কোথায় চলে এলাম! আসলে সব জিনিসের সঙ্গে সব জিনিস কেমন ইন্টাররিলেটেড দেখুন। এই জিনিসটা আমায় শিখিয়েছে ইউটিউব। ধরুন আপনি সার্চ করলেন কলকাতা। চলে এল গাইডেড ট্যুর টু কলকাতা। দেখে ফেললেন। পরের রেকমেন্ডেশন এল দক্ষিণেশ্বর টেম্পল। দেখলেন। তার পরে ওরাই বলল ট্যুর টু বেলুড়। বেলুড় থেকে হয়ত এসে গেল নিউ বিগবাজার স্টোর ইন বেলুড়। লিঙ্ক মানুষকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায়। অর্থাৎ নাথিং ইজ ইররেলিভান্ট। উইকিপিডিয়ায় দেখেননি! একটা সেনটেন্সের দশটা শব্দের মধ্যে পাঁচটা শব্দই হাইপারলিঙ্ক। মাউস নিয়ে গেলে সেগুলো সঙ্গে সঙ্গে হাতের মত হয়ে যায়। বিরাটির মামারবাড়িতে সন্ধে নামলে দিদা পুকুরধারে গিয়ে হাঁসগুলোকে ডাকত, আয় আয় চই চই। আমাকে ওই হাতগুলোও কেমন যেন চই চই করে ডাকে। বাইনারি চইচই। একটা ক্লিক যেন আসছি গো আসছি। হিয়ার আই কাম। 

ট্র্যাক চেঞ্জ হল। স্যাক্সোফোন বাজবে এবার। বিশাখার প্রিয় ইনস্ট্রুমেন্ট হল স্যাক্সোফোন। ও বলে সেক্সিফোন। এই ইনস্ট্রুমেন্টটার নামটা কি সিডাক্টিভ না! আমাদের অনেক ইনটিমেট সময়ের সাক্ষী এই স্যাক্সোফোন। কলেজ থেকে বেরোতে না বেরোতেই ক্যাম্পাসিংয়ের কল্যাণে যে কোম্পানিতে চাকরিটা পেলাম, তারা ট্রেনিং নিতে পাঠাল ত্রিবান্দ্রম। ভেবেছিলাম সাউথ ইন্ডিয়াতেই সেটল করে যেতে হবে হয়ত। দশ মাসের ট্রেনিং ছিল। ট্রেনিংয়ের পরে কলকাতাতেই পোস্টিং পাই। মাসচারেক হল চলে এসেছি। ভাগ্যটা ভাল ছিল বলতে হবে। যে বন্ধুটা আমার থেকে বেশি প্যাকেজের চাকরিটা অ্যাকসেপ্ট করে টপাটপ কয়েকটা ভ্যান হুসেন কিনে আন্ডারআর্মে ডেভিডফ স্প্রে করে ছাতি ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াত, তার কোম্পানি এখনও কলকাতায় জমিই পেলনা। আমি তো চলে এলাম! শ্যামবাজারে বাড়ি। সেক্টর ফাইভ সেখান থেকে যাতায়াত করা কোনও ব্যাপারই ছিল না। সেক্টর ফাইভ আমাকে স্বপ্ন দিয়েছে। ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স দিয়েছে। চার লাখ টাকা লিমিটের প্ল্যাটিনাম ক্রেডিট কার্ড দিয়েছে। এয়ারপোর্ট লাউঞ্জের পাস দিয়েছে। সেক্টর ফাইভের রোমান হরফের ফাইভ লেখাটা আমার কাছে ভিকট্রি চিহ্নের মতো লাগে। চাকরিটা পেয়ে প্রথম দু-এক মাস চিকেন ড্রামস্টিক দেখে জিভের লালা ঝরত। লালা কথাটা খুব বাজে শোনায়। স্যালাইভা বেটার। ত্রিবান্দ্রমে বসে এর কয়েকমাস পর থেকে একই ফিলিং হতে লাগল অনলাইন এডিশনে বাংলা খবরের কাগজের প্রথম পাতায় রাজারহাট-নিউটাউনের ফ্ল্যাটগুলোর বিজ্ঞাপন দেখে। স্বপ্নের মধ্যে সাধপূরণ। স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট। সাড়ে ন’ লাখ থেকে শুরু। এখন তো সবকিছুতেই পার্টনারশিপের যুগ। সিনেমা শুরু হওয়ার আগে দেখুন। মিউজিক পার্টনার, লোকেশন পার্টনার, কস্টিউম পার্টনার, জুয়েলারি পার্টনার, ডিস্ট্রিবিউশন পার্টনার। এক একটা পার্টনারের লোগো পর পর স্ক্রিনে আসতে থাকে। সেদিন একটা সিনেমায় দেখলাম প্লেজার পার্টনার বলে একটা কন্ডোম কোম্পানির লোগো। কি খিল্লি মাইরি। যাক গে যাক, রেডি টু পজেস একটা প্রজেক্টের বিজ্ঞাপনের নিচে বড় বড় করে লেখা ছিল ব্যাঙ্কিং পার্টনার অমুক ব্যাঙ্ক। সঙ্গে লোগো। ওই ব্যাঙ্কেই আবার আমার স্যালারি অ্যাকাউন্ট। আমারও ওদেরকে দরকার ছিল, ওদেরও আমাকে। লোনটা পেয়ে গেলাম। প্রসেসিং টাইম নিল দশ মিনিট। কফিও খাওয়াল। মুভি ভাউচার দিল। আর সেই ভাউচারটাই রিডিম করে মাল্টিপ্লেক্সে বিশাখার হাতটা ধরে খবরটা ডিসক্লোজ করলাম। 

বিশাখা আমার প্রজেক্ট পার্টনার। বিশাখা মুখার্জী। ত্রিবান্দ্রামে ট্রেনিংয়ের সময় থেকেই ওর সঙ্গে আলাপ। ভীষন সুন্দর দেখতে আর ভীষন টেক স্যাভি। জয়েন্টে যদিও আমার থেকে ওর রেঙ্ক অনেক পরে ছিল, অবশ্য তাতে কি এসে যায়। মনে পড়ে ত্রিবান্দ্রমে যাওয়ার পরে প্রথম উইকএন্ড। অফিস থেকেই নিয়ে গিয়েছিল। কোভালাম বিচে। ভলভো বাসে আমার ঠিক পাশের সিটে বসেছিল বিশাখা। ওর হাতের আইফোনের ব্যাক কভারে আধখাওয়া মেটালের আপেলটার মত চকচক করছিল ওর মুখটাও। সারা শরীরের চামড়ার ভিতরে যেন ফিট করা ছিল ব্যাকলাইট। ‘হাই, তোমার ফোনটা একবার দেখতে পারি?’ এ ভাবেই কথা বলাটা শুরু করেছিলাম আমি। ‘ইটস এ ফ্যাবিউলাস ফোন’ বলে গ্যাজেটটা ফেরত দেওয়ার সময় বিশাখার আঙুলগুলো টাচ করেছিলাম। ইচ্ছে করেই। ও কিছু বুঝেছিল নিশ্চয়ই। সে রাতে এফবিতে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা পাঠায় বিশাখাই। সঙ্গে একটা মেসেজও ছিল। ‘ইউ আর এ কুল চ্যাপ ম্যান। চল আমরা বন্ধু হই। বাট আমার একটা রিকোয়েস্ট রাখবে প্লিজ? গেট অ্যান আইফোন।’

প্রথম চাকরির প্রথম মাসের মাইনে দিয়ে মায়ের জন্য একটা সাউথ ইন্ডিয়ান সিল্ক কিনব ভেবে রেখেছিলাম। জীবনে তো কিছু দিইনি কখনও। কিন্তু সেই টাকাটা নিয়ে নিল আইফোনের ডাউনপেমেন্ট। ঠিক আছে। মা কিছু মাইন্ড করবে না আমি জানতাম, কারণ শাড়িটা মায়ের কাছে পুরোটাই সারপ্রাইজ ছিল। কিন্তু, আইফোনটা না কিনলে হয়তো বিশাখাকে পেতাম না। মানে অ্যাপ্রোচটাই করতে পারতাম না আর কি। ডাউনপেমেন্টটার পর ওই মাসের বাকি দিনগুলো ডিনারে শুধু দুমিনিটের নুডলের পাঁচ টাকার ছোটা প্যাক খেয়ে কাটিয়েছিলাম মনে আছে। যাক গে, আজকের পেইন ফর কালকের গেইন। 

ত্রিবান্দ্রামের ব্যাচটায় আমাদের নাম হয়ে গিয়েছিল দ্য অ্যাপল কাপল। বিশাখা ভীষন এনজয় করত এই নামটা। নিজের সঙ্গে ফোনটাকেও টিপটপ রাখাটা ও পছন্দ করত। প্রথমবার আমার কানের লতিটা আলতো করে কামড়ে বিশাখা বলেছিল, ‘উই উইল অলওয়েজ হ্যাভ দ্য বেস্ট ফোনস ইন আওয়ার পকেটস, হানি।’ বিশাখার এটাই ছিল একমাত্র শখ। সমস্ত অ্যাপের লেটেস্ট এডিশন থাকত বিশাখার ফোনে। তখনও ডেটা প্যাক ছিল যথেষ্ট দামি। বিশাখা বলত, ‘অ্যাপের সঙ্গে কোনওরকম কমপ্রোমাইজ করাটাকে আমি হেট করি। মাই ফোন, মাই লাইফ।’

ত্রিবান্দ্রামের ক্যাম্পাসটাতে ছেলেদের আলাদা উইং ছিল। মেয়েদের আলাদা। ফলে বিশাখার সঙ্গে একটু ইনটিমেসির দরকার হলে, ইউ নো হোয়াট, বাইরে হোটেলে যেতে হত। ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। ক্যাম্পাস থেকে দু-আড়াই কিলোমিটার দূরেই একটা পার-আওয়ার হিসেবের হোটেলের সন্ধান পেয়ে গিয়েছিলাম। চিপ হোটেল, কিন্তু শিয়ালদা বা হাওড়ার চিপ হোটেলগুলোর মত নয়। মাচ বেটার। মাস তিনেকের ট্রেনিংয়ের ওই স্প্যানটাতে বিশাখাকে নিয়ে গিয়েছি বার দশেক তো বটেই। তিন-চারবার যাওয়ার পরেই বুঝে যাই, বিশাখাকে ছাড়া বাঁচব না। একটা ফিলিং কাজ করতে শুরু করে দিয়েছিল ভিতরে ভিতরে। বিশাখার সব ভাল লাগত আমার। শুধু একটা জিনিস ছাড়া। ভীষন ক্লোজ কিছু সময় কাটানোর সময়ও এক হাতে ও আইফোনটা ধরে থাকত কেন কে জানে। এই জিনিসটা নিয়ে আমার অপছন্দের কথাটা বিশাখাকে বলেওছিলাম একবার। গাঢ় চকোলেট লিপস্টিকের দুটো ঠোঁট বলেছিল, তোমরা দুজনেই তো ইকুয়ালি সেক্সি সোনা। 

বিশাখা আমায় টেকনোলজির কত কিছু শিখিয়েছে। সবই অ্যাপ-শিক্ষা অবশ্য। কটা স্টেপ হেঁটে কত ক্যালোরি পুড়ছে, আগামী পাঁচ ঘণ্টায় ওয়েদার কেমন থাকবে, একটা লোকের সেক্স কোসেন্ট কত, সিনেমার শোয়ের সঙ্গে যে পপকর্নটাও বুক করে দেওয়া যায় অ্যাপ মারফৎ--এগুলো বিশাখা ছাড়া কে শিখিয়েছে আমায়? আমাদের ক্যাম্পাসে ছেলেদের আর মেয়েদের উইংদুটোর মধ্যে দূরত্ব ছিল সাকুল্যে তিনশ মিটার। একদিন সন্ধেবেলা ট্রেনিংয়ের শেষে আধঘণ্টা জিম করে ক্যাম্পাসেরই একটা পার্কে বসে আছি। চকোলেট ডিও মাখা ফ্লেভার্ড বিশাখা আমার গলায় একটা স্মুচ করে বলল, ‘চলো আমরা আমাদের লোকেশন রেজিস্টার করি গুগল ম্যাপে।’ ব্যাপারটা আমি অতটা বুঝতাম না। এটাও বিশাখা আমায় শিখিয়েছে। বলল, ‘কাম’অন। ফোনটা দাও।’ দিলাম। ও করল কি, গুগল ম্যাপে গিয়ে আমাদের ক্যাম্পাসের বয়েজ উইং আর লেডিস উইংয়ের বিল্ডিংটা লোকেট করে রেজিস্টার করল। মানেটা হল, গুগল ম্যাপে গিয়ে এর পর থেকে আমাদের কোম্পানির এই ক্যাম্পাসের বয়েজ কিংবা গার্লস উইং সার্চ মারলেই সেটা পিন পয়েন্ট হয়ে যাবে। যে অ্যাপ ট্যাক্সিগুলো খুব চলে আজকাল, সেখানে দেখেছেন নিশ্চয়ই। কোনও নির্দিষ্ট অ্যাপার্টমেন্ট বা স্টোর বললেই ম্যাপে সেই লোকেশনটা দেখাতে থাকে, অবশ্য সেটা যদি আগে থেকে গুগল ম্যাপকে শিখিয়ে রাখে কেউ। বিশাখার সঙ্গে খুনসুটি চলল বেশ কিছুক্ষণ। ইটিং আউট হল রেস্তোরাঁয়। ক্যাম্পাসে ফিরে বয়েজ উইংয়ে আমার রুমটায় পৌঁছলাম যখন তখন রাত প্রায় পৌনে বারোটা। কাহিল লাগছিল। আসলে সারাদিনের ট্রেনিং সেশনের পরে জিম করাটা খুব এগজস্টিং। এসিটা চালালাম। ঘুম পাচ্ছিল খুব। ডিনারের সময় মা-বাবার মিসড কল ছিল চার-পাঁচটা। মুডটা ডাইভার্ট হয়ে যাবে ফোনগুলো তুলিনি তখন। কখন ঘুম এসে গিয়েছিল মনে নেই, হঠাৎ ফোনের রিংয়ে ঘুমটা ভাঙল। দেখি রাত একটা চল্লিশ। বিশাখা। হাস্কি লাগছিল গলাটা। বলল, ‘হাই, চল একটা গেম খেলি। আমি কলটা কেটে দেওয়ার পরেই তুমি তোমার আইফোনের গুগল ম্যাপটা অন করে দেবে। স্পিকারটাও। আমার উইংটা লোকেট করে ডিরেকশন চাইবে। আর তুমি অ্যাকর্ডিংলি চলে আসবে। নাথিং মোর নাউ। তোমার ফিলিংয়ের জন্য ওয়েট করব আমি।’ 

রাতবিরেতে এসবের কোনও মানে হয়! কিন্তু ওই যে বললাম, বিশাখা আমার কাছে হট চকোলেট সসের মতো। কস্টলি কিন্তু প্লিজিং। নিচে নামলাম। যা বলল তাই করলাম। বাধ্য মাউস ক্লিক খুঁজে যায়। গুগল ম্যাপ বলল, ওয়াক স্ট্রেট ফর সেভেনটি মিটারস অ্যান্ড টার্ন লেফট। চোখে কাপড় বেঁধেও যে রাস্তাটা যেতে পারতাম, মধ্যরাতে তাতে টর্চ ফেলছিল গুগল। বিশাখার জন্য। মাথা দপদপ করছিল। বাঁদিকে মুড়লাম। ওয়াক স্ট্রেট ফর টুহান্ড্রেড অ্যান্ড থার্টি মিটারস। হাঁটছিলাম। শীত করছিল। আর স্ক্রিনে দুশ তিরিশটা কমে কমে দুশ কুড়ি, একশ সত্তর, একশ হচ্ছিল। আকাশে আধখাওয়া চাঁদ। আমারই মতো ঘুম পেয়েছে ওর। দেখি লেডিস উইংয়ে ঢোকার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশাখা। একটা লাল টাইট টপ আর শর্টস। মিনি না মাইক্রো মিনি? দুটো মাখন পায়ের দিকেই তাকিয়েছিলাম প্রথমে। চোখাচুখি হতেই নিজের ঠোঁটে আঙুল দিল বিশাখা। মানে কথা বলা মানা। মনে হল, কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করছে ও। আমি এগোচ্ছি। কাছে আসছি। গুগল ম্যাপের থেকে সেই যন্ত্র মেয়েটা হঠাৎ বলে উঠল, ‘ইওর ডেস্টিনেশন ইজ অন দ্য লেফ্ট।’ আর এটা শুনেই আমার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল বিশাখা। একটা চুমু খেয়েই আমার হাত থেকে নতুন আইফোনটা নিয়ে বলে উঠল ‘ইয়েস, আমি পেরেছি, ইয়েস। আমার ফার্স্ট গুগল ম্যাপ এক্সপেরিমেন্ট। বলো, প্লিজ বল, কেমন লাগছে তোমার?’ মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল। কোথায় যেন শুনেছিলাম, কোনও কোনও মিথ্যে সত্যির থেকেও অনেক বেশি দামি। বিশাখাকে বললাম, ‘অর্গাজম হচ্ছে বেবি। এবারে যাই তাহলে?’ এটা শুনে বিশাখা আমায় জাপটে ধরে বলল, ‘আমারও।’ সেই হাস্কি গলাটা শুনলাম, আবার। আরও বলল, ‘উই মাস্ট থ্যাঙ্ক গুগল। ডেস্টিনেশন অ্যারাউভড কথাটা শোনার জন্য কি ভাবে আমি ওয়েট করছিলাম ইউ ক্যান্ট ইমাজিন।’ একটা কিস করে বিশাখা বলল, ‘গুড নাইট লাভ। আর ফোনটা আমি রেখে দিলাম। কাল পাবে অফিসে। গুগল ম্যাপের বেশ ওল্ডার ভার্সান ইউজ করছ তুমি। আমি আপডেট করে দেব। সি ইউ।’ গলার কাছে এসেও যে কথাটা আটকে গিয়েছিল তা হল, সকালে বাড়িতে একটা ফোন করব ভেবেছিলাম। আজ সারাদিন কথা হয়নি। বলতে পারিনি। তিনশ মিটার আসার জন্য গুগল ম্যাপের আপডেটটা বেশি জরুরি ছিল, না বিশাখা, নাকি উনিশশো কিলোমিটার দূরের একটা ফোন, এখন আর ঠিক মনে পড়ে না।


আজ রবিবার। ছুটি। সকাল থেকেই আকাশে আজ মেঘ। সঙ্গে ঠান্ডা হাওয়া। টু পয়েন্ট ফোর এক্স সার্জ দিয়ে সকালবেলা শ্যামবাজার থেকে আমার নিউ টাউনের ফ্ল্যাটে আসার জন্য যে অ্যাপ সেডানটা বুক করলাম, সেখানে রেডিওতে একটা গান বাজছিল। এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে কাটে না যে মন। বোরিং। মেঘ দেখে বাবা মাকে বলছিল, ‘আজ দুপুরে খিচুড়ি করবে না কি?’ আমি মনে মনে বললাম, স্পেয়ার মি। আধঘণ্টার মধ্যে রেডি হয়ে গিয়ে গাড়িটা বুক করে দিলাম। এসি ক্যাব। বেরনোর পরেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামল। গাড়ির কাচটা নামিয়ে দিলাম। বৃষ্টিটা এনজয় করতে ইচ্ছে করছিল খুব। আর আরও বেশি করে এনজয় করতে ইচ্ছে করছিল বিশাখাকে। দুজনেই কলকাতায় ফিরে এসেছি মাস চারেক। এর মধ্যে অফিস ছাড়া ওকে পাইনি। আসলে কলকাতায় কোনও প্রাইভেসি নেই। ত্রিবান্দ্রমের সেই কোজি মুহূর্তগুলো মিস করি। 

আমার ফ্ল্যাটটা এখনও দেখানো হয়নি বিশাখাকে। সুযোগ পাইনি। নতুন প্রজেক্টে দুজনেরই খুব চাপ। বেরোতে রাত হয়। গাড়িতে উঠেই ওকে একটা ফোন করলাম। বললাম, ‘একসাথে ভিজতে ইচ্ছে করছে খুব।’ বিশাখা বলল, ‘অ্যাট লাস্ট? লেটস গো টু অ্যাকোয়াটিকা।’ আমি গলা নামিয়ে বললাম, ‘ফ্ল্যাটটা ফাঁকা আছে। চলে এস।’ ও বলল, ডান। 


প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে এখন। অন্ধকার করে এসেছে চারদিক। ঘড়ি না দেখলে বোঝাই যাবে না যে এখন মাত্র সাড়ে তিনটে। 

বিন্দু বিন্দু আলোগুলো আজ জ্বলে উঠেছে খুব তাড়াতাড়ি। ধোঁয়াশার মত লাগছে। বারো তলার উপরে আদম ইভের মতো শুয়ে আছি আমরা। একই সঙ্গে শুয়ে আছে দুটো আধখাওয়া আপেলও। আমি বিশাখার জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় আছি।

আপাতত বিশাখার মন খারাপ। ওর আইফোনের স্ক্রিনে কারেন্ট ওয়েদার দেখানোর যে অ্যাপটা আছে, সেটা আপডেট হচ্ছে না কিছুতেই।

স্ক্রিনে দেখাচ্ছে সানি।

ওটা থান্ডারস্টর্ম না হওয়া অবধি বিশাখা আমার কাছে আসবে না।


1 টি মন্তব্য: