শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্যের গল্প স্বাদ-হীনতা

খুব জোরে বৃষ্টি নেমেছে। চারপাশ কালো করে আসা ভয়ঙ্কর ঘড়ঘড়ে বৃষ্টি। মাটি থেকে দলা দলা শ্লেষ্মা টেনে নিয়ে প্রকৃতি আবার মাটিতেই পাঠিয়ে দিচ্ছে সে সব। সেই বৃষ্টি আর তার হাওয়া গায়ে লাগিয়ে একটি ফতুয়া এবং ধুতি পরে বাবু হয়ে নদীর সামনে বসে আছে মাঝারি সাইজের এক মানুষ। ধুতিটি আগে সাদা ছিল। এখন হলদেটে ছিটে লেগে গিয়েছে তার গায়ে। ধুতির খুঁটের দু’ইঞ্চি মাপের একটি জায়গায় মধ্যে যত্ন করে লেখা-অন্নপূর্ণা। 

ওই মিলেরই কাপড়। মিলের মাঠের শেষপ্রান্তের পেয়ারা গাছটি ফলের ভারে ঝুঁকে পড়েছে। সেই গাছের পেয়ারা পাঁচটা বড়ো দেখে কোঁচরে বেঁধে নিয়ে এসে এখানে বসে আছে মানুষটি,তাও হয়ে গেল ঘন্টা দেড়েক। একটা খেয়ে ফেলেছে। এখন আরও চারটে রয়েছে। প্রায় আড়াইশো গ্রাম ওজনের এক-একটা পেয়ারা। জল ঢুকে আরও ঝুলে গিয়েছে ধুতির কোঁচড়টি। সেই জলে ভরা পেয়ারা ধুতিতে নিয়ে কালো হয়ে যাওয়া পৃথিবীর তলায় বসে থাকা মানুষটা নদীর দিকে তাকিয়ে অত বর্ষণের মধ্যেই কেঁদে ফেলল বিচ্ছিরিভাবে। সে এক অদ্ভুত বিষাদ-চুপচুপে কান্না। কান্নার ভিতর থেকে গনগন করে উঠে আসছে বালতি-ভর্তি বিষাদ। অমন কান্না যেন এর আগে কখনও ঘটেনি। এরপরেও কখনও ঘটবে না। এত আদিম কোনও ব্যাপার বহুদিন ঘটেনি এই রোদ-বৃষ্টির গ্রহে। আলতামিরা গুহার সেই বিস্ময়কর বাইসনটির হাড়-মাংস-চামড়া আঁকা হয়েছিল যেন এই কান্নাটিকে একটু উলটেপালটে দিয়েই। এই কান্নাটি এক সময় থামল। থেমে গেল বৃষ্টির সঙ্গেই। লোকটি থেমে যাওয়া বৃষ্টির মাটিতে দাঁড়িয়ে সামনের নদীর দিকে তাকিয়ে জোরে চেঁচিয়ে বেশ কয়েকবার একটাই কথা বলল এরপর। প্রবল বৃষ্টিতে সাদা হয়ে যাওয়া নদীটির খোসার ওপর ছোটো ছোটো তিল হয়ে ভেসে ছিল যে নৌকাগুলো, তাদের মাঝিরাই কেবল শোঁ শোঁ বাতাসের ভিতর দিয়ে অস্পষ্টভাবে আসা কথাটিকে যত্ন করে ধরে ফেলল। কথাটি বলে লোকটি নি:শব্দ হয়ে চেয়ে রইল নদীটির দিকে। এই নদীটি বরিশালের। তার নামটি হল- কীর্তনখোলা। আর, মানুষটির নাম বলরাম। গত শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগের একটি ঘটনা এটি। মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছে দু'বছর আগে। নদীর পাড়ের বাড়িগুলোর মানুষের জীবন সদ্য জন্মানো একটি ঘাসের মতো হয়ে বেড়ে উঠছিল। কী সুস্থিত! কী নিশ্চিন্ত! যুদ্ধ এসে সব গুলিয়ে দিল। সেই গুলিয়ে দেওয়া আকাশ-বাতাসের নিচে বসে ভালো করে কেঁদে নিয়ে উঠে দাঁড়াল বলরাম। তার বাবা মোক্তারের কাজ করে। শনিবার শনিবার জমিদারবাড়িতে বারের পুজো করে আড়াই টাকা নিয়ে আসে। রাত বাড়লে সালসা খায়। এখনকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং এক্সপেনসিভ মাছ তখন পাঁচটা সিকে দিলেই থাউকো ভরে বাড়ি নিয়ে আসা যেত। রবীন্দ্রসঙ্গীত তখনও এত বেশি বাড়ির উঠোনে জায়গা পায়নি। 'মুক্তি' দেখে এসে বাড়ির দাওয়ায় বসে মুড়ি খেতে খেতে লোকে আলোচনা করছে- আহ! বড়ুয়ার কী অভিনয়! এর মধ্যেই বলরাম নামের মানুষটি বা লোকটি বা এত কিছু বলাও ভুল, কারণ, তার তো তখন মাত্র তেইশ বছর বয়স, গোঁফটা পাতলা লোমগুলো নিয়ে জুলফির কাছাকাছি গিয়ে থেমে গিয়েছে, কণ্ঠনালীটি কিঞ্চিত উঁচু, বছর দশেক আগেও সে নিমা পরে ঘুরে বেড়াত, তারপর হাফপ্যান্ট, কয়েকদিন হল ধুতি ধরেছে- এখন এই নদীর পাড়ে বসে আছে। কোর্ট-কাছারি, থানা, ইস্টিশন, স্টিমারঘাট, কয়েকটি তাজা নদী- কিছুরই অভাব নেই তার এই জায়গায়। একটু চালভাজা উঠোনে ছড়িয়ে দিলে মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের আশফল, আমড়া, সজনে গাছ থেকে শালিক, কাকের দল নেমে আসে। এটা উনিশশো ছেচল্লিশ। একটা নতুন শতাব্দীর প্রায় সাত আনা চলে গিয়েছে বেমালুম। বিয়ে করেছে পাশের গাঁয়ের লাবণ্যকে। সবে একটি ছেলে হয়েছে তাদের। টলে টলে হামা দেয়। হ্যারিকেনের আলোর আবছা অন্ধকারে সে হাসি হাসি মুখে বলরামের দিকে তাকায়। ওর সামনে এই শতাব্দীর আরও চুয়ান্ন-পঞ্চান্নটা খরচ না হওয়া টাটকা বছর পড়ে আছে। কী সুখ চারদিকে ধানের ছড়ার মতো পড়ে ছিল! অথচ, এখন আর তা নেই। কোথাও একটুও শান্তি নেই। সবাই বলছে, দেশভাগ হবেই। নেহরু, গান্ধী, দেশবন্ধু, জিন্না, সুরাবর্দি, ফজলুল হক- নামের পর নাম ভেসে আসে। বক্তৃতার পর বক্তৃতা। নেতাজি এখনও ফিরল না। ব্রজমোহন কলেজে দাঁড়িয়ে বলরামের ছোটোবেলার বন্ধু আকবর সেদিন মাইকে বলল- দেশের সব মুসলমানকে আসতে হবে লিগের ছাতার তলায়। হকসাহেবের কৃষক প্রজা পার্টির পক্ষ থেকে বলছি...হকসাহেবের দেশ পিরোজপুরের খলসেকোঠায়। বছর পাঁচেক আগে অবধি ওর বাবার কাছে নিয়মিত আসত। চুপচাপ পরামর্শ করত কী সব ব্যাপারে। ইদানীং, যে মানুষটির তোলা একটি কথা, 'আমি সবার জন্য ডালভাতের ব্যবস্থা করতে চাই'- ভাবতে গিয়ে বুকের মধ্যে অন্যরকম একটি আশার হংসধ্বনি টের পায় এদিককার মানুষ, সে ওর বাড়িতে এসে ওর মায়ের বানানো কইমাছের রগরগে ঝোল খেয়ে গিয়েছে বহুবার। পাতে একসঙ্গে পাঁচ-ছ'টা মাছ। প্রতিটার গা থেকে হলুদের রং আলাদা করে শনাক্ত করে ফেলা যায়। ঝোলের ভিতর ডুমো করে কাটা আলু আর ফুলকপির টুকরো। হকসাহেব একটা মাছের পিঠ থেকে খামচে বেশ খানিকটা একসঙ্গে তুলে নিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। 'কী জিনিস করছেন, বউঠান'! ওর মা'কে বউঠান বলেই ডাকত বাবার বন্ধুরা। 'আমাদেরই পুকুরের মাছ...এই তো, সকালে উনি ধরলেন...আপনি খাবেন', ওর মা তালপাতার পাখায় বাতাস করতে করতে কথা বলছে। পাখার হাওয়ায় কুপির আলোর শিখা মাঝেমাঝেই থেঁতলে যাচ্ছে। অদূরেই একটি শিয়াল ডেকে উঠল। ডাকটা ভালো না। ওর মা হাওয়া করতে করতে একটু চমকে উঠল। ব্যাপারটা লক্ষ করলেন বাংলার লিডার। 'ভয় পাবেন না, বউঠান। স্বাধীনতা আসতে দ্যান। দ্যাশে কোনও শ্যাল থাকবে না। দ্যান, আর দুটো দ্যান দেখি'। হুশহুশ করতে করতে মাছ খাচ্ছেন ফজলুল হক। একটা শেয়াল ডাক শুনে এর মধ্যেই একটা প্রতিশ্রুতি হয়ে গেল। শেয়াল ব্যাপারটাকে কিছু ভয়ই পান বকুলরানি। তার একটি ছেলেকে ঘরের দাওয়া থেকেই মুখে করে তুলে নিয়ে গিয়েছিল একবার। ছেলেটির তখন সাড়ে তিনমাস মতো বয়স। গোটা শরীরে তেল মাখিয়ে রোদে শুইয়ে দিয়েছিলেন উঠোনে। ছেলের দিকে পিছন করে তিনি দাওয়ায় বসে রাঁধছিলেন লাউ শাক। কয়লার অল্প আঁচে দুধ, বড়ি, আলু দিয়ে অতি উৎকৃষ্ট লাউ শাক রাঁধছিলেন মন দিয়ে। খেয়ে দেয়ে একটা বড়ো ঘটির এক ঘটি জল খেয়ে লম্বা ঢেকুর তুললেন ফজলুল হক। তারপর বকুলরানির হাত থেকে পান নিতে নিতে বললেন- আপনেরা হলেন গিয়ে হিন্দু। আমি হলাম গিয়ে মোছলমান। কিন্তু, রাজনীতিতে কোনও হিন্দু-মোছলমান নেই। রাজনীতিতে কোনও বিভেদ নেই। রাজনীতি বিভেদ তৈরি করে, নিজে কখনও বিভেদে ঢোকে না। রাজনীতিতে আসল কথা হল গিয়ে মানুষ। মানুষের জন্য রাজনীতি। তা না করতে পারলে সব অর্থহীন। এই যে একটা যুদ্ধ চলছে এখন। মুছোলিনি, হিটলার, এদিকে আমাদের চার্চিল- খুন, রাহাজানি, লুঠপাট করেও শালারা বলতেছে, মানুষের জন্য করছি। এরা পশু। বোজলেন তো'! কথাটা বলে উনি আর দাঁড়ালেন না। পান চিবোতে চিবোতে ওই রাতেই ওদের দাওয়া, উঠোন, নিমগাছ, পুকুরপাড়, মন্দির, ধানখেত টপকে আচমকা একটি বাঁকে গিয়ে অদৃশ্য হলেন। হাতে একটি হ্যারিকেন... পুরো ব্যাপারটা জানলার পর্দা দিয়ে উঁকি মেরে মেরে দেখেছিল বলরাম। বাবা বাড়ি না থাকলেও হকসাহেব আসতেন। কোনও বাধিনিষেধ ছিল না। তাঁর জন্য ওদের বাড়িতে, যাকে বলে, ছিল এক অবারিত দ্বার। অথচ, হকসাহেব সেইদিন রাতে কইমাছের ঝোল খেয়ে চলে যাওয়ার পর আর এলেন না। বৃষ্টি কমে গিয়েছে এখন। দুটো পেয়ারা শেষ। বড়ো মিষ্টি এদের স্বাদ। এই স্বাদটি জিভে করে নিয়েই পৌঁছে যেতে হবে কলকাতায়। ওখানে ট্রাম চলে। ফুটবল খেলার চারদিক ঘেরা স্টেডিয়াম আছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সবথেকে উমদা জায়গাটির নাম- বড়োবাজার। যুদ্ধের আগে আগে বলরাম যখন ইস্কুলে পড়ত, ওর এক বন্ধু ছিল অসিত। রহমান স্যারের অঙ্ক ক্লাসে একদম পিছনের বেঞ্চে বসে অসিত বলেছিল- ব্যবসা করব। এখানে ফিউচার নেই। বড়োবাজারে যেতে হবে। কলকাতায়।

- কীসের ব্যবসা করবি? জানতে চেয়েছিল বলরাম।

- পোস্ত। অনেক দাম।

- সেটা আবার কী! তার আগে পর্যন্ত পোস্ত ব্যাপারটা সম্বন্ধে কোনও ধারণা ছিল না বলরামের।

- খাবার জিনিস। ভাত পাতে বাটা খায়। নুন-লঙ্কা দিয়ে মেখে। আলুতে দেয়। ডিমে দেয়। ঝিঙেতে দেয়। পটলে দেয়।

- কীসে দেয় না?

- তা জানি না। তবে, করতে পারলে, ভালো ব্যবসা। একবার জমিয়ে নিলে চিন্তা নেই।

- পারবি?

- পারতেই হবে। আমি তো ব্যবসাই করতে চাই, বলরাম।

- ব্যবসা করার পর আমাকে পোস্ত খাওয়াবি, অসিত? ডিমে দেওয়া।

- তুই বড্ড হ্যাংলা, বলরাম। তোর বরং বলা উচিত ছিল এভাবে- "ব্যবসা করার পর পারলে একটু পোস্ত-টোস্ত খাওয়াস"। মানে, চাইছিস খেতে। কিন্তু, ভাবটা এমন করতে হবে, যেন, পেলেও হয় আবার না-পেলেও হয়।

- এগুলো চালিয়াতি। আমার চালিয়াতি ভালোলাগে না, অসিত। মা আজ ডিমের কোর্মা করেছে। তোর পোস্তর থেকে অনেক ভালো। ভাত দিয়ে খাব। চল।

- কীসের ডিম?

- আমাদের পোষা হাঁসের।

- আমি চারটে খাব তাহলে।

- তাই খাবি। ক্লাস শেষ হলেই পালাই চল। গেলেই মা ভাত বেড়ে দেবে। খিদে পেটে বীজগণিত ভালোলাগে নাকি?!

কীর্তনখোলা এই কয়েকঘন্টার বৃষ্টিতে উপচে পড়েছে। নৌকাগুলোর যা যা চড়ায় পড়ে ছিল, সব এখন জলে ভাসছে। চারদিক সাদা হয়ে গিয়েছে। পৃথিবীটা ভাসো-ভাসো। বাতাস ঠাণ্ডা। তারিখ দিয়ে এখানে কেউ মাস মনে রাখে না। তবে বর্ষাকাল। বৃষ্টি থামলেও ঝোড়ো হাওয়া আছে একটা। পরদিন এই ঝোড়ো হাওয়ার ভিতরেই নৌকা নিয়ে বলরাম একা একাই কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিল। লাবণ্য তার মাসখানেক বয়সের ছেলেটিকে নিয়ে রয়ে গেল গ্রামে।


কলকাতায় এসে বলরাম প্রথমেই থই পেল না সবটার। ছেলের বাড়ি ছেড়ে দেওয়া কোনও বাবা-ই মানতে পারে না। কেশবচন্দ্রও পারেননি। তিনি স্থানীয় আদালতে মোক্তারের কাজ করেন। গাঁয়ের জমিদারবাড়ির অন্যতম পুরোহিতও বটে। তিনি কলেজ পুরো কমপ্লিট করতে না পারলেও, তাঁর ছেলে বলরাম পেরেছে। অঙ্কে সে খুবই ভালো। জমিদার মশাই কেশবচন্দ্রকে নিজে ডেকে বলেছিলেন- একটি হাইস্কুল করছি গাঁয়ে। আপনার ছেলেকে চাই, মোক্তারবাবু। অঙ্ক-টঙ্ক করাবে। যতই পুরোহিতগিরি করুন না কেন, গাঁয়ের সবার কাছেই কেশবচন্দ্রের প্রধান পরিচয় একটাই- মোক্তার বাবু। বলরাম হল মোক্তারবাবুর ছেলে। একমাত্র ছেলে। তাঁর নামে বাইশ বিঘা চাষজমি। খুবই উর্বর। প্রায় সারা বছরই চাষ হয়। মূলত,ধান। জমির সিংহভাগ জুড়েই ধান। এছাড়া, ছোটো ছোটো অংশে মাচান করে শশা, পটল- এসবেরও চাষ হয়। চারটে পুকুর আছে। অসংখ্য মাছ তাতে খেলে বেড়াচ্ছে সবসময়। মাঝেমাঝে সন্ধের মুখে মুখে একটা-দুটো করে জলঢোঁড়ার পেটে যায়। পুকুরকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা নারকোল আর সুপুরি গাছগুলো শান্তভাবে দুলতে দুলতে ছায়া পাঠিয়ে যাচ্ছে সারাদিন ধরে। সেই ছায়ার ওপর কখনও নারকোল-সুপুরির পাতা ভেদ করে সূর্যের আলো পড়ে একটি জাফরি তৈরি করলে তাকে শরীর ও আত্মা দিয়ে তিলে তিলে কোনও দৈবী পাগলের গড়ে তোলা ম্যাজিকাল অর্কেস্ট্রা বলে মনে হয়। তখন যদি তার ভিতর একটি সামান্য চড়াই বা শালিখ এসে বসে এবং তারপর ধীরে উড়ে চলে যায়- তা দেখতে দেখতে নিশ্চিতভাবে মনে হবে, এতদিনের পুরনো ঝুলকালিমাখা পৃথিবীটার কার্নিশ থেকে একটি আনন্দের ব্যাপার টুপ করে মাটিতে পড়ে, যেখান থেকে এসেছিল সেই বিস্ময়ের ভিতরেই আবার মিশে গেল মাথাটা নিচু করে। বলরাম এসবের ভিতরেই ছোটোবেলা থেকে মানুষ। তবু কেন যে সব ছেড়েছুড়ে কলকাতা চলে গেল! কী আছে ওখানে?! এখানে তো ওর বউ, তিন মাসের ছেলে, একটা গোটা মা, একটা গোটা বাবা রয়েছে। একটুও বুঝতে পারেন না কেশবচন্দ্র। তিনি আগের শতাব্দীর শেষের দিকের মানুষ। নেতাজির থেকে দেড় বছরের বড়ো। এই বয়সেও নারকোল গাছে উঠে যেতে পারেন তড়তড় করে। অনেকটা করে ভাত খান। কিডনিটা ভালো আছে বলে একটু চাপ দিয়ে পেচ্ছাপ করলে তা পাঁচ হাত দূরের জমিতে গিয়ে পড়ে। সেই তাঁরই ছেলেটি এমন হল কী করে! তিনি ভাবতে ভাবতেই ভাত ভেঙে কচুর লতির বাটিটা উপুর করে দেন। টাটকা ইলিশের সুবাস থালা থেকে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। প্রথমে ঘরে। তারপর ঘর পেরিয়ে উঠোনে। উঠোনে ভর্তি করে ঢেঁড়শ গাছ, লাউমাচা। এই উঠোনের রোদেই এক সময় বলরামের হিসির কাঁথা শুকোতে দিত ওর মা। এখন সেখানে ওর ছেলের কাঁথা। কাঁথার ওপর রোদ। তার পাশে ছাগল ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর ঘন্টাখানেক পর আকাশ থেকে চাঁদ আলো পাঠাবে এই উঠোনে। কথাটা ভাবার সময় কচুর লতি শেষ করে ইলিশের ভাজার বাটিটার দিকে হাত বাড়াচ্ছেন কেশবচন্দ্র। খুব এক সুখে ভিতরটা ভরে যাচ্ছে তাঁর! কতই বা বয়স বউমার। বলরামেরই তো তেইশ। বিয়ের সময়ই ওদের বাড়ি থেকে বলেছিল- সতেরো। কেশবচন্দ্র দু'বছর বাড়িয়েই ধরলেন। তাহলেও, উনিশেই বিয়ে। বিয়ের এক বছরের মাথায় মা। এখন বাচ্চাটির সাত মাস বয়স। মায়ের কিছুতেই একুশের বেশি না। ছেলেটি গবেট হলেও, বউমাটি হয়নি। এত ভালো রাঁধার হাত! শুধু রামায়ণ-মহাভারতেই এমন হাত পাওয়া যায় বোধহয়! তাঁর স্ত্রী তো এতদিন ধরে রাঁধছেন। কই, এমনটা তো মনে হয়নি! 

খাওয়া শেষ হল। পায়েসের বাটিটা তুলে নিয়ে একটা বড়ো ঢেকুর বাতাসের তরঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে কেশবচন্দ্র ঘোষণা করলেন- কাল পূর্ণিমায় তোমাকে নিয়ে যাত্রা দেখতে যাব, লাবণ্য। তোমার তো অনেকদিনের শখ। লাবণ্য ওঁর ছেলের স্ত্রী। তিনি সাধারণত 'লাবু' বলেই ডাকেন। আজ ভালো নামে ডাকলেন।

ঘোমটার ভিতর থেকে ছোটোখাটো চেহারার ফর্সা শরীরটা উত্তর দিল- আচ্ছা, বাবা।

কেশবচন্দ্র হাসলেন। কী যে করছে কংগ্রেস, মুসলিম লিগ- এরা! ব্রিটিশদের উসকানিতে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগির খেলায় নেমেছে! বাংলার মানুষকে খুবই বোকা পেয়েছে ওরা! ভাগ যে হবে না, সেই ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত! অত সোজা নাকি! অথচ, দেশের নওজোয়ানদের কথাটা বোঝাবে কারা! প্রত্যেকেই উত্তেজিত। দেশটা ভাগ করতে না পারলে যেন এরা কেউ ফার্স্ট চান্সে পাশ করতে পারবে না! এত কী হইচই! মানুষ তো এই প্রকৃতির কাছে অতি সামান্যই। আকাশের মেঘের ভিতর দিয়ে সাদা পাখি উড়ে যায়। কোথায় কোথায় যে উড়ে যায়, তা কে জানে! মিষ্টি জলের ভিতর দিয়ে ইলিশের ঝাঁক ভেসে চলে যায় ডিম পাড়ার জায়গার খোঁজে। আকাশ ও জল- কেউই কারও খবর রাখে না। কিন্তু, প্রত্যেকে প্রত্যেকের কর্তব্যটা করে যাচ্ছে। তাদের গায়ে লেগে আছে সময়ের কোটিং। মানুষ তো নিজের কাজগুলো ঠিকভাবে করছেই না, তারওপর ভালো করে খাওয়াদাওয়া করতেও ভুলে গিয়েছে। আরে, খাওয়াদাওয়া না করলে কী করে হবে! খেতে তো হবেই! একটা দেশ সামলানো মানে তো বিপুল ব্রেনওয়ার্ক দরকার। তার জন্য খাবার লাগবে। ইলিশ লাগবে অনেকগুলো করে একেকজনের জন্য। মরশুমেরটা মরশুমে। এই বর্ষায় ভালো ইলিশ খেলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার যেমন অনেক বেশি উন্নতি হয়। দুপুরে ভাত দিয়ে ইলিশের ডিমের বারোটা বড়া, দুটো কোল ভাজা, তিনটে পাতুড়ি, কালো-জিরে কাঁচালঙ্কা দিয়ে রাঁধা দুটো পেটি খেয়েই পুত্রবধূকে যাত্রা দেখতে নিয়ে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি তিনিই যেমন চট করে নিয়ে ফেলতে পেরেছেন।

ওদিকে কলকাতায় এসে বলরাম পড়ল ফাঁপড়ে। কিছুই চেনে না সে এখানকার। কিছুই জানে না। শিয়ালদহে নেমে প্রথমেই সবটা গুলিয়ে গেল। চারদিকে মানুষ মানুষ আর মানুষ। ছোটোবেলা থেকেই শুনে এসেছে, পড়ে এসেছে- ভারতবর্ষ এক বিশাল দেশ। যার সীমা-পরিসীমার ঠিকঠাক বিচার করতে গেলে মাথা ঘুরে যায়। সেই দেশের একটা ক্ষুদ্রস্য ক্ষুদ্র অংশের নাম- বরিশাল। সেখানে থানা, ইস্কুল, কীর্তনখোলা, আমবাগান- সবই আছে। কিন্তু এত মানুষ একসঙ্গে, ভাবাই যায় না! বরং, এত মাছ এক জায়গায় ভাবলে ওর মনে একটা পরিস্কার ছবি ভেসে ওঠে। ডুমো ডুমো করে কেটে ছড়িয়ে দেওয়া সুখের ছবি। সেই মাছ, ভাত, সরু ফালি করে কাটা আলু দিয়ে ঝোল- এসব ও শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বেরিয়ে উল্টোদিকের রাস্তায় টাঙানো গান্ধীর চরকা কাটা ছবির মধ্যে দেখতে পেল।
সামনেই একটা ভাতের হোটেল। দেরি না করে সেখানে ঢুকে পড়ে বলরাম। দুপুরের খাওয়া তাড়াতাড়ি খেয়ে নেওয়া ওর অভ্যাস। দেরি করে খেলে শরীরটা খারাপ হবে। তখন কাজ করতে অসুবিধা। বরিশালে মাস আজ দশেক ধরে গাঁয়ের জমিদারের তৈরি করে দেওয়া ইস্কুলে সে অঙ্ক করাতো। যখন পড়াতে ঢুকেছে, তখন লাবুর সাত মাস চলছে। এখন ছেলেটার সাত মাস। পড়াতে ওখানে ভালোলাগত, ঠিকই। কিন্তু, ওর আত্মসম্মানবোধটা ওর বাবার থেকে কিছু বেশিই। সবসময়ই মনে হতো, একটা দেওয়া চাকরি। জমিদারের ছুড়ে দেওয়া বাতাসা। মাইনেও দিত না কখনও। তার বদলে, মাস গেলে গোলার ধান পুকুরের মাছ পাঠিয়ে দিত। ওসব নিয়ে সে কী করবে! ওসব তো তাদের অফুরন্ত! পুকুরে হাত ডুবিয়ে চোখ বন্ধ করে এক থেকে দশ অবধি গুনে হাতটা মুঠো করলেই কতগুলো পুঁটি, খলসে খলবল করতে করতে উঠে আসে। তার এখন ছেলে হয়েছে। নিজের সংসার। টাকার তো দরকার। বাবার থেকে চাইতে কেমন লাগে। এতদিন সামলেছেন। এখনও সামলাচ্ছেন। একমাত্র ভালোমন্দ খাওয়া-দাওয়া ছাড়া কোনওকিছু নিয়েই তেমন চিন্তা নেই যেন তাঁর। এদিকে দেশের পরিস্থিতি পালটে যাচ্ছে দ্রুত। অর্থনীতির অবস্থা খুব খারাপ। বলরামের বন্ধু সমরেশ, মোবারক- ওরা কাজের খোঁজে কলকাতায় চলে এসেছে। কোথায় আছে তারা, তা অবশ্য ও জানে না। চিঠি দেওয়ার কথা থাকলেও, দেয়নি। নিজের কাজ নিজেই খোঁজার তাল করে ভিটেমাটি ছেড়ে বলরাম চলে এসেছে কলকাতা। আসার টাকা যোগাড়ের জন্য লাবণ্যের বিয়ের একটি হার আর বাউটি বন্ধক রেখে এসেছে নিমাই স্বর্ণকারের কাছে। টাকা হলে ছাড়িয়ে নেবে।

হোটেলে খেতে এসে অবাক হল বলরাম। মাছ-ভাত বারো আনা। ওকে নতুন ভেবে ঠকাচ্ছে নাকি?- এটুকুর বেশি খিদের মুখে আর ভাবতে পারল না মানুষটা। সেই ভোররাতে বেরিয়েছে। সারাদিন পেটে খানিকটা জল আর মুড়ি ছাড়া কিছু পড়েনি। দু'বার নৌকো, তারপর বাস, তারপর ট্রেনে করে ও উপস্থিত হয়েছে কলকাতায়। খেতে বসে শুক্তোতেই একটু থমকে গেল ও। এরা শুক্তোতে দুধ দেয় নাকি? এত মিষ্টি-মিষ্টি কেন? ওরা তো শুকনো খায়। ঝালঝাল। ও যখন পেঁয়াজে কামড় দিচ্ছিল, তখন ওর পেছন দিয়ে কংগ্রেসিদের একটি বড়ো মিছিল 'বন্দেমাতরম' স্লোগান দিতে দিতে রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছিল। খিদের মুখে বলরাম ওসব খেয়াল করল না। নইলে, ঠিক উঠে দাঁড়াত...

এক-এক জন মানুষের এক-এক রকম ভঙ্গি মনের ভিতরকার নরম জমি খুঁজে তাতে গিঁথে যায়। কেউ কেউ লেগে যায় চোখে। চোখটা পুরোপুরি বন্ধ করে ফেললেও তা যেতে চায় না। বলরামের জীবনে সত্যেন পাল ওরফে বুনোদা সেরকমই একজন। বয়সে খানিকটা বড়ো। কণ্ঠমণি থলথলে মাংসের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছ। গলার স্বরটি গমগমে। হাসলে গম্ভীর খুনির মতো দেখায়। পেশায় ডাক্তার। মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তার। চালের ওই আক্রার বাজারে তার চাহিদা কিছু বেশিই। শিয়ালদহের পাইস হোটেলে এক টাকা চার আনা দিয়ে রোজই পাঁঠার মাংস খায়। এক প্লেটে ছ'পিস। পাঁউরুটির ব্ল্যাক করা তার ক'দিন বাদেই শুরু হবে। শিয়ালদহ থেকে ঘন্টা তিনেকের ভিতরই একটি আলাদা দেশ তৈরি হবে। কে ভেবেছিল তখন! সেই বুনোদা বলরামকে বলল- আমার হাসপাতালের উঠোনে একটু জায়গা হবে। তোমাদের দেশের লোকই দখল করে রেখেছে। বেডগুলোরও তাই অবস্থা! সব বাংলাদেশি!

কথাটা ভালোলাগল না, বলরামের। 'বাংলাদেশি' আবার কী! বাংলাদেশ তো এই সবকটা মিলিয়ে। কলকাতা, গোপালগঞ্জ, কসবা, বরিশাল- এই তো একটা মানচিত্র। মাঝখানে কয়েকটা নদী, রাস্তা, রেললাইন। এসব তো সৃষ্টির আদি থেকে রয়েছে। থাকার জন্য একটা সম্পূর্ণ একার বেড পেয়েছিল বলরাম। সেখানে না শুয়ে পাঁচটা ইট নিয়ে চলে এলো মেডিক্যাল কলেজের সামনের ফুটপাথে। সেখানে তখন তারমতোই অনেক বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, ফরিদপুর শুয়ে আছে। মাথার তলায় দুটো নিশ্চিন্ত হাত। কারও গায়ে কারও পা লাগছে না। কলকাতার মানুষ ততদিনে তাদের কী এক কারণে অন্য দেশের মানুষ ধরে নিয়েছে। জল চাইলে দেয় না। একটু ভালো মাছ খেতে চাইলেই 'দূর বাঙাল' বলে খোঁটা দেয়।

কাজের খোঁজে ঘুরে বেড়ায় বলরাম। লক্ষ্য একটাই- কোনও সওদাগরি আপিসে কেরানির চাকরি। কিন্তু ইংরাজি বলতে পারে না তেমন করে। ওদের এক আত্মীয় বিমলদা। বাড়ি ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ সাব-ডিভিশনে। কলকাতায় চাকরি করে। ওর কী রকম মাসতুতো দাদা। নিরামিষ খায়। পেচ্ছাপ করার সময় কানে পৈতে দিয়ে নেয়। বাড়িতে এলেই মায়ের জন্য তাঁতের শাড়ি আর বাবার জন্য গরদের ধুতি আনত। রাতে একবার পাশাপাশি শুয়ে বলেছিল- পার্টস অব স্পিচটা শিখে রাখ, বলাই। চাকরিতে কাজে লাগবে।

৩ 

শিয়ালদহে বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনার লোকজন একটি লজে ওঠে। নাম- প্যারাডাইস। খুলনার লোকজন তুলনায় কিছু বেশি বলে লজটির আরেকটি নাম- খুলনা নিবাস। বাথরুমটি ভয়ঙ্কর অন্ধকার এবং পিছল। দিনের বেলাতেও হ্যারিকেন নিয়ে যেতে হয়। চৌবাচ্চায় আরশোলা ঘোরে। এই লজেই থাকতেন বিভূতিভূষণ। ইস্কুলে পড়াতেন আর এই লজের একটি ঘরে বসে মৌচাক নামের একটি ছোটোদের মাসিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লিখতেন- চাঁদের পাহাড়। কী অসামান্য উপন্যাস! বারবার পড়ার মতো। গল্পের বই পড়ার অভ্যাস বলরামের প্রথম থেকেই। রবিবাবু, শরৎ বাবুর লেখা বেশ কয়েকটি উপন্যাস ওর পড়া। কিন্তু, বিভূতিভূষণ যেন কোথাও গিয়ে আলাদা। 'চাঁদের পাহাড়' পড়তে পড়তে কতবার যে নিজেকে শঙ্করের জায়গায় কল্পনা করেছে বলরাম, তার ঠিক নেই। শঙ্করের গ্রাম এবং ওদের গ্রামের মধ্যে আর তফাৎ কী! পুকুরের ধারে ঘাসের ওপর মাথা রেখে শুয়ে সেও তো ভেবেছে দেশভ্রমণের কথা। মাথার ওপর জামগাছ। সেখান থেকে টুসটুসে পাকা জাম এবং তক্ষকের ডাক ওর বুকে একইসঙ্গে এসে পড়ছে। সেই বিভূতিভূষণ এতদিন থাকতেন অধুনা ওর পার্মানেন্ট বাসস্থানটির একটি ঘরেই! ভাবতেই কী অবাক লাগে! পৃথিবীটা এতটাই গোল! 

শুনেছে, বিভূতিভূষণ লিখতে বসে শোনপাপড়ি কুচি খেতেন। জিনিসটা কাছেরই একটি জায়গাতে পাওয়া যায়। দু'পয়সায় ঠোঙা ভরে দেয়। জিনিসটা খেয়ে দেখল বলরাম। ভালোলাগল না। বড্ড মিষ্টি। গা গুলিয়ে ওঠে। ওর মিষ্টি জিনিসটা একদম পছন্দ নয়।

বিভূতিভূষণের ঘরে এখন থাকে মুকুল বলে একটি ছেলে। বিমা এজেন্ট। নিজে কিছু করবে বলে বাড়ি ছেড়ে এত দূর চলে এসেছিল বলরাম আজ থেকে আটমাস আগে। প্রথম প্রথম থাকত মেডিক্যাল কলেজের সামনের ফুটপাথে। ইটে মাথা রেখে শোয়া। তারপর বড়োবাজারের একটি গদিতে কাজ করত মুটের। তখন থাকতে আরম্ভ করল ওই এলাকারই একটি মেসে। ভালোই কাটল প্রথম দুটো মাস। কলকাতার রান্নায়ও অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল ক্রমে। মুটের কাজ করে পাওয়া টাকা থেকে পাঁচটি টাকা পাঠিয়েছিল দেশের ঠিকানায়। উত্তরে পেল মায়ের লম্বা চিঠি। ওর মা সেকালের ম্যাট্রিক পাশ। চিঠি লিখতে গেলে বানান ভুল করে না। চলিতে লেখা। 
'স্নেহের বলাই, কী এক আতান্তরে ফেলে চলে গেলে তুমি আমাদের! কিছুরই তো অভাব ছিল না তোমার এখানে। স্ত্রী সন্তান জমিজমা। সবই তো তোমার। এখানকার পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত। তুমি থাকলে মনে বল পেতাম। তোমার পিতা শয্যাশায়ী। এখন আর মাছের মুড়ো চিবোতে পারেন না। এই ক'মাসে যেন কত বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছেন। সবসময়ই বিড়বিড় করেন- আমি দেশ ছেড়ে কোথাও যাব না। তোমার সন্তানটি একটু-একটু হাঁটতে পারে এখন। 'বাবা' বলার চেষ্টা করে। পারে না। তুমিও পারতে না। যেখানেই থেকো আমাদের আশীর্বাদ নিয়ো। পারলে তোমার কাছে নিয়ে চলো আমাদের। হকসাহেব পরশুদিন আমাদের গ্রামে এসে মিটিং করে গেলেন। এ বাড়িতে আসেননি। আসবেন ভেবে খলসে আর দারকিনার কষা করে রেখেছিলাম। দেশভাগ কি হবেই? আমাদের তুমি নিয়ে চলো। যত শীঘ্র সম্ভব।
আশীর্বাদসহ- তোমার মা'। 

নিচে তারিখ দেওয়া- দোসরা মার্চ, ১৯৪৭। ওর কাছে এসে পৌঁছেছে ১২ই মার্চ। এর মধ্যেই কত কী ঘটে গেল! খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে পরিস্থিতি। বসন্তে শুধু পাতাঝরা আছে। কোকিল নেই। দেশভাগ যে হবেই, সে বিষয়ে প্রায় সকলে নিশ্চিত। স্বাধীনতাও আসবে হয়তো। কিন্তু তাতে কী! এই সবের মধ্যেই একদিন খুব শুঁটকি খাওয়ার ইচ্ছে হওয়ায় বাজার থেকে কিনে এনেছিল বলরাম। মূলত, অবাঙালিদেরই মেস ওটা। তাদের বেশিরভাগই নিরামিষাসী। মাছের গন্ধেই বমি উঠে আসে। দোকান থেকে শুঁটকি আনার পর তারাই হইচই শুরু করল। ‘ইয়ে কিস কা বাস আ রাহা হ্যায় রে বাবুয়া! নিকলো ইঁহাসে!’ বলরাম পাত্তা না দিয়ে লঙ্কা, মরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে সাঁতলাতে আরম্ভ করেছিল। মেসের ম্যানেজার বর্ধমানের লোক। বাঙালি। দৌড়ে এসে বলল, থামাও তাড়াতাড়ি। নইলে এরা আমাকে মারধোর করা শুরু করবে এবার! বলরাম ওই মেস ছেড়ে দিল তারপর। একটু শান্তিতে শুঁটকি খাওয়া যায় না যেখানে, সেখানে থেকে হবেটা কী! তারপর থেকে এখানেই।

প্রবৃত্তি, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, বাস্তবতা জ্ঞান দিয়ে তৈরি একটি সুন্দর মাংস লাগানো শরীর ছিল তার। ঠিকভাবে খাওয়াদাওয়া না করতে করতে গালগুলো ঢুকে গিয়ে মুখটা কেমন দুর্বোধ্য হয়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝে সারাদিন খেটেখুটে এসে বিকেলের দিকে প্যারাডাইস লজের ঘরে শুয়ে কড়িবরগার সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর মনে পড়ে কীর্তনখোলার কথা। কীর্তনখোলা, কালিজিরা, সুগন্ধা, সন্ধ্যা নদীদের কথা। ভারি বৃষ্টির সময় নদী থেকে যখন তখন টাটকা ইলিশ ধরা যেত। লাফাতে লাফাতে কখন যেন থেমে যেত তারা। সামান্য পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ দিয়ে মাঝিরাই রান্না করে দিত দুর্দান্ত স্বাদু ইলিশ। সঙ্গে বাঁশফুল চিকন ধানের ভাত। অন্তত পাঁচটা টুকরো তো ও খাবেই। ভাবতে ভাবতেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ও। পাখিরা এই সময় সারাদিনের ডিউটি সেরে নিজেদের বাসায় ফিরে যাচ্ছে। এক আকাশ থেকে অপর আকাশে উড়ে চলে যায় ওরা। কী নিশ্চিন্তে! কতটা উড়ে যায় তা আমরা নিচের মানুষরা জানতে পারি না। বলরাম শুধু জানে, এই মেঘের ভিতর দিয়ে গাছপালার ভিতর দিয়ে শিয়ালদার উপর দিয়ে ওরা চলে যাচ্ছে বরিশালের দিকে। এই সময় কী করছে ওর মা? ওর বাবা? লাবু? ছেলেটা এখনও ‘বাবা’ বলতে পারে না। দেখেইনি ভালো করে, বলবে কী! ও কলকাতায় আসার সময় টলে টলে হামা দিত। ডাকঘর পড়ে এত মুগ্ধ হয়েছিল বলরাম, ছেলের নাম রেখেছিল- অমল। অমলেন্দু। ডাক নাম- টুকু। ‘এইটুকু’ থেকে ‘টুকু’। আসার সময় লাবুকে বলে এসেছিল, ছেলেকে কোলে করে বিকেলের দিকে মাঝেমাঝে নদীর ধার থেকে হেঁটে আসতে। চাই কি, একটু নৌকা করে ঘুরেও আসা যেতে পারে। ভালোই লাগবে। মাঝিরা ওদের সবাইকে চেনে। কোনও অসুবিধা হবে না। টুকু তো ওদের কোলেপিঠেই মানুষ হবে। নদীর উপর দিয়ে এই বিকেলবেলাগুলোয় ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিদের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে শরীরের ভিতরের আনন্দ ও তৃপ্তির গর্তগুলো টইটম্বুর হয়ে ওঠে। টুকু কি ওইগুলো দেখে? নিজেকে মাঝে মাঝে অমীমাংসিত বাবা বলে মনে হয় ওর। ছেলেটার বড়ো হয়ে ওঠাটাই নিজের চোখে দেখতে পারছে না। এই সময়ই কিছু ঘটনার কথা ওর পরপর মনে পড়ে যায়- যেমন, কচুর শাকের সঙ্গে খানিক আগেই ধরা ইলিশ মাছের মাথা। মোচার ঘন্টে ছোট চিংড়ি। সাতক্ষীরার ওলের টকটকে লাল রঙের ডালনার ঝোলে এক ডজন বড়ো সাইজের চিংড়ি ডুবে আছে- পিঠটা তোলা। বাড়িতে তোলা সর থেকে ঘি। তার সঙ্গে বড়ো চিংড়ির লালচে ঘিলু। ধান ওঠার পর মাঠ ছেচা কই পাওয়া যাবে। তখন তেলকই। শুকনো শুকনো করে ভাতে মেখে খাওয়া। মাঝেমাঝে একটা করে কাঁচালঙ্কা ডলে নেওয়া শুধু একবার করে। লেবুপাতা দিয়ে কাঁচকি মাছ করত মা। একটি ভাই ছিল ওর। নাম- প্রফুল্ল। তিন মাস বয়স নাগাদ তাকে শিয়ালে টেনে নিয়ে যায়। প্রফুল্ল হওয়ার কয়েকদিন বাদে মা করেছিল। পেঁয়াজ কুচি, রসুন কুচি, কাঁচা মরিচ ফালি, হলুদ গুঁড়ো দিয়ে করা সেই কাঁচকি মাছ সেদিন এই কর্কশ, বন্ধুরতার পৃথিবীতে নেমে এসেছিল একা একা। তার গায়ে লেবুপাতার গন্ধ। খুব বৃষ্টি হচ্ছিল ওইদিন। বাবা বাড়ি ফিরতে পারেনি। ভাই মরে যাওয়ার পর ওই মাছ কেন জানি আর কখনও হয়নি। মিষ্টিকুমড়ো দিয়ে করত তিনকাঁটা মাছ। অনেকে ওটিকে ‘বাতাসি’ বলেও ডাকে। সঙ্গে তুলাইপাঞ্জি চালের ভাত। পুরো ব্যাপারটা ঘটতে হবে একইসঙ্গে। নইলে ভালোলাগবে না কিছুতেই। শীত পড়লে হাড় বিঁধে যাওয়া শীত। কালিজিরা নদীর জলে দুধের সর হয়ে পড়ে থাকে কুয়াশা। হাঁ করলে নি:শ্বাস ধোঁয়া হয়ে যায়। তখন খেতে হয় ঘাসু খাসি। খাওয়ার সময় রোদে পিঠটা ফেলে দিয়ে বসতে হবে। বলরামের দাদু, কেশবচন্দ্রের বাবা ক্ষেত্রমোহন নব্বই বছর বয়সের এক শীতে ওই জিনিস তাড়িয়ে খেতে খেতে এক দুপুরের দিকে ধড়ফড় করতে করতে হঠাৎ থেমে গিয়েছিল বাড়ির দাওয়াতেই। রবিবাবু তখনও নোবেল প্রাইজ আনেননি। টুকু কি এসব জিনিস জানতে পারবে কখনও? কথাটা ভাবতে ভাবতে হোটেলের নিচের তলায় রওনা দিল বলরাম। সন্ধের মুড়ি-তরকারি খাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। আগে এটা ও খেত না। এখানে এসে শিখেছে। এক স্থানের খাবার এইভাবেই তার নিজস্ব জল-হাওয়া নিয়ে অপরস্থানে মিশে যায়। 


৪ 

জীবনের সব চ্যাপ্টারেই দখলের জন্য বরাদ্দ থাকে একটা বড়ো সাইজের প্যারাগ্রাফ। অবশেষে স্বাধীনতা এলো। যা ভাবা হয়েছিল তাই। ভাগ হয়ে গেল দুই দেশ। কোনও আনন্দ নেই চারপাশে। বাতাস থকথক করছে অবিশ্বাসের তাতে। সিলেট, খুলনা, চট্টগ্রাম, ঢাকা, বরিশাল থেকে পিলপিল করে লোক চলে আসছে এপারে। কেউ যাচ্ছে কলকাতা, হাওড়া, হুগলি- কেউ বা নেমে যাচ্ছে মালদহ, মুর্শিদাবাদে। অনেকের কিছুই ঠিক করা নেই আগে থেকে। রেললাইন দিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসছে তারা। কোথায় যাবে, জানে না। কী করবে, জানে না। নতুন দেশ। নতুন সরকার। খুব শান্ত কোনও জায়গা দেখতে পেলে সেখানেই পরিবার নিয়ে থেমে যাচ্ছে কেউ কেউ। সবার খেলার সঙ্গীরা আলাদা হয়ে গেল। সবার গলার স্বর ভেঙে গিয়ে বদলে গেল। হাজার হাজার বছরের মাঠ খেত নদী জঙ্গল পেরিয়ে ওপারের মানুষ চলে এলো এপারে। গম-খড়ের ফিকে সাদা বিচুলির কুচো ছাড়া আর কিছু লক্ষই করতে পারেনি কখনও, এমন মানুষও মন দিয়ে প্রথমবার দেখল ট্রাম। তার গায়ে হাত বুলোল। যেন প্রথম তোলা ধানটি। এর মধ্যেই শিয়ালদহ স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে বলরাম। নিজের বাপের বাড়ির লোকের সঙ্গে টুকুকে নিয়ে কলকাতা চলে আসছে লাবু। ওর কাছে। তার সঙ্গে কেশবচন্দ্র আর বকুলরানিও থাকবে। চিঠি পেয়েছিল বলরাম দিন পনেরো আগেই। ওরা আসছে। প্রায় ঘন্টা ছয়েক অপেক্ষার পর ওদের দলটাকে দেখতে পেল ও। স্টেশনে ভর্তি পুলিশ। তার থেকেও পাঁচ লক্ষ গুণ বেশি মানুষ। বলরাম বুঝতে পারে না, দেশের নাম কী বলবে এখন। টুকু বড়ো হয়েছে একটু। গায়ের রঙটি ফর্সা। মামার কোলে। বাঁ-হাতে একটা ছোট্ট আখ। কতদিন পর দেখছে লাবুকে! ভিড়ের চাপে ঘোমটা সরে গিয়েছে। এভাবে ওর অভ্যাস নেই তো! এতদিন পর ওকে দেখেও হাসল না। কেবল বলল, চলে এলাম।

- মা এলো না?

- না। বাবা কিছুতেই আসতে চাইলেন না। তাই মাও আর এলেন না।

- কেন?

- উনি আসবেন না। গোটা গাঁয়ের লোক বোঝাল। কিছুতেই রাজি হলেন না!

- আসার সময় কিছু বললেন?

- কথা হয়নি আর। পুজো করছিলেন মন দিয়ে। মা তোমার জন্য দশটা টাকা পাঠিয়েছেন। বলছিলেন- কীভাবে থাকে ছেলেটা, জানি না। কী কী খায় ওখানে, তাও তো জানি না। কখনও যদি আর দেখা না হয়… এটা ওর হাতে দিয়ে দিয়ো। কলকাতায় তো হুগলি নদী আছে, ওখান থেকে তোলা মাছ যেন কিনে খায়। মাছ খেতে তো খুব ভালোবাসে ছেলেটা…

শ্রাবণ মাস শেষ হয়ে গেল, তবু তেমন বৃষ্টি নেই। এতগুলো লোককে নিয়ে লজে ওঠা যাবে না। কোথায় যাওয়া যাবে, তা ভাবা হয়নি…

কলকাতার জঙ্গলে মিশে যাচ্ছিল ওরা। লাবণ্যের একটি হাত বলরামের হাতে। আরেকটি হাতে মুঠো করে রাখা দশটি টাকা। ওরা গাড়ি-ঘোড়া পেরিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। চুপচাপ। একটি কথা নেই কারও মুখে। মাসছয়েক আগে চিঠি লিখে মা বলেছিল- তুমি আমাদের নিয়ে চলো এখান থেকে। সেই চিঠির উত্তর দিতে পারেনি বলরাম। ওরা হাঁটছিল মৌলালির দিকে। একভাবে হাঁটতে হাঁটতে কেউই আর দেখতে পেল না, অনেক উপরের আকাশ দিয়ে বহু বছর আগে এরকমই এক ভাদ্রের দুপুরে যত্ন করে রান্না করা একটি বড়ো সাইজের তেলকই কেমন টুপ করে মেঘের ভিতর হারিয়ে গেল চিরকালের মতো…

1 টি মন্তব্য:

  1. এমন গল্প বহুদিন পড়িনি। গরম বাঁশকাটি চালের ভাত, ইলিশের তেল , কালোজিরা দিয়ে ঝোল আর তেলকইর স্বাদে ভরা আখ্যান।
    কয়েকটা জায়গায় বুক মোচড়ায়। যেমন বলরামের কাঁথা যেখানে শোকাত সেখানে আজ তার ছেলের কাঁথা। অথবা শিয়াল বলরামের ভাইকে নিয়ে যাবার পর আর কখনও কাঁচকী মাছ হয়নি।
    আর চিরন্তন সত্য তো আছেই। রাজনীতি মানুষের মধ্যে বিভেদ করায় কিন্তু নিজে কখনও বিভেদে ঢোকে না। একদম।
    কীর্তনখোলার নদী বরিশালের রূপ চোখে ভাসায়। কলকাতা এসেও বলরামের অন্তর্দ্বন্দ্ব,জীবন উপভোগের ইচ্ছে, স্বাদ নেবার আকুতি খুব ভালোভাবে পরিস্ফুট।
    উপরি পাওনা প্যারাডাইস হোটেলে বিভূতিভূষণের চাঁদের পাহাড়ের ব্যাকগ্রাউন্ড। শেওলা পড়া পিচ্ছিল বাথরুম, দিনেও হারিকেন নিতে হয়, শোনপাপড়ি। হ্যাঁ ঘটিস্বাদের পোস্ত থেকে রান্নায় মিষ্টি সব আছে মজুত।
    শুধু একটা সন্দেহ। টাটকা ইলিশ কি বরিশালে পেঁয়াজ দিয়ে খাওয়া হয়? কালো জিরে কাঁচামরিচ জানতাম।
    গল্প বলার আঙ্গিক দারুণ সুন্দর। এটাকে বদলাবে না। শুধু সুসংহত ও সংক্ষিপ্ত করো। অযাচিত অনেক কিছু আছে গল্পের সঙ্গে পারম্পর্যহীন। লেখকের ডান হাতের লোভ হবে লিখতে কিন্তু গল্পকারের বাঁ হাত সেটা থামিয়ে দেবে।
    এই গল্প বারবার পড়ে এডিট করো। আরও ধারালো হবে।
    এ যে ভারি মায়াময় , অনুভূতির গল্প। অনেক স্নেহ, শুভেচ্ছা। কি বোর্ড চলুক।

    উত্তরমুছুন