শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

সাব্বির জাদিদ'এর গল্প : স্বস্তিকর দুঃসংবাদ

মহল্লায় ফরহাদকে নিয়ে কানাঘুষা আছে। তার বিয়ের বয়স ছয় পেরিয়ে সাতে গড়িয়েছে। এখনো ছেলেপুলে হয়নি। কানাঘুষা ফরহাদের পৌরুষত্ব নিয়ে। সমস্যাটা কার? ফরহাদের নিজের, না তার স্ত্রী রুবিনার? ফরহাদ চুপচাপ ধনরনের মানুষ। অফিসের কলিগ মাসুদ ছাড়া তার ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধুও নেই, যার কাছ থেকে ফরহাদের বেডরুমের খবর নেয়া যায়। তাই শত কৌতূহল সত্ত্বেও মহল্লাবাসী ঘটনার শেকড় পর্যন্ত পৌঁছতে পারছে না।
মহল্লাবাসী দূরে থাক, বিয়ের প্রথম তিন বছরে খোদ রুবিনাই জানতে পারেনি তারা কেন বাচ্চা নিচ্ছে না। তিন বছরের মাথায় রুবিনা প্রথম জানায় তার মা হতে ইচ্ছে করে। মাতৃত্বের জন্য ফেনিয়ে ওঠা স্ত্রীর দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকে ফরহাদ। তারপর গম্ভীর হয়ে যায়। রুবিনা ফরহাদের ঘাড়ের নিচে ডান হাতের মাঝের তিন আঙুলের গুতো দিয়ে বলে, কী ব্যাপার! অমনি পাহাড়ের মতো গম্ভীর হয়ে গেলে!

পাহাড়ের সাথে দেয়া গাম্ভীর্যের এই তুলনাটা রুবিনা শিখেছিল শামিমের কাছ থেকে। ইন্টারমিডিয়েটের কালে শামিমের কাছে রুবিনা কেমিস্ট্রি পড়ত। বিজ্ঞানের ছাত্র শামিম কবিতা লিখত। কোথাও কোথাও নাকি ছাপাও হতো সেসব কবিতা। রুবিনা কোনোদিন পড়ে দেখেনি। পড়ানোর ফাঁকে শামিম প্রায়ই তার কবিতা যাপনের কথা বলত। রুবিনার ওসবে আগ্রহ নেই, সে কথার প্রসঙ্গ অন্য রাস্তায় তুলে দিত। ফলে ইচ্ছে থাকলেও নিজের কবিতা ছাপা হওয়া কোনো পত্রিকার কপি রুবিনার সামনে মেলে ধরেনি শামিম। এই কবিতা লেখা শামিম কোনো কোনো দিন রুবিনার মন খারাপ থাকলে বেশ কাব্যিক স্বরে বলত, কী ব্যাপার রুবি, আজ যে তুমি পাহাড়ের মতো গম্ভীর!

এতদিন পর প্রাইভেট স্যারের কাছ থেকে শেখা সেই উপমাটা ফরহাদের উপর প্রয়োগ করতে পেরে ভালোই লাগে রুবিনার। মা হওয়ার আহ্লাদে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে সে। স্বামীর শরীরের উষ্ণতা নিজের ভেতর অনুভব করে। আরো কতক্ষণ চুপ করে থেকে ফরহাদ বলে, কিন্তু আমি বাবা হতে চাইনে।
যেন অন্ধকারে ভুল মানুষের ঘনিষ্ঠ হয়েছিল, আলো জ্বলে ওঠায় ভ্রান্তি কেটেছে, এমন ভঙ্গিতে তড়াক করে স্বামীর গলা ছেড়ে দেয় রুবিনা। বড় বড় চোখে বলে, মানে!
আমি বাবা হতে চাইনে।
কারণ?
এই দেশ আমার সন্তানের জন্য উপযুক্ত নয়। শুধু নিজেদের মাতৃত্ব আর পিতৃত্বের লালসায় একটা শিশুকে এই অস্থির পৃথিবীতে ছেড়ে দেয়ার কোনো কারণ দেখি না।
এই জন্য তুমি সন্তান নিবা না?
হুম।
রুবিনার আবার শামিমের কথা মনে পড়ে। শামিমও এমন অদ্ভুত সব ব্যাপার নিয়ে ভাবত, যেটাকে অন্যরা ভাবনার কোনো বিষয়ই মনে করে না। একবার ঈদে সে মেহেদি পাতা বেটে হাত রাঙিয়েছিল। শামিম দেখে বলেছিল, এই রঙ মেহেদির রক্ত। মেহেদির পাতা চিবড়ে চিবড়ে তোমরা তার রক্ত বের করেছ। একটা সময় বলি দেয়া শিশুর রক্ত দিয়ে উৎসব করা হতো পৃথিবীতে। এখন তোমরা গাছের রক্ত দিয়ে উৎসব কর। আমি রক্তের গন্ধ পাচ্ছি। শামিমের কথায় থমকে গিয়েছিল রুবিনা। রাঙানো হাতের দিকে তাকিয়ে সে কতক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আজও সে একই রকম থমকে গেছে ফরহাদের কথায়। শামিম না হয় কবি ছিল, উদ্ভট ভাবনা-চিন্তা করা তার মানায়। ফরহাদ তবে কী! তারুণ্যে সেও কি তবে কবিতা লিখে সুন্দরীদের মুগ্ধ করার চেষ্টা করত!

তাই বলে কি বাচ্চাকাচ্চা নেয়া থেমে আছে মানুষের? রুবিনা যুক্তি দেয়।
থেমে নেই। আর সে জন্য বাবা-মার দুশ্চিন্তারও অন্ত নেই। মনে রাখবা, যার সন্তান নেই তার সন্তান হারাবার ভয়ও নেই। 
আচ্ছা, তুমি কি আগে কবিতা চর্চা করতে? 
কেন বল তো?
ব্যাংকার না হয়ে তোমার কবি হওয়ার দরকার ছিল।
তুমি চাইলে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে কবিতা লেখা শুরু করতে পার। 

পাঁচ ভাইবোনের সবার ছোট ফরহাদ। মা-বাবার অপ্রয়োজনের সন্তান সে--মাঝে মাঝে ভাবে ফরহাদ। তার জন্ম না হলে মা-বাবা, ভাইবোনের সুখের কোনো ঘাটতি পড়ত না। সে এসে খুব যে উপকার হয়েছে সংসারের, তাও না। চার বোনের পর তার জন্ম হলে একটা কথা ছিল। লোকে বলত, চার মেয়ের পর কাঙ্ক্ষিত ছেলে-- বংশের প্রদীপ--তাও সে নয়। অপ্রয়োজনের সন্তান ছাড়া সে তবে কী! এই পৃথিবীতে এসে সে কম বিপদ দেখেনি। স্কুলে থাকতে একবার তার পা ভেঙেছিল। স্কুল থেকে ফিরছিল। দুটো যুবক মোটর সাইকেল পাল্লা দিয়ে চালাতে গিয়ে তার পায়ের উপর তুলে দিয়েছিল। দেড় মাস সে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেনি। ভীষণ যন্ত্রণা। দেড় মাস সে বিছানায় কাঁতরিয়েছে আর মাঝে মাঝে জীবন নিয়ে ভেবেছে। তার জন্ম প্রকৃতির ভুল সিদ্ধান্ত। যে পৃথিবীর স্কুলপথ একটা শিশুর জন্য নিরাপদ নয় সেই পৃথিবীতে কেন শিশুর জন্ম হবে! পরবর্তী জীবনে যতবার বিপদে পড়েছে ফরহাদ, ততবার নিজের জন্ম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে নিজের কাছে। তার জন্মের পেছনে তার নিজের কোনো হাত ছিল না। কিন্তু তার সন্তানের জন্মের পেছনে তার হাত আছে। সে চায় না, এই শ্বাপদের দেশ নতুন আরেকটা শিশুর দীর্ঘশ্বাসে ভারি হোক।

রুবিনার বাবার বাড়ি থেকে চাপ আসে রুবিনার উপর। ছেলেমেয়েকে বিয়ে দেয়া হয় নাতিপুতির আশায়। সেটা যদি না হয়, জীবন মরুভূমি। রুবিনার বাবামা শারীরিক সক্ষমতা থাকতে থাকতে নাতিপুতিকে বড় করে যেতে চায়। তাদের সে আশায় বালি ফেলেছে ফরহাদের খেয়ালি মন। জামাইয়ের উপর তাই বিরক্ত রুবিনার বাবামা। বাবামার চাপ আর নিজের মাতৃত্বের ব্যাকুলতা দিয়ে একবার ফরহাদকে রাজি করিয়ে ফেলে রুবিনা। ঠিক সেই দিনই এক দুর্ঘটনা ঘটে। বগুড়ায় স্কুলের পিকনিকের বাস খাদে পড়ে চোদ্দ শিক্ষার্থী নিহত। টিভির পর্দায় নিহতদের লাশ আর অভিভাবকের আহাজারি দেখে বিষন্ন হয়ে ওঠে ফরহাদ। রুবিনার সকল প্রচেষ্টা এই এক ঘটনায় মাঠে মারা যায়। তার নিজের বুকটাও খচখচ করে ওঠে ব্যথায়। আজ ওই ছেলেগুলোর সাথে যদি তার ছেলেটাও মরত! রুবিনা ভাবতেই পারে না এসব। দ্রুত চ্যানেল ঘুরিয়ে সে নিজে মুক্তি পায়, মুক্তি দেয় স্বামীকে।

মাস ছয়েক পরে স্বামীকে বাচ্চার ব্যাপারে আবারো প্রলুব্ধ করে তোলে রুবিনা। ফরহাদও একজন মানুষ এবং পুরুষ মানুষ। তারও ইচ্ছে করে বাবা হতে। কল্পনার চোখে সে দেখে, অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফেরার পর একটা মিষ্টি মেয়ে বাবা বাবা বলে তার গলা জড়িয়ে ধরছে। সে মেয়ের গালে গাল ঘঁষে দিয়ে লুঙ্গি চাচ্ছে রুবিনার কাছে। অমনি মায়ের আগেই মিষ্টি মেয়েটা লুঙ্গি নিয়ে হাজির।

এমন সুন্দর স্বর্গীয় ছবি নিয়ে ভাবে যে পুরুষ, তাকে খুব সহজেই উস্কে দেয়া যায়। রুবিনার আস্কারায় ফরহাদ নতুন করে বাবা হওয়ার ভাবনা ভাবতে থাকে। ঠিক সেই মুহূর্তে নতুন ঘটনা শোনা যায়। চাঁদপুরে ল ডুবিতে দেড়শ মানুষ নিখোঁজ। শিউরে ওঠে ফরহাদ। এত লাশ! এত মৃত্যু! এত এত বুক খালি! সে আবার আগের মতো পাথর হয়ে যায়। খবর শুনে রুবিনাও ঢুকে যায় নিজের নির্জন পৃথিবীতে। 

দিন গেলে সবকিছুই ফ্যাকাশে হয়ে আসে। মায়ের মৃত্যুশোকও হয়ে যায় স্বাভাবিক। চাঁদপুরের সেই দুর্ঘটনা মুছে যায় রুবিনার স্মৃতি থেকে। তার মাতৃত্ব আবার প্রবল হয়ে ওঠে। সামাজিকতা, পিতৃত্ব আর স্ত্রীর ফুসলানিতে ফরহাদের দোদুল্যমাম মন সন্তান নেয়ার ব্যাপারে স্থির হয় আবার। তখন আবার নতুন ঘটনা ঘটে। সকালে টিভি খুলে দেখা যায় চ্যানেলে চ্যানেলে হইচই পড়ে গেছে। নারায়নগঞ্জে খেলার মাঠের পাশে গভীর পাইপের ভেতর পড়ে গেছে দেড় বছরের শিশু। দমকল বাহিনী উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। টিভি সাংবাদিকদের ভেতর শরীরি প্রতিযোগিতা--কে কতটা বিশ্বস্ততার সাথে দেখাতে পারে ঘটনা। ফরহাদের মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। রুবিনা রাঁধছিল। ফরহাদ গলা চড়িয়ে ডাকে স্ত্রীকে। ফরহাদের এমন গলা কমই শোনা যায় তাই রান্না ফেলে তখনই ঘরে ছুটে আসে রুবিনা। ফরহাদ বলে, দেখ, সিনেমা দেখ।

আঁচলে ভেজা হাত মুছতে মুছতে রুবিনা কৌতূহল ব্যক্ত করে-- কই সিনেমা! 
ফরহাদের ব্যাখ্যা করতে হয় না কিছু। মোটা মোটা লাল অক্ষরের ব্রেকিং নিউজ পড়ে গা গুলিয়ে ওঠে রুবিনার। চোখে আতঙ্ক ফুটে ওঠে। সে দোয়া করতে থাকে-- আল্লাহ, বাচ্চাটা যেন জীবিত উদ্ধার হয়। না জানি ওর মার এখন কেমন লাগছে।
ফরহাদ পরিহাসের গলায় বলে, বাচ্চা বাচ্চা করে পাগল হয়ে যাও, কেন, বাচ্চা নিবা না! এই দেশ কি বাচ্চার জন্য নিরাপদ!
অন্য সময় হলে রুবিনা বলত--কোটি কোটি মানুষের দেশে একটা দুটো দুর্ঘটনা ঘটেই। সেই ভয়ে কি কেউ নিঃসন্তান থাকে! আজ সে কিছু বলতে পারে না।

এতদিনে স্বামীর বুকের ভেতরের কোমল জায়গাটার সন্ধান সে পেয়ে গেছে। মমতায় স্বামীর মাথাটা সে বুকের সাথে চেপে ধরে। চুলে আঙুল চালিয়ে আদর করে দেয়। রুবিনা আর রান্নার ঘরে যায় না। সেখানে কাজের মেয়ে আছে। ফরহাদের অফিসে যেতে ইচ্ছে করে না। তার মনে হয় রাস্তায় বেরোলে পেছন থেকে কোনো দানব লরি তার গায়ের উপর উঠে যাবে। মানুষ থেকে মুহূর্তে সে হবে থেতলানো লাশ।

ফরহাদ বারবার চ্যানেল পাল্টায়। দেশি চ্যানেল থেকে সে দূরে থাকতে চায়। পাইপের ভেতর থেকে বাচ্চা বের করার এই হই-হাঙ্গামা তার অসহ্য লাগে। কিন্তু বেশিক্ষণ না দেখে থাকতেও পারে না। সে মনেপ্রাণে কামনা করে-- খুব শিগগিরই যেন বাচ্চাটা জীবিত উদ্ধার হয়।
দুপুর গড়িয়ে গেলেও বাচ্চাটা উদ্ধার না হওয়ায় বাচ্চার বেঁচে থাকার আলোগুলো ধীরে ধীরে নিভে যায়। ফরহাদ টিভি বন্ধ করে উঠে পড়ে। তার বাইরের যাওয়ার প্রস্তুতি দেখে রুবিনা খেয়ে যেতে বলে। ফরহাদ রুবিনার কথার জবাব না দিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে যায়।

এক মেঘলা দিনে ছোট ছোট দুই মেয়ে নিয়ে বেড়াতে আসে রুবিনার ছোটবোন স্বপ্না। মায়ের পরামর্শে বিশেষ এক মিশন হাতে নিয়ে সে আসে। মিশনের অস্ত্র স্বপ্নার দুই মেয়ে জেরি আর শেরি। স্বপ্না দুইদিন থাকবে বড়বোনের বাসায়। দিনরাত ফরহাদের সামনে লাফালাফি করবে জেরি শেরি। শ্যালিকার বাচ্চা দেখে ফরহাদ হয়ত বাচ্চার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে। ষড়যন্ত্রের এই আয়োজন ফরহাদ যে বোঝে না, এমন না। সে বোঝে স্বপ্নাকে পাঠিয়েছে তার মা, ফরহাদের শাশুড়ি। তার মজাই লাগে। আবার দুঃখও পায়-- কেউ তাকে বুঝতে পারে না। সে সন্তান চায় না এমন না। বাবা হলে তার চেয়ে খুশি আর কেউ হবে না। কিন্তু এই দেশ কি নতুন একটা শিশুকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত! যদি প্রস্তুত না হয় তাহলে নিজেদের সুখের জন্য কেন একটা বাচ্চাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া!

রাতে শেরিকে নিজেদের ঘরে রাখে রুবিনা। ফরহাদ আর রুবিনার মাঝখানে শোয় শেরি। শেরিও কি এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত! নইলে খালাকে রেখে সে কেন ফরহাদের গলা জড়িয়ে ধরে! ফরহাদ শেরির নরম গালে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে শেরি। সেই হাসিতে রাতের ঘর দুলে ওঠে। হাসি নয়, যেন ফেরেশতার পাখার পবিত্র আওয়াজ। শেরির গায়ের শিশু শিশু গন্ধ মাতাল করে তোলে ফরহাদকে। এত বছরের পাথরচাপা পিতৃত্বের মোহ শেরির স্পর্শে বল্গাহীন হয়ে যায়। সে এই প্রথমবার প্রটেকশন ছাড়াই রুবিনার উপর উপগত হয়। 

দেড়মাস পর লাজুক গলায় সংবাদটা জানায় রুবিনা। ফরহাদ তখন অফিসে। রুবিনা মা হচ্ছে। ফরহাদ হচ্ছে বাবা। সম্পূর্ণ অপরিচিত এক অনুভূতি আচ্ছন্ন করে ফরহাদকে। অপরিচিত হলেও সে বুঝতে পারে-- এই অনুভূতির ভেতর আনন্দ এবং শঙ্কা দুটোই একাকার হয়ে মিশে আছে। আনন্দ যখন প্রবল হয়, তার রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। আর ভয় যখন প্রবল হয়, সে সম্পূর্ণ শীতল হয়ে যায়।

ছয়মাস থাকতেই বউকে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেয় ফরহাদ। এই সময় একটা মেয়ের কী কী দরকার হয়, কেমন সেবাযত্ন লাগে-- কিছুই জানে না ফরহাদ। আর জানে না বলেই বউকে নিজের কাছে রাখার ঝুঁকি নিতে পারে না। প্রথম মা হচ্ছে রুবিনা, এই সময় সে তার অভিজ্ঞ মায়ের কাছেই থাকুক।

ডাক্তার আলট্রাসনো করে মেয়ে হওয়ার খবর দেয়। ফরহাদের মেয়ে পছন্দ। কিন্তু মোবাইলে সংবাদটা শোনার পর নতুন শঙ্কা দানা বেঁধে ওঠে। এই দেশে তো মেয়ে শিশু সবচে বেশি অনিরাপদ। তার এই শঙ্কা আরো পোক্ত করতে সেদিনের সংবাদপত্র সাতক্ষীরায় সাড়ে ছয় বছরের শিশু ধর্ষণের নিউজ ছাপে আর ফরহাদের ভেতরটা এলোমেলো হয়ে যায়।

আনন্দ আর শঙ্কার পে-লামে দুলতে দুলতে ডাক্তারের দেয়া তারিখটা এসেই যায় ক্যালেন্ডারের পাতায়। ফরহাদের ইচ্ছে ছিল সিজারের আগের দিন থেকে সে স্ত্রীর কাছে থাকবে। কিন্তু অফিসে অপ্রত্যাশিত এক কাজের চাপে সে আটকে যায় এবং পরদিন অর্থাৎ সিজারের দিন শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়। গাড়িতে উঠে সে জানতে পারে রুবিনাকে অটিতে নেয়া হয়েছে। আনন্দ আর টেনশনে চোখে পানি এসে যায় ফরহাদের। গাড়িতে ওঠার দোয়াটা সে অনেক কষ্ট করেও মনে আনতে পারে না। গাড়ি যেন দ্রুত এবং নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছায় সে আল্লাহর কাছে দোয় করতে থাকে। শেখপাড়া বাজার পার হলে পেছনের দিকের সিটে ছোটখাটো হট্টগোল লাগে। হইচইয়ের ভেতর থেকে যেটুকু শোনা যায়-- ভাড়া আদায় করতে গিয়ে একা একা কলেজে যাওয়া এক তরুণীর গায়ে হাত দিয়েছে সুপার ভাইজার। একবার পেছন ফিরে মেয়েটার বিব্রত লাল মুখ দেখে আর তাকাতে পারে না ফরহাদ। তার কান দিয়ে গরম বাতাস বের হতে থাকে। স্ত্রীর পেটে নিজের মেয়েটার কথা মনে পড়ে। 

বাস থেকে নেমে রিকশা নিয়ে সে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায়। অটির সামনে গিয়ে সে শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের দেখা পায়। শ্বশুর-শ্বাাশুড়ি, স্বপ্না, স্বপ্নার বর সবাই আছে। সবার মুখ থমথমে। শাশুড়ি কাঁদছে। স্বপ্না মাকে আকড়ে ধরে আছে। শ্বশুর বসে আছে নিচু মাথায়। অটির সামনের পরিবেশ একটি পূর্ণাঙ্গ দুঃসংবাদ হয়ে থমকে আছে। ফরহাদ ধীর পায়ে জটলার ভেতরে ঢুকলে স্বপ্নার বর তার কাঁধে হাত রাখে। সান্ত্বনা দেয়ার ভঙ্গিতে নরম গলায় বলে, মন খারাপ করবেন না ভাই। ডাক্তার চেষ্টা করেছে কিন্তু বাচ্চাকে বাঁচানো যায়নি। ফরহাদ ঝট করে শাহেদের দিকে তাকায়। শাহেদের চেহারার বিপর্যস্ত বলিরেখা ঘটনা সত্যতার সাক্ষ্য দেয়। বাচ্চাটা পেটে আসার পর থেকে আনন্দ আর শঙ্কা--দ্বান্দ্বিক দুটো অনুভূতি কাজ করছিল ফরহাদের। আজও দ্বান্দ্বিক দুটো সত্তা নিজের ভেতর আবিষ্কার করে সে। বাচ্চার মৃত্যু সংবাদে সে কষ্ট পায় বটে, তবে অন্যরকম স্বস্তিতে হালকা হয়ে ওঠে ভেতরটা। তার চেহারায় সেই স্বস্তির ছায়া ফুটে ওঠে। ফরহাদ তখন চঞ্চল হয়ে ওঠে। সন্তানের মৃত্যুসংবাদে স্বস্তি পাওয়া অপরাধ। সেই অপরাধ ঢাকতে ফরহাদ দ্রুত ওয়াশরুমে ঢোকে। 

৩টি মন্তব্য:

  1. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  2. শেষের দিকটাতে একটু তাড়াহুড়ো লাগল। কিন্তু প্লটটা বেশ স্পর্শকাতর। গল্পকার সাজিয়েছেন ভালো।

    উত্তরমুছুন
  3. গল্পটা অসাধারণ ছিলো।
    কিন্তু একটা জিনিস কি, মাথা ব্যাথা হলে মাথা কেটে ফেলো। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম হয়ে গেলো না?

    উত্তরমুছুন