শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

কণিষ্ক ভট্টাচার্যের গল্প : অন্ধকার সঙ্ঘারামে

এক 

হিমহিম সন্ধে নামে। ঠাণ্ডা তেমন পড়ে না। কুয়াশা আর ধোঁয়া মিশে ছড়িয়ে থাকে দুধের সরের মতো। বাতাস বয় না এখন। রেললাইনে উঠলে দেখা যায়, মাঠের ওপর সাদা একটা স্তর স্থির হয়ে ভেসে রয়েছে। ধান কাটা হয়ে গেছে। কাটা ধান ঝেড়ে গোলায় তুলে দিয়েছে জন খাটা মেয়েমরদ। 

এখন মধুকরকে ঘুরতে হয় বেশি। মাঠে এখন ছড়ানো ধান আর নেই। এতদিন মাঠে ঘুরে ঘুরেই পেট ভরিয়ে ফেলত মধুকর। তারপর আরও ধান টুকিয়ে আনত আস্তানায়। মধুকরীর এখন খিদে বেশি। মধুকরীও ওর সঙ্গে সঙ্গে যায় মাঠে। ধান টুকায়। তেমন জোরে দৌড়তে পারে না বিপদআপদে। পেটের ভিতরের টলটলে জল যেন পিছন দিকে টানে ওকে। আর সেই জলে সাঁতার কেটে কিলবিল করতে থাকে ছানাগুলো। এবার বেরিয়ে আসবে ওরা। মধুকরী খানিক দৌড়োয় আবার খানিক দাঁড়ায়। এদিক ওদিক চায়। জোরে শ্বাস পড়ে ওর। কিচ্‌কিচ্‌ করে ডাকে ওকে দেখতে না পেলে। মধুকর থামে। ফিরে দেখে। পিছিয়ে পড়েছে মধুকরী। এদিক ওদিক দেখছে বিপদের আশঙ্কায়। অপেক্ষা করে ওর জন্য। খানিক শ্বাস নিয়ে মধুকরী আসে। আবার এক সঙ্গে দৌড়য় ওরা। দাওয়ার দিকে। ওখানেই গোলায় তুলে দিয়েছে ধান। 

ঈশ্বরের মতো সমস্ত জগত চরাচরকে দেখতে পায় বুদ্ধু-ভুতুম। উঁচু আমডাল থেকে দেখা যায়। মাথা ঘুরিয়ে সমস্ত দিগন্তরেখাটা একনজরে দেখে নিচ্ছিল ওরা। এখান থেকে ওই মাঠ, ওপাশের বাঁশঝাড়ের ডোবা, মানুষগুলোর ঘর, গোলা, দাওয়া সব দেখা যায়। দেখতে গিয়েই ওর নজরে পড়েছিল সঙ্গিনীর জন্য অপেক্ষারত মধুকর। অপেক্ষা একটা দুর্বলতা। তারপর থেকে অনেকক্ষণ ধরে একদৃষ্টে চেয়ে আছে বুদ্ধু ওর দিকে। ওই যে, ওই যে মধুকর মুখ বের করছে। মাটির দাওয়ার পাশ থেকে আবার মুখ বের করছে মধুকর। দাওয়ার কোণায় ওই বাঁশের খোঁটার নিচের গর্তে ওদের বাস। বুদ্ধু জানে। এই সময় নড়তে নেই। ও ঠিক বেরবে। যখনই ভাববে যে আর বিপদের কিছু নেই, ঠিক তখনই বেরবে ওরা। সেই সময়টার জন্য অপেক্ষা করতে হবে বুদ্ধুকে। দূর থেকে বিপদের গন্ধ পায় মধুকরেরা, বুদ্ধু ভুতুম জানে। কিন্তু এই অন্ধকারের রাজত্ব বুদ্ধুভুতুমরাই শাসন করে, ওরাই রাজারানি, ওরাই ঈশ্বর। মধুকরদের সমতলের থেকে অনেক ওপরে বসে, ধৈর্য ধরে সঠিক সময়ের অপেক্ষা। এটাই জয়ের মন্ত্র। মধুকরেরা ঠিক বেরবে। বেরতে ওদের হবেই। খিদে সবারই পায়। 

যতই থমথম করুক চারপাশ, হাসপাতালের ব্যস্ততা কখনও থেমে থাকে না। এই রাত্তির বেলাতেও ইমারজেন্সিতে লোকজন আনাগোনা চলছেই। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া মানুষজন, পড়ে গিয়ে মাথাফাটা কী হাড়ভাঙা লোক, পায়খানা-বমির রুগি আর তাদের হাসপাতালে নিয়ে আসা পেশেন্ট পার্টি। আনাগোনা লেগেই আছে এখানে। প্রসূতি বিভাগ ছাড়া আর থাকেই বা কে এই হাসপাতালে। লোকে বলে, “বাড়ির লোককে মারতে কে আনবে গো এখেনে।” কিন্তু রাতবিরেতে তেমন তেমন হলে যাবেই বা কোথায়। ধারেকাছে তো আর কিছু নেই। তবু নিরুপায় অভাজন ছাড়া কেই বা আসে এখানে। 

ইমারজেন্সির গেটে দিনের বেলায় একটা পুলিশের লোক থাকে সেই ভাংচুরের পর থেকে। কিন্তু সে আর সারাদিন এখানে থাকে কই, রোজদিন বাজারের দিকে চলে যায়। দোকানির থেকে এটা ওটা তুলে নেয়। এপাশ ওপাশ ঘোরে। চায়ের দোকানে চুপচাপ বসেই থাকে। কাগজ পড়ে। কখনও বেশি ভিড়, কী ঝুটঝামেলা হলে পেশেন্ট পার্টিকে বলে কয়ে বের করে দেয় সে। তাছাড়া বসে বসে ঝিমোয় আর সমস্ত রাগ হাতের চেটোয় ডলে ফেলতে চায় খৈনির সঙ্গে। খৈনিটা দাঁতের সামনে দিয়ে থুতু ফেলে বলে, “শালা কুত্তা...”। নিজেকেই বলে, আর কিছুই কাজ নেই লোকটার। কিন্তু আজ সে বেজায় ব্যস্ত। থানার মেজবাবু চলে এসেছে হাসপাতালে। মেজবাবুর সামনে খুব কাজ দেখাচ্ছে লোকটা। ওকে অন্য কোথাও পোস্টিং নিতে হলে মেজবাবুকে খুশি করতেই হবে। হাসপাতালে কি আর আয় আছে! নাকি এই আয়ে সংসার চলে! মেজবাবুরা বুঝবে না। ওদের ঠিক এসে যায়। দিনের পর দিন স্যার ওকে এখানে ফেলে রেখেছে আর স্যারের পেয়ারের ফোর্সকে আমদানির জায়গায়। আজ ওকে যে করেই হোক মেজবাবুকে খুশি করতে হবে। 

তাপস এসেছে। তাপস লোকাল নেতা। এই মরা আলোতে কুতকুতে চোখে চারপাশ যেন মেপে দেখে নিচ্ছে। ওর ঘাড়ের কাছে, সাদা পাঞ্জাবির ইঞ্চিকলারের আড়ালে ছোটো ছোটো আঁচিলগুলোর মধ্যে দিয়ে সোনার একটা ডাবল চেন চলে গেছে। পাহাড়ি টিলার মধ্যে দিয়ে পাথর সরিয়ে চলা সোনালি নদীর প্যাঁচ খাওয়া ধারার মতো, যেভাবে তাপস এতদূর পৌঁছেছে পথ করে নিয়ে। পায়ে সাদা স্নিকার। ওর গাড়ির আগে দুটো বাইকের থেকে চারটে ছেলে নেমেছে হাসপাতালের গেটে। গাড়িতে ওর সঙ্গে এসেছে বিল্টু আর ওর ছেলে খোকা। গাড়ি থেকে নেমেই বিল্টু চারপাশ দেখে নিয়েছে। বাইকের ছেলেগুলো আগে এগিয়ে গিয়ে গেটে বলল, “এই দাদা এসেছে, দাদা এসেছে”। চায়ের দোকানের তিনচারজনের জটলাটা ছাড়া আর কেউ তাকাল না। পুলিশে লোকটা বেরিয়ে আসে। তাপস মেজবাবুর কাঁধে হাত রেখে জটলা থেকে খানিকে দূরে নিয়ে গিয়ে কথা বলে। পুলিশের লোকটা ওদের সঙ্গে এগোতে গেলে বিল্টু ওর সামনে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে, “বিড়ি খাবে, কাকা?” ও বুঝতে পারে ওদের সঙ্গে ওর যাওয়ার নয়। ফিরে এসে বিড়িটা কানের কাছে মোড়াতে মোড়াতে থুতু ফেলে ও সাইড করে। নিজের ওপর ঘেন্না ভাবটা তবু যেন যায় না ওর। “শালা কুত্তার জীবন” বিড়বিড় করে ও। 

এই সময়ে যে গায়ে গায়ে ঠাণ্ডার আমেজলাগা হাওয়াটা থাকার কথা সেটা যেন ঠিকঠাক বইছে না এখনও। জামাতেই চলছে, চাদরটাদর নামানো লাগেনি। গেটের পাশে চায়ের দোকানে জটলা আছে একটা। আর একটু বাদেই দোকান বন্ধ করার কথা ছিল, কিন্তু আজ অনেক লোকজন বেশি। দুধ যা আছে তাতে আর খানিকটা জল ঢেলে দিল বাবুন। আরেকটু ফুটিয়ে নিলে আর খানিকক্ষণ টানা যাবে। লোকজন আজ রাতে আরও খানিক থাকবে বলে বুঝতে পারে ও। কম তো দেখল না এতকাল। গ্রামের দিকে কী একটা হয়েছে। দুটো বডি এসেছে আজ। এক বাড়ির। ডেইলি পঁচিশ টাকা হিসেবে মাসে সাড়ে সাতশো দিতে হয় ওকে তাপসকে। ও একবার ভাবল এগিয়ে গিয়ে বলে, দাদা ভালো তো। কিন্তু মেজবাবুর সঙ্গে ওকে যেতে দেখে আবার পিছিয়ে গেল। এই হারামিগুলোর থেকে যতটা দূরে থাকা যায় ততই ভালো। 

দুই 

ইমারজেন্সির ভিতরে রংচটা সবুজ পর্দার পিছনে যে ট্রলিটা রাখা আছে, ওই ট্রলির বডিটা আমি। ওই যে দেয়ালের ধার ঘেঁসে রাখা ট্রলিটায় যে লোকটা মরে পড়ে আছে। বয়েস বাহান্ন। কালো রোগা চেহারা। হাতের পায়ের শিরা বের করা। খয়েরি রঙের একটা আদ্যিকালের টেরিকটের প্যান্ট। কোমরের হুক আর বোতাম খোলা। নিচের দিকটা ছিঁড়ে ফালা হয়ে গেছে। সদ্য ছেঁড়া ওটা। এমনিতেই তলার পট্টিটা সেলাই করা হাতে। সুতোর রঙটা মেলেনি বলে কালো সুতো দিয়ে করা। কাছে গিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে। পাছার কাছটাও ছেঁচড়ে গিয়ে ছিঁড়ে গেছে, কতকালের প্যান্ট এটা। ওই বডিটা উলটো করলে দেখা যাবে পিঠটাও পুরো ছেঁচড়ে গেছে। চামড়াগুলো গুটিয়ে গেছে পুরো। লাল দগদগে জায়গাগুলো দেখা যাচ্ছে না ধুলো মাটিতে ঢেকে গেছে বলে। ওরা যখন প্যান্ট খুলে নিতে যাচ্ছিল তখন পড়ে গেছিলাম আমি। প্যান্ট খুলে ওরা আমাকে ল্যাংটো করে পাড়ায় ঘোরাবে বলেছিল। কিন্তু ওদেরই টানাটানিতে পড়ে গেলাম দেখে ওরা ছেঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল ওই সিমেন্টের চারকোণা পোস্ট অবধি। ওটাতে আমাকে বাঁধবার জন্য। গায়ের ওই ফালা ফালা হয়ে যাওয়া স্যান্ডো গেঞ্জিটা কিন্তু কাচাই ছিল। শুধু ফুটো হয়ে গিয়েছিল কয়েক জায়গায়, কিন্তু কাচা। এখন দেখলে হয়ত বোঝা যাবে না। তাছাড়া ধুলো মাটি কিছুটা কাদাও লেগে আছে। আর ছোপ ছোপ হয়ে রক্ত লেগে আছে। তবে শুকিয়ে এসেছে এখন। কালচে হয়ে এসেছে কিছুটা। বাঁদিকে বুকের কাছের ছোপটা যেন জং পড়ার মতো দেখতে। 

আমার মরার বয়েস হয়েছিল কিনা বলা যায় না। কারণ বয়েসের কারণে তো আমি মরিনি। অবশ্য যে ভাবে চলছিল তাতে এভাবে না মরলে অন্য ভাবে মরতাম। সেই মরাটাও বয়েসের জন্য নয়। যেমন আমার বাবা মরেছিল। আমার তখন সতেরো আঠেরো। যেমন এখন আমার মেয়েটার বয়েস। ছেলেটা কলেজ গেছিল আজ। ওরা সালিশি বসিয়েছিল গ্রামে। আমায় নিয়ে। দুপুরে তখন বসেই কথা হচ্ছিল। ওরা শাস্তি ধার্য করল আমাদের জন্য। জরিমানা দিতে হবে এখানে থাকতে গেলে। কোত্থেকে দেব, এখনও মেঝেতে প্লাস্টার নেই, দেয়ালে প্লাস্টার নেই। ঢালাইয়ের কাঠ দিয়ে এখনও দরজা আটকানো। জানলায় গ্রিল বসেছে শুধু। মেয়ের মার পুরনো কাপড় টাঙানো থাকে জানলায়। এই সময় রাতে হাওয়া ঢোকে, হাওয়ার সঙ্গে পোকা ঢোকে, বর্ষায় জল ঢোকে আরও অনেকেই ঢুকে পড়তে চায়। ছেলেবেলায় হাঁস-মুরগির জালি দেওয়া ঘরে জিভ লকলক করে শিয়াল যেমন ঢুকে পড়তে চাইত। উঠোনের আম গাছে পাখির বাসায় সাপ যেমন ঢুকে পড়তে চাইত। রাতে মেয়ে আর মেয়ের মার ঘরেও কারা যেন ঢুকে পড়তে চায়, উঁকিঝুকি দেয়। মেয়েটা একদিন মাঝরাতে চিৎকার করে উঠেছিল, “কে রে, কে?” মেয়ের মুখ চেপে ধরেছিল মা। চেনা মুখ ওরা দিনের আলোতে, রাতে তাই ওদের দেখলেও চিনতে নেই। 

ছেলেটা গতবার উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে আইটিআই পেল। তার টাকা জমা দেওয়া আছে। ছেলের মা মুখ বুজে চারগাছি চুড়ি এনে দিয়েছিল। সেঁকরা বলল, “সোনা ক্ষয়ে সরু হয়ে যাওয়া ব্রোঞ্জের চুড়ি, কী বা আছে দাদা ওতে!” তবু যদি কৌশিক লেখাপড়া শিখে দাঁড়ায়। সুসার হয় সংসারের। কলেজে ফ্রী করাতে গেছিল, কিন্তু হাজার হ্যাপা। সার্টিফিকেট দাও, লিখিয়ে আনো তাপসবাবুকে দিয়ে। হয়নি ওসব। টিউশানি নিয়েছে ছেলেটা। কলেজ করে বিকেলে দুটো করে পড়িয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সেই রাত। আদ্ধেক দিন সন্ধে থেকে কারেন্ট থাকে না, সেই রাত্তিরের দিকে আসে। ভোল্টেজ লো থাকে তখন। টিমটিম করে একটা বাতি জ্বলে তাতে। ছেলেটা পড়তে পারে না ওই আলোতে। একটা ব্যাটারির আলো কিনে এনেছে নিজের টিউশনি পড়ানোর পয়সা থেকে। ওতেই পড়ে। রাত অবধি। বোনটাকেও বসায়। মেয়েটার মাথা বুঝি ছেলেটার থেকে ভালো। ইস্কুলের বড়দি রেজাল্টের সময় ডেকে বলেছিল, মেয়েটার পড়াশোনা বন্ধ করবেন না, বিয়ে দিয়ে দেবেন না এখুনি। যতদূর পারে পড়ুক। মেয়েটা এবার মাধ্যমিক পাশ করল। দিদিমণির মুখ রেখেছে মেয়েটা। দাদার থেকেও ভালো নম্বর পেয়েছে। সামনেই ইলেভেন দেবে। মেয়েটার বিয়ের কথা সত্যিই ভাবিনি এখনও। সবার তো মাথা থাকে না। ওকে যখন ভগবান দিয়েছেন, পড়ুক। আমার সামান্য এইট পাশেই তো এত কিছু চলছে। ব্যাঙ্কে গেলে দেখি কত নতুন ছেলে মেয়ে এসেছে ... কতই বা বয়েস, কুশি হিমুর থেকে কতোই বা বড়ো ওরা। 

ছেলেটার একেবারে মত ছিল না এখানে ঘর তোলায়। “যবে পারবে সদরেই তুলো। এখানে জায়গা ভালো নয়।” 

“সদরে তোলার খরচ জানিস? বোনের বিয়ে দিতে হবে। বোধবুদ্ধি হয়েছে কিছু তোর? তোকে তো ভাবতে বলিনি এখনও। সাধ্যমত পড়াচ্ছি। তুই পড় না। তারপর চাকরিবাকরি পেলে দেখবি খন। তোরা না হয় সদরেই ঘর তুলে থাকিস।” 

“সব বোঝো তো, এটাই সমস্যা।” গলায় ঝাঁঝ কৌশিকের। “তাপসের ছেলেপুলে ভালো নয়, লোফার ছেলে সব। তাপস ওদের ফুর্তি করার পয়সা দিয়ে হাতে রেখেছে। বোনের বন্ধুদের স্কুল থেকে ফেরার সময় আওয়াজ দেয়। জানো? খবর রাখো কিছু? অ্যাঁহ... বাড়ি করছ এখানে! এর থেকে সদরে ভাড়ায় থাকা ভালো।” 

ছেলের কথা যে বুঝি না এমন নয়। জায়গা এখন কোথায়ই বা ভালো। বাচ্চা ছেলেটাকে মেরে দিলো না সেদিন। ক-বছর হয়েছে? দিদিকে আনতে গেছিল স্টেশনে। সদর তো। পুলিশের সামনে। আসলে পরিবেশটা খারাপ হয়ে গেলে তখন কিবা সদর কি বা অন্দর। নিজেদেরই এখন একটু সামলে সুমলে চলতে হবে। মেয়েটা কলেজ পাশ করলে বিয়ে দিয়ে দেব। তারপর তুই চাকরিবাকরি পেলে যা করবি করিস। তোর মার আর আমার এখানেই জীবন কেটে যাবে। নিজেদের বাস্তু এটা। জমি কেনার ক্ষমতা আছে আমার সদরে! সব তো তুই বুঝে গেছিস! এ সবই ভাবি শুধু, বলতে পারি না। 

খিঁচটা বেঁধেছিল অবশ্য দু বছর আগে ঘর তোলা নিয়েই। জমিটা বাপদাদারই ছিল। কিন্তু ঘর তুলতে যেতেই নানা কথা শুরু হয়ে গেল। ক্লাবকে থোক দেড় লাখ টাকা দিতে হবে। তাপসদার সঙ্গে দেখা করতে হবে গিয়ে। ওদের থেকে মাল নিতে হবে। দেখা করেছিলাম। কোন মাল, কে দেবে, কত রেট সব ওরাই ঠিক করে দিল। কমা মাল সব। ওদের থেকে বেশি দামেই নিতে হল। আবার গাড়ির রেট আলাদা। কিছু করার ছিল না। একটু সামলে নিয়ে থোক টাকাটা ওদের দিয়ে দেব বলে কথা দিয়েছিলাম। ও কথা না বললে ঘর তুলতেই দিত না। ছেলেটা বোঝে না এসব। ওর সব কিছুতেই প্রতিবাদ। মেয়েটাও হয়েছে দাদার মতো। রক্ত গরম তো, বোঝে না যে, বলে কিছু হয় না। আজ যেই আসুক বাঁচাতে, কাল তো এখানেই থাকতে হবে। এদের মধ্যেই। তখন তো শিয়াল কুকুরে ছিঁড়ে খাবে। তখন কে আসবে বাঁচাতে? জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করা যায় না। কৌশিক আইটিআইতে চান্স পাওয়ার পর পুজোর আগে থেকে ওদের সেই টাকাটা এবার দিতেই হবে বলে ওরা জোরাজুরি শুরু করল। দেবো দেবো করে কালীপুজোটা যাওয়ার পর ওরা আজ সালিশি ডাকল। বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে এল আমায়। ছেলে তখন কলেজে বেরিয়ে গেছে 

দুপুরে সালিশি বসেছিল। তখন মেয়েটা কিছু বলেনি। ভিড়ের বাইরে ঠায় দাঁড়িয়েছিল। যখন ওরা বলল, যদ্দিন না টাকা দিচ্ছি তদ্দিন আমি ছাড়া আর কেউ বাড়ি থেকে বেরতে পারবে না, তখন ও চিৎকার করে ঢুকে আসে। “মগের মুলুক নাকি? দেশে আইন কানুন নেই? তোমরা কে? কে তোমরা? দাদা কলেজে না গেলে পড়াশোনা হবে কী করে? আর সামনে পরীক্ষা না আমার? বাড়ি থেকে বেরনো যাবে না! অ্যাঁহ ... থানায় যাব আমরা, প্রশাসনের কাছে যাব। বাবা উঠে এস ...” বলে আমার হাত ধরে টেনে তুলে আনতে যায়। আমি ওকে থামতে বলি, কিন্তু ততক্ষণে ওর গালে একটা চড় বসিয়ে দিয়েছে লোকাল নেতা তাপস। “এই মাগিটা মহা ফড়ফড় করে। ইস্কুলের ওই চুরিদার পরা খানকিটা শিখিয়েছে, না? ব্যাটাছেলেরা কথা বলছে, তুই মেয়েছেলে হয়ে তার মধ্যে কথা বলতে এয়েচিস কেন?” তাপস মল্লিক পঞ্চায়েতের মেম্বার। ইস্কুলের প্রেসিডেন্ট। মেয়েটা কোনও কথা নেই হঠাৎ ঘুরে উল্টে সারা গায়ের জোর দিয়ে একটা থাপ্পড় মেরে দেয় তাপসের গালে, তারপর ওর মুখে থুতু দিয়ে দৌড়ে পালায় সালিশি থেকে। তাপসের ছেলেপুলেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই। 

তিন 

মধুকরীর পেটের ভিতরের অন্ধকার টলটলে জলের মত অমাবস্যা আজ। তার মধ্যে খাবার খুঁজতে বেরোয় মধুকর অনিশ্চিতের দিকে। ধান এখন গোলায় তোলা হয়ে গেছে। আসে পাশে ছড়িয়ে পড়া ধানের টুকরো খড়ের নুড়ি দিয়ে ঝাড় দিয়েছিল গৃহস্তের গিন্নি। দেখেছিল মধুকর। তারপর সেগুলো টুকিয়ে জড়ো করে কোথায় যে রেখেছে খুঁজতে হবে সেটা। গন্ধও আসছে না তেমন করে। এই টলটলে অন্ধকারে দেখা যায় না কিছু। যেন অন্ধকারের দমবন্ধকরা মাথাডোবা জলে সাঁতার কেটে এগোতে হবে মধুকরকে। যে ভাবে মধুকরীর পেটের অন্ধকার জলে মধুকরের সন্তানেরা সাঁতার কাটছে এখন। বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে ওই অন্ধকার থেকে। ওই মাথাডোবা জল থেকে। 

“নদী নদী নদী/ সোজা চলিস যদি/ সঙ্গে যাব তোর/ আমি জীবনভোর।” সুমনদা দাদার কলেজের বন্ধু। দাদার সঙ্গে এসেছিল একবার আমাদের বাড়ি। সুমনদা কবিতা পড়ে। আমাকে একটা বই দিয়েছিল সুমনদা। কবিতার বই। ছবি ছিল সঙ্গে। টরে টক্কা। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা। তাতে ছিল এই কবিতাটা। খুব ভালো লেগেছিল বলে লিখে রেখেছিলাম অঙ্ক খাতার পিছনে। “হিমানীর থেকেই তো নদী হয়,” বলেছিল সুমনদা। আমার নাম তো হিমানী। কিন্তু নদী তো কখনও সোজা চলে না। তালে এমন কেন লিখেছিলেন কবি? সোজা যায় না বলেই কি? তালে মানে কী এর? নদীর সঙ্গে কখনও আসলে পথ চলা যায় না! আজ এই অন্ধকারে বসে কবিতাটা কেন মনে পড়ছে আমার? আমি জানি না। কিচ্ছু জানি না। সুমনদার সঙ্গে যদি আবার কখনও দেখা হয় জিগেস করব। বাঁশঝাড়ের পিছনে এই ডোবার কাছে বিনবিন করছে মশা। হাত-পা জ্বালা করছে মশার কামড়ে। মারতে ভয় লাগছে। মারলে আওয়াজ হবে। শুনতে পাবে তাপসের ছেলেগুলো। আমি তো সোজাই চলতে চেয়েছিলাম। এমএ পাশ করব। স্কুলে পড়াবো। অপরাজিতাদির মতো। 

অপরাজিতাদির শহরে বাড়ি। টাউনে ভাড়া থাকে। একা। শনিবার ইস্কুল করে বাড়ি চলে যায়, আবার সোমবার সকালের ডাইরেক্ট বাসে আসে। ঘরে পিএইচডির কাজ করে দিদি। কত বই দিদির ঘরে। কী সুন্দর করে সাজে। কারও পড়া বুঝতে অসুবিধা হলে অপরাজিতাদি বাড়িতে আসতে বলে। পয়সা কড়ি নেয় না কারও থেকে, আবার টিউশনি পড়ানোর মতো রোজ পড়ায় না। আমার খুব ভালো লাগে দিদির ঘরে যেতে। মাঝে মাঝেই যাই। পড়া বুঝলেও যাই, অপরাজিতাদি বোঝে যে এমনি এমনিই যাই কিন্তু কিছু বলে না আমায়। কত গল্প করে। দেশে দেশে মেয়েরা ইতিহাসে কতকিছু করেছে। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, মহাকাশে গেছে আবার দরকার হলে বন্দুকও ধরেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে, এই ঘরের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। টিভিতে-কাগজে-বিজ্ঞাপনে যেভাবে মেয়েদের দেখানো হয় ওটাই শুধু মেয়েরা নয়। অপরাজিতাদি বলে, “তোমার বাঁচতে যে টাকা দরকার সেটা যতক্ষণ তুমি নিজের যোগ্যতায় রোজগার না করছ ততক্ষণ তুমি স্বাধীন নও। তার জন্য ভালো করে পড়াশোনা করতে হবে। তবেই তোমার চারপাশটাকে, তোমার নিজেকে বুঝতে পারবে”। বলে, “অন্যায়কে কখনও মেনে নেবে না”। দিদির ঘর থেকে ফেরার সময় মনটা কেমন বড়ো হয়ে যায়। কত কী মনে হয়। 

আমিও চাকরি করতে চাই। ইস্কুলে পড়াতে চাই। কিন্তু ওরা যা করছে তাতে আমার, দাদার আর পড়াশোনা হবে না। ওরা বাবাকে মারল। সত্যিই তো, দাদা ঠিকই বলেছিল। বাবা কেন এখানে ঘর তুলল কে জানে। বাবার ওপর রাগ হচ্ছে এখন। কেনই বা ওদের টাকা দেবে বলেছিল? এখানে জায়গা ভালো না। আর ওই তাপস বলল, খানকি না, খানকি? আমি জানি মেয়েরা কেন খানকি হয়। শখে হয় না। মেয়েছেলে হয়ে ব্যাটাছেলের কথার মধ্যে...। বাবা আমার গায়ে কোনোদিন হাত তোলেনি, আর ওই গুন্ডা মাতাল তাপস...। মাথাটা দপদপ করছে এখন। হাতটাও তখন ঝনঝন করে উঠেছিল। আসলে মাথাটা এত গরম হয়ে গিয়েছিল। ওটা একটা মাতাল। সন্ধের পর থেকে চোখ খুলে রাখতে পারে না। জানোয়ারগুলো রোজ ইস্কুল থেকে ফেরার সময় আমাকে আর ঝুমাকে আওয়াজ দেয়। ডাকে। নোংরা কথা বলে। কোথায় যাচ্ছি সব নজর করে। অপরাজিতাদির বাড়ি থেকে ফেরার সময়েও দিদির নামে নোংরা কথা বলে। ওই তাপসের পায়ে পড়তে হবে কেন আমাদের? কে ও? আলো পড়ে এলে এখান থেকে অপরাজিতাদির বাড়ি যাব। ঠিক যাব, লুকিয়ে। 

তাপসের ছেলেপিলেগুলো যেন কুকুরের মতো গন্ধ শুঁকে বাঁশঝাড়ের ডোবার পাশ থেকে তুলে এনেছিল মেয়েটাকে। 

চার 

মধুকরী আর দৌড়োতে পারছে না দেখে মধুকর থেমে গেছিল এবার। মধুকরী ফিরে যাচ্ছে দাওয়ার বাঁশের খোঁটার দিকে। সময় এসে গেছে ওর। হঠাৎ মধুকরের থেমে যাওয়াটা দেখে ভুতুম। দেখে মধুকরের মন এখন নিজেকে বাঁচানোর দিকে নেই। মধুকরও ফিরতে চাইছে মধুকরীর কাছে। ভুতুম বুদ্ধুর দিকে চায়। বুদ্ধু একদৃষ্টে মধুকরীকে দেখছে। এটাই সময়। গাছের ডালে পায়ের একটা ঠেলা দেয় ভুতুম। ওর পায়ের ঠেলায় গাছের ডালটা সামান্য দুলে ওঠে। দোলাটা বুদ্ধুর শরীর বেয়ে ভেসে যায় অন্ধকারকে দোলা দিয়ে। দুটো ঝাপটের পর ডানা দুটোকে সোজা মেলে মধুকরের ফুট চারেক দুরত্বে ভুতুম নিজের পাদুটোকে প্রথমে একটু পিছিয়ে নেয় আঙুলগুলোকে মুড়ে, তারপর চকিতে নখগুলো খুলে নিখুঁত তাক করে এগিয়ে দেয়। ছুঁচলো তীক্ষ্ণ নখওয়ালা থাবা দিয়ে ছোঁ-টা মারে। ধানের গন্ধমাখা মাটি থেকে হিম হিম অন্ধকার শূন্যে উঠে যায় মধুকর। ভুতুমের পায়ের কব্জায় থেকেও যেন সাঁতার কাটে ওর সন্তানদের মতো টলটলে তরল অন্ধকারে। ভুতুমের নখ বসে গেছে মধুকরের ঘাড় আর পেটের চামড়া ফুটো করে। ভয়ে ডাকতেও ভুলে গেছে মধুকর। উড়ন্ত চোখে শুধু একবার দেখতে পায় বাঁশের খোঁটার আড়ালে ওর গোলাপি বাচ্চাগুলোকে জন্ম দিচ্ছে মধুকরী। ধানের কচি পাতার মতো নরম তুলতুলে কটা বাচ্চা। 

যতক্ষণ আমার জ্ঞান ছিল, যতক্ষণ আমি দেখতে পেয়েছিলাম। মেয়েটাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য মেয়ের মা পড়ে গেছিল তাপসের পায়ে। এক লাথিতে তাপস সরিয়ে দিয়েছিল মেয়ের মাকে। বাকিরা লাথি মারছিল মেয়ের মাকে। বুকে পেটে এলোপাথাড়ি লাথি। পায়ের গোড়ালি দিয়ে ঘাড়ের কাছে, কানের নিচে মারছিল, কুঁকড়ে গিয়েছিল ওর মা। আঁচল ধরে টানছিল একজন। হিমানী ওর মাকে তুলতে গিয়েছিল ওদের হাত ছাড়িয়ে। ওর মা ওখানেই অজ্ঞান হয়ে গেছিল বোধহয়। সার ছিল না আর। নড়ে না, চড়ে না। মেয়েটা মাকে ধরতে যাচ্ছিল। তখন ওরা টানাহেঁচড়া করছিল মেয়েটাকে। আমাকেও তো মেরেছে। আবার মেয়েটাকেও মেরেছে। লাইট পোস্টে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পাচ্ছিলাম। আমাকে মারাটা একরকম আর মেয়েটাকে মারাটা আরেক রকম। আমাকে মারাটার মধ্যে ওদের রাগ আছে। গায়ের ঝাল মেটানো আছে, কিন্তু মেয়েটাকে মারাটা যেন একটা সুখ ওদের কাছে। ব্যথা দেওয়ার থেকেও বেশি যেন ওর গায়ে হাত দেওয়ার জন্য মারা। প্রথমেই ওরা ওর জ্যালজ্যালে ওড়নাটা ওরা টেনে নেয়। তাতে যখন মেয়েটা ওর সস্তার সালোয়ার কামিজের বুকটা ঢাকতে গেছিল দুহাত দিয়ে তখন ওদের একটা ছেলে ওর জামার গলাটায় হাত দিয়ে ফড়ফড় করে ছিঁড়ে দেয় জামাটা। আমি চিৎকার করে উঠেছিলাম। কে যেন পাশ থেকে আমার চোয়ালে কিছু একটা দিয়ে মারে। বলে “দাদার গায়ে হাত দেওয়া! দ্যাখ হারামি আমরা কী করতে পারি।” কিন্তু তারপরে আমি আর কিছু দেখিনি। কিছু মনে নেই আর। শেষবার যখন তাকিয়েছিলাম তখন কে যেন আমার থুতনিটা তুলে ধরেছিল একটা খেটো লাঠি দিয়ে। আমার চোয়ালের হাড় ততক্ষণে ভেঙে গেছে। বাঁ চোখটা ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। সামনে দেখেছিলাম মাটিতে মেয়েটার ছেঁড়া জামাটা ছাড়া তখন আর কিছু ছিল না ... 

ভুতুম খেলছিল শিকারের সঙ্গে। পায়ের কবলে গাছের ডালে মধুকরকে ঠেসে ধরে ওর গলার চামড়াটা একেক বার ছিঁড়ে নিচ্ছিল আর আবার খানিকক্ষণ যেন ওকে ভুলে গিয়ে জগত সংসার দেখছিল নির্বিকল্প দৃষ্টিতে। বারবার চামড়া ছিঁড়ে নেওয়ার সময় মধুকর চিঁচিঁ করে চিৎকার করে উঠছিল, ঝাপট দিচ্ছিল শরীরে। তিরতির করে কাঁপছিল ওর লেজের ডগা। আবার খানিক পরে ঝিমিয়ে পড়ছিল। মধুকর থেমে গেলেই যেন ভুতুমের আবার মনে পড়ছিল ওর কথা। চিরে যাওয়া গলার মধ্যে শক্ত ঠোঁট ঢুকিয়ে একটু করে মাংস ছিঁড়ে নিচ্ছিল। মধুকর আবার চিৎকার করে উঠছিল। এ এক আজব খেলা। পরাজিতকে হারিয়ে দেওয়ায় কেবল সুখ নেই এই খেলায়। বরং তার হেরে যাওয়ার গ্লানিটাকে ঠেসে, ঠুকে, গুঁতিয়ে তার এই শেষ কয়েক মুহূর্তের অস্তিত্বের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়াতেই আনন্দ। এই অসহায়তাটাকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করাতেই তো উৎসব। ভুতুম জানে, মধুকরী যে এখন মধুকরের দিকে তাকিয়ে আছে, সেটা মধুকর আর না দেখতে পেলেও দেখছে আরও অন্য অনেকে। মধুকরের প্রজাতির অসহায় অসংখ্য চোখ তাকিয়ে আছে এখন ওর দিকে। ভুতুমও যেন তাদের নিজেকে দেখার সুযোগ আরও একটু করে দিতে ঈশ্বরের মতো দৃষ্টিতে জগত চরাচর দেখে। আজ যারা ওকে দেখছে তারা ওর ভবিষ্যতের প্রতিরোধহীন সহজ শিকার হিসেবে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে মধুকরের জায়গায়। 

মধুকরী বাঁশের খোঁটার পাশ থেকে একটা একটা করে বাচ্চাকে পাশের গর্তটাতে নিয়ে যাচ্ছিল। এরই মাঝে বুদ্ধু আমডাল থেকে নেমে এসে সামনে শান্ত হয়ে বসে দাওয়ার কাছে। একদম মাধুকরী আর বাচ্চার মুখোমুখি। মধুকরী আর নড়তে পারে না। নিঃশ্বাসের ওঠাপড়ায় দোলে কবার আর দুপা এগিয়ে যায় কেবল বাচ্চাগুলোর দিকে। 

আবার একটু তিরতিরে হাওয়া ছেড়েছে। হাসপাতালের ভেপার ল্যাম্পের চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে কয়েকটা শ্যামাপোকা। কাচের শেডটার ভিতরে অনেক শ্যামাপোকা মরে শুকিয়ে আছে। মেজবাবুর সঙ্গে কথা শেষ করে হাতের সিগারেটটা ফেলে ওর পিঠটা চাপড়ে দিল তাপস। মেজবাবু “হ্যাঁ-হ্যাঁ” করে পুলিশের লোকটাকে ডাক দিল চোখের ইঙ্গিতে। বাইকের ছেলেদের গাড়ির জানলায় ডেকে স্টেশনের দিকে যেতে বলল তাপস। ওদের এখনও একটা কাজ বাকি আছে। বিল্টু একবার পুলিশের লোকটার দিকে তাকায়। তাপস “ও ঠিক আছে” বলে খোকাকে গাড়িতে নিয়ে বেরিয়ে যায়। আজ রাতেই বাইরে চলে যেতে বলা হয়েছে ওকে। খোকাকেও নিয়ে যাবে ও। পুলিশের লোকটাকে মেজবাবু বিল্টুদের সঙ্গে যেতে বলে। মেজবাবু জানে, ও না করবে না। এই বোকা গোঁয়ারটা অনেক দিনের অভুক্ত। না করার অবস্থা নেই লোকটার। মেজবাবুর নিজেরও কি আছে? সদর থেকে বড় সাহেবের ফোন এসেছে, জানে মেজবাবু। স্টোভের ডেকচিতে ফুটন্ত দুধটার দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই হাসে বাবুন। ঠিকই বুঝেছিল ও। হাসপাতালে লোক আসা এখনও বাকি আছে। 

সদ্যজাত বাচ্চাটার পেটের চামড়াটা ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়তে গিয়ে চোখে রক্ত ছিটকে আসায় হঠাৎ থেমে গেছিল বুদ্ধু। ডাকতেও শেখেনি এখনও বাচ্চাটা। ঠোঁট ছোঁয়ালেই ছিঁড়ে যাচ্ছে,। বুদ্ধুর নখ, ঠোঁট রক্তে মাখামাখি। তাজা রক্তের গন্ধে ভরে উঠছে ওর ঘ্রাণ। শান্ত দৃষ্টিতে আবার তাকায় বুদ্ধু। মধুকরীর মুখের কাছে ওই যে আরেকটা বাচ্চা। গর্তে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে মধুকরী। 

রেললাইন থেকে দেখা যায় মাঠের কাছে দুধের সরের মতো কুয়াশায় আলো নেভানো দুটো বাইক এসে থামে। 

কৌশিক এখনও ফেরেনি। ট্রেন লেট। দেরি হচ্ছে ওর। 

তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে তরল ডুবুডুবু অন্ধকারে আবার উড়াল দেয় বুদ্ধু। 





লেখক পরিচিতি 
কণিষ্ক ভট্টাচার্য
১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার সুকিয়াস স্ট্রিটে জন্ম। বর্তমানেও কলকাতাতেই থাকেন। হেয়ার স্কুল-যাদবপুর আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। বিষয় সাহিত্য। পেশা শিক্ষকতা। কবিতা দিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে কবিতা লেখেন না। লেখা শুরু ‘প্রমা’ পত্রিকা থেকে, সম্পাদক ছিলেন সুরজিত ঘোষ। সংবাদ প্রতিদিনে বুকরিভিউ করতেন। এখন প্রধানত গল্প আর প্রবন্ধ লেখেন, নিজের লেখা না এলে অনুবাদ করেন। অনূদিত উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে মহাশ্বেতা দেবী সম্পাদিত বর্তিকায়। বিভিন্ন পত্রিকায় লেখেন। 
· প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থ - “ছোট্টো রাজকুমার” কলকাতার ‘হযবরল’ প্রকাশনী থেকে ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়। 
· প্রকাশিত ছোটগল্পের সংকলন - “কৃষ্ণগহ্বরের স্মৃতিফলকেরা” ‘সৃষ্টিসুখ’ প্রকাশনী থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়। 
যোগাযোগ-kanishka.box@gmail.com 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন