শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

কিউবার গল্প : ইজ্জত ধোলাই

মূল গল্প : নোরবার্তো ফুয়েন্টেস
বাংলায়ন : কুলদা রায়

(নোরবার্তো ফুয়েন্তেস কিউবায় জন্ম গ্রহণ করেছেন ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে।) 

বুড়ো কর্মীটি সাহস করে তাকে বলল, ‘ এটা অতি সামান্য দেরি মাত্র। মোরগের ডাক শুনে দেখো। তারা বলছে--কতটা দেরি হয়েছে। তুমি কেনো বাড়িতে যাও না মাঝে মাঝে? কেনো তোমার তরুণ মাথাকে বিশ্রাম দাও না? সব ঝামেলাই ঠিক করা যায়। এক বুড়ো লোকের পরামর্শ শোনো। কেনো তুমি বাড়ি যাও না?’

‘কিছুই করার নেই!’ চেঁচিয়ে বলল মিলিশিয়া লোকটি। টেবিলের পাশে একটি টুলের উপর সে বসেছিল। তার বন্দুকটি আর আটটি ম্যাগাজিনে পোরা বেল্টটি রেখেছে টেবিলের উপর। তার বসার টুলটি দেওয়ালের সঙ্গে হেলানো। তার শার্ট কুচকানো --প্যান্টের বাইরে বেরিয়ে রয়েছে। তার চোখের পাপড়ি ঘুমে ভরা। 

‘আমি--কিছুই করার নেই বলেছি। আমার মানুষটির ইজ্জত ধুয়েমুছে পরিস্কার না হওয়া পর্যন্ত এই ঘরে কেউ ঘুমোতে পারবে না। খুব ভালোভাবে ধোলাই হতে হবে যাতে তা ঝক ঝক করে।’

বুড়ো লোকটি দুপুর থেকে বলা কথাগুলো আবার শোনালো- ‘কিন্তু কিভাবে আমরা তা ধোলাই করবো? দেখো, এটা অনেক দেরি হয়ে গেছে।’ 

‘বুড়ো, তুমি খুবই চালু মাল। চুপ করো এখন। তুমি জিজ্ঞেস করছো--আমি কিভাবে আমার ইজ্জত ধোলাই করব। এখনো আমি সেটা নিয়ে ভাবিনি। তবুও মাঝে মাঝে আমার বিবেক আমাকে বলে যে, আমার প্রতিশোধ হবে দীর্ঘ এবং ভয়ঙ্কর। এটা অন্যভাবে হতে পারে না। এটা স্পষ্ট যে, তুমি আজ সেনা ব্যারাকে ছিলে না। তুমি বলছ--আগামী কাল আমাদের এটা ঠিক করা উচিত। সম্মান অপেক্ষা করতে পারে না।’ সে দৃঢ়ভাবে এটা ঘোষণা করল। আর দেরি না করে কানের দুপাশের চশমার ডাঁটি চেপে ধরল যাতে তার মাথা থেকে কিছু ভাবনা বের হয়ে আসে। 

‘ ওহ, শোধ নেওয়ার মতো কিছু আমি ভাবতে পারি না।’ ফ্লোরেন্টিনা তার বাবামায়ের মাঝখানে বসেছিল শাস্তিভোগকরা স্কুল বালিকার মতো। বৈঠার মতো ঢেউ তোলা তার নিতম্বে জোর ছিল না। তার কালো দীর্ঘ চুলগুলো কাঁধের উপর এলোমেলো হয়ে আছে। তার গায়ের ত্বক ম্রিয়মান হয়ে পোষাকের সঙ্গে লেপ্টে আছে। একটি ভেজা রুমাল তার ভেঙ্গে পড়ার পরিচয় দিচ্ছিল। 

‘তুই কাঁদবি না আর। চোখের জল ফেলা থামা।’ মিলিশিয়া লোকটি আদেশ করল। ‘বারো ভাতারি কুত্তি’ এই শব্দ তিনটি বাক্যটির শেষে জুড়ে দিল। 

‘এটা কিন্তু আমি সহ্য করব না।’ ঝিমুনি ভেঙ্গে লাফিয়ে উঠল ফ্লোরেন্টিনার মা। 

‘ কেনো নয়?’ জিজ্ঞেস করল মিলিশিয়া লোকটি। বলে টেবিল থেকে তার সাবমেশিন গানটি হাতে নিল। বলল, সহ্য করতে না পারলে আয় তো, দেখা-- কি করতে পারিস।’

‘ ঈশ্বরের দোহাই লাগে, এটা করবেন না।' উত্তর দিল মা। 

এবং সে কথায় কান না দিয়ে সে বলে চলল, ‘ সহ্য করতে পারবি না, কে তোকে এই বারোভাতারি কুত্তিকে জন্ম দিতে বলেছিল?’ 

একটা জোর হেঁচকি উঠে এলো ফ্লোরেন্টিনার বুক থেকে। 

শেষ পর্যায়ে মিলিশিয়া লোকটি কাঁদতে লাগল। তার পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করল। কাগজটিতে সারি করা দাগ আছে। স্কুলের নোটবুক থেকে ছিড়ে আনা এই কাগজটিতে ফ্লোরেন্টিনা বড়ো বড়ো বিক্ষিপ্ত অক্ষরে লিখেছে। ‘তুমি কি এটা দেখেছো হে বুড়ো? এটা কি ভালো করে পড়েছো?’ 

‘ না, বাছা। তোমার আসার আগে এই দুপুরে আমি কিছুই দেখিনি।’

‘ কিন্তু খুব খেয়াল করে পড়েছো এ কাগজের লেখাগুলো? দেখো এটা। যে লজেঞ্জগুলো তুমি পাঠিয়েছিল তা অতি সুস্বাদু। দেখো, দেখো, এখানে চোখ মেলে দেখো। যদি তোমার কোনো ময়লা জামাকাপড় থাকে সেগুলো আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। আমি কেঁচে ধোলাই করে দেবো। দেখেছ?’ এরপরে সে সত্যিকারের আবেগে হা হা করে কাঁদতে লাগল।

যে পর্যন্ত না তার কোম্পানি ইন্সট্রাক্টর তাকে ডাকল সে পর্যন্ত তার গলা থেকে কান্না থামল না। 

‘ ওরে র‍্যামন পালোমো!’ ব্যারাকের দরজা থেকে ইন্সট্রাক্টর চেঁচিয়ে ডাকল। ‘ শোনো র‍্যামন পালোমো, তুই কি তোর ভাইয়ের পাশের বাড়ির ফ্লোরেন্টিনাকে চিনিস ?’

‘ নিশ্চয়ই চিনি কমরেড ইন্সট্রাক্টর। সে আমার মেয়েবন্ধু। আমার অফিসিয়াল বাগদত্তা। তার দুহাত আমার দুহাতের সঙ্গে মেলানোর দিনটির জন্য অপেক্ষা করছে।’ 

শুনে ইন্সট্রাক্টর তাকে বলল, ‘বেশ, তবে প্রতিবিপ্লবী ডাকাতদেরকে যে মেয়ে বান্ধবীরা চিঠিপত্র লেখে তাদের ব্যাপারে সতর্ক হ।’ তারপর সে নোটবুকের একটি পাতা ছুড়ে দিল। পাতায় ঝকঝকে কিছু লেখা আছে। আর খুব অদ্ভুতভাবে সেটা ভাঁজ করা রয়েছে। 

চিঠিটি কাঠের মেঝের উপরে পড়ে রইল। কিছুটা ভাঁজ খোলা। এই আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার কথা যে সময়ে ঈশ্বর ভাবেননি সেই সময়ের মতো নিরব হয়ে আছে ব্যারাকটি। 

‘কোথা থেকে?’ কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইল র‍্যামন পালোমো। 

‘রোসালিও ভালদেসের কাছ থেকে পেয়েছি চিঠিটা। কালকে এ লোকটি আমাদের প্রতিরক্ষা লাইন ভাঙ্গার চেষ্টা করছিল। তুইই তখন একে আটক করেছিলি।’

তারপর ইন্সট্রাক্টর আবার বলল, বেশ। শরীরচর্চার জন্য তাড়াতাড়ি চলে আয়।

তারপর সে প্রবেশ পথকে খালি রেখেই অর্ধেকটা দৌঁড় শেষ করল। 

র‍্যামন পালোমো জুতোর ফিতের গিট খুলে ফেলল। তার বুট জুতো ফেলে রাখল। ব্যারাকের লোকজন তখনো নিরবতা পালন করছে। র‍্যামন পালোমো তার খাটের উপরে শুয়ে পড়ল। মিলিশিয়া লোকগুলো ব্যারাক ছাড়তে শুরু করেছে। দরোজার কাছে চিঠিটা পড়েছিল। তাকে মাড়িয়ে যেতে তাদের বেশ অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল। 

তারা সবাই চলে গেল।

তারপর র‍্যামন পালোমো দরোজার দিকে এগিয়ে গেল। 

পরদিন সকাল নটার দিকে ফ্লোরেন্টিনার বাবা বাড়ি থেকে হেঁটে জুকা ক্ষেতের দিকে গেল। চাষের জন্য সেটা তিনি ক্ষেত প্রস্তুত করেছেন। দুপুরে যখন বাড়ি ফিরলেন, তখনো র‍্যামন পালোমো টেবিলে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিল। সাবমেশিন গানটি তার হাঁটুতে রাখা আছে। বুড়ো লোকটি নিজের বালিশটি এনে তার মাথার নিচে গুঁজে দিল। র‍্যামন পালোমোর ঘুম ভাঙল না। ফ্লোরেন্টিনার মা সাবমেশিন গানটি দূরের ওয়ার্ডরোবে রাখার সিদ্ধান্ত নিল যাতে সেটা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুলি বের না হতে পারে। 

রাত নটার সময় র‍্যামন পালোমো চোখ খুলল। তার সামনে এ বাড়ির লোকজন এক থালা জাউ দিল। সেটা সে খেলো। তারপর আগ্নেয় অস্ত্রটি চেয়ে নিল, নিয়ে কাউকে বিদায় না জানিয়ে চলে গেল। 

ফ্লোরেন্টিনা নিজেকে ঘরের মধ্যে সকাল থেকে বন্দি করে রেখেছিল। এরপর সে অনেকদিন ঘরের বাইরে গেল না। এভাবে সময় চলে গেল বছর খানেক। তখন সে শহরে গেল। লোকজন তার অতীত নিয়ে তার পিছনে নানা কথা বলাবলি করছিল। 


প্রেরিত ডকুমেন্ট
---------------------
এই পত্রটি একজন ডাকাতের ব্যাগের মধ্যে পাওয়া গিয়েছে। ডাকাতটি ১৯৬৩ সালের ১১ মে তারিখে এক যুদ্ধে মারা গেছে।

মি: রোজালফো ভালদেস, ঈশ্বর ও কুমারী মেরীর কাছে প্রার্থনা করছি এই চিঠি যখন আপনার হাতে পৌঁছাবে তখন আপিনি সুন্দর স্বাস্থ্য উপভোগ করছেন। মহাশয়, আপনার আদরমাখা চিঠির উত্তরে এটা লিখছি। একই সময়ে আমার সম্পর্কে আর ভাবনা না করার জন্য বলছি। আপনাকে আমি সুখী করতে পারিনি বলে দু:খ প্রকাশ করছি। আমি জানি আপনি আমাকে ভালোবাসেন। কিন্তু আপনার বোঝা উচিত যে, আমি একজনের বাগদত্তা। সেজন্য আপনার পবিত্র ভালোবাসা আমি গ্রহণ করতে পারি না। অবশ্য আমি মনে করি খুব ভালো মানুষ বলেই এই ভালোবাসা আপনার পাওয়ার যোগ্যতা আপনার ছিল। হবু স্বামীকে ছেড়ে আরেকজনের সঙ্গে কীভাবে যাওয়া সম্ভব এবং চিন্তা করে দেখবেন এটা করা আমার জন্য খুবই জটিল কাজ। আমি আপনাকে পছন্দ করি। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। আপনি জানেন, এখানে আর কিছু বাসনা থাকতে পারে না। আমার হৃদয়ের গভীর তলদেশ থেকে দু:খ প্রকাশ করছি যে আপনি এজন্য অনেক ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আমার আর কোনো উপায় নেই। আহা, যদি আমি বাগদত্তা না হতাম তাহলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতো। 

সব সময়েই আপনার প্রতি আমার ভালো অনুভূতি থাকবে। কিন্তু কোনো বাসনা থাকবে না। আমাকে আর কখনো চিঠি লিখবেন না। এটা বলার জন্য আমি 

দু:খিত। কিন্তু এটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আপনার চিঠি দেখে আমার ভালো লাগছে। একজন বন্ধু হিসেবে আপনি লিখতে পারেন। কিন্তু বাসনা নিয়ে লিখবেন না। আমি আর কোনো চিঠি লিখব না। কারণ আমার আশঙ্কা অন্যরা জেনে যাবে। শেষে, আশা করছি ঈশ্বর আপনার সঙ্গে থাকুন আর আপনাকে সাহায্য করুন। আমি আপনাকে বিদায় বলছি। এর সঙ্গে আমার কাছ কাছ থেকে প্রীতিসম্ভাষণ করুন--

-----ফ্লোরেন্টিনা লোপেজ
-------------------------------------------------------------------
বি.দ্র. মজাদার চকলেট পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ। যদি আপনার কোনো ময়লা কাপড় চোপড় থাকে তবে ছেলেদের দিয়ে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবেন। আমি কেঁচে ধোলাই করে দেবো।
--ফ্লোরেন্টিনা লোপেজ




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন